menu

লুইস গ্লুকের কবিতা

ব্যক্তি থেকে বিশ্বজনীনতায় রূপায়ন

অনন্ত মাহফুজ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২০
image

পঁচিশ বছর বয়সে লুইস গ্লুকের প্রথম কবিতাগ্রন্থ ফার্স্টবর্ন প্রকাশিত হবার পর কবিতাঙ্গনে একটি স্বতন্ত্র স্বর এবং কবিতা-কাঠামো খুঁজে পাওয়া যায় এবং সেই সময়ে তার কবিতা “শুদ্ধ কবিতা”র তকমা লাভ করে। কবিতায় তিনি সমকালীন রূপক ও প্রতীক ব্যবহার করেন, পুরাণের চরিত্র স্থাপন করেন সমকালের ঘটনা ও ঘটনার পশ্চাতের নিগূঢ় সত্য প্রকাশে। তাঁকে অনেকে সিলভিয়া প্লাথের সাথে তুলনা করেন স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার কবি হিসেবে। তাঁর কবিতা একান্ত ব্যক্তিক অভিজ্ঞতার শক্ত পটভূমিতে নির্মিত, গ্রিক পুরাণ, বাইবেলের ঘটনা ও চরিত্র, লোকোকাহিনির চরিত্র ইত্যাদির ভিতর দিয়ে বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর প্রতীক হয়ে ওঠে যেন। গ্লুকের জন্মের আগে তাঁর বোনের মৃত্যু এবং পরে পিতার মৃত্যু তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। ফলে মৃত্যু, অমূল্য বস্তু হারানো বা ক্ষতি, হতাশা ইত্যাদি তাঁর কবিতার মূল বিষয় হয়ে ওঠে। প্রথম কাব্যগ্রন্থের পরবর্তী কবিতায়ও তাঁর এই বিষয়বস্তু বিরাজমান থাকে। কৈশোরে ভোগা এনোরেক্সিয়া ভেরোসা রোগটিও তাঁকে প্রভাবিত করে। কবিতায় উঠে আসে রোগ বা রোগের সাথে তাঁর যুদ্ধ। এ রোগের কারণে তাঁর স্কুল জীবনের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাঁকে সাত বছর থেরাপি নিতে হয়। তিনি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাডামসের কবিতার কর্মশালায় যোগ দেন। এর দুই বছর পরে কবি স্ট্যানলি কুনিজের সাথে কাজ করতে যান। কুনিজের সাথে কাটানো সময়েও তাঁর দ্বারা তিনি ব্যাপক প্রভাবিত হন। দেখা যায়, জীবনের নানা সময়ে ঘটে যাওয়া এইসব ঘটনা আর ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতায় ঘুরেফিরে আসে।

অন্তরের ভেতরের কথা শোনা বা ভেতরের দিকে তাকানো- লুইস গ্লুকের কবিতার প্রসঙ্গে এ-রকম কথা আলোচনায় আসে। ভাষার দুটো উদ্দেশ্য থাকে: একটি হলো প্রকাশ আর অন্যটি হলো লুকিয়ে রাখা অথবা বলা যায় প্রকাশ্যতা আর অপ্রকাশ্যতা। আমরা যা কবিতায় পড়ি তা তো কবি তাঁর কবিতায় উপস্থাপন করেনই; কিন্তু এমন কথাও কবিতার প্রতি দুই লাইনের মাঝে থাকে যা কবি প্রকাশ্যে উপস্থাপন করেন না। এই অপ্রকাশ্য কথাগুলো লুইস গ্লুককে আলাদা করে দেয়। লুইস গ্লুক কবিতায় সেই কাজটি সফলতার সাথে করতে সমর্থ হয়েছেন। এ-রকম অভিমত তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের।

২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয় সাতাত্তর বছয় বয়সী আমেরিকান কবি লুইস গ্লুককে। নোবেল পুরস্কার ঘোষণায় বলা হয়, “তার সুস্পষ্ট কবিতার ভাষার সাথে মারাত্মক সৌন্দর্য মিলে ব্যক্তিক অস্তিত্বকে বিশ^জনীন করে তুলেছে।” তাঁর কবিতায় স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের আর্তির কথা জানা যায় তাঁর পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী দ্য ওয়াইল্ড আইরিস কাব্যগ্রন্থের ‘স্নোড্রপস’ কবিতায়:

তুমি কি জান আমি কী ছিলাম, কীভাবে বেঁচেছিলাম? তুমি জান

হতাশা কী। তাহলে

তোমার কাছে শীতের একটি অর্থ থাকতে পারে।

গ্লুক তাঁর লেখায় ট্রমা, আকাক্সক্ষা এবং প্রকৃতির ইতিবাচক দিকগুলোতে মনোনিবেশ করেছেন। হতাশার বিপরীতে আশার কথাও উপস্থাপিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। নেতি থেকে ইতিবাচকতার দিকে ঘুরে যাওয়া তাঁকে হতাশাবাদী কবি থেকে আলাদা করে। বিস্তৃত ভাবনা অন্বেষণে তার কবিতা দুঃখ এবং বিচ্ছিন্নতার খোলামেলা প্রকাশের জন্য পরিচিত হয়ে উঠেছে। আত্মজীবন ও শাস্ত্রীয় পুরাণের সাথে সম্পর্কও তাঁর কবিতার অন্যতম বিষয়। কেউ কেউ তাঁকে আত্মজীবনীমূলক কবি বলে থাকেন। ব্যক্তি জীবনের সাথে মিথের এক অসামান্য মেলবন্ধন রচনা করেন গ্লুক। পৌরাণিক ঘটনাকে বর্তমানের মানুষের জীবনের প্রাত্যহিক ঘটনার সাথে অসাধারণ দক্ষতায় মিলিয়ে দেন তিনি। পুরাণের চরিত্রগুলোকে বর্তমানের প্রেক্ষাপটে বিন্যাস করার অপার দক্ষতার ভিতর দিয়ে তিনি এ সময়ের দুঃখ-যাতনা এবং হতাশার চিত্র তুলে ধরেন। তাঁর ‘পারসিফোন দ্য ওয়ান্ডারার’ কবিতায় আমরা হেডিস কর্তৃক নিয়ে যাওয়া পারসিফোনের জীবনাংশ দেখি। ‘পারসিফোন অলিম্পাসের দেবতা জিউস ও দিমিটারের কন্যা। হেডিস তাকে অপহরণ করে তার রাজ্য পৃথিবীর নিচে নিয়ে যায়।

পারসিফোন নরকে সঙ্গমরত।

আমাদের অবশিষ্টের মতো সে-ও জানে না

শীত কী, শুধু এই যে

সে এই শীতের একটি কারণ।

সে শুয়ে আছে হেডিসের বিছানায়,

তার মনে কী আছে?

সে কি ভীত? কোনোকিছু কি মনের ভিতরের

ভাবনা মুছে ফেলছে?

সাহিত্যসাধনায় কৈশোরেই মনোনিবেশ করেন লুইস গ্লুক। ১৯২৩ সালের ২২ এপ্রিল নিউইয়র্ক সিটিতে জন্ম নেওয়া লুইস গ্লুক ড্যানিয়েল এবং বিট্রিয়াস গ্লুকের কন্যা। লুইসের জন্মের আগেই এই দম্পতির প্রথম কন্যা মারা গিয়েছিল। এই ঘটনা গ্লুককে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। যদিও বোনের মৃত্যুর পরে তাঁর জন্ম, তবু এ মৃত্যু থেকে তাঁর রচনায় ক্ষতি এবং শোক-সংক্রান্ত বিষয়গুলো উপস্থাপিত হয়। লুইসের জন্মের পরে তার আরেক বোনের জন্ম হয়। ব্যাংকার এই বোনও লেখালেখির সাথে যুক্ত ছিলেন। কথাসাহিত্যের জন্য স্থানীয় একটি পুরস্কারও পেয়েছিলেন। গ্লুক তিন বছর বয়সে গ্রীক পুরাণ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তাঁর বাবাও লেখক হতে চেয়েছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর শ্যালকের সাথে ব্যবসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যবসায়ী হয়েছিলেন। তাঁর মা মেয়েদের সৃজনশীলতা বিকাশে উৎসাহ যোগাতেন। কৈশোরে গ্লুক এনোরেক্সিয়া নার্ভোসা রোগে আক্রান্ত হন যে রোগে তাঁর বোন মারা গিয়েছিল। বলা যায়, তাঁর পারিবারিক জীবন স্বস্তির ছিল যা তাঁর লেখালেখির অনুকূলে ছিল।

১৯৬১ সালে লং আইল্যান্ডের হিউলেট হাই স্কুল থেকে স্নাতক এবং ১৯৬২ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসভিলের সারা লরেন্স কলেজে পড়াশোনা করার পরে গ্লুক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি একটি কবিতা কর্মশালায় নাম লেখান যেখানে কবি ও শিক্ষক স্ট্যানলি কুনিজের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। কুনিজের সাথে দেখা হওয়াটা তাঁর জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এ থেকে ব্যাপক প্রভাবিত হয়েছিলেন গ্লুক। ১৯৬৬ সালে একাডেমি অফ আমেরিকান পোয়েটস পুরস্কার জিতেছিলেন লুইস গ্লুক। ১৯৬৭ সালে বিয়ে করেন চার্লস হার্টজ জুনিয়রকে। অল্প সময়ের মধ্যে হার্টজ জুনিয়রের সাথে তার বিয়ের বিচ্ছেদও ঘটে। ১৯৬৮ সালে গ্লুকের প্রথম

কাব্যগ্রন্থ ফার্স্টবর্ন প্রকাশিত হয়। গত শতকে স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার প্রচলন ছিল। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থে স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার প্রাধান্য আছে। এরপর এক দীর্ঘ সময় তিনি “রাইটার্স ব্লকে” ভোগেন। গডার্ড কলেজে ১৯৭১ সালে কবিতার ক্লাস নেওয়াকালীন তিনি সেই অভিশপ্ত সময় থেকে মুক্তি পান। দি¦তীয় কবিতার বই দ্য হাউস অন মার্শল্যান্ড প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে। ফার্সবর্ন প্রকাশিত হবার দীর্ঘ সময় পরে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে তিনি প্রথম কবিতাগ্রন্থের ধারা থেকে বাঁক নেন। তাঁর কবিতার আলোচকগণ মনে করেন, এ গ্রন্থ থেকে তিনি “স্বতন্ত্র স্বর আবিষ্কার” করেছেন। এই গ্রন্থ প্রকাশের পর তাঁর কবিতার জটিল ও রহস্যময় গঠন সম্পর্কে পাঠক জানতে পারেন। এ গ্রন্থে তিনি কবিতার যে স্বর ধারণ করেন তা ক্ষুব্ধ এবং বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত। যদিও সমালোচক এবং পাঠক তাঁর কবিতার রূঢ় সুরে আহত হয়েছিলেন, তবে তাঁরা কাব্যিক কৌশলের মৌলিকত্ব এবং দক্ষতা দেখে মুগ্ধও হয়েছিলেন। তাঁর এ কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের পর “গ্লুক-স্টাইল” বলে একটি বিষয় কবিতাঙ্গনে রটে যায়।

তাঁর এই স্বতন্ত্র স্বর আরও পরিস্ফুট হয় ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ডিসেন্ডিং ফিগার কাব্যগ্রন্থে। এই কাব্যগন্থে বিভ্রান্তিমূলক সহজ ভাষার মাধ্যমে সাধারণ মানব-সম্পর্কিত বিষয়গুলোর ভিতরে পরীক্ষামূলক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপিত হয়েছে। তবে কবির স্বতন্ত্র কথার চেয়ে কবিতায় ঘটনাপ্রবাহের ব্যবহার তাঁকে তাঁর বিষয়গুলোর সাথে আরও জটিলভাবে সংবেদনশীল এবং বৌদ্ধিক সম্পর্কে জড়িয়ে রাখতে সক্ষম করে। উদাহরণস্বরূপ, ‘দ্য গার্ডেন’-এ গ্লুক আধ্যাত্মিকভাবে নিজের উদ্যানকে জেনেসের ইডেনের সাথে তুলনা করেছেন যাতে কবিতাটি মানব ইতিহাসের একটি পাঠ হয়ে ওঠে।

১৯৭৩ সালে তাঁর সঙ্গী জন ড্রানোর সাথে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। পরে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। যখন ম্যাসাচুসেটস-এর প্রভিন্সটাউনে বাস করছিলেন তখন ভার্মন্টের গডার্ড কলেজে লেখকদের এক সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলেন গ্লুক। তিনি তাঁর জীবনের এক সাহিত্য-নায়ক কবি জন বেরিম্যানের সাথে দেখা করার প্রত্যাশায় ঐ সমাবেশে যোগ দিতে রাজি হয়েছিলেন। গ্লুক গ্রামীণ ভার্মন্টের পরিবেশের প্রেমে পড়েন। সেখানে উপস্থিত লেখকের সাথে সাক্ষাৎ হবার পরে শিক্ষকতা পেশার প্রতিও উৎসাহ বোধ করেন। শিক্ষকতা পেশা তাঁর সৃজনশীলতার জন্য ইতিবাচক হয়েছিল। তবে এ পেশা তাঁর সাহিত্যচর্চায় বিঘœ ঘটাতে পারে- এ-রকম একটি ভীতি তাঁর ভিতরে পূর্ব থেকেই ছিল। তিনি শিক্ষাদানের ভিতর দিয়ে অসাধারণ অভিজ্ঞতা খুঁজে পেয়েছিলেন এবং লিখতে অনুপ্রেরণা বোধ করেছিলেন। পরের দশকে গডার্ড কলেজ এবং আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন গ্লুক। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ডিসেন্ডিং ফিগার। কবিতার বিষয় ও কিছু কবিতা, বিশেষ করে এই গ্রন্থের বর্তমানে বহুল পঠিত কবিতা ‘ডুবন্ত শিশু’ কবিতার জন্য অনেকে তাকে “শিশু বিদ্বেষী” আখ্যা দিয়েছিলেন।

১৯৮০ সালে আগুনে বাসস্থান পুড়ে গেলে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এ ধ্বংস্তূপ সরিয়ে পুনরায় লিখতে শুরু করেন। ১৯৮৫ সালে প্রকাশ হয় তাঁর তৃতীয় এবং সাড়া জাগানো কাব্যগ্রন্থ দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস। পূর্বের ধারাবাহিকতায় এ গ্রন্থেও তিনি পুরাণের চরিত্র ও বিষয় ব্যবহার করেছেন বর্তমান প্রেক্ষিত বর্ণনায়। এ গ্রন্থের জন্য ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল পুরস্কার, দ্য বোস্টন গ্লোব লিটারারি পুরস্কার, আমেরিকার পোয়েট্রি সোসাইটিসহ বেশ কয়েকটি পুরস্কার লাভ করেছিলেন। দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস যৌনতা ও ক্ষমতা, ভালোবাসা ও শিল্পের মধ্যে সম্পর্কের কথা তুলে ধরে। ছাব্বিশটি কবিতার এ কাব্যগ্রন্থে পৌরাণিক ও বাইবেলীয় চরিত্র এবং অভিব্যক্তি উঠে আসে। পাশাপাশি আছে কবির দীর্ঘচর্চিত বিষয়বস্তু, কিছু হারিয়ে ফেলা বা ক্ষতি ও মৃত্যু। একিলিস ও পেট্রোক্লাস বন্ধু। ট্রয়ের সাথে যুদ্ধে পেট্রোক্লাস হেক্টরের হাতে নিহত হলে একিলিস চরমভাবে ব্যথিত হয় এবং বন্ধু হারানোর বেদনা তাঁকে ব্যাপকভাবে আহত করে। একিলিস ও পেট্রোক্লাসের বন্ধুত্বকে কোথাও কোথাও সমলিঙ্গের প্রতি যৌনানুভূতির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। এ গ্রন্থের ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস’ কবিতার শেষ কয়েক পঙক্তি:

তার তাঁবুতে, একিলিস

তার সমস্ত সত্তা নিয়ে বিমর্ষ

এবং দেবতারা দেখলেন

সে ইতিমধ্যে মৃত একজন মানুষ, এক শিকার

সেই অংশের যে ভালোবেসেছিল,

রক্তমাংসের আরেক অংশকে।

এ গ্রন্থের অন্য কবিতা ‘মেটামরফোসিস’ তাঁর পিতার মৃত্যুকেন্দ্রিক, যদিও তা আমাদের টিকে থাকা ও জীবনের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।

১৯৮৪ সালে গ্লুক মেসাচুসেটসের উইলিয়ামস কলেজে ইংরেজি বিভাগে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী দুই দশক অর্থাৎ ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি উইলিয়ামসে একই পদে ছিলেন। ১৯৮৫ সালে পিতার মৃত্যু তাঁকে স্বজন হারানোর অপরিমেয় কষ্টের দিকে ঠেলে দিলেও কষ্ট থেকে শক্তি সঞ্চয় কওে ১৯৯০ সালে প্রকাশ করেন কবিতাগ্রন্থ আরারাত। তার ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ এবং সবচাইতে আলোচিত বই দ্য ওয়াইল্ড আইরিস ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৯৩ সালে পুলিৎজার পুরস্কার এবং উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস পুরস্কার লাভ করেন। তার দ্য ওয়াইল্ড আইরিস কাব্যগ্রন্থের ভিতর দিয়ে আত্মা, পরকাল ও ব্যক্তির মধ্যে পবিত্র সম্পর্ক উন্মোচিত হয়। এ গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি বাগানের ফুলেদের জীবন নিয়ে। “সৌন্দর্যের কবিতা” বলে খ্যাত এই কাব্যগ্রন্থের ভিতর দিয়ে গ্লুকের কবিতার ব্যাপক বিশ^ভ্রমণ শুরু হয়। দ্য ওয়াইল্ড আইরিস কাব্যগ্রন্থে চুয়ান্নটি কবিতা স্থান পেয়েছে। গ্লুক আশাবাদের কবি। কবিতার কথক বাগানের একেকটি ফুল, বাগানের মালি এবং ঈশ্বর। রূপান্তর, যাতনা, মৃত্যু, পুনর্জন্ম ও আশাবাদ এ কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয়। এ গ্রন্থের ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ কবিতার প্রথম কয়েক লাইন:

যাতনার শেষে আমি একটি দরজা পেলাম।

আমার যন্ত্রণার শেষে একটি দরজা ছিল।

আমার কথা শোনো: তোমরা যাকে মৃত্যু বলো আমি তা স্মরণ করতে পারি।

মাথার ওপরে শব্দ, পাইনের ডালপালা সরে যাচ্ছে।

তারপর কিছু না। দুর্বল সূর্যটা

শুষ্ক পাটাতনের ওপর মিটমিট করছে।

এ কবিতায় বেঁচে থাকা, মৃত্যু এবং পুনরায় জন্মগ্রহণের অর্থ বুঝবার চেষ্টা করেছেন গ্লুক। কবিতার কথক ফুল, জীবচক্র সমাপ্ত করেছে। এই যে সংগ্রাম বা জীবনচক্র যার শেষে একটি দরজা আছে, টানেলের শেষে একটি আলো। ফুল এখানে একটি প্রতীকী বিষয়। ফুলের জীবনের সাথে মানুষ ও মানবাত্মার তুলনা করা যায়। এই কবিতায় শারীরিক অস্তিত্ব বা পুনর্বার জন্মের চেয়ে মানসিক পুনর্জন্মের চিত্রের শক্ত উপস্থিতি পাওয়া যায়।

নব্বইয়ের দশক তাঁর জন্য পয়মন্ত। আবার এ সময়ে তিনি কঠিন সময়ও পার করেছেন। ড্রানোর সঙ্গে তার দ্বিতীয় বিয়ে ভেঙে যায় সময়েই। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ তিনি ভার্মন্টের পোয়েট লরিয়েটের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয় কবিতা-সংক্রান্ত গদ্যগ্রন্থ প্রুফস এন্ড থিওরিজ: এসেজ অন পোয়েট্রি। দুই বছর পরে পুনরায় কবিতার বই মিডোল্যান্ডস প্রকাশিত হয়। ১৯৯৬ সালে তিনি অ্যামেরিকান একাডেমি অব আর্টস এন্ড সায়েন্সের সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত একাডেমি অব অ্যামেরিকান পোয়েটস-এর চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তাঁকে ১৯৯৯ সালে লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে বিশেষ পরামর্শদাতা নিযুক্ত করা হয়েছিল। ভিটা নোভা কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৯৯ সালে এবং দ্য সেভেন এজেজ প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার হামলার ঘটনায় চরম বিমর্ষ বোধ করেন গ্লুক। এ ঘটনা তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করে যে, তিনি ২০০৪ সালে বই আকারে প্রকাশ করেন ছয় অংশে বিভক্ত দীর্ঘ কবিতা অক্টোবর। ২০০৬ সালে ইয়েল বিশ^বিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি হিসেবে যোগদানের পর প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ অ্যাভার্নো এবং ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় আ ভিলেজ লাইফ। গ্লুকের কবিতাগ্রন্থ প্রকাশের পর তা যেমন আলোচনায় থাকত তেমনি বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হতো।

 গ্লুকের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ফেইদফুল এন্ড ভার্চুয়াস নাইট প্রকাশিত হয় ২০১৪ সালে। কাব্যগ্রন্থটি শুরু হয়েছে ‘প্যারাবল’ নামে একটি কবিতা দিয়ে। কবিতাটি এক দল ভ্রমণকারী তাদের এই যাত্রার কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না বা তারা এই ভ্রমণ ত্যাগ করবে কি না তা নিয়ে আলোচনা করে। তাদের আলোচনা এত দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয় যে, তারা ভুলে যায় তারা এই যাত্রা ত্যাগ করতে চেয়ে আলোচনায় অবতীর্ণ হয়েছিল। কবিতাটি আমাদের সামনে এক প্রতীকী ব্যাখ্যা তুলে ধরে আর তা হলো তারা স্থান থেকে স্থানে ভ্রমণ করেনি; তারা মূলত সময় থেকে সময়ে ভ্রমণ করেছে। তাদের সময় গেছে এবং জীবন সায়াহ্নে উপস্থিত হয়েছে। এ গ্রন্থের বেশ কয়েকটি কবিতা একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে যার শৈশব তার বাবা-মায়ের মৃত্যুর দ্বারা উপস্থাপিত হয়েছে।

লুইস গ্লুক সাহিত্যে নোবেল জয় করবেন, এমন আলোচনা খুব একটা দেখা যায়নি। তার কবিতা নিয়ে বোদ্ধা মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে। কবিতায় তিনি একটি স্বতন্ত্র পথ তৈরি করেছেন বটে, কিন্ত তা কবিতার উল্লেখযোগ্য বাঁক বদলের ক্ষমতা রাখে না বলেই অনেকে মনে করেন। মৃত্যু, ক্ষতি, প্রত্যাখ্যান, সম্পর্কের ভাঙন এবং এসব থেকে পুনরুত্থানের ট্রমা মিথ, বাইবেল ও লোকোকাহিনির চরিত্র ও ঘটনার মধ্য দিয়ে সেসবের উপস্থান নিয়ে সারাজীবন তিনি যে কবিতা লিখেছেন তা একরৈখিক। অবশ্য এ নিয়ে সমালোচকদের মধ্যে ভিন্ন মত আছে। কেউ কেউ তাঁর এই দীর্ঘ কবিতাযাত্রাকেই বহুমাত্রিক বলে বর্ণনা করেছেন। উল্লেখ্য, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন পোলিশ লেখক ওলগা তোকারচুক ও অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হ্যান্ডকে। হ্যান্ডকে নানাভাবে বিতর্কিত একজন সাহিত্যিক। তখন এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। ধারণা করা হয়েছিল ইউরোপ থেকে এবারের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার চলে যাবে অন্য কোনোদিকে। তা যে আমেরিকার কেউ হবেন, এমন ভাবনা কমই দেখা গেছে। বহু বছর ধরে সম্ভাব্য নোবেলজয়ীদের কেউ পুরস্কারটি পাচ্ছেন না বলে এ পুরস্কার নিয়ে প্রচুর সমালোচনা আছে। লুইস গ্লুকের মতো বিতর্কহীন একজনকে এবারের পুরস্কার দিয়ে নোবেল কমিটি পূর্ববর্তী বছরের সমালোচনা থেকে বাঁচার যে চেষ্টা করেছে, তাতে তারা মোটামুটি সফল বলা যায়।

  • বিশেষ সাক্ষাৎকার

    বাক্য নিজেই কথা বলার একটি উপায় খুঁজে নেয়

    সাক্ষাৎকারে লুইস গ্লুক ভূমিকা ও অনুবাদ : ফজল হাসান

    newsimage

    ২০২০ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের দৌড়ে আন্তর্জাতিক পাঠকমহলে পরিচিত একাধিক কথাসাহিত্যিক এবং

  • লুইস গ্লুকের কবিতা

    ‘তাজা বাতাসে জড়ানো নতুন পৃথিবী’ অনুবাদ : অশোক কর

    newsimage

    গ্রিটেল, অন্ধকারিত্বে এমন পৃথিবীই আমরা চেয়েছিলাম। যারা আমাদের মরে যেতে দেখেছিলো, ওরা এখন মৃত।

  • লুইস গ্লুকের কবিতা : ২

    ‘সেটিই নগর যেখানে আমি হাওয়া হয়ে যাই’ অনুবাদ : মুজিব রাহমান

    বাগান বাগান তোমাকে সমীহ করে। তোমার খাতিরে সে নিজেই মেখে নিয়েছে সবুজ রঞ্জক, গোলাপের লাল

  • শ্রদ্ধাঞ্জলি রশীদ হায়দার

    শরতের মেঘের মতো বিনয়ী ছিলেন যিনি

    আদিত্য নজরুল

    newsimage

    ‘মাত্রা’ গল্পের মাধ্যমেই রশীদ হায়দারের সাথে আমার পরিচয়। আমার আগ্রহ বেড়ে যায়

  • বিস্মৃত রাজনৈতিক মঞ্চের কথক মহিয়সী জায়নাব আখতার

    মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ

    newsimage

    প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন বইটি সাধারণ অর্থে অব্যাহতভাবে লেখা কোনো স্মৃতিকথা নয়।

  • সোনাভানের কাসিদা

    দিলারা মেসবাহ

    newsimage

    ‘অ ব্যাটা - ব্যাটারে। তোর মাওডা মইর‌্যা গেল কেমনে? সোনার মানুষডা

  • টক অব দ্য কান্ট্রি

    পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

    newsimage

    কেবলমাত্র একটা তুচ্ছ সন্দেহকে কেন্দ্র করেই তাদের এক দশকের নিশ্চিদ্র দাম্পত্য গেছে