menu

ভালো মানুষ

হাইকেল হাশমী

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০১৯
image

আমরা যখন তাকে পতিতাপল্লী থেকে উদ্ধার করলাম তখন সে অজ্ঞান ছিল। তার কাপড় রক্তে ভেজা আর পুরা শরীরে ক্ষতের চিহ্ন ছিল। তার এই গুরুতর অবস্থা দেখে আমরা তাকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠিয়ে দিলাম।

আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে (এনজিও) কাজ করি। যাদের কাজ হচ্ছে মানুষ পাচার রোধ করা, এবং নিরীহ মহিলা, পুরুষ, শিশু যারা এইসব ঘটনার শিকার হয় তাদের উদ্ধার এবং তাদের সাহায্য করা। আমরা খবর পেলাম যে একটি নিষিদ্ধ পল্লীতে একজন অল্প বয়সী মেয়েকে আনা হয়েছে। ঘটনা থেকে মনে হচ্ছে তাকে অপহরণ করা হয়েছে। আমরা পুলিশের সাহায্য নিয়ে ওই মেয়েকে উদ্ধার করলাম এবং চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো।

সন্ধ্যায় খবর পেলাম যে, মেয়েরটি জ্ঞান ফিরেছে। সে কে এবং কোথা থেকে তাকে অপহরণ করে আনা হয়েছেÑ এসব জানার জন্য, আমাকে হাসপাতালে যেতে হলো। মেয়েটির বয়স পনর বছরের মতো হবে। শ্যামলা রঙ আর শরীরের গঠন হালকা-পাতলা। বড় বড় চোখ যার মধ্যে ভয় খেলা করছে।

আমি তার বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর সাথে সাথে সে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলো আর বিড়বিড় করতে লাগলো, “আমার গায়ে হাত দিবেন না, আমাকে কষ্ট দিবেন না।” আমি তাকে বললাম আমি তাকে কষ্ট দিতে আসি নাই, আমি তাকে সাহায্য করতে এসেছি। কিন্তু তার চোখে অবিশ্বাসের ছায়া দেখতে পেলাম। আমি ডাক্তারকে তার অবস্থা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলাম। ডাক্তার আমাকে জানালো যে সে এখন অনেকটা ভাল আছে কিন্তু খুব দুর্বল আর মানসিক “শক”-এ আছে। আমি আর ওই মেয়ের সাথে কথা না বাড়িয়ে ফিরে এলাম এই চিন্তা করে যে, সে একটু সুস্থ হলে তার থেকে সব ঘটনা শোনা যাবে, তার সম্বন্ধে জানা যাবে।

পরের দিন আমি আবার হাসপাতালে গেলাম। আজকে মেয়েটাকে আগের দিনের চেয়ে বেশ ভাল লাগলো। আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোতে সে একটু চমকে উঠলো। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি এখন কেমন আছো?”

সে আস্তে করে উত্তর দিল, “ভাল” এবং আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো। আমি তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বললাম, “আমি তোমার কোন ক্ষতি করবো না, আমরা তোমাকে ওই জায়গা থেকে উদ্ধার করে এনেছি।”

সে এখন বোধহয় একটু ভরসা পাচ্ছে, কিন্তু সন্দেহও করছে। সে যে অবস্থার ভিতর দিয়ে গিয়েছে সন্দেহ করাটা অস্বাভাবিক কিছু না। আমি তাকে বললাম, “আমি কি তোমাকে কিছু প্রশ্ন করতে পারি? তুমি কি আমার সাথে কথা বলতে চাও? আমি তোমার ভাল চাই।”

সে শূন্য দৃষ্টি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো, যে দৃষ্টিতে অনেক প্রশ্ন ছিল আর অনেক উত্তরও ছিল। আমি তার ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, ওর সাথে কি কথা বলা যাবে? সে উত্তর দিল, সে এখন সুস্থ অবস্থায় আছে, আপনি তার সাথে কথা বলতে পারেন।

আমি তার বিছানার পাশে রাখা টুলে গিয়ে বসলাম এবং তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “মা, তুমি এখন কেমন আছো?”

আমার কথা অথবা মা সম্বোধন তাকে আবেগময় করে দিল এবং তার চোখ দিয়ে অশ্রু পড়তে লাগলো। আমি তাকে সাহস দিলাম, “মা, তুমি এখন নিরাপদে আছো আর ভাল লোকদের মাঝে আছো।” কিন্তু তার কান্না আর থামে না। আমি কিছুক্ষণ আপেক্ষা করলাম যখন তার কান্না একটু থামলো তখন তাকে আবার জিজ্ঞাসা করলাম, “মা, তোমার নাম কী? তোমার দেশের বাড়ি কোথায়?”

সে খুব ক্ষীণ শব্দে কিছু বলল যেটা আমি ঠিক বুঝতে পারি নাই। তাই তাকে একটু উচ্চকণ্ঠে বলার জন্য অনুরোধ করলাম। সে একটু উচ্চৈঃস্বরে বলল, “আমার নাম শিউলী, আমার দেশের বাড়ি জামালপুর।”

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি এখানে কীভাবে এলে আমাকে একটু বলবে? তোমার ভয়ের কিছু নেই, তোমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। আমরা তোমার সাথে আছি।”

সে তখন একটু সাহস পেলো এবং আস্তে আস্তে নরম স্বরে বলতে লাগলো যে সে একটি ছোট গ্রামে থাকে, তার বাবা ক্ষেতে কাজ করে। আর মা তার বাবাকে ক্ষেতখামারে সাহায্য করা ছাড়া সংসারের সব কাজকর্ম করে এবং আরো দুই ভাইবোনের যতœ নেয়। সে তিন ভাইবোনের মধ্যে সব চেয়ে বড়। অভাবের সংসার। এক বেলা ভাত জুটলে পরের বেলা কী হবে তার কোন ঠিক নেই। সে নিজেও যথাসাধ্য তার মাকে সাহায্য করার চেষ্টা করে। ক্ষেত থেকে শাকসব্জি সংগ্রহ করে, জ্বালানির জন্য কাঠ আর পাতা কুড়ায়।

তার মাঠে মাঠে ঘুরতে ভাল লাগে। সে সবুজে হারিয়ে যেতে চায়, সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে পাখির উড়াল দেখে মুগ্ধ হয়। সে প্রজাপতির পিছু নেয়, তাদের পাখার রঙ দেখে বিস্মিত হয়। সে নদীর ধারে বসে থেকে, নদীর ঢেউ গনে আর পানির ছলৎছলাৎ তার বুকে সুর তোলে। শত অভাব, অস্বচ্ছলতা আর ক্ষুধা তার মনের সুখ কেড়ে নেয়নি।

সে তো নিজেকে বেশ স্বচ্ছলই মনে করতো কিন্তু যে দিন রহিমা খালা শহর থেকে এলো তখন থেকেই তার কপালের দুর্দশা শুরু হলো। রহিমা খালা তাদের পাশের গ্রামে থাকতো কিন্তু এখন ঢাকা শহরে থাকে। মাঝে মাঝে ছয় মাস, এক বছর পর পর গ্রামে আসে আর পুরা এলাকায় সবাই জানে সে ঢাকা শহরে অনেক আরাম আয়েশের সাথে থাকে। তার স্বামী না কি কোন বড় ব্যবসা করে। তাদের অনেক টাকা-পয়সা আছে। রহিমা খালা দামী দামী শাড়ি পরে গ্রামের বিভিন্ন বাসায় সাক্ষাতের জন্য যায়। খুব বিনয়ী আর ভদ্রভাবে অভাবগ্রস্ত পরিবাররে লোকদের সাথে কথা বলে। সে তাদেরকে জানায় যে, ঢাকা শহরে কাজের অনেক সুযোগ আছে বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। সে আরো জানায়, যে তার স্বামীর একটি বড় গার্মেন্টস ফ্যক্টরি আছে আর ওখানে শত শত মেয়ে কাজ করে।

রহিমা খালা একদিন তাদের বাসায় আসলো। তার মায়ের সাথে অনেকক্ষণ আলাপ করলো, তাদের কষ্ট আর দুর্দশার জন্য তার সমবেদনা প্রকাশ করলো। তার মাকে সে বললÑ

“তোমাদের অভাবী সংসারে বেশ আয় যোগ হতে পারে যদি তোমার মেয়েকে ঢাকা শহরে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।”

শিউলীর মা উঠে বললÑ “আপা আমি আমার মেয়েকে এতো দূরে একা একা পাঠিয়ে দেবো এটা চিন্তাই করতে পারি না।”

রহিমা খালা বললÑ “আমি তাকে একটি ভাল চাকরির ব্যবস্থা করে দিব, সে মাসে ভাল আয় করতে পারবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে, নিজেও সুখে থাকবে, আর তোমাদের সংসারেও বেশ ভাল টাকা যোগান দিতে পারবে।”

শিউলীর মা হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। সে কল্পনাই করতে পারে না যে, সে তার এতো ছোট মেয়েকে এতো দূরে কাজের জন্য একা একা পাঠিয়ে দিবে। এই কথা চিন্তা করেই তার চোখ ভিজে গেলো।

রহিমা খালা আর কথা না বাড়িয়ে বললÑ “তোমরা আমার প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখো। এটা আমি শুধু তোমাদের অবস্থা দেখে বলছি, তোমাদের কিছু সাহায্য করতে চাই। আমি সপ্তাহখানেক গ্রামে আছি, তোমরা চিন্তা করে আমাকে জানিও।”

সন্ধ্যাবেলা যখন শিউলীর বাবা ক্ষেত থেকে বাসায় এলো, তখন তার বউ তাকে হাতমুখ ধুয়ে ভাত খেয়ে নিতে বলল। সে হাত মুখ ধুয়ে খেতে বসলো, সেই মোটা চালের ভাত, পোড়া মরিচের ভর্তা আর কচু শাক। সে লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে চুপচাপ ভাত গিলতে লাগলো। তখন শিউলীর মা তাকে রহিমা খালা এসেছিল এবং কী প্রস্তাব দিয়ে গেছে তা জানালো। তার স্বামীর চেহারায় চিন্তার রেখাগুলো আরো গভীর হয়ে গেলো। সে উৎকণ্ঠার সাথে বললÑ “এটা কীভাবে সম্ভব? এতো ছোট মেয়েকে আমরা কীভাবে এতো দূরে পাঠাবো? থাক আমাদের সাথেই থাক, আমরা যে অবস্থায় আছি সেও একই অবস্থায় থাকবে।” এই কথা বলে সে ভাত খাওয়া ছেড়ে উঠে হাত ধুয়ে ফেলল।

পরের দিন সন্ধ্যাবেলা শিউলীর বাবা খুব মলিন মুখে ক্ষেত থেকে ফিরলো, তাকে অনেক চিন্তিত দেখাচ্ছিল। সে গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে মাটিতে পাতা মাদুরে বসে পড়লো। শিউলীর মা তাকে মুখহাত ধুয়ে ভাত খেতে বলল। কিন্তু সে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকলো। শিউলীর মা তাকে জিজ্ঞাসা করলো,

“কী হলো? এভাবে মন-মরা হয়ে কেন বসে আছো?”

শিউলীর বাবা লম্বা নিঃশ্বাস টেনে তিক্ত স্বরে বলল, “কপাল যার খারাপ তার মুখে হাসি আসবে কোথা থেকে?” শিউলীর মা কারণ জানতে চাইলে সে আরো দুঃখের স্বরে বলল, “আজ মহাজন এসেছিল, সে তার টাকা ফিরৎ চায়। কিছু দিনের সময় চাইলাম কিন্তু আর সময় দিতে রাজি না। বলে এতো দিনে যখন ধার শোধ করতে পারো নাই তাহলে এই কয়দিনে কীভাবে পারবে। সে বলে টাকা ফিরৎ না দিতে পারলে, জমি ছেড়ে দিতে, ওই জমি ওকে দিয়ে দিতে।”

শিউলীর মা আঁতকে উঠলো, “এখন কী হবে শিউলীর বাবা? একটুকরো জমি দিয়েই তো আমাদের সংসার চলে, যদি ওটাও হাতছাড়া হয়ে যায় তখন আমাদের কী হবে?”

শিউলীর বাবা বলল, “অনেক কাকুতি মিনতি করে তার থেকে দুই মাস সময় নিয়েছি, এবার মাসে মাসে টাকা শোধ করবো কিন্তু বুঝে উঠতে পারছি না কীভাবে শোধ করবো? কোন আয় নেই আর তার উপর মাসিক কোন আয় নেই যে, আমি আমার দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবো।”

শিউলীর মায়ের চিন্তা, তাদের আর কিছু করার নেই। যা একটুকরো জমি আছে ওটাও মহাজনের হাতে চলে যাবে। তাদের জীবন আরো দুর্বিসহ হয়ে পড়বে। না খেয়ে মরতে হবে। তাদের ভিক্ষা করার জন্য রাস্তায় বের হতে হবে। এইসব চিন্তা করতে করতে তার হঠাৎ রহিমা খালার কথা মনে পড়লো। সে তো বলেছে যে শিউলীকে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে একটা ভাল চাকরি দিয়ে দেবে। শিউলী যদি চাকরি পায় তাহলে মাসে মাসে সে কিছু টাকা তাদের পাঠালে মাহাজনের ধার শোধ করা যাবে। এই চিন্তায় সে একটু স্বস্তি পেলো। সে নিজের স্বামীকে এই কথা বলার সাথে সাথে সে রেগে গেল। কিন্তু যখন তার বউ তাকে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে বলল তখন সে থমকে গেলো, অনেক চিন্তা ভাবনার পর সে এই একটি সমাধান ছাড়া আর কোন পথ খুঁজে বের করতে পারলো না।

এখন সমস্যাটা দাঁড়ালো যে শিউলীকে এই কথা কীভাবে জানানো হবে যে, তাকে কাজ করার জন্য শহরে যেতে হবে। তার বয়স তো মাত্র পনরো বছর, এই বয়সে কি কেউ কাজ করে? কিন্তু এমন উদাহরণও তো আছে, ওর চেয়ে ছোট মেয়েদের গ্রামে বিয়ে হয়ে গেছে। ওই আমাদের সকিনার মেয়ে বেলী তার বিয়ে তো মাত্র বারো বছর বয়সে হলো। এখন সে ঘরসংসার করছে। তাহলে শিউলীও কাজ করতে পারবে, এইসব বলে মা নিজেকে সান্ত্বনা দিল। তাই এক ফাঁকে সে শিউলীকে তাদের সমস্যার কথা জানালো, মহাজন তাদের জমি নিয়ে নিতে চায় যদি টাকা শোধ না করতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে তাঁরা রাস্তায় বসে যাবে। মেয়েটি এইসব শুনে ঘাবড়ে গেলো আর মাকে জিজ্ঞাসা করলো এখন উপায় কী? তার মা তাকে জানালো যে কোন উপায় খুঁজে বের করা যাচ্ছে না। তার বাবা মহাজন থেকে অনেক চেষ্টা করে দুই মাসের সময় নিয়েছে যে, আস্তে আস্তে করে প্রত্যেক মাসে তার দেনা শোধ করে দিবে। তখন শিউলী জানতে চাইলো যে মাসে মাসে ধার শোধ দেয়ার টাকা কোথা থেকে আসবে? তার মা ওকে জানালো যে, একটা উপায় আছে কিন্তু তার জন্য তার সাহায্য লাগবে। তখন সে ওই উপায়টা জানতে চাইলো, তার মা তাকে রহিমা খালার প্রস্তাবের কথা বলল। শিউলী প্রথমে তো ভ্যবাচেকা খেলো, সে এই চিন্তা করে কেঁদেই ফেলল যে, তাকে তার মা-বাবার কাছ থেকে দূরে চলে যেতে হবে, একটি অচেনা জায়গায় তাকে কাজ করতে হবে। কিন্তু তার মা তাকে বলল যে, “তোকে চলে যেতে হবে এমন কোন কথা নেই, কিন্তু টাকা না দিতে পারলে মহাজন আমাদের জমি দখল করে নিবে।” শিউলী বুঝতে পারছে না সে কী করবে! একদিকে মা-বাবাকে ছেড়ে যেতে মন চায় না, আর অন্যদিকে না গিয়েও কোন উপায় নাই। পরে সে তার মাকে জানালো সে যেতে রাজি আছে; কিন্তু যেই না তাদের ধার শোধ হয়ে যাবে সে ফেরত চলে আসবে। ওই দিনই তার মা রহিমা খালাকে তার সম্মতির কথা জানিয়ে দিল।

রহিমা খালা এক সপ্তাহ পর যাবার দিন ঠিক করলো। শিউলীর কাছে মনে হলো দিনগুলো অনেক দ্রুত চলে যাচ্ছে। তার মন সারাক্ষণ খারাপ থাকে আর যাবার কথা চিন্তা করে তার চোখটি ভিজে যায়। সে তার মা-বাবা আর ভাইবোনকে দেখবে না এই কথা চিন্তা করে তার বুক ফেটে কান্না আসে। এক সপ্তাহ পর ওই মুহূর্ত চলে এলো যে দিন সে গ্রাম ছেড়ে, তার বাসা ছেড়ে, তার পরিবার ছেড়ে এক অজানা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো। সে সারা রাস্তা বাসে বসে কাঁদলো।

ঢাকার মহাখালীতে এসে বাস থামলো, শিউলী এতো মানুষ কোন দিন দেখে নাই। এতো হট্টগোল, এতো ধরনের শব্দ, কোন দিন শুনে নাই। এইসব দেখে সে কান্না ভুলে গেল। রহিমা খালা একটা সিএনজি করে তাকে নিয়ে শাহজাহানপুরে তার বাসায় গিয়ে পৌঁছাল। এখানে এসে শিউলী একটু হতভম্ব হয়ে গেল, সে তো তার বড় বাসা এবং গাড়ি বাড়ির কথা বলত, কিন্তু এখানে সে একটি দুই কামরার ফ্ল্যাট বাড়ি দেখছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না। রহিমা খালা তাকে পাউরুটি খেতে দিয়ে বলল যে, ওটা খেয়ে একটু বিশ্রাম করে নিতে, সন্ধ্যা বেলা তাদের আর এক জায়গা যেতে হবে যেখানে তার জন্য কাজ ঠিক করা হয়েছে। দুপুর চারটার দিকে রহিমা খালা রিক্সা করে তাকে নিয়ে গুলিস্তান বাসস্ট্যান্ডে গেল তারপর একটা বাসে করে কোথাও নারায়ণগঞ্জ নামের কোন জায়গার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো। সন্ধ্যা ছয়টা তারা নারায়ণগঞ্জে পৌঁছালো। তারপর আবার রিক্সা করে একটি চিপা গলিতে যাত্রা শেষ হলো।

রহিমা খালা একটা জীর্ণ বাসার দরজা ধাক্কা দিল, কেউ এসে দরজা খুলে দিল। রহিমা খালা শিউলীকে নিয়ে ভিতরে ঢুকলো আর একটা নোংরা রুমের একটা নোংরা খাটে বসতে দিয়ে নিজে বাইরে চলে গেল। হঠাৎ সে দেখলো রুমের দরজা বন্ধ হয়ে গেল, কেউ বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। সে ভয়ে উঠে দরজা ধাক্কাতে লাগলো আর চেঁচাতে লাগলো দরজা খুলে দেয়ার জন্য। কিন্তু বাইরে কোন সাড়াশব্দ নেই। সে জোরে জোরে চেঁচাচ্ছে আর দরজা ধাক্কাছে, সে রহিমা খালাকে ডাকছে, নিজের মা-বাবাকে ডাকছে কিন্তু কেউ তো আর দরজা খুলে না। সে ক্লান্ত হয়ে দরজার কাছেই বসে পড়লো আর কাঁদতে লাগলো। সে জানে না কতো সময় এভাবে কাঁদতে কাঁদতে চলে গেছে। বন্ধ রুমে কোন জানলাও নেই যে সে আন্দাজ করবে বাইরে অন্ধকার হয়েছে নাকি এখনো আলো আছে। সে কখন যে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লো সে নিজেও টের পায় নাই।

দরজা খোলার শব্দে শিউলী হঠাৎ জেগে উঠলো। দেখে একজন মোটাসোটা লোক রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। লোকটি খাটের উপর বসে শিউলীর দিকে তাকিয়ে রইল। একটু পর তাকে তার কাছে এসে বসতে বলল। সে উত্তর দিল, “আমি ওখানে বসবো না আমাকে রহিমা খালার কাছে নিয়ে চল।” সে এক বিচ্ছিরি হাসি দিয়ে বলল, “রহিমা খালা তো তোকে আমার কাছে পাঁচ হাজার টাকায় বিক্রি করে গেছে। তোকে এখন থেকে এখানেই থাকতে হবে আর আমাদের কাজ করতে হবে। আমাদের খুশি করতে হবে।”

শিউলী কিছুই বুঝতে পারছে না, তাই ওই লোককে জিজ্ঞাসা করলো, “হ্যাঁ আমি তো কাজ করার জন্য আমার দেশ থেকে এসেছি, আমাকে কী কাজ করতে হবে? রহিমা খালা বলেছিল আমাকে গার্মেন্টস ফ্যক্টরিতে কাজ দিবে।”

সেই লোকটি জোরে হেসে বলল, “না রে মাগি তোরে অন্য কাজ করতে হবে।” তারপর সে হঠাৎ করে শিউলীকে জড়িয়ে ধরলো এবং তার গায়ের বিভিন্ন জায়গায় হাত দিতে লাগলো। সে যতই তার কবল থেকে মুক্ত হতে চায় লোকটি তাকে আরো জোরে চেপে ধরে। সে তার কাপড় খোলার চেষ্টা করছে আর ওর নোংরা মুখ দিয়ে তার গালে আর ঠোঁটে চুমু দিচ্ছে। লোকটি তার কাপড় ছিঁড়ে ফেলে তাকে একদম উলঙ্গ করে দিল।

যখন তার জ্ঞান ফিরলো তখন সে বুঝতে পারছে না যে সে কোথায়। এইটুকু বুঝতে পারছে যে সে একটি শক্ত বিছানায় শুয়ে আছে আর তার সমস্ত শরীরে প্রচ- ব্যথা। মনে হচ্ছে কেউ হাতুড়ি দিয়ে পুরো শরীরকে পিটিয়েছে। তার মুখে লবণাক্ত স্বাদ লেগে আছে, হাত দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে দেখলো যে হাতের তালুতে লাল রক্ত লেগে আছে। আরো অনুভব করলো যে তার ঠোঁট দাঁতের কামড়ে ফুলে গেছে। সে এখন সম্পূর্ণ সজাগ। এখন তার চোখ অন্ধকারে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সে লক্ষ্য করলো যে তার পাশে সেই নোংরা লোকটি শুয়ে আছে। তার শরীরে কাপড় নামের কোন বস্তু নেই, শুধু একটি ময়লা চাদর দিয়ে শরীরটি ঢাকা। সকাল হবার আগে ওই লোকটি আবার তার উপর চড়াও হলো, সে আবার ব্যথার দরুন জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। আবার যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন সে দেখলো সকাল হয়ে গেছে। আর সেই লোকটি রুমে নেই।

একটু পর দরজা খুলে আর একজন লোক শিউলীকে এক থালা ভাত দিয়ে গেল। সে অনুভব করলো সে অনেক ক্ষুধার্ত আর তার প্রচ- পিপাসা পেয়েছে। সারা দিন সে খাটে শুয়ে ব্যথায় কাতরালো আর চিৎকার দিয়ে কাঁদলো কিন্তু কান্না শোনার কেউ ছিল না। কয়েক রাত তার উপর এইভাবেই অত্যাচার চলল। তাকে না খাইয়ে দাইয়ে সারা রাত কয়েকজন লোক তার উপর অত্যাচার করে। তাকে কতো লোক ভোগ করলো সেই হিসাব সে ভুলে গেলো।

আমি তার কথা শুনে মনের ব্যথায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম আর নিজেকে পুরুষ ভেবে লজ্জায় আমার মাথা নত হয়ে গেল। আমি তার চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারছি না। আমি নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে তাকে আশ্বাস দিলাম যে, এখন তুমি নিরাপদে আছো আর তোমাকে কেউ কিছু করতে পারবে না। সে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল আর তার চোখের কোণ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। আমি তার কপালে হাত বুলিয়ে বললাম, “মা, তুমি আর চিন্তা করো না, তোমাকে আর কেউ কিছু করতে পারবে না। আমরা তোমার সব দায়িত্ব নিবো। যদি চাও তোমাকে তোমার বাসায়, তোমার গ্রামে পাঠিয়ে দিবো।”

সে চোখ খুলে আমার দিকে ভেজা ছলছল চোখে তাকালো আর বলল, “আমি এখন কীভাবে আমার মা-বাবার কাছে যাবো, আমি এখন তাদেরকে কীভাবে মুখ দেখাবো।”

“কেন তোমার মা-বাবা তো তোমাকে ছুঁড়ে ফেলবেন না, আর যা ঘটেছে তাতে কি তোমার কোন ইচ্ছে ছিল। কিছু খারাপ লোকের পাল্লায় পড়ে তোমার এই দুর্দশা হয়েছে, এটাতে তোমার কী দোষ?”

সে আমার দিকে অসহায়ভাবে তাকিয়ে রইলো। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আচ্ছা তুমি নিশ্চয় ওই খারাপ লোকদেরকে প্রচ-ভাবে ঘৃণা করো?”

সে আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আস্তে করে উত্তর দিলো, “আমার ওদের উপর কোন রাগ নেই, তারা তো খারাপ মানুষ, তারা তো নোংরা মানুষ। আমার রাগ হচ্ছে আপনাদের মতো ভাল মানুষের উপর, আপনারা এতো দিন কোথায় ছিলেন!”