menu

ভ্রমণ

ভগবান টিলার পাদদেশে

রুহুল আমিন বাচ্চু

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৮
image

খাগড়াছড়ির জেলা সদরের সোজা উত্তরে পানছড়ি উপজেলা। সদর থেকে দূরত্ব ২৫ কি.মি। রাস্তার বামপাশ ঘেঁষে কখনো কখনো বয়ে গেছে খাগড়াছড়ির প্রাণ চেঙ্গী নদী। আবার দূরে সরে বাঁক নিয়ে ফিরে এসেছে রাস্তার পাশে পাশে। চেঙ্গী নদীর দুপারে সমান্তরাল শস্যশ্যামল ভূমি। সব ধরনের সব্জির উদ্যান যেন পরিপূর্ণ করে রেখেছে এ অঞ্চলকে। রাস্তার আশে পাশে ছোট ছোট টিলা থাকলেও পাহাড় একটু দূরত্বে অবস্থান করছে। চৈত্রের শুরুতে আমরা তিনজন ঢাকা থেকে রওনা হই খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে। আমার সঙ্গী মুরাদ ও মিঠু এককালে খাগড়াছড়িতেই বড় হয়েছে। এখন রাজধানীর ছাত্র। চেঙ্গী নদীতে এখন কোথাও হাঁটু পানি নেই। পাহাড়ের ঝর্না থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নদীতে সৃষ্টি করেছে ক্ষীণ স্রোতধারা। ঝর্নার পানি বহুধা বিভক্ত হয়ে নদীর গা ভিজিয়ে রাখছে। বলা যায় মাতা নদীকে কোনভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে দুঃসময়ে। গেল চার মাসেও এখানে বৃষ্টি হয়নি। বর্ষায় আবার দুরন্ত অধ্যায়। পাহাড়ি চেঙ্গী নদীর স্রোত অপ্রতিরোধ্য। তখন উপহাস করর মতো কোন বাক্য থাকে না। নদীর তলানীতে মোটা বালু, নুড়ি পাথর। স্বচ্ছ জলের ক্ষীণ স্রোতে নদীর উদ্যোম পেটে সোনালি আভা বিচ্ছুরিত।

পানছড়ি উপজেলার ইসলামপুর গ্রামটি মূলত খাগড়াছড়ি হতে দুদকছড়ি চলার পথে। দুদকছড়িতে ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হয় সে কারণে স্থানটি ঐতিহাসিক ঘটনায় অভিষিক্ত।

আমার এক আত্মীয়ের পূর্বের ব্যবসায়িক ঠিকানা ইসলামপুর বাজার। বাজার সংলগ্ন তাদের বসতবাটি। রাস্তার পাশে তাদের টিনের ঘর। পেছনে কিছুটা সমান্তরাল ভূমি পেরিয়ে ধাপে ধাপে নেমে গেছে নিচে। পেছন থেকে মনে হয় টিলার উপর ঘর, তারপর কয়েক ধাপ নিচে রান্নাঘর। স্নানাগার, আর টয়লেট। ওখানে গেলে থাকা খাওয়ার একটা সাশ্রয়ী ব্যবস্থাও হয়ে যায়।

রাস্তা সংলগ্ন বিধায় ধুলা-বালি, চাঁদের গাড়ির গর্জন, মোটর সাইকেল, বেবিট্যাক্সির হর্ন বিরক্তিকর। পাহাড়ে এসেছি নির্জনতায় বসবাসের জন্য। ব্যবস্থাও হয়ে যায়। অদূরে একটা টিলায় কটি ঘর। সাইফুলদের আম, জলপাই, গাছের নিচে একটা কামরা পেয়ে যাই। অতিরিক্ত ব্যবস্থা হিসেবে থাকার ঘরের সাথেই বাথরুম টয়লেট ব্যবস্থা। ইসলামপুর গ্রামের একদল যুবক ক্রমে ক্রমে আমার অনুরাগী হয়ে ওঠে। সাইফুল, রুবেল, মুরাদ, ইকবাল, হাসান, ফারুক, রেজাউল করিম, জুয়েল এবং মিঠু। আগেও একাধিকবার এই এলাকা সফর করেছি। ওদের কেউ ছাত্র, কেউ চাকরিজীবী কেউ বিভিন্ন কর্মকান্ডের সাথে জড়িত হলেও আমার বিভিন্ন কাজে ওদের সময়মতো পেয়ে যাই। ওদের নিয়েই বিভিন্ন পাহাড় টিলা কখনো কখনো বৌদ্ধবিহারে যাতায়াত চলে। ওরা ক্লান্তিহীন। ছড়ায় বা ঝর্নায় আমাকে সঙ্গ দিতে উদগ্রীব। রাবার ড্যামে বা কোন প্রাকৃতিক লেকে গোসল করতে আগ্রহী। একেকদিন একেকজনের প্রস্তাব এবং বাস্তবায়ন। কোথাও জঙ্গলে বিরাট বটবৃক্ষ। চল যাই বল্লে, দেরি নাই। বটতলের হিমেল হাওয়ায় বট শিকড়ের সাথে নিজের আত্মাকে জড়িয়ে ফেলি। চৈত্রের পথ চলায় পদতলে কখনো শাল পাতার খচখচ শব্দ উপভোগ করি। আবার থেমে গিয়ে নির্জনতায় প্রকৃতির শ্বাস উপলব্ধি করি। কখনো কখনো পাক-পাখালির আদূরে ডাক নিজ কণ্ঠে ধারণ করে উত্তর দেই। রাবার গাছের ভরাট কচি পাতার রং দেখি, লজ্জাবতী পাতায় ছোঁয়া দিয়ে প্রকৃতির লজ্জা উপভোগ করি। ওরা বেশ মজা করে। নতুন ভাবনায় প্রকৃতির সান্নিধ্য উপলব্ধি করে।

কথা হলো পরদিন ভগবান টিলায় যাব। দূরত্ব বেশি না হলেও পাহাড়ি পথ। রুবেল একটা অটোরিক্সা নিজেই চালিয়ে নিল প্রাথমিক গন্তব্যে। আমরা ছয়জন। দীর্ঘদিন ধরে ওরা পানছড়িতে থাকলেও ভগবান টিলায় কখনো যায়নি। পথে লোগাং পাড়া থেকে ওদের বন্ধু নিজামকে ডেকে আনে।

ওদের ভাষ্য অনুযায়ী নিজাম একাধিকবার ভগবান টিলায় গিয়েছে। শুরুতেই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল বলে ওরা আমাকে নিবৃত্ত করতে চাইলো। বল্লাম, চাকুরি থেকে অবসর নিলেও দীর্ঘপথ হাঁটার অভ্যাস আমার আছে। আমার দৃঢ়তায় ওদের দ্বিতীয় যাত্রা শুরু হলো।

চেঙ্গী নদী কখনো আমাদের সহচর, কখনো তার উপর নির্মিত বেইলি ব্রিজ পার হয়ে অটো এগিয়ে চললো।

চলার পথে ছোট ছোট দোকানের সারি। মাঝ মধ্যে রাস্তার পার্শ্বে অস্থায়ী দোকানে পাহাড়ি নারীরা ফলমূল, তরি তরকারি নিয়ে খদ্দরের অপক্ষায়।

ওদের কাছ থেকে ক্ষিরা, সেদ্ধ ভুট্টা, আখ, পাকা টমেটো, কিনে নিলাম। পানির বোতল আগেই সংগ্রহে ছিল। লোগাং পাড়া পেরিয়ে একটা পাহাড়ি দোকানের সামনে অটো থামাতে বল্লাম। নিজাম বল্লো, অটো আর বেশিদূর যাবে না। একটু সতর্ক হলাম। পথে এক পাহাড়ি নারীর দোকানে কলা, বিস্কুট, চা খেয়ে অভিযানের জন্য তৈরি হলাম।

রুবেলের অটো থেমে যায় চিকনচান কারবারি পাড়ায়। সামনে অনেকটা খাড়া ঢাল নেমে গিয়ে আবার উঠেছে সমান্তরালে।

ঢালে অটো নামলে আর ওঠানো যাবে না। তাছাড়া ব্যাটারি চালিত অটোর শক্তি কম। আবার রিস্কও রয়েছে। ব্যাটারির চার্জ কমে গেলে এ দুর্গম পথে ফেরার উপায় থাকবে না।

পেছনে একটা পাহাড়ি বাড়িতে অটো রেখে রুবেল আমাদের সাথী হয়। বেলা বারোটা পেরিয়েছে। কিছুটা চড়াই উতরাই পথ পেরিয়ে রাস্তার বামে নজরে পড়লো একটা চিতা। নিজাম বল্লো, গতকাল কোন পাহাড়িকে দাহ করা হয়েছে। ওদের সংস্কার অনুযায়ী মৃতের ব্যবহার্য জিনিসপত্রও পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এমনকি মৃতের কাছে জমানো টাকা পয়সাও বাদ যায়নি। পরিত্যক্ত চিতায় দুটি অ্যালুমিনিয়ামের থালা বাটি, হাতল পুড়ে যাওয়া একটা দা অবশিষ্ট রয়েছে। আমতলীতে রাস্তার পার্শ্বে দাড়িয়ে প্রায় শতবর্ষী একজোড়া আমগাছ। চৈত্রের প্রথমে গুটি গুটি আম দেখা যাচ্ছে বেশ। গাছ দুটোর সান্নিধ্যে কিছুটা সময় ব্যয় করলাম। গাছের ছায়ায় চোখ বুঝে লম্বা দম নিয়ে বুক ভরে আম্রপাতার নির্যাস মিশ্রিত সবুজ অক্সিজেন নিলাম।

নিজে নিজে বললাম, হে শতবর্ষী আম্রবৃক্ষ এত এত প্রতিকূলতার মাঝেও তুমি আমাদের সুশীতল ছায়া দিচ্ছ। অক্সিজেন দিচ্ছ, ফল দিচ্ছ, সবুজ পাতার আচ্ছাদনে পবিত্র রেখেছ সমাহিত পরিবেশকে। তারপরও কখন না তোমার গোড়ালিতে করাতের খ্যাঁচ খ্যাঁচ আঁচড়ে ধরাশায়ী হয়ে পড়। আমরা মানুষ। তোমাকে প্রয়োজন আমাদের বড্ড বেশি। কিন্তু আমরা বুঝি শুধু অর্থ। যার বিনিময়ে তুমি বিকাবে, বিকাবে তোমার প্রাণ। সে প্রাণ যে প্রাণিকুলের অংশ তা আমরা ভুলে যাই।

আমরা আখ চিবুতে চিবুতে এগিয়ে যাই। পথের পাশে ছোট ছোট টিলায়, মাটির ঘর, বেড়ার ঘর, কোথাও কাঠের খিলির উপর শনের টং ঘর।

রাস্তার দুপাশে শাল, সেগুন, কনক গাছ। মাঝে মাঝে পোড়া বন- পাহাড়ের মাথা। পাহাড়িরা ঝুম চাষ করবে তারই প্রস্তুতি। রাস্তার দুপাশে খাড়া ঢাল। নিচের কলাগাছকে মনে হয় কচুপাতার মতো। আরো দূরে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করে রেখেছে অরণ্য। মাঝে মধ্যে রাবার বাগান। শীতের শেষে চৈত্রের খরতাপে শাল, সেগুন গাছ পত্রবিহীন। এখানে তার ব্যতিক্রম। রাবার বাগান সবুজ পত্রে সেজে আছে। ঝির ঝির বাতাসে সবুজের ঘ্রাণ। শালিক, কোকিল আর কিছু হলদে পাখি নজরে আসে। কোকিলের কুহুতান বনের নীরবতার সুর।

মেলধন পাড়া পেরিয়ে পথে এক পাহাড়ির সাথে দেখা। হাতে দা। ওরা কোমরে বা হাতে সব সময় দা রাখে। দাটি আবার ভিন্ন আঙ্গিকে গড়ানো। পোঁচ দিয়ে কাটা যায় মাথা দিয়ে ঠেকিয়ে ঝুম চাষের জন্য গর্ত খোঁড়া যায়। জিজ্ঞেস করলো আমাদের গন্তব্য কই? ভগবান টিলা বলতেই লক্ষ করলাম ওর চোখে রহস্যের হাসি। আস্তে করে বল্লো রাতে থাকতে হবে। আমাদের গাইড নিজামের দিকে তাকালাম। হেসে বললো আরে এক ঘণ্টার পথ। চলেন তো, পা চালাই। কত গেছি ভগবানের পাড়ায়। একটা চড়াই পার হতেই মিঠু মাথা সমান একটা মুলি বাঁশের অংশ আমার হাতে দিয়ে বলল, আঙ্কেল কাজে লাগবে।

একটু পর ওটা ফেলে দিয়ে বল্লাম হে যুবক, আমাকে বুড়ো বানাচ্ছ। মনে করছ তোমাদের সাথে হেঁটে কুলোবো না। ফারুক বললো, আঙ্কেল তো আমাদের আগে আগে চলছেন। বল্লাম, হাঁ দৌড়াতেও পারবো। ছোট বেলায় স্পোর্টস ম্যান ছিলাম। দৌড়ে পুরস্কারও পেয়েছি। প্রথম পুরস্কার। একটা চিরুনী, একটা আয়না আর একটা পেন্সিল। ওরা একযোগে হেসে উঠলো।

বললাম শোনো, তোমাদের জন্মের আগে। গেল শতকের ষাটের দশকের মাঝামাঝি। তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি।

পঁচিশে ডিসেম্বর বড়দিন উপলক্ষে মৌলভীবাজার খ্রিস্টান পাড়ায় স্পোর্টস। মাইকে ঘোষণা হলো, যারা দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চাও নাম লেখাও। ব্যাস হলো। নাম লেখালাম এবং দৌড়ে ফাস্ট হলাম। পুরস্কার দুই পয়সার চিরুনি, এক আনার আয়না আর দুই পয়সার পেন্সিল। আহা কী আনন্দ! সাথী বন্ধুরা ধরলো, পুরস্কার পেয়েছি বাদাম খাওয়াতে হবে। পকেটে ছিল এক আনা, এক ছটাক বাদাম কিনে....

মিঠু কথা শেষ করতে দিল না, বললো আঙ্কেল দেখি শায়েস্তা খানের আমলের কথা বলছেন? বললাম, আমল হিসেবে দূরত্ব অনেক। কিন্তু মূল্যমান সে তুলনায় কাছের। চার আনা হালি হাসের ডিম্ব বিক্রি করতাম। আমার মা’র ছিল পনর জোড়া হাঁস। সে সময় শ’টাকায় সোনার ভরি। আমার মা দেড়শ’ টাকায় দেড় ভরি ওজনের সোনার হার বানিয়েছিলেন। এক আনার ডিম দশ টাকা এখন। তখন ষোল আনায় টাকা। বছর এবং মূল্য দুটোই হিসেব করে দেখ শতকরা হিসাবে কী দাঁড়ায়।

মিঠু বললো আঙ্কেল ল্যাপটপ লাগবে। বল্লাম, তোমরাতো ইয়ো ইয়ো ডটকম। তোমাদের ব্রেইনটাই তো একটা পিসি।

ফারুক ক্লান্তি জনিত একটা শ্বাস ঝেড়ে বললো, আঙ্কেল আপনারা কোথায় ছিলেন আর আমরা...

বল্লাম, হে বালক কী বল্লে? আমি কোথায় ছিলাম মানে? আমি কি নেই? এটাতো অর্ধজীবনের কথা। আমাকে তোমরা অতীত করে দিচ্ছ।

ওরা সমস্বরে সরি সরি বলে উল্লাস করতে লাগলো। বল্লাম, সবাই একটা করে টমেটো খাও। রেজাউল তার হাতে রাখা পলি ব্যাগ এগিয়ে ধরলো। বল্লাম এতে খাবার এবং পানি অর্থাৎ খাবার পানি রয়েছে। ক্ষুদ পিপাসার কাতরতা কেটে যাবে। ওরা সাহাস্যে আমন্ত্রণ গ্রহণ করলো। মুরাদ টমাটোতে কামড় দিতেই পিচকিরি দিয়ে রস বেরিয়ে মিঠুর কানে ঢুকে পড়লো। সবাই হাসতে হাসতে বলল আঙ্কেল দি গ্রেট। বল্লাম, তোমরা আগামিতে গ্রেটেস্ট হবে। পাহাড়ি চড়াই উতরাই পেরিয়ে দুঘণ্টা পথ চল্লাম। নিজামের দিকে তাকাতেই বল্লো, আঙ্কেল এইতো প্রায় এসে গেছি। এ যে কলাগাছগুলো ওখানে যাব, বলেই তার হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল।

একটু এগিয়ে দেখলাম, সামনের রাস্তা পয়তাল্লিশ ডিগ্রী এঙ্গেলে নেমে গেছে, রাস্তা বাঁক নিয়ে আবার উপরে উঠেছে। নিজামের কলাগাছ কোথায়! দৃশ্যত বাঁক পেরিয়ে কলাগাছের শত শত মুড়া, তার নিচে আবার, তারও নিজে কচুপাতার মতো ধোঁয়াশায় আবৃত আরেক স্তর। সেতো নেই চলে গেছে রেজাউলকে নিয়ে। তিনজন পাহাড়ি একটা বাঁকে বটতলে বিশ্রাম নিচ্ছে। দুজন যুবক একজন বৃদ্ধা। ওদের হাতে তিনটা চকোলেট ধরিয়ে দিলাম। খুব খুশি হলো। ওদের পাশে রাখা দুই আঁটি কাঁচা মুলি বাঁশ। পাহাড়ের ঢাল থেকে কেটে এনেছে। আমরা তিনজন এক আঁটি উঠানোর চেষ্টা করেও পারিনি। ওরা চকোলেট মুখে হাসি ঝেড়ে বললো ভারি, খুব ভারি। ওদের সাথে ছবি তুলে নিজামের উদ্দেশে পা চালালাম।

ডানে বাঁয়ে তাকালাম। আশেপাশে মনুষ্য বসতি নেই। মাঝে মাঝে রাস্তার বাঁক গলিয়ে পায়ে চলার পথ। দূরে পাহাড়ের টিলায় পাহাড়ি দু’চারটি পরিবারের বাস। জানলাম ওরা সমতলে কমই আসে। ঝুম চাষ করে আর পনর দিন বা মাসে একবার স্থানীয় হাট থেকে এটা ওটা কিনে নেয় অথবা বিক্রি করে।

আরেকটা বাঁক পার হতেই দেখা হলো একদল বিজিবি সদস্যের সাথে। ওরা টহলে নেমেছে। দলনেতা আমাদের পরিচয় জেনে বল্লো, এটা দুর্গম এলাকা, সামনে বেশি দূর যাবেন না। তাছাড়া এ পথে নিরাপত্তা নেই।

নিজামের ভাষ্য : ভগবান টিলার নিচে বড় বড় পাথর, মূর্তি, রয়েছে বিশাল জলাধার, বিরাট বিরাট গাছের ছায়ায় আচ্ছাদিত প্রকৃতি। মনে মনে ভাবলাম, অপূর্ব প্রাকৃতিক সমন্বয়ের দ্বারপ্রান্তে আমরা। নিজামকে খোঁজ করার জন্য দুজনকে আগে যেতে বল্লাম। এবার অনেকটা একা হয়ে আছি আমরা শহুরে তিনজন। সাহসের বুকে শক খেলাম। অপেক্ষার সুযোগ নেই, নেই জিরোবার কোন বাহানা।

নিজেকে কমান্ড করলাম, আমি নিয়মিত মেডিটেশন করি। নেতিবাচক কোন কাজ বা ভাবনা আমার জন্য নয়। পৃথিবী আমার, যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাব। পা বাড়ালাম। নিজামের প্রদর্শিত প্রথম কলামুড়ার কাছে থামলাম। ওরা কেউ নেই। মুরাদকে হাঁক দিতে বল্লাম। শব্দ পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো।

রাস্তার ঢালে কলাগাছ সারি সারি। কয়েকটি গাছ ছড়ার ভারে নুয়ে আছে। ফারুক হঠাৎ আবিষ্কার করলো আমাদের মাথার ওপর এক ছড়ি কলা পেঁকে আছে। ক্ষুদ-পিপাসায় কাতর হয়ে কলাপাতার দোলানো ছায়ায় অবস্থান নিয়েছি। ওদের হাঁকা হাঁকির কোন প্রতিউত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। বাস্তবিক পক্ষে বেওয়ারিশ ভূমিতে আল্লার দেয়া দান উপেক্ষা করলে পস্তাতে হবে। কলা দেখানো ঐ প্রকৃতি নয়, পাকা কলার ছড়া পাতানো স্রষ্ঠার লীলা খেলার অনুগ্রহ মনে করে ওদের বল্লাম গাছটাকে কোরবানী দাও। হাতে নেই দা, ছুরি। বুদ্ধিমান বালকদ্বয় মিঠু আর ফারুক গাছের মাজা লাঠি দিয়ে ঘাই মেরে ফেলে দিল। কলার কাঁদিটা পড়লো রাস্তায়। এতোক্ষণে ফাঁক গলিয়ে দৃষ্টি চলে যায় নিচে। কলাগাছের মুড়া পেরিয়ে খাড়া গভীর খাঁদ। সিøপ করলে একদম শ’ শ’ ফুট নিচে। সে কলার কাঁদিই হোক আর মানুষ্য সন্তান হোক। টিভিতে ডিসকভারি চ্যানেলে সারভাইভ্যাল সিরিজ দেখে অন্তত কিছু একটা শিখেছি। মুহূর্তে পাকা কলা ছিলে কামড় বসালাম। একি পরিহাস প্রকৃতির। এ দেখি বিচিকলা। কাল কাল বিচিতে একদম ঠাসবুননী। এমনকি চুষেও একটু স্বাদ নেয়ার উপায় নেই। ভাবলাম এই সেই জংলীকলা। যা পশু পাখিদের জন্যই একান্তভাবে স্রষ্টার বরাদ্দ।

হতাশ রুবেল সাঁই সাই করে সামনের জঙ্গলে মিলে গেল। একটু পর নিচ থেকে শব্দ এল নানা নিচে নামুন। আবার রুবেলের হাঁক ডাক। ওরা ডাকছে নিচে যেতে।

ভগবানের লীলা যে আর কদ্দুর কাকে জিজ্ঞাসা করবে! আমার হাতে বাকি একজন মিঠু। বল্লাম, চলো আল্লার নাম নিয়ে নেমে পড়ি।

মিঠুর দেয়া একটা গাছের ডাল খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করছি। খুঁটি ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে নামছি খাঁড়া নিচে। মাঝা মাঝি স্থানে অপেক্ষা করছে রুবেল। হঠাৎ ডানদিকে তাকিয়ে বল্লো, নানা দেখেন দেখেন, কতোগুলো বানর গাছে খেলছে। মুহূর্তে ওরা আড়ালে চলে গেল। পাহাড়িদের খাদ্য তালিকায় বানর, শুকর, সাপ, বেজি, গুইসাপ, সব ধরনের পাখি রয়েছে।

মানুষ প্রকৃতির বন্ধু হতে পারেনি কখনো। প্রকৃতি আপন মনে বন সজ্জিত করে। পত্র-পল্লব, ফুল-ফল দেয় আর আমরা প্রয়োজনে, অপ্রয়োজনে নিধন করছি। বাড়ন্ত প্রকৃতিকে পুড়িয়ে কয়লা বানাচ্ছি, গাছর প্রাণ আছে, গাছ অনুভূতি প্রবণ, গাছ ভালবাসা বোঝে এ বোধ এখানে অচল।

শেষ পর্যন্ত শ শত ফুট নেমে একটা ছড়ায় নামলাম। চৈত্রের শেষ বিকেলের গরম নেই এখানে। উপরে, পাশে গাছ গাছলি আর দুপাশে পাথরের দেয়ালের মাঝে বয়ে চলছে ঝরনার সুশীতল জল। বাতাসটাও হিমেল। মন জুড়ে এলো। প্রথমে হাত পা গুটালাম স্বচ্ছ পানির স্রোতে গা ভেজাবো সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা প্রশান্তির রাজ্যে এসে পড়েছি। মনে হচ্ছিল এখানে পাথরের চাঁইয়ে বসে ধ্যান করলে অনেক সঞ্চয় হবে। সময় আর মশা বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। আমাদের গাইড সহ ওরা চার পাঁচজনের দেখা নেই। ঝরণার বাঁকে বাঁকে ওরা এগিয়ে গেছে বহুদূর।

ওরা ফিরে এলে কটি ছবি তুললাম দুর্লভ সময়ের। ওরা আবার বিপরীত স্রোতে এগিয়ে গেল। বিরাট বিরাট পাথরের চাঁইয়ের ফাঁকে ফাঁকে জল গড়িয়ে আসছে। উৎসস্থলের জানা নেই। লক্ষ করলাম পাথরের পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে ক্ষীণধারায় পানি নামছে।

নিজাম হাঁক দিয়ে কাছে থেকেই, আঙ্কেল দেখে যান। এগিয়ে গেলাম ঝিরি পথ বেয়ে পা ভিজিয়ে। বল্লো, দেখুন এখানে দুই পাহাড়ের মাঝে একটা কালভার্ট নির্মিত হয়েছিল বহু আগে, পাহাড়িদের ধারণা কালভার্টটি দেবতারা ভেঙ্গে দিয়েছে। দেখলাম অবশিষ্ট, রড, কংক্রিট এখনো রয়েছে এক পাড়ে।

ও বললো দেবতারা চান না ভগবান ঠিলায় মানুষের পদচারণা অবারিত হোক। বল্লাম, এখানে রাস্তা কোথায়? ও বল্লো, আগে কালভার্ট নির্মাণ করেছিল জেলা পরিষদ।

মনে হলো দেবতারা ভগবানের কাছাকাছিই থাকেন। ভগবান নিষ্ক্রীয় থাকেন আর দেবতারা কারণ দেখিয়ে কার্য সমাধা করেন। নিজাম এতোক্ষণে বল্লো, আমরা ভগবানটিলার পাদদেশে। তাহলে ভগবানের টিলাটা কোথায়? ও যা বল্লো, ঝরা দিয়ে অথবা আরো দুটি উঁচু পাহাড় ডিঙ্গিয়ে যেতে হবে। শুনেছি এখান থেকে একদিনের পথ, যদি যাওয়া যায়।

নিজামের রহস্যের সাথে যুক্তিটাও রহস্যময় ঠেকলো। পানির বোতল সবার শূন্য।

রেজাউল হাঁক দিলো জুয়েল পানির বোতলগুলো নিয়ে আয়। ও চিৎকার করে জানালো তোমরা সবাই আস, এখানে ঝরনা থেকে পানি পড়ছে। ভাবলাম ভগবানের দান নিশ্চয়ই, স্রোতের পদতলের পানি না খেয়ে ঝর্নার পানিটা নিশ্চয় নিরাপদ সুস্বাদু হবে। পাথর ঘেমে ফিল্টার হয়ে নামছে নিচে।

ফেরার তাগাদা দিলাম। জুয়েলের ব্যাগে সেদ্ধ ভুট্টো রয়েছে। ফিরতি পথে দ্বিতীয় ঢাল পেরিয়ে গাছের গুড়িতে সবাই বসলাম।

দশ মিনিট বিরতির সাথে পাঁচ টাকা দামের একেকটি ভুট্টাছড়া দিয়ে শেষ হলো আমাদের লাঞ্চ। সময় বিকেল চারটা পয়তাল্লিশ। ফিরতি হাঁটা পথে তিন ঘণ্টার পথ পার হতে হবে আমাদের দেড় ঘণ্টায়।

পরদিন সবার ঘুম ভাঙ্গলো একটু দেরিতে। ইসলামপুর বাজার পেরিয়ে স্থানীয় নার্সারির সামনে আট দশটা ট্রাক ভর্তি শাল, সেগুনের কর্তিত দেহ। কার্বারিরা কাঠ পারাপারের অনুমতি পত্রের জন্য কোথাও গেছে।