menu

রফিক আজাদ: মুক্তিযুদ্ধের কবিতা ও টুকরো অতীত

সুশান্ত মজুমদার

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২০
image

আমার সৌভাগ্য যে রফিক আজাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ গ্রন্থটি প্রকাশে আমি সংশ্লিষ্ট ছিলাম। প্রথমে সন্ধানী প্রকাশনী পাঁচজন লেখকের মুক্তিযুদ্ধের স্বতন্ত্র গল্পগ্রন্থ বের করে। ২০১১ সালে প্রকাশক গাজী শাহাবুদ্দিন আহমদ পাঁচজন কবি’র পাঁচটি মুক্তিযুদ্ধের কবিতার বই প্রকাশে উদ্যোগী হন। অতএব, সন্ধানীর সঙ্গে জড়িত থাকার সুবাদে আমাকেও দায়িত্ব নিয়ে সক্রিয় হতে হয়। আমি জানতাম, রফিক আজাদের একটি কবিতা পাওয়ার জন্য পায়ের চাপে রাস্তা নিচু হয়ে যায়। তাঁর চেয়ার-টেবিল বারবার আসা-যাওয়ার মানুষটি দেখতে দেখতে চিনে ফেলে; কিন্তু শূন্য হাতে ফিরতে দেখে তারাও দুঃখে ঢলে পড়তে চায়। হতে পারে, এমন কষ্ট ও ক্লান্তির মধ্যে সবাইকে পড়তে হয়নি। সাপ্তাহিক সচিত্র সন্ধানীতে বিশেষ সংখ্যার জন্য কবিতা পেতে আমার অভিজ্ঞতায় আয়াশ প্রাপ্তির কিছু ছিল না। কবিতা চাইলেই ছাপার উদ্দেশে কবিতা দেয়ার কবি তখন তিনি ছিলেন না। পরবর্তীকালে সহসা কবিতা দিতেন কিনা আমার জানা নেই। তবে কবিতার জন্য রফিক আজাদ ছিলেন যথাযথ অধ্যবসায়ী। ষাটের দশকে নতুন ধারার নতুন বিষয়ের নতুন আঙ্গিকের কবিতাচর্চার আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম নেতৃস্থানীয় শরিক। বিষয়ানুযায়ী যথাযথ ছন্দ-শব্দ প্রয়োগে তিনি ছিলেন নিয়ত যতœশীল ও তন্নিষ্ঠ।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে রফিক আজাদ তাঁর লেখা কবিতা বাছাই করে পা-ুলিপি তৈরি করতে উপর্যুপরি অনুরোধে আগ্রহী হলেও আমি জানতাম এমন নিরলস কাজে ব্যয় করবেন তিনি বহুদিন। একুশের বইমেলায় বইটি পাঠকদের হাতে যাবে। বাধ্য হয়ে তাঁর অনুমোদন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কবিতার একটি পাণ্ডুলিপি করে তাঁকে দেখালাম। তিনি তখন জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক। দাপ্তরিক ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি পাণ্ডুলিপি দেখে গ্রন্থে ছাপার জন্য কয়েকটি কবিতার নাম বললেন। তাঁর সঙ্গে কথপোকথনে গ্রন্থভুক্ত বিষয় নিয়ে আমার মনোভাব ব্যক্ত করি। বললাম: মুক্তিযুদ্ধের কবিতা মানে সব যুদ্ধের কবিতা- এই ধারণার পরিবর্তন দরকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কবির চিন্তায়-হৃদয়ে-আলোড়নে এবং তা প্রকাশে কেবল একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আমার জন্য স্বস্তির যে ভিন্নমত পোষণ করার সম্ভাবনা তিনিও নাকচ

ষাটের দশকে নতুন

ধারার নতুন বিষয়ের নতুন আঙ্গিকের কবিতাচর্চার আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম নেতৃস্থানীয় শরিক। বিষয়ানুযায়ী যথাযথ ছন্দ-শব্দ প্রয়োগে তিনি ছিলেন নিয়ত

যত্নশীল ও তন্নিষ্ঠ

করে দিলেন। আমি কখনো রফিক আজাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আড্ডা ও সখ্যের সুযোগ পাইনি। সাপ্তাহিক রোববার পত্রিকা সম্পাদনার সময় আমার লেখা একটি ছোটগল্প তাঁকে দিয়েছিলাম। কয়েক মাস পরও গল্পটির ভবিষ্যৎ আমি জানতে পারিনি। তখন তিনি বাংলা একাডেমিতেও ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকার কাজ করতেন। এক বিকেলে বাংলা একাডেমির সামনে তাঁকে একা পেয়ে যাই। আমার গল্পটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন- ওটা ছাপা হবে না। আমি জানতে চাই- তাহালে গল্পটি অমনোনীত হয়েছে। রফিক আজাদ জানালেন- না, গল্পটি মনোনীত হয়েছে বলে ছাপা হবে না। এমন অদ্ভুত কথা মনে হয় কবিকেই মানায়। পরে রফিক আজাদের অনুপস্থিতিতে তাপস মজুমদার আমার গল্পটি রোববারের এক বিশেষ সংখ্যায় ছেপেছিলেন। রফিক আজাদের সঙ্গে নীলক্ষেতে দেখা হলে বললেন- দিলাম তো। ঘাড়ে হাত রেখে গাঢ় স্নেহস্বরে বললেন- তোমার পরীক্ষা নিলাম। তুমি বেশ সিরিয়াস।

২০০৮ সালে ‘ধানসিঁড়ি’ ও ‘দূর্বা’ দু’টি লিটল ম্যাগাজিন যৌথ উদ্যোগে আমাকে কথাসাহিত্যে এবং কামাল চৌধুরীকে কবিতায় জীবনানন্দ দাশ সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে। পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তা ছিলেন বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সভাপতি জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। অনুষ্ঠানের শুরুতেই সভাপতি নিজস্ব জরুরি কাজে চলে যাবেন জানিয়ে তাঁর কথা অগ্রিম বলতে চান। বক্তৃতায় জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী বললেন: সুশান্ত মজুমদারের নাম আমি আগে শুনিনি। তাঁর লেখাও পড়িনি। মনে হয়, তিনি ভালো লেখেন, নইলে তাঁকে পুরস্কার কেন দেয়া হচ্ছে? সভাপতি আরো কয়েক লাইন বক্তৃতা রেখে চলে গেলেন। আমি ভাবছিলাম, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর সম্পাদনায় সংবাদ-এর প্রযোজনা ও ঠিকানা থেকে ‘সুন্দরম’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের হয়েছিল। ওই পত্রিকায় আমার একাধিক লেখা ছাপা হয়েছে। হতে পারে তিনি বয়সী মানুষ, স্মরণে সব লেখকের নাম ঠাঁই দেয়া সব সময় সম্ভব না। রফিক আজাদ বক্তব্যের শুরুতেই বললেন- সম্মানিত অনুপস্থিত সভাপতি। অনুষ্ঠানস্থল জাতীয় জাদুঘরের মিলনায়তন জুড়ে হাসির রোল পড়লো। রফিক আজাদ অনুষ্ঠানের আয়োজকদের এবার বাক্যবাণে বিদ্ধ করলেন। পুরস্কার প্রাপকের নাম জানেন না, তাঁর লেখা পড়েননি, এমন মানুষকে কেন অনুষ্ঠানের সভাপতি করতে হবে? এই বরেণ্যজনরা এখন অনুষ্ঠানের অলংকার হয়েছেন। কিন্তু অলংকারপ্রীতির সঙ্গে সাহিত্যের কোনো সম্পর্ক নেই। রফিক আজাদকে আমার পক্ষে কী ভুলে যাওয়া সম্ভব! স্পষ্ট কথা বলার জন্য আমার স্মৃতিতে তিনি আয়ুষ্মান থাকবেন।

এক বছর পর ২০০৯ সালের ঘটনা। ফেব্রুয়ারি মাস। তারিখ মনে নেই। আমার কর্মস্থল গাজী ভবনের অফিসে বসে রাতে আড্ডা দিচ্ছিলাম। অফিস লাগোয়া হলরুমে ডেনমার্ক-প্রবাসী শিল্পী বাংলাদেশী কাজলের একটি অনুষ্ঠান চলছিল। হঠাৎ দেখি, অফিস ও হলরুমের মধ্যের দরজা দিয়ে রফিক আজাদ ভেতরে ঢুকছেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি যে উপস্থিত আদৌ আমি জানি না। খুব চমকিত হই। কাছে এসে আমাকে তিনি অভিনন্দন জানালেন। বিষয় কী? এইমাত্র তিনি মোবাইল ফোনে জেনেছেন, কথাসাহিত্যে আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছি। তিনি আমাকে টেনে নিলেন। হাত ধরে অনুষ্ঠানের মঞ্চে উঠে গেলেন তিনি। মাইক্রোফোনে সবাইকে এই পুরস্কারপ্রাপ্তির কথা জানালেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি জড়সড়। বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদানের বিকেলে স্বল্পসংখ্যক দর্শক-শ্রোতার মধ্যে লক্ষ করি তিনি সামনের সারিতে উপস্থিত। দুই-চার বাক্যে বক্তৃতা দিয়ে নিচে আসার পর তিনি তাঁর সঙ্গীকে বললেন- বলেছি না, সুশান্তর বক্তব্য এডিট করার প্রয়োজন নেই। আজো আমার কানে সংগোপনে হৃদয়ভূত এই কথা প্রায়শই বাজে। আমি ভেতরে ভেতরে প্রাণিত হই।

রফিক আজাদের ছোট একটি কবিতা আমার মধ্যে ঘুরেফিরে নাড়া দেয়। আমার পক্ষে কোনো দিনই ভোলার নয়। পড়ার পর মন ও মস্তিষ্ক দখল করে ফেলে। স্বামী-স্ত্রী রাতে মিলনের আকাক্সক্ষায় পরস্পর যখন ঘনিষ্ঠ হয়েছে, তখনই মনে পড়লো আজ কালরাত্রি, ২৫ মার্চ, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা যজ্ঞ শুরু। নস্যাৎ হয়ে যায় তাঁদের মিলনের ইচ্ছা। এই কবিতার বিষয় আমি কবিকে একাধিকবার বলেছি। প্রতিবার তিনি তাঁর গোলমুখে মৃদু হাসি ধরে রেখেছেন। আমি চেষ্টা করেছি, রফিক আজাদের কবিতা খুঁজে খুঁজে পড়ার। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের নাম পড়েই সজ্ঞান পাঠক উপলব্ধি করতে পারবেন, এই কবির কবিতা স্বতন্ত্র, তাঁর কাব্যভাষাও পৃথক। অসম্ভবের পায়ে, সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে, চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া, সশস্ত্র সুন্দর, একজীবনে, প্রিয় শাড়িগুলি, হাতুড়ির নিচে জীবন, পরীকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ, খুব বেশি দূরে নয়, গদ্যের গহন অরণ্যে হারিয়ে যাওয়া আমি এক দিগ্ভ্রান্ত পথিক, অপর অরণ্যে, ক্ষমা করো বহমান হে উদার, অমেয় বাতাস কাব্যগ্রন্থগুলি সময়ের কঠিন প্রহার সহে মননে দীর্ঘজীবী হবে। ত্রিশের নতুন ধারার কবিতা বিভাগোত্তর এই ভূখণ্ডে যে ক’জনের হাতে সম্প্রসারিত হয়েছে রফিক আজাদ তাঁদের মধ্যে অবশ্যই একজন শক্তিমান কবি।

প্রস্তুতি শুরু হলো রফিক আজাদের মুক্তিযুদ্ধের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা প্রচ্ছদ। কবিতা সংগ্রহ, কবিতার প্রুফ দেখবো আমি। শেষাবধি কবিতা বাছাইও করতে হয়েছে। কবি গ্রন্থকেন্দ্রের কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ হঠাৎ গিয়েও তাঁকে পাওয়া যেত না। বইমেলার বাকি আর সপ্তাহ দুই। তাঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ থেকে ঊনচল্লিশটি কবিতা গ্রন্থভুক্ত করা হলো। এবার প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের কবিতা বিষয়ে কবির লেখা একটা ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধের কবিতা নিয়ে নিজস্ব প্রতিক্রিয়া তিনি জানাবেন। শামসুর রাহমান লিখেছিলেন। তাঁর বইটি বেরিয়েছে আগে। বেলাল চৌধুরী, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ স্ব স্ব মুক্তিযুদ্ধের কবিতা গ্রন্থের ভূমিকা লিখলেন। কিন্তু রফিক আজাদ লেখেননি। বইয়ের ফ্ল্যাপ লিখতে হলো আমাকে। বইয়ের ব্যাক কভারে কিছু কথা জুড়ে দিলাম। এখনকার পাঠকের জন্য তুলে ধরছি: ‘উনিশ শ’ একাত্তরে লড়াকু বাঙালি জাতির সশস্ত্র যুদ্ধ সে এক গৌরবময় শ্রেষ্ঠ কীর্তির রক্তাক্ত সেই জীবনপণ সংগ্রামে একটি নতুন দেশ নির্মাণে আমাদের দিতে হয়েছে লক্ষ প্রাণের চরম মূল্য। প্রতি মুহূর্তে তখন মৃত্যুর বিভীষিকা। বেয়নেটবিদ্ধ দুঃসময়ের নয় মাসের অভিজ্ঞতায় আমাদের কবিরা রচনা করেছেন মৃত্যুতাড়িত অথচ সংগ্রামশীল মুক্তিযুদ্ধের পঙ্ক্তিমালা। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের জায়মান অনিঃশেষ চেতনা যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা, অন্যায্য সামরিক শাসন, সাম্প্রদায়িকতা-মৌলবাদ-স্বৈরাচার বিরোধিতা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। এই বিষয়ের কবিতাও স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ও মানবতার জয়গান হয়ে নতুন নতুন কাব্যশৈলীতে রূপান্তরিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের দীপ্ত চেতনার সারাৎসার নিয়ে আমাদের কবিদের কবিতা তাই দশকে দশকে লিখিত হতে থাকবে।’

এদেশে বইয়ের ফ্ল্যাপ লেখেন অধিকাংশ লেখক। নিজের লেখা সম্পর্কে তাঁরা দামী দামী কথা লেখেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের কবিতা সিরিজের একজন কবিও নিজের ফ্ল্যাপ লেখেননি। যথারীতি দায়িত্ব পড়ে আমার মতো কবিদের তরুণ বন্ধু উপর। রফিক আজাদের ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ গ্রন্থের ফ্ল্যাপে যা লিখেছি এখানে তা পাঠক সমীপে পেশ করছি:

“ষাট দশকের অস্তিবাদী কবি রফিক আজাদ সামাজিক চেতনা থেকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর কবিতার জন্য নিজস্ব বিশ্বাসের ধ্রুবলোক। বিরোধী পারিপার্শ্বিকতার দুঃসময়, মানবতার অসহায়ত্ব, জীবনের জটিলতা ধারণ করে রফিক আজাদের কবিতা হয়ে ওঠে সত্তাসম্পন্ন। তাঁর আত্মসচেতনতা শেষাবধি দেশ-কালের সম্বন্ধ স্বীকারের গভীরতায় গিয়ে পৌঁছেছে। দেশীয় পরিপ্রেক্ষিত, মানুষের রুগ্ণ রূপ তিনি যেমন পতনোন্মুখ দেখেছেন, তেমনি স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের জীবনযাত্রার রূদ্ধশ্বাস এবং ক্ষয়ের আক্রমণকে দেখেছেন বিভিন্ন প্রতীকে।

মানুষের আপতিক খ-তার জন্য সমাজও দায়ী। কবি এ-বিষয়ে যতই অবহিত হন ততই বিষয়বস্তু ও আধারের বিস্তার ঘটে, অধিকন্তু জীবনের ধারা বহুমিশ্রিত সমগ্রতা পায়। আর সমগ্রের বিকাশের অসীম সম্ভাবনায় শিল্পীর শিল্পী হিসেবে পরিণতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।

রফিক আজাদ একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা-উত্তর দেশের প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহ, মানুষের স্বপ্নভঙ্গ, পরাজিত শক্তির উত্থান নিয়ে তাঁর অস্বস্তি ও বিরোধিতা, গণতন্ত্র নস্যাৎ করা অন্ধকারের শাসন এবং সাধারণ মানুষের মনোজগতের আর্তি। জীবনের প্রত্যক্ষের উপর বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত ব’লে তাঁর কবিতার মধ্যে প্রাণ-প্রাবল্য উচ্ছলিত। এই গ্রন্থে কবি রফিক আজাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসঞ্জাত কবিতাসমূহ পাঠকের জন্য এক নতুন চিন্তার উদ্বোধন।”

ছাপার আগে লেখাটি রফিক আজাদকে পড়তে দিই। পড়ে আমার দিকে কবি যখন অপলকে চেয়েছিলেন ভেতরে ভেতরে আমি ঘামছিলাম। এই বুঝি তাঁর অপছন্দের কথা আমাকে জানান। অফিসের পিয়নকে ডেকে বললেন- ওকে এক প্লেট ফল খাওয়াও। সেই কবিসুলভ ব্যতিক্রমি আপ্যায়ন। পরে অবয়বের কাঠিন্য সরিয়ে অভ্যস্ত জড়িতস্বরে তিনি বললেন- তাঁর কবিতাই তাঁর কাছে গদ্য। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন তাঁর প্রিয়বন্ধু সৌমিত্র মিত্রকে।

বইয়ের সূচনা কবিতাটি হচ্ছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ঘাঁটি এলাকা ‘স্মৃতিময় সখীপুর।’ ঘন গাছপালা ঘেরা সখীপুর, ক্যাম্পজীবন, যুদ্ধ পরিচালনার স্থান এবং স্বনামে সহযোদ্ধারা কবিতার বিষয়। যুদ্ধে অংশ নিয়ে কবি ট্রিগারে আঙুল রেখে বুঝে নিতে চাইছেন- ‘এই যুদ্ধ ন্যায় যুদ্ধ।’ তাঁর উপলব্ধি, ‘বিশ্বাসঘাতক নয়, আজ সৌন্দর্যের প্রকৃত প্রেমিক চাই।’ কবি অবলীলায় তাই মরণপণ লড়াইয়ের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলছেন: ‘নেবে স্বাধীনতা?- নাও, তোমার দু’হাতে তুলে দিচ্ছি ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভেতরে যা কিছু- জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে- সব কিছু তোমার।’ যুদ্ধোত্তর স্বাধীন, পরিবর্তিত বাংলাদেশ কবিকে দিয়েছে বিবিধ বোধ-প্রতিক্রিয়া-উত্তেজনা-প্রতিজ্ঞা-ভারাক্রান্ত অনুভূতিও। বিরুদ্ধ ভ্রুকুটির মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কবি মনোবল হারান না, তিনি ঠিকই প্রাণিত হ’ন। ভাষা আন্দোলন ও বিজয়ের মাস তাঁর কাছে- ‘বছরের দুই মাস- ফেব্রুয়ারি আর ডিসেম্বর/ অজেয় বাঙালি সত্তা স্পর্ধাভরে সুখস্বপ্নে কাটে।’ ‘মুক্তি ও চেতনা’ কবি’র কাছে ‘আমার দুই কন্যা।’ রবীন্দ্রনাথও কবি’র আরাধ্য। তিনি বাঙালির উজ্জ্বল আশ্রয় ও উদ্ধার। রফিক আজাদের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ, ‘সর্বদাই প্রাসঙ্গিক তিনি আমার জীবন-বেদে/দুর্দিনে ও দুঃসময়ে- প্রাণে পাই শক্তি ও সাহস।’

পরিবর্তিত স্বদেশের উপর কাঠামোর অস্থিতিশীলতা, ছিন্নভিন্ন মুক্তি-উন্নয়ন-ত্রাণ কবি’র মনোযোগের আড়ালে থাকে না। নিষ্ঠুর বাস্তবতা নিয়ে তিনি স্পষ্ট দেখছেন: ‘শিশু হত্যা, নারী হত্যা, নেতৃ হত্যা থেকে ক্রমাগত/ নিহতের তালিকাটি দীর্ঘ হতে থাকে- / স্বদেশের রাজপথে ট্যাংকে রক্তচক্ষু ঘাতকের জীপ।’ বিপথগামী, বিভ্রান্ত, স্বার্থান্বেষী, বিদেশী চক্রান্তের অংশীদার সেনাবাহিনীর একাংশ রাতের অন্ধকারে হত্যা করে জাতির পিতাকে। অন্যায্য ইতিহাসলাঞ্ছিত সপরিবার নিধনে সিঁড়িতে পড়েছিল মহানায়কের মরদেহ। রফিক আজাদ লিখেছেন: ‘এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে/ সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছে-/ বত্রিশ নম্বর থেকে সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে/ অমন রক্তের ধারা ব’য়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।’ ক্রমশ রাজ্যপাটে দেশ শাসনে চেপে বসে অগণতান্ত্রিক ও একাত্তরে পরাজিত যৌথশক্তি। সমাজে দেখা দেয় আপোসকামী, পরনির্ভরশীল, চরিত্রহীন নতুন শ্রেণি। চরম অরাজকতার মধ্যে নষ্ট-ভ্রষ্টদের শ্রীবৃদ্ধিও কবি’র দেখা ও লেখা থেকে বাদ যায়নি। রফিক আজাদ নির্দ্বিধায় জানিয়ে দেন তাঁর প্রতিবাদী পঙ্ক্তিবদ্ধ কথন: ‘আমার বৈভব নেই, কিংবা এমন যোগ্যতা নেই/কোনো বহুজাতিক সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হয়ে/দেশি কর্ণধারদের বিলাসোপরকরণ যুগিয়ে/আমিও গোছাতে পারবো নিজের আখের / কেনইবা করবো তা, আমি মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক- আমার শিরায় আছে বিদ্রোহের প্রজ্ঞা ও সাহস।’

মুক্তিযোদ্ধা কবি রফিক আজাদ তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ের কাব্যগ্রন্থের ঊনচল্লিশটি কবিতায় নয় মাসের লড়াই, একাত্তরের পূর্বাপর প্রতিটি সামাজিক আলোড়ন এবং তার তরঙ্গ সংক্ষুব্ধ দ্বন্দ্ব স্বীয় অন্তর্লীন ধ্যানানুভূতিতে ধারণ করেছেন। এ-বড় আশ্চর্যের, রফিক আজাদের কবিতার অনেক পাঠকও তাঁর এই ‘মুক্তিযুদ্ধের কবিতা’ গ্রন্থটি সম্পর্কে কিছুই জানেন না।