menu

শোধ

সুরাইয়া জাহান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ এপ্রিল ২০১৯
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

গোধূলির লালচে আভায় যেন পৃথিবীটা মোড়ানো। আকাশ আর প্রান্তরের মধ্যকার জায়গাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা, নিঃসঙ্গ। কুয়াশার হালকা আবরণ ভেদ করে তেতুলিয়া থেকে খালের সংযোগটা ঠিক দেখা যায় গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা থেকে। খালের উপরে পাকা সেতুটা অর্ধেক তৈরি হয়ে ঝুলে আছে পানির উপর। অনেকদিন ধরেই এই প্রশস্ত খালটা মানুষ নৌকা দিয়েই পার হয়ে শহরে, গঞ্জের হাটে যায়। তাদের ভোগান্তির দিন শেষ হতেই খালের উপর তৈরি হতে থাকে পাকা সেতু। সেই সেতুর হাত ধরে গ্রামের চাষাভুষো মানুষগুলো দিন গোনে, স্বপ্ন দেখে। হঠাৎ সেই স্বপ্নে ব্যাঘাত ঘটে। মানুষ সেতু ভুলে, নৌকা রেখে পায়ে হেঁটেই জলে ভিজে ভিজে পাড়ি দেয় খাল।

জলে পাড়ি দিতে দিতে মানুষগুলো যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে। যে যায় অনেকি দন আর ফিরে আসে না। বিশেষ করে গ্রামের যুবকগুলো হারিয়ে যেতে লাগলো। একটা সময় দেখা গেলো ছোট বড় বোঁচকা, বাক্স পেঁটরা নিয়ে মানুষের দীর্ঘ সারি। দৌড়ে দৌড়ে তারা খালের জলে নেমে এক হাতে বোঁচকা অন্যহাতে জল হাঁচড়ে পাঁচড়ে ওপারে ওঠে। ওরা পালাতে চায়। পেছনে নিজের বসতভিটে, জমিজিরাত, হালের গরু রেখে ওরা ধেয়ে চলে বিস্তীর্ণ শূন্যতার দিকে; যেন তাড়া করে আসছে ছেলেবেলায় দাদি, নানির মুখে গল্পে শোনা এযুত, মেজুতের দল। তারপর অনেকগুলো সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, মাস পেরিয়ে কিছু মানুষ হয়তোবা ফিরে আসে তার বসত ভিটায়, নিজের আপনজনের কাছে, প্রিয় প্রতিবেশের কাছে। আর কেউবা কোনদিন ফেরে না।

যুদ্ধ শেষ হয়েছে অনেক আগেই। সেই অর্ধসমাপ্ত সেতুর গোড়ায় বসে মতলু পাগলা ধনিয়া গ্রামের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে। সামনের প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দিনের বেশিরভাগ সময় গঞ্জের হাটে বসে থাকে সে। দয়া করে কেউ খাবার দিলে খায়, না দিলে উপোস থাকে। সন্ধ্যা হয়ে এলে ধীরে গ্রামের পথ ধরে। কিন্তু গ্রামে না ফিরে আধেক সেতুর গোড়ায় বসে থাকে। আর ফিরবেইবা কোথায়? যুদ্ধের আগে সারাদিন কাজ করতো ইদ্রিস মোল্লার বাড়িতে। রাতে নিজের ভাঙ্গা ঘরে থাকতো। পাগল হয়ে যাওয়ার পরে সেই জমিন দখল নিয়েছে ইদ্রিস মোল্লা।

কেউ কেউ বলে রাত ঘন হয়ে এলে এখান থেকে কান্নার আওয়াজ শোনা যায়। যতই গভীর হয় রাত ততই জোরালো হয় কান্না। তাই তো সন্ধ্যার পর এই রাস্তা ধরে চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। মতলু পাগলার অবশ্য তাতে কোন হেলদোল নেই। সকাল-সন্ধ্যা, যখন খুশি এসে বসে থাকে সাঁকোর গোড়ায়। কেউ তার কাছে কান্নার কথা জানতে চাইলে হিঃ হিঃ শব্দে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হেসে ওঠে। প্রশ্নকর্তা হাসির দমকে বোকা বনে যায়। কেউ কেউ হয়তো ভেবেই বসে- মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য ওটা মতলু পাগলার খেয়ালী চিন্তার ফল। কিন্তু তেমনটি ভাবার কোন কারণ নেই- কান্নার শব্দটি নিঃসন্দেহে মেয়েলি।

মানুষ প্রথমে অলৌকিকতায় বিশ্বাস করে তারপর সেই বিশ্বাস ভয়ে রূপ নেয়। আর ভয় থেকে শুরু হয় জল্পনা, কল্পনা, অহেতুক বাগাড়ম্বর। রাতের কান্না নিয়ে ধনিয়া গ্রামের মানুষেরাও তেমনি বাগাড়ম্বরে লিপ্ত হয় দিনের পর দিন। অবশ্য মাসের অন্ধকার দিনগুলোতেই তারা সেই কান্নার আওয়াজ পায়, ছায়া শরীরের নড়াচড়া দেখতে পায় আধেক সেতুর গোড়ায়। যুদ্ধের আগের দিনগুলো আর পরের দিনগুলোর তফাৎ করতে গেলে দেখা যায়- গ্রামে জোয়ান তাগড়া ছেলে নেই বললেই চলে। যেন হ্যামিলনের সেই বংশীবাদকের মতন কেউ একজন সব জোয়ান ছেলেগুলোকে খালের যেখানে শেষ, তেতুলিয়ার শুরু তেমনি কোন একদিকে নিয়ে গেছে। বাড়ির পর বাড়ি পুড়ে ছাই- ওই যে গানবোট এলো ওই তেতুলিয়ার বুকে ইঞ্জিন চালিয়ে... আর সেই পারুল নামের মেয়েটি! পাক সেনারা যখন ভর দুপুরে খাঁ খাঁ রোদ্দুর মাথায় নিয়ে মিয়া বাড়ি, দাসপাড়া, বিশ্বাস বাড়িতে আগুন দেয়, পুরো গ্রাম যেন জনমানবহীন বিরানভূমিতে পরিণত হয়। যে যেদিকে পেরেছে- জীবন নিয়ে পালিয়েছে। পাক কমান্ডারের সাথে খোস মেজাজে কেবল ইদ্রিস মোল্লাকেই দেখেছে কেউ কেউ। যারা দেখেছে তারাও কি দেখেছে, আজ আর ঠাহর করতে পারে না। অদৃশ্য শক্তি যেন তাদের বলার ক্ষমতা রহিত করেছে। তাও তো অনেক দিন হয়ে গেল! অনেক পরিবর্তনের মধ্যে একটা পরিবর্তন- ইদ্রিস মোল্লার বাড়িতে দালান উঠেছে। অনেকের মতই পারুলের মা সুফিয়া আর ফেরেনি গ্রামে।

দুই.

দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় বছর খানেক পরে খোঁড়াতে খোঁড়াতে একদিন গ্রামে এসে হাজির ইদ্রিস মোল্লা। জনে জনে দেখিয়ে বেড়ায় মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট। দ্বিধা আর সংকোচে অশিক্ষিত গ্রামবাসী যেন মাটির থেকে চোখ তুলতে পারে না। একজন খুব প্রতিবাদ করলো। পুরো গ্রামের সামনে মনের সবটুকুন আগুন উজাড় করে দিয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা রতন মিয়া, ‘এতো দিন গা ঢাকা দিয়া আমনে কই থিক্যা আইলেন মোল্লা সাহেব? এই গ্রামের বেবাকতে জানে যুদ্ধের সময়কার আপনের কাহিনি!’

রতন সেদিন বুঝতে পারেনি- তখনো পুরোপুরি শত্রুমুক্ত হয়নি দেশের মাটি। আনাচেকানাচে ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিলো ষড়যন্ত্র! বিদেশি শত্রুদের না হয় তাড়ানো গেছে কিন্তু দেশের মাটি কামড়ে যেসব শত্রু লুকিয়ে ছিলো তারা তৎপর নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায়।

ঝরঝর করে চোখের জল ছেড়ে দেয় ইদ্রিস মোল্লা, সাথে হেঁচকির শব্দ। হেঁচকি তুলে তুলে যুদ্ধে আহত হবার বিশাল এক কাহিনির ফাঁদে আটকে ফেলে গ্রামবাসীকে। বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে থাকে গ্রামের সহজ, সরল মানুষ। আপন তাগিদে রতন প্রমাণ করতে চায় রাজাকার ইদ্রিস মোল্লার ভুয়া সার্টিফিকেট। সবাইকে বলেকয়ে ঢাকায় চলে যায় রতন। সেই যে গেল- আর ফেরেনি। কেউ বলে বড় রাস্তায় ট্রাকে চাপা পড়ে মরেছে রতন, কেউ বলে যাবার সময় তেতুলিয়ায় ডুবে সলিল সমাধি হয়েছে। রতন নিরুদ্দেশ হওয়ার পর ইদ্রিস মোল্লার দিকে তর্জনি উঁচিয়ে কথা বলার মানুষ থাকলো না গ্রামে। অদৃশ্য শত্রুকে যে বড় ভয় মানুষের!

এইতো সেদিন, ভাদ্র মাসের অমাবস্যার রাতে মুষলধারে বৃষ্টি আর থেমে থেমে বিদ্যুৎ গর্জন। বাতাসে তোলপাড় তেতুলিয়ার জল। হারেস মুন্সি জমির মামলা মোকদ্দমা সারতে সারতে সন্ধ্যাই বয়ে গেল। খেয়া পারাপারের জন্য রীতিমতন যুদ্ধ করতে হলো ওই পাড়ের এক মাঝির সাথে। ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে কোনমতেই এই পাড়ে আসতে চাইলো না মাঝি। অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে দ্বিগুণ ভাড়ায় খেয়া পার হলো হারেস। এমনই ভাগ্য একে তো অন্ধকার রাত তার উপর বৃষ্টি। প্রতি পদক্ষেপে পা হড়কে পড়িমরি দশা। সেতুর গোড়ায় আসতে না আসতেই হঠাৎ প্রচন্ড শব্দে বাজ পড়লো কাছে কোথাও। সাথে বিদ্যুৎ চমক। লা ইলাহা পড়তে পড়তে বুকে থুতু ছিটায় হারেস। বিজলির আলোতে চোখ তার ছানাবড়া। দুটো ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে ঠিক তার সামনেই। ভয়ে কুঁকড়ে যেন নিজের মধ্যেই সেঁধিয়ে যেতে চায় হারেস। ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে হাত পা। বাতাসের তোড়ে মুহূর্তেই হাত থেকে ছুটে যায় ছাতা। দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে ঠিক চিনতে পারে, মতলু পাগলা কিন্তু অন্যজন কে? আবারো চারদিক আলোকিত করে বিজলীর চমক। অন্য ছায়ামূর্তি যে একজন নারী বুঝতে সময় লাগে না হারেসের। তবে কে সে?

‘মতলু, ওই মতলু!’ ধরা গলায় ডেকে ওঠে হারেস। ‘তোর লগে এইডা কে মতলু?’

অন্যপাশ নিরুত্তর। বাতাস আর বৃষ্টির শব্দ ছাড়া অন্য কোন শব্দই কানে আসে না হারেসের। তাকে পাশ কাটিয়ে নারী মূর্তি হনহন করে হেঁটে যায় তেঁতুলিয়ার দিকে। হারেস কিছু বুঝে উঠবার আগেই মিলিয়ে যায় গাঢ় অন্ধকারে। ঝড় বৃষ্টির রাতে মতলু পাগলা কার সাথে কথা বলছিলো- মেলাতে পারে না হারেস। মতলু পাগল মানুষ, কখন কী করে বসে সেই ভয়ে কথা না বাড়িয়ে দ্রুত বাড়ির পথ ধরে সে। পুরো রাত মনের ভেতর কাটার মতন খচখচ করে সন্ধ্যায় দেখা দুটো ছায়ামূর্তি। হারেসের একবার মনে হলো নারী মূর্তিটি যেন সুফিয়া! আবার নিজের মনে নিজেকে বোঝায়- এতদিন পরে সুফিয়া কোথা থেকে আসবে?

তিন.

ঘটনাটি রীতিমতোন তোলপাড় করে পুরো গ্রাম। সত্যি সত্যিই হারিয়ে যাওয়া সুফিয়াকে নাকি ইদানীং তার পোড়ো ভিটায় দেখা যায়। সেদিন খবির জাইল্যা নদী থেকে ফেরার সময় শেষ বিকেলের আলোয় দেখেছে সুফিয়া নিজের বাড়ির উঠানে বসে বিলাপ করছে। মাথায় লম্বা ঘোমটার কারণে মুখটা ঠিকমতন দেখা হয়নি। খবির কাছাকাছি যেতেই সুফিয়া নদীর দিকে হাঁটতে থাকে। একসময় খবিরের সাথেই মেঘনা, তেঁতুলিয়ায় মাছ ধরতো সুফিয়ার স্বামী কাদের। বড় নৌকা নিয়ে একবার সমুদ্রে গেল ইলিশ ধরতে। সেই সময় সাগরে ভীষণ উৎপাত জলদস্যুদের। ওদেরকে মারধর করে সাগরে ফেলে দিয়ে নৌকা জাল ছিনিয়ে নেয় দস্যুরা। চারজনের মধ্যে কেবল খবির বেঁচে গেল অন্য জেলে নৌকার সহায়তায়। স্বামীকে হারিয়ে একমাত্র মেয়ে পারুলকে নিয়ে পথে বসে সুফিয়া। শেষমেশ কাজ জোটে ইদ্রিস মোল্লার বাড়িতে। আহা! কী মায়াবতী আর লক্ষ্মী ছিলো পারুল। যেদিন গানবোটে পাকিস্তানি মিলিটারি এলো- দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো গ্রামের বাড়িঘর। ইদ্রিস মোল্লা শহর থেকে মিলিটারিদেরকে পথ দেখিয়ে গ্রামে নিয়ে আসে। ফিরে যাবার সময় আগুন দেয় পারুলদের ছনের ঘরে। টেনে হিঁচড়ে মেয়েটাকে নিয়ে ইদ্রিস মোল্লা তোলে গানবোটে। পারুলকে নিয়ে যাওয়ার সময় ইদ্রিস মোল্লার পায়ে পড়ে চিৎকার করে মতলু। লাথি মেরে তাকে পা থেকে ছাড়াতে গিয়ে ইটের উপর পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। জ্ঞান ফেরার পর ঠিকমতন কোন কিছুই মনে করতে পারে না মতলু। সুফিয়া তখন ইদ্রিস মোল্লার বাড়িতেই কাজ করে। মিলিটারির ভয়ে সেও আর সবার সাথে পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলো। মেয়েকে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবরে দিশেহারা সুফিয়া স্বামীর ট্যাডা নিয়ে ছুটে যায় নদীর দিকে। সেই যে গেল আর ফিরে আসেনি গ্রামে। এতোদিন পর হঠাৎ সুফিয়াকে দেখে রীতিমতন ভড়কে যায় খবির জাইল্যা।

কানাঘুষো বাড়তেই থাকে। ভাদ্র মাসের সেই রাতে আসলেই যে মতলুর সাথে সুফিয়াকে দেখেছে খবির মুন্সি তাতে আর সন্দেহ থাকে না গ্রামবাসীর। কিন্তু একজন যেন কিছুতেই মানতে চায় না সুফিয়ার ফিরে আসা। খবরটা কানে যেতেই ইদ্রিস মোল্লা হেসেই খুন-

‘তোমরা সব মতলুর মতন পাগল হইয়া গেলানি হারেস মুন্সি? কি কও না কও! তোমরা দেখতাছি গ্রামে ভূতপ্রেত আমদানি করতাছো।’ গঞ্জের বাজারে নিজের চালের আড়তে বসে চোখ মটকিয়ে হাসে ইদ্রিস মোল্লা। ডোরাকাটা লুঙ্গিটা বা হাতে দু’পায়ের মধ্যে ঠেসে ধরে মেহেদী রাঙানো দাড়িতে ডান হাত বুলায় আলগোছে।

‘আমি নাহয় আন্ধারে দেখছি, কিন্তু খবির তো দিনের আলোয় দেখছে...’ আমতা আমতা করে হারেস মুন্সি।

‘হ অইছে! জমিজমার জটিল হিসাবনিকাশ মিলাইতে মিলাইতে মাথাডাই তোমার আউলাঝাউলা হইয়া গ্যাছে। মতলুর মতন তুমিও কয়দিন বাদে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবা। খবির তো অইলো গিয়া আরেক কিছিমের পাগল। সাগরের নোনতা পানি চোক্ষে গিয়া হ্যায় তো আরেক আন্ধা! কী দেখতে কী দ্যাহে!’ আয়েস করে দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে দাঁত খোঁচায় ইদ্রিস মোল্লা।

‘আমনে তো এমনি ভাবেন। আমার কী? মতলুও আমনের কাম করতো আর সুফিয়াও করতো। মাইনসে তো কয়’ ...থামে হারেস মুন্সি

‘কী কয় মাইনসে? কও দেহি...’

‘সুফিয়া পারুলের লগে মতলুর বিয়া ঠিক করছিলো। আর হেই মাইড্যারে আমনে পাকিস্তানি মিলিটারির গানবোটে উডাইয়া দিলেন? মতলুরে পিডাইয়্যা পাগল বানাইলেন! পথ চিনাইয়া এই গ্রামে আমনেই তো মিলিটারি আনছেন। নিজের শত্রুতা কমাইতে মিয়াবাড়ি, দাসপাড়া আগুন দিছেন।’

‘থামো হারেস!’ গর্জে ওঠেন ইদ্রিস মোল্লা। ‘যা কইবার লাগছো, প্রমাণ করতে পারবা? জমিজমার কাম বালা বোঝ হ্যার লাইগ্যা তোমারে দিয়া মামলা মোকদ্দমা চালাই। তাই বইল্যা আমার পেডে লাথি মারবার লাইগ্যা উইঠ্যা পইড়া লাগছো? ভুইল্যা যাইওনা আমার দয়ায় যে বাঁচো?’

শকুনের মতন কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে ইদ্রিস মোল্লা।

‘আমি কি একলা কই?’ মিনমিনে গলায় বিড়বিড় করে হারেস।

‘আর কইবা না, একবারও কইবা না। মতলু আগে থেইক্যাই একটা আধা পাগলা আছিলো। জানো না তোমরা?’

চুপ মেরে যায় হারেস মুন্সি। বুঝতে পারে, সময় পাল্টে গেছে। এখন পুরনো কাহিনি সামনে আনতে চাইলে তার গলায় ছুরি চালাতে এক মুহূর্ত দেরি করবে না ইদ্রিস মোল্লা। ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তি সব কিছুতেই ইদ্রিস মোল্লা নাগালের বাইরে। যুদ্ধের পরে দুই বছরের মাথায় গ্রামের সবাই যখন না খেয়ে মরছিল- ইদ্রিস মোল্লার আড়তভর্তি তখন ধানে। সুযোগ মতন সেই ধান বেঁচে লাখ লাখ টাকার মালিক হয়েছে ইদ্রিস মোল্লা। শোনা যায়, রাতের অন্ধকারে অনেক হিন্দুরা জমিজমা ফেলে ভারতে পালিয়ে গেলে সেইসব জমি দখলে নিয়েছে সে। এখন তার হাতের ইশারায় চলে গ্রাম।

অগ্রহায়ণ প্রায় শেষ হয়ে আসছে। শীতটাও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। চাদর ভালো করে গায়ে মাথায় মুড়ে আড়তের তালা আটকায় ইদ্রিস মোল্লা। মনটা বেশ ফুরফুরে তার। আজ হাটের দিনে কম দামে অনেক ধান কিনেছে। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামীকাল পাশের গ্রামে যাবে আরো ধান কিনতে। অগ্রহায়ণ আর পৌষ মাসে ধান কিনে আড়ত আর বাড়ির উঠান ভরে ফেলবেন। তৃপ্তির নিশ্বাস ফেলে বাড়ির দিকে পা বাড়ায় ইদ্রিস মোল্লা। ঘাটে পৌঁছে দেখেন নৌকার ছইয়ের ভেতর বসে ঝিমুচ্ছে গনি মাঝির ছেলে বাবলু। ঘন কুয়াশায় এক হাত দূরেও ভালো করে দেখা যায় না।

‘কিরে, তোর বাপ আইলো না? তুই পারবি নৌকা বাইতে?’ নৌকার পাটাতনে বসতে বসতে বলে ইদ্রিস মোল্লা।

‘পারমু হুজুর। আমনে খালি শক্ত কইরা বহেন। ‘বলতে বলতে নৌকা ছেড়ে দেয় বাবলু। পানির ভেতর বৈঠার ছপছপ শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ ইদ্রিস মোল্লার কানে আসে সেই কান্নার শব্দ। থেমে থেমে আসা শব্দটি গোঙানির মতন শোনায়। প্রথমে আস্তে ক্রমান্বয়ে জোরালো হয়। মাথা থেকে চাদর খুলে ভালো করে শোনার চেষ্টা করে ইদ্রিস মোল্লা। পরক্ষণেই কেবল শুনতে পায় রাতজাগা পাখির কান্না আর ছপছপ পানির শব্দ। ভুল শুনেছেন ভেবে মনকে আশ্বস্ত করেন। এরই মধ্যে খালের অন্য পাড়ে গিয়ে ভেড়ে নৌকা।

‘হুজুর নামেন’ বলে বাবলু।

হারিকেন হাতে সাবধানে নামেন, চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। মনে মনে একবার ভাবেন বাবলুকে সাথে করে নিয়ে যাবেন বাড়ি পর্যন্ত। পরক্ষণেই মনস্থ করেন, ভয় কিসের- একাই যাবেন বাড়িতে। বাবলু তার নিজ বাড়িতে ফিরে যাবে।

পুলের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ মনে হলো ধুম করে অনেকটা কুয়াশা পড়েছে ঠিক সামনেই। হারিকেনের মিটমিটে আলোয় কিছু দেখা যায় না। কেবল ধোঁয়া ধোঁয়া। কিছু একটা নড়ে উঠলো বোধহয় ছায়ার মতন। একটু থামেন, হারিকেন তুলে ধরে ভালো করে তাকান। আরো একটু এগিয়ে যেতেই সামনে দুটো মুখ অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। চমকে উঠে ইন্না লিল্লাহে বলে ওঠেন ইদ্রিস মোল্লা। নিজের চোখকে বিশ্বাস হয় না তার। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠেন-

‘সুফিয়া, তুই?’ প্রচন্ড শীতের মাঝেও ইদ্রিস মোল্লার কপালে জমে ওঠে নোনা শিশির।

‘কুসুম, আমার কুসুম কই ইদ্রিস মোল্লা? আমার কুসুম কই?’ চিমসানো গাল আর কোটরাগত চোখে নিষ্পলক মোল্লার দিকে তাকিয়ে থাকে সুফিয়া। ঘোমটাবিহীন উস্কখুস্ক চুল। ট্যাডা হাতে একপা এগিয়ে যায় ইদ্রিস মোল্লার দিকে-

‘আমি... আমি কেমনে কমু...’ তোতলাতে থাকেন ইদ্রিস মোল্লা। সুফিয়া একপা আগায় সে একপা পিছায়। মতলু কেবল তাকিয়েই থাকে। উত্তরের অপেক্ষা করে না সুফিয়া, ট্যাডা ঢুকিয়ে দেয় ইদ্রিস মোল্লার বাম পাঁজরে। আর্ত চিৎকার করে চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। গলগল করে রক্ত ঝরতে থাকে গায়ের জামা চাদর ভিজিয়ে। খিক খিক শব্দে হেসে ওঠে মতলু আর রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যায় সুফিয়া।

পরের দিন সকালে ট্যাডাবিদ্ধ মৃত ইদ্রিস মোল্লাকে পাওয়া যায় খালের পাড়ে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না মতলু পাগলাকে। অনেক কৌতূহলির মাঝে চেঁচিয়ে ওঠে খবির জাইল্যা

‘এইডা তো আমাগো কাদেরের ট্যাডা...’