menu

সাময়িকী কবিতা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০

মনে হয়

মহাদেব সাহা

মনে হয় সব ভুল ছবি, ভুল ঠিকানা

কপাট দেওয়া দালানখানি, কীভাবে তার মুখটি

চিনি;

হঠাৎ কখন ঘুমিয়ে যাই, সেকথা কি বকুল জানে?

কেউ জানে না, মধ্যরাতে চুপিসারে সেই দালানে

ঘুরতে যাবো,

জোছনা নাকি রৌদ্র তখন, দালানজুড়ে ফুলের

গন্ধ;

ভালোই হলো গন্ধ আমি বুক-পকেটে ভরে নেবো

দালানজুড়ে কীসের গন্ধ, কীসের আলো, কীসের জাদু

আমার কিছুই মনে পড়ে না, বদ্ধ মাতাল,

বেতাল মহিষ,

ফাঁক-ফোকড়ে রুমাল গোঁজা, রুমালে কী সেন্ট মাখানো!

অষ্টপ্রহর ঘণ্টা বাজে, দরদালানে ভিতরমহল

নেচে বেড়াই সারাটা রাত, কে ওখানে গলা সাধে,

নদীতে কি জলের নৃত্য, জলপরীদের নাচের মুদ্রা?

আমার কিছুই মনে পড়ে না, সুখের জীবন, সুখের

বাড়ি।

ঠিক কোথায় রুপার কৌটো, কাঠের বোতাম,

কাঠের বাক্স

কপাট দেওয়া একটি দালান, কপাট দেওয়া একটি বাড়ি

সিং দরজায় তালা ঝোলে, বাড়ির মধ্যে

কীসের নৃত্য?

নামঠিকানা জানি না তার, কোনখানে এই দালানবাড়ি

স্বপ্ন দেখি, গন্ধ পাই, আর কিছু মনে পড়ে না।

লোলুপ তৃষ্ণার ফাঁদে

মাহফুজ মুজাহিদ

সব পাড়া ঘুমিয়ে গেলে অন্ধকারে

জেগে থাকি চোখে স্বপ্ন নিয়ে একা

বটের ঝুলে ঝুলবো বলে; ফুলদল

ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে বাগানের কোণে

হেঁটে হেঁটে গহীন অন্ধকারে খুঁজি পথ

সারসের ঠোঁটে মাংসল খাবার নিয়ে

তৃষ্ণার ঘোরকালে জেগে জেগে বাজে

সুরের মূর্ছনা; ঘুমকাল অতীত এখন

পৃথিবীর পথে পথে রাত পেরুলেই

নপুংশক সকাল খেলা করে অস্থিতে

যাচ্ছি-যাই বলে চলে যেতে যেতে ফিরে

এখনো রয়েছি পড়ে পাড়া ঘুমানো অন্ধকারে

একদল মানুষের উৎপাতে খসে যায় চাঁদ

ভালোবাসাহীন সমূদ্রের ঢেউ লেগে শেষে

সব হারাবার ভয়ে একা; একা জেগে থাকি

সব পাড়া ঘুমিয়ে গেলে পৃথিবীর অন্ধকারে

গল্পের বৈঠা

শেলী সেনগুপ্তা

বসে আছি দিনটির দিকে চেয়ে

যেদিন তোমার গল্পের বৈঠা থামবে

আমার দুয়ারে,

নদীটিও ধুয়ে দেবে কাদা মাখা হাত,

চাষী-বউ এর মতো

আমিও মন্ত্র জানি বীজধান জমিয়ে রাখার,

আকালের বছর তোমার আঙ্গিনায়

ছড়িয়ে দেবো ধারাপাত প্রেম,

তুমি আঁকড়ে ধরো

নিষ্ফলা দুপুরের ঘুঘুর ডাকের মতো,

আমার দিনটিও ফিরিয়ে দিও

গল্প-বৈঠার সাথে

কোন কোন নদী ছলাৎ শব্দে বলে

‘গল্পের মতো প্রেমও প্রতিদানহীন’!

সারাংশ

কাজী নুসরাত শরমীন

মরণ হয়েছে আজ, ঘুমের ভেতর... নিশ্চল নিশ্চুপ,

বিপদ সংকেত তোয়াক্কা না করা বেপরোয়া জেলে

যেমন পায় না খবর জলোচ্ছ্বাসের, তেমনি পৃথিবীও

জানলো না পেলো না টের, যাচ্ছি, ধীর মন্থর পায়ে...

গন্তব্য না জেনে বুঝে, নক্ষত্র মোহনায়

বুকের মলাটে এক ছিলো উত্তাল সমুদ্র

সেখানেও উঠতো ঝড়, ছিন্নভিন্ন মালাটখানি

ঠিক সয়েবয়ে নিতো তা-ব, জলজ আর্দ্র...

পাহাড়ের প্রশান্তি নিয়ে চোখ বুজতেই

মনগ্রুপের রক্তে, শিরা উপশিরায় তীব্র বেগে

দৌড়াতো সবুজ, একটা অবুঝ জীবন, দুঃসহ তার ভার,

জেঁকে বসলো সেদিন মনের ভেতর হয়ে পাহাড়।

আদিগন্ত মাঠ ছিলো এক, জানো!

কংক্রিটের আধিপত্য পেরেক ঠুকেছে রোজ

দুঃখেরা সব জোট বেঁধেছে অনন্ত মেঘেরি দল

আকাশজুড়ে চিল শকুনের ওড়াওড়ি...

এই সমস্ত স্বপ্ন, আজন্ম জমিয়ে তোলা ভার

শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে, গুঁজে ঘাড়

যাচ্ছি, ধীর পায়ে পায়ে হায়

না জেনে বুঝে তাকে, নক্ষত্র মোহনায়।

রবিউল রবি তো রুমি ও কান

কবি রবিউল হুসাইন স্মরণে

অমিত চৌধুরী

মনোলোকে হতাশার আলোক-আঁধারে কুয়াশার জাল

স্বপ্নীল আকাশে ছিল অসাধ্য সাধনে শিল্প-মহাকাল-

কাব্যের বাকময়তা খুঁজেছিল আরাধ্য দেবীকে

প্রেম-মায়া-মোহ আর ব্যর্থতায় জরাজয়ী ছিলো কে?

সুন্দর দক্ষিণে হোক- উত্তরেও থাকে কবি রবিউল

স্থপতি নও কেবল, তুমি স্থাপত্যের নগর বাউল

সুখে দুঃখে ছিলে সৃজনী প্রতিভায় সুন্দর-শ্রীজাত

শব্দ শিল্পের বাঁধনে স্মরণীয় এক কবি তুমি প্রতিভাত।

কাঁচের আয়না বাঁধানো শহরে নগরে বন-বাদাড়ে

ইমারত গড়ার সৃজনে স্থাপত্য কলায় ওরে

লুঁই কানের উত্তরসূরি যে প্রকৃতপক্ষে তুমিও

মহান স্থাপত্য কিংবা শব্দ শিল্পে তুমি কান-রবি-রুমিও।

অনুজ জনের জন্যে তোমার ছিলো সে দায় দায়িকতা

ঔদার্যে অসীম, ধর্মে ও বর্ণে ছিল না সাম্প্রদায়িকতা।

নৈঃশব্দ্যের মৌনতা

জান্নাতুল বাকিয়া কেকা

নৈঃশব্দ্যের মৌনতায় উঁকি দেয় জীবন।

ঢিলছোড়া জলে চক্রাকারে ঘোরে

জীবনের নানান আস্ফালন।

নৈঃশব্দ্যের জলে দেখি

ভেজাল পরজীবী কচুরিপানার

বেঁচে থাকার কীর্তিময় আস্ফালন।

পানার নিচে টাটকিনি আর ড্যারকা পোনার

অবিরাম ছোটাছুটিতে মৌনতা ভাঙে

জানান দেয় জীবনের আহ্বান।

আইলের দুধারে বিস্তৃত জমিনে

ফল-ফসলের নৈসর্গিকতা

প্রগাঢ় ভালোবাসায় গড়ে নৈঃশব্দ্যের মৌনতা।

আবার ফুলে ফুলে মৌমাছির গুঞ্জনেও ভাঙে

নৈঃশব্দ্যের নৈসর্গিক মৌনতা।

আমরা কি তবে মানুষ নই

মানজুর মুহাম্মদ

লতাগুল্মেও সাথেও কথা বলি এখন

ওরা বলে- মানুষ পৃথিবীর সাথে ঘুরে

তারপর একদিন সবুজ হওয়ার প্রত্যয়ে ঋষি হয়

আমার তখন তোমার কথা মনে পড়ে খুব

আমাদের সবুজ হওয়ার দিন পেরিয়েছে সেই কবে!

আমরা পৃথিবীর সাথে ঘুরিনি কখনো

শুধু মিশে যেতে চেয়েছি অস্পৃশ্য হাওয়ায়, রোদের গুড়োয়

নক্ষত্রের রাতগুলোয় শুধু ভেঙ্গেচুরে মিহি হতে চেয়েছি রুপোলি আলোয়

লতাগুল্মকে আমি কানে কানে প্রশ্ন করি- ‘আমরা কি তবে মানুষ নই?’

আলেখ্য

অঞ্জন আচার্য

ঘুমেরা চলে যায় ডানা মেলে রাতে

পড়ে থাকে দু-একটা স্বপ্নের ডিম,

তাতে তা দেয় রূপনগরের কাক;

কোকিল বরাবরই চতুর- কাকেরা নির্বোধ।

নিজের উষ্ণতায় বেড়ে ওঠে শস্যের দানা

তৃণেরা কখনো স্বপ্ন দেখেছে কিনা বৃক্ষ হওয়ার

জানা হলো না কারো।

লেখা নেই ইতিহাস পাতায়; বিজ্ঞান কিংবা ভূগোলের খাতায়।

আপাদমস্তক গল্পের শরীরে

শম্পা মনিমা

ইচ্ছা ছিল শহরের সব চোখ দাঁত বসাবার আগেই

অফেরতযোগ্য কোনো দ্বীপে নিরুদ্দেশ হওয়ার

ধান পালানো শহরে আজ শুধু দেখি

বৃদ্ধ সঙ্গম দিয়ে যৌবনের দ্বীপ নির্জন চোখে

তাকায় আড়চোখে।

প্রয়োজনে নিরুদ্দেশ তুমি

চোরা চাউনিতে সময় পান করেছো

আঙুলে আগুন রেখেছো ধরে-

গোছানো শরীরের নয় ছয়ে অনিত্য উষ্ণতায়

কবুতরী শাদা নাভিমূলে ঝড় সোহাগে

দুটি মানুষের কাহিনীতে আসা যাওয়া ছিল

দাঁত বসানো প্রণয়ে নষ্টামি ছিল না।