menu

মহাতর্জনী আর যুদ্ধ ঘোরের মেটাফোর

নাসরীন জাহান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২১
image

শিল্পী : শাহাবুদ্দীন আহমেদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

পুরো যুদ্ধের সময়টাই বলা যায় আমার স্বপ্নে বাস্তব ঘোর লড়াইয়ে কেটেছে। যেখানে বেশিরভাগ সময় বাস্তব জয়ী হয়েছে। মনে পড়ে, যুদ্ধ শুরুর দুমাস পর এক মিশনে গোপনে ওঁত পেতে ছিল তারা। একসময় গা হিম করা এক দৃশ্য দেখি, উঠোনে হয়তোবা নাতনিকে নিয়ে রোদ পোহাচ্ছিলেন এক চামড়া কুঁচকে যাওয়া বয়সের ভারে নুয়ে পড়তে থাকা এক বৃদ্ধা। নিচে একটা ধান কাটার কাস্তে পড়েছিল। পাকসেনারা তাকে ঘিরে উর্দুতে কাস্তেটা তুলে দিতে বলে, বৃদ্ধ নুয়ে পড়ে কাস্তেটা তাদের হাতে দিয়ে তির তির কাঁপতে থাকে। কিন্তু শিশুটি জমিনে পড়ে চিৎকারে ফেটে পড়ে।

এক সেনা শিশুটির গলায় পা রেখে সাঁই করে বৃদ্ধটির শিশ্ন কেটে ফেলে প্রথম, বৃদ্ধটি ছিটকে ভূলুণ্ঠিত হতে হতেই আসমান জমিন ফাটানিয়া চিৎকারের মধ্যে মুহূর্তে ওরা এক দু করে হাত-পা কাটতে থাকে। পুরো জমিন রক্তে থই থই-এর মধ্যে ওরা যখন অট্টহাসিতে মেতে উঠেছে, আমি মুহূর্তে মুক্তিযোদ্ধার সমস্ত নিয়ম রুটিন প্রবণতা খুইয়ে ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে অস্ত্র হাতে ছুটে ধাবিত হতে চাইলাম ওদের দিকে।

আমাকে রীতিমতো খাবলা দিয়ে আটকান আলতাফ ভাই, পাগল হয়েছ? এখনো আমাদের সময় হয় নি। এই যুদ্ধে আমি এমন অনেক নৃশংস দেখেছি। একবার এক বিশাল মাঠে প্রায় একশজন নারীপুরুষকে এক সমান্তরালে দাঁড় করিয়ে ওরা যখন মারণাস্ত্র তাক করে একেকজনের সঙ্গে নানারকম রসিকতা করছে, সেই ভিড়ের পেছন দিকে সাধারণ পোশাকে এক শিশু কোলে দাঁড়িয়ে ছিলেন মুস্তাফিজ ভাই। পাকসেনারাও সংখ্যায় অনেক ছিল। একসময় বিদ্যুতের মতো গুলি ছুটতে থাকল। মুহূর্তের মধ্যে রক্তসমুদ্রের মাঠে দাঁড়িয়ে বজ্জাতগুলো সারি বেঁধে হিসি করতে শুরু করে। মুস্তাফিজ ভাইয়ের কোল থেকে শিশুটি ছিটকে গিয়েছিল। তিনি লাশ স্তূপের নিচে প্রায় দম আটকে নিঃসাড় পড়েছিলেন। যেন ভূমণ্ডল ফুঁড়ে আমাদের তাজ্জব করে সেই মৃত্যু স্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন মুস্তাফিজ ভাই।

ফিরে আসার পর মুহূর্তেই আলতাফ ভাই দক্ষতার সঙ্গে আমাদের নিয়ে সেখানে পৌঁছলে আমরাও সেই পেশাব করতে থাকা পাক আর্মিদের অট্টহাসির টুঁটি চেপে মুহূর্তের মধ্যে সব কটা পাক আর্মিকে শ্মশান সমুদ্রের যমদূতের হাতে পৌঁছে দিই।

যুদ্ধের রুটিন না মেনে আমি নিজেও বলতে পারব না, কীভাবে এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমিই। আলতাফ ভাই লড়াই শেষে আমাকে প্রথমে এমন আবেগী ছেলেমানুষী ফের না করতে কঠিন নির্দেশ দিয়ে পরক্ষণেই বুকের সঙ্গে আমূল মিলিয়ে বললেন, ইউ আর গ্রেট ইলিয়াস। যুদ্ধ আমাদের মতো কতজনকে এমন কত যে লোমহর্ষক স্মৃতির মুখোমুখি করছে! মাঝে মাঝেই আমি আর আমি থাকি না, মনোডাক্তার থাকি না। মনস্তাত্ত্বিক লেখকের চরিত্র বনে যাই।

এইবার সেই অবস্থা রীতিমতো চূড়ান্তে গিয়ে পৌঁছায়।

আলতাফ ভাইয়ের কণ্ঠ যেনবা ঝাপসা শোনায়, তোমাকে অবশ্যই বেঁচে থাকতে হবে, একটু ধৈর্য ধরো, আমি দ্রুত তোমাকে কাছের তাঁবু হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।

এবার সেই ভয়াবহ আক্রমণের মুখোমুখি পাল্টাপাল্টি আক্রমণ হচ্ছিল। একসময় ওরা পিছু হটেছে পাক্কা নিশ্চিত হয়ে আমরা ক’জন জাস্ট জিপে এসে বসেছি, কোত্থেকে যেন ভূতের মতো ক’জন পাক আর্মি জিপের সামনে এলে ঝাপসা চোখে দেখি বরাবর গুলি ছুড়তে ছুড়তে পালাতে চাইলে মুস্তাফিজ ভাই মুহূর্তে লুটিয়ে পড়েন। আমি হতবিহ্বলতার মধ্যেই আলতাফ ভাই মুহূর্ত ইশরায় ওদের পেছনে ধাওয়া করে সবকটাকে মাটিতে মিশিয়ে ফের জিপে ফিরে আসেন। এরপর রক্তাপ্লুত মুস্তাফিজ ভাইকে হারি আপ দেখে ওকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, এর মধ্যে বেঁচে থাকা আরও পাকিস্তানি বেইমানগুলো যেহেতু অনেকটা ক্লান্ত, আমি কিছুক্ষণের জন্য ওদের বিশ্রাম চাইছি। আমার কানে আলতাফ ভাইয়ের কোনো শব্দাবলি পৌঁছায় না। আমার চোখে তখনো একটি বৃহদাকার নক্ষত্রচ্যুতির বিকট শব্দের বিবর। আমি মুস্তাফিজ ভাইয়ের ওপর লুটিয়ে পড়ি। শুধু একবার আপনি নাসিমা ভাবির কথা ভাবুন। আমার কণ্ঠে কুয়াশার বরফ জমতে থাকে যেন, আলতাফ ভাই উত্তেজিত, হারি আপ, কে আছেন... কুইক হাসপাতালে...

এরপর ধূমায়িত হেমন্তের প্রচ্ছায়া ছিঁড়ে সবাই মুস্তাফিজ ভাইকে অ্যাম্বুলেন্সে উঠালে মুস্তাফিজ ভাইয়ের ধীর লয় কণ্ঠের ধোঁয়াশা ধ্বনি... ইলিয়াস, আমি চলে যাচ্ছি, নাসিমা শিক্ষিত, কিছু একটা করে জয়িতাকে নিয়ে দিব্যি চলতে পারবে, এরপর ওদের দায়িত্ব আমি তোমার ওপর ছাড়লাম... আমি তাঁর দেহটা নবজাতকের মতো কোলে তুলতে চাই যেন, চুপ মুস্তাফিজ ভাই, বি-পজেটিভ, কিচ্ছু হবে না আপনার, কিন্তু তার বিলিয়মান কণ্ঠধ্বনির কুহক শিরশির করে আহ! আমি আমার জয়িতার মুখটা দেখে যেতে পারলাম না!

আমার শিরায় শিরায় রোদন, একসময় মুস্তাফিজ ভাই নিস্তেজ হয়ে গেলেন। আমি যখন মৃত্যু আর জীবনের সীমান্তে আছি কি আছি না- এমন দশায় অস্ফুট চিৎকার আকুলে ঘোর খাচ্ছি তখন আলতাফ ভাই যেন আমাকে বিস্ময়তার ঘোর ভেঙে দুর্মর এক হেঁচকা টানে দাঁড় করান। আমরা সবাই তো মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই এখানে এসেছি। ইলিয়াস! বাহাদুর বাচ্চা আমার। শান্ত হও, তার কণ্ঠস্বর স্রোতম্বী কান্নায় কাঁপতে থাকে। তিনি ফের বলেন, ঘুরে দাঁড়বে তুমি, আমি নিশ্চিত জানি, বরাবরই তো তুমি আমাদের একেকটা চমক দেখাও! অ্যাম্বুলেন্সে আর যারা ছিলেন, তাদের মধ্যেও গুমোর কান্নাধ্বনি! কিন্তু আলতাফ ভাইয়ের প্রত্যয়ী কণ্ঠ আমাকে, আমাদেরকে যেন নিজ নিজ সত্তার ভূমণ্ডল থেকে ওপরে টেনে তোলে। এরপর সব ইন্দ্রিয়কে নিজের আমূল অস্তিত্বকে বুদ্বুদে ছেড়ে দিয়ে যাতনায় ফিসফিস কান খুলে রাখলাম, আলতাফ ভাই এখন কী করতে হবে, প্লিজ আলতাফ ভাই বলুন।

আলতাফ ভাই বলেন, আপাতত ওরা কিছুটা ক্লান্ত। কিন্তু ওদের কোনো গ্যারান্টি নেই। চল... চল... এখান থেকে যত দূরে যাওয়া যায়।

কোথা থেকে যেনবা খামারের পোড়া ইটের গন্ধ ভেসে আসে। সহসা নিজেকে ঘুরিয়ে আমরা সেখান থেকে নিজেকে উইড্র করে রক্তসমুদ্রে ভাসতে ভাসতে আলতাফ ভাইকে অনুসরণ করে দ্রুত গতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের মহালছড়িতে চলে যেতে থাকি। নিজেকে তীব্র বেদনাহত ছুরিবিদ্ধ ডাহুক, হরিণ, ঘোড়া কখনো কখনো কর্পূর ভ্রম হতে থাকে। আলতাফ ভাইয়ের নির্দেশে আহত মুখ তুলি, হ্যাঁ, এই রাস্তাই ঠিক, ড্রাইভার, জোরে চালাও...। একটা চিন্তা ছিল, যদি আমরা ফাইট করতে করতে কক্সবাজারের দিকে চলে

যাই, তবে আমাদের অন্য কারোর সঙ্গে যোগাযোগের উপায় থাকবে না।

কিছুক্ষণ পর আমরা দ্রুত টার্ন নিয়ে একটা হাসপাতালে তাঁবুর সামনে গাড়ি দাঁড় করাই। কিন্তু যেতে যেতেই আমি ফের আত্মনিমগ্ন! ফিসফাস শুনি। জাস্ট কয়েক মুহূর্তের জন্য। সন্তর্পণ চিৎকার শুনি।

একজন অস্ফুটে চেঁচায় যেন ইলিয়াস ভাইয়ের ডান হাত-পায়ে যে গুলি লেগেছে, আমি দেখেছি সেই বেদনাতুর দৃশ্য! মৃত্যুতে ঢলে পড়তেও ইলিয়াস ভাই পকেট থেকে যথাসম্ভব সুরক্ষার ব্যান্ডেজ বের করেছিলেন আর সবাইকে যাতে টেনশনে পড়তে না হয়, সন্তর্পণে কখনো হাতে, কখনো ব্যান্ডেজ মুড়িয়েছিলেন। কিন্তু এখনো ভেতরে গুলি রয়ে গেছে। ব্যান্ডেজ ফুঁড়ে এখনো চাপ চাপ করে রক্ত বেরুচ্ছে! দেখেন দেখেন সবাই!

হতবিহ্বল আমি মহাবিরক্ত, ব্যাটা মুস্তাফিজ ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে আমার নাম নিচ্ছে কেন? নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে! যা হোক আলতাফ ভাই দ্রুত নির্দেশে আমরা অস্থায়ী হাসপাতালের সামনে একসময় ভেতরে ঢুকে রক্তপিষ্ট মাথায়ও ভাবতে থাকি, এখানে সত্যিকারের নার্স নিজ দায়িত্বে এই সেবাকার্যে এসেছেন। অনেক আগেই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে এখানে ট্রেনিংপ্রাপ্ত হাসপাতালের নার্স তো আছেনই, পাশাপাশি অস্থায়ী ট্রেনিং নিয়ে এখানে প্রচুর নার্স নার্সিংয়ের দায়িত্ব নিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে অনেক ধৈর্য আর নিপুণতার সঙ্গে নিজেদের জীবনকে বলা যায় সমর্পণ করেই দিনরাত তাদের সেবা করে যাচ্ছেন, ফিসফিস দৃঢ়তায় বলি, আলতাফ ভাই, ওদেরকেও কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার খেতাব দিতে হবে।

আমার উত্তেজিত কণ্ঠকে দাবিয়ে আলতাফ ভাই বলেন, এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু অনেক আগেই বলে রেখেছেন। তুমি আর কথা বলো না, চুপ, ইলিয়াস চুপ! মুস্তাফিজ ভাইকে ট্রলিতে করে ভেতরে নিয়ে আমরা দেখি, কত যে আহত পুরুষ নারী যোদ্ধা, বীরাঙ্গনা প্রায় খণ্ডিত শিশুরাও কাতরাচ্ছে! এর মধ্যে ডাক্তার-নার্সরা কতটা মাথা ঠাণ্ডা রেখে সবার নিখুঁত চিকিৎসা করে যাচ্ছেন!

কিছু পরে যা হলো, জাস্ট কয়েক মুহুর্তের মধ্যে মুস্তাফিজ ভাইয়ের দেহ থেকে গুলি বের করে, সুন্দর ব্যান্ডেজ করে তার দেহে রক্ত ঢুকাল!

একজন ডাক্তার আমাকে বলেছিলেন, আজ পুরোটা রাত ওনাকে ঘুমাতে হবেই। আমরা এক্ষুনি ঘুমের ইনজেকশান দিচ্ছি। ফের অনুভব করি আমার তালগোলের বোধের তীব্র তরঙ্গে, আমি কখনো নিজেকে ইলিয়াস, কখনো মুস্তাফিজ ভাই দুটো চরিত্রের মধ্যে নিজেকে প্রায়শ গুলিয়ে ফেলছি।

ক্রমশ প্রভাত গড়ায়মান, কেয়ার ডোরাকাটা গামছায় টুপটুপ ভেজাচুল, অথইয়ের মায়াবী চাহনি বারবার প্রতিভাত হয়। ঘুমের ইনজেকশনের পর আলতাফ ভাই যুদ্ধ-ক্যাম্পে ফেরত গিয়েছিলেন। আমি কি মুস্তাফিজ ভাইয়ের পাশে বসে ঢুলছিলাম? এর মধ্যে আমাকে দুর্মর কাঁপিয়ে একজন ডাক্তার চিৎকার করতে থাকেন, এত কড়া নজরের মধ্যে এমন পেসেন্ট কীভাবে তাঁবু থেকে পালালেন?

তাঁবুর বাইরে এক চিমটি ঘাঁপটি মেরে ছিলাম। কী? মুস্তাফিজ ভাই জাদুকরী সত্তায় কোথাও পালিয়ে গেছেন? আমার হিমশীতল স্থবির বরফ আত্মায় সহসা কোনো বোধ কাজ করে না। দণ্ডায়মান জিপে উঠে মরিয়া হয়ে ক্যাম্পে এসে আমি হাঁ হয়ে যাই। আলতাফ ভাই চিৎকার করছেন। রক্তাভ মুস্তাফিজ ভাই যেন মাথা নিচু স্ট্যাচু। আলতাফ ভাইয়ের বিস্ময়, ক্রোধ কান্নাজড়ানো কণ্ঠ সমস্ত ক্যাম্পে আছড়ে পড়ে। নিশ্চয়ই তুমি হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসেছ? এত জলদি কেন এতটা অধৈর্য হলে? সম্পূর্ণ চিকিৎসাটা নিলে না? বাকি কত মাস যুদ্ধ করতে হবে, তার সম্পর্কে আমরা কি কেউ জানি? তুমি হাল ছেড়ে মৃত্যুর কাছে সমর্পিত হওয়ার জন্য ভেতরে আকুল হয়ে ওপরে ওপরে আমাকে মাস্তানি দেখাতে এসেছ? ছি! তুমি জানো না আমাদের দলে ঢুকে যাওয়া, নানা জায়গায় অবিশ্বাসী রাজাকার ঢুকে গেছে? কী ভয়াবহ অবস্থায় আমাদের দিনরাত্রি যাচ্ছে। কে ভালো কে বেঈমান বোঝা কতটা কঠিন? ভয়ংকর শত্রু এরা! ভুলে গেছ? এরা শুরু থেকেই আমাদের মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত করছে। প্রথমে গুরুত্ব দিই নি, এ দেশেরই শত্রু হয়ে কুত্তা রাজাকারগুলো কালুরঘাট থেকে এ পর্যন্ত নানারকম উল্টাপাল্টা তথ্যে প্রত্যয় দিয়ে যাচ্ছিল? তুমি কথা দিয়েছিলে, এদেশেরই যারা শত্রু তারা পাকসেনাদের চেয়ে কম হিংস্র না, ওর একটা কঠিন উচিত শিক্ষা দেওয়ার কথা বঙ্গবন্ধুর কানে পৌঁছাবেই, এর জন্য বেঁচে থাকতে হবে না? কী হলো সেসব কথার?

আমি সম্পূর্ণ ধৈর্যের আশ্রয়ে আলতাফ ভাইয়ের ভেতরের রক্তমাংসের মানুষটার প্রত্যয় দৃঢ়তার আড়ালের আনুভূতিক মানুষটাকে প্রত্যক্ষ করে যেন বোবা হয়ে থাকলাম।

এরপর,

বৃক্ষ তোমার নাম কী? ফলে পরিচয়।

সেই ফলের অমৃত স্বাদ তো আলতাফ ভাইকে না খাওয়ালেই চলবে না। কিন্তু করোটির করুণতা ফের ফিসফিস রিন রিন কোন ধ্বনিতে ধাবিত কোনদিকে করছে আমাকে? প্রতিনিয়ত হামলেপড়া সব মুক্তিযোদ্ধার মতো আমাকেও রেডিও তর্জনী ভাষণের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলার বেতারে গানের তরঙ্গধ্বনি, যা প্রতিনিয়ত আমাকে, আমাদের রক্তমাংসের দুর্মর প্রেরণায় বারংবার কঠিন যুদ্ধে ঝাঁপানোর প্রেরণা দিত... মরু-প্রান্তরে কেন সেই সুর ভেসে আসে, মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি...। এই তো সব খোলস ভেঙে গেছে, যেন ক্যাম্প নয়, চারপাশে বোবা হয়ে থাকা অন্য যোদ্ধাদের কেউ নেই পাশে, হুহু তেপান্তরে রাইফেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি আমি, ইলিয়াস রিজভী আহমেদ। ফের ক্যাম্পে আলতাফ ভাইয়ের সামনে ভাঙচুর অবস্থায় দাঁড়িয়ে আমার বুক হুহু করে। মুস্তাফিজ ভাই কোথায়? আচানক হতচকিত হয়ে চারপাশে তাকাই। আবার রক্তাভ শরীর নিয়ে ফের কোথায় হাওয়া হলেন? আচমকা কানের মধ্যে রূপকথার ব্যাঙমি যেন আমাকে লম্বা উসকানি দিয়ে কঠিন চেতনার দিকে ধাবিত করেন, আলতাফ ভাই তোমাকেই বকছেন ইলিয়াস।

তাই-ই? আমাকে! বিভ্রম কাটা শব্দে গর্জরিত সূর্যের শব্দ নিভে গেল।

এরপর কখনো ধোঁয়ায় বাকিটা দৃশ্যমান যুদ্ধে, যেনবা ফড়িংয়ের ঘাড়ে চেপে কখনো অথই, যাকে মাঝে মধ্যেই ভালো থাকার চিঠি লিখি, সে জানায় একদম চিন্তা না করতে, সব ঠিক আছে। সে অথই আমাকে অদৃশ্য সঙ্গ দেয়, কখনো নিশ্চুপ কেয়া... শূন্য বুকের মরুভূমিতে বারংবার মুস্তাফিজ ভাইয়ের প্রচ্ছায়া, হে মহীরুহ! আপনি কোথায়। পৃথিবীটা যে আঁধার লাগে প্রায়শ? হুশ করে একেবারে কর্পূর হয়ে মিশে গেলেন? যুদ্ধ শেষে, এই যে এখনো হাত-পাহীন নিজ ছিন্নঘর বিছানায় আপনাকে খুউব মনে পড়ে গো।

যা হোক, রাতে একটু সময় পেলেই আরও বেশি যুদ্ধদিনের স্মৃতিতে আশ্রয় নিই। খুব নিস্পৃহ বোধ করলে আমার মন মননে অথই ধেইধেই লাফাতে থাকে। কখনোই অথই বলতে থাকে, আব্বু জয়িতাদের বাড়ি একবারেই যাবে না, ও ফোনে বলেছে, তুমি যদি সুস্থ হয়ে ফিরে আসো, সে এবং আন্টিও মুস্তাফিজ চাচার মৃত্যুর জন্য তোমাকেই দায়ী করবে। তুমি নাকি উনাকে জোর করে যুদ্ধে নিয়ে গিয়েছিলে।

বিছানা থেকে দেহ উচ্চকিত করতে চাই, আহ যন্ত্রণা!

যুদ্ধ জয়ের আনন্দে আত্মহারা হতে আমার একটু সময় লাগছিল। কখনো অস্থির, ঘাঁপটি মারে খরস্রোতা ঢেউ... কিন্তু ফিরে এসে ডান হাতকে বিশ্রাম দিয়ে অথইকে বলতে থাকি, কীভাবে আমি গুলিবিদ্ধ হলাম, তারপর কী, সব ডায়েরিতে লেখা আছে। ক্যাম্পে টুকরো টুকরো, ফিরে এসে অনেকটা বিস্তারে ডায়েরিতে অনেক কিছু লিখেছি। স্কুলে না গেলে সারাক্ষণ আমার পাশেই থাকবি। তোর সান্নিধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ মানুষ মনে হয়। তাই তুই ডায়েরি এমন সময় পড়বি যখন আমি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকি।

এরকম ধূপছায়া রক্ত বীজের উল্লাসে ডেটলপ্রাণ, নার্স, ডাক্তার গোলাবারুদ বৃদ্ধের শিশ্নের উল্লাস, যাতনাপিষ্ঠ আমি যখন ধাতস্থ হচ্ছি সবে, শুনি, চারপাশে লক্ষকোটি মানুষের জয়ধ্বনির উল্লাস, জয় বাংলা, বাংলার জয়।

জয়টা কী উপভোগই করতে পারি নি? পঙ্গুত্বের কাছে, লেখক সত্তার বিকারের কাছে, মুক্তিযোদ্ধা আমি হেরে গেলাম শেষ পর্যন্ত? ভাবতেই পাঁজরে পিন ফোটে! বিকলাঙ্গ আমি এদেশের বোঝা না হয়ে যুদ্ধের মাঠে মরে গেলাম না কেন? পরক্ষণেই পজেটিভ ধ্বনি- তুমি না লেখক? তুমি কীভাবে দেশের ভার হও?

কিছুটা নির্ভরতা পেয়ে ভাবি, এর মধ্যেই কোনো না কোনো একটা কাজে আমাকে ঢুকতেই হবে।

যতই ঘোর বিভ্রাট লেখক মগজে খেলা করুক, যুদ্ধটা আমি নিপুণ সাফল্যেই সঙ্গেই করেছি। আলতাফ ভাই বারংবার বলছিলেন, আমাদের জাতে মাতাল তালে ঠিক বীর ইলিয়াস!

শেষে বিপর্যস্ত বাসায় ফিরলে অথই, কেয়া কান্নায় ভেঙে পড়ে। কদিন গেলে ধীরে ধীরে ওরা ধাতস্থ হয়। আলো-ছায়ায় যেন ঠিকঠাকভাবে এই প্রথম দেখি, দেহ থেকে আমার একটি পা আর একটি হাত সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। যেনবা পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ব্যান্ডেজে মোড়ানো।

তাঁবুতে মুস্তাফিজ ভাইকে নয়, আমাকে যখন ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে অচেতন করেছিলেন ডাক্তার, মধ্যরাতের ফিসফিস কুয়াশা আবহে মরণ যন্ত্রণায় কোঁকানো চেপে আমি নিজের অস্তিত্ব বেমালুম বিস্মৃত হয়ে যোদ্ধাদের সহজাত কৌশলে বক পা দিয়ে চারপাশে সন্তর্পণে তাকাই... কেউ ব্যস্ত, কেউ চিকিৎসা শেষে ক্লান্ত... এমন ডাক্তার-নার্স চোখ ফাঁকি দিয়ে মুস্তাফিজ ভাই নয়, আমি দ-ায়মান স্ট্যাচু হয়ে আলতাফ ভাইয়ের ক্রোধমায়া শব্দ যত শুনছিলাম ততই আমার ভেতর আমূল ঢুকে যাওয়া মুস্তাফিজ ভাই আমার ভেতর থেকে যেনবা বুদ্বুদ হয়ে বের হয়ে যাচ্ছিলেন।

ডায়েরি চাপা দিতে দিতে অথইয়ের চোখ নোনা স্রোতে ভিজে যায়। কেয়া বিকেলের নাস্তা এনে দেখে, ইলিয়াস বিড়বিড় করতে করতে ঘুমের বেঘোরে তলিয়ে যাচ্ছেন। তখন গভীর নিবিড়ে নিবিষ্ট অথই হিবিজিবি মাথা নিয়ে সুররিয়ালিস্টিক লেখক বাবার গোছালো কথার ডায়েরির অক্ষরে ফের ধীরে হাঁটতে থাকে। বাবা লিখেছেন, আসলে গুলি লেগেছিল আমার আর মুস্তাফিজ ভাই দুজনেরই দেহে। মুস্তাফিজ ভাই হাত আঁকড়ে ফিসফিস কিছু কথা বলেই তিনি মৃত্যুর অনন্তে ঢলে পড়েন। এই ধাক্কাটা সত্যিই আমি নিতে পারি নি। রক্তস্রোতে ভাসছিলাম দুজনই। এরপর পকেট থেকে ব্যান্ডেজ বের করা থেকে শুরু করে মুস্তাফিজ ভাইকে মর্গে পাঠিয়ে অপারেশন শেষে ঘুমের ইনজেকশান আমার দেহেই পুশ করা হয়েছিল।

বাড়ি ফেরার পর দীর্ঘ দুমাসে মুস্তাফিজ ভাইয়ের মৃত্যৃর ট্রমা যতই কেটেছে, ততই বিছানায় বসানো কেয়ার সাজিয়ে রাখা বালিশ টেবিলে ভর করে আমি ডায়েরি লেখার মধ্যে মাঝে মাঝেই দীর্ঘসময় ধরে ডুবে থেকেছি। সে চর রাজাকারের ভুল তথ্যে যাত্রাপথে আমি আর মুস্তাফিজ ভাই কীভাবে অতলে পড়েছিলাম, একটু একটু করে লিখতে থাকি। একটা পর্যায় পর্যন্ত লেখা শেষ করে দেখি ডায়েরির দিকে অথইয়ের তিতিরের মতো তাকিয়ে থাকা, দেখে বলি, নে, পড়, তুই তো আমার যোদ্ধা মেয়ে, তাও বলছি, মন শক্ত করে পড়বি, একটুও যেন না কাঁদিস, তুই কাঁদলে আমার জাদু ইন্দ্রিয় কিন্তু টের পেয়ে যাবে...।

এ কদিনে কেয়া সমুদ্র সাম্পানের মাঝি হয়ে উঠেছে যেন, নিখুঁত নির্জীব নিমগ্নতায় সে এটাও আমাকে বুঝতে দেয় না। সেও কিছু হারিয়েছে যুদ্ধ শুরুর মাসখানেক পর একদা রাজাকারদের লুটতরাজের চক্করে পড়ে ওর গর্ভের ভ্রƒণটি নষ্ট হলে কতটা উদ্ভ্রান্ত পাগল চক্করে দিনরাত্রি চোখের স্রোতে ভাসিয়ে দিত! ভাগ্যিস সেদিন অথই কী কাজে যেন অন্য কোয়ার্টারে গিয়েছিল। প্রতিবেশীরা বিশেষ করে অথই বহু কষ্টে তাকে সামলেছে। কিন্তু অথই চিঠিতে এসবের চিহ্ন বিসর্গও আমাকে জানতে দেয় নি। মুস্তাফিজ ভাইয়ের জীবন বাস্তবতার সঙ্গেও আমাদের কী মিল!

অথই ডায়েরিতে ঢুকে আছে।

বাবা আরও লিখেছেন, আমি যুদ্ধে প্রতিহত হওয়া পাক আর্মিদের মধ্যে কোনো চতুষ্পদের ছায়া খুঁজে পাই না।

ন’মাস শেষে আমরা জয়ী হয়ে যখন আলতাফ ভাইয়ের উন্মাতাল নৌকায় চেপে ক্রমশ ঘরমুখী, আমার মাথার ওপর নয়... যেন সম্মুখে আসমানের মেঘপুঞ্জের ছায়া পুরোটা মিহি বিস্তারিত।

যেন এর মধ্যে সম্মুখের কঠিন শীতের কালো কুয়াশা ছাপিয়ে আশ্চর্য এক রক্তাভ সূর্যচ্ছটা দণ্ডায়মান! কে? কী? বিমূঢ় বিস্ময়ের ঘোর কাটতে থাকে যাতনা-ভোলা এক অদ্ভুত বিস্ময়কর বিমূঢ় তরঙ্গে!

আলতাফ ভাই বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে পাকসেনারা কোথায় যেন লুকিয়ে রেখেছে। তিনি আদৌ বেঁচে আছেন কি না, তাও কেউ জানে না!

ফলে সেই অপার্থিব দৃশ্য আমি একাই দেখি। দেখি, আদিম এক বিশালাকার অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে একটি স্বাধীন পতাকা পতপত ওড়াতে ওড়াতে অপার্থিব হাসিমুখে বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন!

আমার হৃৎপিণ্ড দ্রুতগামী হতে থাকে। একসময় তিনি তাঁর উত্তাল দুহাত সামনের দিকে প্রসারিত করেন।

আমার দেহমন সব পঙ্গুত্ব নিমিষেই জাদু নিঃসাড়ে উধাও। যেন আলতাফ ভাই নয়, যুদ্ধ জয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছি আমি। পেছনে সারি সারি মুক্তিযোদ্ধা জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে আমাকে অনুসরণ করতে করতে দৃঢ় তর্জনী উত্তোলিত সেই মহামানুষটির দিকে তীব্রগতিতে কুয়াশা শেকড়ের ছায়া ফুড়ে ছিঁড়ে সামনের দিকে ধাবিত হতে থাকে।

আমি সেই অপার্থিব মানুষের বুকধ্বনিতে কান পেতে হুহু আনন্দে তাঁর তর্জনীর দিকে আলোর তরঙ্গের মতো ক্রমশ ধাবিত হতে থাকি।

ঘনায়িত প্রভাতের শিশির টিন চালের দিকে অথই ভেজা প্রথম চোখে, পরক্ষণেই উদ্ভাসিত মুখের প্রস্ফুটনে সে শীতালু বৃষ্টি ঝড়ে পতাকাকে কাত হতে দেখে মই বেয়ে প্রায় ছুটতে ছুটতে চালের ওপর দাঁড়ায়। এরপর বিন্যস্ত নিপুণে পতাকাকে সোজা করলে সে অভিভূত হয়ে দেখে, এদেশের পুরো আসমান সমুদ্র ধরে বিশাল পতাকাটা ধেই ধেই করে উড়ছে। অথই হাওয়া দোলানিয়া পতাকার দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে নিরন্তর দিনরাত্রির দাহমুখর ভুলে নিরন্তর তাকিয়ে থাকে।

সেও পতাকার বাঁশ আঁকড়ে একবার সেই অপার্থিব মানুষের, অন্যবার যোদ্ধা বাবার বুকের ধ্বনিতে গর্বিত কান পাতে। (সমাপ্ত)

  • অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    স্বতন্ত্র, বিচিত্র ও অভিনব

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    তীব্রভাবে সমালোচিত ও তীব্রভাবে গ্রহণযোগ্য চিলের কবি নিকানোর পাররার কেন বলেছিলেন যে,

  • ধ্রুপদী স্রষ্টা

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    হিন্দোল ভট্টাচার্য

    newsimage

    অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল যখন তখন সকাল বেলা সাড়ে ১১টা। ফোন

  • অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    অধিবিদ্যার কবি

    উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    এক বেশ্যা অনায়াসে ভিতরমদিরে ঢুকে যায় বুদ্ধ মন্দিরেরে দরজা বন্ধ হয়ে গেল এক

  • সাময়িকী কবিতা

    এখন আমায় তরুণতর সতীর্থেরা বলে অলোকদা, আপনি আমাদের মাথার ওপর আছেন। ভাবি আমি কি তবে তাদের জরাজীর্ণ আচ্ছাদন ছলে ও কৌশলে?

  • এখানে এখন : সামাজিক সংকটের নির্মাণ

    সানজিদা হক মিশু

    newsimage

    সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বাংলা নাট্যসাহিত্যের কিংবদন্তি। তাঁর ৮৫ তম জন্মক্ষণে সংক্ষিপ্ত

  • ঘুম

    শাশ্বত নিপ্পন

    newsimage

    বুকের বাঁ পাশটায় একটা অস্বস্তিকর ব্যথা নিয়ে আনিস ওজুতে বসে। দু’ঠোঁটের মাঝে

  • গ্রাম-গ্রামান্তরে

    প্রথম পূর্ণ ডিজিটালাইজড শিক্ষা বোর্ড যশোর

    রুকুনউদ্দৌলাহ

    newsimage

    দেশের অনেক কিছুতে যশোর প্রথম হওয়ার গৌরবের অধিকারী। যুক্ত বাংলার প্রথম জেলা