menu

বিশ্বসাহিত্য মরমে পশিল যারা

ফারুখ সিদ্ধার্থ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ এপ্রিল ২০১৯

http://print.thesangbad.net/images/2019/April/03Apr19/news/Untitled-10.jpg‘ছবিতে ছবিতে গল্প’ আমার প্রথম ভালোলাগা অন্য ভাষার বই। বইটি রুশ শিশুগল্পের এক বিশেষ সংকলন; আয়তাকার অ্যালবামসদৃশ সম্পূর্ণ আর্ট পেপারে তৈরি। বইটির নামই বলে দেয় তার অন্তর্ভুক্ত গল্পগুলো ছবিভিত্তিক। পৃষ্ঠা উল্টালেই ঝলমলে রঙিন ছবিসহ ম্যাজিকের মতো হাজির হয় একটি নতুন গল্প। প্রতি পৃষ্ঠায় চারটি আকর্ষণীয় ছবি। প্রত্যেক ছবির নিচে ক্যাপশনের মতো লেখা। ছবি দেখার পাশাপাশি তা পড়তে পড়তেই হারিয়ে যেতে হয় ছবির দেশে- গল্পের দেশে। এভাবে চারটি বা আটটি ছবি দেখা হলেই জানা হয়ে যায় একটি চমৎকার নতুন গল্প। জীবনের সেই ভোরবেলায় ‘ছবিতে ছবিতে গল্প’ আমাকে এত আন্দোলিত করেছিল যে তার কয়েকটি গল্প আমি তখনি ছড়ায়-ছন্দে বেঁধে রেখেছিলাম, যার একটি ‘বিড়াল ও পাখি’ নামে আমার স্মৃতির ঝাঁপিতে এখনো আছে: ‘ছোট্ট দুটি ঝোঁপের মাঝে/ একটি গাছের গুড়ি/ দুটি ঝোঁপই দেখতে যেন/ বুড়ো এবং বুড়ি।/ ওই গুড়িতে একটি পাখি/ সুরেই ছিল মেতে/ দু-ঝোঁপে দুই বিড়াল ছিল/ ওর দিকে ওঁত পেতে।/ ছোট্ট পাখি বুঝতে পেরে/ আর কি থাকে বসে/ তাল ঠুকে তাই বিড়াল দুটোর/ ভাঙল কপাল শেষে।’

সে-বইয়ের আরেকটি গল্প এমন: এক বালক মাঠের খেলা শেষে পাশর্^বর্তী জলাশয়ে নেমেছে নাইতে। তার আগে সে পাড়ে ঘাসের ওপর রেখেছে তার জুতা ও মোজা। সে ইচ্ছামতো ডুবাচ্ছে- সাঁতরাছে। এদিকে কখন যে ঘাসের ভেতর থেকে দুটি ব্যাঙ বেরিয়ে তার দুই মোজার মধ্যে ঢুকে পড়েছে টের পায় নি। সে ডুব-সাঁতার খেলে পাড়ে উঠে দ্যাখে তার লাল জুতার পাশে রাখা সবুজ মোজা দুটি নেই। আশেপাশে তাকিয়ে দ্যাখে কোথাও কেউ নেই, কেবল একসাথে পাশাপাশি লাফিয়ে লাফিয়ে মাঠ পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে যাচ্ছে তার মোজার মতো লম্বা লেজের দুটি অদ্ভুত প্রাণি! দেখেই সে হকচকিয়ে যায়। ছবিতে দেখা যায় তার চোখ দুটি বড় হয়ে কপালের দিকে উঠছে।

এরকম বিবিধ বিষয়ের কয়েক ডজন গল্পের বইটি আমাকে কত যে আনন্দ দিয়েছে, ভাবতেই ভালো লাগে। সেটি পড়েই আমি প্রথম অনুভব করেছি আমার জানা গল্পের ঝুলিটা কত স্বাস্থ্যবান! ইস্কুলে সহপাঠী বন্ধুরাও বুঝেছিল। তারা এর উৎস জানতে উঠে-পড়ে লেগেছিল। অনেক পীড়াপীড়ির পর আমি একদিন বইটি তাদের দেখাই এবং ক্লাসের ফাঁকে সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসি। অচিরেই বইটি নিজের মতো করে পাওয়ার জন্যে সবার মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। আর এভাবে হাতে হাতে ঘুরে বইটি অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং একদিন বাড়ির পুরনো কাগজের মধ্যে শয্যা নেয়। আমার অগ্রজ সব জানতে পেরে আরেকটি নতুন কপি আমাকে উপহার দেন।

সেই সাথে হাতে আসে আরো একটি বই, মোল্লা নাসিরুদ্দীনের, ছোট-বড় শ-খানেক গল্পের একটি সচিত্র সংকলন। তার প্রতিগল্পেরই মূল চরিত্র হোজ্জা, যে একাধারে বুদ্ধিমান, রসিক ও ব্যঙ্গপ্রিয়। তার প্রায় সব কথা বা আচরণই বুদ্ধিদীপ্ত ও হাস্যরসময়। গল্প শেষ হলেও তার রেশ থেকে যায়। সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনযাপনের বহু অসংগতি নিয়েও রয়েছে তার কৌতুক-পরিহাস। এমনকি নিজের দুঃখজনক পরিস্থিতিতেও সে কৌতুক বা রসিকতা করে। হোজ্জার সেইসব গল্প সবারই কমবেশি জানা, তাই কোনো উদাহরণ দিলাম না। গল্পগুলো আমাকে প্রভূত আনন্দ দিয়েছে, যুগিয়েছে বুদ্ধির খোরাক, কত বন্ধুর সাথে শেয়ার করেও মজা পেয়েছি! কিন্তু একবার এক মামাতো বোনকে বইটি পড়তে দিয়ে আর ফেরত পাই নি। তবে সেই ভালোলাগা আজো আমার স্মৃতির ঝাঁপিতে অটুট রয়েছে।

http://print.thesangbad.net/images/2019/April/03Apr19/news/Untitled-11.jpgএরপর বিভিন্ন ভাষার আরো কাহিনি পড়েছি, যার মধ্যে ভালো লেগেছে ডেনমার্কের লেখক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান আন্দেরসেনের গল্প। তাঁর ‘ছোট ক্লজ ও বড় ক্লজ’, ‘মহারাজার নতুন পোশাক’, ‘উড়ন্ত সিন্দুক’, ‘শূকর পালকের গল্প’সহ বেশকিছু গল্প বাবা ও অগ্রজের সুবাদে আগেই জানা ছিল। কিন্তু জানতাম না তিনি গল্পের অত বড় জাদুকর, রূপকথার আদলে লিখেছেন এত কাহিনি। প্রায় ক্ষেত্রে তারা রূপকথারই রূপ নিয়েছে, চিহ্নিত হয়েছে ফেয়ারি টেইলস হিসেবে। তবু সেসব নিছক রূপকথা নয়, তার অতিরিক্ত বিবিধ উপাদান তাতে রয়েছে, যা তাঁর কাহিনিকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। সরাসরি যখন তাঁর লেখা পড়েছি, তখনি জেনেছি এসব। তাঁর কাহিনিতে কল্পনার পাখা তিনি এমনভাবে মেলে দিয়েছেন যে পশুপাখি, লতাপাতা, তৃণ থেকে নিত্যকার ব্যবহার্য দ্রব্যাদি- যাবতীয় গৃহসামগ্রী- সবারই প্রাণ রয়েছে, প্রত্যেকেই মানবজীবনের অংশীদার। কল্পনা ও বাস্তবের মিশেলে লেখক বলেছেন এমন অনেক কাহিনি যাতে তাঁর মানবিক অনুভূতি ও জীবনের দুঃখদহন জ্বালার নির্যাস মুক্তার মতো ফুটে উঠেছে। তাই যতবার পড়ি ভালো লাগে। বেশি ভালো লাগে ‘ছোট্ট ইডার ফুলগুলো’, ‘আঙুলিনা’, ‘মৎস্যকন্যা’, ‘কোকিল’, ‘কুচ্ছিত প্যাঁকারু’, ‘লাল জুতোর কথা’, ‘ছোট্ট দেশলাইগুলি’, ‘ঝাউগাছের কথা’, ‘বুনোহাঁসদের কথা’, ‘কোর্ট কার্ডস’, ‘সুখী পরিবার’ প্রভৃতি। একেকটি গল্প একেক রকম জগতে নিয়ে যায়, আর যেতে যেতে অভিভূত করে: কী অসাধারণ লেখকের কল্পনাশক্তি, কত কাব্যিক তাঁর বর্ণনা! প্রতিটি গল্পই কত উপমা ও চিত্রকল্পময়, কবিতার মতোই। তাই কবিতার পাঠক আমাকে আজো তা বারবার পড়তে হয়।

আন্দেরসেনের গল্পের যে-সংকলনটি আজো আমার সংগ্রহে আছে তার নাম ‘কাহিনী পঞ্চাশৎ’। ২০০৫ সালে ঢাকার সাহিত্য প্রকাশ থেকে তাঁর দ্বিশততম জন্মবার্ষিক উপলক্ষে তাঁকে নিবেদন ক’রে প্রকাশিত। সেটি পঞ্চাশটি বাছাই গল্পের একটি সংকলন। আন্দেরসেনের রচনাবৈচিত্র্য এবং গল্পকথার ধরনসমূহ বিবেচনায় রেখে সেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সংকলনে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত তাঁর রূপকথার পাশাপাশি সন্নিবেশিত হয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্যময় আরো কিছু কাহিনি- যা তাঁর সাহিত্যকর্মের সমগ্রতার প্রতিনিধি/ পরিচায়ক। বইটিতে বিশ^ব্যাপী পরিচিত ‘মৎস্যকন্যা’, ‘কুচ্ছিত প্যাঁকারু’, ‘বুনো হাঁসের কথা’ প্রভৃতির সাথে রয়েছে বিশেষ তাৎপর্যবাহী কাহিনি, যেমন- ‘কোর্ট-কার্ডস’, যে-গল্পের পাঠ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে তাঁর ‘তাসের দেশ’ নাটক রচনায় অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। আরো রয়েছে ‘সবচেয়ে আজব কাজ’-এর মতো কাহিনি, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালে অধিকৃত ডেনমার্কে যে-গল্পের মুদ্রণ নাৎসিরা নিষিদ্ধ করেছিল। তাঁর ‘জননীর গল্প’, ‘বুকভাঙা কষ্ট’, ‘প্রজাপতি’সহ অনেক গল্পই দেশকালের সীমানা পেরিয়ে হয়ে উঠেছে সর্বকালীন ও সর্বজনীন। উল্লিখিত সেই বৈশিষ্ট্যই তাঁর সম্পর্কে আরো জানতে আমাকে উৎসাহী করেছে। সেই উৎসাহ উদ্দীপনা ও অনুসন্ধিৎসা থেকেই জেনেছি ১৮৭৫ সালে বাংলায় প্রথম প্রকাশিত হয় তাঁর গল্পের অনুবাদ। সেই থেকে আর অনুবাদের ধারাবাহিতায় ছেদ পড়ে নি। নানাজন নানাভাবে করেছেন সেই কাজ। এমনকি বিশ শতকের গোড়ায় সিলেট থেকেও প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর নির্বাচিত রূপকথার বই। এটাও আনন্দের যে ১৯৩৫ সালে তরুণ কবি বুদ্ধদেব বসু কর্তৃক ঢাকা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল আন্দেরসেনের রূপকথার অনুবাদ-গ্রন্থ। এসব তথ্য প্রমাণ করে যে আন্দেরসেনের গল্প আমার মতো অসংখ্য পাঠকের মন জয় করেছে।

আমার কৈশোরে খুব ভালোলাগা অন্য ভাষার লেখার মধ্যে আরেকটি লেখা পড়ার অনুভূতি আজো আমার মধ্যে কাজ করে, যার লেখক চার্লস ডিকেন্স, লেখাটির নাম ‘অলিভার টুইস্ট’- একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস। তাতে অলিভার নামের এক কিশোরের জীবন-সংগ্রাম লেখকের গভীর মমতায় বর্ণিত। নিজের কৈশোর পেরিয়ে এসেছি অনেক আগে, কিন্তু সেই কঠিন জীবনসংগ্রামের ভেতর দিয়ে বেড়ে-ওঠা কিশোরকে ভুলতে পারি নি। তাই তার পুনর্পাঠ তৃষ্ণা বুকে জেগেছিল বহুদিন। অতঃপর বছর দুয়েক আগে ডিকেন্সের আরো কয়েকটি উপন্যাসের সাথে সেটিও পড়ার সুযোগ হয়েছে।

‘অলিভার টুইস্ট’ যখন প্রথম পড়ি তখন চার্লস ডিকেন্স-এর পাশাপাশি জেফ্রি চসার, শেকসপিয়ার, লিও টলস্টয়, আলেকজান্দর পুশকিন, বরিস পাস্তেরনাক, আন্তন চেখভ, মায়াকোভোস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কি, ইভান তুর্গেনেভ, নিকোলাই গোগল, নিকোলাই অস্ত্রভস্কিসহ অনেক কবি-সাহিত্যিকের আনাগোনা ছিল আমাদের বাড়িতে। তাঁদের কবিতা-গল্প-উপন্যাস-স্মৃতিকথা-জীবনকথা-ভ্রমণকথাসহ যাবতীয় লেখা নিয়ে তাঁরা দাপিয়ে ফিরতেন। তাঁদের থেকে আমি সামান্যই নিতে পেরেছি। সেটুকুই এত ভালোলাগায় পেয়েছিল যে দিনের পর দিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে তাঁদেরই সঙ্গী হয়েছি, আর ঘরে থেকেও তাঁদের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছি পূর্ব ইউরোপের প্রায় সব দেশসহ বিশে^র বহু দেশ। সেই সূত্রেই পরিচিত হয়েছি সেসব দেশের বিচিত্র আবহাওয়া-জলবায়ু, পরিবেশ-প্রকৃতি-নিসর্গ, সাহিত্য-সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন, সমাজ ব্যবস্থা, ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাথে; বুঝেছি মানুষের বেঁচে থাকার সাথে সংগ্রামেরও একটি সম্পর্ক আছে।

উল্লিখিত কবি-সাহিত্যিকদের প্রায় সব বইপত্র আমাদের পারিবারিক গ্রন্থগারে ছিল। ফলে সেই শৈশবেই হাত বাড়ালেই তাদের আমি পেতাম, তারাও আমাকে পেত। তবে ম্যাক্সিম গোর্কির সাথেই পরিচয়টা বেশি হয়েছিল; কারণ বাবার কাছে, তাঁর সিথানের পাশে, বেশি দেখতাম গোর্কির বই। কখনো ‘মা’, কখনো ‘আমার ছেলেবেলা’- ‘পৃথিবীর পথে’- ‘পৃথিবীর পাঠশালায়’, কখনো ‘ক্লিম সামগিনের জীবন’, ‘ইতালির রূপকথা’, কখনো তাঁর নাটক, ছোট ছোট গল্প, লেনিন, তলস্তয়, চেখভের সাহিত্যিক চিত্রায়নাদি প্রভৃতি খোলা থাকত, অথবা দেখতাম তিনি চশমাচোখে পড়ছেন। বাবার সবচে কাছের মানুষ ছিলাম আমি। তাই তাঁর ব্যবহৃত সবকিছুতেই ছিল আমার অবাধ অধিকার। সেই অধিকারেই উল্লিখিত বইগুলো নাড়াচাড়া এবং সেভাবেই গোর্কিকে চেনা, জানা ও ভালোলাগা। ভালো লাগতে লাগতে একসময় ভালোবেসে ফেলা। তাঁর প্রথম কবিতা থেকে শেষগল্প- সব মিলিয়ে সেই ভালোবাসা। তাঁর সমগ্র সাহিত্যই অভিজ্ঞতায় পোড়-খাওয়া অস্থির এক পান্থজনের আঁকাবাঁকা পথে নিয়ে যায়। সেই পথ ধূসর নয়, রক্তাক্ত টগবগে এক মানুষের, যিনি দেখিয়েছেন আস্তাকুঁড় থেকে বন্ধুর পথ মাড়িয়ে কীভাবে ছুঁতে হয় সৃষ্টিশীলতার সূর্যকে, আর শুধু নিজেকে জাগিয়ে নয়, অন্যের মানসলোক কীভাবে জাগাতে হয়; যেমন- কল্পনায় নবযুগের গোর্কির ‘বুড়ি ইজেরগিল’ রূপকথার কাহিনীতে দেখি: দাংকো নিজের হৃৎপিন্ড তুলে আনছেন, আর তার স্ফটিক আলোয় পথ দেখাচ্ছেন সর্বসাধারণকে। হৃৎপিন্ডের সেই আলো খুবই প্রতীকী, যেন এভাবেই বাতলে দিচ্ছেন ভবিষ্যতের পথ।

তাঁর তিন খন্ডের আত্মজীবনীমূলক আখ্যান বা ট্রিলজির মধ্যে ‘আমার ছেলেবেলা’ই সেই শৈশবে বেশি ভালো লেগেছিল, তারপর আর সব। সেগুলো আজো পড়তে হয় অন্য এক ভালোলাগা থেকে। তাঁর এপিকধর্মী উপন্যাস ‘ক্লিম সামগিনের জীবন’টা কখনো শেষ করতে পারি নি। এটাকে নিজের ব্যর্থতাই মনে হয়। চসারের ‘কান্টারবেরি উপাখ্যান’-এর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কত বছর ধরে বইটি পড়ছি, আজো শেষ হলো না। বাবার মতো আমিও বইটিকে আমার বিছানার পাশেই রেখেছি। যে কোনোদিন পড়ে উঠব।

বলছিলাম গোর্কির কথা। প্রথম যৌবনে পড়া তাঁর ‘ঝোড়ো পাখির গান’ বুকে ঝড় তুলেছিল। ১৯০১ সালে রচিত এই কবিতা তাঁকে বিশেষ উপাধি দেয়। প্রকাশের পর তিনি সেন্সর বিভাগের মুখোমুখি হন। সেন্সর বিভাগের কর্মচারীরা তাঁর নাম দেন ‘ঝোড়োপাখি’। সেবছরই জারবিরোধী কর্মকান্ড আর শ্রমিক সংশ্রবের জন্য তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। অতঃপর জেলখানার কয়েদি হিসেবেও তাঁকে ডাকা হতো ‘ঝোড়োপাখি’ নামে। গোর্কির কবিতা পুশকিনের কবিতার মতো গীতিময় ও ছন্দোবদ্ধ নয়, অনেকটাই গদ্যময়। উল্লিখিত কবিতার ‘পাখি’ প্রতীক রুশদেশের ভবিষ্যৎ বিপ্লবেরই ইঙ্গিত বহন করছিল। ঝড়-ঝঞ্ঝা, বজ্র-বিদ্যুৎ মাড়িয়ে ভয়শূন্য পাখিটি বয়ে আনছে আনন্দের বার্তা। সেই অর্থে ওই কবিতায় গোর্কিকে ভবিষ্যৎদ্রষ্টাও মনে হয়। কবিতার সূত্রেই ভালোলাগা এসব তথ্য আমার জানা হয়েছে।

http://print.thesangbad.net/images/2019/April/03Apr19/news/Untitled-12.jpgএকই সময় গোর্কির কিছু গল্প ও নাটকও ভালো লেগেছিল। ‘চেলকাশ’ গল্পটির উল্লেখ করতে চাই; কারণ- গল্পের নায়ক ‘চেলকাশ’ একজন চোরাকারবারি। সে অর্থের দাস নয়, মুক্তমনের মানুষ। তার পুঁজিবাদী এ-উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও এমন সূত্রের ওপর টিকে আছে, কেন? গোর্কি দেখিয়েছেন- চেলকাশ বিদ্যমান সমাজব্যবস্থার শিকার। চোরাকারবারি ছাড়া অন্যকিছু ক’রে তার টিকে থাকার অবস্থা ছিল না। সমাজ তাকে অন্ধকার পথে যেতে বাধ্য করেছে; অর্থাৎ তার ইচ্ছার স্বাধীনতা হরণ করেছে।

ইতালিতে তাঁর প্রথম বসবাসকালীন সাধারণ ইতালীয় মানুষের জীবনকে উপজীব্য করে লেখা ‘ইতালির রূপকথা’ও আমার মন জয় করেছে। ‘স্বয়ং জীবনের হাতে যা রচিত তার চেয়ে সুন্দর রূপকথা কিছু নেই’ এন্ডারসনের এই কথাকে বইয়ের শীর্ষলিপিতে তুলে ধ’রে গোর্কি সেই গল্পমালাকে ‘রূপকথা’ বলেছেন কেবল আপেক্ষিক অর্থে। বইটির পেছনকার ভাবনা তিনি নিজেই সূত্রবদ্ধ করেছেন এই বলে: ‘লোকদের সুকঠিন, দ্রুত ক্লান্তিকর জীবনে খানিকটা স্ফূর্তি আনা...’। পাঠক হিসেবে আমি তা জেনেছি শুধু তা নয়, ইতালির অপরূপ প্রকৃতির মোহনীয় পটে সত্যসিদ্ধ কথায় তিনি যেভাবে দেখিয়েছেন ইতালীয় সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের দারিদ্র্য, দুঃখ-দুর্দশা, ক্লেশ আর মহৎ সংগ্রাম, আমি যেন দেশে থেকেও প্রত্যক্ষ করেছি সব। তাহলে কেন ভালো লাগবে না?

গোর্কির ‘নিচের মহল’ নাটকের কাহিনিতে দেখি ভাড়াটে বস্তিবাড়ির মানুষের সমাবেশ। দারিদ্র্যের কষাঘাত, মৃত্যু, গালিগালাজ, মাতলামি, বিশ^াসঘাতকতা, কলহভরা জীবনই যেন তাদের বেঁচে থাকার মানে। জীবন এখানে তুচ্ছ, মূল্যহীন! নিষ্পেষিত আর আশাভঙ্গের নিরাভরণ অমন মানুষকে সচেতন করাই বুঝি লেখকের লক্ষ্য। নাটকের মাধ্যমে গোর্কি সমাজের বাস্তব দশাই দেখাতে চান নি, চেয়েছেন সমাজ অধ্যুষিত নিরন্ন-হাভাতে, বঞ্চিত-লাঞ্ছিত, মানুষের অধিকার-বোধ জাগিয়ে তুলতে। সেই বোধ আমার মধ্যে আজো কাজ করে; কারণ আমার সমাজেরও অনেকক্ষেত্রে সেই দশা কাটেনি।

গোর্কির উপন্যাসের মধ্যে ‘মা’-কেই আমার বেশি ভালো লাগে। ‘মা’ পড়লে আমি বুঝতে পারি, এটি রচনার সময় লেখক তাঁর সমকালীন ঘটনার প্রতি কীরকম বিশ্বস্ত ছিলেন। শ্রেণি এখানে মুখ্য হলেও মায়ের সাথে পাভেল করচাগিনের যে সম্পর্ক তা শুধু রক্তের নয়, সাংস্কৃতিক লড়াইয়েরও গতিমুখ। গোর্কির জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখা যায় নিজের দীর্ঘ শ্রমিক জীবনের অভিজ্ঞতা আর বাস্তবের রক্তাক্ত লড়াইকে এ-উপন্যাসে তিনি বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। বইটির নন্দনতাত্ত্বিক শিল্পগুণ নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে মা নিয়ে যত উপন্যাস লেখা হয়েছে তার মধ্যে সর্বজনীন সর্বহারার মা কেবল গোর্কির ‘মা’।

তাঁর ‘Reminiscences of Leo Nikolaevich Tolstoy’ বইটিও অসাধারণ! বিস্ময়কর। কোনো লেখককে নিয়ে এমন অসামান্য স্মৃতিকথাও লেখা যায়! কী করে? আমি ভেবে পাই না। তাই একই বই পড়তে হয় আবার।

ফরিদপুর উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াকালেই আমি প্রপতিশীল ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলাম। ১৯৮৯ সালে রাজেন্দ্র কলেজে পা রেখেই হয়ে উঠেছিলাম আরো সক্রিয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি তখন সমাজ বদলের স্বপ্নেও বিভোর ছিলাম। স্বপ্নের সেই গাঢ় লাল দিনগুলোতে অন্য ভাষার কিছু লেখা অধিকতর সঙ্গী হয়ে ইস্পাতসদৃশ মনোবল যুগিয়েছে, যেমন- আলেকজান্দ্র বেক-এর ‘ভলকলামস্কয়ে সড়ক’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড), জন রিড-এর ‘দুনিয়া কাঁপানো দশদিন’ নিকোলাই অস্ত্রভস্কির ‘ইস্পাত’ (প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড)।

প্রিয় লেখকের আত্মজৈবনিক উপন্যাস বা স্মৃতিকথা আমাকে বরাবরই টানে। অস্ত্রভস্কি-র ইস্পাতও বহুলাংশে তা-ই। তার কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘পাভেল করচাগিন’ আমাকে এতটাই অধিকার করেছিল যে আমার বড়বোনের এক সন্তানের নামও রেখেছিলাম ‘পাভেল’। আমার সেই ভাগ্নে তার সমাজে আজ সে-নামেই পরিচিত। ‘ইস্পাত’ উপন্যাসে অস্ত্রভস্কি নতুন রাশিয়ার বীর নায়ক পাভেল করচাগিনের পূর্ণাঙ্গ আলেখ্য তুলে ধরেছেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন পুনর্গঠনের কালপর্যায়ের পটভূমিতে তিনি এঁকেছেন এই আলেখ্য। পটভূমি খুবই বাস্তবতাসম্মত, প্রধান চরিত্রটি প্রত্যয়জনক, সমগ্র কাহিনিই একফালি বাস্তব জীবন, খুব জোরালোভাবে, পরমোৎকৃষ্ট রুচিবোধ আর সূক্ষ্ম নাটকীয়তাবোধ অনুসারে উপস্থিত করা হয়েছে। ‘বীরত্ব জন্মে সংগ্রামের ভেতর দিয়ে, আর কঠোর অবস্থার ভেতর দিয়ে তার পরীক্ষা হয়।’ জীবনে মনে রাখার মতো এমন অনেক কথা যার মধ্যে আছে তাকে ভালো না বেসে পারা যায়?

আমার একযোগে একাধিক বই পড়ার অভ্যাস রয়েছে। সেই অভ্যাসেই কলেজে পড়াকালীন ওমর খৈয়াম-এর ‘রুবাইয়াৎ’ এবং কালিদাসের ‘মেঘদূত’কে সাথে নিয়ে পড়েছিলাম সোফোক্লিসের ‘ইডিপাস’ এবং শেকসপিয়ারের ‘ওথেলো’ ও ‘ম্যাকবেথ’- সবই ভালোলাগার তালিকায় রয়েছে। আলবার্টো মোরাভিয়ার ‘Two Women’ ও ‘Time of Desecraption’-ও তখন ভালো লেগেছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘Two Women’-ই বেশি দাগ কেটেছিল মনে। যুদ্ধ একটি দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে কীভাবে বদলে দেয়, কোথায় নিয়ে যায়, সে-দেশের জনজীবনে কী রকম প্রভাব ফেলে, মানুষের মধ্যে কেমন ক’রে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিপর্যয় ঘটে তার বেদনাবিধূর ছবি ধরা পড়েছে ওই উপন্যাসে।

এ-প্রসঙ্গেই ‘ভলকলামস্কয়ে সড়ক’ বইয়ের কথা বিশষভাবে বলতে হয়। বইটির উল্লেখ আমি আগেই করেছি। কিন্তু তার সম্পর্কে লিখতে বসে তেমন কিছুই মনে আসছিল না। ব্যাপারটি আমার মনস্তত্ত্বের সঙ্গে যায় না, তবু তা-ই ঘটছিল। ফলে তখনি প্রয়োজন দেখা দিল বইটি পড়ার। কিন্তু বিকেলে কিছু সামাজিক আর সন্ধ্যার পর কজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা তার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ে। তাই মধ্যরাতেই তাক থেকে বহুদিনের পুরনো ধূসর হয়ে যাওয়া বইটি নিয়ে দ্রুত বসে গেলাম। তার প্রচ্ছদে কেবল খয়েরি রঙের এক বীর যোদ্ধার ছবি। আকাশ ছোঁয়া মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে সে স্লোগান দিচ্ছে। কভারপেজের পরই যথাক্রমে রুশ ও বাংলায় আলেকজান্দ্র বেক-এর নামের নিচে বড় রুশ অক্ষরের ‘ভলকলামস্কয়ে সড়ক’, আর তার নিচেই আমার অগ্রজের স্মৃতিবাহী নিজস্ব স্টাইলের একটি স্বাক্ষর। অগ্রজের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রেখে পাতাটা উল্টালাম। এল দু-পৃষ্ঠার সূচিপত্র; ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামের ২৪টি পরিচ্ছেদ, যার সমষ্টি দু-খন্ডের এ অখন্ড বইটি। প্রথম খন্ডের সূচনা পরিচ্ছেদ- ‘লোকটির নাম আছে, পদবি নেই’- দেখেই ছেলেবেলার মতো মজা পেয়ে হেসে উঠলাম। শিরোনামের ‘লোকটি’র নাম বাউরজান মমিশ উলি, মস্কোর লড়াইয়ের কথক। ১৯৪১ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে মস্কোর ভলকলামস্কয়ে সড়কের অদূরে রুজা নদীর তীরে জার্মানির নাৎসি বাহিনি ও রাশিয়ার লালফৌজের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ওই লড়াই। সেই সময় সে ছিল সিনিয়র লেফটেন্যান্ট। তার সাথে লেখকের পরিচয়ের গল্পই এই বিশেষ পরিচ্ছেদ।

দু-পৃষ্ঠার সূচিপত্রের পর একটি পাতায় উৎসর্গপত্রের মতো উৎকীর্ণ: ‘আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতে বর্ধিষ্ণু জনপদের ধ্বংসলীলা, উৎপীড়িত জনগণের প্রবল বিদ্রোহ বা মাতৃভূমির উপর বন্যবর্বর জাতির আক্রমণের মতো বিরাট ঘটনা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ যদি কেহ পায়, তবে তাহার উচিত যাহা কিছু দেখিয়াছে লিখিয়া রাখা। ইতিহাসের ভাষা লিপিবদ্ধ করার নৈপুণ্য যদি তাহার না থাকে, লেখনীর ব্যবহার থাকে অনায়ত্ত, তবে কোন অভিজ্ঞ লিপিকারের কাছে সে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা উচিত। লিপিকার লিখিয়া লইয়া পৌত্রপ্রপৌত্রদের শিক্ষার নিমিত্ত তাহা অক্ষয় করিয়া রাখিবেন। [ভ. ইয়ান, ‘চেংগিস খাঁ’]।

হ্যাঁ, আলেকজান্দ্র বেক তাঁর এ-বইতে সে-কাজটিই করেছেন। শুরুতে বিনয়ের সাথেই বলেছেন, ‘আমি এই বইয়ের বিশ^স্ত অনুলেখকমাত্র। বইয়ের ইতিহাসটা তবে বলা যাক।’ এ-কথা বলেই তিনি চলে গেছেন পরিচ্ছেদের পরের অংশে এবং শুনিয়েছেন বাউরজান মমিশ উলির মুখ থেকেই: ‘... যুদ্ধের আগে আমিও ঠিক তাই ভাবতাম। একটি মেয়েকে আমি ভালোবাসতাম, খুবই ভালোবাসতাম। কিন্তু যুদ্ধ করতে করতে যে প্রেমের জন্ম তার সঙ্গে কিছুরই তুলনা হয় না। যুদ্ধক্ষেত্রেই সম্ভব গভীরতম প্রেম, গভীরতম ঘৃণা। এই প্রেম আর ঘৃণা যে কী জিনিস যারা কখনো তা অনুভব করে নি তারা বুঝতে পারবে না...’; আর আমি মনে করি বেক-এর এ-বই যারা পড়েননি তাঁদের কিছু বলেই বোঝানো যাবে না এটি পড়তে কী রকম লাগে। কাহিনির সাথে রুদ্ধশ্বাসেই এগিয়ে যেতে হয়। আমি সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছি- পড়ছি ছেলেবেলার মতো সশব্দে। মাথার ওপর বৈদ্যুতিক পাখা ঘোরার সামান্য শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোনো শব্দ নেই। সবাই ঘুমিয়ে। প্রহরে প্রহরে কেবল একটা পেঁচার ডাক কানে আসছে। এমন সুনসান নীরবতাও ভেঙে খান খান হলো যখন আমি ফুপাতে ফুপাতে একেবারে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলাম। চোখ মুছতে মুছতে কাঁধের গামছাটা ভিজে উঠল, তবু হাতের বই রাখতে পারলাম না। সেভাবেই পড়তে পড়তে ভোর হয়ে এল। এ-লেখার জন্যে আমি গতরাতেও মাত্র দু-ঘণ্টা ঘুমিয়েছি। সময়মতো অফিসে ছুটতে হবে ঠিকই- এই ভেবে বাতিটা নিভিয়ে আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। আঙিনার ইউক্যালিপটাসের আড়াল থেকে পূর্ণিমার চাঁদ আমাকে অভিনন্দন জানাল। সে কি জানত অন্য ভাষার সাহিত্যের একটি বই পড়তে পড়তে আমি এভাবে কাঁদছি?

প্রিয় লেখকের আত্মজৈবনিক রচনা বা স্মৃতিকথার প্রতি আমার দুর্বলতার কথা আগেই বলেছি। আমার সব প্রিয় লেখকেরই সে-ধরনের লেখা আমি পড়ে থাকি। তবে এযাবৎ যা পড়েছি তার মধ্যে বিস্ময়কর মনে হয়েছে চিলির কবি পাবলো নেরুদার ‘অনুস্মৃতি’। কী দুর্দান্ত লেখা! কত অবলীলায় প্রকাশ করেছেন তিনি নিজেকে! জীবনের সব সত্য অকপট স্বীকারের অমন দৃষ্টান্ত তাঁর আগে কি কেউ রেখেছে? ওই মাপের আত্মজীবনী বা স্মৃতিকথা পৃথিবীর সব সাহিত্যেই বিরল। বইটি আমাকে আমার নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমি প্রশ্ন করি নিজেকে, ‘তুমি কি এভাবে বলতে পারো সব কথা?’ উত্তরে আমি নিজেই পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ি: ‘তা পারতে হলে কীভাবে যাপন করতে হয় মনুষ্যজীবন?’

এ-প্রসঙ্গে আরেকটি বইয়ের কথা বিশেষভাবে বলতে চাই। সেটি রসুল গামজাতভের ‘আমার জন্মভূমি: দাগেস্তান’। আমার ভালোলাগা, বারবার পড়া, আরেকটি বই; যতবারই পড়ে উঠেছি- মনে হয়েছে আহ্ এমন একটা লেখা যদি লিখতে পারতাম- জীবনে আর কিচ্ছু চাইতাম না।

‘Black Beauty’ নামের একটি আপাত ছোট্ট বইকে ঘিরেও আমার ভালোলাগা আছে। সে আমার অনেক সময় নিয়েছে, দিয়েছেও। তার ‘কালো সৌন্দর্য’ আসলে একটি কালো ঘোড়া, যার প্রতীকে মহত্তর সৌন্দর্যেরই অন্বেষণ। সেই শুভসন্ধানে কত কী না করেছি। পড়ার সময় কয়েক রকম অভিধান পাশে রেখে বসতাম, যাতে সেই সৌন্দর্যকে আরেকটু ছুঁতে পারি। অনেক সময় তাতেও কাজ হয়নি। তবু লেগে থেকেছি সেই অধরা সৌন্দর্যের পিছে। মনে পড়ে কত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছি অগ্রজের বাড়ি ফেরার, কারণ তিনি ছিলেন একখান জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া।

আহ্ কী চমৎকার সময় ছিল তখন এই সব ভালোলাগা নিয়ে! ভাবতেই ভালো লাগে। জীবনে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের আগে অন্তত আরও একবার গ্রহণ করতে চাই সেই সব অসাধারণ লেখার স্বাদ।