menu

ভারতের বুকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ

মাটি চাপা হুঙ্কারের ইতিহাস ও নকশালবাড়ি

গৌতম গুহ রায়

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০১৯
image

(পূর্ব প্রকাশের পর)

তেভাগা’র আন্দোলনে জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সের ইতিহাস এক ব্যতক্রমী ঘটনা। এখানে কৃষকের লড়াইতে শ্রমিক যুক্ত হয়ে এক ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল। ১৯৪৬-এর ৬-৮ ডিসেম্বর আসামের লামডিংয়ে বেংগল-আসাম রেলরোড ওয়ার্কাস য়ুনিয়নের সম্মেলনে প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিলো যে; “বাংলা ও আসামের কৃষকেরা ফসলের অংশ পাওয়ার জন্য তেভাগা আন্দোলন শুরু করেছে, এই সম্মেলন মনে করে যে, যে সমস্ত জমির মালিকারে ফসল উৎপাদনে এর ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করে না, তাদের ফসলের এক-তৃতীয়াংশের বেশি পাবার অধিকার নেই।” এর ফলে, তেভাগা আন্দোলন ডুয়ার্সে এক নতুন দিশায় আভাসিত হলো। কৃষকের আন্দোলনের পাশে কাঁধ দিয়ে দাঁড়ালো শ্রমিক, নয়া ইতিহাসের দ্বার উন্মুক্ত হলো। জলপাইগুড়িতে মাধব দত্তের নেতৃত্বে তুমুল লড়াইয়ে শামিল সমতলের কৃষকেরা, ওদিকে ডুয়ার্সে মালবাজার, ওদলাবাড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় রেল শ্রমিকরা শামিল হলো সেই এলাকার কৃষকের পাশে। ১৯৪৬-এ ৩ মার্চ দোমহনীতে এক জনসভায় বিপুল আকারে অংশ নিলেন শ্রমিক ও কৃষকেরা। এর পর তেভাগা আন্দোলন আরো তীব্রতা পায়, ডুয়ার্সের বাতাবাড়ি, ওদলাবাড়ি, মেটেলী প্রভৃতি এলাকায় শ্রমিক কৃষকের যৌথ লড়াইয়ে জোতদাররা ভয় পেয়ে যায়। মাহাবাড়ির গয়ানাথের খোলানে তেভাগার সংগ্রাম প্রচন্ড আকার নেয়। মেটেলি ও মাল থানার অনেকটা জুড়ে তেভাগার ধান কৃষকেরা কেটে নেন। ৪-এপ্রিল মাহাবাড়িতে পুলিশের গুলীতে শহিদ হন নয়জন কৃষক ও শ্রমিক, এদের মধ্যে ছিলান ওদলাবাড়ির চা শ্রমিকেরাও। ১৯৪৭-এর ১ মার্চ ও ৪ এপ্রিল মোট ১৫ জন শহীদ হন মাল মেটেলি থানায়। তেভাগার আন্দোলনে তিন জেলায় এসময় মোট ৬০ জন শহীদ হন, এদের মধ্যা দিনাজপুরে ৪২ জন, রংপুরে ১ জন আর ১৭ জন জলপাইগুড়ি জেলায়। জলপাইগুড়ি জেলায় তেভাগার সূচনা পর্বে বড় ভূমিকায় ছিলো বোদা, পঞ্চগর, ডিমলা, দেবীগঞ্জ প্রভৃতি এলাকা। দেবীগঞ্জের “বুড়ি মা” বা পুণ্যেশ্বরী দেবী এক প্রবাদপ্রতিম কৃষক সংগ্রামী নারী, এই এলাকায় নেতৃত্বে ছিলেন মাধব দত্ত, তার সহায়ক ছিলেন চারু মজুমদার। তরাইতে ছিলেন পটল ঘোষ, বিমল দাশগুপ্ত, সমর গাঙ্গুলী প্রমুখ। এই আন্দোলনের সাথে সংস্কৃতি কর্মীদের সংযোগ তৈরি হয়েছিলো, লাল শুক্রা ওরাও-এর মতো লোক শিল্পীরা মেটেলি মলবাজারে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কলকাতা থেকে এসে উত্তর বাংলার আন্দোলনকারীদের পাশে থাকেন সোমনাথ হোড়, ননী ভৌমিক, সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তীরা। তেভাগা আন্দোলনের প্রবাদপ্রতীম চরিত্র কংসারী হালদার পঞ্চাশের দশকে নির্বচনে রেকর্ড ভোটে জয়ী হয়েছিলেন।

এই অঞ্চলের তেভাগা আন্দোলনের বিশেষত্ব ছিল, ১) সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা। ২) শ্রমিক কৃষক যৌথ লড়াই, ৩) মহিলাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগ ৪) সব জনজাতির, আদিবাসীদের ধর্ম পরিচয়কে দূরে রেখে অংশগ্রহণ।

অভূতপূর্ব অত্যাচার, সশস্ত্র পুলিশের আক্রমণ, জোতদার ও রাষ্ট্রশক্তির মিলিত সন্ত্রাসের কারণে এই আন্দোলন সার্বিক সাফল্য না পেলেও একথা অস্বীকার করা যায় না যে ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে তখন পর্যন্ত এটি ছিলো বৃহত্তম ও তীব্র আন্দোলন, যার সঙ্গে তুলনা চলে তেলেংগনার আন্দোলনের সঙ্গে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতার সূত্র ধরেই জন্ম নেয় নক্সালবাড়ি আন্দোলন।

১৯৬৭ থেকে ১৯৭২, এই ৫ বছর ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসের এক উদ্দাম সময়। গণআন্দোলনের ইতিহাসে নক্সালবাড়ির নাম চিরকালীন হয়ে ওঠে এর ফলে। কৃষকের হাতে বিস্ফোরিত হওয়া আন্দোলন ক্রমশ ছড়িয়ে পরে ছাত্র সমাজের মধ্যে, আলোড়িত মধ্যবিত্ত যুক্ত হন বিপুল সংখ্যায়। কবিতায় গানে চিত্রে বাংলার সমাজ সংস্কৃতি আলোড়িত হয়ে ওঠে এর ফলে, যার অভিঘাত আজকের সময়েও প্রবল ভাবে প্রাসঙ্গিক।

তেভাগা আন্দোলনের প্রায় সমসময়েই অন্ধ্রপ্রদেশের তেলেংগনায় শুরু হয়েছিলো কৃষক আন্দোলন, ইতিহাসে যা তেলেংগনা আন্দোলন নামে প্রসিদ্ধ। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সেখানে প্রায় ২৫০০ কমিউন তৈরি হয়। চীনের সমাজবাদী বিপ্লবের ন্যায় গণ-প্রজাতন্ত্রের আদর্শে আনুপ্রাণিত এই সংগ্রামীরা ১৯৪৮-এ অন্ধ্র লেটার নামে একটি দলিল তৈরি করে। এই সংগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে চলেছিলো। এই অবস্থার মাঝেই ১৯৬২-তে চীনের সঙ্গে সীমান্ত যুদ্ধে জড়িয়ে যায় ভারত, ১৯৬৫-র ৬ সেপ্টেম্বর সীমান্তে বেজে ওঠে যুদ্ধের দামামা। স্বাভাবিকভাবেই দেশের কমিউনিস্ট পার্টির উপর আক্রমণ ও নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। দলের মাঝেও চলতে থাকে অন্তর্ন্দ্বন্দ্ব। ১৯৬৪তে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বিভাজিত হয়, জন্ম হয় মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির। গোটা দেশে তখন কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যে নানা ঘাতপ্রতিঘাত যেমন চলছিলো তার প্রতিক্রিয়া এখানেও আসছিলো। ইতিপূর্বে উত্তর বাংলা ও হিমালয় সন্নিহিত অঞ্চলে কমিনিস্ট পার্টি নানা চেহারায় তাদের সংগঠন বিস্তার ঘটিয়ে চলছিলো। ১৯৪৮-এ কলকাতার পার্টি কংগ্রেসের পর সরকার পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করে। কমিউনিস্ট পার্টির অনেক নেতা গ্রেপ্তার হন। ততদিনে চা বাগান ও ডুয়ার্সে চাশ্রমিক, রেল শ্রমিক ও কৃষকদের মধ্যে পার্টি সংগঠন তৈরি করে নিয়েছিলো। এর অনেক আগেই, ১৯৩৯-এর ৬ ফেব্রুয়ারি জলপাইগুড়ি জেলায় তিন সদস্যের সংগঠনিক কমিটি তৈরি হয় কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের লক্ষে। এর আগে ১৯৩৮-এ বেংগল ডুয়ার্স রেলওয়ের হেড কোয়ার্টার দোমহনিতে বামপন্থী মনভাবাপন্ন রেরোড ওয়ার্কাস ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা হয়েছিলো। সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন বীরেন দাশগুপ্ত। এই সময় মালবাজারের নিকটবর্তী হায়হায় পাথারে এক বিশাল শ্রমিক সমাবেশ হয়, বক্তা হিসাবে এসেছিলেন ভবানী সেন। এর ফলে ১৯৪৬-এর আগস্টে মালবাজারে ৩০টি চাবাগানের (জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং যৌথ ভাবে) শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে এক সম্মেলন আয়োজিত হয়। রতনলাল ব্রাহ্মণ’কে সভাপতি ও দেবপ্রসাদ ঘোষকে (পটল বাবু) সম্পাদক করে গঠিত হয় ‘চা-বাগান ওয়ার্কাস ইউনিয়ন’। চা শ্রমিকরা এই সংঠনের প্রেরণায় আন্দোলনে নামার সাহস পায়, ১৯৪৮-এ গ্রাসমোড় চা বাগানে শ্রমিকরা দাবিদাওয়া নিয়েও আন্দোলনে নামে, ধর্মঘটের ডাক দেয়, ১১ দিন চলে এই ধর্মঘট। সমস্ত বাগিচা শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা মাথায় রেখে এরপর তৈরি হয় ‘অল ইন্ডিয়া প্লান্টেশান লেবার ফেডারেশান। সভাপতি হন রতনলাল ব্রাহ্মণ, সম্পাদক সত্যেন মজুমদার, সহ-সভাপতি সুবোধ সেন, সুশীল চ্যাটার্জি ও অচিন্ত্য ভট্টাচার্য। এরপর চলতে থাকে দাবিদাওয়া নিয়ে ব্যাপক আন্দোলন। ১৯৫১-তে বিশ্বব্যাপী মন্দার প্রভাব এখানেও পড়ে। মন্দার সুযোগে চা বাগান মালিকেরা শ্রমিকদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ছাটাই করতে শুরু করে, বিধিবদ্ধ রেসান বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৫৩-তে চা শ্রমিকের বাধ্য হয়েই ৩ দিনের চা বাগিচা ধর্মঘটের ডাক দেয়। ১৭-১৯ আগস্ট এই ধর্মঘটে প্রভূত সাড়া পড়ে। ২৫ জুন ১৯৫৪, দার্জিলিঙের ৫৬টি চা বাগানে ধর্মঘট হয়। ১৯৬৪তে সমস্ত চা শ্রমিক সংগঠনকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে তৈরি হয় ‘কো-অর্ডিনেশান কমিটি অব টি প্লান্টার্স ওয়ার্কার্স’। এভাবেই ধীরে ধীরে দৃঢ় ভিত্তির উপর শ্রমিক সংগঠন বিস্তার লাভ করতে থাকে এই অঞ্চলে, যা শ্রমিক ও কৃষকের আন্দোলনের ভিত্তিকে মজবুত করতে থাকে। কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান কাজ হয় এই ক্ষেত্রে জমি তৈরি করা। ১৯৪৩-এর মন্দার কারণে চা শ্রমিকসহ এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিলো। এর উপর ছিলো স্থানীয় জোতদারদের নিষ্পেষণ। কমিউনিস্ট পার্টি এই অনুকূল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গ্রামগঞ্জে তাদের প্রচার আন্দোলন সংগঠিত করতে থাকে, এই সময় সক্রিয় সংগঠকদের অন্যতম ছিলেন চারু মজুমদার। চুয়াল্লিশের শেষের দিকেই শিলিগুড়িতে বন্দিমুক্তি আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৪৭, দেশ স্বাধীন হলো। ১৯৪৮-এ যখন ২য় পার্ট কংগ্রেসের উদ্যোগ চলছে তখন চারু মজুমদারসহ দলের মধ্যেকার চরমপন্থীরা আওয়াজ তোলেন, ভারতীয় বিপ্লবের পথ নির্দিষ্ট করে কর্মসূচি ও রণকৌশল নিতে হবে।

১৯৬৪তে কমিউনিস্ট পার্টি বিভাজনের পর সিপিআই (এম)-এর ভেতর যারা সশস্ত্র সংগ্রামে আস্থাশীল তারা তাদের বক্তব্য জোরালো করতে থাকেন। তেষট্টিতে জেলে একসঙ্গে থাকার সময় থেকেই চারু মজুমদার পার্টির ‘বিপ্লবী লাইন’ নিয়ে বিতর্ক তুলতে থাকেন। মুজফফর আহমেদ তাঁকে তাঁর বক্তব্য লিখিতভাবে দলিল আকারে পেশ করতে বলেন। দার্জিলিং পার্টির নেতা চারু মজুমদার ১৯৬৫-৬৬ তে একে একে আটটি দলিল প্রস্তুত করে পার্টির বিবেচনার জন্য রাখেন। ১৯৬৫-র সেপ্টেম্বরে তার প্রথম ৫টি দলিল প্রকাশ করেন, সে সময় অধিকাংশ পার্টি কর্মীই জেলে। পঞ্চম দলিল লেখার পরেই গ্রেপ্তার হন চারু মজুমদার, ছাড়া পান ‘৬৬র মে মাসে। তার নতুন লাইন তখন ক্রমশ তরাইয়ের কৃষক অঞ্চলে জনপ্রিয় হচ্ছিলো। সে সময় ক্রমশ তীব্র হতে থেকে এই লাইনের প্রচার আন্দোলন, যেখানে ‘রাষ্ট্রশক্তি ধ্বংস করার জন্য স্বসস্ত্র সংগ্রাম’-এর ডাক দেওয়া হয়। ১৯৬৬ থেকেই কৃষকেরা জোতদারদের দখলে থাকা জমির সব ধান কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৬৭-র মার্চে শিলিগুড়ি মহকুমার কৃষকসভার সম্মেলনে ‘সশস্ত্র শক্তির সাহায্যে জমি দখল’-এর প্রস্তাব পাস হয়। ১৯৬৭-র গোড়া থেকেই গোটা দেশজুড়ে প্রবল খাদ্যাভাবের সংকট দেখা দিতে থাকে, সে বছর food Reviwe Committee-র সতর্ক বার্তায় জানালো দেশ এক গভীর খাদ্য সংকটের মধ্যে পড়তে চলেছে। বিহার, মধ্যপ্রদেশ প্রভৃতি রাজ্য তাদের অধিকাংশ এলাকাকে দুর্ভিক্ষ কবলিত ঘোষণা করলো। ১৯৫১তে যেখানে সারা দেশে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা ছিলো ৩ কোটি ৬ লক্ষ, সেখানে ১৯৭১-এ তা বেড়ে দাঁড়ালো ৪ কোটি ৫৪ লক্ষ। উল্টোদিকে, ১৯৬৭-৬৮ সালে ভারতের ৭৫টি বড় কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ ছিলো ৪০৩২ কোটি টাকা। এই পরিমাণ ১৯৬৩-৬৪ সালের তুলনায় ৫৪% বৃদ্ধি পেয়েছিলো। সেই সময়কালে দারিদ্র্য সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২৩ কোটি পার হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতেই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় এলো যুক্তফ্রন্ট সরকার, সাথী কম্যুনিস্ট পার্টির একাংশ। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতার এই পরিবর্তন অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন ঘটাতে পারলো না।

চারু মজুমদারেরা সংশোধীয় রাজনীতির বিরোধিতার লাইনেই থাকলেন। কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল প্রমুখকে নিয়ে তিনি শিলিগুড়ি মহকুমার বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে প্রচার ও সংগঠন বিস্তার ঘটাতে থাকলেন। দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমার তিনটি থানা নিয়েই তার পরীক্ষা চালাতে থাকলেন, নকশালবাড়ি, ফাসিদাওয়া, খড়িবাড়ি। ১৯৫৯ থেকে বেনামী জমি উদ্ধার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের জমি তৈরি করেন তারা। এই আন্দোলনকে প্রায় অভ্যুত্থানের চেহারা দিয়েছিলেন। পুলিশ ও জোতদারদের সঙ্গে এসময় কৃষকদের সংঘর্ষ বাধছিলো। ’৬৫তে যুদ্ধের কারণে অনেক কমিউনিস্ট নেতা কারারুদ্ধ হন, চারু মজুমদারও গ্রেপ্তার হন। এই সময়কালের মধ্যেই তিনি আরো ৪টি দলিল লেখা শেষ করেন, মোট ৮টি দলিলে ‘একদিকে তিনি দেখালেন যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রশ্নটি বাদ দিয়ে বা এড়িয়ে গিয়েও কমিউনিস্ট পার্টি বিপ্লবী থাকতে পারে না। কৃষকসভা ও ট্রেড ইউনিয়নের আন্দোলনের কাজকে একমাত্র কাজ হিসাবে নিয়ে অর্থনীতিবাদের পঙ্কে পার্টি নিমজ্জিত হয়। রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্তব্য কেবল কিছু দাবি দাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দিলে পার্টি সংস্কারবাদ ও সংশোধনবাদের পথে যায়। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের প্রশ্নেও যেমন করে হোক কেন্দ্র দখলের কথাই অনেক সময় ভাবা হয় যা সঠিক নয়। ক্ষমতা দখলের প্রশ্নটিকে নির্দিষ্টভাবে আনতে গেলে এলাকাভিত্তিক ক্ষমতা দখলের বিষয়েই ভাবতে হবে।’ (সৌরেন বসু/চারু মজুমদারের কথা)

এদিকে জলপাইগুড়ি জেলে বন্দি থাকার সময় চারু বাবুর অসুস্থতা বেড়ে যায়, তখন তাকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয় এবং পিজি হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়। জেল থেকে এরপর সকলেই ছাড়া পেলেন, আদর্শগত লড়াই তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৬৫-র অক্টোবরে হরেকৃষ্ণ কোঙ্গার শিলিগুড়ি এসে পার্টির জেলা সম্পাদক ম-লীর বৈঠক ডাকেন। সেখানে চারু মজুমদার, কানু সান্যাল ও সৌরেন বসুর সাথে তার বাদানুবাদ হয়। হরেকৃষ্ণ কোঙ্গার বিকালে চারু বাবুর বাসায় এলে তিনি তার ৬ষ্ঠ দলিলের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। কিন্তু সৌজন্যে-এর বাইরে আলোচনা এগোয়নি সেদিন।

১৯৬৬তে রাজ্যে পরিবর্তনের বাতাবরণ তৈরি হলো, মানুষ শাসক কংগ্রেসের উপর বীতশ্রদ্ধ, বেকারত্ব, অনাহারে মানুষ অসহায়। সেসময় গোটা বিশ্বেই ছাত্র তরুণেরা নানা রকমের প্রতিবাদে শামিল, এর ছোঁয়া লাগে বাংলার তারুণ্যেও। ক্ষোভ ও প্রতিবাদের আগুনে জ্বলে ওঠে গ্রাম, চা বাগান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ চত্বর। সেপ্টেম্বরে নকশালবাড়ি এলাকায় চা শ্রমিকদের ধর্মঘট হয়, পুলিশ ও বাগান মালিকদের পক্ষ থেকে এই ধর্মঘট ভাংগার চেষ্টা হলে উত্তেজনা আরো বৃদ্ধি পায়। বছরের শেষে সাধারণ নির্বাচন ঘোষিত হয়, ফাসিদাওয়া কেন্দ্র থেকে জঙ্গল সাঁওতাল ও শিলিগুড়ি কেন্দ্র থেকে সৌরেন বসুকে সিপিআই (এম) প্রার্থী করে। এই নির্বাচনে রাজ্যে কংগ্রেস পরাজিত হয়, প্রথম অকংগ্রেসি সরকার গঠিত হয় রাজ্যে, ২ মার্চ ১৯৬৭। তরাই ডুয়ার্সে তখন চারু বাবু আরো সক্রিয় হন। এই সময় হিন্দু চা বাগানে শ্রমিকদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। ১৯৬৭-র ১৩ এপ্রিল ফাসিদেওয়ায় চারু মজুমদার একটি ক্যাডার সভা ডাকেন। নকশালবাড়ি, ফাসিদাওয়া, খড়িবাড়ির কর্মী ও পুরানো কর্মীরা এখানে সমবেত হন। সেখানে চারু মজুমদার বললেন, ‘আমরা বিচার করছি, বিপ্লবী অবস্থা হয়েছে কি হয়নি? আম যখন পেকে গিয়েছে তখন আরো পাকবে ভেবে আমরা রেখে দিচ্ছি। কিন্তু এখন সেটা রেখে দিলে পচে যাবে। ভারতবর্ষটা ডিনামাইটে পরিণত হয়েছে। আমরা শুরু করলে বুঝতে পারব কি তার বিস্ফোরণের ক্ষমতা’। সেই সভায় আওয়াজ উঠলো, ‘ফৌজ গঠনের জন্যে জোতদার জমিদারদের বন্দুক দখল এবং গ্রামাঞ্চলে জোতদার-জমিদারদের কতৃত্ব উচ্ছেদ করে কৃষকের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই আজকের দিনের কাজ।’ মে মাস আসতে না আসতেই আরো তীব্র হয় কৃষক অভ্যুত্থানের কাজ। ৭ মে মহকুমা কৃষক সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় যে পরের দিন জমিদারি-জোতদারি উচ্ছেদে নামা হবে, লাঙ্গলের ফলা দিয়ে চিহ্নিত জমি দখল করে তা কৃষকদের মধ্যে বিলি করা হবে। ১৫ই মে প্রচুর জমি দখল করে নেওয়া হয়। শিলিগুড়ি মহকুমার একটি ছোট্টো থানা নকশালবাড়ি, এর সাথে খড়িবাড়ি ও ফাসিদাওয়া নিয়ে আয়তন ২৭৪ বর্গ মাইল, একদিকে মহানন্দা ও অন্যদিকে মেচি নদী। লাগোয়া দুটি দেশ নেপাল ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, আজকের বাংলাদেশ। প্রায় দুই লক্ষ মানুষের বসবাস এখানে, যাদের অধিকাংশই আদিবাসী শ্রমিক ও জন মুজুর, ভূমিহীন কৃষক। এদের মধ্যেই অভ্যুথানের কাজ শুরু করেন চারু বাবুরা। ২৪ মে ঘটলো সেই ঘটনাটি, রেডিও বেইজিং (পিকিং) যাকে “ভারতের বুকে বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ” বলে ঘোষণা করে। এই দিন হাতিঘিষায় নকশালবাড়ি থানার পুলিশ অফিসার সোনাম ওয়াংদি পুলিশ নিয়ে কৃষকদের এই কর্মকা-কে মোকাবিলা করতে আসেন। কৃষক বাহীনির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘাত হয় পুলিশের। তীরের আঘাতে আহত হন ওয়াংদি, পরে তার মৃত্যু হয়। পরদিন আসাম রাইফেলসের এক বিশাল বাহিনী পাঠানো হয় বিদ্রোহীদের মোকাবিলায়। সেদিন নকসালবাড়ি এলাকায় কৃষকদের আন্দোলনের সমর্থনে একটা মিছিল বের হয়, অভিযোগ যে বিনা প্ররোচনায় সেই মিছিলের উপর গুলি চালানো হয়। দুই শিশু সহ ১১ জন সেই গুলিতে নিহত হন। এদের মধ্যে আট জন কৃষক রমণী। এরা ছিলেন বোঙ্গাইজোতের ধনেশ্বরী দেবী (৩০), সরুবালা বর্মন (৩১), সোনামতি সিং (৩৪), ঢাকনাজোতের সীমশ্বরী মল্লিক (৩০), নয়ন মল্লিক (২৫), সামশ্বরী শৈব্যাণী (২৮), গাউদ্রাঊ শোইব্যানী (২৮), ফুলমতি সিং (২৫), খড় সিং (৩১) ও প্রহ্লাদ সিং (৩০)। সংবাদপত্র এই ঘটনাকে “নকশালবাড়ি অভ্যুথান বলে চিহ্নিত করে।

পরদিন সিপিআই (এম)-এর প্রবীণ নেতা প্রমোদ দাশগুপ্ত শিলিগুড়ি এসে এই ঘটনাকে প্যারি কমিউনের সাথে তুলনা করেন। এই আগুন ধীরে ধীরে গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে যায়।

কলকাতার রামমোহন লাইব্রেরি হলে এক বিরাট কনভেনশনে গঠিত হলো নকশালবাড়ি ও কৃষক সংগ্রাম সহায়ক কমিটি। সভাপতি হন প্রমোদ সেনগুপ্ত, সম্পাদক পরিমল সেনগুপ্ত। সুশীতল রায়চৌধুরী, সত্যানন্দ ভট্টাচার্য কমিটিতে থাকেন। কনভেনশানে প্রস্তাব নেওয়া হয়, অবিলমবে তরাই থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করতে হবে, বন্দী কৃষকদের মুক্তি দিতে হবে। এই কনভেনশান পরবর্তী সময়ে প্রতিবাদ আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা নেন ছাত্র সমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা। বিদেশের প্রচার মাধ্যমে এই ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হতে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়সহ রাজ্য সরকারের মন্ত্রীরা আসেন বিক্ষোভ উত্তাল এই অঞ্চলে। ৩০ মে সিপিআই (এম) সম্পাদক মন্ডলী প্রস্তাব নেয় যে, “নকশালবাড়িতে শিশু নারী কৃষকদের উপর যে নৃশংস হত্যালীলা হয়েছে তাতে স্তম্ভিত। সম্পাদকমন্ডলীর দৃঢ় প্রত্যয় জন্মেছে যে, নকশাবাড়ির কৃষক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে এক গভীর সামাজিক ব্যাধি। পুলিশের কার্যকলাপ দেখে মনে হচ্ছে যে তারা প্রতিশোধ নেবার জন্যই এ কাজ করেছে। ২ জুন পার্টির মুখপত্র দেশহিতৈষী’ লিখলো ‘নকশালবাড়িতে যুক্তফ্রন্ট সরকারের কলঙ্কময় অধ্যায় রচিত হয়েছে।’

১৯৬৭তে সুশীতল রায়চৌধুরীরা বেরিয়ে গিয়ে প্রকাশ করেন ‘দেশব্রতী’। ‘দেশব্রতী’ হয়ে ওঠে নকশালবাড়ি আন্দোলনের মুখপত্র। জুলাই থেকে নভেম্বরের মধ্যে বাংলায় ‘দেশব্রতী’, ইংরেজিতে ‘লিবারেশান’, হিন্দিতে ‘লোকায়ুধ’ সংগ্রামী মুখপত্র হিসাবে প্রকাশিত হতে থাকল। ১২-১৩ নভেম্বর তামিলনাড়ু, উত্তর প্রদেশ, বিহার, কর্নাটক, উড়িষ্যা ও পশ্চিম বাংলার সংগঠকেরা মিলে AICCR (All India Committee of Communist Revolutionaries) গঠন করে। ১৯৬৯ এর ২২শে এপ্রিল AICCCR ( All India Coordination Committee of Communist Revolutionaries) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঈচও (গখ) গঠিত হয়। চারু মজুমদার এর সম্পাদক হন। ১ মে শহীদ মিনারে পার্টির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন কানু সান্যাল। এর পরের ইতিহাস ভারতের ইতিহাসের অন্যতম রক্তাক্ত ইতিহাস। বিহারের মুসুল, উত্তর প্রদেশের লখিমপুর, বাংলার ডেবরা গোপীবল্লভপুর প্রভৃতি অঞ্চলে তথাকথিত মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করলো সি পি আই (এল এল)। কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক নির্মন দমন-পীড়নে নমলো। ১৯৭১-এ সরোজ দত্ত হত্যাকা- ঘটলো। ১৯৭১-এই বরানগরে একদিনে ১৫২জন পার্টি কর্মী ও সমর্থককে হত্যা করা হলো। ৫০ হাজার নকশাল কর্মীকে হাজতে পুরে রাখা হলো। এদের মধ্যে অধিকাংশ ছিলেন কৃতি ছাত্র। ১৯৭২-এর ১৬ জুলাই এন্টানি থেকে ধরা পড়লেন চারু মজুমদার। ২৮ জুলাই পুলিশ লকাপে তার মৃত্যু হয়।

নকশালবাড়িকে কেন্দ্র করে যে অভূতপূর্ব গণসংগ্রাম এই দেশে জন্ম নিয়েছিলো, যে আন্দোলন দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রকে আলোড়িত করেছিলো তা ক্রমশ স্তিমিত হতে থাকলো। এই আন্দোলন নিছক একটি কৃষক আন্দোলন ছিলো না, কেবলমাত্র একটি রাজনৈতিক আন্দোলন হিসাবে দেখলে চলবে না। এটি দীর্ঘদিনের বঞ্চিত মানুষের ‘বজ্র নির্ঘোষ’ ছিলো। সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের কণ্ঠস্বর কীভাবে সমাজে সবাক হতে পারে তার একটি প্রক্রিয়া ছিলো এই আন্দোলন। কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার বিরুদ্ধে এ ছিলো এক স্থায়ী অভিঘাত জাগানো আন্দোলন। (সমাপ্ত)

  • বিশ্বসাহিত্য সংখ্যা চার

    ক্যারল অ্যান ডাফি এই সময়ের কবি

    উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    আবেগপ্রবণতা অথবা কাঠিন্য, কৌতুকরসবোধ অথবা গীতিবিন্যাস, রীতিবিরুদ্ধ মনোভাব অথবা প্রচলিত ধারা, যাদুবাস্তবতা

  • ক্যারল অ্যান ডাফির কবিতা

    ভাষান্তর : উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    তাঁর মুক্তাগুলোকে উদ্দীপ্ত করা আমার নিজের ত্বকের পাশে, তাঁর মুক্তা খচিত গহনা। আমার

  • ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে

    হাসান অরিন্দম

    newsimage

    একটি চিহ্নিত ভূখন্ডে মানবসন্তানের জন্ম হয়, আর আমরা পাই এক-একটি মাতৃভাষাও। সেই

  • ডব্লিউ এস গ্রাহাম-এর অপ্রকাশিত কবিতা

    ভূমিকা ও অনুবাদ : মিলটন রহমান

    newsimage

    সম্প্রতি স্কটিশ কবি ডব্লিউ এস গ্রাহাম-এর কিছু অপ্রকাশিত কবিতা প্রাপ্তির কথা জানিয়েছে

  • একজন মানুষ

    মূল : ভায়াকম মোহাম্মদ বশীর
    ভাষান্তর : নীতিন রায়

    newsimage

    আপনার নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নেই। আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে বহুদূরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

  • আষাঢ়ে, বরিষণে

    newsimage

    তোমার কথা ভাবছিলাম বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তোমার কথা ভাবছিলাম তুমি এলে না, বৃষ্টি এলো সেই

  • নিরাপত্তা

    জান্নাতুল ফেরদৌস

    newsimage

    বেলা এগারোটার দিকে আমি পৌঁছালাম সেই গ্রামটাতে। এখন আমি ভিকটিমের বাড়ির ছোট

  • কানিজ পারিজাতের শিহরন জাগানো গল্পগ্রন্থ ‘জলশিহরন’

    অঞ্জনা সাহা

    newsimage

    কানিজ পারিজাত একজন গল্পকার। কিন্তু তাকে আমি কবি বলেই জানতাম! প্রথম যেদিন