menu

সফুরার কুড়িয়ে পাওয়া মোবাইল এবং

ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০১৯
image

চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়। হঠাৎ করেই ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে ঘণ্টাখানেক আগে। গভীর গজারী বনের ভেতর থেকে লাকড়ি কুড়িয়ে মাথায় নিয়ে দ্রুত বাড়ি ফিরছে সফুরা খাতুন। সঙ্গে সাত বছরের মেয়ে সামিয়া। আঁচল ধরে মায়ের পেছন পেছন ছুটছে ছোট্ট সামিয়াও। আকাশ মেঘলা হলেই সফুরার শরীরে কাঁপন ওঠে। বৃষ্টিতে তার বড্ড ভয়।

বৃষ্টির পানি মাটিতে পড়ার আগে সফুরার শনের ছাউনির ঘরে থাকা কাঁথাবালিশ, জামাকাপড় ভিজে যায়। হঠাৎ আকাশ মেঘে ছেয়ে গেছে বলে দ্রুত বাড়ি ফিরছে। মা-মেয়ে লাকড়ি নিয়ে ফেরার সময় হঠাৎ করেই পাশের একটি ঝোপের ভেতর থেকে মোবাইল ফোনের রিংটোন শুনে দু’জনই থমকে দাঁড়ায়। আশেপাশে কোনো মানুষ নেই! কিন্তু মোবাইল বাজে কোথায়? ছোট্ট মেয়েকে প্রশ্ন করে সফুরা। মেয়েও এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। মাথা থেকে লাকড়ির বোঝা নামিয়ে ঝোপের দিকে এগোতে থাকে সফুরা। ঝোপের দিকে যতোই এগোচ্ছে ততোই দুর্গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা লাগছে। মানুষ পঁচা গন্ধ। এক পর্যায়ে শাড়ির আঁচলে নাক চেপে ধরে ঝোপের কাছে গিয়ে দেখেন সবুজ ঘাসের ওপর একটা মোবাইল সেট পড়ে আছে। লাল রঙের মোবাইল সেটটি হাতে নিতেই আবার বেজে ওঠে। সফুরা কলটি রিসিভ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। ওই মোবাইলের রিসিভের অপশন জানা নেই। আবার ফোন। আন্দাজের ওপর টাচ করতেই এবার ফোন রিসিভ হয়ে যায়। ও প্রান্ত থেকে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে মধ্য বয়সী এক পুরুষ বলে ওঠেন হ্যালো...। সফুরাও জবাব দেয় হ কন, হুনতাছি।

: আপনি কে? আতিক কই?

: আতিক ক্যাডা? আমি তো চিনি না। জঙ্গলে মোবাইলড্যা পইড়া আছিল, আমি পাইছি।

: এটা কোন্ জায়গা?

: এইডা রাজেন্দ্রপুর জঙ্গল। নেশোনাল পার্কো।

: ঠিক আছে মা, আপনি মোবাইলটা বাড়িতে নিয়ে যান। আমি আপনার বাড়ি খুঁজে বের করবো। ফোন দিলে রিসিভ করবেন। এটা আমার ছেলে আতিকের ফোন। ওকে গত চারদিন ধরে পাচ্ছি না। শতশত বার ফোন করেছি, রিসিভ হয়নি।

: ঠিক আছে, আফনে আহেন, আমি মোবাইল বাড়ি নিয়া যাইতাছি। এহন রাহি। বিষ্টি আইতাছে। বাড়িতে যাওন লাগবো তাড়াতাড়ি।

: ঠিক আছে মা, আপনি বাড়ি যান।

সফুরার সঙ্গে থাকা তার ছোট্ট মেয়ে সামিয়া পাশে দাঁড়িয়ে টেলিফোনে তাদের দু’জনের কথা শুনছিল। মা মেয়ে ফিরে যায়। এই নিয়ে আর তেমন ভাবনা মাথায় আসেনি সফুরা। সন্ধ্যায় সফুরার স্বামী হালিম সরদার রিকশা চালিয়ে চাল, ডাল, মাছ, বেগুন আর নুন নিয়ে বাড়িতে আসে। মোবাইল সেটটটি বিছানায় দেখে হালিম স্ত্রীর কাছে জানতে চায় মোবাইল কার? কোথায় পেলে? চুলোয় ভাত বসিয়ে মাছ কুটতে কুটতে ঘটনা বলতে থাকে সফুরা। সামিয়া কেরোসিনে কুপি জ্বালিয়ে পড়তে বসেছে। আকাশে মেঘের ওড়াউড়ি থাকলেও শেষ পর্যন্ত বৃষ্টি আসেনি।

আদিম আতঙ্ক, অশান্ত সাগর, সর্বনাশের দূত, অন্ধ শিকারী কিংবা শেষ চাল বা শত্রু ভীষণÑ মাসুদ রানা সিরিজের এই সব বই সেলফের মধ্যে থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন আতিক হাসান। পড়ার টেবিল, বিছানা, সোফা কিংবা ঘরের মেঝেতেও পড়ে আছে কাজী আনোয়ার হোসেনের কাল্পনিক চরিত্র মাসুদ রানা সিরিজের বিভিন্ন বই। বেশিরভাগ বই-ই পড়া হয়েছে আতিক হাসানের। অন্য কোনো লেখকের বই তার তেমনটা পড়া হয়নি। কোটিপতি বাবা শামসুল হকের একমাত্র ছেলে আতিক হাসান। কমপিউটার ইঞ্জিনিয়ার। রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় নিজস্ব বাসা। বেশ আদরে বড় হয়েছেন আতিক। মাসুদ রানা সিরিজের বই পড়ে পড়ে আতিক নিজেকে মাসুদ রানা ভাবতে শুরু করে শৈশব থেকেই। স্বজনদের কাছে আতিক হাসান এ কারণে মাসুদ রানা নামেই বেশি পরিচিতি লাভ করে। মাসুদ রানাকে বলা যায় বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো, দীর্ঘস্থায়ী ও জনপ্রিয় সুপার-হিরো চরিত্র, যার পক্ষে অসম্ভব বলে কিছুই নেই, যে কখনো পরাজিত হয় না, যার মৃত্যু হয় না। আতিক হাসান এই বিশ্বাসেই বড় হয়েছেন। আতিক গোয়েন্দা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন শৈশবেই। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ঢাকার একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপিউটার সায়েন্সে পড়াশোনা করেছেন তিনি। আতিক হাসান একবার টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তার খালাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে সমবয়সী রাহাত আলীর সঙ্গে পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। তারপর ঘনিষ্ঠতা। রাহাত আলীর কাছে আতিক তার স্বপ্নের কথা জানায়। মাসুদ রানা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করার আশ্বাস দেয় রাহাত। দু’জন এক বিছানায় ঘুমায় মাঝে মাঝে। করোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বাংলা অনার্স তৃতীয় বর্ষে পড়ুয়া বিলকিস নাহারের বাড়ি আতিকের খালার বাড়ির পাশে। রায়হান কবীর নামে এক সহপাঠীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল বিলকিস। ধনাঢ্য বাবার একমাত্র সন্তান আতিক হাসান প্রথম দেখাতেই পছন্দ করে বসে বিলকিসকে। বেশ কিছুদিন প্রেম প্রস্তাব দেওয়ার জন্য চেষ্টাও করেছেন আতিক। কিন্তু সুযোগ হয়নি। তবে বিলকিস জানে আতিক যে তাকে পছন্দ করে। বিলকিসকে ভালো লাগার কথা, ভালোবাসার কথা একদিন রাহাতকেও বলে দেন আতিক। খালার বাড়ি বেড়ানো শেষে পনেরো দিন পর বাড়িতে আসেন আতিক। এর এক সপ্তাহ পর রাহাত তার বন্ধু আতিকের বসুন্ধরার বাড়িতে হাজির। আতিককে গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি নিয়ে দেওয়ার কথা বলেছিল রাহাত। স্বপ্ন পূরণের আশ্বাস দিয়েছিল। সেই স্বপ্ন পূরণে বার্তা নিয়ে আতিকের কাছে যাওয়া রাহাতের। সরকারি উচ্চপদস্থ গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসাবে চাকরি নিতে হলে ২০ লাখ টাকা লাগবে বলে রাহাত জানায় আতিককে। আতিক কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই রাজি হয়ে যান। পর দিন ৯ লাখ টাকা বন্ধুর হাতে তুলে দেন আতিক। টাকা পেয়ে এক মাসের মধ্যে মালয়েশিয়া পাড়ি জমান রাহাত। মালয়েশিয়ায় আতিকের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করার জন্য রাহাত গিয়েছে বলে সময় অতিবাহিত করতে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ হয় দু’জনের। প্রায় বছরখানেক পর দেশে ফিরে আসে রাহাত। মালয়েশিয়ায় বসেই ওই ৯ লাখ টাকা আত্মসাতের পরিকল্পনা করে সে। আতিককে মেরে ফেলা ছাড়া এ টাকা আত্মসাতের কোনো সুযোগ নেই। দেশে ফিরে আত্মগোপনে থেকে আতিকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে থাকে চতুর রাহাত।

এক রাতে রাহাত টেলিফোন করে আতিককে। সে জানায় মালয়েশিয়ায় ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। আগামী মাসে চলে যেতে হবে। থাকতে হবে পনেরো দিন। এর আগে গাজীপুরের ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে সাত দিনের ট্রেনিং আছে। সেটাও শেষ করতে হবে। কিন্তু শর্ত হলো কাউকে এটা বলা যাবে না। আতিক সানন্দে গ্রহণ করে বন্ধুর প্রস্তাব। এবার রাহাত টেলিফোনে আতিককে বলে- রথও দেখা হবে, কলাও বিক্রি করতে পারবে। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানটি একবার ঘুরে দেখে আসো, যেখানে ট্রেনিং নেবে। সুখবর হলো- বিলকিস নাহার তার প্রেমিক রায়হানকে নিয়ে আগামী ৯ মার্চ সেখানে ঘুরতে যাবে।

: তুমি এদিন পার্কে আসো। আমার লোকজন রেডি আছে। রায়হান কবীরের হাত পা ভেঙ্গে বিলকিসকে তোমার সাথে দিয়ে দেবে।

: বলো কী? তাহলে তো ভালোই হলো, ট্রেনিংয়ের জায়গা দেখতে পাবো। আবার ভালোবাসার মানুষকেও ছিনিয়ে নিয়ে আসবো।

: কয়টায় আসবা?

: দুপুরের আগেই। বাসে আসবো। বাবার কাছে গাড়ি চাইলে জানতে চাবে কোথায় যাবো।

: ওকে কোনো সমস্যা নেই।

যথাসময়ে আতিক ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে হাজির হন। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পর রাহাত। কিন্তু অন্য আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না। বিলকিস আসার তো প্রশ্নই আসে না। বিলকিসের কথা বলে মূলত রাহাত পার্কে আতিককে এনেছে। দুই বন্ধু হাত ধরে আস্তে আস্তে পার্কের গভীরে যেতে থাকে। রাহাতের প্যান্টের পকেটে একটি বোতল ছিল। এসিড ভরা। পেছন থেকে ছবি তুললে ভালো দেখা যাবে বলে গজারী বনের ভেতর গিয়ে একটি গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে বলে আতিককে। রাহাত একের পর এক ছবি তুলছে। এক পর্যায়ে আতিকের পেছন দিক থেকে জাঁপটে ধরে রাহাত। গলা চেপে ধরে। কোনো শব্দ করারও সুযোগ ছিল না। ধস্তাধস্তি করার সময় আতিকের হাতে থাকা মোবাইল সেটটা ছিঁটকে দূরে গিয়ে পড়ে। মৃত্যু নিশ্চিত করে মুখের মধ্যে এসিড ঢেলে দেয়। পরে আতিকের মোবাইলটি খুঁজে আনতে ভুলে যায় রাহাত। ঠান্ডা মাথায় বন্ধুকে হত্যার পর ঝোপের ভেতর লাশ ফেলে রেখে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে দু’আঙুলের ভাঁজে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাহাত ফিরে যায়।

চারদিন গত হলো আতিক বাড়িতে নেই। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। পাবেই বা কীভাবে? আতিকের লাশ পঁচে গেছে। শিয়ালে খেয়ে ফেলেছে অর্ধেকের বেশি। শকুনগুলোর যেন উৎসব। ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের ভেতর যেখানে আতিকের লাশ পড়ে আছে সেখানে মানুষের যাতায়াত নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে লাকড়ি কুড়ানিরা আসে ওই এলাকায়। নীরব নিস্তব্ধ এলাকা।

ষাটোর্ধ্ব বাবা পাগল প্রায়। পুত্রশোকে কাতর মাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শামসুল হকের বসুন্ধরার বাড়িতে স্বজনরা আসে-যায়। কেউ আর আতিকের খোঁজ দিতে পারে না। পুলিশের সহযোগিতা নিয়েও ছেলের সন্ধান করতে পারেননি শামসুল হক। আতিকের মোবাইলটা খোলা। অবিরত কল বাজতেই থাকে। কেউ রিসিভ করে না। দামি সেট বলে চার্জ শেষ হয়নি চারদিনেও। নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে মাঝে মাঝে বন্ধ দেখায়। আতিককে হত্যার সময় ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তার হাতে থাকা মোবাইলটা ছিটকে পড়ে যায় সামান্য দূরে। এর ঠিক চার পাঁচ হাত উত্তর দিকে ঝোপের ভেতর লাশ লুকিয়ে রাখে রাহাত। সফুরা লাকড়ি কুড়াতে এসে মোবাইল সেটটি পেলেও লাশ আর দেখিনি। শুধু পচা মানুষের দুর্গন্ধ তার নাকে এসেছিল।

রাত তখন বারোটার ঘর ছুঁই ছুঁই। শামসুল হক কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে সফুরার জীর্ণকুটিরে হাজির। ঘণ্টাখানেক আগেই সফুরার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা হয়েছে শামসুল হকের। মোবাইলে আর চার্জ নেই। বন্ধ হয়ে আছে। ক্লান্ত শরীরের সফুরা ঘুমিয়ে যান স্বামীর সঙ্গে।

  • গল্প সংখ্যা

    তালুকদারের হৃদয়-বাসনা

    দিলার মেসবাহ

    newsimage

    তোতা মিয়া তালুকদারের ছায়ার চেয়েও নিকটে। মিয়া সারক্ষণ হাসতে থাকে। মুদ্রাদোষ। তোতার

  • ভালো মানুষ

    হাইকেল হাশমী

    newsimage

    আমরা যখন তাকে পতিতাপল্লী থেকে উদ্ধার করলাম তখন সে অজ্ঞান ছিল। তার

  • রোদনপাখি

    শিপা সুলতানা

    newsimage

    ঘোর অন্ধকার রাত, তবু গ্রামে ঢুকতে কোনো অসুবিধা হলো না আমার। গ্রামে

  • অসম্পূর্ণ গল্প (পর্ব ২)

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) তৃতীয় অধ্যয় - আমি কিন্তু আসলেই ডাক্তার, ভাই! ইন্টার্নি করা হয়ে

  • নৈঃশব্দ্যের ঢেউ : যাপিত জীবনের ভাবানুবাদ

    newsimage

    তাহমিনা খানের কবিতার বই ‘নৈঃশব্দ্যের ঢেউ’ বেশ কিছু কবিতার বহুবিস্তৃত ভাবনায় সংকলিত

  • ‘রক্তকরবী’ ও রবীন্দ্র-নাট্যদর্শন

    এমিলি জামান

    newsimage

    “উপনিষদ বলেন, প্রাণই সত্য, তার মৃত্যু নেই... ‘রক্তকরবী’তে আমি সে কথা বলেছি।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    অশ্বচালক ইদ্রিস সরকার কাঁটা তারে ছিন্ন হয় হৃদয়ের অনন্ত সাহস সারিবদ্ধ পাখি বৃক্ষে বৃক্ষে খোঁজে