menu

রোদনপাখি

শিপা সুলতানা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০১৯
image

ঘোর অন্ধকার রাত, তবু গ্রামে ঢুকতে কোনো অসুবিধা হলো না আমার। গ্রামে ঢুকতে আরো অসুবিধা হলো না, কারণ রাতটা মাঘের। বর্ষার রাত হলে গ্রামের মুখে যে ফকিরের গাছের তলা, তলায় যে ঝুপড়ি ঘর, সেখানেই রাত কাটিয়ে ঘুম ভাঙলে বাড়ি ফিরতাম। বর্ষায় দিনেদুপুরেই পথের উপর সাপ পড়ে থাকে। এক টিলায় লেজ, অন্য টিলায় মাথা। মাঝখানের সরু আর ধবল বালুর উপর গাছের জড়ের মতো, বেতবনের বেতের মতো আঁকাবাঁকা আলদ, অজগর...

কবে রওয়ানা দিয়েছিলাম, কবে পৌঁছালাম কোনো হিসেব মেলাতে পারছি না। যেখান থেকেই আসি, একটা আন্দাজ থাকার কথা যে কোন সময়ে গিয়ে গ্রামে পৌঁছাবো। এভাবেই তো বাড়ি ফেরে লোকে। সন্ধ্যা হলে ফকিরের গাছের তলায় হারিকেন জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কেউ একজন। আমি যে কেমন করে এমন করলাম, আমার যে এতো রাত হয়ে গেলো!

গ্রামের কিছুই বদলায়নি মনে হচ্ছে। সেই উত্তরে চাতলা পাহাড়ের মাথায় মোকামবাড়ির চূড়ায় কার ঘরে যেনো কুপিবাতি জ্বলছে! না কুপি তো আমার জন্মের আগেই বাল্লায় ছুঁড়ে দিয়েছে মানুষ। আমার ঠিক পেছনে, বাঁকের ভেতর ঠাকুর বাড়িতে কবরের নীরবতা। আগে কেউ না কেউ সারারাত জেগে থাকতো। পুত্রহারা মায়ের মতো কুনকুন করে গীত গাইতো যেনো কেউ! ঠাকুর বাড়ির শিমুল গাছের ডালে একটা ঝুলবাতি ঝুলে আছে। দেখে কেমন অস্বস্তি লাগে, একটা খুঁটিতে বেঁধে রাখলেও পারতো। সেই ফাঁসলাগা বাতির আলো হঠাৎ করে নাই হয়ে গেছে বাঁক পেরুতেই। আমার তবু কিছু দেখতে অসুবিধা হচ্ছে না। সামান্য হাঁটলেই ঘোড়ামারা হাইন্দ, তারপর সেই বাঁক পেরুলে বামে চাতলা ডাইনে ফেওলা, সামনে আইশনোটিলা। ফেওলা টিলার মাথায় কোনো বাতি নেই, বিলেতে চলে যাবার পর সেই বাড়িতে বাতি জ্বলেও না। এভাবে জনমানুষহীন থাকতে থাকতে বাড়িতে ফিরে এসেছে পুরনো বাসিন্দারা। দিনেদুপুরে যেতেও ভয় লাগে। দুই চাইর বছর তবু লোকে আম কাঁঠাল পাড়তে যেত, একদিন তাও বন্ধ হয়ে যায়।

চাতলা যতটা দূরে, আইশনোটিলা অতোটা দূরে নয়। আইশনোটিলায় আমাদের বাড়ি। বাড়ির সিঁড়ির মাথায় কাঠের খুঁটির আগায় একশ ওয়াটের একটা ফিলিপস বাতি জ্বলছে, সেই আগের মতো, বছরের পর বছর। আমার দাদাজির হুকুমে। রাতবিরাতে গ্রামে ঢুকলে যেনো লোকে পথ না হারায়। পথ হারায় নাকি কেউ! হারায় হারায়। নতুন আগন্তুক এলে আর জোছনারাতি হলে অবশ্যই পথ হারায়। পাহাড়ের প্রত্যেকটা বাঁক এক একটি ফাঁদ, বাঁক পেরুলেই কোথাও ছোট কোথাও বড় বড় বালুর মাঠ। চাঁদের আলো পড়লেই মাঠগুলো নদী হয়ে যায় আর তার পাড়ে বসে করুন সুরে রোদন করতে থাকে এক পাখি। মানুষ তখন নদীমুখি হাঁটতে থাকে আর তারা পথ হারিয়ে ফেলে।

শাফকাত ভাই, সারাদিন কী আঁকো তুমি?

নদী

নদী আঁকার কি হলো, নদীতো এমনিতেও দেখতে পাওয়া যায়! যা দেখা যায় না সেটা আঁকতে পারো না?

নদীর পারে পাখি কাঁদে? এই দেখ এখানে একটা পাখি বসে বসে কাঁদে, পাখির চোখের পানি নদীতে পড়েই হারিয়ে যাচ্ছে...

দাদাজী তাই হুকুম করেছেন কোনোদিন বাড়ির মাথা থেকে আলো নিভবে না... সেই আলোতেই দেখতে পেলাম ফেওলা টিলার মাথায় ঘোর অন্ধকার। একটি দুটি জোনাক জ্বলছে নতুন গজানো গাছেদের ডালে ডালে, তবে অন্ধকারটাই খুব ঘন আর ভারি। সেদিক থেকে চোখ ফেরাতে গিয়ে মনে হলো আমাদের বাড়ি আর ফেওলা টিলার মাঝখানে যে বরইটিকি, পুকুর, ধানখেত, সবজি বিচরা, বাঁশঝাড় আর নতুন গোরস্থান, তার অদূরে আরেকটি বাতি জ্বলছে কারও বাড়ির মাথায়। ঐখানে তো বৈদাটিলা। কেউ তো থাকে না সেখানে। কেউ কি নতুন পাড়ি দিয়েছে সেই টিলায়। কার যেনো ছিলো টিলাটি। আমাদের, ছোট দাদার? টেকার বাড়ির কারো! তবে খুব উজ্জ্বল বাতি জ্বালিয়েছে তারা।

যাবো কি যাবো না করে সেই বাতির দিকে হাঁটতে লাগলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাড়ি ফিরলাম আমি! ক্যালেন্ডার দেখে পূর্ণচন্দ্র হিসেব করে আসতে পারতাম। তাহলে ভোর হবার আগে আগে পুরো গাঁ চক্কর দিয়ে আসা যেত। জোছনা রাতে সে এক দৃশ্য আমাদের গাঁয়ে। রাতভর মানুষের গুনগুনানি, পাখপাখালির ফিসফিসানি, এক ঘরের চাল থেকে আরেক ঘরের চালে ফুড়–ৎ করে চড়–ইয়ের উড়ে যাওয়া, নিমগাছে তক্ষক ডাকা, সেই তক্ষককে ঢিল মারা, বন থেকে বেরিয়ে একলা এক বাবা খরগোশের ছড়ার পাড়ে বসে থাকা, বনের ফাঁকে ফাঁকে শেয়ালদের সতর্ক চোখ, উঠানের উপর ছায়া ফেলে অশরীরীদের উড়ে যাওয়া, ঠাকুরবাড়ের চাতালে বসে হারু কাকা, বাদলদা, বাদশা ভাইদের ‘মনা প্রাণে বাঁচি না’, ‘চল মিনি আসাম যাবো’, ‘পর জনমে হইও রাধা...’

ঘুটঘুটে অন্ধকার তবু যেনো কার বাড়ি থেকে মোরগের পালক পোড়ার গন্ধ আসছে, এতোরাতে কেবা মোরগ জবাই করলো, কেনো করলো!

কে? কে ওখানে? পুকুরপাড়ে কে?

সুবর্ণা

তুমি এতো রাতে এখানে কী করো?

আপনি কী করেন শাফকাত ভাই?

আমি বসে বসে পুকুরের পানি দেখি। মধ্যরাতে তুমি বাড়ির বাইরে। জানো না এটা কতোটা খারাপ হতে পারে? বাড়ি যাও, কুইক যাও।

আমি জিগাইছি আপনি মধ্যরাতে বাড়ি ছেড়ে পুকুরপাড়ে বসে আছেন কেন?

আমি গোছল করতে আসছি।

এখন ইচ্ছা করলে আপনি বসতে পারেন, উঠেও যেতে পারেন।

সুবর্না শুনো, যন্ত্রণা না করে বাড়ি যাও, চলো, আমি আগায়া দিয়া আসি।

তারচেয়ে আমার সাথে পুকুরে নামেন, কেউ জেগে নাই, আমার খুব শখ মধ্যরাতে পুকুরে আপনার সাথে গোছল করি। এক মিনিট, এই দেখেন আমি আপনার পায়ে ধরতেছি, আর কোনোদিন বলবো না...

শাফকাত ভাই কোনোদিকে না তাকিয়ে বাড়ির পথ ফেলে বরইটিকির নিচ দিয়ে যে পায়ে হাঁটা সরু পথ, যে পথ পাহাড়ের বাঁকের ওপারে দিয়ে হয় ফেওলা টিলা, নয় তো জাহান্নামের দিকে চলে গেছে, সেইদিকে হাঁটতে লাগলো। আমি গলা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছি, ডুব দেবার আগে বললাম

রুমি আপা বাড়ি নাই, নানারবাড়ি গেছে...

বাতিওয়ালা বাড়ির নিচে এসে মনে হলো একবার শুনেছিলাম যৌথবাড়ি থেকে বৈদাটিলাতে আলাদা বাড়ি বানিয়ে চলে গেছেন শাফকাত ভাইয়ের আব্বা। ফের ঘুরে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগলাম। রুমী আপাদের বাড়িতেও কেউ থাকে না, তারা সব আমেরিকা চলে গেছে...

বাড়িতে উঠতে লাগলাম পুবের পথ ধরে। পুকুরে নামতে হলে এই পথেই নামতে হয়, এই পথে নেমেই রুমী আপাদের বাড়ি পৌঁছে যায় শাফকাত ভাই। রুমী আপা শুধু হাসে, হাসতে হাসতে তেজপাতা গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে মাটিতে, মাটিতে পড়েও হাসে, শাফকাত ভাই তখন ভুখা ভিখিরির মতো তাকিয়ে তাকে রুমী আপার দিকে।

তুমিও হাসো না, আমিও না শাফকাত ভাই, জানো, আমাদের খুব মানাবে, তুমি যেমন কী ভাবো সারাদিন, আমি ভাবি তোমার কথা, আমার দিকে তাকাও, দেখতো আমি তোমার কথা ভাবছি কিনা!

-বিড়বিড় করে কি বলো সুবর্ণা?

কই? না তো

-তুমি ছোট্ট একটা মেয়ে, সারাদিন ঘুরবে, হাসবে, এখানে ওখানে বেড?াতে যাবে, এক জায়গায় বসে থাকো কেন?

বসে থাকি না, আপনার আঁকাআঁকি দেখি, আর নদীপারে পাখি আঁকেন না? আর আমি এবার কলেজে যাবো শাফকাত ভাই, ছোট মেয়ে ছোট মেয়ে বলবেন না...

বড় চাচি না? কেমন আছেন?

শাফকাত ভাইয়ের আম্মা, পুরনো ঘর থেকে বেরিয়ে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন, আমি ডাকলাম, পায়ে হাত দিয়ে কদমবুসিও করলাম, চাচী ফিরেও তাকালেন না, যেভাবে উত্তরমুখি দাঁড়িয়ে ছিলেন, দাঁড়িয়ে রইলেন। হ্যারিকেন উঁচু করে ধরা, যেনো কারো অপেক্ষা বা বিদায় দিচ্ছেন, কাকে বিদায় দিবেন, আসবেই বা কে এই মধ্যরাতে!

চাচীর পেছনেই বাঁধাই করা লিচুগাছের গুড়িতে বসলাম আমি। আগে এই বাঁধানো চাতালে বসে ফুলগুটি খেলতাম, তারপর চাঁদনীরাতে সবাই গাছটিকে ঘিরে বসতাম, শুয়ে থাকতাম, দুনিয়ার গল্প সবার।

শাফকাত ভাই, তুমি কি সত্যিই রুমী আপার সাথে আমেরিকা চলে যাবে? তোমার পেইন্টিংস? চাচাচাচি?

-জানি না

এক কাজ করো, ধরো তুমি গেলে না, এই দেখো, আমার পেটে একবার হাত বুলাও, প্লিজ শাফকাত ভাই, একটা টুকটুকি আছে পেটের ভেতর, গোলাপী ফ্রক পরা টু, তুমি যদি বলো, টুকটুকির নাম পাখি রাখবো আমরা...

লিচুর মুকুল ঝরে ঝরে পড়ছে সবার মাথার উপর, গায়ের উপর, কোলের উপর। শাফকাত ভাইর ছুটি শেষ, কাল চলে যাবে সে শহরে, একটা সোনালি মুকুল তার ঠোঁটের উপর বসে থাকলো আহ্লাদ করে, কী জানি কী মনে পড়াতে একজোড়া বাদুড় সাঁই সাঁই করে উড়ে গেলো কোথাও, ঝুরঝুর করে অজ¯্র মুকুল এসে পড়তে লাগলো সবার উপর, কোনো কারণ ছাড়াই সবাই হৈ হৈ করে হেসে উঠলো... শাফকাত ভাইয়ের ঠোঁটের উপর অশ্রুকণার মতো ঝুলে আছে সেই মুকুলটি!

-তুই কাঁদছিস নাকি রে সুবর্ণা?

ধুরো ভাবি, চোখে মুকুল পড়ছে।

ঝাপসা ঝাপসা চোখেও দেখলাম তীব্র ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছে শাফকাত ভাই...

রুমী আপার চোখ সুন্দর, সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, তার ঢলো ঢলো একজোড়া নিজস্ব চাঁদ, তার জোছনাবরণ গা, তার চোখের জলও হয়তো অপার্থিব কিছু, ভোর ভোর থাকতে সেই জল মুছতে রুমী আপাদের বাড়ি যেতে দেখলাম শাফকাত ভাইকে!

...আপনার নদী পারে পাখি আঁকা শেষ শাফকাত ভাই? আবার কবে ছুটি? ছুটিতে এলেই কি রুমী আপার সাথে তোমার বিয়ে?

-সুবর্ণা না? এতো ভোরে পুকুরপাড়ে কী করো? কথা বলছো না যে।

রুমী আপা কি খুব সুন্দর করে কাঁদলো শাফকাত ভাই? তুমি কি হাত দিয়ে সেই সুন্দর কান্না ছুঁয়ে এলে এখন?

-কি সুবর্ণা, কথা বলছো না যে!

খেয়েদেয়ে ঘুমাতে যাবো, এমন সময় খুব হৈচৈ শুনলাম, জোছনারাতে এমন খামাকা হৈচৈ প্রায়ই শোনা যায় গ্রামে। পাহাড়ঘেরা গ্রাম, বাইরের হুল্লোড? তেমন ভেতরে আসে না বলে হুল্লোড় করার কোনো উপলক্ষ্যই ছাড়ে না গ্রামের লোকে। কোথাও বনের ভেতর শেয়ালের জ্বলজ্বলে চোখ দেখা গেছে, তিন মুখে গিয়ে সেটা হয়ে গেছে বাঘের চোখ। তখন খড়ের মশাল জ্বালিয়ে, শাবল, রামদা, পাকানো লাটি, পাখি মারার ছররা বন্দুক নিয়ে সারা বন তোলপাড় করা, নারকেল চোর দৌঁড়ানি, গরমকালে মধ্যরাতে জোছনার আলোয় পুকুরে ঝাপিয়ে পড়া, পানিতে চুবানো, মাছধরা...

আজকের হৈচৈ ঘরের ভেতর। ছোট চাচী প্রায় খামচি মেরে মশারির ভেতর থেকে বের করে আনেন আমাকে, তার চোখেমুখে দুইশ ওয়াটের ফিলিপ বাত্তি, আমার নাকি বিয়ে। বিলেতে থাকে বর, বিয়ে করতে গিয়ে দেখে কনে পালিয়ে গেছে তার পছন্দের মানুষের সাথে। সেইসব ঝামেলা সমাধান করতে করতে এতোরাত হয়ে গেলো আমাদের বাড়ি আসতে। বিয়ের বর শূন্যহস্তে বাড়ি ফেরা অমঙ্গল, বউ নিয়েই বাড়ি ফেরা দস্তুর। ছোট ফুফা বরের কোনো এক আত্মীয় লাগেন, তিনিই আমাদের বাড়ি নিয়ে আসেন তাদের, বরযাত্রী সবাই বাড়ি ফিরে গেছে, বরসহ দশবারোজন রয়ে গেছে বউ নিয়ে ফিরবে বলে।

চাচি শুনো

চাচী কিছুই শুনেন না, মুরুগের খুপড়ি থেকে গগনবিদারী চিৎকার আসছে, সেই শব্দে আমার চিৎকার শূন্যে মিলিয়ে যায়। বালবাচ্চা নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলো, রাতের অন্ধকারে হামলে পড়ি একের পর এক জবাই করা হচ্ছে তাদের। আমি আর কাউকে ডাকার সাহস পাই না, আর কেউ মানে তো দাদা আর দাদী। চাচা আর চাচী আমার সৌভাগ্যে আনন্দে ফেটে পড়ছে, মাত্র তিনটা মোরগ খরচ হয়েছে আমার বিয়েতে, যারা এই মধ্যরাতে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলো না। শাফকাত ভাই ছুটিতে বাড়ি ফেরার আগে আগে আমি বরের সাথে ইংল্যান্ড চলে গেলাম।

শাফকাত ভাইয়ের আম্মা তেমনি উত্তরমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। রাত প্রায় শেষের দিকে। উত্তর দিকে তাদের পথ, বাড়িতে উঠার বা নামার। শাফকাত ভাই কি এই পথ দিয়েই উঠে আসবে বাড়িতে, কবে আসবে! নাকি আসবেই না! চাচীকে ফিরে গিয়ে জিজ্ঞেস করবো কি যে শাফকাত ভাইয়ের একটা পেইন্টংস আছে ‘নদী পারে পাখি’ ঐটা কি তিনি আমেরিকা পর্যন্ত নিয়ে গেছেন, না বাড়িতেই আছে? পাখি যে কাঁদে, চাচী কি সেটা দেখতে পান!

বাড়িতে এতোগুলো ঘর, এতোগুলো মানুষ, কিন্তু কোথাও কেউ জেগে নেই। কেউ না থাকলেও দাদাজি এখুনি জাগবেন, প্র¯্রাব করে এসে ওযু করে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে হাউমাউ করে কাঁদবেন। তার এতো প্রিয় নাতি, তার বংশের সবচেয়ে সুনাম বয়ে আনা সন্তানের জন্য কাঁদবেন, খোদার দরবারে হাত তুলে ফানাহ চাইবেন, আত্মহত্যা বড় কঠিন পাপ, নাতির জন্য পাপমুক্তি চাইবেন দাদাজি।

দাদাজি ওযু করে মাত্র দাঁড়িয়েছেন, আমি উঠানে গিয়ে দাঁড়ালাম, কেনো জানি বিষম খেলেন তিনি, আমি গিয়ে জাপটে ধরলাম, তবু হুটোপুটি করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ছোটচাচী আর ময়নার মা বুবু। দুজন দাদাজিকে ধরাধরি করে চেয়ারে বসিয়ে বুকেপিঠে মালিশ করতে লাগলেন।

আমি তখনো কদমবুসি করিনি, এই অবস্থায়ও উবু হয়ে পা ছুঁলাম তার, তিনি আবার বিষম খেলেন। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, চোখে পানি চলে আসছে, বাড়ি জুড়ে জোছনারাতের মতো চিৎকার, দাদাজির কথা জড়িয়ে আসছে, তবু আমার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে লাগলেন ‘সুবর্ণা...সুবর্ণা...’

দাদিজি তার মুখে চামচ দিয়ে পানি দিচ্ছেন আর কলেমা পড়ছেন, চাচা কেঁদে কেঁদে বলছেন ‘সুবর্ণাকে একটু পরেই ফোন দিবো আব্বা, আপনি তখন কথা বলবেন, আব্বা আপনি চোখ বন্ধ করবেন না...।’

আমি ছোট চাচার দিকে তাকাই, উঠোনভর্তি বাড়ির সবাই, শাফকাত ভাইয়ের আম্মা মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে ‘শাফকাত, আমার শাফকাত...’ বলে কাঁদতেছেন, অথচ কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছেনা! কাল বিকেলে যখন খবর পেলাম শাফকাত ভাই আমেরিকাতে আত্মহত্যা করেছে, আমার এমন চায়ের তৃষ্ণা পেলো, এমন যে, মনে হলো গনগনে রোদে বসে কোথাও বসে এক কাপ চা চাই আমার। ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের রোডেই যাচ্ছিলাম, এমন সময় একটা সবুজ রঙ্গের কার! এরা যে কী করে ড্রাইভিং লাইসেন্স পায়!

তখন কি বাংলাদেশের রাত এগারোটা? তখনও কেউ দেশে জানায়নি?

ভিড়ের ভেতর দিয়ে শাফকাত ভাইদের পথের মুখে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি, মসজিদে আজান পড়ছে, ভোর হচ্ছে...