menu

রফিক আজাদের ছন্দ

হাবীবুল্লাহ সিরাজী

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০
image

রফিক আজাদ তাঁর এ যাবৎ কালের কবি-কর্মে ছন্দ, উপমা, প্রতীক, চিত্রকল্প, শব্দব্যবহার বা ধ্বনিব্যঞ্জনায় কতোটুকু একজন পাঠককে কবিতার শুদ্ধ অঞ্চলে প্রবাহিত এবং প্রভাবিত ক’রতে পেরেছেন- তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে।

তাঁর প্রিয় ছন্দ অক্ষরবৃত্ত। সংযত, নিবিড় এবং গভীর এই অক্ষরবৃত্ত ছন্দ। আজাদ তাঁর অধিকাংশ কবিতার মেদহীন দেহ অক্ষরবৃত্তের শব্দপুঞ্জেই আবৃত ক’রেছেন। দৃঢ়তর জীবনের দিকে এই বহিঃপ্রকাশ এক কথায় সার্থক। নিজস্ব মেজাজে তিনি শব্দকে অভিধান, অভিজ্ঞান এবং আবহাওয়া থেকে তুলে এনে আকাক্সিক্ষত চারিত্র্য দান ক’রেছেন। তাঁর শব্দব্যবহারই সরলভাবে তাঁর কণ্ঠস্বরকে পাঠকের দুয়ারে পৌঁছে দেয় এবং এক্ষেত্রে তার ছন্দ-পছন্দও নির্ভুল। কবিতার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ মিলে যে ঢিল গভীর কূপে নিক্ষিপ্ত হ’য়েছে, তার প্রতিধ্বনি গম্ভীর এবং বিলম্বিত।

১. ‘সূর্যাস্তে শীতল চাঁদ সম্ভাবনাময় রৌদ্রে উড়ে যায়, একা-

যেন লাল কাঁকরের পথ ভেঙে, দ্রুত উঁচুনিচু-

প্রতিশ্রুত আমরাই দৌড়ে যাই কম্পমান চরণবিন্যাসে।’

২. ‘একটি চুমুর বিনিময়ে

অকাতরে

আমি বিক্রি

করেছি আমার

সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।’

সমমাত্রার পর্ব কিংবা অসমমাত্রার পর্ব- এই দুই অক্ষাংশের প্রতি তিনি সমানভাবে হাত বাড়িয়েছেন। উভয় ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যও সমান।

হাল্কা চালের স্বরবৃত্তে লেখা কবিতাগুলো একটু নরম, একটু ভিন্ন পথের যাত্রী। ‘রাহুর প্রেম’, ‘মানব যৌবন ও স্থান-কাল প্রতিবেশ’ তাঁর এ ধরনের রচনা। এখানে একটি উদ্যত ভঙ্গি আছে, একটি চ্যালেঞ্জের মনোভাব আছে : ‘অগ্রজ কি হবু রাজা সব শালাকে চ্যালেঞ্জ করি’ কিংবা ‘স্টপ প্লেয়িং- আর খেলা নয়- এবার শোনো আলটিমেটাম।’

আজাদ তাঁর অধিকাংশ কবিতার মেদহীন দেহ অক্ষরবৃত্তের শব্দপুঞ্জেই আবৃত ক’রেছেন। দৃঢ়তর জীবনের দিকে এই বহিঃপ্রকাশ এক কথায় সার্থক। নিজস্ব মেজাজে তিনি শব্দকে অভিধান, অভিজ্ঞান এবং আবহাওয়া থেকে তুলে এনে আকাক্সিক্ষত চারিত্র্য দান ক’রেছেন

মাত্রাবৃত্তেও তিনি কিছু কাজ করেচেন। ‘যদি ভালোবাসা পাই’, ‘জড় ও চৈতন্যের দ্বৈরথ’ শীর্ষক কবিতার কথা উল্লেখ্য। অবশ্য, ‘জড় ও চৈতন্যের দ্বৈরথ’ দ্বিমুখী যাত্রায় অংশীদার। মাত্রাবৃত্ত এবং স্বরবৃত্ত উভয় অঞ্চলেই একে ফেলা যায়- আর বস্তুত একে ‘স্বরমাত্রিক’ ব’ললে কি ত্রুটি হয়? ছন্দ-বৈচিত্র্যের প্রতি রফিক আজাদের ঝোঁক ‘আমার প্রধান প্রবণতা’ পর্যায়েই লক্ষণীয়।

চারুভাষার জন্য হৃদয়গ্রাহী উপমা চাই। মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্য-স্বাক্ষরে যেমন মনোহর উপমায় পুলকিত হ’তে হয়, তেমনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপমার অভিনবত্বে চমৎকৃত না হ’য়ে পারা যায় না। আবহমান সেই ধারায় যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে উপমারও আধুনিক রূপ লক্ষণীয়। দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তুর সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষার্থে কবি যে উপমার অবতারণা করেন তা কালের প্রেক্ষাপটে কবিতাকে রূপসী ক’রে তোলে। রফিক আজাদকৃত উপমার উদাহরণ : ‘অক্ষয়বটের মতো যেন নিবিড় দাঁড়িয়ে আছি’ কিংবা ‘বিষ-পিঁপড়ের মতো তোমার কথারা’ কিংবা ‘প্রোথিত বৃক্ষের মতো বদ্ধমূল আমার প্রতিভা’। এই সব তুলনা সাধারণ পাঠকের মর্মমুলে নতুন অভিঘাত সৃষ্টি করে।

প্রতীক, শব্দব্যবহার ও ব্যঞ্জনায় আধুনিক কবিমন সর্বদা তীক্ষè ও মেজাজি। শব্দের সঙ্গে শব্দের ঘর্ষণে কিংবা অবস্থানে যে ধ্বনিমালার সৃষ্টি হয়- তা-ই কবিতাকে সুখপাঠ্য ক’রে তোলে, প্রাথমিকভাবে পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এমনও দেখা গেছে, কোনো কবিতার বিষয়ের গূঢ় আবরণ ভেদ করা না গেলেও কবিতাটি ভালো লাগে। আর, এই ভালো লাগার স্পন্দনে রফিক আজাদ সর্বাংশে প্রিয় না হ’লেও অনেকাংশে হৃদয়গ্রাহী। তাঁর চয়িত শব্দনিচয়ের একটা আলাদা ঠাঁট আছে, একটা পৃথক ফ্লেভার আছে, যা বন্ধ দরোজা-জানালায়ও মৃদু স্পর্শ রাখতে সক্ষম। ‘একটি শব্দ’ শীর্ষক কবিতার অন্তর্বাচ্যে কি কবির সার্থকতা নিহিত নেই? এবং কবিকর্মের প্রতুল উপহার তো তাঁর কবিতায়-ই লেগে আছে :

১. ‘এ-রকম দেখা হ’লে দ্রাম ক’রে খুলে যায়, দ্যাখো ;

বুকের ভিতরে সব ম’র্চে-পড়া দরোজা-জানালা;’

২. ‘উত্তর-তিরিশ তুমি, তবু বউ-বউ গন্ধ ঝ’রে পড়ে দেখি

তোমার বিশদ দেহে, শরীরের ভাঁজে-ভাঁজে রাধিকা কল্লোল।’

‘দ্রাম ক’রে খুলে যায়’- যেন খোলার শব্দটিই আমাদের কানে এসে লাগে, কিংবা, ‘ম’র্চে পড়া দরোজা-জানালা’- এ যেন চোখের সম্মুখে দরোজা-জানালার একটি ক্ষয়িষ্ণু প্রতিরূপ। অন্যদিকে, প্রতীকের যে উদ্ধৃতিটি- তা তো বাংলা-কবিতার সম্যক সত্তার রূপ। কবিতা আর প্রেমিকা উলোটপালট হ’য়ে প্রতীকী ব্যঞ্জনায় এ কবিতার শরীরে প্রাণ দিয়েছে। পরস্ত্রীতে স্বভাবত কবির কাতরতা নেই, কিন্তু ‘তোমাকে’ (কবিতা) দেখার পর কাতরতা বেড়ে গেছে। কবিতা নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী হ’য়ে উভয় উভয়ে মজ্জমান। উত্তর-তিরিশ এই নারীর দেহে যেমন এখনও ‘বউ-বউ গন্ধ’, তেমনি কবিতার ‘শরীরের ভাঁজে-ভাঁজে রাধিকা কল্লোল’। নারীর প্রতীকে ‘ত্রিশোত্তর বাঙলা কবিতা’কে কবি চিত্রায়ণ করেছেন অপূর্ব রেখায়।

চিত্রকল্প কবিতার দৃশ্যমান রূপ। কবি তাঁর মনোজগতের, স্বপ্নরাজ্যের, বাস্তব উপলব্ধির, সামাজিক পরিস্থিতির বর্ণাঢ্য উপস্থাপনা করেন তাঁর কবিতায়। রফিক আজাদের কবি-কীর্তিতে কল্পনার যে রং (গাঢ় বা ধূসর) তিনি কবিতায় লাগিয়েছেন তা আমাদেরকে একটি স্বচ্ছ চিত্র উপহার দেয়। দৃষ্টির তীক্ষ্ণ তীর যে রক্ত ঝরায় তা কবিকেও সম্পৃক্ত করে।

১. ‘ঈথারের গন্ধ শুঁকে-শুঁকে, সহস্র সোদর চাঁদ

নিরিবিলি ঝ’রে পড়ে, মধ্যরাতে, মাঠের বিজনে।’

২. ‘সাজানো বাগানে ঝলমলে আলোকের চাষ ক’রে

অভিজ্ঞতা আছে,- প্রত্যুষের কোমল, পাতলা, মিহি

সুগন্ধি রোদের চাষ।’