menu

মহাস্থানের হাজার বছর

সৌম্য সালেক

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮
image

‘মহাস্থান’ নাটকের একটি দৃশ্য

নাটককে প্রাচীন কলাশাস্ত্রবিদগণ ‘দৃশ্যকাব্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। নাটকের মধ্যে বিশেষ কালপ্রবাহ আসতে পারে, আখ্যান ও তার পর্যায়ক্রমিক বর্ণনা আসতে পারে, বৃহৎ রাজকীর্তিমালাও থাকতে পারে; যেমনটি আমরা সফক্লিস, শেক্সপিয়র, বার্নার্ড শ, হেনরিক ইবসেন কিংবা হেরল্ড প্রিন্টারের নাট্যরচনায় লক্ষ্য করে থাকি। কিন্তু একই সাথে বৃহৎকালপ্রবাহ এবং অনেক আখ্যান, উপ-আখ্যানের পরম্পারায় বিশেষ জাতিসত্তার ইতিহাস উপস্থাপনা হয়ত জগতের খুব কম নাটকের মধ্যেই ঘটেছে; মহাস্থান নাটকে এমনই এক কীর্তিধারা উপস্থাপিত হয়েছে যা সত্যিই বিরল। এটা হয়তবা নাটকটির প্রকরণগত কারণেই অনেকাংশে সম্ভব হয়েছে।

মহাস্থান প্রতœনাটক। প্রতœনাটক ধারণাতে যা রয়েছে প্রকৃতার্থে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডমি প্রযোজিত তিনটি নাটক: সোমপুর কথন, উয়ারীবটেশ্বর এবং মহাস্থান এর থেকে ভিন্ন কিছু; আঙ্গিক, উপস্থাপন কৌশল, সমন্বয়রীতি, অভিনয়কলাসহ প্রায় সর্বাংশে। আর্কিও ড্রামা বিশ্বে আর কোথাও এভাবে মঞ্চায়িত হয় না। আর্কিও ড্রামা নামকরণের প্রেক্ষিতে পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতার নানা ঘটনাবলীকে লোকসমুখে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। একেবারে প্রতœস্থলে খননে-উদ্ভাবিত স্থাপনাপটে আর কোথাও এভাবে নাটক হয় না। একেবারে নিজস্বধারায় প্রতœনাটকের যে চর্চা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি গত কয়েক বছর ধরে করছে তা অত্যন্ত ইতিবাচক, এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং নাট্যচর্চার এই প্রক্রিয়া বিশ্বব্যাপী প্রচারিত হলে ‘প্রত্ননাটক’-এই পদবাচ্য ব্যবহারের সাথে বাংলাদেশের নামও পাশাপাশি উচ্চারিত হবে।

মহাস্থান সম্পর্কে মাহবুবুল হক, নাটকের নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মহাস্থান নাটক তো তাহলে কেবল মহাস্থানের ইতিহাস থাকলো না?’ এর জবাবে তিনি বলেছিলেনÑ ‘হ্যাঁ তাই, এটা কেবল মহাস্থানের ইতিহাস নয়। এটা মহাস্থানের গৌরবোজ্জ্বল আখ্যানের ভিতর দিয়ে সমগ্র বাংলার মহাস্থান হয়ে ওঠার গল্প। মহাস্থান বলছে কোটি বছরজুড়ে এ মাটির জেগে ওঠার কথা। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তার গড়ে ওঠার কথা। হাজার বছর ধরে তার মানব বসতির কথা। কবে থেকে বসতি গড়ে উঠল এখানে? কারা গড়ে তুললো সেই বসতি? কোন ইতিহাসের ভিতর দিয়ে মহাস্থান নামে এই বৃহত্তর বাংলা, মহাস্থান সে প্রশ্নগুলোর মীমাংসা খুঁজে খুঁজে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত একটি সম্পন্নতায় পৌঁছেছে। নাট্যকার সেলিম মোজাহার ইতিহাসের মৌলিক উপাদানের সাথে এ নাটকে ব্যবহার করেছেন লোককথা, লোকশ্রুতি, কল্পনা-কিংবদন্তিসহ নানা সাংস্কৃতিক উপাদান। গৌতম বুদ্ধ, আলেকজান্ডার থেকে আরম্ভ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত দীর্ঘকালপর্বে অসংখ্য চরিত্রের আগামন ঘটেছে এ নাটকে।

নাটকের ঘটনাপ্রবাহকে ১২টি আখ্যান ও ২৪টি উপ-আখ্যানে বিন্যস্ত করে উপস্থাপন করা হয়েছে। মহাস্থান প্রযোজনাটি এমন হয়েছে যে, এর যে কোন একটি অংশ, আখ্যান বা উপ-আখ্যান থেকে নাটক বা নৃত্যনাট্য গড়ে উঠতে পারে। এ নাটক এমন একটি সার্বিক প্রযোজনা হয়ে উঠেছে যে, এটি অনেক ধারণা বা শিল্পমন্ত্র উস্কে দিতে পারে যা থেকে আরও শিল্পনির্মিত গড়ে উঠতে পারে।

মহাস্থান মঞ্চস্থ হয়েছে ভাসুবিহারে। ভাসুবিহারের তিনটি মৌলিক স্থাপনাকে মূলমঞ্চ করে মধ্যবর্তী স্থানে আরো তিনটি মিনিয়েচার-ধর্মী কৃত্রিম মঞ্চ তৈরি করা হয় এবং মঞ্চ তিনটির অগ্রভাগের উন্মুক্তস্থানকে কালের লীলাক্ষেত্রে তথা ঘটনাবলীর প্রভাবে সৃষ্ট লোক-মানুষের আবর্তনপট কিংবা পাদপীঠরূপে উপস্থাপন করা হয়। মহাস্থান নাটক উপস্থাপনের এই প্রক্রিয়া ও পরিকল্পনা অত্যন্ত দুরূহ ও চমকজাগা। উপস্থাপনকৌশল, পোশাক ও গীত নির্বাচনসহ সম্পূর্ণ প্রযোজনাটিতে নির্দেশক লিয়াকত আলী লাকী তাঁর নাট্যপ্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন।

মহাস্থান-এর মহড়া হয়েছে দেড় বছর। এ নাটকে অভিনয় করেছেন ৩৫০জন নাট্য ও নৃত্য শিল্পী। ঢাকার বিভিন্ন নাট্যদলের সাথে নাটকটিকে অংশগ্রহণ করেছে বগুড়া ও গাইবান্ধা জেলার শিল্পীবৃন্দ। প্রত্যেকেই জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পসাধনা হিসেবে ভেবে মহাস্থানে কাজ করেছেন। নেপথ্যের সহ-নির্দেশক, শব্দ ও আলোক প্রকৌশলী, পোশাক সংযোজনাসহ সবমিলিয়ে প্রায় ৪০০ শিল্পী কলাকুশলী এ নাটকে কাজ করেছেন। মহাস্থান নাট্য-উপস্থাপনার ক্যানভাসের ব্যাপ্তি ৫০ হাজার বর্গফুট আর প্রথম দিনে নাটকের শো দেখেছেন প্রায় বিশ হাজার দর্শক। সব মিলিয়ে ‘মহাস্থান’ নাট্যজগতের এক মহা-সংযোজন। এ নাটকে নান্দীপাঠ করেছেন বিশিষ্ট নাট্যজন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠে নাটকের প্রারম্ভ ও সমাপ্তি উপস্থাপনা, এ প্রযোজনার ঐতিহাসিক দৃঢ়তাকে সমৃদ্ধ ও সংহত করেছে।

(দুই)

আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃষ্টির যে প্রাচুর্য রয়েছে, প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো তার মধ্যে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ। মহাস্থানগড় দেশের এক প্রাচীন পুরাকীর্তি। প্রসিদ্ধ এই নগরী একসময় বাংলার রাজধানী ছিল। এখানে জনপদ গড়ে উঠেছে প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে। বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানগড়কে ২০১৬ সালে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণা করা হয়। প্রতœতাত্ত্বিক স্থান নিয়ে তৃতীয় কাজ হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি মহাস্থানগড়ের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে দৃশ্যপটে তুলে এনেছে। শিল্পকলা একাডেমি তথা বাংলাদেশের নাট্যজগতের এক মহাকাব্যিক উপস্থাপনা এই নাটক।

মহাস্থানগড়ের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীরবেষ্টিত এই নগরীর ভেতর রয়েছে বিভিন্ন সময়ের নানা প্রতœনিদর্শন। কয়েক শতাব্দি পর্যন্ত এ স্থান পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী এবং পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল। তৃতীয় খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অসংখ্য হিন্দু রাজা ও অন্যান্য ধর্মের রাজারা এখানে রাজত্ব করেছিল। ‘মহাস্থান’ নাটকের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সময়ের শাসন-শোষণের ঘটনা উঠে এসেছে। ঐতিহাসিক এই স্থান একসময় ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবেও পরিণত হয়। ধর্মের বাণী বুকে নিয়ে কেউ মানবতার গান গেয়েছেন, কেউ আবার মানুষের অধিকার নষ্ট করেছে। মহাস্থানগড়ের এসব কীর্তি, কৃষ্টি ও সভ্যতার ইতিহাস রয়েছে নাটকের আখ্যানের পুরোভাগে।

মহাস্থানগড়ের প্রাচীন ইতিহাসের সাথে কাল-পরম্পরায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বিস্তৃত সময়কাল নিবিড় গ্রন্থনায় এখানে উঠে এসেছে। সর্বোপরি বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসকে বিভিন্ন ঘটনায়, প্রতীকে, উচ্চারণে, আবাহনে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখেছি নাটকজুড়ে। এখানে প্রাচীন শিকার যুগ থেকে শুরু করে বৈদিকযুগ, আদিবাসী পর্ব, রামায়ণের গীত, কালিদাসের কাব্য, চর্যাপদ, সুফিসামা, বৈষ্ণব পদাবলী, ব্রাহ্মসংগীত, লোকগান, বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, ব্রতচারীগান, পঞ্চকবির গান, ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ইতিহাস কাব্য-গীত, বর্ণনা, কথকতা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় পালাগীত-কথনে প্রকাশিত হয়েছে। নাটকে আমরা লক্ষ্য করেছি হযরত শাহ বল্খী (রঃ) এর মহাস্থানগড়ে আগমন, পরশুরামের সাথে তার যুদ্ধ এবং ধর্ম প্রচার পরবর্তীতে ‘মহাস্থান’ নাটকের গল্প মহাস্থানগড় থেকে বেরিয়ে পড়ে। তারপর নাটক এগিয়েছে বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস মোতাবেক আর সেটা আরম্ভ হয়েছে পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে তারপর বৃটিশবিরোধী নানা সংগ্রাম ও সংকট, পাকিস্তানী দুঃশাসন এবং সর্বোপরি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনসহ সাম্প্রতিক উন্নয়ন ও অর্জনের অগ্রবর্তীতায় এসে ‘মহাস্থান’ নাটকের সমাপ্তি ঘটে। নাটকের ব্যাপ্তি প্রায় আড়াই ঘণ্টা। কিছু জায়গায় নাটকের গতি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া নান্দীপাঠ ও সমাপ্তি উপস্থাপনার ভিজ্যুয়াল পরিবেশনার চলচ্চিত্র ও স্থিরচিত্র নির্বাচনে আরেকটু ভাবার অবকাশ রয়েছে বলে মনে হয়েছে। নাটকে ভিডিও কিংবা নির্মিতির বিষয়ে নির্দেশক আরেকটু ভাবলে ‘মহাস্থান’ নাটকের মঞ্চায়ন আরও অপূর্ব হবে বলে বোধ করছি। ‘মহাস্থান’-এর মঞ্চায়ন খুব ব্যয়সাপেক্ষ হলেও এটি যেহেতু নির্মিত হয়ে গেছে সুতরাং ঢাকার কোনো স্টেডিয়ামে এবং ভাসু বিহারে এ নাটকের আরও অন্তত তিনটি মঞ্চায়ন হওয়া জরুরী কেননা এটি কেবল বিনোদনধর্মী কাজ নয়, এটি আমাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক যূথবদ্ধ শিল্পনির্মিতি।

আমাদের যে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের আলোকিত অধ্যায় রয়েছে, ‘মহাস্থান’ নাটক দর্শক-শ্রোতা বিশেষত নতুন প্রজন্মের সামনে সেই ঐতিহ্য ও সভ্যতাকে নান্দনিকভাবে প্রকাশ করেছে, যা আমাদের সর্বসাম্প্রতিক বাস্তবতায় অনেক বেশি জরুরী। ‘মহাস্থান’-কে কেবল নাটকের আঙ্গিক-আয়তনে ভাবলে বা বিবেচনা করলে বড় কম হবে। মহাস্থান, নাট্যপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে উপস্থাপিত বাঙালি জাতিসত্তার শিল্পস্মারক। মহাস্থানগড়ে মানব বসতি আরম্ভ হয়েছিল হাজার বছর পূর্বে, সেই থেকে আমাদের পথ চলার সূচনা। আর সেই ইতিবৃত্তে গড়া নাটক ‘মহাস্থান’ আমাদেরই পূর্বাপর। মহাস্থানের হাজার বছর যেন বাঙালির শিল্পময় অগ্রযাত্রা।

  • সিকদার আমিনুল হক সম্পর্কে

    বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা

    সাক্ষাৎকার

    newsimage

    [কবি সিকদার আমিনুল হকের ডাকনাম দীপক। দীপকের বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা। বর্তমানে তিনি

  • আজ সিকদার আমিনুল হকের ৭৭তম জন্মদিন : শ্রদ্ধাঞ্জলি

    সিকদার আমিনুল হকের গদ্য রচনা

    ফারুক মাহমুদ

    newsimage

    সিকদার আমিনুল হক মূলত কবি। ‘বিপুলপ্রজ’ কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতিও রয়েছে। বেঁচে

  • আমার বাবা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবেন

    সালমান তারিক মিশা

    newsimage

    ছোটবেলা থেকে আমি খুব একা থাকতাম। স্কুলে ভর্তি হই ১৯৭৫ সালে গভর্নমেন্ট

  • মহাদেব সাহার কবিতা

    newsimage

    [মহাদেব সাহা ষাটের দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি

  • নিরাপত্তা রক্ষী

    এম নাঈম

    newsimage

    লাশটি মাটির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আর গ্রামের মানুষরা চারিদিকে জটলা

  • অজানার ডাকে

    কণিকা রশীদ

    newsimage

    গত সতের দিন ধরে অন্ধ রজব আলী বসে আছে বকুল গাছের তলায়।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    চতুর্দশপদী চিঠি মার্গারিটার কাছে ফাউস্ট মাহফুজ আল-হোসেন আমায় তুমি ক্ষমা কোরো না গ্রেচেন, আর করবেই