menu

মহাদেশের মতো এক দেশে ৬

কামরুল হাসান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

http://print.thesangbad.net/images/2019/February/06Feb19/news/Untitled-31.jpgহক্‌সবুরি রিভার স্টেশনে একা বসে আছি প্রকৃতির অমলিন ঔদার্যের ভিতর। স্টেশনের ওভারব্রিজ পার হয়ে রবিনসন ক্রুসো এসে পাশে বসলেন। তার নাম ক্রেইগ ডোরান। মুখভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, নীল চোখ, লালচে মুখের প্রৌঢ়ত্বে পা দেয়া মানুষটিকে হলিউডের কেউ বলে ভ্রম হতে পারে। মাথার হ্যাটখানিও wild wild west-এর হিরোদের মত। মুখখানি খুব একটা বড় নয়, তবে চোখ দুটো তীক্ষ্ণ। তীক্ষ্ণচোখে তাকে খুটিয়ে দেখছিলাম। পরিপাটি নয়, তার পরনে কর্মজীবী মানুষের পোশাক। তার কাজ নৌকা বানানো। যে নৌকাটি থেকে নামলেন, যেটি নিচে ঘাটে বাঁধা আরো দুটি বোটের সাথে, সেটি তার নিজের হাতে বানানো। শুধু সেটাই নয়, হকসবুরি নদীর চর ঘেঁষে যে জলসাম্রাজ্য সেখানে ভেসে থাকা বোটগুলোর কয়েকটি তার তৈরি। আঙুল তুলে অর্ধবৃত্তাকারে হাত ঘুরিয়ে বোটগুলো দেখালেন। বল্লেন, এ জলসাম্রাজ্যের নাম হকসবুরি রিভার স্যাঙ্কচুয়ারি।

ক্রেইগের সঙ্গে যখন কথা বলছিলাম তখন কয়লা বহন করে এমন একটি মালবাহী ট্রেন প্লাটফর্ম ঘেঁষে বেরিয়ে যাচ্ছিল। ক্রেইগ বলল, ট্রেনটি নিউ ক্যাসেল ফিরে যাচ্ছে, সেখানে বেশ ক’টি কয়লাখনি আছে। গোলাকার কার্গোগুলোর গায়ে কারা যেন গ্রাফিত্তির শিল্প এঁকেছে। খালি বগিগুলো হয়ে উঠেছে শিল্পপ্রদর্শনীর মতো। চলচ্ছবিময় সে প্রদর্শনী যতক্ষণ চোখের উপর ছিল, ততক্ষণ ক্রেইগের সাথে আর কথা বলিনি। ক্রেইগ ততক্ষণে মদের একটি বোতল খুলেছে। খুলেছে ঠিকই, কিন্তু পান করছে না। তার আগ্রহ আমার সাথে কথা বলায়। সে অনেকগুলো দেশ ঘুরেছে, যেমন ইতালি ও ফ্রান্সে গিয়েছে, কিন্তু প্রতিবারই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে এসেছে। নিজ দেশই তার প্রিয়। যৌবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু শেষ করেননি, তার শখ নৌকা বানানো এবং নৌকায় চড়ে ভ্রমণ। ইতালির কথা বলার সময়ে সে ইতালির মেয়েদের দেহকাঠামোর প্রশংসা করলে (বাতাসে হাত ঘুরিয়ে চমৎকার কার্ভেচার আঁকছিল সে) বুঝি বয়স ভারি হলেও মানুষটি রোমান্টিক। আমার প্রশ্নের মুখে স্বীকার করলেন গোটা জীবনে অনেক নারীর সাথেই তার সম্পর্ক ঘটেছে। ‘কতজন?’ আমার এ প্রশ্নে হাসি দিয়ে বললেন, ‘I forgot to count’. পরে কী ভেবে ডান হাতের পাঁচটি আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘May be five’। তার কথা থেকে বুঝলাম টুকটাক অনেকগুলো প্রণয় থাকলেও ৫/৬টি পরিপক্ক সম্পর্ক ছিল। আমায় বললেন, একবার চাকরি নিয়ে তাসমানিয়ায় গিয়েছিলেন, সঙ্গে গার্লফ্রন্ড (ঐ পঞ্চমার একজন)। মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে পড়ে। ‘I made it’, বেশ আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বললেন ক্রেইগ, মুখে গর্বের হাসি। অকৃতদার মানুষটি নিজের বন্ধনমুক্ত জীবন উপভোগ করেন, বললেন, ‘You can’t play God’। তার কথাবার্তায় অন্য যে সুরটি বেজে উঠলো তা প্রথাবিরোধিতার, রাজনীতিবিদদের প্রতি তার আস্থা নেই, রাজনীতিবিদদের প্রতিশ্রুতি না রাখার বিরুদ্ধে চাপা রাগ রয়েছে।

http://print.thesangbad.net/images/2019/February/06Feb19/news/Untitled-33.jpgআমি আর ক্রেইগ যখন কথা বলছি, ক্রেইগ তখনো তার বোতলে মুখ লাগায়নি, তখন দুজন প্রৌঢ় মানুষ রেলওয়ে ওভারব্রিজের উপর থেকে আমাদের দেখছিল, আমরা তাকালে সুন্দর করে হাত নাড়লো। ট্রেন এসে পড়ে, ক্রেইগ ও আমি ট্রেনে উঠে পড়ি। দেখি ট্রেনের বাম পাশে পাহাড়, ডান পাশে হারবার। জল ও পাহাড়ের দৃশ্য বহুদূর ট্রেনের দুপাশে লটকে রইলো। জলদৃশ্য টেনে এনে ট্রেন এসে পড়েছে পাহাড়ের পাদদেশে, পাহাড়ের বক্রতা ঘেঁষে সে সাপ কিংবা নদীর মতো শরীর বাঁকাচ্ছে কেবল। প্রথম জলপিঠ দেখে যে প্রবল উৎসাহ জেগে উঠেছিল, ক্রমাগত একই দৃশ্য দেখে দেখেও তা কমে না, তবে প্রশ্ন হচ্ছে একই প্রকার কয়টি ছবি আমি তুলবো। আমার ঐ অস্থির চিত্রধারণ ক্রেইগ কৌতুকের সাথে লক্ষ্য করে। সে এই পথে প্রায় নিয়মিতই যায়, চোখে সবদৃশ্য সাঁটা, আমার চোখে সবই প্রথম। ডড়ু ডড়ু স্টেশনে ক্রেইগ নেমে গেল। আমিও নামলাম, কেননা আরমান যে চিত্রনাট্য লিখে দিয়েছিল তাতে আমার এখানে নামার কথা। যে ভুলটা হলো তা হচ্ছে গল্পের তোড়ে সদালাপী ও আকর্ষণীয় মানুষটির ছবি তোলা হয়নি। স্টেশনে একটি পরিবারের সাথে পরিচয় হলো। দুটি মেয়ে, তারা যে পরস্পরের বোন তা কেবল তারা যে হুবহু একই জামা পরিহিতা তা নয়, তাদের চেহারা প্রায় একই, দেখে বোঝা যায়। বড়টি বছর দশ হবে, উঁচু হয়ে ট্রেনের ছাদ থেকে ঝোলানো হাতল ধরছিল, সে যে বড় হয়েছে তা বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টা। ছোটটি ৪/৫ বছরের হবে, বেশি স্মার্ট। আমার নাম জিজ্ঞেস করলো। ওর নাম ঊষধ, বড়টির নাম Garcia। ওদের মা দীর্ঘদেহী, সঙ্গে নানীও ছিল, অর্থাৎ তিন প্রজন্ম এক সাথে। প্ল্যাটফর্মে ওদের সবার একটি গ্রুপ ছবি তুলতে চাইলে ইলা ও গার্সিয়ার মা জিজ্ঞেস করেন, ‘What’s for?’ আমি যখন বললাম, ‘for memory’ তখন দাঁড়ালেন। কথাহীন নানীর মুখে মিটিমিটি হাসি। ইলা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি স্প্যানিশ বলি কি না, তখন অনুমান করলাম ওরা স্প্যানিশ। ওদের মা বলল, তা নয়, তোমার ইংরেজি উচ্চারণ শুনে মনে হয়েছে তুমি স্প্যানিশ। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন আমি হিন্দি বলি কি না। ‘You are from India, aren’t you?’ তার জিজ্ঞাসা। তাকে বাংলাদেশের কথা বলি, আর ইলাকে ডায়েরিতে লেখা বাংলা দেখিয়ে বলি, ‘I speak Bangla’।

উয়ি উয়ি স্টেশনে দাঁড়িয়ে ভাবি, এখানে কী কাজ আমার? গোটা স্টেশনে আমিই একমাত্র লোক। স্টেশনের নামটি বেশ ছন্দোময়, বোধকরি আদিবাসীদের দেয়া নাম, সেখানে পাহাড় আর হ্রদসদৃশ্য জলপিঠের নৈসর্গিক কোলাজ। তখন বিকেল ৫:১৫ বাজে, ক্ষুধা লেগেছে, কিন্তু খেতে পারছি না, কেননা ছোট স্টেশনটিতে কোন ফুডশপ নেই। স্টেশনটির পূর্বপার্শ্বে শহর, পশ্চিমপার্শ্বে হ্রদ (না কি হারবার?), জায়গাটি পাহাড়ঘেরা। রৌদ্রকিরণ অতিউজ্জ্বল হলেও তাপমাত্রা সহনীয় হয়ে এসেছে। এখানে ট্রেন আসে বেশ দেরিতে। পরবর্তী ট্রেন আসবে ৪০ মিনিট পরে। এই চল্লিশ মিনিট আমার অনুপম দৃশ্যভোজ, দেহ যদিও ক্ষুধার্ত।

প্রকৃতির কোলে বসে থাকা রূপবতী কন্যা এই ডড়ু ডড়ু স্টেশন। কবিরা এখানে বসে সারাদিন কাব্য রচনা করতে পারবেন, শিল্পীরা আঁকতে পারবেন ছবি। তবু তার রূপ বর্ণন বা অঙ্কন ফুরোবে না। সে স্টেশনে বসে আছি পৌনে এক ঘণ্টা, একটুও বোর ফিল করিনি, হয়তো আরও থাকতাম, কিন্তু আজকের যাত্রার মক্কা গসফোর্ডে এখনো যাওয়া হয় নি। এর মাঝে একটি ভিন্ন চেহারার ট্রেন এসে পড়ে, মাথা তার গসফোর্ড অভিমুখী। এটিও দোতলা ট্রেন, তবে এর রঙ অচেনা। রেলের এক কর্মীকে জিজ্ঞেস করি, সেই ট্রেন ধরে আমি গসফোর্ড যেতে পারবো কি না। সে যখন মাথা নাড়ে আর মুখে বলে, হ্যাঁ, তখন উঠে পড়ি।

ট্রেনটির ভিতরে একটি ভিন্ন চিত্র পাই, সব সিট জুড়ে মানুষ বসে আছে, মুখোমুখি সিটগুলোর মাঝে সামান্য পরিসর, বসে থাকা যাত্রীদলও বেশ স্বাস্থ্যবান, ফলে ফাঁকটুকু আরও কমে অপ্রবেশ্য হয়ে আছে। অনেকেই আবার পা ছড়িয়ে বসে আছে, নড়ার বা সরে বসার কোন লক্ষণ নেই। তাদের মোটাসোটা দেহ, প্রকান্ড ঊরু ও মাংসল বাহুর ভেতর জগতের খাদ্যসম্ভারের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকি ও মাঝপথে ট্রেনে ওঠা যাত্রীদের প্রতি তাচ্ছিল্যভাব প্রকটিত। ততক্ষণে জানালাপার্শ্বে দেখা দিয়েছে নীলজলপিঠ ও তাতে চড়ে থাকা জলযানসমূহ। ‘Can I sit?’ আমার অনুরোধে সাড়া দেয় না একজনও, যদিও জায়গা আছে, দুজন বসে আছে তিনজনের সিটে, নড়ার জায়গা থাকলেও তারা অনিচ্ছুক। কী আর করা, পালোয়ানদের ঘাঁটানোর সাহস নেই আমার। একজন কালো পালোয়ান, তাকে কালা পাহাড় বলা যায় নিঃসঙ্কোচে, ঘুমাচ্ছিল। আমার ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দে জেগে উঠতে পারে বিধায় আমি অন্য দিকে সরে যাই, কুম্ভকর্ণ জেগে উঠলে বিপত্তি বাধতে পারে। শব্দটি ঠিকই তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করে, আমাকে গম্ভীরভাবে তা silent করে রাখার নির্দেশ দেয়। অতিরিক্ত কিছু করেনি বলে তাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিয়ে অন্যদিকে সরে যাই। সমুখে বসে থাকা এক নারী ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ঝুলিয়ে রাখে। ইচ্ছে হলো ছবিতে বাঁধিয়ে রাখি সে রহস্যময়তা। উপরতলায় এ অভাগার ঠাঁই না মেলায় নিচতলায় নেমে আসি। সেখানে আরেক অনুপমা চোখ মুদে টানটান হয়ে আছেন। তার শুভ্র উরুযুগল জানালাপার্শ্বে যাবার প্যাসেজ আটকে রেখেছে। উপরে ছিল দৈত্যবাধা, নিচে মেনকা-রাধা। বাধা দুদিকেই। তখন দরোজাই ভরসা দৃশ্য দেখার, ছবি তোলার।

এমনি করতে করতে গসফোর্ড এসে যাই। রেল স্টেশনটি বেশ বড়, বুঝলাম ছোট কোন শহরে এসে পড়েছি। এক বৃদ্ধ সহযাত্রী জানালেন, ‘This is the first significant town north of Sydney’। শহরটির প্রধান আকর্ষণ তার উপসমুদ্র বা বে। চেক আউট করে বেরুতেই দেখি ঘ্রাণশোঁকা বলশালী কুকুর নিয়ে পুলিশ দাঁড়িয়ে। আমাকে যেন কুকুরে না পায় তাই দূর দিয়ে বাঁকা হয়ে চলি। অন্যপাশে পিস্তল হাতে বলশালী পুলিশ দাঁড়িয়ে। এদিকে কুকুর, অন্যদিকের পিস্তল-অভ্যর্থনার আয়োজনটি মন্দ নয়। বুঝলাম কী কারণে যেন অতিরিক্ত সতর্কতা। ওভারব্রিজ থেকে স্টেশনের দু’পাশেই নামা যায়, আমি আন্দাজের উপর নির্ভর করে ভুল দিকে নামছিলাম, এক সাড়ে ছয়ফুটি আমাকে উল্টো দিকের সঠিক পথটি দেখিয়ে দেয়। নিচে নেমে একটু হাঁটতেই যেখানে এসে পড়ি সেটা গসফোর্ডের নগরকেন্দ্র।

http://print.thesangbad.net/images/2019/February/06Feb19/news/Untitled-32.jpgদোকানপাট বন্ধ, রেস্তোরাঁগুলো খোলা আছে। এক টলটলে যৌবনদীপ্ত মঙ্গোলয়েড চেহারার নারীর পদযুগল অনুসরণ করে চলে আসি নগরকেন্দ্রের এক প্রান্তে। পথে একটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের গির্জা পড়লে দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম, আমার গাইড ততক্ষণে হাওয়া। ধর্মের প্রতি অনুরাগ আমার জাগতিক অনুরাগকে ঢেকে রাখে। গির্জা ছাড়ালেই একটি পার্ক, সমুখের খোলা চত্বরটির কেন্দ্রে একটি সাদামাটা মার্বেল পাথরের মনুমেন্ট। সেখানে বিভিন্ন যুদ্ধে নিহত এই গসফোর্ডের ‘বীর’দের নাম খোদিত। পার্কটির পত্রালির ফোকর দিয়ে গসফোর্ড বে’র অদ্ভুত নীল জল দেখা যাচ্ছিল। পার্কটি অনেকটা উঁচুতে, সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় দেখি পার্কের বেঞ্চিতে বসে এক প্রেমিকযুগল পরিপার্শ্বঅচেতন হয়ে প্রণয়ে লিপ্ত। তাদের উত্তুঙ্গ প্রেমলীলা অবশ্য চুম্বন আর আলিঙ্গনের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো, তবে আগ্রাসী চুম্বনের ভেতরে নৈকট্যলাভের তীব্রতাটুকু বোঝা যায়। হলিউডি ছবির এডাল্ট দৃশ্য থেকে চোখ সরিয়ে জলপিঠের দিকে এগিয়ে যাই।

এখন সময় ছ’টা, মনে হবে বিকেল চারটা, চারিদিক ঝলমল করছে রৌদে। পার্কের নিচে সবুজ ঘাসছাওয়া সমতল অংশটুকুর পাশ দিয়ে মোটরওয়ে, সাঁ-সাঁই করে গাড়ি যাচ্ছে। সতর্কতার সাথে সড়কটি পার হই, নইলে পরপারে পাঠিয়ে দিবে মৃত্যুদূতগুলো। সিমেন্টের তৈরি বুমেরাংয়ের মতো বাঁকানো একটি ভূমিসংলগ্ন ঢ়রবৎ-এর একপাশে নোঙর করা আছে কিছু ব্যক্তিগত জলযান। ওগুলো যে ব্যক্তিগত তা বুঝি ইয়টগুলোর পেছন দিকটায় দম্পতিদের টেবিল পেতে পানাহার দেখে। টেবিলে সাজানো সুরার পাত্রে বিকেলের সোনালি আলো সোনালি সুরাকে করে তুলছে স্বর্গসুধা। আমি যখন হেঁটে যাচ্ছিলাম, তখন কেউ কেউ আমার অভিবাদনের উত্তরে হাত নাড়ছিল। স্টারশিপ ক্রুইজের একটি ছোট জাহাজ খধফু কবহফধষষ ও সেখানে নোঙড় করা। ওপাশে আরো কিছু ইয়ট ও স্পীডবোট। বে’র পাশেই একটি থীম পার্ক, বড় রাইডগুলো দূর থেকেই দৃশ্যমান।

পিয়েরে প্রবেশের মুখটায় আধেক জল আধেক ডাঙায় দাঁড়ানো The Coast নামের মনোলোভা রেস্তোরাঁটি, যার ভেতর দিয়ে সবছবি মায়াময় নীল, সফেদ ও স্ফূর্তিবাজ, ঈশ্বরের আশীর্বাদপুষ্ট মানুষেদের, যাদের উদরপূর্তির জন্য জগতের প্রাণীকুল ও শস্যক্ষেত্রগুলো নিবেদিত, টেবিলে টেবিলে পানাহাররত দেখি। রেস্তোরাঁটির বেশিরভাগটাই খালি, সমস্ত আসন থেকেই গসফোর্ড বে’র নীল সৌন্দর্য দেখা যায়, তারি একটিতে বসলে পরীর মতো এক মেয়ে এসে বলল, ‘This table is reserved. Please take another’। আমি তো সকল টেবিলের প্রতিই indifferent, আমার পক্ষপাত শুধু পরীদের প্রতি। সেই মেয়েটি, যে আগের জন্মে পরী ছিল, কাছেই ঘোরাফেরা করে। গসফোর্ড বে’র একপাশে দীর্ঘ পথ আর আবাসিক এলাকা চলে গেছে জলবেষ্টনীর ভেতর ডাঙার নাক গলানো কায়দায়; অন্যপাশে পাহাড়, আমাদের ট্রেন যে পাহাড়ের কোল ও পা বেয়ে এসেছে।

ফিরি একই পথে, মোটরওয়ে, পার্ক, গির্জা, সিটি সেন্টার, বেল স্টেশন। স্টেশনে একজন ভারতীয় নার্সের সাথে পরিচয় হলো। কেরালার মেয়ে, নাম আলিনা। সে এদেশে পড়াশোনা করেনি, গসফোর্ড হাসপাতালে কাজ করে, তখন বাড়ি ফিরছে। ট্রেন ছাড়লো ৭:১০-এ। এখানে দু’পাশের জলরাশির নাম Brisbane Water| Wandabyne স্টেশনের একপাশে হ্রদ, অন্যপাশে পাহাড়, এ স্থানটিও নৈসর্গিক। এখানে হকসবুরি নদীর উপর উঁচু রেলসেতু রয়েছে। ঘড়িতে সন্ধ্যে নেমেছে বহু আগেই। প্রকৃতিতে এখন সন্ধ্যা নামছে, তাও অতি ধীরে। হকসবুরি রিভার স্টেশনটি সামগ্রিক অবয়বে পেলাম ফিরতি যাত্রায়, সন্ধ্যার মায়াময় কোমলতার ভেতর। নিচে সড়ক, উপরে রেলপথ। ফ্লাগ নড়ে, হুইশল বাজে, প্রাচীন রীতিতে চলে আধুনিক ট্রেন। একটি সেতুর ছবি তুলতে না পেরে মন বিষণ্ন, যেমন হয়েছিল ক্রেইগ ডোরানের ছবি না তোলায়।

অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কারের সকল কৃতিত্ব দেয়া হয় ব্রিটিশ নাবিক ক্যাপ্টেন জেমস কুককে। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে জেমস কুকের পথ অনুসরণ করে একজন ফরাসী নাবিক অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। তার নামটি বেশ লম্বা, জ্যঁ-ফ্রাঙ্কোস ডি গাপটিল কমতে ডি লাপেরোজ। যদিও লাপেরোজ তার উপাধি, তবু সে নামেই বিশ্ব তাকে চেনে। কুক অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেন ১৭৭০ সালে। লাপেরোজ অস্ট্রেলিয়া পৌঁছান তার আঠারো বছর পরে, ১৭৮৮ সালে। তার নেতৃত্বাধীন L’Astrolabe ও La Boussole নামের দুটি জাহাজ সিডনির যে অংশে নোঙর করে বোটানি বে’র সেই এলাকাটির নাম লাপেরোজ। ব্রিটিশ ও ফরাসিরা তখন একে অপরের শত্রু, নতুন ভূখন্ড দখল ও মালিকানা নেবার চেষ্টায় দুটি বিরোধপূর্ণ দেশের মাঝে সংঘাতের সম্ভাবনা থাকলেও তা হয়নি, কেননা পেরোজের অভিযানটি ছিল বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে ব্রত, তাঁর জাহাজে বৈজ্ঞানিকই ছিলেন ১০ জন। কুক ও লাপেরোজ দু’জনেই সমুদ্র অভিযাত্রী, বিজ্ঞানমনষ্ক, প্রকৃতিসন্দর্শী ও ভূগোলবিদ। কুকের অভিযাত্রা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে ব্রিটিশ শাসনাধীনে আনার পথ সুগম করে দেয়, লাপেরোজে তেমন কিছু ঘটেনি। তিনি যে বছর (১৭৮৮) অস্ট্রেলিয়া পৌঁছেন সে বছরই ক্যাপ্টেন ফিলিপ আর্থারের নেতৃত্বে ব্রিটেন থেকে দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদীদের নিয়ে প্রথম জাহাজটি অস্ট্রেলিয়া পৌঁছে। দুটি যুদ্ধে ফরাসি নৌবাহিনীর জয়ে নেতৃত্ব দেয়া লাপেরোজকে কমোডর পদে পদোন্নতি দিয়েছিলেন ফরাসি সম্রাট পঞ্চদশ লুই। সম্রাটের নির্দেশে সমুদ্র অভিযাত্রায় বেরিয়ে পড়েন দুটি জাহাজ নিয়ে। এ যাত্রার পেছনে পেরোজের অনুপ্রেরণা ছিল জেমস কুকই, যাকে আদর্শ ভাবতেন তিনি। সমুদ্রপথ আবিষ্কার, পৃথিবীর ভূভাগ সমূহের মানচিত্র আঁকা, বিশেষ করে কুকের অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করা, বৈজ্ঞানিক নিদর্শন সংগ্রহ করা, জ্যোতির্বিদ্যার চর্চ্চা, নতুন প্রাণী আবিষ্কার প্রভৃতি মানবকল্যাণমূলক উদ্দেশ্য ছিল তার যাত্রার।

  • হাসান আজিজুল হকের সাক্ষাৎকার

    ‘আমি যা কিছু লিখেছি-
    মাটি থেকে পেয়েছি’

    সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ওবায়েদ আকাশ, কাজী রাফি, খন্দকার মুনতাসীর মামুন

    newsimage

    ওবায়েদ আকাশ : লেখকদের মধ্যে একটা ব্যাপার দেখা যায় যে, এ কাজটি

  • বিপুল জীবনানন্দ

    আজও অসম্পূর্ণ উত্তরপত্রের এক সুদীর্ঘ প্রশ্নপত্র

    এমিলি জামান

    newsimage

    ১৯৯৯ সনে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সর্বাধিক পাঠকপ্রিয় শক্তিধর কবি জীবনানন্দের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপিত

  • বইমেলার পরিবেশ ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধি

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    বইমেলা যখনই কোনো রাজনৈতিক সুস্থ পরিবেশে অুনষ্ঠিত হয়েছে; তখনই এর ফলাফল নিয়ে

  • অসীম সাহার কবিতা

    newsimage

    অমৃত-গরল জ্যোৎস্নাকে ফেরাতে নদী ছুটে যাচ্ছে সমুদ্রের কাছে! টাইটানিক গতি তার। ডুবে যাচ্ছে বেদনার তীব্র

  • মিনার মনসুরের কবিতা

    আমার আজব ঘোড়া

    newsimage

    গল্পগুলোর ডানা ছিল ঘোড়াটিই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল রূপকথার সেই মাঠে। দিগন্তছোঁয়া তার পৌরুষ।

  • ধারাবাহিক উপন্যাস ৬

    ‘মৌর্য’

    আবুল কাসেম

    newsimage

    পূর্ব প্রকাশের পর মন্দাকিনী মহামূল্যবান একজোড়া জুতো পরিয়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতে বললো।

  • ক্যান্ডি

    মূল: নয়নরাজ পান্ডে
    অনুবাদ: ফজল হাসান

    newsimage

    জেলার প্রধান কার্যালয়ের সামনে পাজেরো গাড়ি থেকে নেমে আমার ব্যক্তিগত সহকারী এবং