menu

বিশেষ আয়োজন শিল্পের অন্বেষা

শিল্প-জিজ্ঞাসা

আবু হেনা মোস্তফা এনাম

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ ২০১৯
image

শিল্পী : পল সেজান

সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক সিনেমায় শ্রী মনমোহন মিত্র [উৎপল দত্ত] তাঁর সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় জীবনের তোয়াক্কা না করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। এর নেপথ্য কারণটি হলো, স্পেনের আলতামিরা অঞ্চলে পাথুরে গুহার প্রাচীরে আদিম মানুষের আঁকা বাইসনের ছবি। এই ছবি তিনি কখনো আঁকতে পারবেন না। সেই বাইসনের শিং, বাঁকা গ্রীবা, তেজ, দীপ্ত ভঙ্গি এবং সমগ্র রূপ মিলিয়ে যে অভিব্যক্তি তা মনেমোহন মিত্রকে মুগ্ধ করেছিল। শিল্প সম্পর্কে বাইসনের এই ছবি থেকে আমাদের ভাবনার তর্ক সূচনা করতে পারি। অবশ্য, কেবল বাইসনই নয়, আদিম মানুষের পাথরের হাতিয়ার, কুঠার এবং ক্রমান্বয়ে গৃহস্থালি ব্যবহার্য তৈজসপত্র আমাদের সামনে শিল্পকলার প্রাথমিক উৎস হিসেবে নানান জিজ্ঞাসার সূচনা করে। অর্থাৎ শিল্পের সূচনাবিন্দু ছিল মানবঅস্তিত্বের লড়াইয়ের কালপ্রেক্ষিত, অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে আবিষ্কারের বিস্ময়াবিষ্ট উল্লাসের সময়স্রোত।

এভাবে বলা যেতে পারে যে, শিল্প হলো ব্যক্তির আবেগ-অনুভব, চিন্তাপ্রবাহ, সমাজ-সংস্কৃতি, ধর্মচিন্তা, কল্পনা, দর্শন, সৌন্দর্যবোধ [এবং অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনও] প্রভৃতির সমষ্টি। কিন্তু এই প্রপঞ্চগুলো নির্দিষ্ট বা একক কোনো মানদন্ডে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। ব্যক্তির বেড়ে ওঠা, পারিবারিক-সামাজিক-রাষ্ট্রিক সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুভূতি, নৈতিকতা, এমনকি শ্রেণিচেতনা, ইত্যাদির ভেতর দিয়ে ব্যক্তির মানসিক গঠনের একটি মিথষ্ক্রিয়া নির্মিত হয়। শিল্প বা শিল্পের বোধ, শিল্পের প্রক্রিয়া, নির্মিতি, দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়। সময়ের প্রবহমানতাও এই নির্মিতির নেপথ্যে বিবেচ্য বিষয়। কাজেই শিল্প কী- এই প্রপঞ্চের কোনো সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা দেয়া কঠিনই বটে। [সে অভিপ্রায় আমার মোটেও নেই। বরং শিল্প-বিষয়ক দু-একটি বই ও প্রবন্ধ পড়ার বিভ্রমময় উপলব্ধির একটি রূপকল্প মাত্র।] যদিও শিল্প সম্পর্কিত সংজ্ঞা, তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ সমালোচক, শিল্পচিন্তকরা দিয়েছেন। পরস্পর তর্কে লিপ্ত হয়েছেন। শেষাবধি তাঁদের এইসব তর্কের মধ্য দিয়ে আমাদের দৃষ্টি দিতে হয়েছে শিল্পের উৎস ও বিকাশের ইতিহাসের দিকে।

যেমন প্লাতো বলেছেন, শিল্প হচ্ছে ইমিটেশন বা নকল এবং এ কারণেই সত্য থেকে অনেক দূরে। প্লাতোর এই বক্তব্যের প্রতিউত্তরে আরিস্ততল বলেছেন, যেহেতু ইমিটেশনের মাধ্যমেই ক্রমান্বয়ে পৃথিবীতে মানুষের সচলতা এবং সজীবতা, তাই শিল্প ইমিটেশন হওয়ার কারণেই সত্য বস্তুর চেয়ে অধিকতর জীবন্ত। একটি বস্তু উপকরণগত বাস্তবতা নিয়ে নিঃশেষ হয়, কিন্তু শিল্প অনুভূতির অন্তঃসার নিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। [পোয়েটিক্স্]

অ্যার্নেস্ট হান্স জোসেফ গমব্রিচ বলেছেন, [তাঁর বইয়ের নাম The Story of Art, ১৯৫০] সত্যিই শিল্প বলে এমন কোনো কিছু নেই। কেবল রয়েছেন শিল্পীরা। শিল্পকে বিশেষ কিছু মনে করা হলো একে কতকটা রেলের বগি ধাঁচের এবং বন্দনা করার মতো একটা কিছু বিবেচনা করা। কেউ চাইলে কোনো শিল্পীকে এই বলে পথে বসিয়ে দিতে পারেন যে তিনি এখুনি যা সৃষ্টি করলেন তা তার নিজের ধরনে পুরোপুরি ভালো হলেও, তা একফোঁটা শিল্প হয়নি।

এমন অনেক তর্ক ও সংজ্ঞা উল্লেখ করা যায়। অথবা এসব বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বলা যেতে পারে, শিল্প হচ্ছে দৃষ্টি ও মানবমনস্তত্ত্বের সূক্ষ্মতায় প্রকৃতি ও বস্তুজগৎকে অনুভব করার একটি আবেগময় জিজ্ঞাসা। শিল্পী বিশেষ কৌশলে তার মন, চেতনা, দৃষ্টিধৃত ও অনুভূত সত্যকে রং, রেখা, শব্দ, সুর ও স্বরের সাহায্যে প্রকাশ করেন। হারবার্ট রিড এই শিল্পচেতনা বা বোধের ক্ষেত্রে দুটি শব্দ বা চিন্তা উল্লেখ করেছেন- ‘পার্সেপশন’ [Perception] এবং ‘এক্সপ্রেশন’ [Expression]। [রিডের বই A Concise History of Modern Painting, ১৯৬১] রিড অবশ্য ‘স্ট্রাকচারাল প্লিজিং’ বা মনোরম আকার সৃষ্টির প্রচেষ্টাকেও শিল্প বলেছেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে তিনিই তাঁর এই জিজ্ঞাসার পুনর্নির্মাণ করেছেন। তাঁর শিল্পচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লিখিত শব্দ দুটি। পারসিভ করা বা অনুভব করা, অর্থাৎ দেখার সঙ্গে সঙ্গে যদি উদ্দিষ্ট বস্তুকে অনুভব করতে শেখা না যায় তাহলে দেখা সম্পন্ন হলো না। কাজেই বস্তুকে দেখা, বস্তুকে নির্ণয় করা, চিহ্নিত করা এবং অনুভব করা; অতঃপর উদ্দিষ্ট বস্তুকে প্রকাশ করা। কবি যখন কবিতা লেখেন তখন তিনি একটি ল্যান্ডস্কেপে গাছ দেখেন, পাখি, মেঘ, নদী, নদীর বাঁক, নদীর স্রোত, স্রোতের উদ্দামতা দেখেন। একজন চিত্রশিল্পী বা কণ্ঠশিল্পীও দেখেন। কিন্তু সবকিছুকে তাঁরা প্রকাশ করেন না। এই বিস্তীর্ণ ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে তিনি একটি বিশেষ কিছু নির্বাচন করে নেন বা আবিষ্কার করেন। তাঁর দৃষ্টির পরিসীমায় কোনো কোনো বস্তু সত্যিকারের বিশেষ অনুভূতি নিয়ে জাগ্রত হয়। এই যে বোধ বা চৈতন্যের উত্থান ও উন্মোচন, একেই হারবার্ট রিড বলেছেন পার্সেপশন। একজন শিল্পীর অনুভব, কল্পচৈতন্য ও বোধের সুপ্ত তরঙ্গে পার্সেপশন যতক্ষণ না উন্মোচিত হয় ততক্ষণ তাঁর এক্সপ্রেশন বা প্রকাশ-ক্ষমতাও সৃষ্টি হয় না। কেবল ব্যাকরণ বা ছন্দের শাসন মেনে শব্দ সাজিয়ে গেলে বা রেখা-রঙের প্রয়োগে নিয়মতান্ত্রিকভাবে ছবি আঁকলেই যথার্থ কবি বা শিল্পী হয়ে ওঠা যায় না। এ জন্য দৃষ্টির বৈভব, অনুভূতির তীব্রতা অর্জন করতে হয়। কেননা, বস্তু হচ্ছে শিল্পীর উপলক্ষ, প্রতিপাদ্য নয়। বস্তুকে লক্ষ্য করে তিনি বাস্তবকে নির্ণয় করেন না। বরং বস্তুকে লক্ষ করে একটি সজীবতাকে এবং একটি সচল অনুভূতি বা সাড়াকে তিনি প্রত্যক্ষ করেন, প্রকাশ করেন। এভাবে বস্তুর মধ্যে অনুভূতি ও চৈতন্যের অন্তর্গূঢ়, সচেতন ও সূক্ষ্ম পরিপ্রেক্ষিত সঞ্চালন করে একজন শিল্পী নির্মাণ করেন তাঁর শিল্পকর্ম। যেমন কুড়িয়ে পাওয়া পাথর কোনো শিল্প নয়। পাথর ঘসে বিভিন্ন বিন্যাস বা আকার দেয়া হলো, ধার ও কৌণিক রেখা বের করা হলো, তখন পাথরটি হয়ে উঠল হাতিয়ার, হয়ে উঠল শিল্প।

শিল্পের স্বরূপ : উৎসের দিকে দেখি অথবা আরিস্ততল

লক্ষণীয়, শিল্প সম্পর্কে যে বস্তুকে দেখা ও অনুভবের বিশেষ কৌশলের প্রসঙ্গ বলা হলো, শিল্প বিষয়ক ভাবনার উৎসকালেই, অর্থাৎ প্লাতো-আরিস্ততলে তার প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা। [প্রাতিষ্ঠানিক বলছি এ কারণে যে, আলোচনার শুরুতেই আমরা প্রাচীন পাথুরে গুহার প্রাচীরে আঁকা বাইসনের কথা উল্লেখ করেছি। অর্থাৎ পাথরের হাতিয়ার তৈরি বা গুহাগাত্রের চিত্রকলা মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত শিল্পচিন্তার প্রকাশ, যদিও শিল্প সম্পর্কে তখন তাদের মধ্যে হয়ত কোনো জিজ্ঞাসাই সৃষ্টি হয়নি।] এখনও আমরা আরিস্ততলের পোয়েটিক্স্-এর চিন্তারই বিবিধ সম্প্রসারণ করে চলেছি। [আরিস্ততল জন্মগ্রহণ করেন গ্রিসের স্ত্যাগিরা নগরে ৩৮৪ খ্রি. পূর্বাব্দে] আরিস্ততল তাঁর পোয়েটিক্স্ গ্রন্থে বলেছেন, ‘মহাকাব্য, ট্র্যাজেডি, কমেডি এবং ডিথাইরাম্বিক কবিতা [এক ধরনের গীতি কবিতা। গ্রিক দেবতা বাখাস-এর জন্মকাহিনিই ছিল এসব কবিতার মূল প্রতিপাদ্য] এবং বাঁশি ও বীণার নানারূপ সংগীত- এ সবকিছুই সাধারণভাবে বলা চলে অনুকরণেরই নানা উপায়। তবে সেসবের মধ্যে একটির সঙ্গে অন্যের পার্থক্য তিনটি বিষয়েÑ অনুকরণের মাধ্যম, অনুকরণের বিষয় ও অনুকরণের পদ্ধতি।

তাঁর মতে, এমন অনেক লোক দেখা যায় যাঁরা বর্ণ ও রেখার মাধ্যমে বা স্বরের মাধ্যমে নানা প্রকার বিষয় অনুকরণ ও উপস্থাপনা করে থাকেন, তেমনি উল্লিখিত শিল্পগুলিতে মোটামুটিভাবে অনুকরণ নিষ্পন্ন হয় ছন্দ, ভাষা বা সঙ্গতির একক অথবা সামবায়িক উপায়ে। বাঁশি ও বীণার সংগীতে সুর-সঙ্গতি ও লয় প্রয়োগ করা হয়; নৃত্যে একমাত্র ছন্দই থাকে, সুর থাকে না। নৃত্যেও চরিত্র, হৃদয়াবেগ এবং ঘটনা অনুকৃত হয়। অন্যদিকে সাহিত্য কেবলমাত্র ভাষা দ্বারাই অনুকরণ করে; সে ভাষা গদ্য অথবা পদ্য। ভাষায় নানা মাত্রার ছন্দের সংমিশ্রণ ঘটতে পারে অথবা একটিমাত্র ছন্দও থাকতে পারে। [মজার ব্যাপার হলো, একসময় যেহেতু পদ্যেই সমস্তকিছু রচনা করা হতো, তা ভেষজ-বিদ্যা বিষয়ক রচনা বা প্রকৃতি বিজ্ঞান, পদ্যে লেখার কারণে সকল লেখককে কবি সম্বোধন করা হতো। এখনও, গ্রাম বা শহরের মানুষ সাধারণত শিক্ষিত বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি এমন মধ্যবিত্ত ও আটপৌরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত, তারাও গদ্যলেখককেও কবি সম্বোধন করেন।] আবার কোনো কোনো শিল্প ছন্দ, সুর, লয়, মাত্রা অবলম্বিত। [ক্রমেই নৃত্য বা শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের বিশেষ কৌশলও যুক্ত হয়] ডিথাইরাম্বিক কাব্য, নোমিক কাব্য [নোমিক কাব্য হলো একক সংগীত, গাওয়া হতো গ্রিক দেবতা আপোল্লোর উৎসবে।] এবং ট্র্যাজেডি-কমেডি এই শ্রেণির শিল্প।

অনুকরণের বিষয় হলো, মানুষ ও তার ক্রিয়াকলাপ। ভালো অথবা মন্দ- এই দুই শ্রেণিতে মানুষকে ভাগ করা চলে। আরিস্ততল বলেছেন, তদ্রুপ সমস্ত শিল্পই এই পার্থক্য স্বীকার করে, বিভিন্ন বস্তুকে অনুকরণ করে বলেই তারা বিভিন্ন বা পৃথক। চিত্রকলা, বাঁশি বা বীণা বাজানোতেও এই বৈচিত্র্য ধরা পড়ে, এবং একইভাবে বৈচিত্র্য প্রতিফলিত হয় পদ্যে কিংবা গদ্যে। যেমন, আরিস্ততল উদাহরণ দিয়েছেন, হোমারের সৃষ্ট চরিত্রগুলো ‘উন্নততর’, ক্লেওফোনের চরিত্রগুলো ‘বাস্তব’ এবং হেগেমোনের [প্রথম প্যারডি রচয়িতা রূপে খ্যাত] চরিত্রগুলো ‘নিম্নতর’। একইভাবে কমেডি মানবজীবনের নিম্নতর আর ট্র্যাজেডি উন্নততর ছবি সৃষ্টি করে।

আরিস্ততল অনুকরণের পদ্ধতি বা রীতি সম্পর্কে যেসব বক্তব্য উপস্থিত করেছেন তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর মতে, অনুকরণের পদ্ধতিই হলো বিভিন্ন শিল্পের মধ্যে পার্থক্যের কারণ। যেমন একই বিষয়ে একই পদ্ধতিতে রচনা করার সময় এটা খুবই সম্ভব যে, কিছুটা বর্ণনার মধ্য দিয়ে বলা যায়, আর কিছুটা, যেমন হোমার করেছেন, লেখক যেন একটি চরিত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ। অথবা লেখক স্বয়ং একটি চরিত্র, অথবা চরিত্রগুলো যেন জীবন্ত, তারাই সমস্ত ঘটনার ক্রীড়নক- এমনভাবেও বর্ণনা করা সম্ভব। এ জন্যই কেউ কেউ তাঁদের কাব্যকে নাটক বলেছেন, কারণ এসব কাব্যে ক্রিয়াশীল মানুষের অনুকরণ করা হয়েছে। এ কারণেই এসব নাটক ট্র্যাজেডি, কমেডির আখ্যা পেয়েছে।

ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পরিসর

আমরা উল্লেখ করেছি, শিল্প হচ্ছে দৃষ্টি ও মানবমনস্তত্ত্বের সূক্ষ্মতায় পৃথিবীকে অনুভব করার একটি আবেগময় জিজ্ঞাসা। অর্থাৎ আমরা আমাদের দৃশ্যেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বস্তুপৃথিবীকে দেখি এবং আমাদের বোধে, চৈতন্যে ওই দৃশ্যমান বস্তু সম্পর্কে একটি আবেগময় জিজ্ঞাসা বা অনুভব নির্মিত হয়। কিন্তু যারা জন্মান্ধ? কথিত আছে হোমার, ইউরিপিডিস [ট্র্যাজেডি রচয়িতা], রোমান সাহিত্যিক ভার্জিল [তাঁর কাব্য ঈনিদ], জন মিল্টন [প্যারাডাইস লস্ট রচনা করেন অন্ধত্ব নিয়ে] অন্ধ ছিলেন। [নেত্রকোনা জেলার একজন অন্ধ কণ্ঠশিল্পীর গান শোনার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। এছাড়া অনেক অন্ধ ভিক্ষুক আমাদের চারপাশে গান গেয়ে ভিক্ষা করেন। অথবা অন্ধ ব্যক্তি প্রচন্ড কোলাহলের মধ্যেও তার সাদা ছড়ির ক্ষীণ শব্দে ঠিকই অনুভব করে নেন বস্তুর দূরত্ব বা নৈকট্য। কিংবা বাদুড় মুখ নিসৃত ধ্বনির প্রতিধ্বনি শুনে কীভাবে নির্ণয় করে বস্তুর দূরত্ব বা নৈকট্য?] তাহলে এঁরা কীভাবে রচনা করলেন এইসব অমর কাহিনি? প্রকৃতপক্ষে কেবল দৃশ্যেন্দ্রিয় নয়, পঞ্চেন্দ্রিয়ই মানুষের বোধ ও চৈতন্যে বিবিধ জিজ্ঞাসা, কৌতূহল, আবেগের উদ্ভব ঘটায়। প্রতিটি ইন্দ্রিয়ই কোনো না কোনোভাবে ব্যক্তির অন্তর্চৈতন্যে একটি ‘স্পেস’ তৈরি করে। এই স্পেসের মধ্যে বস্তুকে স্থাপন করতে হয়। [চিত্রকলার পরিভাষায় এই স্পেস বা পরিসরকে বলা হয় ‘পিকটোরিয়াল স্পেস’।] শিল্পের কাজ স্পেসের মধ্যে অবস্থিত বস্তুর নৈকট্য, দূরত্ব, গভীরতা, আলো-অন্ধকার ইত্যাদি প্রকাশ করা। তবে এটা হয়ত সম্ভব কি না যে, একটি ইন্দ্রিয়ের পরিবর্তে অন্য ইন্দ্রিয় স্পেসের এই শর্তাবলি পূরণ করতে সক্ষম! ঘ্রাণ বা শ্রবণেন্দ্রিয় দিয়ে হয়ত বস্তুর আকার-প্রকৃতি অনুধাবন করা সম্ভব, হয়ত রঙের একটি বোধও জাগ্রত হতে পারে; স্বাদ বা স্পর্শেন্দ্রিয়ের মাধ্যমেও বস্তুর কৌণিক গঠন, রং, দূরত্ব, নৈকট্য, গভীরতা অনুভব করা সম্ভব। কিন্তু কোনোটি ঠিক কোনোটির পরিপূরক নয়। বরং সামগ্রিকভাবে সমস্ত ইন্দ্রিয়ের একটি সামবায়িক অনুভূতি তরঙ্গায়িত। স্পেসে বস্তুর এই অবস্থিতি এবং ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা প্রকাশ করতে যেমন চিত্রকলায় রেখা, রং, আলো-অন্ধকারের বৈপরীত্য ব্যবহার করতে হয়; সংগীতে যেমন সুর, তাল, লয় ব্যবহার করতে হয়; তেমনি সাহিত্যে শব্দ, বাক্য, ছন্দ, অলঙ্কারের সুসামঞ্জস্যে একটা বস্তুর অনুভূতি হয়ে ওঠে বাক্সময়। হেগেলের চিন্তায় এরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। হেগেল বলেছেন, শিল্প হলো চূড়ান্ত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রকাশ।

মার্কসীয় ভাবনা

মার্কসবাদের শিক্ষার্থীমাত্রেরই জানা যে, মার্কস কখনো ‘বিশুদ্ধ’ শিল্পে আস্থাশীল ছিলেন না। কিন্তু মানবসংস্কৃতির বিবর্তনে শিল্প ও সাহিত্যের ভূমিকার মূল্যায়নেও তিনি কোনো প্রকার বাঁধাধরা নিয়ম বা ছাঁচ অনুসরণ করতেন না। মানুষের সমাজ ও ইতিহাস বিচারে তাঁর যে মৌল প্রত্যয়, সেই যুক্তিপরম্পরার ভিত্তিতেই তাঁর শিল্প-জিজ্ঞাসা বা বোধ গঠিত ও নিরূপিত হয়। তিনি দ্য জারমান ইডিওলজি গ্রন্থে শিল্পকর্মের ইতিহাস, বিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে যেসব মন্তব্য করেছেন, এবং তাঁর অন্যান্য রচনা থেকেও, শিল্প সম্পর্কে একটি ধারণা আমরা পেতে পারি। র‌্যাফায়েল, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, টিশিয়ান প্রভৃতি শিল্পীর শিল্পকর্মের তুলনামূলক আলোচনা থেকে মার্কসের শিল্পবোধ সম্পর্কিত ধারণাটি এভাবে বলা যায়- একজন ব্যক্তি তার প্রতিভার বিকাশ কীভাবে করবেন তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে চাহিদার ওপর, চাহিদা আবার ঐ পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত শ্রমবিভাগ ও জনসমষ্টির সাংস্কৃতিক সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। মার্কসের এই বক্তব্যে দুটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এক, শ্রম বিশেষ শ্রেণির শিল্পকর্মের আবির্ভাবের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে; দুই, শৈল্পিক চৈতন্য বিচ্ছিন্নভাবে বিবেচিত ব্যক্তিবিশেষের সামাজিক অবস্থানের যান্ত্রিক প্রতিফলন নয়Ñ এ হলো তার মনের শৈল্পিক অভিক্ষেপ, যে মন যুগপৎ সমাজের সঙ্গে তার সম্পর্কের সামগ্রিকতা দ্বারা এবং অন্যান্য সমাজের সঙ্গে তার সমাজের অপরাপর সম্পর্কের বন্ধন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও গঠিত হয়েছে।

মার্কস-এঙ্গেলসের দৃষ্টিতে সমাজের মূলগত ভিত্তি তার অর্থনৈতিক রূপ, মানুষে-মানুষে পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক; অর্থনৈতিক সম্পর্কই মানুষের সমাজের সূচনার সত্য। কিন্তু তাই বলে মানুষ শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সম্পর্কের সমষ্টি নয়। তার বুদ্ধি, বোধ, মেধা, মনন ও ভাবজীবনেও সে প্রতিষ্ঠিত। মার্কসের মতে :

‘Objectification of human existence, both in a theoretical and practical way, means making man's senses human as well as creating human senses corresponding to the vast richness of human and natural life.’

অর্থাৎ, শিল্পের লক্ষ্য তাই মানুষের বোধশক্তিকে, তার অনুভূতিকে মানবিক সংবেদনশীলতায় সত্য ও সমৃদ্ধ করে তোলাÑ জীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সীমাহীন বৈচিত্র্য সৌষ্ঠবের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানবীয় বোধ সৃষ্টি করা, সংবেদনশীলতকে সজীব করে তোলা। এই মানবিক বোধই শিল্পকে মহত্ত্ব দান করে।

[আলতামিরা গুহাগাত্রে আঁকা বাইসনের ছবি, যে প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আমরা এই আলোচনার সূত্রপাত করেছি, আগন্তুক সিনেমার মনমোহন মিত্র যেখানে বলছেন, পৃথিবীর কোনো আর্টস্কুল নেই, যেখানে তাকে এইরকম বাইসন আঁকা শেখাতে পারে। মার্কস মানুষের যে শ্রমবিভাগ, চাহিদা, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক, বোধ, অনুভূতি ও মানবিক সংবেদনশীলতার কথা বলেছেন, বাইসনের ছবিটি সেই আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়।]

মনঃসমীক্ষণ

শিল্প জিজ্ঞাসায় মনঃসমীক্ষণেরও নিজস্ব একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে। এই দৃষ্টিতে শিল্পের উৎস হলো শিল্পীর চৈতন্যস্থিত ব্যক্তিত্ব, যা তার চৈতন্যের গভীর গোপনে সুপ্ত থাকে। মনঃসমীক্ষণবাদীদের ভাবনায় শিল্পসৃষ্টির মূলে থাকে সহজাত প্রবৃত্তির তাড়না। এই প্রবৃত্তি তাড়নার উপর ব্যক্তি হিসেবে শিল্পীর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না, আর থাকলেও তা নিতান্তই সামান্য। মনঃসমীক্ষণবাদের সবচেয়ে আলোচিত চিন্তাবিদ ফ্রয়েড [১৮৫৬-১৯৩৯] তাঁর শিল্পভাবনা বা জিজ্ঞাসাকে যৌন অবদমনের সাধারণ তত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, শিল্পবস্তু পরিবর্ত পরিতৃপ্তি দান করে, যা বাস্তবের তুলনায় নিছক মোহমাত্র।

মনঃসমীক্ষণ-ধারণার আরেক প্রবক্তা কার্ল ইয়ুং [১৮৭৫-১৯৬১], তিনিও শিল্প সৃষ্টির নেপথ্যে সহজাত প্রবৃত্তির তাড়নার কথা বলেছেন। তথাপি তিনি আরো অগ্রসর মন্তব্য করেছেন, তাঁর মতে, যখনই সৃজনি শক্তি প্রবল হয়ে ওঠে, তখনই মানবজীবন সক্রীয় এষণার পরিবর্তে অবচেতন বা নির্জ্ঞান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও গঠিত হয়।

শিল্পের বিমানবিক কণ্ঠস্বর ও অর্তেগা ঈ গাসেৎ

স্পেনীয় দার্শনিক ও সমালোচক অর্তেগা ঈ গাসেৎ [Ortega y Gasset] গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে আধুনিক শিল্পকলা বিষয়ক Dehumanization of Art and Other Essays on Art, Culter and Literature [১৯২৫] শিরোনামে দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন। তিনি এ প্রবন্ধে বলেছেন, আধুনিক শিল্পকলা আপামর জনসাধারণ উপভোগ করতে পারে না, কেননা তার প্রেরণাপুঞ্জ সার্বজনীনভাবে তথাকথিত মানবিক নয়। শিল্পের সুখানুভূতি বা আনন্দ বলতে অধিকাংশ মানুষ কী বুঝে থাকে? তারা যখন কোনো শিল্পকর্ম, কবিতা, নাট্যাভিনয়, চিত্রকলা পছন্দ করে তখন কী ঘটে তাদের চেতনা ও বোধে?

গাসেৎ-এর এই ভাবনাসূত্রে বলা যায়, সাধারণ মানুষ এইসব নাটক, চিত্রকলা, কবিতা বা উপন্যাস তখনই পছন্দ করে যখন এসব শিল্পে উপস্থাপিত মানবিক নিয়তি তাদের আকর্ষণ করে। যখন এসব শিল্পের পাত্রপাত্রিদের প্রেম-ঘৃণা, আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ দর্শক বা স্রোতার চিত্তকে আলোড়িত করে, এবং তারা অনুভব করতে থাকে যে তারাও ওই ঘটনার জীবন্ত একটি অংশ, তাদের জীবনেও ওই বাস্তব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এ কারণে তারা ওই শিল্পের সঙ্গে একাত্ম বোধ করে, পছন্দ করে এবং তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। [জনপ্রিয় সাহিত্যের প্রচুর দৃষ্টান্ত আমাদের চারপাশ পরিবেষ্টন করে রেখেছে।] কিন্তু যখনই উপকরণগত বাস্তবতা নিঃশেষ হয়ে বস্তু শিল্প-অনুভূতির অন্তঃসার নিয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে [আরিস্ততলের অভিমতে], অর্থাৎ শিল্পে নান্দনিক উপাদানরাশির প্রাধান্য ছড়াতে থাকে তখনই অন্তর্হিত হয় প্রাত্যহিক ও তথাকথিত মানবিক জীবনের উপভোগ্য বিষয়সমূহ।

অর্থাৎ শিল্পের রসাস্বাদনের প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য বিচারে এর ভোক্তাকে দুই শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায়। এক শ্রেণি আধুনিক শিল্প অনুধাবন করতে ব্যর্থ, এবং এই শ্রেণিই সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্য শ্রেণি অনুধাবনে সক্ষম। এ জন্য শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, বন্দে আলী মিয়া বা জসীমউদ্দীন কিংবা ‘বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ঐ’ কবিতার রচয়িতা অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত যত বেশি জনপ্রিয়, জীবনানন্দ দাশ বা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তত বেশি অজনপ্রিয়। একই কারণে হুমায়ূন আহমেদ বা জে কে রাউলিং অথবা হারুকি মুরাকামি যত জনপ্রিয়, পক্ষান্তরে সতীনাথ ভাদুড়ী বা উইলিয়াম ফকনার, জেমস জয়েস বা আলেহ কার্পেন্তিয়ারের কথাসাহিত্য ততটাই অজনপ্রিয়। রনবীর কার্টুন তাই আমাদের দৈনন্দিন ক্লিশে আবেগকে আন্দোলিত করে, কিন্তু পিকাসোর গোয়ের্নিকার সামনে আমরা অসহায় বোধ করি। এই জনপ্রিয় শিল্প আশ্রয় করেছে বাস্তব জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও ভাবাবেগ-ভাবালুতা ভরা মানবিক উপাদান। কিন্তু অজনপ্রিয় শিল্প বাস্তবতার অনুকরণ নয়, বরং আবিষ্কার করে নিঃশেষিত বাস্তবতার ভেতরের সত্য। অর্তেগা ঈ গাসেৎ যাকে বলেছেন বিমানবিক [ডিহিউম্যানাইজেশন] শিল্পকলা।

অর্তেগা ঈ গাসেৎ শিল্পের বিমানবিকীকরণ অর্থে অমানবিকতা বোঝাননি। বিমানবিকীকরণের বিষয়টি পরিষ্কার করতে তিনি জানালার বাইরে দৃশ্যমান একটি পুষ্পোদ্যানের উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমরা জানালা দিয়ে পুষ্পোদ্যানের বৃক্ষ দেখি, পুষ্প দেখি। কখনো কখনো জানালাটাও দেখি। কিন্তু সূর্যালোকের প্রতিফলিত কণা জানালার কাচে যে অদ্ভুত বর্ণালির সৃষ্টি করে সেটি দেখি না। অর্থাৎ দৃশ্য দেখি, দৃশ্যাবৃত কাঠামোটি অপ্রত্যক্ষ থেকে যায়। যেমন কথাসাহিত্যে গল্পেরই সন্ধান করি, কিন্তু প্রকরণ বা আঙ্গিক লক্ষ করি না। যিনি দেখেন, তিনি শিল্প সৃষ্টি করার জন্য জানালা ও দৃশ্যমান পুষ্পোদ্যান দেখার মানবিক আবেগ ত্যাগ করতে পারেন এবং শিল্প রচনা করেন।

শিল্প-জিজ্ঞাসা, অতঃপর

শিল্পে পুনরাবৃত্তি মূল্যহীন। প্রতিটি শিল্পের ধারা একসময় বিগত হয়ে যায়, অনেক সময় হয়ে যায় নিঃশেষ। এবং নিঃশেষিত প্রাচীন বা বিগত শিল্পের ফসিলের উপর রচিত হয় নতুন শিল্পের সম্ভাবনা, ঘটে আধুনিক শিল্পের উদ্ভব। এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত বস্তুকে দেখা ও অনুভবের, শিল্পীর যাপিত সময়ের উত্থানপতনের, আর্থরাজনৈতিক পরিস্থিতির, কল্পনামনীষার। তাই আরিস্ততল যে অনুকরণ পদ্ধতির কথা বলেছেন, আধুনিক শিল্পে সেই পদ্ধতির প্রতিরূপ হয়ে ওঠে রূপক।

অর্তেগা ঈ গাসেৎ-এর মতে রূপকই হচ্ছে শিল্পের বিমানবিকীকরণের অন্যতম পদ্ধতি। কেননা, আমাদের মনে হয়েছে, বাস্তবের মাঝে রূপকই সৃষ্টি করতে পারে কল্পনিক মাকুন্দো গ্রাম, সমুদ্রের ঊর্মিমালায় হারিয়ে যাওয়া যাত্রীপূর্ণ ট্রেন অথবা গলে দুমড়েমুচড়ে ঝুলতে থাকা বিমূর্ত সময় নির্দেশক ঘড়ি কিংবা শত শত বাবুই পাখির উড়ন্ত মেঘের ছায়ার ভেতর যাপিত সমাজ-রাষ্ট্র ছেড়ে উড়ে যাওয়া মানুষ- এই পরাবাস্তব, এই অধিবাস্তব, এই ম্যাজিক। আর এভাবেই আধুনিক শিল্প রূপকের শাসনে বিস্তৃত হয় বিবিধ শিল্পকলাপ্রকৌশলে।