menu

জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের রচনা-

শূন্যে সেই উদ্যান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
image

সহধর্মিণী ও কথাসাহিত্যিক পূরবী বসুর সঙ্গে জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত

এক

পর্বতসানুদেশে এক পর্ণকুটিরের কথা শোনা ছিল। ক্ষীণস্রোতা তটিনীর তীরে। পাইনের বন সারি বেঁধে দাঁড়ানো, লাল-হলুদের কোনো বুনো ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে হাজারো রঙের প্রজাপতি। কান পাতলে ঠোঁটরাঙা টিয়া আর ময়নার আলাপ শোনা যাবে, বা দোয়েলের শিস, কি গান সেই বুলবুলের।

নদীর বুকে তাকালে জল নয়, যেন কাচ, কাকচক্ষুর মতো পরিষ্কার। স্রোতের মুখে শরীর বিছিয়ে যেন নক্সা তৈরি করেছে হলুদ সবুজ জলজ লতা। নিঃশঙ্ক পাখনা দুলিয়ে ভেসে আছে রঙিন মৎস্যকুল! এই মুহূর্তে স্থির, আবার শরীরে বঙ্কিম রেখা তুলে দ্রুত সরে যাচ্ছে।

দুই

সম্মুখে বয়ে যাওয়া নদীর পথ ধরে দূরে তাকিয়ে থাকে সে। দিগন্তছোঁয়া শানবাঁধানো তীরে ছলাৎ ছলাৎ আঘাত করে যাচ্ছে কালো জল। একটু আগে দু’পাশে বোঝাই বার্জ নিয়ে অসুর জলযান চলে গেছে। এখনো যাচ্ছে। কত স্পীডবোট, প্রমোদতরণী। তাদের ব্যবহৃত জ্বালানিই হবে নিশ্চয়, ঢেউয়ের মাথায় কালো ফিতের মতো তীরে আছড়ে পড়ে। পারাপারের সেতু সে এখান থেকেই দেখতে পায়। শক্ত পাথরের গাঁথুনিতে বসানো সারি সারি সুউচ্চ হর্ম্যরে শ্রেণি, নদীর দু’পার দিয়ে চলে যাওয়া প্রশস্ত সরণি, যানবাহন, আলো সব এমন মোহের সৃষ্টি করে যে কিছুই মানবিক নয়- এমন ভাবা চলে।

নদীর এপাড়ে বাস অবশ্য অনেক সুবিধের, কিন্তু এখানে বাসস্থান পাওয়া বড়ো সহজ নয়। কেবল অর্থ-সামর্থ্য নয়, ভাগ্যও প্রয়োজন। তেমন ভাগ্যই তাদের হয়েছে। এই কথা স্ত্রী তাকে বুঝিয়েছে। তবুও বাড়িটি দেখতে এসে অমন আলো, চওড়া রাস্তা কিছুই তাকে খুশি করে না। মূল রাস্তায় নয়, সম্পূর্ণ বাড়িও নয়, বহুতল ভবনে তিনঘরের একটি বাসা। তা-ও পেছনের দিকে। তিন পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সূর্য আড়াল করা দালান। হাওয়ার, আলোর না জানি কত অভাব। এই কথাই বার বার বলে সে। পা দিয়ে টিপে টিপে কাঠের মেঝে দেখে। পুরনো দালানই তো। ঐ নতুন কনডোমিনিয়াম, যার আটত্রিশ তলা পেন্টহাউসে দাঁড়ালে পায়ের নিচে শহর, বাড়িঘর, পুল, রাস্তা, গির্জার চূড়া, ধোঁয়ার চিমনি, সরল রেখায় চলে যাওয়া রাস্তাঘাটের কাটাকুটি, শ্রেণিবদ্ধ দাঁড়ানো গাছের সারি, যেন পটে আঁকা ছবির মতো, সে দেখতে পেত, চাই কি নদীর শেষে যে মোহনা, সাগরের আভাস, আকাশ আর মাটির মাঝামাঝি, তাও দেখতে পেত। কিন্তু সেখানে ঢোকা তার হবে না, ফলে সে এই পুরনো ফ্ল্যাটবাড়ির মেঝে, রান্নাঘরের দেয়াল, স্নানঘরের ফোয়ারা খুূঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। কিছুই তার মনে ধরে না। সবশেষে “পুরো বাড়িই একটি খোঁজা যাক বরং” বলে সঙ্গিনীর মুখের দিকে তাকালে সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, “সে সাধ্য নেই তুমি জানো” বলে বাচ্চা দুটিকে সামলে আবার ফিরে আসে নদীর তীরে। নৌবিহার শেষে প্রমোদতরী নিয়ে ফিরে যাচ্ছে ধনপতি, আলোর মালায় সাজানো জাহাজের পাটাতনে নৃত্যরত তার দল।

রাতে ঘরে ফিরে পুরনো কাগজপত্র নিয়ে বসে সে। আদালতের ছাপ দেওয়া দলিলের কপি, যাতে তার মালিকানা স্বীকৃত। সঙ্গে কিছু চিঠিপত্র। দখলকারীদের এক সময়ের প্রস্তাব, তার অংশ একটি দাম স্থির করে কিনে নিতে রাজি তারা, উল্টেপাল্টে দেখে।

টাকাটা এখন পাওয়া যায় কি? ভাবে সে। বাতিল বায়নাপত্রটা তুলে ধরে। এইরকম দুর্বল সময়ে সম্পাদন করা। শেষ অবধি রেজিস্ট্রি করা হয়নি। এক সেট ছাপানো ফরম সরকারি জমি বরাদ্দের। অঋণী, অপ্রবাসী সবচেয়ে সুখী হলেও সরকারি জমি পাওয়া প্রবাসীদের জন্যে সহজ ভেবে সে ফরমগুলি আনিয়েছিল। কিন্তু ছোট অক্ষরে ওই শহরে যাদের জমি আছে তারা যোগ্য নয় এই ঘোষণাটি চোখে পড়লে সে আর দরখাস্ত পাঠায়নি। স্ত্রী বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিল, কখনো দখলে ছিল না, আদৌ কখনো দখল পাবে কিনা তেমন জমির মালিক বলে নিজেকে সে কীভাবে বিবেচনা করবে? স্ত্রীর প্রতি রুষ্ট দৃষ্টিপাত করা ছাড়া আর কোন জবাব ছিল না তার।

আয়নায় ইদানীং আর নিজের দিকে বেশি তাকায় না। হালকা চুলই কেবল নয়, তাদের সাদা রঙও তাকে প্রীত করে না। সময় এমনি করে শেষ হয়ে যায়। ক্রয়েচ্ছু পক্ষের শেষ চিঠির তারিখ বছর পাঁচেক আগের। দেরাজ খুলে এ্যারোগ্রাম বের করে চিঠি লিখতে শুরু করে। পুরনো প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখছে। আলাপ-আলোচনার জন্য আসবে শীঘ্রই।

যেন কোন স্বপ্নের কথা মনে পড়ে। কখনো কখনো গভীর রাতে ঘুম ভেঙে দেখত সমস্ত ঘর তীব্র আলোয় উজ্জ্বল। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে বিশাল ঘরে পাশাপাশি পাতা খাটে, চৌকিতে নিদ্রারত পরিবার। ভাইবোনেরা দু’তিন জন এক বড়ো চৌকিতে। সে একলা ছোট খাটে, শ্বাসকষ্টের জন্য। জানালার পাশে সরে যেত সে। কাঁঠালগাছটির সামান্য আড়ালের পরে আর কিছু নেই- প্রতিবেশীর ছেড়ে যাওয়া পড়ো ভিটেমাটি, খবিরুদ্দির ধানের জমি, থানা সদরে যাওয়ার রাস্তা, তারপরে হোরাসাগর, বিনানইয়ের চর, ওপারে যমুনায় ভেসে যাওয়া স্টিমারের সার্চলাইট শ্বেত আলোর বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে তাকে, জানত। তবুও ঘুম ভাঙে না আর কারো। সে একলা ঐ নিশীথ রাত্রির জানালায় বসা।

হোরাসাগরের তীরে আর একবার দাঁড়ানোর বড়ো ইচ্ছা ছিল তার। বাঁয়ে, অনেক দূরে থানা সদর। সেখানে দেউড়িতে বসে দেহাতি দারোয়ান কি গেয়েছিল ‘নৈকট কৈমান?’ আজো ঐ কথার অর্থ জানে না সে। কচুরিপানার দাম ভেসে যাচ্ছে যেদিকে সেদিকে লেডলি কোম্পানির পাটের আড়ত, গাঁট বাঁধবার কারখানা। হোরাসাগরের বুকে সারি সারি দাঁড়ানো বার্জ। তীরে নোঙর বাঁধা তাদের। সময় হলে ক্যাপস্টানে হাতল ঢুকিয়ে ঘোরাবে সুরে সুরে খালাসির দল। আর খানিক ভাসলেই পাওয়া যাবে বন্দর, মহাজনের আড়ত, “যেখানে সেখানে থুথু ফেলিবেন না” টিনের দেয়ালে বিজ্ঞাপন। গমগমা বাজারে সাদা তাঁবুর নিচে চায়ের দোকানে সুখী পানকারীর হাতে পেয়ালা “ইহাতে নাহিক কোনো মাদকতাদোষ, খাইলে পরে হয় অতি চিত্ত পরিতোষ।”

তিন

সাজানো ঘরের চারপাশ জুড়ে সোফা, চেয়ার- আইন ব্যবসায়ীর ঘর। যে ধর্মাত্মা তার জমি দখল করে রেখেছেন তার প্রিয় শিষ্য এই আইনজীবী। মিষ্টভাষী। সে দরজার মাঝপথে দাঁড়াতেই উকিল সাহেব উঠে এসে সাদরে তাকে ঘরে তুলে নিলেন। হোরাসাগরের বাতাস তার গায়েও লেগেছিল- সেই সূত্রেই মধ্যস্থতার অধিকার।

লম্বা পোশাকে তিনি মাঝখানে সবচেয়ে জাঁকালো চেয়ারটিতে বসা। উঠে করমর্দন করে তার শুভকামনা জ্ঞাপন করেন সশব্দে। আরো দু’জন লোকও ঘরে বসা। সম্ভবত তারা সাক্ষী হয়ে বায়নাপত্র সই করবে।

ঘরের চারপাশ ভালো করে দেখে সে। জানালার যে গ্রিল নিজে পছন্দ করেছিল, সেই গ্রিলই আছে এখনো। ফরমায়েশি মোজেইকের রঙ এখনো তেমনি মনে ধরে। সোফায় বসবার আগে জানালা দিয়ে দেখে। পঁচিশ বছরে শেফালীর চারা মহীরূহ না হলেও প্রাচীর বরাবর লাগানো সেই সুপারিগাছ ক’টি আজ ‘গুবাক তরুর সারি’ অবশ্যই। ফেলে আসা গ্রামের স্মৃতি।

কুশল বিনিময়ের শেষে আপ্যায়নের কোনো ত্রুটি রাখেন না গৃহস্বামী। দূর থেকে আনা মিষ্টির প্লেট সামনে ধরে দেন। হেসে বলেন, “সবই তো নদীর গর্ভে গেছে, সনাতনের দোকানটি আছে এখনো, দেখুন মনে পড়ে কিনা” সে জানে সর্বগ্রাসী যমুনার কথা, কিছুই ভোলেনি। তবে ক’দিনের টানা ভ্রমণে ক্লান্ত সে। আপ্যায়নের আকাক্সক্ষী নয়। কিন্তু সে কথা বলা যায় না। তবুও যথাসম্ভব দ্রুত সারতে চায় সব। উকিলসাহেব আগে থেকে তৈরি বায়নানামা তার হাতে তুলে দেন। অবিশ্বাস্য অঙ্কটির দিকে সে তাকিয়ে থাকে। গত পাঁচ বছরের মধ্যে দাম নিয়ে আর কোনো কথাবার্তা না বললেও সে জানে এই অঞ্চলে বাড়িসুদ্ধ জমির দাম গত পাঁচ বছরে চার গুণ বেড়েছে।

উকিল সাহেব তার মনের কথা বোঝেন মনে হয়। সোফায় একটু হেলান দিয়ে আবার একটু উঠে বসেন, “দেখুন আপনাকে আগেই বলেছি, দামটা তো অনেক আগেই ঠিক করা। আর তাছাড়া, সত্যি কথা বলতে কি, আপনার মুখ চেয়েই কেবল আমরা এই টাকাটা দিতে চাইছি।”

সে কিছু বলে না। পনের বছরের বাদ-প্রতিবাদ নথিতে লেখা আছে। আদালতের নির্দেশ আছে। কাগজটি হাতে নিয়ে তাকে দেরি করতে দেখে উকিল সাহেব আবারও বলেন, “পনেরো বছরেও কিছু পাননি, আগামী পনেরো বছরেও যে কিছু পাবেন এমন আশা দেখি না। সইটা করে ফেলুন।”

সে আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়, সন্ধ্যা ক্রমে রাত্রির দিকে গড়াচ্ছে। ওপর দিকে আকাশ অস্পষ্ট দেখা যায় এখনো। সারি বাঁধা সুপারিগাছের পাতা হালকা হাওয়ায় শরশর শব্দ করছে। শীত এখনও তেমন ধারালো দাঁতে চামড়া কাটতে না শিখলেও বাইরে বেরুনোর সময় গায়ে একটা মোটা সোয়েটারই চাপিয়েছিল সে। এখন মনে হলো সেটা খুললেই আরাম হতো।

সাক্ষীরা চুপ করে বসে আছেন। দু’পক্ষের সই হয়ে গেলে সাবুদ করবেন তারা। সে মুহূর্তে কলমটি তুলে নিয়ে সই করে দেয়।

বারান্দা থেকে নামে সে। বেলিফুলের ঝোপ এখন আরো বড়। ফটকের দু’পাশে কামিনী আর হাস্নাহেনার ঝাড়। স্থলপদ্ম তেমনি স্থির দাঁড়িয়ে আছে। বাগানের দক্ষিণ কোণে জুঁই ফুটত। কামিনীর শরীর বেয়ে উঠেছিল অপরাজিতা। মনে পড়ে ঝুলত চামেলিও। কিন্তু এখন অন্ধকারে কিছু দেখা যায় না।

উকিল সাহেব সপারিষদ নেমে এসেছিলেন তার সঙ্গে। রাস্তা অবধি সঙ্গে এলেন। তাঁর গাড়ি দাঁড় করান ছিল, ঘরে পৌঁছে দেবেন বলে অনেক পীড়াপীড়িই করলেন। সে উকিল সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে একটি রিকশা ডেকে নিল। রিকশায় ওঠার মুখে একটু থেমে সে জিজ্ঞাসা করে, “শুনেছি আমাদের ভিটেটিও আর নেই।”

হেসে বলেন উকিল সাহেব, “সে তো কবেই গেছে।”

বড়ো রাস্তা ধরে একটু গিয়ে রিকশা বাঁয়ে মোড় নিল, তারপরে সাঁকো পেরনোর সময়ে সে জলের দিকে তাকায় আবারো। মাঝখানের চরের বেড়া ভেঙে যমুনা এক সময়ে হোরাসাগরের সঙ্গে মিশেছিল বলেই সে সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

এক সময় মানুষের নাগালের বাইরে, ধরাছোঁয়ার বাইরে এক মনোরম উদ্যান ছিল। সেই উদ্যানের খ্যাতি সহস্র যোজন, সহস্র বর্ষব্যাপী বিস্তৃত ছিল। কিন্তু এখন সেই বাগানের একটি কল্পচিত্রও খুঁজে পাওয়া যায় না।

সেই পর্ণকুটিরেরও নয়।