menu

মুহম্মদ খসরুর সাথে মাহবুব আলমের কথাবার্তা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ ২০১৯

http://print.thesangbad.net/images/2019/March/13Mar19/news/Untitled-7.jpg

(পূর্ব প্রকাশের পর)

মাহবুব : আপনিই পড়িয়েছিলেন বোধ হয়, ওদের কি যেন একটা কাগজে বের হয়।

খসরু : ‘বিজ্ঞাপনপর্ব’। আর সুবিমল মিশ্রের সঙ্গে কলকাতার একটা বইমেলায় পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল সুমন্ত্র চট্টোপাধ্যায়, ঐ যে গণেশদের ওখানে (সন্তোষপুর) থাকে, সে ঐ কাগজের সাথে জড়িত। সুবিমল মিশ্রের এই আধুনিক গল্পের ব্যাপারটা এসেছে ফিল্ম থেকে। সে এটা স্বীকারও করে এবং এ ব্যাপারে তার কোনো দ্বিধাও নেই। কিন্তু আমাদের দেশের লেখকেরা ফিল্মকে শিল্প বলতে শরম পায়। তারা “ফিল্ম শিল্প নয়” এই বলে ফতোয়া দেয়। অথচ এখানকার কবি-সাহিত্যিকরা পোস্টমডার্ন, সাব অলটার্ন নিয়ে গুলতানী মারায় অথচ চলচ্চিত্র শিল্পের বিরুদ্ধে কথা বলে। আরে ব্যাটা পোস্টমডার্ন প্রধান শিল্পই তো হলো চলচ্চিত্র শিল্প। ভেবে দেখ, সেই কবে মানুষ চাঁদে গিয়ে হাগুমুতু করে এসেছে, শুরু হয়েছে “স্টার ওয়ার”, স্যাটেলাইট মিডিয়ার আগ্রাসন। তারপর ঋত্বিক দা’র ‘কোমল গান্ধার’ ছবিটার কথা ধর, এখন যখন আমরা তার ‘কোমল গান্ধার’ ছবিটা দেখি- দেখ, কোমল গান্ধার’-এ কোনো গল্প আছে? আমরা তো সবাই ছবিতে গল্প খুঁজি, উপন্যাস খুঁজতে যাই, যার জন্য চিদানন্দদার বইখানা ‘বই নয় ছবি’ আমরা তো বই বলে অভ্যস্ত ফিল্মকে আসলে তো ‘ফিল্ম’ ‘বই’ না, ফিল্ম তো ফিল্মই। ছবির ব্যাপারটা একটা ভিস্যুয়াল ব্যাপার, দেখার ব্যাপার ভিস্যুয়াল আর্ট। ছবির ব্যাপারটা তো এইভাবেই দেখতে হবে।

আর এই কারণেই আমরা প্রথমে ফিল্ম সোসাইটির মাধ্যমে এর চর্চাটা শুরু করেছিলাম। আমাদের মতো গরিব দেশে তো আর ফিল্ম ইনস্টিটিউট ছিল না। তাই ফিল্ম দেখার মাধ্যমে, চর্চার মাধ্যমে, “দেখে শেখাটা বড় শেখা”- ল্যাংলোয়া বলেছিলেন- ফিল্ম পঁচাত্তর ভাগ লোকই দেখে শিখেছে, তারপর ইনস্টিটিউট হয়েছে- এভাবে দুটো স্কুল হয়েছে। একটা একাডেমিক আর একটা নন একাডেমিক। এ দুটোই আছে। ভারতবর্ষেও আছে। কেরালাতে একাডেমিক কাজ খুব বেশি হয়েছে। পুনে থেকে বেশ ভালো ভালো ছেলেরা এসেছে। অথচ পশ্চিম বাংলায় খুব কম। পুনের ছেলেরা পশ্চিম বাংলায় খুব একটা ভালো কাজ করতে পারেনি, ডিরেকশনে তো না-ই। পশ্চিম বাংলার যে তিন জন শীর্ষস্থানীয় পরিচালক সত্যজিৎ, ঋত্বিক, মৃণাল এরা কেউই কিন্তু ইনস্টিটিউটের না। যদিও ঋত্বিকদা একটা সময় পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ভাইস-প্রিন্সিপাল ছিলেন এবং শিক্ষক হিসেবে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছেন। সত্যজিৎ রায়ও একাডেমিক্যাল ব্যাপারটা বিশ্বাস করতেন না। কেরালাতে যেমন আদুর গোপাল কৃষ্ণান একজন ইনস্টিটিউটের স্নাতক। একদম পুনের ছাত্র। গোল্ড মেডেলিস্ট। আবার জি, অরবিন্দন কিন্তু হাতে কলমে কোনো ফিল্মের কাজ শেখেন নি। কিন্তু তাই বলে চলচ্চিত্রকার রূপে তিনি আদুর গোপাল কৃষ্ণানের চাইতে কোনো অংশেই খাটো নন। বরং এ দুজনের ফিল্মই যথেষ্ট বুদ্ধি, মেধা এবং শৈল্পিকভাবে নির্মিত। দেশে-বিদেশে দুজনই সমানভাবে সম্মানিত হয়ে আসছেন।

মাহবুব : যাই হোক, ভারতের চলচ্চিত্র তবু একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে। ওদের ফিল্ম সোসাইটিগুলো এখনও অ্যাকটিভ। কিন্তু আমাদের এখানে, ষাটের দশকে শুরু হয়ে স্বাধীনতার পর ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট হঠাৎ প্রাণস্পন্দন ফিরে পেয়ে এখন আবার স্তিমিত, এবং এ জন্য আমি বলব আমরা চলচ্চিত্র সংসদকর্মীরাই দায়ী। কারণ পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে আমরা আমাদের কর্মসূচি নির্ধারণ করতে পারিনি, এই অবস্থার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব আমাদের নিশ্চয়ই। ছবি দেখানোর দায়িত্বটা বলতে গেলে এখন শুধু অপারেটররাই নিয়ে নিয়েছে। আমাদের ফিল্ম সোসাইটির আর কার্যকরী ভূমিকা নেয়ার প্রয়োজন নেই।

খসরু : এটা তো বটেই। তাছাড়া চলচ্চিত্রের এখন ক্রান্তিকাল চলছে। ক্রান্তিকাল এই অর্থে যে টেলিভিশন-ভিডিও-ডিস এগুলো আসার সাথে সাথে ফিল্ম-এর প্রতি মানুষের একটা তাৎক্ষণিক অনীহা ডেভেলপ করছিল। এটা এখনও আছে। কিন্তু এটা ক্রমশ কাটিয়ে উঠছে। গদার পড়লে বোঝা যায় যে এরা এখনও ফিকে, অনেক বড় মিডিয়া হিসেবে ভাবেন। এতে একটা সুবিধা হয়েছে যে, ফিল্ম যে আরও কঠিন একটা মিডিয়া, ফিল্ম মিডিয়াকে যে গভীরভাবে জানার স্বতন্ত্র একটা দিক আছে, টেলিভিশন এসে সেই স্বতন্ত্রটাকে, বোধটাকে, আরও স্পষ্ট করে তুলেছে, ডেপথটাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এটা মানুষ ভেবেই আসত যে, সে টেলিভিশন করবে না ফিল্ম করবে। ফিল্ম কিন্তু টেলিভিশনের পরিপূরক না, টেলিভিশনও ফিল্ম-এর পরিপূরক না। দুটোই সম্পূর্ণভাবে আলাদা মিডিয়া। ভিডিওর ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া হিসেবে এগুলোকে ধরা হয়। কিন্তু বেসিক্যালি ফিল্ম আর্ট মিডিয়া হিসেবে যতটা সম্মানিত হয়েছে, টেলিভিশন হবার পর আরও বেশি হচ্ছে এবং হবে। কেননা যারা এই আর্ট মিডিয়া নিয়ে সিরিয়াস কাজ করবে তারা ফিল্মে করবে, টেলিভিশনে না। যারা হালকা কাজ করতে চায় তাদের কথা আলাদা। যেমন বার্গম্যান বয়সের কারণে ফিল্ম ছেড়ে টিভির জন্য ছবি করছেন। অর্থাৎ ফিল্ম-এ কাজ করার জন্য সেই শারীরিক শক্তি এখন আর তার নেই। আসলে আর্ট মিডিয়া হিসেবে টেলিভিশন কিন্তু এখনও সেইভাবে আদৃত হতে পারেনি। আমরা ফিল্ম সোসাইটি করছি- এখন এই দুটো মিডিয়াকে তো ফেলে দেয়া যাবে না। এ দুটোকে সমন্বয় করতে হবে। টেলিভিশনও রাখতে হবে, ভিডিওকেও রাখতে হবে। সবকিছু দেখতে হবে। তবে তার যোগ্যতা অনুযায়ী, সেইভাবে আর কি। কিন্তু এখন যদি আমরা ফিল্ম না করে টেলিভিশন করি তবে টেলিভিশন কি আর ফিল্ম-এর কাছে পৌঁছুতে পারবে? এটা যতই বলা হোক না কেন, এখনও সে অবস্থা আসেনি।

বিশেষ করে আমরা বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির পক্ষ থেকে ফিল্ম কোঅপারেটিভ করার পর এর মাধ্যমে একটা ছবি করার পদক্ষেপ নিয়ে এই আন্দোলনে একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছিলাম। মূলত আর সব কিছুর মতো আমরাই তো প্রথম ফিল্ম কো-অপারেটিভের মাধ্যমে শর্টফিল্ম নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। সেটা হয়তো সময়মতো সম্পূর্ণ করা যায়নি, কারণ আমরা ভুল লোক নির্বাচন করেছিলাম। ছবিটা যার করার কথা তার দায়িত্বহীনতা, চলচ্চিত্র বিষয়ে তার কূপম-ূকতা- এক কথায় বলতে গেলে তার বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই কাজটা সময়মতো সম্পূর্ণ হয়নি। যাই হোক ইতিহাসই এসব দেখবে, কে কী করল না করল।

অন্যান্য সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর চাইতে ফিল্ম সোসাইটিগুলির সাথে বিদেশি মতাদর্শ, ফরেন ইনভলভমেন্ট অনেক বেশি। অনেকগুলি ফিল্ম সোসাইটি এসবের শিকার হয়েছে। তারপর ধর, যে সমন্বয়টা দরকার ছিল, যার জন্য পরে আমরা “আদার ভিডিও কালেকটিভ” (ওভিসি) করলাম, যার মাধ্যমে আমাদের ইচ্ছে ছিল নির্বাচিত ভিডিও ফিল্মের একটা বিশাল লাইব্রেরি গড়ে তোলা। এবং এই দায়িত্বটা দেয়া হয়েছিল মুরাদকে। যে মুরাদকে আমরা বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটি থেকে চেকোশ্লোভাকিয়া পাঠিয়েছিলাম চলচ্চিত্রের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য। কিন্তু সেই মুরাদও একদিন সংগঠন ছেড়ে চলে যায়। এইভাবে সংগঠন ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়া তো আমাদের একটা চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাট্যান্দোলনই বল আর চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনই বল এই পরিবর্তন কিন্তু সব জায়গাতেই। কলকাতাতেই দেখ না, এত সুযোগ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অবস্থাটা আগের মতো নেই। আমাদের তো কোনো সুযোগ-সুবিধাই নেই। আমাদের বাংলাদেশে সরকারই ফিল্ম সোসাইটি চালাতে দিচ্ছে না। এখনও ছবি সেন্সর করতে হচ্ছে। ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’ ছবিটা দু’দুবার এসে ফেরত চলে গেল সেন্সর দেখতে না দেয়ায়। এখানে যে ফিল্ম সোসাইটিগুলো, ওই যে একটা স্থানীয় ছবি আরেফিনের সুরুজ মিয়ার স্বপক্ষে মিছিল করল, প্রটেস্ট করল ভালো ছবি হিসেবে। অথচ তারা দু’দুবার এসে ফেরত যাওয়া ঋত্বিক ঘটকের ‘যুক্তি তক্কো গপ্পো’-র ব্যানারে একবারও কোনো প্রতিবাদ করেনি। পরে শর্টফিল্ম ফোরাম নামে ফিল্ম সোসাইটির পাল্টা একটি সংগঠন করেছে। আমি তো বলব ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন সঠিকভাবে পরিচালিত না হবার জন্য এই ফোরাম অনেকটাই দায়ী। ফোরাম হয়ে উঠেছে একটা মতলববাজদের সংগঠন। উচ্চাশা চরিতার্থ করার জন্য এর নেপথ্য মন্ত্রণাদাতা ও সংগঠক ছিলেন আলমগীর কবীর। বেসিক্যালি এই যে শর্টফিল্ম শর্টফিল্ম বলে চিল্লাচিল্লি হচ্ছে, তা শর্টফিল্ম হয়েছেটা কী? আমি তো তেমন কিছু দেখছি না। এরা তো এখন ভিডিও ফরম্যাটে বন্দি।

http://print.thesangbad.net/images/2019/March/13Mar19/news/Untitled-6.jpgমাহবুব : আপনি আসলে কী বুঝাতে চাচ্ছেন?

খসরু : এটা ঠিক প্রতিক্রিয়াশীল না। বরং অর্থক্রিয়াশীল বলা ভালো, কেননা এগুলো আসার সাথে সাথে কিছু টাকা-পয়সার খেলা চলে আসল ফিল্ম সোসাইটিতে। কিছু কিছু বিদেশি দূতাবাস টাকা-পয়সা দেয়া শুরু করল ছোট ছবি নির্মাণের নামে। অনুপযুক্ত লোকদের, সদ্য ফিল্ম সোসাইটি করতে আসা নতুন ছেলেপেলেদের জার্মান-ফ্রান্স এখানে-সেখানে পাঠানো শুরু করল। তারা একটা টাকার ব্যবসা শুরু করল আর কি। আর এদের সঙ্গে এখন যোগ দিয়েছে কিছু মালটিন্যাশনাল কোম্পানি এবং এনজিওগুলো। এখন এ দেশের প্রগতি ও সংস্কৃতির ধ্বজাধারীরা এনজিওর কোড়ল ঘাড়ে বয়ে বেড়াচ্ছে। এনজিওর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রগতিবাদীদের নাং-ভাতার সম্পর্ক বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। অথচ সরকার এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না। ফিল্ম সোসাইটিতে কিন্তু কখনও কোনো টাকা পয়সার লেনদেন হয়নি। যদিও সরকার ‘চলচ্চিত্র সংসদ নিয়ন্ত্রণ আইন’ নামক কালাকানুন জুড়ে দেবার কু-যুক্তি হিসেবে এই টাকা-পয়সার লেনদেনের ব্যাপারটি টেনে এনেছেন। তো এসব কারণে এখন ফিল্ম সোসাইটি করতে হলে আমাদের নতুনভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এতে যেমন ফিল্ম থাকবে তেমনি ভিডিওকেও রাখতে হবে। সব কিছু রেখে আবার নতুনভাবে শুরু করতে হবে। একটা সময় গেছে- যারা ফেডারেশনের হর্তাকর্তা তারাই আবার ফোরামের হর্তাকর্তা। দু’বছরে ফোরামের একটা অনুষ্ঠান করতে হয় যেহেতু এতে কিছু পয়সাকড়ি আসে। আর কিছু হাউকাউও হয়। কিছু একটা না করলে তো হয় না।

মাহবুব : না, কাজকর্ম কিছু তো হয়েছে...

খসরু : কোথায় হয়েছে? তুমি একজন শর্টফিল্ম বানানেওয়ালা দেখাও যে একটা ভালো ছবি করেছে। ক্রমশ এর যে একটা উদ্দীপনা ছিল সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই যে এতগুলো ছেলে পুনে থেকে এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ইনস্টিটিউট থেকে একাডেমিক শিক্ষা নিয়ে এসেছে, এরা করেছেটা কী? কচু করেছে? এখন তো এদের কোনো কাজই দেখি না।

মাহবুব : না, তাদের ব্যাপার আলাদা। কিন্তু এই যে ফোরামের সমালোচনাটা, এখন আমরা হয়তো ফোরামের বাইরে বলেই এ ধরনের সমালোচনা করছি। ব্যাপারটা যদি একটু অন্যভাবে দেখি, যেমন, আপনারা যখন ষাটের দশকে প্রথম ফিল্ম সোসাইটি মুভমেন্ট শুরু করেন তখনও কিন্তু একটা বিরুদ্ধ দল ছিল, যারা বলত যে ফিল্ম সোসাইটি করে হয়েছেটা কী? ক’জন সুস্থ দর্শক তৈরি হয়েছে? ক’টা ভালো ছবি নির্মিত হয়েছে? ভালো ছবির পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে কি-না, ইত্যাদি। ঠিক সেরকম হয়তো আমরাও...। শর্ট ফিল্ম ফোরামে নিশ্চয়ই কিছু ভালো ছেলে আছে, যারা সিনসিয়ারলি কাজ করতে চাইছে, এরা তো মিসগাইডেড হতে পারে। কিন্তু বাইরে থেকে যদি আমরা এভাবে একতরফা সমালোচনা করি, যেখানে আমরাও চাই যে একটা ভালো ছবির পরিবেশ গড়ে উঠুক, সেখানে এই সমালোচনাটা কি একদম নেগেটিভ হয়ে যাচ্ছে না? এটা কি ঠিক হচ্ছে?

খসরু : না, সমালোচনা করছি এ জন্য যে, এরা তো মূল জায়গাটাতে হাত দিচ্ছে না। এদের উচিত ছিল সরকারকে বাধ্য করানো ভালো ছবির জন্য একটা ফান্ড আদায় করা। স্বাধীনতার এত বছর পরে ভালো ছবি খুঁজলে সেই তো একটাই- ‘সূর্যদীঘল বাড়ী’- ফিল্ম সোসাইটির ছেলেদের করা। শাকের-নিয়ামত, আনোয়ার, সম্পাদনায় টুটুল, তারপর ডলি, ও তো আমাদের মেম্বার ছিল। এক কথায় এটাকে মোটামুটি আমরা ফিল্ম সোসাইটির প্রডাক্ট হিসেবে ধরতে পারি।

কিন্তু ছবি তো আর গল্প লেখা নয়, ছবি তো আর পেইন্টিং করা না যে, ২০ টাকার কালি আর কলম নিয়ে বসে গেলাম, এটা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ব্যাপার। কিন্তু সরকার তো ভালো ছবির জন্য অনুদান দেয় না। আমি দু’বার আওয়ামী জমানায় দু’বার বিএনপি জমানায় চিত্রনাট্য জমা দিয়েছি। কিন্তু অনুদান পাইনি। হাসান আজিজুল হকের গল্প “নামহীন গোত্রহীন”-এর একটা স্ক্রিপ্ট করে বসে আছি, কই, আমি তো একজনও প্রডিউসার জোগাড় করতে পারলাম না। আমি তো কম মানুষকে চিনি না, কিন্তু আমার ছবি তো কেউ প্রডিউস করতে আসে না। কোনো দেশেই, তুমি দেখ না, ইন্ডিয়াতে শুধু সরকার নয়- সরকার তো অনুদান দিচ্ছেই এনএফডিসির মাধ্যমে প্রতিটি রাজ্যে, তারপরও রয়েছে অনুদান প্রথা, রাজ্য সরকারের। প্রত্যেকটা রিজিয়নে ফিল্ম করার টাকা বরাদ্দ আছে এবং প্রত্যেকটা রিজিয়নের টেলিভিশনে ফিল্ম সেকশন আছে। সেই টেলিভিশনে প্রত্যেকটা রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে ছবি তৈরি করা হয়। ৪/৫টা ছবি তো দেখে এলাম। ঐ যে, ‘ওয়াল’ ছবিটা- আদুর গোপাল কৃষ্ণানের, ওটা তো টেলিভিশনের ছবি। অরবিন্দনদা’র ‘মারাট্টাম, দেখলাম, সেটাও তো টেলিভিশনেরই ছবি। নরসিমার বিতর্কিত ছবি ‘দাসী’ দেখলাম- সবই টেলিভিশনের। ওখানকার টেলিভিশন এখন ভালো ভালো সিরিয়াস ছবি করছে। আর আমাদের টেলিভিশন সেই কবে এক ছবি বানিয়েছে, ব্যস, তারপর ঘাপটি মেরে বসে আছে। এখন আবার কী-সব কথাবার্তা বলছে, কাকে শর্ট ফিল্ম করতে দেব, কী করবে না করবে। দুর্বোধ্য সব ব্যাপার। এভাবে করলে তো হবে না। অনুদান দিলে সম্পূর্ণটাই দিতে হবে। শুনেছি তারা নাকি বছরে ৮০ কোটি টাকা আয় করছে। এখান থেকে ৮ কোটি টাকা দিলেই তো এই বাজেটে ৮/১০টি ভালো ছবি বানান যায়। এভাবে কিছু তো খরচ করতেই হবে এবং ভালো ছবি নির্মাণের স্বার্থে এটা সরকারের মাধ্যমেই হতে হবে। এখন আমার কথা হচ্ছে, এই যে যারা শর্ট ফিল্ম ফোরাম করেছে, ছবি নির্মাণের ব্যাপারটাই যাদের প্রধান বিষয়, তারা কেন সরকারকে চাপ দিচ্ছে না। যারা পুনে থেকে পাস করে এসেছে তারা কেন নিজেরা একটা কো-অপারেটিভ কিংবা গ্রুপ করে সরকারকে বাধ্য করছে না? এফডিসিতে তো বড় হর্তাকর্তা ছিলেন সালাউদ্দিন জাকি, পুনে থেকে পড়ে এসেছে, ভালো ছবি নির্মাণে তার ব্যক্তিগত কন্ট্রিবিউশন কী? এরপর এফডিসি ছেড়ে বিটিভির মহাপরিচালকও তো হয়েছিল। টিভিতে থেকেও তো কিছু করলেন না। বরং এই মহাত্মন ব্যক্তিটি এফডিসিতে থাকা অবস্থায় দু’তিনটি পূর্ণ দৈর্ঘ্যরে ছবি করেছেন। সে সব ছবি কি পাতে তোলা যায়? এতো মালসায় রাখার জিনিস। তাছাড়া বাদল আছে, জানেসার- এরা সব প্যাকেজ করছে, অ্যাড ফিল্ম করছে। ঠিক আছে, আমি স্বীকার করি, রুটি-রুজির প্রশ্ন তো থাকবেই। কিন্তু সবাই মিলে কি বছরে একটা ভালো ছবি করা যায় না? শুনেছি জানেসারের একটি ছবি অশ্লীলতার দায়ে সেন্সর বোর্ড নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ছবিটি এত নোংরা, যা নাকি জনসমক্ষে দেখানো যাবে না। http://print.thesangbad.net/images/2019/March/13Mar19/news/Untitled-8.jpgকী সেই ছবি এই পুনেটিক বানাল?

মানুষের কাছ থেকে মেগে এনে, ভিক্ষে করেও তো একটা ছবি করা যায়। ভারতে জন আব্রাহাম করেছে না? সেও তো পুনে থেকে পাস করা। মানুষের কাছ থেকে আট আনা এক টাকা করে পয়সা নিয়ে ছবি বানিয়েছে। ছবি প্রদর্শনের জন্য স্কুলগুলোতে ফ্রি দেখিয়েছে, হাসপাতালে ফ্রি দেখিয়েছে। কোনো ডিস্ট্রিবিউটরের দারস্থ হয়নি। নিজে এবং ইউনিটের ছেলেরা ঘাড়ে-কাঁধে প্রজেক্টর বয়ে নিয়ে গ্রামেগঞ্জে ছবি দেখিয়েছে। তারপর কলকাতা থেকে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ও অন্যদের ছবি কিনে নিয়েছে, সেইসব ছবি দেখিয়েছে। এইভাবে ওরা ফান্ড করে নিয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে যারা ফিল্ম সোসাইটি বল আর ফোরামই বল, এইসব করছে, তারা সরকারের সঙ্গে সরাসরি কোনো বিরোধে যেতে চায় না। আমার তো মনে হয় এদের কেমন যেন একটা গা-ছাড়া ভাব। কী জানি সরকারকে ক্ষেপালে যদি আমার ব্যবসার ক্ষতি হয়, অমুক পদটা যদি হাতছাড়া হয়, তমুক কমিটি তাকে যদি বাদ দিয়ে দেয়? এরকম করে তো তৃতীয় বিশ্বে কোনো আন্দোলন হবে। না। তোমার কিনা ‘হাগবাও না পথও ছাড়বা না’, এ তো হয় না। তোমাকে একটা লাইভ নিতেই হবে। করলে কর, না করলে নাই। কিন্তু যারা সত্যিকারের কাজ করতে চায় তাদের তো তুমি বিভ্রান্ত করতে পার না। ইদানীং যেমন শুরু হয়েছে। ফিল্ম সোসাইটির ইমেজ নষ্ট করার চেষ্টা।

মাহবুব : ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে-

খসরু : ইতিহাস বিকৃতির কথা উঠলই যখন, তখন একটু বলি। এটা কোত্থেকে শুরু হলো, কেন শুরু হলো, আর কারা শুরু করল? দেখা গেছে যে ফিল্ম সোসাইটি ফেডারেশন গঠন করার পর প্রথম দু-তিন বছর ভালোই চলছিল। ফেডারেশনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভায় ইলেকশনের নিয়ম থাকলেও সবার মধ্যে একটা সমঝোতা থাকার কারণে ব্যাপারটা ‘সিলেকশনই’ হচ্ছিল। কিন্তু দু-তিন টার্ম যাবার পর দেখা গেল একটা প্রতিযোগিতার ব্যাপার এসে গেল। অনেকে ফেডারেশনে আসতে চাইছিল যারা ফিল্ম সোসাইটির ব্যাপারে তেমন অ্যাকটিভ ছিল না। অনেকের, যাদের সংসদের সারা বছর কোনো কাজই চোখে পড়েনি তারা ২০০ টাকা চাঁদা দিয়ে ফেডারেশনের মেম্বার হয়ে ইলেকশনে অংশ নিয়ে নির্বাহী কমিটির পদগুলো দখল করে বসল। ব্যস, ওই দখল পর্যন্তই। তারপর না করত ফেডারেশনের কাজ, না চালাত নিজেদের সংগঠন। আস্তে আস্তে তারা ইনঅ্যাকটিভ হয়ে যেত। তারপর দেখা যেত আবার যখন ফেডারেশনের ইলেকশন আসত তখন এই চক্রটি আবার তৎপর হয়ে উঠত।

এই ব্যাপারটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে যে বছর আলমগীর কবির আর বাদল রহমানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ব্যাপারটা খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়েছিল। সে বছর আলমগীর কবির প্রচ- অসুস্থতা কাটিয়ে উঠে একটু সুস্থ হয়ে কোথায় তার মূল পেশা ফিল্ম মেকিং-এ ফিরে যাবেন, তা-না হঠাৎ করে ফিল্ম সোসাইটির ব্যাপারে তার উৎসাহ আবার চাগাড় দিয়ে উঠল। মূলত তার সঙ্গে তো আমার পূর্বে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল, সেই আলোকেই বলব, যাই হোক, ভদ্রলোক ছিলেন এই ধরনের যে, একটা সংগঠনে যৌথভাবে সবাই মিলে যে একটা কাজ করা যায়, সে জিনিসটা আমি তার মধ্যে লক্ষ্য করি নি। আমিই তাকে প্রথম ফিল্ম সোসাইটিতে নিয়ে এসেছিলাম। সেটা ১৯৬৬-৬৭ সালের কথা, তখন তিনি শুধু জেল থেকে বেরিয়েছেন। তখন কী কারণে যেন তাকে জেলে নেয়া হয়েছিল, যদিও ব্যাপারটা পরিষ্কার না আমাদের কাছে। উনি লন্ডন থেকে এসে কিছুদিন সাংবাদিকতা করলেন, এবং আমার ব্যক্তিগত ধারণা উনি সবচাইতে যেটা ভালো করেছিলেন এবং করতে পারতেন সেটা হচ্ছে সাংবাদিকতাই। কিন্তু শেষ অব্দি উনি ওখানে রইলেন না, ফিল্ম মেকিং-এ এলেন। ছবি করলেন। যদিও আমি মনে করি না তার ছবিগুলো তেমন কোনো ভালো শিল্পোত্তীর্ণ ছবি হয়েছে আমার ধারণা আর কি! তবুও তিনি একের পর এক ছবি করে যাচ্ছিলেন। যাই হোক, যে কথা হচ্ছিল, তিনি যখন আবার হঠাৎ ফিল্ম মেকিং ছেড়ে ফিল্ম সোসাইটি, মানে ফেডারেশনের ইলেকশন করতে এলেন, তখন বাদলের সঙ্গে তুমুল লড়াই হলো। তো, ওখানে তখন দুটো গ্রুপিং হয়ে গেল, একটা বাদল রহমান গ্রুপ আরেকটা আলমগীর কবির গ্রুপ। সেখান থেকেই গ্রুপিং-এর শুরু। এবং ইলেকশনে বাদল গ্রুপ জিতে গেল। যদিও বাদল এরপর ফেডারেশনের জন্য তেমন কোনো কাজই করেনি। এর কিছুদিন পরই এই ‘শর্টফিল্ম ফোরাম’ নামে একটা প্রতিষ্ঠানের নাম আমরা শুনতে শুরু করলাম। এর মূলে তারাই ছিল যারা হেরে যাওয়া আলমগীর কবির গ্রুপের সঙ্গে ছিল। এবং সেই প্রতিষ্ঠানের কাজ হলো শর্টফিল্ম করা, শর্টফিল্ম দেখানো, শর্টফিল্ম ফেস্টিভ্যাল করা- এইসব শর্ট ব্যাপার-স্যাপার আর কী! যতদূর জানি পোল্যান্ডের ক্রাকৌয়াতে একটি শর্টফিল্ম ফেস্টিভ্যাল হয়ে আসছে বহুকাল যাবৎ। এবং এই ফেস্টিভ্যালই হলো পৃথিবীর সব চাইতে শ্রেষ্ঠ শর্টফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। কিন্তু কেবলই শর্টফিল্ম নির্মাণ করব- এ ধরনের আদিখ্যেতামার্কা আন্দোলনের কথা কোথাও শুনেছি বলে মনে পড়ে না। এখন ফোরামের মুখে মুক্ত দৈর্ঘ্যরে কথা শুনছি। অচিরেই হয়তো পূর্ণ দৈর্ঘ্যরে কথাও শুনব। সুতরাং এদের আন্দোলনটা মনে হচ্ছে দৈর্ঘ্য নিয়ে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে স্বল্প থেকে শুরু করে মুক্ত দৈর্ঘ্য হয়ে পূর্ণ দৈর্ঘ্যে উপনীত হওয়ার পর তারা পূর্ণতা লাভ করবে। ব্যাপারটা ছিল ভালোই, কিন্তু কেবলই শর্টফিল্ম করব, শর্টফিল্ম এর মাধ্যমে ভালো ছবির জন্য আন্দোলন করব- এ রকম কোনো শর্টফিল্মভিত্তিক আন্দোলন পৃথিবীর কোথাও হয়েছে বলে আমার জানা নাই। আসলে শর্টফিল্ম ফোরামটা হলো একটি হিংসার ফসল। ভাবটা এই, দ্যাখ ব্যাটা ফিল্ম সোসাইটিতে আসতে পারলাম তো পাল্টা একটি প্রতিষ্ঠান করে দেখালাম। এ ধরনের কর্মকা- শুধুমাত্র ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনে হয় না। আমাদের শিল্প সংস্কৃতি এবং রাজনীতির সর্বত্র দেখতে পাবে এ ধরনের ভাঙনের খেলা। এটাকে তুমি বলতে পার আমাদের জাতীয় চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য। যার কারণে আজকে আমাদের এই অধঃপতন। শর্টফিল্মের পাশাপাশি ফিচার ফিল্মও করতে হবে। শর্টফিল্ম এরকম একটা আন্দোলন যেটা সংক্ষিপ্তাকারে বলতে গেলে, প্রথমে যখন কারও একটা ফিল্ম করার আগ্রহ জাগে তখন সে ছোট ছবি করে দেখে যে নিজের বুদ্ধি ও মেধা কতটা, নিজের দক্ষতা অর্থাৎ নিজের ক্ষমতাটাকে যাচাই করার জন্য এই শর্টফিল্ম করা। তারপর এর মাধ্যমে যখন নিজের মধ্যে একটা কনফিডেন্স তৈরি হয় তখন সে ফিচার ফিল্ম করে। শর্ট ফিল্ম অনেকটা ছোট গল্পের মতো। যার পাঠক আছে কিন্তু প্রকাশক নেই। পাবলিক উপন্যাস যতটুকু পড়তে চায়, ছোটগল্প ততটুকু পড়ে না। এভাবেই বলতে গেলে শর্ট ফিল্ম বানাতে যেমন প্রডিউসার পাওয়া যায় না, ঠিক তেমনি এসব ছবির প্রদর্শন করাটাও একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

শর্টফিল্ম যে করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কথা বাদই দেই, আমাদের এই উপমহাদেশের ফিল্মের যে-ট্র্যাডিশন দেখি তাতে অনেক বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার কোনো শর্টফিল্ম না বানিয়ে প্রথমে ফিচার ফিল্ম বানিয়েছেন এবং সেটা খুব শিল্পোত্তীর্ণ ছবি হয়েছে। বলতে গেলে কলকাতায় তো সবাই যেমন, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, উৎপলেন্দু প্রমুখ- এঁরা সবাই একাডেমিক শিক্ষার বাইরে। এদের ফিচার ফিল্ম করার ব্যাকগ্রাউন্ডে তেমন কোনো ভালো শর্টফিল্ম করার উদাহরণ নেই- একমাত্র গৌতম ঘোষ ছাড়া।

http://print.thesangbad.net/images/2019/March/13Mar19/news/Untitled-9.jpgমাহবুব : তবে তাঁদের দিয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য শর্টফিল্ম এবং ডকুমেন্টারি করানো হয়েছে।

খসরু : হ্যাঁ, সেটা করানো হয়েছে। বেশিরভাগই ডকুমেন্টারি ধরনের, যেটা সত্যজিৎ করেছেন, ঋত্বিক করেছেন, মৃণাল সেনও। সত্যজিৎ রায়ের প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি হচ্ছে ‘সদগতি’ যেটা ভারতীয় দূরদর্শনের প্রথম রঙিন ছবি। এগুলি তারা করেছেন তাদের ফিচার ফিল্ম নির্মিত হয়ে যাওয়ার বহু পরে।

মাহবুব : তারপর ‘পিকু’।

খসরু : ‘পিকু করেছিলেন ফরাসি টিভির জন্য, ‘টু’ করেছেন ঊঝঝঙ-র সৌজন্যে। আর বাকিগুলো যেমন ‘রবীন্দ্রনাথ’, ‘ইনার আই’, ‘বালা’, ‘সিকিম’ এগুলো সরকারি ফিল্ম ডিভিশনের অর্ডারি ছবি।

মাহবুব : ‘সিকিম’ ছবিটা বোধ হয় সেন্সরের কারণে এখনও প্রদর্শিত হয় নি।

খসরু : হ্যাঁ, ছবিটা নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। একবার শুনেছি ছবিটা নিষিদ্ধ। তবে যদ্দুর জেনেছি অচিরেই ছবিটা উদ্ধার করে দেখানো হবে, চেষ্টা চলছে। দুঃখজনক হচ্ছে উনি জীবিত অবস্থায় ছবিটার প্রদর্শনী হলো না।

মাহবুব : ব্যাপারটা রাজনৈতিক কারণেই...।

খসরু : রাজনৈতিক তো বটেই। গোটা ছবিটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। সেটা ভারতবর্ষের রাজনীতি এবং ছবিটা রাজনীতির একটা ভিক্টিম, কেননা সত্যজিৎ রায়েরও কিছু নিজের বক্তব্য আছে ছবিটা সম্পর্কে, ওটা পড়লে বোঝা যায় যে সিকিম তো একটা ডিসপিউটেড ইস্যু, ভারত সেটাকে অধিকার করে নিয়েছে। এটা ওদের রাজনৈতিক ব্যাপার। যাই হোক, আবার ফোরামের কথায় ফিরে আসি, ফোরাম সে সময়ে যে কাজটা শুরু করল, অর্থাৎ ব্যাপারটা একসময় এমন দাঁড়িয়ে গেল যে, যা-ই ফোরাম তাই ফেডারেশন, যেন এই দুই সংগঠনের ভূমিকা একই। ফেডারেশন বরং একটা সেকেন্ডারি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। একটা কাগজে দেখেছি ওরা প্রথমে ফোরামের নাম লিখেছে তারপর ফেডারেশনের নাম। একটা সময় যৌথভাবে অনুষ্ঠান করা শুরু করে ফেডারেশন এবং ফোরাম, যা কিছু হয় যৌথভাবে। অথচ আমি ফোরামের আগা-মাথা কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। আসলে শর্টফিল্ম ফোরামের চরিত্রটা খোলাসা নয়। ফোরাম যে কী বলতে চায় বা কী করতে চায় তা পরিষ্কার নয়। আন্দোলনের তো অনেক বছর হয়ে গেল, ফোরামের অর্জনটা কী? এখনো কিন্তু মূল যে এ্যাচিভমেন্ট, ফিল্ম করার যে-ব্যাপারটা, সেটা কিন্তু গৌণ হয়ে রয়েছে। কাজের কাজ কিছু তো হলো না, মাঝখান থেকে ফিল্ম সোইটির বারোটা বেজে গেল।

মাহবুব : আপনার কথার সূত্র ধরেই আমি একটু বলি, সেটা হলো, এদেশে যদি কোনোদিন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায় তার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব কিন্তু আলমগীর কবিরের। কারণ তিনি একটা অন্যায় জেদবশত কিছু তরুণ চলচ্চিত্র সংসদকর্মীর মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেছেন যে, এইসব ছবিটবি দেখে কিছু হবে না, নিজেরা ছবি বানাও। ছবি কী বানাল, সে যারা দেখেছে তারাই বুঝেছে। এবং এইসব ছবি নিয়েই ‘বিকল্প ধারার’ আকাশ-কুসুম কল্পনা করছে তারা। আপনার হয়তো স্মরণে থাকতে পারে, বেশ কিছুদিন আগে এক তরুণ চলচ্চিত্র সংসদকর্মী এক রাগী চিঠি দিয়েছিল আপনাকে, যার মূল বক্তব্য ছিল চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের নামে এইসব ছবি দেখানো, সেমিনার-টেমিনার করে কিচ্ছু হবে না। অতএব ধর ক্যামেরা, বানাও ছবি। তার মানে ঘুরেফিরে সেই শর্টফিল্ম ফোরাম। এবং মজা যেটা, সেটা হচ্ছে চলচ্চিত্রের মূলধারা অর্থাৎ বাজারি ছবির বিকল্প ধারা না হয়ে শর্ট ফিল্ম ফোরাম চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের বিকল্প ধারা হয়ে উঠেছে। তারা যত না ছবি বানাচ্ছে দেখাচ্ছে তার চাইতে বেশি। তাহলে আর ফিল্ম সোসাইটি বাদ দিয়ে শর্ট ফিল্ম ফোরাম করা কেন? এই কথাটাই...।

খসরু : এটা তুমি খুব একটা সঠিক পয়েন্ট উল্লেখ করেছ। আমি ঠিক ওই কথায় যাচ্ছিলাম। এটা ঠিক যে, এইসব অনভিজ্ঞ ছেলেদের মাথা সে-ই নষ্ট করেছে। সে নিজে তো আর ভালো ছবি করতে পারেনি, তার গ-ীর ভেতরে থেকে যারা ছবি করেছে তাদেরও ঐ একই অবস্থা। আলমগীর কবির লোকটাই ছিল প্রচ- ভিনডিকটিভ টাইপের। সে না থাকলেও তার প্রেতাত্মা ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। এই তো কিছু দিন আগে আমাদের নাট্য জগতের এক প্রবীণ নাট্য কর্মী মমতাজউদদীন স্যার খবরের কাগজে লিখলেন: কবিরের মতো ফিল্ম-এর উপর পড়াশোনা করা লোক দেশে আর কেউ নেই। ভাবটা এই, তিনি যেন দেশের সব ফিল্ম-বোদ্ধাদের ইয়ার। কেননা, ফিল্ম করা এমনই একটা ব্যাপার এটা যখনই স্ক্রিপ্ট থেকে শুটিং পর্যায়ে চলে গেল তখন কমপ্লিটলি ব্যাপারটা টেকনিক্যাল ব্যাপার হয়ে গেল। টেকনোলজিক্যাল। সিনেমাটোগ্রাফি, যে ব্যাপারটা, এটা আগাগোড়া একটা প্রাকটিক্যাল ব্যাপার, এটা ফিজিক্স-এর ব্যাপার। ফিল্ম-এর শুটিং যখন শেষ হয়ে গেল তারপর কেমিস্ট্রির ভিতর চলে গেল- প্রসেসিং, কালার, ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ইত্যাদি। তারপর আবার এডিটিং-এ চলে গেল। প্রচ- রকমের টেকনিক্যাল, মানে এখানে আর্ট ফার্ট-এর ব্যাপারটা ঐ রকম আসে না যতটা আর কি লেখালেখির। মধ্যে আসে। আলমগীর কবিরের সাথে আমার একদম প্রথম যখন একবার আলোচনা হয়েছিল, সেটা ১৯৬৬-তে হবে, তখন ফারুক আলমগীর, আমাদের পুরনো বন্ধু, এখন টেলিভিশনে আছে, আমাদের জামাল খান বলে আরেক প্রাক্তন ফিল্ম সোসাইটি এটিভিস্ট এখন জ্যামাইকা ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করছে সেও ছিল, ইয়াসিন আমিন ছিল- তো, আলমগীর কবির যখন জানতে চাইল তখন আমরা কিছু ছবির নাম বললাম। সে শুনে খুব অবাক হলো এবং বলল, আপনারা এসব ছবি এখানে বসে দেখেছেন? আমরা বললাম হ্যাঁ, কেন? বেশিরভাগ ছবিই আমরা সোসাইটির মাধ্যমে দেখিয়েছি, তাছাড়া হলেও ২/১টি দেখেছি। এখানে সে বলে বেড়াত সে নানান স্কুলে পড়েছে, সে নাকি ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটেও পড়াশোনা করেছে। তার ছবি দেখে কিন্তু আমার কখনও সেরকম মনে হয় নি। ইদানীং কিছু কিছু ফিল্মের প্যারাসাইড ও ভল্লা তাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সুপারম্যান বানাবার উদ্দেশ্যে তার সম্পর্কে নানান অপব্যাখ্যা দিচ্ছে। সম্প্রতি হারখা (হারুনুর রশিদ খান, দৈনিক সংবাদের প্রাক্তন চলচ্চিত্র পাতার সম্পাদক ও একটি মৃত ফিল্ম সোসাইটির কর্মকর্তা) জনকণ্ঠে এক লেখায় উল্লেখ করেছে যেআলমগীর কবির নাকি বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। এর চাইতে মিথ্যা আর কি হতে পারে! বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটিতে ‘আমিই কবিরকে ডেকে এনে সাধারণ সম্পাদক করেছিলাম। তখনই সংগঠনের বয়স চার পাঁচ বছর হয়ে গেছে। সম্প্রতি দেখতে পাচ্ছি ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতির ধুম পড়ে গেছে।

যাই হোক, আবার আগের কথায় ফিরে আসি। এই যে, শর্ট ফিল্ম ফোরাম যে কাজটা করছে, নিঃসন্দেহে অন্যায় কাজ করছে। তারা বিদেশীদের কাছ থেকে ফিল্ম করার নাম করে কিছু পয়সা-কড়ি নিচ্ছে, মানে কিছু কিছু এ্যামবেসি তাদের এত প্রিভিলেজ দিয়েছে যে, তারা ছবি তৈরির ওয়ার্কশপের নাম করে কিছু পয়সাকড়ি দিয়েছে, কিন্তু তারপর আর সে ছবির কোনো খবর নাই। যেমন, জেলেদের নিয়ে নাকি শুনেছিলাম মাসের পর মাস কী একটা ওয়ার্কশপ করল, লাখ লাখ টাকা খরচও হলো, কিন্তু সেই ওয়ার্কশপের আউটপুট, অর্থাৎ জেলেদের সেই ছবি যে কোথায়, কী হয়ে গেল আমরা তা জানি না। পাবলিক জানে কি না জানি না। অন্তত এটা দেখার সৌভাগ্য কোনোদিন কারো হবে বলে মনে হয় না। কত মালপানি নেয়া হলো, কত খরচ হলো কে খবর নেয়! নাম ধরেই বলছি, জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউট এদেশের ফিল্ম সোসাইটির ছেলেছোকড়াদের টাকা-পয়সা দিয়ে করাপট্ করছে। এই বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি কি সত্যিকার অর্থে এদেশে ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের প্রসার চায়? যদি তা-ই চাইত, তাহলে ধর আমাদের মতো আদি এক প্রথম ফিল্ম সোসাইটিকে কোনো ছবি দেখাবার সুযোগ দেয়া হচ্ছে না কেন? অথচ আমাদের সংগঠনের চাইতে অতি নগণ্য সংগঠনকে মাসের পর মাস বুকিং দিয়ে যাচ্ছে। এরা এদেশে যা করছে তাকে বলে কালচারাল সাবভারশন। (বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)

  • বিশেষ আয়োজন শিল্পের অন্বেষা

    শিল্প-জিজ্ঞাসা

    আবু হেনা মোস্তফা এনাম

    newsimage

    সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক সিনেমায় শ্রী মনমোহন মিত্র [উৎপল দত্ত] তাঁর সামাজিক ও

  • শিল্প : জীবন ও বাস্তবতার সৃজনশীল অভিব্যক্তি

    সঞ্জয় দে রিপন

    newsimage

    কখনো কাগজে কখনো ক্যানভাসে। চিত্রকর্মে বিষয় হিসেবে আসে জীবনকথা, মানুষের কথা, জড়

  • রহিমা আখতার কল্পনার কবিতা

    newsimage

    উদ্যত তোমার সঙ্গিনেরা আমাকে হত্যার জন্য উদ্যত করেছো যে মারণাস্ত্র একদিন সে নির্ভুল ঘুরে

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    আমি খুঁজছি মাহমুদ আল জামান আমি নিরন্তর খুঁজে চলেছি সেই মানবীকে যে মিছিলের মুখ হয়ে উঠেছিল যে

  • আরাধ্য স্বাধীনতার বোধ্য উপন্যাস

    এমরান কবির

    newsimage

    ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার ঝুঁকি অনেক। কারণ চরিত্রের পাশাপাশি লেখককে সময়ের প্রতি সুবিচার

  • যে আছে কাছে

    রেজাউল করিম খোকন

    newsimage

    আজ রুমকির জন্মদিন। মেয়ে বড় হয়ে গেছে। সামনেই তার এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট