menu

মরিয়ম-এর নিগূঢ় তালাশ

তমাল রায়

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ এপ্রিল ২০১৯
image

একজন মানুষ কী আদ্যন্ত একটি রক্তমাংসের শরীর? না কি সে এক অনন্য ইতিহাস বই? কত না যুদ্ধবিগ্রহ, ক্ষত চিহ্ন, রক্ত, ঘাম, নুন, আলো, অন্ধকার, বদলে যাওয়া অজস্র মুখচ্ছবির মাঝে কখনও সে পাহাড়, কখনও নদী বা ঝর্ণাও। লেটস সেলিব্রেট আ রাফ জার্নি। কার জার্নি, মরিয়মের? নাকি এ আমার জার্নি, তোমার, তোর। যে জার্নির কথা সে মরিয়মকে বিবৃত করছে! নাকি মরিয়ম এক আধার ‘আমি’ বা ‘আমরা’র সংকলন, যে সাধারণ আমির ভেতর থাকা ছোট ছোট টুকরো আমিগুলোকে ম্যাগ্নিফাইং গ্লাসের নিচে এনে ধরলে তা বড় হয়ে ওঠে, এবং অপরূপ এক গ্লোরিফায়েড সত্যের সম্মুখীন করায়, যা জানি, কিন্তু সেভাবে দেখিনি কোনোদিন!

অমর একুশে বইমেলায় চৈতন্যর স্টল থেকে যখন ‘মরিওঁম’ কেনা হয়, ধারণা ছিল না এই বইটি এভাবে আক্রমণ করবে, আমার চিন্তাকে। তারপর যা হয়! এই মরিয়মের, সাথেই এক যাত্রা শুরু হলো। মরিয়ম কখনও কাঁদে, কখনও হাসে, সে কখনও আগুন হয়ে জলের দিকে যায়, কখনও জল হয়ে আগুনকে আক্রমণ করে। আসুন মরিয়মের সাথে পরিচিত হই।

মরিয়মকে মনে আছে? ইচ্ছে সমবয়সী যার

একটি কুকুর ছিলো। ড্যানি বলে ডাকতেই

এতোদিন পর বনজঙ্গল ফুঁড়ে এসে হাজির

হলো স্মৃতিতে। হাতে টিকিট নিয়ে আমরা

বলেছিলাম চলো যাই, সিনেমার হলে।

তোমাকে না দেখতে দেখতে আমার চোখ

অন্ধ হয়ে যায়। বুকের উপর থাবা গেড়ে

ড্যানিও দেখেছিলো পুরোটা ছবি, আমরা

বলেছিলাম মানুষ মানুষের জন্য।

মরিয়মকে চিনতে চিনতে দেখছি, আরে এতো নিজেকেই চিনছি। ধর ভোর হলো আকাশ কমলা করে। ভোর তো শুধু প্রকৃতি নয়, আমরাও ভোর। আর তা থেকে ক্রমশ খর দুপুরে পৌঁছই। আমাদের দুপুর। দুপুর যখন তিরিক্ষে, আর্দ্রতা নেই এক ফোঁটাও।

১৬

ভীষণ রোদ একটি শাদা বাড়ির উপর শাড়ির

পাড়ের মতো পড়ছে।

মরিয়ম শুকিয়ে যাচ্ছে রোদে।

মরিয়ম কি তাহলে আমাদের যাপিত জীবন? মরিয়মকে খুঁজছি... এ বইটির অলিতে গলিতে ঘুরি, টের পাই সে আমায় টানছে, আমায় ক্রমশ পেয়ে বসছে। ৩৭

সন্মোহন, ফিরেছেন? মুখর বিকেল ফুরিয়ে

গেলে নদীতে আর জল ধরে না, মেঘ কিনেছেন?

ছাতার গায়ে ফুলের ছাপ, আমরা দু দু’গুণে

চার হবো, ছাতা বেচবো একদিন বলেছিলাম!

একদিন ঝাপসা হবো ।

খেজুর গাছের পাতা হয়ে জন্মাবো, যেমন

চলে গেছে মরিয়ম। যেমন জন্মাবে মরিয়মÑ

মেঘের গায়ে ফুলের গায়ে!

মরিয়ম তাহলে, মৃত্যুর পর ফের জন্মায়। মেঘের গায়ে ফুলের গায়েও বুঝি জন্মানো যায়! যায়ই তো। সীমার মাঝে যেভাবে অসীমের জন্ম! বলাবাহুল্য, মরিয়ম তো হতেও পারে আমাদের ইচ্ছেকুসুম। আমাদের আটকে যাওয়াগুলোকে টপকে যায় সে, আর যে জয়ী তারই ইতিহাস লেখা হয়, না’কি ভুল, হেরেও মরিয়ম উঠে দাঁড়ায়, আর যারা দাঁড়ায় তারা অবশ্যই ইতিহাস! নিতান্ত সাধারণের অক্ষরেখায় দাঁড়িয়েও কেউ কেউ যন্ত্রণাদগ্ধ ইতিহাসও।

২১

নগ্ন ফুল থাকে ঠোঁটের উলটো পিঠে।

যেভাবে ব্যাকপ্যাক নাও তুমি, যেভাবে

পাহাড়ে চলো একটু ঋজু, একটু

ক্লান্তির সাথে। নগ্নতা আসলে একটা বাহু,

যেকোনো শীতেই মরিয়ম হয় গুহাবাসী।

চাদরের খুঁট থাকে পাহাড়ি ফুলে মোড়া,

ঝিরঝির করে আকাশের তারা। পড়তে থাকে

যেনো কোনো প্রাচীনতা ইতিহাস হয়ে ঠান্ডায়

জমে যায়। মরিয়ম অপেক্ষা করে এক শীত

থেকে আরেক শীতের, ঠোঁটের দক্ষিণে অলস একটি তিল!

মরিয়ম মানে ইতিহাস, ভূগোল, শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, বসন্ত সব! সবইতো! মরিয়ম ঋতুবৈচিত্রের মতই স্বাধীনা ও সুন্দর সে কখন জানুয়ারি কখনও বা ফেব্রুয়ারি।

ফেব্রুয়ারি এলেই দেখি মাত্র কটা দিন, তুমি যাচ্ছো,

দেখছো না আমাকে!

যেনো ডাকবে না আর, কোথাও বাজবে না ব্যাঞ্জো

বৃষ্টি বৃষ্টিময় সুর। ফেব্রুয়ারি গেলেই জানি বন্ধ হয়ে

যায় আমাদের মুখ। আমরা বোবায় পাওয়া একচ্ছত্র

বিষণœতা! তোমার জন্য জঠর তৈরি হয় মরিয়মের।

মরিয়ম মানেই একটি শীতপ্রধান দেশ! যেখানে

হাঁটাপথে তোমার যাত্রা শুরু হয়েছিলো বলে আজও

ব্যাঞ্জোকেই পাখির কান্না বলে ভ্রম হয়।

মরিয়ম কি তাহলে কোনো শীতপ্রধান দেশ নয় চির-আকাঙ্ক্ষিতর জঠর প্রস্তুতকারীও। মরিয়ম আসলে কে, কোথায় তার গন্তব্য? বুঝতে বুঝতেই দেখি,

মরিয়ম মানে আমরা। পনির যাত্রার মত,

একটা সহজ জীবন মুখের ভেতর গলতে

গলতে যায়। হাত বাড়ালে দেখি বৃষ্টি হয়।

দরজা বন্ধ করলে প্রতিবেশি আসে।

বিকেল খেলে দাড়িয়াবান্ধা

উঠোন জুড়ে, বহুদিন পর খাঁ খাঁ বাড়িটা

মরে যাচ্ছে। কতদিন কোনো গাছ জন্মায় না

এখানে অথচ মরিয়ম শেকড় ছেড়ে গেছে চা

গাছের মতো।

মরিয়ম তাহলে জন্মের থেকে বড়, মৃত্যুর থেকেও মহান এক সর্বব্যাপী ইচ্ছে সত্তা! মাহী ফ্লোরা, আমার কাছে একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত কবি। কিন্তু তার কবিতায় ভাসতে ভাসতে কাঁটাতার পেরিয়ে মরিয়ম নামক এক সামগ্রীক বোধের সম্মুখীন হই। হু মরিয়ম এক বোধ। আর এই বইটি পড়তে গিয়ে টের পেলাম, শুধু কবিতা নয়, অজস্র অণু উপন্যাসেরও সংকলন, না’কি ক্যামেরার চোখে দেখা সাধারণ আটপৌরে জীবনের রেট্রো সিনেমাটিক কোলাজ, যার বর্ণ আসলে সেপিয়া! এ গ্রন্থের সব কবিতাই মরিয়ম। অথবা এক জার্নির। আর বইটির নাম যখন হয়ে ওঠে ‘মরিওঁম’। ওঁম, সর্বব্যাপী অস্তিত্ব, অথবা নিবেদিত হবার সত্তা, যাকে আমরা ঈশ্বর বলেই চিনি। আসলে মা বা মরিয়ম যা হয়ত সেই আদি অকৃত্রিম অস্তিত্ব! নতজানু হও!

মরিওঁম ॥ মাহী ফ্লোরা ॥ প্রকাশক : চৈতন্য প্রকাশনী ॥ প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ॥ প্রচ্ছদ : শিবু কুমার শীল।