menu

যত অশ্লীল, তত ভাইরাল : গাণিতিক কাব্য-সওয়াল

প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২০
image

চোখ বুলোতে থাকুন শুধু অগুনতি শীর্ষকে। ‘উত্থিত শিশ্ন, বীর্যপাত, প্রদর্শন আর সাধারণ পাগলামি নিয়ে কিছু কথা’ মূল ভাষায় Erections, Ejaculations, Exhibitions and General Tales of Ordinary Madness: আমেরিকান কবি-কথাকার-চিত্রনাট্যকার চার্লস বুকোওস্কির একটি বইয়ের এমনই শিরোনাম। রতি-রিরংসা-দ্বিধাহীন যৌনতার খুল্লমখুল্লা অজস্ররতা, ‘প্রোগ্রামড’ পণ্যায়নের অধুনাতম নমুনা এই গদ্য-পদ্যের ওয়েব-পাতা উল্টোতে উল্টোতে ওই বইটিরই অন্য শীর্ষকগুলোতে চোখ বুলোই- ‘টেক্সাসের এক বেশ্যালয়ের জীবন’, ‘ছয় ইঞ্চি’, ‘কম্বলে মোড়া ২৫টি নিতম্ব’, ‘বিশাল পাছা-ওয়ালী আমার মা’, ‘যোনি এবং কান্ট এবং সুখী গৃহকোণ’, ‘নারী-বৃষ্টি একঝলক’, ‘ধর্ষণ, ধর্ষণ’! নামকরণেই রেখে দিয়েছেন বারুদঠাসা ‘চৌম্বকীয়’ উত্তেজনা। শীর্ষকগুলোই যেন ঘাড় ধরে নিজেদের পড়িয়ে নিতে চাইছে।

গত শতাব্দীর সাত-আটের দশকে কলকাতার সিনে-ক্লাবগুলোর দর্শকমহলে বিকৃত যৌন-তাড়না উত্থিত কিছু রগরগে প্রশ্ন হাওয়ায় ভাসত: ‘সিন-টিন’ আছে? ইস! ‘নিরামিষ’ নাকি? আফিমের নেশায় বুঁদ (অ)সামাজিকতাকে সহজেই কব্জায় রাখা যায়। আর তাই কি অবক্ষয়-অপসংস্কৃতির পরিপালকেরা ফের বিশ্বজুড়ে বুকোওস্কি-র কবিতা-গদ্য-কাহিনিকে অতি সুনিয়ন্ত্রিত বণিকী কায়দায় যুবসমাজের নজরের আমনে-সামনে রাখছেন। গান বাঁধা হচ্ছে। সিনেমা তৈরি হচ্ছে। আর এগুলো নাকি ইয়োরোপ-আমেরিকায় খুবই জনপ্রিয়। বিদগ্ধ মহলে- উওমেন্স লিব-ও চর্চিত হচ্ছে- গার্গী-মৈত্রেয়ী-রিজিয়া-হ্যারিস-কেট মিলেট-গ্লোরিয়া স্টেইনেম উচ্চারিত হচ্ছে। আর তারই আড়ালে-আবডালে একইসাথে ঘটে চলছে নারীশরীরের অবাধ পণ্যায়ণের মতো সামাজিক পাপ। দু’হাজার কুড়িরই চূড়ান্ত স্পর্ধায় একাসনে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে চোমস্কি ও বুকোস্কি। স্রফে অন্ত্যমিলের প্রয়োজনেই অথবা নিছকই শ্রুতিমাধুর্যের কারণেই কি আ-বিশ্ব স্বীকৃত সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষাবিজ্ঞানী এবং সর্বনিকৃষ্ট ও জঘন্যতম ভাষা-ব্যবহারকারী সাহিত্যকারকে একনিশ্বাসে উচ্চারণ করা হচ্ছে। অভিরুচির এই ‘কভী না মিটনেওয়ালা’ বৈপরীত্য-অসঙ্গতি-অসামঞ্জস্য, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-দ্বৈত্যের দুরাচারী দৌরাত্ম্যকে ‘ডার্টি রিয়ালিজম’ নামের সুদৃশ্য মোড়কে মুড়ে দুনিয়াজুড়ে মার্কেটিং করার প্রয়াস জারি আছে। পণ্য-সংস্কৃতির এমনধারা অত্যাধুনিকতাই এই পর্যালোচনার মূল চর্চাবস্তু। ফিরে তাকালে পাই- খোদ আমেরিকাতেই টাইমস ম্যাগাজিন চার্লস বুকোওস্কিকে ‘লরেট অব দি আমেরিকান লো লাইফ’ আখ্যা দিয়েছিল।

‘৫৯ ছুঁয়েছে বটে বয়স, সমালোচকেরা বলছেন

আমার পণ্যবস্তুগুলো নাকি আগের চেয়ে ঢের ঢের ভালো হচ্ছে।’

(ড্যাংলিং ইন দি টুর্নেফোর্শিয়া, ১৯৮১)

কিন্তু ‘ডার্টি রিয়ালিজম’-এর ‘চতুর’ তকমা ঠুসে দিয়ে কিংবা বীট বা আভা-গার্দ জাতীয় কোনো গোষ্ঠীভুক্ত ভেবে নিলেই কি সাত খুন মাফ হয়ে যায়? কারণ, ‘ভালো-র সংজ্ঞা কী? চার্লস বুকোওস্কির সাহিত্যকৃতি, নিশ্চিতই, নৃশংস এবং মাত্রাতিরিক্ত নিগেটিভিটিতে পরিপূর্ণ। সাফ কথায়, এ হলো ‘টার্গেটেড’ পাঠকের কাছে পৌঁছে যাওয়ার এক অতি সুকৌশলী প্রয়াস। বলা হয় যে উনিশশো ষাট-সত্তরের মার্কিনী নগরজীবনের অবক্ষয়ের কথা উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। মার্কিনী সমাজজীবনের কাল্ট-হিরো ছিলেন বুকোওস্কি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, যৌনগন্ধী রূপকল্প আর শারীরিক ভোগবৃত্তি-রিরংসা-নৃশংসতার রৌরবে আশ্রয় নিয়েছিলেন বুকোওস্কি। নারীশরীর সম্ভোগের পৌনঃপুনিক এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণকে ঘিরেই লতিয়ে উঠেছে তাঁর ‘আত্মজৈবনিক’ লেখালিখি। মজার কথা হলো তাঁর সমকালেই তিনি উপেক্ষিত থেকে গিয়েছিলেন।

আলোচক জেফ্রে এঙ্কে মন্তব্য করেছেন যে, তাঁর সাহিত্যকীর্তি ছিল টিপিক্যালি ইন্ডিভিজুয়ালিস্ট, অ্যান্টি-ফরম্যাল, অ্যানার্কিস্টিক’- সবিশেষ অহংবাদী, প্রথাবিরোধী, নৈরাজ্যবাদী। কিংবা রাসেল হ্যারিসন যেভাবে লিখেছিলেন ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মার্কিনি ইতিহাসে তিনিই হলেন একমাত্র প্রখ্যাত আমেরিকান লেখক, যিনি ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর কার্যকারিতার অপমৃত্যু ঘটিয়েছেন।’ স্বভাবতই, অনুসারী প্রশ্নটি ভেসে আসবেই- ‘আমেরিক্যান ড্রিম’ বস্তুটা কী? বুকোওস্কি কি সেই স্বপ্নের ভিন্নমার্গী ছিলেন? আর তিনি যদি বিরুদ্ধাচারীই ছিলেন, তাহলে কি উনিশশো ষাট-সত্তরের ‘আমেরিক্যানিজম’-এর আচার-আচরণ-পারফরমিং দৃষ্টিকোণের দ্বিত্য-দ্বৈবিধ্য-দ্বিচারিতা ছিল? ইওরোপ কিংবা আমেরিকায় কেন তাঁকে ফের পুনঃপ্রতিষ্টা দেওয়ার নির্বিবাদ প্রচার চালু হয়েছে? এ কি এক চূড়ান্ত কন্ট্রাডিকশন বা বৈপরীত্য নয়? খুঁজে দেখা যাক!

বস্তুত, কবি-কথাকার চার্লস বুকোওস্কির আশৈশব জীবনচর্যার মধ্যেই এইসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে। অতি শৈশবে মাত্রাতিরিক্ত দারিদ্র্যের মধ্যে বুকোওস্কি পরিবারের দিন কেটেছে। বুকোওস্কির বাবা মি. হেনরি বুকোওস্কি জার্মানির আর্দেনাখে থাকতেন। জার্মান আর্মিতে কর্মরত থাকাকালীন (১৯১৮) তিনি ক্যাথারিনা নামের এক মহিলার প্রেমে পড়েন। কবি চার্লস বুকোওস্কি বারংবার দাবি জানিয়েছেন যে তাঁর জন্ম, বস্তুত, ওই প্রেমজ বিবাহের চূড়ান্ত পরিণতি, যদিও তাঁদের জার্মান বাসস্থানের জন্ম-মৃত্যু-বিবাহের রেজিসট্রেশন ডকুমেন্ট অনুযায়ী কবি চার্লসের পিতামাতা তাঁর জন্মের মাত্র একমাস আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯২৩ নাগাদ তাঁরা সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোর এলাকায় বাসা বাঁধেন। হেনরি বুকোওস্কি তাঁর নবজাত সন্তানের নাম রেখেছিলেন চার্লস হেনরি বুকোওস্কি; কিন্তু সেই নামটি, বিশেষত হেনরি আখ্যাটির প্রতি, চার্লস বুকোওস্কির ঘোর বিতৃষ্ণা ছিল। হ্যাম অন রাই নামের আত্মজীবনীমূলক বইতে বুকোওস্কি জানিয়েছেন যে, তাঁর বাবা খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিলেন, এবং নিয়মিতভাবেই তাঁকে বাবার হাতে পিটুনি সহ্য করতে হতো। শাস্তি দেওয়ার অজুহাতে চামড়ার বেল্ট দিয়ে তিনি বেত্রাঘাত করতেন। বুকোওস্কি মনে করেন এই অত্যাচারের ব্যথা-যন্ত্রণাই তাঁর কাছে লেখালিখির দরোজা খুলে দিয়েছিল। হয়তো এ কারণেই বুকোওস্কি মনে করতেন যে দ্বন্দ্ব-বৈপরীত্যের সূত্রেই প্রগতির বিকাশ ঘটে- ঠিক যেরকম থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিন্থেসিস পদ্ধতির অবিকল প্রতিরূপের মতোনই সংস্কৃতির উথালপাতালের সূত্রে প্রতিসংস্কৃতির জন্ম হয়, ক্রমে যা প্রগতিশীল সংস্কৃতির রূপ ধারণ করে। সম্ভবত তাই- মাতাল, উড়ো খৈ গোছের নিষ্কর্মার দলবল, দরিদ্রতম বেশ্যা ও লম্পটেরা তাঁর গল্প-কবিতা-চিত্রনাট্যে সুস্থিতি পেতে থাকে।

বুকোওস্কির একটি কবিতার শীর্ষক হলো ‘সো ইউ ওয়ান্ট টু বি এ রাইটার?’ উত্তর খোঁজার জন্য বেশি দূরে নয়, বুকোওস্কির জীবনচর্যার, শব্দশরব্যতার দিকে নজর দিলেই হবে। কবি লিখেছেন- ‘আনলেস ইট কামস আনমাক্সড আউট অফ ইওর/ হার্ট অ্যান্ড মাইন্ড অ্যান্ড ইওর মাউথ। অ্যান্ড ইওর গাট, ডোন্ট ডু ইট।’ সরল বঙ্গানুবাদে : ‘রাখঢাক ছাড়াই/ মন থেকে, অন্তর থেকে/মুখ আর নাড়ি থেকে/যদি সরাসরি না আসে/তবে নাইবা করলে।’ অর্থ হয়, বুকোওস্কির লেখালিখিতে ভনিতা নেই। এই পর্যন্ত না হয় মেনে নেওয়া গেল কিন্তু তার পরবর্তী উপদেশগুলোতে বুকোওস্কি পরামর্শ দিয়েছেন- ‘ইফ ইউ আর ডুয়িং ইট ফর মানি অর / ফেম/ ডোন্ট ডু ইট। ইফ ইউ আর ডুয়িঙ ইট বিকজ ইউ ওয়ান্ট / উওমেন ইন ইওর বেড / ডোন্ট ডু ইট।’ শব্দগুলো কি টাইপরাইটার মারফৎ, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে, সটান শাদাপাতায় শামিল হয়েছিল? এই সমস্ত উচ্চারণ কি তাঁর যাপিত জীবন আর স্বীয় বিশ্বাসের প্রশ্নহীন অনুগমন? অতি পরিচিত ওই কয়েনেজটির মতোন চার্লস বুকোওস্কি-র অক্ষরশিল্পও তো আদতে অফ দি মানি, ফর দি মানি, বাই দি মানি-র প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সমগ্র অক্ষর-চালচিত্র জুড়ে নারীশরীরের বেফিকির পন্যায়ণ, ‘আমি-সর্বস্ব’ ভোগবাদী দুনিয়ার অভ্রান্ত প্রতিলিপিই তো হাজির; কেমন নির্বিকার, কেমন নিঃসংকোচ-

‘এখন কেবল একটা জিনিস

পেলেই হয়-

টানটান দুটো উরুর মধ্যে

টানটান, নিভাঁজ একটা যোনি’- (আমি যেমন পাগল চিরটাকাল / অনুবাদ: আর্যনীল মুখোপাধ্যায়)

‘হোয়াট ফেম ইজ’: বুকোওস্কি’জ এক্সপ্লোরেশন অফ সেল্ভস’) প্রবন্ধে এন্ড্রু জে ম্যাডিগান জানিয়েছেন যে চার্লস বুকোওস্কির বইয়ের বিক্রিবাট্টা তেমন ব্যাপক কিছু ছিল না। তিনি আরো জানিয়েছেন যে বুকোওস্কি সেরকমভাবে ঘরে ঘরে পরিচিত কোনো সাহিত্যকারও ছিলেন না ‘কখনোই’। এবং মৃত্যুর পরই তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। বস্তুত, বুকোওস্কির হতাশাময় বেপরোয়া জীবনচর্যার ছাপ পড়েছে তার সাহিত্যকৃতিতে। সেহেতু ড্রাগ-অনুরক্তি, পানাসক্তি, নারী-বিদ্বেষ আর বস্তুবাদবিরোধী হয়ে উঠেছে তার সাহিত্যকৃতি ।

“ক্যারল সম্পূর্ণ বিবস্ত্র আর কফি-টেবলের ওপর পড়ে আছে। তার পিঠ টেবলের ওপর ন্যস্ত। তার থাইয়ের নিচের অংশটা আর পা দুটো ঝুলছে। সারাটা শরীর অসম্ভব সাদা, কেমন আকর্ষণীয় ধরনের, মনে হয় সূর্য যেন

কখনো স্পর্শ করেনি ওই শরীর। স্তনদুটো বিশাল হোয়ার বদলে যেন পুরুষ্টু, ভারি মাংসল... আর স্তনবৃন্ত দুটো

আর সব মেয়েদের মতো তাম্রাভ নয়, বরং ভারি উজ্জ্বল গুলাবি রংয়ের, অগ্নিভ, আরো গোলাপি। নিওন জ্বলছে যেন।

খোদাতালার কসম, নিওন-উজ্জ্বল স্তন-ওয়ালী নারী। তার ঠোঁটের রঙও তথৈবচ, স্বপ্নময় হয়ে আবেশে অর্ধ-উন্মুক্ত।...

সারা শরীরে যেন তেল মাখানো হয়েছে। তেলের মতন মসৃণ সে। উত্তুঙ্গ স্তন দুখানি শুধু সুঁচালো হয়ে শরীর

থেকে বেরিয়ে রয়েছে। তার শরীরে এঁকেবেঁকে কুঁকড়ে রয়েচে একটি সাপ, জানি না কোন জাতের...

মুহূর্তের মধ্যে, ক্যারলের শরীর বেয়ে সামান্য নেবে আসবে সাপটি; এমন ধরনধারণ যেন নিষ্পেষিত করে,

সারাটা শরীর জড়িয়ে- আদর করতে চায়, চুমোয় ভরিয়ে দিতে চায়। ঘনঘন শ্বাস ফেলবে ক্যারল, আবেশ বিহ্বল

হয়ে কেঁপে কেঁপে উঠবে। কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে নামবে সাপটা। তারপর মুখটা তুলবে। ক্যারলের চোখের দিকে,

ঠোঁটের দিকে, নাকের পাটার ওঠানামার দিকে তাকিয়েই আবার সেই ভঙ্গিতে চলাফেরা শুরু করবে। লকলকিয়ে

উঠবে তার জিহ্বা, খুব দ্রুত, আর ক্যারলের যোনিপথ উন্মুক্ত হয়ে পড়বে, তার কেশদাম, লালচে আর তীব্র সুন্দর,

যেন কিছু ভিক্ষা চাইছে, স্তিমিত প্রদীপের আলোয়... বেড়ে কপাল করেছে বটে সাপটি, আমার মনে হলো... সামলে

রাখতে পারলাম না নিজেকে, ওকে জাপ্টে ধরলাম, চুমো খেলাম, পিছন দিকে পড়েও গেলাম, দুজনেই। ক্যারল বলে

ফেলল- ‘ওহে কেঁদো বাঘ, গেছো হারামি! বললাম না- ‘আস্তে চলো’।”

এর পরে আর বিশদ উদ্ধৃতি দিতে চাই না আমি। এরপর শুধু সাপের জায়গা নিয়ে নেবেন লেখক স্বয়ং। শিশ্ন ও যোনির নিবিড় যৌথতার ‘ডার্টি বাস্তবতা” অতঃপর। সাপের চেয়েও শতগুণে করিৎকর্মা দু-জন মানুষের আদিম-রিপুর সবিস্তার বাখান। এতোই ডিটেলড, পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা যে তার আর কোনো পর হয় না। আগ্রহীজন নেট ঘাঁটলেই বাকি অংশটুকু পড়ে নিতে পারবেন। আমি এখানেই থামলাম। কিন্তু একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে চাই যে- এমন নিপুণ রতিশাস্ত্রের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা কী? স্রোতে সরে গেলেই অপরাধবোধের সলজ্জ পলিমাটি পড়ে থাকবেই না কি? ষাট বা সত্তরের ‘আমেরিক্যান ড্রিম” নিশ্চয়ই সামাজিক অবক্ষয় ছিল না! গোঁড়ামি, ভণ্ডামি বলে গালি পাড়লেও ‘প্রতি সংস্কৃতির এমন নমুনা কি সমাজকে আলোয় নিয়ে আসে? ষাট-সত্তরের দশকে এলএসডি’র কথা আমরা শুনেছিলাম। এই সাহিত্য কি সে-জাতীয় এক হ্যালুশিনেশন? এই কি তবে প্রতি-সংস্কৃতির সব হারানোর বীটনিক নমুনা?

না, নিশ্চিতই নয়। আদিরসাত্মক ‘একমুখী’ সাহিত্যকৃতির জন্য আমেরিকান সমাজেও তিনি তাঁর জীবদ্দশায় তেমন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেননি; যদিও স্ত্রী-পুরুষের মিলিত শারীরিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়ার বিবরণী দাখিলার জন্য, অনিবার্যভাবেই, তাঁর কয়েকটি গল্প-কবিতার চলচ্চিত্রায়ণ হয়েছে। বাণিজ্যের নিজস্ব প্রয়োজনেই তাঁর জীবনযাপনের খুঁটিনাটির ভিত্তিতে ‘বায়োপিক’ তৈরি হয়েছে। বস্তুত, গ্রিয়ার উইলিয়মস, ১৯৪৯-এ, স্যাটারডে ইভনিং পোস্টে ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছিলেন- ‘ইট হ্যাজ অলওয়েজ বিন এ গ্রেট আমেরিক্যান ড্রিম টু স্ট্রাইক ইট রিচ’ :... ‘খুড়োর কল আবিষ্কার করা, বেস্টসেলার লিখে ফেলা, একটা যন্ত্রাংশ বা গ্যাজেট বানিয়ে ফেলা বা মিলিয়ন ডলার কামিয়ে ফেলা হল (ওদের) প্রধান নেশা’।’ আমেরিকাবাসী সবাই বিরাট ধনী হতে চায়। (সূত্র: স্যামুয়েল লরেন্স: দি আমেরিক্যান ড্রিম’)। আশৈশব দারিদ্র্যে কাটানো বুকোওস্কি-র কাছে ¯্রােতে ভেসে পড়া ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না। বইয়ের বিবরণীকার, জীবনচরিত রচয়িতা, সমালোচক, তাত্ত্বিক এবং অবশ্যই বেশ কিছু পাঠক মিলে সচেষ্ট থেকেছেন তাঁর মতো ‘অপেক্ষাকৃত অপরিচিত লেখক’-এর সাহিত্যসম্ভারকে জনমানসে সুস্থিত জায়গা করে দিতে। কোনোভাবেই যেন বুকোওস্কির রচবাবলি পাঠকের নজরের বাইরে চলে না যায়।

বিপন্ন লেখক সত্তার পুনরুদ্ধারে ব্রতী কোনও প্রতিষ্ঠিত লেখক ছিলেন কি চার্লস বুকোওস্কি? অর্থরোজগার-ই কি একমাত্র লক্ষ্য ছিল তাঁর? অর্থ, যশ, সামাজিক সুস্থিতি- প্রতিপত্তির বদলে হলিউড কি সাংস্কৃতিক কদাচার-নৈরাজ্য-নিহিলিজমকে অবাধ প্রবহমানতা, দানা বাঁধবার-প্রতিরোধী ও প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়নি বা দিচ্ছে না? যৌনতাড়না জীবনের অঙ্গ, নিশ্চিতই; কিন্তু ক্ষুধা-কর্মহীনতা-সার্বিক দৈন্যদুর্দশার চাইতে সর্বপ্লাবী নয়! নিশ্চিতই। ভালো-র সংজ্ঞা কী? আর্থসামাজিক উন্নয়ন না কি মানসিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক অবনয়ন?

‘বারফ্লাই’ শীর্ষকে একটি ছবি বানানো হয়। বুকোওস্কি সেই ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। ফিল্ম ক্রিটিক রজার ইবার্ট ‘বারফ্লাই’ ছবি সম্বন্ধে মন্তব্য করেন যে- ‘বছরের সেরা ছবি’। দুর্দান্ত। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একেবারেই ‘মৌলিক’। বুকোওস্কি-র লেখা ‘বারফ্লাই’ কবিতাটির বঙ্গানুবাদ করেছি এরকম-

৩১ বছর আগে মৃত জেন

হয়তো কোনোদিনও

ভাবতেও পারেনি যে আমাদের যৌথ মদ্যপানের

দিনগুলোর বিষয়ে চিত্রনাট্য লিখব কখনো

আর সেই নিয়ে একটা চলচ্চিত্রও তৈরি হবে

আর এক সুন্দরী চলচ্চিত্রাভিনেত্রী

তার কিছু অংশ ফুটিয়ে তুলবে

শুনতে পেলাম জেন যেন বলছে-

সুন্দরী চলচ্চিত্রাভিনেত্রী? উপস্?, ভগবানের দোহাই!

জেন- একেই বলে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র,

শুয়ে পড়ো জেন, প্লিজ- কেননা,

মোদ্দাকথা হলো যতোই কসরতই করুক

ওরা খুঁজেই পায়নি তোমার মতো কাউকে

অবিকল

আমাকে’...

১৯৭৩-এ টেলর হ্যাকফোর্ড ‘বুকোওস্কি’ শীর্ষকে একটি সিনেমা বানান। লস এঞ্জেলসের রাস্তাঘাটে ‘পানাসক্ত’ কবি, অতিমাত্রায় ব্যঙ্গাত্মক এবং নারী-বিদ্বেষী ‘ডার্টি রিয়ালিজম’-এর প্রবক্তা হিসাবে প্রচার পেতে থাকেন। ইটালিয়ান পরিচালক মার্কো ফেরারি, ১৯৮১-তে, তাঁর ‘টেলস অব অর্ডিনারি ম্যাডনেস’ নিয়ে সিনেমা তৈরি করেছিলেন। বুকোওস্কির যাপিত জীবন আর তাঁরই লেখা ‘মোস্ট বিউটিফুল উওম্যান ইন টাউন’ গল্পটির ভিত্তিতে তৈরি সেই ছবি আমেরিকাতেই চলচ্চিত্রায়িত হয়েছিল। পানাসক্তি-র বিষয়ে বুকোওস্কি নিজেই দাখিলা দিয়েছিলেন যে- ‘আমার মনে হয় মদ্যপান একধরনের আত্মহত্যাই বটে। কেননা, এর ফলে তুমি পুনর্জীবন লাভ করবে- য়ার পরের দিনই নতুনভাবে শুরু করতে পারবে। এ যেন নিজেকে মেরে ফেলা, আর তারপর নবজন্ম লাভ করা। মনে হয় দশ-বারো হাজার জীবন কাটিয়ে দিয়েছি আমি, এতদিনে।’

বুকোওস্কির ভিন্নধর্মী শিরোনাম ব্যবহার করার প্রবণতার বিষয়ে আরো দুচার কথার গহীনতা, বস্তুত, অতি আবশ্যক। নাম-বিভ্রাট সংক্রান্ত যন্ত্রণাদায়ক প্রহেলিকার শিকার হয়ে পড়েছিলেন বুকোওস্কি আর তাই শুরু থেকেই শিরোনাম-শীর্ষকের মায়াবী ও ধাঁধালো ধোঁয়াশা-জগত তৈরি করায় আজীবন সচেষ্ট ছিলেন। এর থেকে নিজেকে বার করে আনতে চেয়েছেন। শীর্ষক বা নামকরণের প্রয়াসকে তিনি এক প্রহেলিকাময় অভেদ্য বর্ম হিসাবে ব্যবহার করেছেন। ছোটবেলা থেকেই নাম নিয়ে দ্বিধা ছিল সাবকনশাস স্তরে। হেনরির বদলে নিজেকে সারা বিশ্বের কাছে ‘চিনাস্কি’ নামে পরিচিতি দিয়েছেন। চিনাস্কি-বুকোওস্কি-চোমস্কির ত্রিবিধ আমেরিকা। সংস্কৃতির চিরাচরিত-প্রতিবিপ্লবী-সংশোধিত বালুঘড়ির নানান থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিন্থেসিসের আবহমান দ্বান্দ্বিক ইন্দ্রজাল; এমন ত্রিস্তরীয় অনমনীয়তা থেকে আমাদের পরিত্রাণ নেই। বুকোওস্কি সেই সমাজেরই কুফল, চোমস্কি যে সমাজের ২৯০২৯ হিমাচল। ফল্গু নদী নিয়ে বিতর্ক তুলে মনে পড়ল শরীরেও রয়েছে এমন জলাশয়, শরীরের চারপাশেই তো এমন বালিয়াড়ি, দু-তিন আঁজলা পরিমাণ- হু হু নৈঃশব্দ্য, তাকে পেয়েছি আমি, গ-দেশে, ডুবেছি, শিহরিত হয়েছি ওর কবোষ্ণ উত্তাপে । বৈপরীত্য নাম দেব কি একে?