menu

যে আছে কাছে

রেজাউল করিম খোকন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ ২০১৯
image

শিল্পী : মাসুম চিশতি

আজ রুমকির জন্মদিন। মেয়ে বড় হয়ে গেছে। সামনেই তার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোবে। এতো বড় মেয়ের জন্মদিন পালন করতে রুমকির বাবা-মায়ের তেমন আগ্রহ না থাকলেও মেয়ের বিশেষ আবদার রাখতেই ছোটখাটো আয়োজন করতে হয়েছে। রুমকি কয়েকজন সহপাঠী বান্ধবীকে দাওয়াত করেছে। রুমকির আম্মা চমৎকার মোরগ পোলাও রান্না করেন। ওর বান্ধবীরা আগেও বেশ কয়েকবার খেয়েছে। তাদের অনুরোধেই রুমকি মায়ের কাছে জন্মদিন উপলক্ষে মোরগ পোলাও রান্নার আবদার করেছিল। আর ক’দিন বাদেই রেজাল্ট বেরোবে, স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে মেয়ে কলেজের আঙ্গিনায় পা রাখবে। রুমকিকে নিয়ে ওর বাবা-মায়ের অনেক উচ্চাশা। ক্লাসে বরাবরই খুব ভালো রেজাল্ট করে আসা এই মেয়েটিকে নিয়ে স্কুলের স্যাররাও বেশ আশাবাদী। মফস্বল শহরের স্কুল হলেও গত বেশ কয়েক বছর ধরে চমৎকার ফলাফল করেছে ছাত্রছাত্রীরা। রুমকি নিজেও তার ভালো রেজাল্টের ব্যাপারে অনেকটা আত্মবিশ্বাসী। বেশ ভালো পরীক্ষা দিয়েছে সে।

বান্ধবীদের পাশাপাশি আসিফকেও ওদের বাসায় আসতে বলেছে রুমি। আসিফ রুমকির সহপাঠী না হলেও ওর খুব কাছের একজন। কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। স্থানীয় নাহলেও এই মফস্বল শহরে আসিফরা আছে বহু দিন ধরে। ওরা বাবা সরকারি অফিসে চাকরি করেন। মাঝারিগোছের কর্মকর্তা। বদলির চাকরি হলেও রুমকিদের এই মফস্বল শহরে আসিফের বাবার পোস্টিং হয়েছে প্রায় নয় দশ বছর। এর মধ্যে অন্য কোথাও বদলির অর্ডার হয়নি। ওদের পুরো পরিবার এ কারণেই অনেক দিন ধরে রয়েছে এখানে।

স্কুলে নিয়ামত স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ে অনেক ছেলেমেয়েই। রুমকি অনেক দিন থেকেই নিয়ামত স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ছে। অংকটা, বিশেষ করে জ্যামিতিটা বুঝতে ওর বেশ সমস্যা হতো প্রথম দিকে। স্যার অনেক যত্ন নিয়ে পড়ান তার সব ছাত্রছাত্রীকে। আসিফও নিয়ামত স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তো। অংকে খুব ভালো আসিফ। রুমকির কয়েক ক্লাস সিনিয়র লাজুক টাইপের মেধাবী ছাত্রটিকে স্যার বেশ পছন্দ করেন। মাঝে মধ্যে আসিফের পড়া শেষ হয়ে গেলেও রুমকির জ্যামিতিক সম্পাদ্য-উপপাদ্যগুলো ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়ার দায়িত্ব দিতেন স্যার। প্রথমদিকে আসিফ এবং রুমকি দু’জনেই বেশ বিব্রতবোধ করতো। কেউ কারও কাছে সহজ হতে পারতো না। এমনিতেই মফস্বল শহরের ছেলেমেয়েরা বড় বড় শহরের ছেলেমেয়েদের মতো ততোটা স্মার্ট হয় না। স্কুল-কলেজে একসঙ্গে পড়লেও সহজভাবে মেলামেশা করার ব্যাপারে দু’পক্ষই লজ্জা ভয় সংকোচ নিয়ে থাকে।

আসিফকে জ্যামিতি বোঝানোর দায়িত্ব দিয়ে ভুল করেননি নিয়ামত স্যার। অল্পদিনেই জ্যামিতির সব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছিল রুমকি। সেই থেকে রুমকির সঙ্গে আসিফের একটা সম্পর্ক হয়েছিল। আসিফ এসএসসির পর স্কুল পেরিয়ে কলেজ ঢোকার পরও ওদের সম্পর্কে ভাটা পড়েনি। বরং দিনে দিনে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দু’জনের মনে ভালো লাগার অন্যরকম একটা অনুভূতি ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। এটা রুমকি এবং আসিফ দু’জনই অনুভব করছে আজকাল। এর মধ্যে একদিন বান্ধবীদের সাথে শহরের শেষ প্রান্তে শিমুলতলী নদীর পাড়ে বেড়াতে গিয়েছিল রুমকি। খবর পেয়ে আসিফও সেখানে গিয়ে হাজির। বান্ধবীদের মধ্যে কেউ কেউ আসিফ রুমকির সম্পর্কের ব্যাপারটা জানে। তার পরেও ওখানে এভাবে আসিফকে দেখে বেশ লজ্জা পেয়েছিল রুমকি। প্রথমে লজ্জা পেলেও পরে এক ধরনের ভালোলাগার শিহরণ ওর সারা শরীরে বয়ে গিয়েছিল। বান্ধবীদের প্রশ্রয়ে এবং সুযোগ করে দেওয়ায় রুমকি এবং আসিফ শিমুলতলী নদীর পাড় ধরে বেশ অনেকক্ষণ হেঁটেছিলো। নদীর উথালপাথাল হাওয়ায় রুমকির চুল উড়ছিলো। আসিফ হাঁটতে হাঁটতে মুগ্ধ দৃষ্টিতে মাঝে মাঝে রুমকির দিকে তাকিয়ে দেখছিল।

রুমকির কাছে ব্যাপারটা ভালো লাগলেও অনেকটা খুনসুটির সুরে কথা বলছিল। ‘অ্যাই ছেলে, কি দেখছো এমন করে, মনে হয় জীবনে কোনো দিন মেয়ে মানুষ দেখো নাই।’

রুমকির কথায় থতমত খেয়ে যায় হঠাৎ, তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আসিফ বলে, ‘নাহ, মানে তোমাকে এভাবে কোনো সময় দেখার সুযোগ হয়নি, অনেকের ভিড়ে তোমাকে দেখে আসছি, দেখো, এই নদীর পাড়ে অনেক দূর পর্যন্ত কোনো মানুষজন নেই। এখানে শুধু তুমি আর আমি। আমার খুব ভালো লাগছে। ইচ্ছে করছে’,

কী ইচ্ছে করছে’ কাঁপা গলায় জানতে চায় রুমকি।

‘তোমর হাতটা ধরতে ইচ্ছে করেছে ভীষণ।

আসিফের কথা শুনে রুমকির মনের মধ্যে কী যে তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। জীবনে প্রথম একটা ছেলে ওর হাত ধরতে চাইছে, আর ছেলেটা তার খুব পছন্দের একজন, যাকে তার ভীষণ ভালো লাগে। কৈশোর পেরিয়ে সদ্য যৌবনে পা রাখা মেয়েদের জীবনে এ ধরনের কিছু মুহূর্ত আসে যখন তারা আবেগের জোয়ারে ভেসে যেতে চায়। তখন অনেক সর্বনাশা কান্ড করে ফেলে। রুমকি অবাক চোখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে আসিফের দিকে। তারপর নিজেই হাত বাড়িয়ে আসিফের হাতটা ধরে। এর আগে কোচিং ক্লাসে জ্যামিতি বোঝানোর সময় নানা ভাবে একজনের সঙ্গে আরেকজনের হাত ছোঁয়াছুয়ি হয়েছে অনেকবার। কিন্তু আজ এই মূর্হূতে আসিফের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্তভাবে ধরে রাখতে গিয়ে অদ্ভুত এক শিহরণ ছড়িয়ে পড়তে থাকে রুমকির সারা শরীরে। এর আগে এ রকম অনুভূতি হয়নি ওর কোনো সময়ে। নদীর পার ধরে হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেক দূর চলে আসার পর আসিফ এবং রুমকির খেয়াল হয়, এবার ফেরা দরকার। রুমকির বান্ধবীরা হয়তো এতোক্ষনে বাড়ি ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে। দ্রুত পা চালিয়ে রুমকিও আসিফ ফিরে আসে। দু’জনের হৃদয়ে তখন তোলপাড় বয়ে যাচ্ছে। জীবনে প্রথম একজন মেয়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনের না বলা অনেক ভালো লাগার কথাগুলো বলার অভিজ্ঞতা আসিফকে নতুন একজন মানুষে পরিণত করেছে। এতোদিন গল্প উপন্যাস সিনেমায় এ ধরনের ঘটনার বিবরণ পড়েছে, দেখেছে। আজ নিজেই তেমন অভিজ্ঞতা অর্জন করলো প্রথম। রক্তের প্রতি কণায় এক ধরনের টগবগে উত্তেজনাময় অনুভূতি কেবলই তাড়া করছে এই মুহুর্তে।

সেই থেকে আসিফ রুমকির সঙ্গে স্কুল-কলেজে যাবার পথে দেখা হলে যতোটা সুযোগ মেলে তার মধ্যেই মনের নানা কথা, ভাললাগা, মন্দ লাগার অনুভূতি জানায়। ব্যাপারটা এর মধ্যে অনেকেরই চোখে পড়েছে। ছোট্ট মফস্বল শহরের গন্ডিটাও সীমাবদ্ধ। এখানে সবাই সবাইকে চেনে। একজনের হাঁড়ির খবর অন্যজন খুব সহজেই জেনে যায়। রুমকির বাবা-মায়ের কানেও তাদের মেয়ের সঙ্গে কলেজ পড়ুয়া ছেলে আসিফের গড়ে ওঠা সম্পর্কের ব্যাপারটাও পৌঁছেছে। মেয়েকে কয়েকবার ধমক দিয়েছেন ওর মা। সাবধান করে দিয়েছেন কড়া ভাষায় আবার যদি ওই ছেলেটার সঙ্গে কথা বলিস কিংবা যোগাযোগ করিস তাহলে কিন্তু তোর পড়াশোনা বন্ধ করে ঘরে বসিয়ে রাখবো না, সোজা বিয়ে দিয়ে দেবো, তোর আব্বুর যা রাগ, কোন কান্ড করে বসে আবার। ওই পাজি ছেলেটার বাবাকেও সাবধান করে দিয়েছে, ছেলেটা উল্টাপাল্টা করলে পিটিয়ে হাত পা ভেঙ্গে দেবে বলে এসেছে।

মায়ের কথাগুলো শুনে বুক ফেটে কান্না পায় রুমকির। বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের মেয়ে হওয়ায় কোনো সময়েই তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেননি তারা। কড়া ধমক দিতে হয়নি পড়াশোনার জন্য। ক্লাস ওয়ান থেকে বরাবরই ভালো রেজাল্ট করে আসা রুমকিকে নিয়ে ওর বাবা-মায়ের মনে যেমন অনেক স্বপ্ন, উচ্চাশা। তেমনিভাবে ছোট এই মফস্বল শহরের চেনা জানা বন্ধুবান্ধব আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে রুমকির আলাদা কদর। সবাই তাকে বেশ পছন্দ করে। হাসিখুশি শান্তশিষ্ট ভদ্র মিশুক স্বভাবের একজন মিষ্টি মেয়ে হিসেবে স্কুলের সব টিচাররা রুমকিকে বিশেষ যতœ নিয়ে পড়ায়। এসএসসি পরীক্ষায় ওর ভালো রেজাল্টের ব্যাপারে কারও মনে কোনো সন্দেহ নেই।

আসিফের সঙ্গে ওর জানাশোনা এবং ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হওয়ার ব্যাপারটা ওদের পরিবারে জানাজানি হওয়ার পর থেকে সবাই রুমকিকে চোখে চোখে রাখলেও অনেক সময় সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে সে আসিফের সঙ্গে দেখা করে, টুকটাক কথা বলে নিজের মনের নানা অনুভূতির কথা জানায়। আসিফও রুমকিদের পরিবারের চোখ রাঙানিতে কিছুটা ভয় পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। আসিফের বাবা খুবই নরম স্বভাবের নিরীহ টাইপের মানুষ। রুমকির বাবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের একজন হওয়ায় তার কড়া ধমকে আসিফদের পরিবার বেশ ভয় পেয়েছে। স্থানীয় না হওয়ায় তেমন দাপট দেখানোর সুযোগ নেই তাদের।

রুমকির জম্মদিনে ওদের বাড়িতে যাবার নিমন্ত্রণ পেয়ে প্রথমেই না বলে দিয়েছিল আসিফ। রুমকির বাবার যা মেজাজ। তার ওপর আসিফের প্রতি তার ভীষণ ক্ষোভ। রুমকির সঙ্গে আসিফের মেলামেশাটা একদম সহ্য করতে পারছেন ন। রুমকি-আসিফের সম্পর্কটা এখনও তেমন গভীর কিছু নয়। ভালোলাগা ভালোবাসার অনুভূতিগুলো দু’জনের হৃদয়ে কেবল অংকুরিত হতে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত কোনদিকে গড়ায় তা এখনই বলা যায় না। প্রথম প্রেমের ছোঁয়ায় একটি ছেলে আর একটি মেয়ে পৃথিবীটাকে নতুনভাবে চিনতে শুরু করেছে মাত্র।

অনেকটা ভয়ে ভয়ে আসিফ রুমকিদের বাড়িতে পা রাখে। রুমকির বান্ধবীদের অনেকেই এসেছে। ওরা আসিফকে দেখে মুখ টিপে হাসে। জন্মদিনের নিমন্ত্রণে আসিফ ওদের বাড়িতে এসেছে, ওর কথা রেখেছে তাতে ভীষণ খুশি রুমকি। খুব বড় আয়োজন না হলেও বাড়িতে মানুষজনের আনাগোনা কম নয়। রুমকির বাবা এখানকার প্রভাবশালী গণ্যমান্য মানুষদের একজন। তার বাড়িতে সামান্য আয়োজন মানেই অনেক কিছু।

আসিফকে একটা ঘরে বসিয়ে রুমকি একান্তে কিছু কথা বলবে ভেবেছিল। কিন্তু বাড়ির কে যেন তাকে ডেকে নিয়ে যায়। ঘরে একাকী বসে থাকতে বিব্রতবোধ করে আসিফ। তাকে কেন্দ্র করে বাড়িটাতে কেমন অস্বাভাবিক পরিবেশ দানাবেঁধে উঠছে মনের অজান্তেই টের পায় সে। রুমকির অনুরোধে ওর জন্মদিনের নিমন্ত্রণ রাখতে এ বাড়িতে আসাটা মোটেও উচিত হয়নি এই মুহূর্তে উপলব্ধি করে আসিফ।

কিছুক্ষণ পর যে ঘটনাটা ঘটে তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না আসিফ। অনেকটা নিরীহ ভদ্র স্বভাবের ছেলে হিসেবে সোহাগপুরে তার আলাদা পরিচিত রয়েছে। ছোটবড় সব বয়সীদের কাছে আসিফের প্রশংসা শোনা যায়। মুরুব্বি শ্রেণির লোকজন তাকে বেশ স্নেহ করেন। ব্যতিক্রম কেবল রুমকির বাবা এবং তাদের পরিবারের মানুষগুলো। তারা এ বাড়িতে আসিফের আসাটাকে অন্য রকম স্পর্ধা বলে ধরে নিয়েছে। এ জন্য তাকে উচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতিও নেয়া হয়ে গেছে। যে ঘরটাতে একাকী বসেছিল আসিফ সেখানে হঠাৎ করে উপস্থিত হন রুমকির বাবা। তাকে দেখামাত্র বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ায় আসিফ। হাত তুলে সালাম দেয়, সালামের জবাব না দিয়ে রাগী চোখে ওর দিকে তাকান রুমকির বাবা।

‘এই ছেলে, তোকে এখানে কে আসতে বলেছে, কয়েকদিন আগে তোর বাবাকে তো সাবধান করে দিয়েছিলাম, তোর ব্যাপারে এতো কথা বললাম তার পরেও তুই এখানে এসেছিস, তোর এতো বড় সাহস, আজ তোকে উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়বো’, বলেই ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন তিনি। এর মধ্যে রুমকির আরও দুই চাচাও ঘরে ঢুকে পড়েছে। রুমকির বাবা চাচা তিনজনে মিলে ইচ্ছেমতো কিল ঘুষি চড় লাথি মারতে থাকেন আসিফককে। তিনজনের ক্রমাগত মারপিটে রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে মাটিতে পড়ে যায় বেচারা আসিফ। ওকে ঘরের মধ্যে যখন বাবা এবং চাচারা বেদমভাবে মারছে তখন তার আর্তচিৎকার শুনে বাইরে ছুটে আসে রুমকি। দরজার কড়া নাড়তে থাকে সে। কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলে, ‘আসিফকে মারবেন না, ওর কোনও দোষ নাই, আমিই ওকে আসতে দাওয়াত করেছিলাম।’ অনেকবার কথাগুলো বলে সে।

কষ্টে বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায় রুমকির। আসিফের আজকের এ অবস্থার জন্য দায়ী সে নিজেই। সে যদি আসিফকে এ বাড়িতে জন্মদিনের দাওয়াতে আসতে না বলতো তাহলে আজ তার এমন অবস্থা হতো না। সব কিছুর জন্য নিজেকে মনে মনে ধিক্কার দিতে থাকে। আসিফের রক্তাক্ত চেহারা দেখে জ্ঞান হারায় রুমকি।

কিছুক্ষণ শুশ্রƒষার পর জ্ঞান ফিরে আসে ওর।

ততোক্ষণে রুমকির বাবা-চাচাদের বেদম মারপিটে আহত আসিফকে পাড়া-প্রতিবেশীরা ধরাধরি করে ওর বাসায় বাবা মায়ের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। শরীরের অনেক জায়গা কেটে গেছে, ফুলে গেছে। সোহাগপুরের একমাত্র এমবিবিএস ডাক্তার মাসুদের চেম্বার নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।

জ্ঞান ফিরে আসার পর রুমকিকে তেমন কিছু বলেন না ওর বাবা। শুধু বলে দেন, ‘আর কোনো দিন যদি ঐ ছেলেটা তোর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে তাহলে ওকে কেটে টুকরা টুকরা করে শিমুলতলী নদীর মধ্যে ফেলে দেবো, বোয়াল মাছের পেটে যাবে টুকরাগুলি, আমার মেজাজের প্রমাণ তো দেখলি, এরপর দেখবি আরেক রূপ।’

বাবার কথার জবাবে কিছুই বলে না রুমকি। চুপচাপ মাথা নিচু করে শুনে যায় শুধু। নিজেকে পৃথিবীর সবচাইতে দুঃখী আর অসহায় একটা মেয়ে মনে হয়। ওর জন্য আজ এ বাড়িতে এসে এভাবে মার খেলো অপমানিত হলো ছেলেটা। কিছুই করতে পারলো না সে। কোনোভাবেই ঠেকাতে পারলো না অভিভাবকদের। প্রতিবাদও জানাতে পারলো না। এতো কষ্ট নিজের মধ্যে ধরে রাখা যায় না। তার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবলো-বুক ফেটে অনেক কান্না পেলো রুমকির। কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। কে যেন ওর কান্নার সব শক্তি শুষে নিয়েছে।

বিছানায় উঠে বসলো রুমকি। ঘুম আসছে না কোনোভাবেই। এখন অনেক রাত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কোনো ঘরেই আলো জ্বলছে না।

যাতে কোনোভাবেই সাড়া শব্দ না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখে রুমকি। বাবা-মাকে একটি বারের জন্য দেখার প্রচন্ড ইচ্ছে জাগে। কিন্তু এই মুহূর্তে তা করতে গেলে ওর সব পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়ে যাবে। পা টিপে টিপে বাড়ি থেকে বেরোয় রেবোয় রুমকি। আসিফের কথা খুব মনে পড়ে। এখন সে কী করছে কে জানে। কী ভীষণ মারটাই না মারা হয়েছে ওকে। ব্যাথায় যন্ত্রণায় বিছানায় শুয়ে হয়তো কাতরাচ্ছে বেচারা।

পরদিন সকালে সোহাগপুরে সবার ঘরে দারুণ শোকের ছায়া নেমে আসে। এমন একটি ঘটনার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না মনে মনে। সোহাগপুর রেলস্টেশন থেকে বেশ কিছুটা দূরে রেললাইনে রুমকির কয়েক টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়া মৃতদেহটা পাওয়া যায়। শেষ রাতের আন্তঃনগর ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে সোহাগপুরের সবার প্রিয়, অনেকের স্নেহের মেয়ে রুমকি। এ ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে যায় সবাই। আসিফকে মারধর করার ঘটনায় অপমানিত হয়ে পরিবারের লোকজনদের ওপর প্রচন্ড অভিমান করে মেয়েটি রেললাইনে চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।