menu

রহিমা আখতার কল্পনার কবিতা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ ২০১৯
image

উদ্যত তোমার সঙ্গিনেরা

আমাকে হত্যার জন্য উদ্যত করেছো যে মারণাস্ত্র

একদিন সে নির্ভুল ঘুরে যাবে তোমার দিকেই

তোমার হাতের টিপ চিনে রেখে খুঁজে নেবে তোমার ঠিকানা

আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

আমি কৃষ্ণ আফ্রিকান, ঈশ্বরের দলিত সৃজন

আমি ফিলিস্তিনের সন্তান, স্বাধীনতা-পিপাসায় আর্ত যুদ্ধরত,

জন্মমুহূর্তেই মৃত্যুর সাথে মিতালি আমার,

আমি সিরিয়ার রক্তক্ষয়ী রণে ক্লান্ত বিধ্বস্ত বিপন্ন মানবতা

মৃত্যু-উপত্যকা আমার বসতভূমি- আমাকে বাঁচাও।

ইরাকে মরেছি আমি অজস্র সহস্রবার

ইরানে খড়গ-তলে মাথা পেতে আত্মাহুতি দিয়েছি অযুত

যুক্তরাষ্ট্রে ঘাতকের হাতে মরে যেতে যেতে

জেনেছি জন্মের পাপ, ধর্ম আর বর্ণই আমার অপরাধ।

আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

আমি বাংলার দাঙ্গায় নিহত নিরপরাধ, গৃহহীন স্বজন সুজনহীন

ভিটেমাটি স্বদেশ-হারানো অগণ্য রুদ্ধ প্রাণের অপচয়।

আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতাকামী যুবা

তিরিশ লক্ষ অমর শহীদ-

বুলেটে ঝাঁজরা বুক, বেয়নেটের খোঁচায় বিক্ষত শরীর

শরীরের নিচে কালোপানা রক্তের নহর।

অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর ধর্ষিতা গর্ভিণী আমি

আমার যোনীতে পশুর দলনে ছিন্নভিন্ন ক্লান্ত রক্তজবা।

আমি রাতারাতি রাজাসন থেকে ধুলায় লুটিয়ে পড়া পরাস্ত ভূস্বামী

যুদ্ধবিপর্যয়ে ম্লানমুখ বাংলায় সোমত্ত কন্যার ভয়ার্ত জনক

অনিবার্য বাস্তুচ্যুতি, পলায়ন, লাঞ্ছনাতিলক আমার নিয়তি

আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

আমি ধর্ষিতা রোহিঙ্গা নারী

গণধর্ষণে অলক্ষ্যে খসে গেছে অমূল্য প্রাণের সবুজ বীজ

আমি অসহায় পিতা

নামশূন্য হাজারো সন্তানের খন্ডিত লাশ পাহারায়।

আমি বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলে ভাসমান

প্রাণভয়ে পলায়নরত আরাকানবাসী, আমাকে বাঁচাও-

নিজের ভূভাগ থেকে, জন্মের মৃত্তিকা থেকে উৎখাত

আমি লক্ষ লক্ষ মৃত্যুমুখী নিরন্ন উদ্বাস্তু, আমাকে বাঁচাও

আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

আমি নাইজেরিয়ার শত শত ক্ষুধার্ত কঙ্কালপ্রায় শিশু

আমার প্রাণ-বাঁচানো অন্নের গায়ে ধর্মের পোশাক পরিয়ো না

আমাকে দিয়ো না কোনো সম্প্রদায়-আবরণ

বিপন্নতাই চূড়ান্ত লেবাস আমার- আমাকে বাঁচাও।

অন্যথায় তোমার প্রশিক্ষিত প্রাণঘাতী মারণ-দানব

একদিন পাল্টে দেবে নিজেদের গতি

আমার রক্তের ধারা বেয়ে বেয়ে ছুটে আসবেই

অদম্য ঘাতক রক্তবীজ, তোমার বিনাশ-

উদ্যত তোমার সঙ্গিনেরা ঘুরে যাবে তোমাকে নিশানা করে।

আমি যুগে যুগে ধর্মান্ধের পাশবিক হত্যাযজ্ঞে

অসহায় নরবলি- আমাকে রেহাই দাও

আমি নির্যাতিত মানবতা, দয়া করো, আমাকে রেহাই দাও।

শৈত্য

ধূমল বৃষ্টির হাতে জমা ছিলো শব্দ কিছু

শব্দগুলো শর্তমুক্ত ধার দিয়েছিলো তারা

রতিমত্ত ব্যাকুল দাদুরীদের

সঙ্গলোভী মরিয়া দাদুরীগণ প্রাণপণ ডেকেছিলো

স্বরের কুহকে চরাচর মাতিয়ে সরবে।

বর্ষাশেষে পাতা ফোটানোর উৎসব শেষ করেছিলো বট

শরৎ আর হেমন্ত খুব দ্রুত কেটে গিয়েছিলো

আনন্দদিনের মতো এক ফুঁয়ে উড়ে চলবার দ্রুততায়।

অতঃপর ‘পৌষ মাসে পোষা আন্ধি’ কুয়াশা বিছিয়ে

হিমশীত প্রবল দাপটে ছড়িয়ে দিয়েছে তার পাখা

মানুষের এই দুরন্ত দুর্দিনে উত্তাপ যোগাতে

গত বর্ষে ঝ’রে পড়া পুরনো পাতার দল

উড়ে এসেছিলো বিনাশর্তে, গাছের ছিলো না তাতে ক্ষোভ

মানুষের উষ্ণতার প্রয়োজনে পাতা খুলে দিতে

গাছেরা কখনো কৃপণতা করে নাই।

অথচ সকল আয়োজনে কোথায় যে ত্রুটি থেকে যায়-

কেন যে সকল আয়োজনে ক্রমাগত শীত জমে যেতে থাকে!

আকাশে রঙের ক্ষীণ আঁকিবুঁকি

গাছে গাছে তখনো লড়াকু শেষপাতা প্রাণপণ জেগে আছে

ধুলোটে বিকেল ভরে অপেক্ষার নীলশিখা-মোম

নিরুপায় পুড়ে পুড়ে শেষ- দেখা নেই তার,

দেখা নেই তার, যে ছড়িয়ে দেয় মৃতের আকাশে রঙধনু

কত লগ্ন বয়ে গেলো, লগ্ন এলো না তবু পুড়ন্ত শূন্য বৃন্দাবনে।

জীবনের অঘ্রাণেই মাঘের প্রবল শীত স্থায়ী হয়ে গেল তবে!

মরাপাতা ঘিরে থাকা এই জনপদে

আর তবে সূর্যোদয় কখনো হবে না- বার্তা রটে গেছে!

আমি কি একটি নিরাপদ কবরের খোঁজে

বাড়ি ছেড়ে তবে এইবেলা নেমে যাবো সহযাত্রীহীন পথে?

বলুন পরম আত্মীয় বান্ধবগণ, সম্মিলিত রায় দিনÑ

মহাকাল তার দক্ষ হাতে আমার জামায় আটকে দিয়েছে পিন

দীর্ঘতম রিক্ত শীতে বন্দি করে দিয়েছে আমার শুষ্ক আয়ুষ্কাল

অবেলায় রাত্রি এসে ঘিরেছে আমার সবুজ সকাল।

আমি তবে কাউকেই কোনোদিন বলবো না-

‘এসো সবুজের দিকে যাই’?

রুদ্ধবাক চলে যাবো, শব্দহীন ছেড়ে যাবো প্রিয়তম ঠাঁই?