menu

গিরিশ কারনাড

সমাজ সংস্কৃতির অম্লান আলো

গৌতম গুহ রায়

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
image

জন্ম : ১৯ মে ১৯৩৮; মৃত্যু : ১০ জুন ২০১৯
প্রচন্ড শ্বাসকষ্টের মধ্যেও মুখে পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে রাস্তায় প্রতিবাদে বেরিয়ে আসতেন গিরিশ কারনাড।

হতে পারতেন ইংরেজি ভাষায় কবিতা লেখা সফল ভারতীয় কবি, হতে পারতেন দর্শনের সফল অধ্যাপক বা অর্থনীতির পন্ডিত, কিন্তু তার আশৈশবের মননভূমি তাকে টেনে নিয়ে আসে নাট্যপ্রাঙ্গণে, সংস্কৃতির স্বাধীনচেতা ও লড়াকু যোদ্ধা হিসাবে। গিরিশ কারনাড, ভারতীয় নাট্য ও সংস্কৃতি জগতের চেতন অংশের প্রধান জ্যোতিষ্ক। পান্ডিত্য, সৃজন ক্ষমতা, মেধা, সতত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যদিয়ে নতুন আলোর অন্বেষণ, দক্ষতা, সবকিছু মিলিয়ে তিনি সমসময়ের এক বহুবর্ণ ব্যক্তিত্ব, যা আজকের সময়ে বিরলতম। মিথ, পুরান, ইতিহাস এবং লোকনাট্যের উপাদান গ্রহণ করে আধুনিক যুগোপযোগী নির্মাণ ও বার্তার কারণে গিরিশ কারনাডের নাটকগুলো বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার প্রতিকূলতা তাকে কাবু করতে পারেনি, তীব্র শ্বাসকষ্ট উপেক্ষা করেও হাজির হয়েছেন ক্ষমতাসীন শাসকের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে আহূত প্রতিবাদসভায়। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নে সর্বদা সরব প্রতিবাদী, নাকে অক্সিজেনের নল, সঙ্গী পোর্টেবল সিলিন্ডার। ‘আরবান নক্সাল’ তকমা দিয়ে প্রতিবাদী সমাজকর্মীদের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে গোটা দেশজুড়ে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছিল, সেই প্রতিবাদ মিছিলের সামনে ছিলেন ৮০ পার হওয়া গিরিশ কারনাড, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, স্বৈরতান্ত্রিক প্রভুত্বের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াকু সংস্কৃতি যোদ্ধা অনিতক্রম্য সেই বার্ধক্যের কাছেই হেরে গেলেন।

২০১৫-এ, টিপু সুলতানের ২৬৫তম জন্মজয়ন্তর অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অতিথি গিরিশ কারনাড প্রস্তাব রেখেছিলেন, ব্যাঙ্গালড়ুর বিমানবন্দরের নাম কেম্পেগৌড়ার বদলে টিপু সুলতানের নামে রাখার জন্য, বলেছিলেন, ‘টিপু’ যদি হিন্দু হতেন তবে তার স্থান শিবাজীর জায়গায় হতো। সাম্রাজ্যবাদী বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে টিপু ছিলেন এক আপসহীন যোদ্ধা। এর ফলে উগ্র হিন্দুত্ববাদী ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের খতম তালিকায় সর্বাগ্রে ছিলেন তিনি। এই প্রসঙ্গে কলকাতায় কথা প্রসঙ্গে দৃঢ় স্বরে তিনি বলেছিলেন, “উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আমি ভয় পাই না। জীবন নশ্বর।” সেদিন শুনিয়েছিলেন বাংলার সেই গানের কলি, ‘ভয় কি মরণে...!’ এই অকুতোভয় মানুষটি চলে গেলেন চির ঘুমের দেশে। যিনি বলেছিলেন, ‘থিয়েটার সমাজ বদলাতে পারে না, কিন্তু সমাজ বদলের ক্ষিদে জাগাতে পারে’।

উপমহাদেশের সাহিত্য, থিয়েটার, ফিল্ম অভিনয়ে, সবার থেকে স্বতন্ত্র, টানটান ও ঋজু, গিরিশ রঘুনাথ কারনাড, ৯ জুন সকালে ৮১ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন তার ব্যাংগালুরুর বাসভবনে। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তাকে চিন্তিত রেখেছিল দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা শক্তির ধর্মান্ধ আচরণ, ক্ষমতার পেশীশক্তির আস্ফালন। তার প্রতিবাদ ছিল আসন্ন সামাজিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে, নাগরিকের মুক্তচিন্তার সপক্ষে। সত্যের পক্ষে তিনি আজন্ম লড়েছেন, আপসহীন এ লড়াইয়ে তার আয়ুধ ছিল সাহিত্য ও থিয়েটার। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কারনাড একাধারে ছিলেন নাট্যকার, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্র অভিনেতা ও পরিচালক। বিভিন্ন ভাষায় তার লেখা নাটক অনূদিত হয়েছে, বাংলাসহ দেশে ও বিদেশে তার নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে। নাট্যকার হিসাবে তার পরিচিতি বেশি হলেও তিনি চাইলে সাহিত্যেও তার আসন স্থায়ী করতে পারতেন। সার্বিক অর্থেই গিরিশ কারনাড ছিলেন বহুমুখী প্রতিভাবান। ভারতীয় সাহিত্যর নব্য আন্দোলনেরও একজন পুরোধা ছিলেন তিনি।

গিরিশ কারনাডের জন্ম মহারাষ্ট্রের মাথেরানে, ১৯৩৮-এ। গিরিশের মানসিক দৃঢ়তা মা কৃষ্ণাবাই মাঙ্কিক-এর থেকে পাওয়া। খুব কম বয়সে স্বামীকে হারান কৃষ্ণবাই, এক পুত্রকে নিয়ে, যাকে বলে অকুল পাথারে পড়েন। এর পর সংসার পালনের জন্য নার্সিং প্রশিক্ষণ নেন। সেখানেই পরিচয় হয় ডা. রঘুনাথ কারনাডের সঙ্গে, তিনি তখন বম্বে মেডিক্যাল সার্ভিসেসে যুক্ত। দুজনে ক্রমশ কাছাকাছি আসেন ও বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিধবার বিয়ে তৎকালীন কন্নড় সমাজে সহজ ছিল না, তারা শেষপর্যন্ত আর্য সমাজের বিধি মেনে বিয়ে করেন। তার ৪ সন্তানের তৃতীয়জন গিরিশ। জন্ম মহারাষ্ট্রে হলেও শৈশব কাটে তার কর্নাটকের শির্ষিতে। সেখানে পারিবারিকভাবেই তিনি সংস্কৃতির পরিবেশে বড় হয়েছেন। স্থানীয় লোকনাট্য ও ট্র্যাডিশনাল পালা ‘যক্ষগান’ দেখে এর প্রতি আগ্রহী হন সেসময় থেকেই, যা তাকে পরবর্তীতে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কর্নাটকের গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হন সেই সময় থেকেই, অনাড়ম্বর গ্রামীণ লোকনাটক তাকে আকর্ষণ করতো, এই টান চিরকাল তাকে আটকে রেখেছিল শেকড়ের সঙ্গে। কিশোর বয়সেই চলে আসেন ধারোয়ারে, ১৯৫২তে ভর্তি হন বাসেল মিশান হাই এডুকেশান ইনস্টিটিউটে। সাহিত্য আগ্রহী হলেও পাঠ নেন অংকে, সেখান থেকেই ১৯৫৮তে কর্নাটক বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে অঙ্কে স্নাতক হন। আবার ভিন্ন বিষয়ে চলে যান ১৯৬০-এ রোডস স্কলারশিপ নিয়ে চলে যান ইংল্যান্ড, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন ও রাজনীতির পাঠ নিতে। সেখানে সক্রিয় থাকেন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসাবেও, অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সম্পাদকও হন।

আবার এরপর ফিরে আসেন নিজের শেকড়ে। চাইলে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় মগ্ন থাকতে পারতেন, কিন্তু মাতৃভাষা কন্নড়কেই বেছে নেন সৃজন কাজের ক্ষেত্র হিসাবে। ১৯৬২-৬৩তে কাজ নেন চেন্নাইয়ের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে। এই সময়েই হাত দেন তার প্রথম নাটক রচনায়, তখন তিনি মাত্র ২২ বছরের তরুণ, মহাভারতের কাহিনি অবলম্বনে লেখেন ‘যযাতি’। নাটকটি ইংল্যান্ডেও মঞ্চস্থ হয়েছিল। সি রাজাগোপালাচারিয়ার মহাভারত থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘যযাতি’ চরিত্রটিকে তার প্রথম সাহিত্যকীর্তি হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন। মহাভারতীয় আখ্যানে নহুষের পাঁচ পুত্রের দ্বিতীয় পুত্র যযাতি। প্রথম সন্তান যাতি সন্ন্যাস নিলে যযাতি রাজা হন। দেবগুরু শুক্রাচার্যের মেয়ে দেবযানীকে বিয়ে করেছিলেন যযাতি, তাদের দুই পুত্র, যদু ও তুর্ব্বসু। কিন্তু সেই রাজা যযাতির আকর্ষণ জন্মে রূপসী দৈত্য রাজকত্যা শর্মিষ্ঠার প্রতি, রূপমুগ্ধ যযাতি শর্মিষ্ঠার মিলন হয়, তাদের তিন পুত্র জন্মে, দ্রুহ্যু, অনু, পুরু। দেনযানী এই সংবাদ তার পিতাকে দেন এবং এর বিহিত চান। ক্ষুব্ধ শুক্রাচার্য এসে রাজা যযাতিকে অভিশাপ দিলেন, যযাতি রূপে জরাজীর্ণ হয়ে গেলেন। কিন্তু তার কাকুতি-মিনতিতে দেবগুরু অভিশাপ থেকে রক্ষার পথও রাখলেন। বললেন, যদি তাদের কোনো সন্তান যযাতির জরা এবং বার্ধক্য গ্রহণে সম্মত হয় এবং তার নিজের যৌবন যযাতিকে দান করেন তবেই যযাতি আবার আগের চেহারা ফিরে পাবেন। এক একে অন্য পুত্ররা অসম্মত হলেও কনিষ্ঠ পুত্র পুরু পিতার জরা গ্রহণে সম্মত হন। যযাতি তার রাজত্ব পুরুকে অর্পণ করেন। মহাভারতের এ আখ্যানটি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক কাজ হয়েছে, মাইকেল থেকে দেবেশ রায় এই আখ্যান নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু গিরিশ স্বতন্ত্র, এখানেই, যখন তিনি পুরুর স্ত্রী চিত্রলেখার বয়ানে শুক্রাচার্যের সামনে প্রশ্ন রাখেন যে নৃপতি যযাতির, যিনি সম্পর্কে তার শ্বশুর, কি অধিকার আছে তার দাম্পত্য হরণের? পুরানের থেকে উঠে আসা চরিত্রের এক নারী এভাবেই পুরুষতন্ত্রের সামনে প্রতিবাদের উচ্চারণ করে। এখানেই তিনি পৌরাণিক আখ্যানের বয়ানে আধুনিক কালের নারীবাদী জিজ্ঞাসা তুলে আনেন।

গিরিশ কারনাড তার শৈশবের আকর্ষণ থেকেই ভারতীয় আখ্যান ও পুরান, মিথ, মহাকাব্য থেকে উপকরণ খুঁজেছেন তার নাটকের জন্য। সেই উপকরণকে তিনি আধুনিক সময়ের ক্যানভাসে সমসাময়িক রঙ্গে এঁকেছেন মঞ্চের জন্য। এভাবেই লিখেছেন, ‘হয়বদন’, ‘নাগমন্ডল’ প্রভৃতি নাটক। ‘হয়বদন’ নাটকটি স্বাধীনতা-উত্তর ভারতীয় নাটকের একটি ‘মাইলফলক’ হিসাবে চিহ্নিত হয়, নাট্যকার হিসাবেও তাকে ভিন্ন উচ্চতায় তুলে আনে।

গিরিশ কারনাডের যে নাটকটি নাট্যসাহিত্য এবং মঞ্চনাটক হিসাবে পাঠক ও দর্শককে তুমুলভাবে আবিষ্ট করেছিল, সেটি এই ‘হয়বদন’, যার প্রযোজনা ও মঞ্চায়ন ছিল সম্পূর্ণ আধুনিক, কিন্তু বিষয় তুলে এনেছিলেন ভারতীয় প্রাচীন আখ্যান থেকে, যেভাবে ‘নাগমন্ডল’ও এনেছেন। ১৯৭১-এ কন্নড় ভাষায় তিনি মূল নাটকটি লেখেন। এর পর এটি হিন্দি, ইংরেজি, বাংলাসহ নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। জার্নাল ‘Enact’-এ এটির ইংরেজি অনুবাদসহ প্রকাশিত হয়। ১৯৭২তে মাদেরাস প্লেয়ারস এই নাটকটি মঞ্চস্থ করে। ‘হয়বদন’-এর কাহ্নি কাঠামো তিনি নিয়েছিলেন সংস্কৃত নীতিশিক্ষামূলক ‘কথাসরিতসাগর’, ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’-এর থেকে, তবে তিনি অনেকটাই প্রভাবিত হয়েছেন টমাস মানের ‘The Transposed Heads’ (1941) দ্বারা। ‘হয়বদন’ মানুষের অসম্পূর্ণতার আক্ষেপ, হৃদয়বৃত্তি ও মননের দ্বন্দ্বের আখ্যান বলা যায়। মানুষের অস্তিত্ব বা পরিচিতি কী? মানবসত্তার বিকাশের পথ কী? এই গভীর জিজ্ঞাসা ‘হয়বদন’-এ উঠে এসেছে। ত্রিপথগামী প্রেমের এক আশ্চর্য আখ্যান এটি। এছারাও কাব্যময় ভাষা, গান, এবং নাগরিক ও লোকনাটকের আঙ্গিকের ব্যবহার এই নাটকটিকে বিশেষ স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে। বাংলায় এটির অনুবাদ করেন প্রথমে চিত্তরঞ্জন ঘোষ, প্রকাশিত হয়েছিল ‘বহুরূপী’তে। গান লেখেন শঙ্খ ঘোষ। এখানে কারনাড তুলে আনেন ব্যক্তির দ্বৈত সত্তা, তাই নিয়ে মৈত্রি হওয়া মানুষের নিজের অস্তিত্বের খোঁজের দ্বন্দ্ব। ‘হয়বদন’-এর টেক্সট আলাদাভাবেও বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। এখানে ঘোড়ামুখো মানুষটি ও তার পরিণতি নাট্যকারের নিজস্ব সৃষ্টি। তিন চরিত্র, সীতা-শ্রীদমন-নমদ থেকে পদ্মিনী-দেবদত্ত-কপিল-এর মূল কাহিনির সঙ্গে এই ঘোরামুখোর উপকাহিনি যুক্ত করে এই স্বতন্ত্র মাত্রায় তুলে আনেন কারনাড।

এই আখ্যানটিকে সমসাময়িকতার ক্যানভাসে রেখেছেন কারনাড। মঞ্চায়নের সময় ব্যবহার করেছেন ঐতিহ্যগত লোক উপকরণ। কারনাডের কৈশরে দেখা গ্রামীণ লোকনাট্য সেই ‘যক্ষগান’-এর অভিজ্ঞতা তাকে এই নাটকটির নির্মাণে সাহায্য করেছিল। নাটকটিতে লোকনাটকের মতোই অনেক গান ব্যবহার করেছেন তিনি।

‘হয়বদন’ আসলে একজন অসম্পূর্ণ মানুষ যে পূর্ণতার খোঁজ করে চলছে। দুই অংকে বিভাজিত এই নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্র পদ্মিনীর ভালোবাসা দু’জনের প্রতি, যারা আবার দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু, গল্পের মূল প্রতিপাদ্য হৃদয় ও দেহের প্রাধান্য ও দ্বন্দ্ব।

নাটকের সূচনায় সূত্রধর ভাগবতকে মঞ্চে দেখা যায়, সে ঈশ্বরের ক্ষমতা ও মানুষের অভিলিপ্সা নিয়ে কথা বলে, মঞ্চে বিঘেœশ্বর গণেশের পূজা আরাধনা করে, শুরু হয় মূল নাটকটি। ভগবত হাতির মাথাওয়ালা দেবতা গনেশকে আরাধনা করে তাকে বর্ণনা করেন সাফল্য ও পার্ফেকশানের দেবতা হিসাবে, শুদ্ধতা ও পবিত্রতার মূর্তি বলে। এরপর সেই ধর্মপূরের দুই যুবকের প্রসঙ্গ আনেন। মঞ্চে প্রবেশ করে হয়বদন, মাথাটি যার অশ্বের মতো, দেহ যার মানুষের, মানুষের ভাষায় কথা বলে। ‘হয়বদন’-এর বয়ানেই জানা যায় তার মা কর্নাটকের এক রাজকন্যা ছিলেন। যৌবন এলে তার বাবা তার বিয়ের প্রস্তুতি নেন, এবং বিশ্বের নানা প্রান্তের রাজপুত্রদের আমন্ত্রণ জানান হয়। তার কাউকে পছন্দ হয় না, অবশেষে আরব দেশের একজনকে তার মনে ধরে, রাজা তখন রাজকন্যার বিয়ের প্রস্তুতি নেন সেই আরব রাজপুত্রের সঙ্গে। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে রাজকন্যা বলেন যে তার পছন্দ আরব রাজপুত্র নয়, তার ঘোড়াটি, এবং সেই ঘোড়াটিকেই সে বিয়ে করবে। তাই হয়, এরপর ১৫ বছর তারা একসঙ্গে ঘর করে, হঠাৎ একদিন দেখে ঘোরাটি উধাও, সেখানে এক গন্ধর্ব পুরুষ। পরে সে দেখে যে ঘোড়াটি আসলে এক গন্ধর্ব পুরুষ, মানবীর ভালোবাসা তাকে আবার গন্ধর্ব রূপ ফিরিয়ে দিয়েছে। গন্ধর্ব পুরুষ তখন হয়বদনের মা’কে গন্ধর্ব দেশে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু তিনি রাজি হন এই শর্তে যে তাকে ঘোড়া হয়েই থাকতে হবে। ঘটনাক্রমে তার মা একটি ঘোড়ায় রূপান্তরিত হন, এবং অরণ্যে চলে যান, পড়ে থাকে তাদের একমাত্র সন্তান হয়বদন, অর্ধেক অশ্বের চেহারা নিয়ে। সে সেই অসম্পূর্ণতা থেকে মুক্তি চায়। সূত্রধর তার পূর্ণতার আকাঙ্ক্ষাকে চরিতার্থ করার জন্য ইচ্ছাময়ী মাকালীর কাছে আরাধনার কথা বলে। এভাবেই এরপর মূল আখ্যানটির উপস্থাপনা হয়, যে আখ্যানটি মঞ্চে উপস্থাপন করা হয় সেখানে দেবদত্ত ও কপিলা দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। ধিমান দেবদত্ত একজন ব্রাহ্মণের সন্তান, আর বলশালী কপিল একজন কামারের সন্তান। দেবদত্ত পদ্মিনী নামের এক মেয়ের প্রেমে পড়ে, এক ধনি ব্যবসায়ীর মেয়ে। কপিল বন্ধুর উদাস মুখ দেখে তার মনের অবস্থা অনুমান করে এবং তাকে মেয়েটির কাছে নিয়ে যায়। এরপর দেবদত্ত ও পদ্মিনীর ভালোবাসা এগিয়ে যায়। একদিন তিনজনে মিলে উজ্জয়নের মেলায় যায়। দেবদত্তের কাছে বন্ধু ও প্রেমিকা দুজনের প্রিয়, কাউকেই সে ছাড়তে পারবে না। মেলায় গিয়ে তাই পদ্মিনী ও কপিলকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেবদত্ত কালী মায়ের মন্দিরে যায় এবং সেখানে আত্মাহূতি দেয় নিজেরই শিরচ্ছেদ করে। কিছুক্ষণ পরে তাকে খুঁজতে খুঁজতে কপিলও মন্দিরে গিয়ে বন্ধুর দ্বিখন্ডিত দেহ দেখতে পায়। এই দৃশ্য তাকে স্তম্ভিত করে, নিজেও তৎক্ষণাৎ শিরচ্ছেদ করে আত্মহত্যা করে। পদ্মিমী এসে দেখে দুই বন্ধুর শিরচ্ছেদ হওয়া দেহ মায়ের সামনে পড়ে আছে। সে এদের পুনর্জীবন প্রার্থনা করে। দেবী-মা এদের বেঁচে ওঠার বর দান করেন। কিন্তু পদ্মিনী একজনের দেহের সঙ্গে অন্যজনের মাথা যুক্ত করে দেন। ফলত দেবদত্তের মাথার সঙ্গে কপিলের দেহ আর কপিলের মাথার সঙ্গে দেবদত্তের দেহ যুক্ত হয়। এই সংযুক্তি ভুল করে হলেও তা ছিল পদ্মিনীর প্রত্যাশানুযায়ী, মেধা ও বীর্য একদেহে পেয়ে সে কিছুদিন তৃপ্ত থাকে। কিন্তু আবার তার মনে অতৃপ্তি হানা দেয়। নাটকটির পরের অঙ্কে দেখা যায় দেহ ও মাথার দ্বন্দ্ব। দেবদত্তের সন্তানের মা হন পদ্মিনী, যেহেতু কপিলের দেহ থেকে এই সন্তানের জন্ম তাই কপিলকে সে পিতৃত্বের অধিকার নিতে বলে। এই নিয়ে নাটকে আর একটি দ্বন্দ্ব এসে যায়। নাটকটিতে কারনাড অস্তিত্ববাদকে অন্বেষণ করেছেন তীব্র অসম্পূর্ণতার বৈশিষ্ট্য দ্বারা। আমরা প্রত্যকেই আসলে পূর্ণ নই, কিন্তু তার অন্বেষণ করে চলি সবসময়। নাট্যকার দর্শকের সামনে তিনটি চরিত্রকে আনেন, যাদের বর্ণ ও শ্রেণি ভিন্ন ভিন্ন। নাটকটির ক্লাইমেক্সে এসে আমরা দেখি পদ্মিনী তার স্বামীতে তৃপ্ত নয়, শক্তিশালী কপিলের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রেমের পূর্ণতা চায়, মনন থেকে গুরুত্ব পায় দৈহিক শক্তি, যা বর্তমান সমাজেরও একটি বৈশিষ্ট্য। এখানে তাই সন্তান অধিকারীকে বা ভাগবতকে দিয়ে পদ্মিনী মৃত্যুকে বেছে নেয়। এই দেহ ও মনের ভিন্নতায় ব্যক্তিত্বের সংঘাত তুলে আনা হয়েছে নাটকটিতে। দেহ এখানে শারীরিক অভিজ্ঞতার স্মারক, মন সেখানে পরিচিতির ও স্মৃতির স্মারক। আমরা দেখি হয়বদন পুরো মানুষ হতে চেয়ে ঘোড়া হয়ে যায়, হ্রেষা-রবও ফিরে পায়, পূর্ণতার সন্ধানে মানুষ অপূর্ণ থাকলেও পশু পূর্ণ হয়। এটি একটি সাইকোলজিক্যাল ড্রামা হলেও অভিনয় ও উপস্থাপনার গুণে হয়ে উঠলো দ্বন্দ্ব চিত্রিত সমাজজীবনের আখ্যান। এই নাটক সেই জীবনের গল্প যেখানে দৈনন্দিন মানবিক সম্পর্কের জটিলতাকে সামাজিক চেতনের কেন্দ্রেই ফিরে আসতে হয়। আর নাট্যকার কাহিনির পরতে পরতে লুকিয়ে রাখেন সেই আস্তরণ বা জট খুলে ফেলার অবিরত ইশারা। আমরা এখানেও মহাভারতীয় আখ্যানের ছোঁয়া পাই, দ্রৌপদীকে যে খুঁজে পাই এখানে। পূর্ব জন্মে দ্রৌপদী তার স্বামীর মধ্যে একাধিক গুণ খুঁজে পেতে চেয়েছিল বলেই তার পঞ্চস্বামীকে বরণ করতে হয়। একজনের মধ্যে সব গুণের সমাবেশ সম্ভব নয়, এই অতৃপ্তি আমরা পদ্মিনীর মধ্যেও দেখি। এখানে নাট্যকার আধুনিক সময়ের সতীত্বের ধারণাটিকেও চ্যালেঞ্জ করেছেন। সতীত্ব ধারণাটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সৃষ্টি। অথচ পুরাণ আখ্যানে উল্লিখিত পঞ্চ সতী অহল্যা, তারা, মন্দোদরী, কুন্তী, দ্রৌপদী, এঁরা সবাই তথাকথিত ‘বহুগামিনী’। এখানেও তাই ‘পদ্মিনীও সতী, সে তার সন্তানকে ভগবতের হাতে দিয়ে যায়, বলে যে প্রথম পাঁচ বছর তাকে কপিলের সন্তান হিসাবে অরণ্যক পরিবেশে পালন করতে, তার পর তাকে পিতামহের কাছে দেবদত্তের সন্তান হিসাবে বিদ্যা শিক্ষার জন্য যেনো পৌঁছে দেওয়া হয়। এই পর্বে নাটকটিতে দেবদত্তের আনা পুতুলগুলো খুব প্রাসঙ্গিক ভূমিকা নেয়। ‘হয়বদন’ ত্রিকোণ প্রেমের জটিল বিন্যাসের নাটক নয়, পূর্ণতাকামী মানবের আর্তির নাটক এটি। নাট্যকার সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায়, গিরিশ যেন নতুন করে বুঝিয়ে দিলেন, আমরা কেউ আর কখনো কোনও একটি পরিচয়ে নিজেদের অভিহিত বা চিহ্নিত করতে পারব না। নতুন শতকের মানুষেরা হবেন সংস্কৃতিতে, ইতিহাসে, ব্যক্তিজীবনে, সমাজেÑ সংকর।

ভারতের সাম্প্রতিক নাট্য ইতিহাসের একটি সফল নাটক ‘হয়বদন’, এর নির্মাণ সৌকর্য নিয়েও কথা হতে পারে। আমরা জানি অরিস্টটল তার ট্র্যাজেডির ষড়ঙ্গ হিসাবে যে ছয়টি লক্ষণের কথা বলেছেন সেগুলো হলো, প্লট, ক্যারেকটার, সেট, ডিকশান, মেলোডি এবং থট। যেকোনো নাটকের জন্য এই ৬টি অনুষঙ্গ বিচার জরুরি। হয়বদন নাটকটিকেও এর প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা যায়। এর সঙ্গে ভারতীয় ঐতিহ্যগত প্রকরণ হিসাবে নাটকের শুরু ও শেষে নান্দীমুখ ও ভরতবাক্য থাকে, যেটিও এখানে গিরিশ প্রয়োগ করেন। বিঘœনাশক গণেশের বা ঈশ্বর বন্দনায় নাটকের সূচনা হয়েছে, শেষেও তা রক্ষিত হয়েছে। মূল কাহিনির চলনের সমান্তরালে অধিকারী ও এই ঘোড়ামুখের কথোপকথনে আমরা সংস্কৃত দৃশ্যকাব্যের আভাস পাই।

গিরিশ লিখতেন কন্নড় ভাষায়, ইংরেজিতে অনুবাদটাও করতেন তিনি নিজেই, নাটক লেখায় তিনি পুরাণ ও ইতিহাসের আখ্যানের আশ্রয় নিতেন। প্রথম নাটক ‘যযাতি’র পরে, ১৯৬৪তে কারনাড লেখেন ‘তুঘলক’, পুরাণের বদলে এখানে তিনি ইতিহাসের থেকে উপকরণ নেন। কন্নড় ভাষায় যদিও এটি লিখেছিলেন দুবছর আগেই। আলেক পদমসির অনুরোধে এটির ইংরেজি ভাষান্তর করেন কারনাড। বম্বে থিয়েটার গ্রুপের মঞ্চায়ন করে, ১৯৭০-এ ভুলাভাই অডিটোরিয়ামে। এ সময়ই এটি ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা হিন্দিতে মঞ্চায়ন করে, বাংলাতেও মঞ্চস্থ হয়। ১৩২৭ খ্রিস্টাব্দ, সুলতানি আমলের, মহম্মদ বিন তুঘলক-এ নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র। এই নাটকটি তাকে খ্যাতির শীর্ষে তুলে আনে। তের অঙ্কের নাটক দিল্লির খামখেয়ালি শাসকের চরিত্রের মধ্য দিয়ে সমসময়ের শাসক চরিত্রকে চিত্রিত করেছেন। একজন খামখেয়ালি শাসকের চরিত্র, বিচিত্র খেয়াল ও স্বপ্ন ভঙ্গের কাহিনির পাশাপাশি এই নাটকটিতে স্বৈরতন্ত্রের বিপদ সম্পর্কেও সচেতনতার বার্তা দেন কারনাড। অনেক সমালোচক এই নাটকের সঙ্গে সদ্য স্বাধীন ভারতবর্ষের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলালের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। প্রচুর স্বপ্ন নিয়ে শাসন ক্ষমতায় বসা ও সেই স্বপ্নগুলোর একে একে ভেঙে পড়া দেখেছেন দুজনেই। গিরিশ কারনাড এই প্রসঙ্গে নিজেই বলেছেন, ‘তুঘলক নাটকের ঘটানাবলিতে অনেকেই সাম্প্রতিকতার ছায়া দেখেন, এটা সত্যি যে, তার মতো স্বপ্নদর্শী, আদর্শবাদী ও বুদ্ধিমান রাষ্ট্রনায়ক দিল্লিতে আর আসেননি এবং তিনি একজন পরাজিত মানুষও বটে। ২০ বছর তার আদর্শবাদী পদক্ষেপ, এর পাশাপাশি হঠকারিতা, ক্রূরতা এর জন্য দায়ী। এবং স্বাধীন ভারতের ষাটের দশকের প্রথমার্ধে এই রকম ঘটনাই দেখা যায়। অন্য প্রসঙ্গে কারনাড বলেছেন, পাগলা রাজা বলে খ্যাত বিন তুঘলক হিন্দু বিষ্ণুপ্রসাদের সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তিনি চাননি তার রাজত্বে হিন্দু-মুসলমান দ্বৈরথ হোক। এই নাটকটি নিয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক ইউ আর অনন্তমূর্তি লিখেছেন, ‘The intrigue here not only enhances the theatrical interest of the play, but is a dramati“ed projection of Tughlaq’s tortured, divided self. Thus, the external action throughout enacts the inner drama of Tughlaq. Both Tughlaq and his enemies initially appear to be idealists; yet, in the pursuit of the ideal, they perpetrate its opposite. The whole play is structured on these opposites: the ordeal and the real; the divine aspiration and the deft intrigue.’’ গোটা দেশে এই নাটকটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও মঞ্চস্থ হয়, ইব্রহীম আলকাজি, শ্যামানন্দ জালান, অরবিন্দ গোউড়া, প্রসন্নের মতো পরিচালকেরা এর মঞ্চায়ন করেন। বাংলাতেও এই নাটকের অনেক কয়টি মঞ্চায়ন হয়েছিল। শাষকের সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অবাস্তব প্রত্যাশা, নেতৃত্বের ভাবনার সংকট আমাদের অলব্যেয়ার ক্যামু’র ‘ক্যালিগুলা’ নাটকের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ভারতীয় পুরাণে যেমন বহুগামিতা স্বাভাবিক আচরণ, তেমনি স্বাভাবিক না হলেও পশু ও মানুষের জৈবিক সম্পর্কের আভাসও দেয়া হয়েছে অনেক আখ্যানে। হরিণ, ঘোড়া বা সাপ, ছাগলের সঙ্গে মানুষের শারীরিক সম্পর্কের কথা এখানে উল্লিখিত আছে, গিরিশ সেই অতীত বাস্তবতাকে স্বাভাবিক ঘটনার মতোই দেখেছেন, এনেছেন নাটকে। ঘোড়া ও মানুষ বা সাপ ও মানুষের মধ্য সম্পর্ককে এনেছেন সাহসের সঙ্গে, এখানে এসমস্ত তাই শুধুমাত্র মানুষের আখ্যান নয় হয়ে ওঠে জীবজগতের, সময় উত্তীর্ণ আখ্যানের নাট্যরূপ।

গিরিশ কারনাডের বয়ানেই জানা যায় তার শৈশবের একটি মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা। তখন তিনি নেহাতই শিশু, গ্রামের পথে চলছিলেন, তাদের পাশেপাশে একটি মেয়ে চলছিল। হঠাৎ দেখেন কিছু লোক এসে মেয়েটিকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। বলছে, ‘খুব শখ হয়েছে, নিচু জাতের ছেলের সঙ্গে মেলামেশার!’ শৈশবের এই ঘটনাটি তার স্মৃতিতে স্থায়ী দাগ কেটে যায়। পরবর্তীতে এর প্রেক্ষিতেই লেখেন ‘তালেডন্ড’, এর শঙ্খ ঘোষ অনূদিত ‘রক্তকল্যাণ’ বাংলার মঞ্চজগতে সাড়া ফেলেছিল। দ্বাদশ শতকের ঘটনার প্রেক্ষাপটে রচিত এই নাটকটি। কন্নড় কবি বাসবান্না এর কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের লক্ষ্যে তৈরি করেছিলেন ‘শরণ সংঘ’, রাজা বিজ্জল ছিলেন বাসবান্নার বন্ধু। ‘শরণ সংঘ’-এর অনুগামীরা সঞ্চয় করা বা জমিয়ে রাখাকে অন্যায় মনে করতেন। শিব তাদের উপাস্য হলেও তারা জাতপাতের গন্ডি মানতেন না। এই সংঘে একমুচির ছেলের সঙ্গে এক ব্রাহ্মণের মেয়ের বিবাহ হয়। আঁতে ঘা লাগে অভিজাত উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণদের। রাজা সে সময় ব্রাহ্মণদের পক্ষ নেননি, রাজা নিহত হন সামাজিক অগ্রগামী বিরোধীদের হাতে। বাসবান্না আবার পথে নামেন সমাজকে মুক্ত করার পথের সন্ধানে। নাটক ‘তালেডন্ড’-এর এই কাহিনি আজও প্রাসঙ্গিক।

গিরিশ কারনাডের অন্যান্য বিখ্যাত নাটকের মধ্যে রয়েছে মা নিষাদ, আঞ্জুমালিগ্নে, টিপু সুলতান কান্ডে কানাসু, ওদাকালু বিম্বা প্রভৃতি। এর মধ্যে ‘হয়বদন’ তাকে নাট্যকার হিসেবে বিশেষ স্বীকৃতি এনে দেয়।

থিয়েটারের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও সমান দক্ষতায় হাজির হন গিরিশ কারনাড। সাতের দশক থেকে ভারতীয় চলচিত্রে মূল ধারার বিপ্রতীপে একটা একটা ভিন্ন ধারার উত্থান ঘটছিল। বাংলার সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক থেকে ক্রমশ শ্যাম বেনেগাল, গোবিন্দ নিহালনি, এম এস স্যাথ্যু এই ভারতীয় চলচ্চিত্র আন্দোলনের ধারাকে পুষ্ট করেছিলেন। এই স্বতন্ত্র ও সমাজ অভিমুখী চলচিত্র ভারতীয় ফিল্ম জগৎকে বেশ কয়েকজন শক্তিশালী অভিনেতাকে তুলে আনে। এদের মধ্যে নাসিরুদ্দিন শা, ওম পুরি, শাবানা আজমী, অপর্ণা সেন, প্রমুখ রয়েছেন, এই ভিন্ন রকমের অভিনেতাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হয়ে ওঠেন গিরিশ কারনাড। অভিনয় জীবনের শুরু হয় ১৯৭০-এ কন্নড় ফিল্ম ‘সংস্কার’-এ অভিনয় দিয়ে। সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বার্তা ছিল এখানে। এর সহকারী চিত্রনাট্যকার ছিলেন তিনি। এর পর ১০টি সিনেমা পরিচালনা করেন কারনাড। তার পরিচালিত ‘ভষ্মবৃক্ষ’ জাতীয় পুরস্কার পায়। পরিচালক, চলচ্চিত্রকার ছাড়াও অভিনেতা হিসাবেও তিনি স্বতন্ত্র সম্মান আদায় করে নিয়েছিলেন। এমনকি ছোট পর্দায়ও তিনি ছিলেন সফল। তার অভিনীত আর কে লক্ষ্মণ রচিত ‘মালগুডি ডে’জ’-এ তার অভিনয় আজও চর্চিত হয়।

পুনের FTII-এর অধিকর্তা ও পরবর্তীতে চেয়ারম্যান হয়েছিলেন গিরিশ কারনাড।

থিয়েটারের মতোই সমান্তরাল ফিল্ম আন্দোলনেও তার ভূমিকা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়ে থাকে। শ্যাম বেনেগালের ‘অঙ্কুর’ ‘নিশান্ত’ (১৯৭৫), ‘মন্থন’ (১৯৭৬)-এ গিরিশ কারনাডের অভিনয় ভারতীয় ফিল্ম অভিনয়ের আর্কাইভে চিরকালের সম্পদ হয়ে থাকবে। বাসু চ্যাটার্জীর ‘স্বামী’ (১৯৭৭)তে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন তিনি। এর পাশাপাশি বাণিজ্যিক ফিল্মেও দুর্দান্ত ছিলেন, এর মধ্যে ‘পুকার’ (২০০০), ‘ইকবাল’ (২০০৫) উল্লেখযোগ্য। অর্ধ শতক ধরে ৯০টির বেশি বাণিজ্যিক ফিল্মে অভিনয় করেছেন, এমনকি গুরুতর অসুস্থ থকাকালীন ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’, চক অ্যান্ড ডাস্টার’-এর মতো বাণিজ্যিক ফিল্মেও অংশ নিয়েছিলেন গিরিশ।

বাংলা থিয়েটার আন্দোলনও গিরিশ কারনাডের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে। শঙ্খ ঘোষ, চিত্তরঞ্জন ঘোষের অনুবাদে ‘হয়বদন’ এখনকার অনেক নাট্যদল মঞ্চস্থ করেছে, মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অগ্রগণ্যা। এর আগে কুমার রায় ‘বহুরূপী’র পক্ষ থেকে ‘যযতি’র মঞ্চায়ন করেছিলেন। অবন্তী চক্রবর্তী করেছিলেন ‘নাগমন্ডল’। সম্প্রতি ‘কথাকৃতি’ সঞ্জীব রায়ের নির্দেশনায় ‘ঘোড়ামুখো পালা’ নামে ‘হয়বদন’-এর মঞ্চায়ন করেছেন। সীমা মুখোপাধ্যায় ‘রংরূপ’-এর হয়ে শঙ্খ ঘোষের অনুবাদে ‘রক্তকল্যাণ’ প্রযোজনা করেছেন। বিভাস চক্রবর্তী ‘ফায়ার আন্ড দ্য রেইন’ অবলম্বনে ‘অগ্নিজল’ প্রযোজনা করেছেন। ‘তুঘলক’, ‘নাগমন্ডল’ এখানে মঞ্চস্থ হয়েছে। ‘তুঘলক’-এ শম্ভু মিত্র অভিনয় করেছেন বিন তুঘলকের চরিত্রে। এভাবেই বাংলা মঞ্চজগত তার সঙ্গে চিরবন্ধনে বাধা রয়ে গেল, তার নাটকের গুণে।

সোজা কথা সরাসরি বলতে গিয়ে কখনও পিছু হটেননি কারনাড। তাই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত ভারতীয় বংশোদ্ভূত লেখক ভি এস নাইপল যখন দেশের ইতিহাসে মুসলিমদের অবদান নিয়ে আলপটকা অভিমত রাখেন সবার আগে প্রতিবাদটা করেন কারনাড। ২০১০-এর জুলাইতে নাইপল এদেশে এসেছিলেন, তখন তার এই অভিমত নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে শোরগোল পড়ে যায়। তিনি এই সমালোচনার জবাবে বলেছিলেন যে ভারতবর্ষের ও তার ইতিহাস সম্পর্কে নাইপলের কোন বাস্তব ধারণা নেই, ৩০০০ বছর ধরে ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতিতে মুসলিমদের অবদান সম্পর্কেও তার ধারণা নেই, তাই তিনি আপত্তিকরভাবে মুসলিম অবদানকে নস্যাৎ করেছেন। বাংলার অগ্রগণ্য নাট্যকার অশোক মুখোপাধ্যায় উল্লেখ করেছেন যে, তার পুত্র রঘু কারনাডের কাছ থেকে জানা যায়, এই প্রতিবাদী ভূমিকার জন্য গিরিশ কারনাডকে তার ব্যাঙ্গালোরের পুরোনো বসত বাড়িটি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হতে হয়েছিল।

ভারতীয় নাট্য সাহিত্য বা নাট্য আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা নিয়েও তিনি স্বচ্ছ বক্তব্য রাখেন। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সঙ্গে কথোপকথনের সময় অন্যান্য প্রসঙ্গের সঙ্গে ভারতীয় থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকার কথাও উঠে আসে। তিনি বলেন কবি ও দার্শনিক হিসাবে রবীন্দ্রনাথ অসামান্য, কিন্তু নাট্যকার হিসাবে দ্বিতীয় শ্রেণির বলে তিনি মনে করেন। এতে দেশজুড়ে, বিশেষত বাংলায় বেশ আলোড়ল ওঠে। এই নিয়ে ব্রিটেনে একজিটার বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখ্য আলোচক হিসাবে গিরিশ পুনরায় একই কথা বলেন, ‘উনিশ শতকের ভারতীয় নাটকে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা গৌণ। তার নাটক সে সময় দেশের মানুষ দেখেনইনি, বোঝা দূরে থাক। পেশাদাররা তার নাটক সে সময় ছুঁয়েও দেখতেন না।” এই প্রসঙ্গে পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন যে, কবি হিসাবে তিনি প্রশ্নাতীতভাবে শ্রদ্ধার, ‘গীতাঞ্জলী’ বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য সৃষ্টি। কিন্তু নাট্যকার হিসাবে তাকে ও কালিদাসকে একাসনে বসানো আপত্তিকর, অক্সফোর্ড পাবলিকেশানে এই দুজনের নাটককে সমমানের বলে উল্লেখ করছে, আপত্তি সেখানেই। তবে রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ নাটক তিনি অনুবাদে পড়েছেন, তাই হয়তো মূলের থেকে কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে ‘তাসের দেশ’ দেখেছেন, এর মঞ্চায়ন তাকে হতাশ করেছে। রবীন্দ্রনাথের থিয়েটার মূলত পারিবারিক পরিবেশে নির্দিষ্ট কিছু দর্শকের জন্য মঞ্চস্থ হতো, এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক ততটা নিবিড় ছিল না। আর রবীন্দ্রপরবর্তীতে বা সমকালীন ভারতীয় থিয়েটারেও রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত হননি কেউ, যেমন মোহন রাকেশ, বাদল সরকার, তেন্দুলকার কেউ না। সমস্ত সাংস্কৃতিক সম্পদেরই সবসময় নিরপেক্ষ পুনর্বিচার আবশ্যিক, দরকার আইকনদেরও পুনর্মূল্যায়নের। তার স্বপ্নশিক্ষক এ কে রামানুজম’-এর প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে রামানুজমের উক্তি উল্লেখ করেছিলেন গিরিশ, ‘আমাদের আলোচনার গন্ডি একটা পর্যায়ে গিয়ে সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তো, সেকালে আমাদের অন্যান্য শিক্ষক যেখানে ইংরেজ লেখকদের অতি সম্ভ্রমের চোখে দেখতেন, সেখানে এ কে রামানুজম সেই কবি-লেখকদের আচ্ছাসে তুলোধুনা করতেন। তার সোজাসাপটা বয়ান ‘এসব খ্যাতনামা লেখকের লেখা আমরা পড়ছি তো পুনর্মূল্যায়নের জন্য। পুজো-পুজো ভাব আসে কোত্থেকে!’ রবীন্দ্র নাটককে তিনি তার শিক্ষকের শিক্ষা থেকেই দেখেছেন।

অটোগ্রাফ সংগ্রহ করা তার নেশা ছিল। অনেক খ্যাতনামা মানুষের স্বাক্ষর তার সংগ্রহে আছে, এঁদের মধ্যে টি এস এলিয়ট, ললিত নায়েকসহ অনেকেই আছেন। ২০১৭ তে টাটা লিট ফেস্টে তাকে আজীবনের সৃষ্টির (লাইফ টাইম এচিভমেন্ট) জন্য পুরস্কৃত করা হয়। এর বাইরেও, তিনি প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম-এর আত্মজীবনী ‘উইংস অব ফায়ার’-এর ভাষ্যে কণ্ঠ দিয়েছিলেন।

শুধু নাট্যকার বা চলচিত্রের অভিনেতা, পরিচালক নয়, সামাজিক আন্দোলনেও সবসময় সক্রিয় ছিলেন তিনি। অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যের ভারত তার স্বপ্নে ছিল। তিনি সামাজিক শোষণ ও কুপ্রথার মতো বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে সক্রিয় ছিলেন, সমতা, সামাজিক ক্ষমতায়ন, ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে নিয়মিত পথে নেমেছেন। তার সক্রিয় প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ছিল হিন্দুত্ববাদী শক্তির সাম্প্রদায়িক ভূমিকার বিরুদ্ধে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের হাতে খুন হন কন্নড় সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী গৌরী লংকেশ, খুনিদের কাছ থেকে স্পেসাল ইনভেস্টিগেশান টিমের উদ্ধার করা ডাইরি থেকে জানা যায় এদের খতম তালিকায় সবার আগে ছিল গিরিশ কারনাডের নাম। সেই বছর ২৩ জুলাই গ্রেফতার হয় খুনিদের চাই রাজুল ডি বাঙ্গেভ। দেশের হিন্দুত্ববাদী শাসক যখন প্রতিবাদী বামপন্থি বুদ্ধিজীবীদের ‘আরবান নকশাল’ বলে উল্লেখ করে ও তাদের কারারুদ্ধ করে, সে সময় নাকে অক্সিজেনের নল ও পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়েও ‘আমি ও নাগরিক নকশাল’ এই স্লোগানের সঙ্গে রাস্তায় নামেন প্রতিবাদের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব গিরিশ কারনাড। সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনের সময়ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে দেশের নাট্য জগতকে শামিল করতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। বড় দুঃসময়ে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন। তার নশ্বর দেহ তার গ্রাম কালাপাল্লিতে দাহ করা হয় গিরিশ কারনাডের অন্তিম ইচ্ছানুসারে শুধু নিকট আত্মীয়স্বজন ছাড়া কেউ স্বগত ছিলেন না, প্রশাসন বা পুলিশের উপস্থিতি ছাড়াই অনাড়ম্বরভাবে স্থানীয় বৈদ্যুতিন চুল্লিতে শেষ কাজ হয়, কোনোরকম ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াই। গিরিশ কারনাডের প্রয়াণে ভারতবর্ষ তথা এই উপমহাদেশের সমাজ সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল।

#

‘The Myth had enabled me to articulate to myself a set of values that had been unable to arrive at rationally. Whether to return home finally seemed the most minor of issues: the myth had nailed me to the past’. Girish Karnad

  • জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ৮০

    নিজের মতো করেই ভাষা তৈরি করতে হবে

    newsimage

    জ্যোতিপ্রকাশ দত্তজ্যোতিপ্রকাশ দত্ত বাংলা কথাসাহিত্যের অপরিহার্য উচ্চারণ। তাঁর গল্পের স্বাতন্ত্র্য ও কাব্যনির্ভরতা

  • জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের রচনা-

    শূন্যে সেই উদ্যান

    newsimage

    এক পর্বতসানুদেশে এক পর্ণকুটিরের কথা শোনা ছিল। ক্ষীণস্রোতা তটিনীর তীরে। পাইনের বন সারি

  • পোস্টমডার্নিজম, উত্তরআধুনিকতা এবং উত্তরচেতনা

    জিললুর রহমান

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) খ. পোস্টমডার্নিজম পোস্টমডার্নিজমের ‘Post’-শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার ‘postis’ থেকে। ‘postis’-এর অর্থ

  • তাহাদের কথা

    মাকিদ হায়দার

    newsimage

    মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ হাজার হাজার বছর আগে। এক সময় এই মানুষেরা বনজঙ্গলে

  • স্মৃতিতে অনন্য জীবনানন্দ

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    এখনো পর্যন্ত বাংলা কবিতার প্রধানতম কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি এই আসন অলঙ্কৃত

  • বসতভিটে গো ভালোবাসা নাও

    দিলারা মেসবাহ

    newsimage

    বসতভিটে গো ভালোবাসা নাও দিলারা মেসবাহ লোকমুখে শুনি আমাদের অবসন্ন ভিটে ক্ষয়রোগে শয্যাশায়ী প্রায়! আহা