menu

লুইস গ্লুকের কবিতা : ২

‘সেটিই নগর যেখানে আমি হাওয়া হয়ে যাই’ অনুবাদ : মুজিব রাহমান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২০

বাগান

বাগান তোমাকে সমীহ করে।

তোমার খাতিরে সে নিজেই মেখে নিয়েছে সবুজ রঞ্জক,

গোলাপের লাল উন্মত্ততা,

যাতে তুমি তোমার প্রিয়জনকে নিয়ে তার কাছে আসো।

এবং উইলোগাছ

দেখো কীভাবে বানিয়ে নিয়েছে এতো এতো

নিস্তব্ধতার সবুজ তাঁবু। তথাপি

এখনো তোমার একটা কিছু চাই,

তোমার শরীর এতো কমনীয়, এতো চনমনে

এই প্রস্তর প্রাণিদের মাঝে।

স্বীকার করে নাও তাদের মতো হওয়াটা যাচ্ছেতাই,

ক্ষতির বাইরে।

দূরবীন

তোমার দৃষ্টি সরিয়ে নেবার পর একটি মুহূর্ত আছে

যখন তুমি কোথায় আছো তা ভুলে যাও

কারণ তুমি বাস করছো, মনে হয়,

অন্য কোথাও, রাতের আকাশের নৈঃশব্দ্যে।

তুমি ধরাতলে থাকার ইতি টেনেছো।

তুমি আছো এক ভিন্ন জায়গায়,

এমন এক স্থানে যেখানে অর্থহীন মানব জীবন।

তুমি দেহস্থিত কোন জীব নও।

তুমি আছো যেমন নক্ষত্ররাজি,

তাদের নীরবতার, তাদের অসীমতার ভাগী হয়ে।

অতঃপর তুমি আবার ধরাতলে।

রাতে, ছোট টিলার ওপরে

দূরবীণ খুলে ফেলে।

পরিশেষে তুমি উপলব্ধি করো

এমন নয় যে প্রতিচ্ছবিটি ভুয়া

কিন্তু সংযোগটি ভুঁইফোড়।

তুমি পুনশ্চ দেখো কতো কতো দূরে

প্রত্যেকটি জিনিস অন্য সব থেকে।

নিশি প্রচরণ

এই ক্ষণে যখন তুমি

পুনশ্চ দেখছো

পর্ণমোচী গাছের লাল খুদেফল

এবং আঁধার আকাশে

পাখিদের নিশি প্রচরণ।

ভাবতেই আমার গভীর দুঃখ হয়

যারা গতপ্রাণ তারা দেখবে না তাদের-

যেসবের ওপর আমাদের নির্ভরতা,

তারা অদৃশ্যে মিলিয়ে যায়।

কী করবে আত্মা তখন সান্ত্বনার জন্যে?

নিজেকেই বলি হয়তো এই ইন্দ্রিয় সুখের

আর হবে না দরকার;

সম্ভবত শুধু সত্তাটাই যথেষ্ট নয়,

কল্পনা করার মতোই কঠিন বিষয় এটি।

আদিম প্রকৃতিকল্প

তুমি তোমার বাবার ওপর পা ফেলছো, আমার মা বললেন,

এবং আমি সত্যি শষ্প শয্যার কেন্দ্রবিন্দুতেই দাঁড়িয়ে রইলাম,

এতো নিপুণভাবে ছেঁটে দেয়া হয়েছে ঘাস

হতে পারে এটি আমার বাবার কবর,

যদিও কোন প্রস্তরফলক নেই এ কথা বলার।

তুমি তোমার বাবার ওপর পা ফেলছো, তিনি পুনর্বার বললেন,

আরো জোরে বললেন এবার, যা আমার কাছে

অস্বাভাবিক মনে হতে লাগলো,

যেহেতু তিনি নিজেও মৃত; এমনকি ডাক্তারও তা স্বীকার করেছিল।

আমি ঈষৎ পাশে সরে দাঁড়ালাম, যেখানটাতে

আমার বাবা করেছিল শেষ এবং মা করেছিল শুরু।

সমাধিক্ষেত্র ছিলো সুনসান। বাতাস বয়ে যাচ্ছিল

গাছের ভেতর দিয়ে; কয়েক সারি দূর হতে

আমি অস্ফুট কান্নাধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম,

এবং একটি কুকুর বিলাপ করছিল আরও দূর হতে।

অবশেষে কমে এলো এই আওয়াজ।

আমার মনে পড়লো এখানে তাড়িত হবার

কোন স্মৃতি আমার নেই,

যেটিকে এখন মনে হলো সমাধিক্ষেত্র,

যদিও এটি কেবল আমার মনেই সমাধিক্ষেত্র হতে পারতো;

সম্ভবত এটি ছিলো একটি পার্ক, অথবা যদি পার্ক না হতো,

একটি বাগান, অথবা নিকুঞ্জ, সুরভিত,

এখন আমি উপলব্ধি করলাম, গোলাপের সুবাসে-

জীবনযাপনের মধুরতা বায়ু ভরে আছে,

জীবনযাপন যাপনের মিষ্টতা, যেমন প্রচল প্রবাদে।

এক সময় মনে পড়লো আমি একা।

কোথায় গেলো অন্যরা,

আমার মামাতো ফুফাতো খালাতো চাচাতো ভাইয়েরা

এবং বোন, ক্যাটলিন এবং অ্যাবিগেইল?

আলো মিলিয়ে যাচ্ছে এখন।

কোথায় অপেক্ষারত আমাদেরকে বাড়ি পৌঁছে দেবার গাড়ি?

অতঃপর আমি শুরু করলাম বিকল্পের অনুসন্ধান।

অনুভব করলাম আমার ভেতর বেড়ে উঠছে

অস্থিরতা, ঘনিয়ে আসছে, আমি বলি, উদ্বেগ।

সবশেষে, দূরে, আমি বুঝতে পারি, একটা ছোট্ট ট্রেন,

থামলো, মনে হলো, কিছু পত্রপুঞ্জের আড়ালে,

দরোজা-কাঠামোয় ঠেস দিয়ে দীর্ঘ সময়

ট্রেনের কনডাক্টর সিগারেট ফুঁকছে।

অনেক ভূমিখ-, অনেক জনক ও জননী ছাপিয়ে

আমি চিৎকার করে বললাম, আমাকে ভুলো না-

অবশেষে যখন আমি তার কাছে পৌছুলাম,

চেঁচিয়ে বললাম, আমাকে ভুলে যেও না,

রেললাইনের দিকে নির্দেশ করে সে বললো, ম্যাডাম,

নিশ্চিতভাবেই আপনি এটিকে শেষ ধরে নিয়েছেন,

ধরে নিয়েছেন লাইন আর দূরে যাবে না।

তার কথা কর্কশ ছিলো, তথাপি তার চোখ ছিল দয়ার্দ্র;

এটিই আমার ব্যাপারটি নিয়ে

জোর জোরাজুরি করতে প্রাণিত করেছিল।

কিন্তু তারা ফিরে যায়, আমি বললাম, আমি তাদের

দৃঢ়তা লক্ষ্য করলাম, যেন তাদের সামনে

এমনতরো বহু প্রত্যাবর্তন ছিলো।

তুমি জানো, সে বললো, কঠিন আমাদের কাজ:

আমরা মোকাবিলা করি অজস্র দুঃখ ও হতাশার।

সে জায়মান সারল্যে আমার দিকে অপলক চেয়ে রইলো।

ভালবাসার অশান্ততায় একদা আমি তোমার মতো ছিলাম,

যোগ করলো সে।

আমি এখন এক পুরনো বন্ধু সম্পর্কে বলছিলাম:

তোমার তাতে কী, আমি বললাম,

যেহেতু তার ছেড়ে যাবার স্বাধীনতা ছিলো

তোমার কি বাড়ি যাবার কোন ইচ্ছে নেই,

পুনর্বার নগরটি দেখবার জন্যে?

এ আমার বাড়ি, সে বললো।

নগর- সেটিই নগর যেখানে আমি হাওয়া হয়ে যাই।