menu

বিশুদ্ধির বিরল উত্থানে সে

ইমতিয়ার শামীম

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৭ নভেম্বর ২০১৯
image

আবুল হাসান / জন্ম : ৪ আগস্ট ১৯৪৮; মৃত্যু : ২৬ নভেম্বর ১৯৭৫ প্রতিকৃতী : মাসুক হেলাল

সাধারণ এক সংখ্যাই ছিল সেটা,- সাপ্তাহিক বিচিত্রার ওই সংখ্যা হয়ত এখন কোনওমতে টিকে আছে কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহের ভিড়ে- সংগ্রাহকও ভুলে গেছে সেটির কথা। অথবা তা পাওয়া যাবে হয়ত বিশাল আর্কাইভ তন্ন তন্ন করে ফেলার পরে। আগে-পরের ভাইবোনদের মধ্যে হয়তো ন্যাপথলিনের গন্ধ নিতে নিতে, ধুলাবালি মাখতে মাখতে, বাতাসের আর্দ্রতায় গুটিসুটি হতে হতে অথবা এসব ছাড়াই সে কেবলই ঘুমিয়ে থাকে। যেমন ঘুমায় সে সংখ্যার একই পৃষ্ঠায় একপাশে আবুল হাসানের কবিতা- ‘আমার সঙ্গে কোনো মেয়ে নাই, তাই কোনো মুখরতা নাই’, আরেক পাশে জুলফিকার মতিনের ‘রাইকমলিনী তুমি বাগানে এসো না’। এই বয়সে আবারও পড়তে গেলে কার কবিতা যে হৃদয় ছুঁয়ে যাবে, কে তা জানে; কিন্তু তখন ঔৎসুক্য ছিল মুখরতা না থাকার বেদনার দিকে। বাগানে আসতে মানা করার কোনও কারণও তো ছিল না। গ্রামদেশে থাকি তখন, আলো ঝলমল সাহিত্য-সংস্কৃতির নগরে কখন কী ঘটে জানতেও পারি না। তাই তখনও ‘রাজা যায় রাজা আসে’র আবির লাগেনি আমাদের গায়ে, কেউ হরণ করেনি আমাদের অন্তঃস্থ আমাদেরকে, তখনও আমরা ভালবাসি ‘ছিন্নমুকুল’, ভালবাসি ‘নদীর স্বপ্ন’ সারা বেলা ধরে। আর ঠিক সেই মতে সুকান্তের জন্যে শ্বাস ভারি হয়ে ওঠে- বেঁচে থাকলে সে যে পৃথিবীর সব কবিকেই ছাপিয়ে যেত, কেন যেন গভীরভাবে বিশ্বাস করারও ইচ্ছে জাগে। মুখরতাবিহীন আবুল হাসান উস্কানি দেয় বটে, সুনির্দিষ্ট কারণেই দেয়, আমাদের মতো কে আর জানে কী দুঃসহ সেই সত্তরের বাল্যবেলা,- ‘আমার সঙ্গে কোনো মেয়ে নাই, তাই কোনো মুখরতা নাই।’ অথচ আমরা কি জানতাম না, উচ্চকিত স্বরে ওই ঘোষণা দিলে গাঁয়ের সব কয়টা হাইলা নড়ি, কারাইল, হলঙ্গা আর লাঠি-খুন্তি গায়ের ওপর এমনভাবে পড়তে শুরু করবে যে, দিব্যি প্রমাণ হবে- নারী না থাকলেও পুরুষ মুখরিত হতে পারে, আকাশবাতাস আর ‘খোদার আরশ আসন ভেদিয়া’ মুখরিত করে তুলতে পারে। অনেক-অনেকদিন কেটে যায়, কেবলই এক মুখরতাবিহীন আমিত্বের ঘ্রাণের সঙ্গে বসবাস করে; মফঃস্বলের আমাদের আর জানা হয় না, সেদিন বোধহয় আকাশ খুব গম্ভীরই ছিল, ঈষৎ উড়ন্ত কালো শাড়ির আঁচলসমেত তাঁর কফিনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এক শোকার্ত নারী- যদিও ‘পৃথক পালঙ্ক’ রচিত হয়েছিল তার অনেক আগেই।

কবিতায় একটি প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাসের জন্ম দিয়ে কবি অমরতা পান; আবুল হাসানও পেয়েছেন। নিঃসঙ্গতা আর বিচ্ছিন্নতাও যে অলৌকিক এক শক্তি হয়ে উঠতে পারে, প্রচ- নিরুপায়তার ঘূর্ণি তুলে তা ইচ্ছের অমিত বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে, মৃত্যুকে খুঁজতে খুঁজতে তুলে আনতে পারে বেঁচে থাকার অমিয় আকাক্সক্ষা-আবুল হাসান ছাড়া সে কথা আর কে-ইবা বলেছিল আমাদের? ষাটের দশককে বলা হয় বাঙালি মধ্যবিত্তের রাষ্ট্রিক-সামাজিক- সাংস্কৃতিক উত্থানের কাল, তারুণ্যের স্পর্ধিত বিকাশকাল; কিন্তু আবুল হাসান সেই উত্থানকে স্পর্শ করেছেন নৈরাশ্যের অরুন্ধতি জ্বেলে। কবি আবুল হোসেন নামের বিখ্যাত কবি রয়েছেন জানার পর ‘আবুল হোসেন’ নামের ‘আবুল হাসান’ রূপান্তর শুধু একটি নামবদলের ঘটনা নয়- বাংলাদেশের কবিদের কাব্যভাষা আর কাব্যআত্মার রূপান্তরও ঘটেছে এর মধ্যে দিয়ে। অন্তত আমার মতো পাঠকের কাছে। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের কবিরা পূর্ববাংলায় যে কাব্যভাষা ও বিষয়ে আন্দোলিত হয়েছেন, কবিতার যে দেহাবয়ব তৈরি করেছিলেন আবুল হাসান তাতে তৃপ্ত হতে পারেননি। তাতে তিনি যুক্ত করেন নতুন স্বর এবং ষাটের দশকের শেষভাগে তাঁর সেই নতুন স্বরের প্রকাশ সম্ভব করেছে বিবিধ নতুন কণ্ঠস্বর। ‘হাওয়া, ধুলোয়, গাছের পাতায়, পাখির ডানায়, নদীর জলে, দিনের কোলাহলে, রাত্রির নিস্তব্ধতায় তিনি কবিতা পেয়ে যেতেন অবলীলায়।’ -মিথ্যা নয়, শামসুর রাহমানের এই অবলোকন; তবে এর সঙ্গে আরও যা দেখি তা হল, এর সব কিছুকেই তিনি অনুভব করেছেন নতুনভাবে, তাই তার কাব্যআত্মাও হয়েছে নতুন; যে কারণে তিনি কথা বলতে শুরু করেছিলেন নতুন কাব্যভাষায়। যা শেষ পর্যন্ত পরিণত একটি রূপ পেয়েছে বলেও মনে হয় আমার মতো দুর্বল পাঠকের। অবশ্য আবুল হাসানকে নিয়ে অতৃপ্তি কিংবা ঈর্ষাও কম নয়। তবে নির্দোষ অতৃপ্তি ও নির্দোষ ঈর্ষার সঙ্গে শুধু ঈর্ষার দূরত্ব নিশ্চয়ই অনেক। তাঁর নৈকট্য পেয়েছেন, এমন অনেকেরও সমালোচনা আছে- শব্দ ছিল আবুল হাসানের মূল মনোযোগের বিষয়। শব্দকে নতুনভাবে ব্যবহার করতে চাইতেন তিনি। অর্থাৎ তাতে কৃত্রিমতা দেখা দিত, এরকম প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত রয়েছে এ সমালোচনাতে। কিংবা কম বয়সে মারা গেছেন, তাই কবিতাও ‘বালকসুলভ’- এই নখরামিও করেছেন বিদগ্ধ সমালোচকরা। অবশ্য শাদামাটাভাবে আমাদের মনে হয়, শব্দই কেবল মনোযোগের বিষয় হলে, কাব্যআত্মা তৈরি হওয়ার কথা নয় এবং কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন শব্দ দিয়ে কোনও নিরবচ্ছিন্ন ভালো লাগা তৈরি করা সম্ভব নয়। নতুন অর্থ বা চিত্রকল্প দাঁড় করানোর চেষ্টায় শব্দ ব্যবহার করলে কৃত্রিমতার ঝুঁকি থাকে ঠিকই, কিন্তু যারা নতুন করে শব্দকে কাজে লাগানোর চিন্তা করতে পারেন, তারা সেই ঝুঁকিগুলোও সচরাচর উপলব্ধি করেন। একটি-দুটি নয়, অসংখ্য কবিতার অসংখ্য চিত্রকল্প ও ভাষাবিন্যাস, অন্তর্নিহিত আস্বাদ আমাদের সামনে তুলে ধরে আবুল হাসানের এই সৃজনশক্তিকে। এমন করে কে আর শক্তি যোগায় ‘প্রিয়তম পাতাগুলি ঝরে যাবে, মনেও রাখবে না’ লিখে বরং মুক্তির স্বাদ নিতে? কে আর ‘বনভূমিকে বল, বনভূমি/ ওইখানে একটি মানুষ শুয়ে আছে’ বলে দুর্বল, প্রায় প্রাণহীন হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের উদ্বেল করে নির্জন ছায়ায় আত্মহারা আনন্দিত চোখ মেলে ধরতে? ‘যাই, এখনও তাদের গায়ে শস্যের গন্ধ লেগে আছে’ বলে কে আর প্রস্তুত করে আমাদের বরং নতুন যাত্রার পথে?

কাঠুরের মতো আকাল আবুল হাসানের এই উদিত দুঃখের দেশে আমাদের ফালা ফালা করে কাটে, তবু আমরা দেখি সারা সকাল শিশির কুড়াচ্ছে শিমুল গাছের কাছ থেকে। তার অনুভূতি, চিত্রকল্প আর শব্দসমূহের নতুন উদ্ভাসন আবুল হাসানে সংশয়ীদের আমাদের করুণা করতে শেখায়

এক দুঃসহকালে ক্রমউত্থান আবুল হাসানের। আর দুঃসহকাল নিজেই নতুন ভাষা খোঁজে, শব্দের নতুন অর্থ খোঁজে। আমরা দেখেছি, আমাদের কবিরাই বরং দুঃসহকালের সেই হাতছানিতে সাড়া দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়েছে তখন, সামষ্টিক অতৃপ্তি আমাদের গিলে খাচ্ছে এবং আমাদের তরুণরা সে অতৃপ্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন ক্ষুব্ধ, রাগী কিন্তু সমবেত প্রচেষ্টার মধ্যে দিয়েই। এসবের পাশে আবুল হাসান অন্যরকম- বিচ্ছিন্নতায় মোড়ানো হলেও তাঁর যাত্রাও সমষ্টির দিকে। ব্যক্তির রাগ, হতাশা, বিষণ্নতা ও স্পন্দন তাঁর কবিতায়, কিন্তু কী নিবিড়ভাবে যুক্ত করেন তিনি আর সকলকে। বন্ধনমুক্ত এক মানুষ, বন্ধনমুক্ত সব হাহাকার ও উল্লাস, কিন্তু যুক্ত তা সকলের সঙ্গে। বাউলরা যাত্রা করেন বিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে।

আবুল হাসানের মধ্যেও ওই বিশ্বাস উচ্চকিত, বিশ্বাসের গাঢ় রং মেখেই তিনি বলে ওঠেন, ‘সে এক পাথর আছে, কেবলই লাবণ্য ধরে।’ কিন্তু শুধু বিশ্বাসই তো নয়- বিশ্বাসের সমান বোধও প্রকাশিত হয় তাঁর মধ্যে থেকে। নিজেকে আবিষ্কার করতে পারা এবং তা সকলের সামনে উন্মোচন করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। আবুল হাসান তা তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাতেই করেন; যেমন করেছেন শেষ প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটিতেও :

মারী ও মড়কে যার মৃত্যু হয় হোক। আমি মরি নাই- শোনো

লেবুর কুঞ্জের শস্যে সংগৃহীত লেবুর আত্মার জিভে জিভ রেখে

শিশু যে আস্বাদ আর নারী যে গভীর স্বাদ

সংগোপন শিহরণে পায়- আমি তাই।...

শেষ অঙ্কে প্রবাহিত শোনো তবে আমার বিনাশ নেই

যুগে যুগে প্রেমিকের চোখের কস্তুরি দৃষ্টি

প্রেমিকার নত মুখে মধুর যন্ত্রণা,

আমি মরি না, মরি না, কেউ কোনোদিন কোনো অস্ত্রে

আমার আত্মাকে দীর্ণ মারতে পারবে না।

(নচিকেতা)

এত ব্যক্তিক তিনি, স্বদেশও হয়ে উঠেছে তাঁর ব্যক্তিগত, তাঁর বড় আত্মিক; সেই আত্মিক, মন্দ্রিত স্বর আমরা শুনি ‘উদিত দুঃখের দেশ’ কবিতায়। ফিরে আসার আহ্বান রাখেন তিনি ব্যক্তিক আকুলতায় উদিত দুঃখের দেশে কবিতাকে, দুধভাতকে। স্বদেশের রক্তক্ষরণকে ধারণ করেন তিনি, ধারণ করেন স্বদেশপ্রেমিকদেরও। নতুন কবিতা অনিবার্য হয়ে ওঠে তাঁর সেই আবাহনে।

রমণীর বুকের স্তনে আজ শিশুদের দুধ নেই প্রেমিক পুরুষ তাই

দুধ আনতে গেছে দূর বনে!

শিমুল ফুলের কাছে শিশির আনতে গেছে সমস্ত সকাল!

সূর্যের ভিতরে আজ সকালের আলো নেই সব্যসাচীরা তাই

চলে গেছে, এখন আকাল

কাঠুরের মতো শুধু কাঠ কাটে ফল পাড়ে আর শুধু খায়!

কাঠুরের মতো আকাল আবুল হাসানের এই উদিত দুঃখের দেশে আমাদের ফালা ফালা করে কাটে, তবু আমরা দেখি সারা সকাল শিশির কুড়াচ্ছে শিমুল গাছের কাছ থেকে। তার অনুভূতি, চিত্রকল্প আর শব্দসমূহের নতুন উদ্ভাসন আবুল হাসানে সংশয়ীদের আমাদের করুণা করতে শেখায়।

এমনতর কাব্যাভাষ সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে আবুল হাসানের কবিতা বিষণ্নতার আধার সৃষ্টি করেও স্থিত কমিটমেন্টের দ্যুতি ছড়ায়। এককথায় তিনি বিষণ্নতা ও দুঃখবোধের নতুন ইঙ্গিত দেন। তাঁর বিষণ্নতা ও দুঃখবোধ হয়ে ওঠে দূরযাত্রার। নিঃসঙ্গতা পরিণত হয় বিশুদ্ধ হয়ে ওঠার আধার এবং আমরা উদ্দীপ্ত হয়ে দাবিও জানাতে পারি :

মৃত্যুমাখা মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছি একলা মানুষ

বেঁচে থাকার স্বীকৃতি চাই

স্বীকৃতি দে, স্বীকৃতি দে, স্বীকৃতি দে।

(স্বীকৃতি দে)

স্পষ্টতই এই আবাহনে কোনও রোমান্টিকতা নেই, নেই স্লোগানও; আবুল হাসান তাঁর সময়ের গভীর স্পন্দনকে অনুভব করেছেন মাত্র এবং অবশ্যই তা, তিনি নিজেই তাঁর আরেক কবিতায় যেমনটি লিখেছেন, অনুভব করেছেন ‘ব্যক্তিগত পোশাক খুলে’। অথচ তিনি তাঁর প্রতিটি বাক্য দিয়ে একাত্মতাবোধ নির্মাণ করেছেন যে-কোনও বিচ্ছিন্ন পাঠকের সঙ্গেও। রাজনীতি করেননি তিনি, কিন্তু ব্যক্তিকে পৌঁছে দিয়েছেন রাজনীতিরই দোরগড়াতে।

দুই.

কৈশোরের সেই গ্রামে ‘আবুল হাসান কোনখানে পাই’ খুব বেশি যে মনে হয়েছে, তা কিন্তু নয়। তেমন আকাক্সক্ষা জাগবার জোরালো পরিপ্রেক্ষিতও ছিল না তখন। আর জাগলেও পাওয়া খুব সহজ ছিল না তাঁকে। চোখকান একটু খোলার পর আবিষ্কার করলাম, ‘রাজা যায় রাজা আসে’ রীতিমতো দুর্লভ। তাছাড়া পাঠকের বিশ্বাসঘাতকতার সত্যে আমাদের বইসংগ্রাহক বন্ধুরা এতই আস্থা রাখতেন যে, ঘনিষ্ঠ বন্ধুকেও তা আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত হতে হতো অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। প্রচ- কৃপণতা ও হিসেবনিকেশসমেত বই পড়তে দেয়ার পরও চোখকান খোলা রাখতে হতো, ওটা ফেরৎ আসবে তো? এইভাবে কোনও বই নয়- কলেজে পড়ার সময় ১৯৮২-র দিকে আমাদের কাছে আবুল হাসানের দ্বিতীয় কবিতাটি এলো বন্ধু জয় ইসলামের কল্যাণে- ‘লক্ষ্মী বউটিকে/ আজ আর কোথাও দেখি না,’ (উচ্চারণগুলি শোকের)। এই শোকাচ্ছন্ন স্বাদেশিকতা সামরিক শাসনবিরোধিতার প্রত্যয়জাগা আমাদের চোখেমুখে ঘোর এনে দিল। একে একে আমরা খুঁজে পেলাম আবুল হাসানের বোনের মতো লাজুক পাড়াগাঁ, যে রয়েছে তার ভাইয়ের প্রতীক্ষায়, যদিও ‘ভাই আর ফেরে না, ফেরে না’ (সে আর ফেরে না)। এইভাবে আমাদের ডাকবাক্সেও ধু ধু অন্ধকার জমতে লাগল, তত্ত্ব-তালাশ করে আবুল হাসানের অনেক কিছুই জানতে পেরে। আরও কিছুকাল পরে হাতে এলো ‘পৃথক পালঙ্ক’- আমার পড়া আবুল হাসানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই। আর পড়তে পড়তে আবিষ্কার করলাম, সেখানে মারী ও মড়কে অবিনাশী যেন আমিই, কল্যাণমাধুরী প্রদীপ নিয়েও যেন আমি, ছায়াকুড়ানো পাতাকুড়ানো মানুষকুড়ানো আমিই যেন দাঁড়িয়ে শস্যমাতার মুখোমুখি। আমাদের নারকেল বনের পাশে আত্মহত্যার মতো বিষণ্ন উপায়ে গল্প বলার ও শোনার দিন শুরু হলো এইভাবে। আমাদের ছুঁয়ে গেল ‘গোলাপ ফুটছে তাও রাজনীতি, গোলাপ ঝরছে তাও রাজনীতি/ মানুষ জন্মাচ্ছে তাও রাজনীতি, মানুষ মরছে তাও রাজনীতি’ (অসভ্য দর্শন)। মৃত্যু, সঙ্গমক্ষুধা সব কিছুকেই আবুল হাসান নতুন করে চেনালেন : ‘এই মৃত্যু জন্ম দেয় শিল্পে কুসুম/ এই আদি সঙ্গমের অনাদী পিপাসা’ (সঙ্গমকালীন একটি বৃশ্চিকের মৃত্যু দেখে)। পৃথিবীর এই অপার অগ্রগ্রতি, মানুষের এই বিকাশ ও উৎকর্ষ সব কিছুকে ব্যথিত নয়নে দেখতে শিখলাম আমরা :

মানুষ চাঁদে গেল, আমি ভালোবাসা পেলুম

পৃথিবীতে তবু হানাহানি থামলো না!

পৃথিবীতে তবু আমার মতোন কেউ রাত জেগে

নুলো ভিখিরীর গান, দারিদ্র্যের এত অভিমান দেখলো না!

(জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন)

এবং স্পর্ধার মতোই কি শোনাবে, যদি বলি, আমাদের মতো সত্যিই কেউ দেখেনি? প্রতিটি কালেই অবশ্য মানুষের রক্তক্ষরণ থাকে, সভ্যতার অবক্ষয় থাকে, নিষ্ঠুরতা থাকে- প্রতিটি কালের তরুণদের খুব কমই সেই রক্তক্ষরণ, অবক্ষয় ও নিষ্ঠুরতা দেখে, প্রতিবাদের বিবর্ণতা দেখে কষ্ট পেতে পারে; পাশাপাশি প্রত্যয়ী হয়ে মানুষকে নিয়ে, সমাজকে নিয়ে ভাবতে পারে। সেই অর্থে, আমাদের মতো সত্যিই কেউ দেখেনি আমাদের এই সময়কে। আমরা যে খানিকটা দেখতে শিখেছিলাম, তাতে নিঃসন্দেহে আবুল হাসানের স্পর্শ ছিল। তাঁর মারী ও মড়কের ঢেউ এসে দোলা দিচ্ছিল আমাদের, আমরাও ঘোষণা করছিলাম, ‘শোনো- আমি মরি নাই’। সদ্য স্বাধীন দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংঘাত, অভাব আর দুর্ভিক্ষ, মানুষে মানুষে অবিশ্বস্ততা- সবই ছুঁয়েছে আবুল হাসানকে। আমরা সেসব সঙ্গী করে এসে পৌঁছেছি সামরিক শাসনের কালে। ষাটের দশক থেকে যে স্বপ্নময়তা ও অস্থিরতার শুরু সত্তরের দশকে তা মোড় নিয়েছে কেবলই স্বপ্নহীনতা ও নৈঃসঙ্গের দিকে। যদি ভাবি, কোনও চিন্তাভাবনা ছাড়াই মনে হয়, হতাশা আর বিচ্ছিন্নতাবোধই তাঁর কবিতার মূল শক্তি। বাংলা কাব্যে নৈঃসঙ্গ্য আর হতাশাচ্ছন্নতা শিল্পিত হওয়ার পাশাপাশি কত কম্যুনিকেটিভ হতে পারে, আবুল হাসান তার অন্যতম প্রধানতম উদাহরণ। এই নৈঃসঙ্গ্য ও হতাশাচ্ছন্নতা আবার কেবল ব্যক্তির প্রেম কিংবা জীবনকে ঘিরে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক রক্তক্ষরণেরও। ‘মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবে না’- কত সহজে তিনি নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেন বিশ্বরাজনীতির মুখোমুখি। কিংবা ধরা যাক ‘অসভ্য দর্শন’ কবিতার কথা, ‘দালান ভাঙছে, তাও রাজনীতি দালান উঠছে, তাও রাজনীতি/... তীব্র এক বেদেনির সাপ খেলা দেখছি আমি/ তাও কি রাজনীতি?’ ব্যক্তির বিষণ্নতার সঙ্গে রাজনীতির দহনকে নাগরিক ভাষায় বিবৃত করতে করতে নিজেই নিজেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি, ছিন্নভিন্ন করেছেন মোহময়তাকে।

আমাদের নিঃসঙ্গতা, দূরত্ব ও বিচ্ছিনতার জন্যে নতুন এপিটাফ লিখেছেন তিনি:

যতদূর থাকো ফের দেখা হবে। কেননা মানুষ

যদিও বিরহকামী, কিন্তু তার মিলনই মৌলিক।

মিলে যায়- পৃথিবী আকাশ আলো একদিন মেলে।

(এপিটাফ)

এই নিঃসঙ্গতা,- গভীর আস্থার নিঃসঙ্গতা- নিজের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল আবুল হাসানের। দীর্ঘ পরিক্রমার মধ্যে দিয়ে একে আবিষ্কার করেছেন তিনি। কিন্তু আবিষ্কার করেছেন তার আশপাশের প্রতিটি মানুষের মধ্যে দিয়ে। কী ভীষণ মর্মরিত প্রতিটি মানুষের স্মৃতি এবং তার সারসংক্ষেপ :

অবশেষে জেনেছি মানুষ একা!

জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা!

দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনদিন।...

দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে

কেবল দিব্যতাদূষ্ট শোণিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি

সেখানেও বসে আছে একা বৃক্ষের মতোন একা একজন লোক

যাকে ঘিরে বিশজন দেবদূত গাইছে কেবলি

শত জীবনের শত কুহেলি ও কুয়াশার গান!

পাখি হয়ে যায় এ প্রাণ ঐ কুহেলী মাঠের প্রান্তরে হে দেবদূত!

(পাখি হয়ে যায় প্রাণ)

উপলব্ধি করেছেন এক নির্মম সত্য, যা তাকে আরও নিঃসঙ্গ করে ফেলেছে :

প্রিয়তম পাতাগুলি ঝরে যাবে মনেও রাখবে না

আমি কে- কী ছিলাম কেন আমি

সংসারী না হয়ে খুব রাগ করে হয়েছি সন্ন্যাসী

হয়েছি হিরণ দাহ, হয়েছি বিজন ব্যথা, হয়েছি আগুন।

আর এই সত্যই যেন তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে নিজের ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। যে স্বীকারোক্তির কাব্যভাষ বরং সুপ্রতিষ্ঠিত করে রেখে গেছে পরিণত এক কবিই তিনি :

আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি, আমি সত্যি মূর্খ, আকাট!

সচ্চরিত্র ফুল আমি যত বাগানের মোড়ে লিখতে যাই, দেখি

আমার কলম খুলে পড়ে যায় বিষ পিঁপড়ে, বিষের পুতুল!

(আমার হবে না, আমি বুঝে গেছি)

আর ব্যর্থতার সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও তিনি পারেন জীবনকে জাগাতে :

আমার অনলে আজ জাগো তবে হে জীবন, জয়শ্রী জীবন!

(জলসত্তা)

নিজের নিঃসঙ্গতাকে স্পর্ধিতও করে তুলেছেন তিনি :

আমার পায়ের সমান পৃথিবী কোথাও পাইনি, অভিমানে আমি

অভিমানে তাই

চক্ষু উপড়ে চড়–ইয়ের মতো মানুষের পাশে ঝরিয়েছি শাদা শুভ্র পালক

(গোলাপের নিচে হে নিহত কবি কিশোর)

কিংবা ধরা যাক, এইখানে :

তোমাকে ছুঁতে না পেরে

আমি নিজ নিয়তির অন্তর্গত রোদনকে বললাম, দ্যাখো

আমি আর কাঁদতে পারব না!

(ঘুমোবার আগে)

কিন্তু কেবল এমন নিঃসঙ্গতা কিংবা একাকিত্ব নয়- কবিতার অন্তর্লীন ইতিহাসবোধও প্রবহমান তাঁর কবিতায়। আর তার এই ইতিহাসবোধের সঙ্গে ব্যক্তিক অসহায়ত্ব এত নিবিড়ভাবে মিশে থাকে যে, তা একই সঙ্গে গণমানুষের কবিতার উচ্চমার্গীয় সংজ্ঞায় পরিণত হয়। আবুল হাসানের সঙ্গে খুব কম পরিচিত পাঠকও বোধকরি এই কবিতাটি পড়েছেন, অনুভব করেছেন সেটির অনবদ্য সারল্য :

আমার চোয়ালে রক্তের দাগ হে অর্জুন,

আমি জানতাম আমি ঠিকই জানতাম...

এই কবিতা আমাদের নিয়ে যায় ইতিহাসের কাছে, নিজেকে স্পর্শ করতে করতে ইতিহাসকেও যে কী তীব্রভাবে স্পর্শ করা যায়, এই কবিতা থেকে তা বার বার অনুভব করি আমরা। মাত্র এক দশকের কাব্যজীবনও নিয়ে আবুল হাসান স্থির অকম্পিত চোখে তাকান বাংলা কবিতার পাঠকের দিকে।

তিন.

এতদিন পরে ব্যক্তিগত এইসব চকিত উদ্ভাসনও বলা যায় বোধহয়- এমন এক সময় ছিল, আবুল হাসান আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী ছিলেন। এখনও নিশ্চয়ই আছেন। কিন্তু সেইসব প্রখর দিনগুলোর কথা ভুলি কী করে! আমাদের এক বন্ধু তার বুকপকেটে নিয়ে ঘুরতেন, ‘আমি অনেক কষ্টে আছি’। রাজশাহীর প্রচ- রুক্ষ দুপুরে কোনও কোনও সময় দেখা হয়ে যেত ফয়জুল ইসলামের সঙ্গে, পশ্চিম পাড়া থেকে আসছে সে ঈর্ষণীয় সহপাঠিনীর সঙ্গে লাইব্রেরিতে যাবে বলে; অথবা কলাভবন থেকে বেরিয়ে বসে আছে গগণশিরিষীপথ কিংবা জারুলপথের ধারে। কাছেই যেন অন্তহীন চোরকাটাভর্তি পশ্চিম পাড়ার মাঠ। অন্য কেউ সঙ্গে না থাকলে সে কবিতার পংক্তি আওড়াতো- আবুল হাসানের কবিতা :

দুপুর ঘুরে কিশোর তুমি বিকেলবেলায়

বাড়ি ফিরলে ক্লান্ত দেখায় ক্লান্ত দেখায়।

ক্লান্ত মুখটি ক্লান্ত দেখায়, ক্লান্ত চোখটি ক্লান্ত দেখায়।

দুপুর ঘুরে কিশোর তুমি বিকেলবেলায়

বাড়ি ফিরলে ক্লান্ত দেখায়! ক্লান্ত দেখায়! ...

উত্তোলিত হাতের মুষ্ঠি, কী তুমি চাও?

সর্বনাশ? না সুহৃদ আকাশ? ফিরে তাকাও না, রাস্তা চলো?

(ক্লান্ত কিশোর তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখায়)

অথবা কোনও রাতে হলের কাছে, পথের ধারে দেখা হলে সে বলে উঠত :

এত রাতে কে যায় ধুলোর রাস্তা? কে যায় বিবর্ণ ঘাস?

কে যায় আগুন? বলো এত রাতে কে যায় পাহারাঅলা?

বলো, বলো, বলো তুমি হে রাত, হে তুমুল দুর্দিন

কাকে তুমি যেতে দাও? হে ধুলো, বিবর্ণ ঘাস, কাকে রাখো?

কাকে ফেলে দাও উচ্ছিষ্ট ভাতের মতো? কুকুরের মতো?

অথবা আবুর দোকানের সামনে টলটলে পুকুরের কাছে পাতার ঘূর্ণিওঠা বাতাস ঠেলতে ঠেলতে দিনের পর দিন আমরা বসে পড়তাম ঘাসের ওপর। বাতাসে ভেসে আসছে একের পর এক মৃত্যুর সংবাদ। আশা ঝরে পড়ার সংবাদ। ভাঙনের সংবাদ। কবিতার কানে কান পাততেন রাজা হাসান :

পাতাকুড়োনীর মেয়ে তুমি কী কুড়োচ্ছো? মানুষ, আমি মানুষ কুড়োই।

আহত সব নিহত সব মানুষ কারা বাক্স খুলে ঝরায় তাদের রাস্তাঘাটে।

পঙ্গু- তবু পুণ্যেভরা পুষ্প : তাদের কুড়োই আমি- দুঃখ কুড়োই!

(ধরিত্রী)

কখনও ভীষণ ক্ষিপ্ত তিনি, আমাদের দেখিয়ে দিতেন কবির একেবারেই ভিন্ন কবিতার গাঁথুনি :

দৃশ্য মধ্যে অহরহ পরস্পরকে খুঁজে আবার কোথায় হই প্রতিধ্বনিত

আমার নিজ কণ্ঠস্বরে অন্য কাউকে ডেকে ফিরছি। ছেঁড়া চক্ষু ভাঙা গলা

দেখে যাচ্ছি, শুনে যাচ্ছি, একই বৃত্তে পরস্পরকে একই সঙ্গে এক আসরে

অথচ দ্যাখো আমরা কেউ চিনি না কাউকে ব্যক্তিগত পোশাক পরলে।

(ব্যক্তিগত পোশাক পরলে)

হোক চর্বিতচর্বণ, কিন্তু প্রায়ই ফিরে ফিরে আসেন আবুল হাসান- আমাদের আড্ডায়, আমাদের কথপোকথনে। ফ্রয়েড নিয়ে কথা হচ্ছে, কথা হচ্ছে মার্কসের অ্যালিয়েনেশান নিয়ে- কিন্তু হানা দেয় আবুল হাসান, হানা দেয় তাঁর ‘নিঃসঙ্গতা’ :

অতটুকু চায়নি বালিকা!

অত শোভা, অত স্বাধীনতা!

চেয়েছিল আরো কিছু কম,

আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে

বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল

মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!

আর অপার্থিব তারুণ্য থেকে আমরা অর্জন করি যে নিষ্পাপ বেদনা, তা থেকে উগলে আসে ব্যক্তিগত সুখদুঃখের পাঁচালি, আসে ‘যুগলসন্ধি’র অপর উচ্চারণ :

দেখা হলো যদি আমাদের দুর্দিনে

আমি চুম্বনে চাইব না অমরতা

আমাদের প্রেম হোক বিষে জর্জর

সর্পচূড়ায় আমরা তো বাধি বাসা।

আর আমরা যা দেখেছি, তা-ই দেখে গেছেন আবুল হাসান, আমরা জেনেছি ‘পাতকী সংবাদ’ আর ছুটি চেয়েছি ‘এই শিল্প, এই সামাজিক ফুল, হুলস্থূল সমিতিপ্রধান যুগ, রৌদ্র আর রাত্রিভুক অবসাদ’ থেকে। ‘চামেলী হাতের নিম্নমানের মানুষ’- সে তো আমাদেরই পারিবারিক কথন। আমাদের সঙ্গেই ঘোরাফেরা তার। জনককে আর কে পেরেছে এমন সৌন্দর্যময় করে তুলতে, কে আর পেরেছে এভাবে অনুভব করাতে :

একটি ছেলে ঘুরে বেড়ায় কবির মতো কুখ্যাত সব পাড়ায় পাড়ায়

আর ছেলেরা সবাই যে যার স্বার্থ নিয়ে সরে দাঁড়ায়

বাবা একলা শিরঃদাঁড়ায় দাঁড়িয়ে থাকেন, কী যে ভাবেন,

প্রায়ই তিনি রাত্রি জাগেন, বসে থাকেন চেয়ার নিয়ে

চামেলী হাতে ব্যর্থ মানুষ, নিম্নমানের মানুষ!

(চামেলী হাতে নিম্নমানের মানুষ)

আমরা যখন রাকসুতে, সাহিত্য সপ্তাহে আলোচনার একটি পর্ব ছিল আবুল হাসানকে নিয়ে। তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন জুলফিকার মতিন। সে আলোচনা পরে তাঁর একটি গ্রন্থভুক্তও হয়েছিল। এই সাহিত্য সপ্তাহে অংশগ্রহণের জন্যে তখন আমন্ত্রণ জানাতে গিয়েছিলাম প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক সনৎকুমার সাহাকে। তিনি সম্ভবত চট্টগ্রামে একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির কারণে থাকতে পারেননি। কিন্তু খুব কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, এই আলোচনার মধ্যে তোমরা জীবনানন্দ দাশ আর আবুল হাসানকে রেখেছো কেন? মানে এই যে বেগম রোকেয়া, সোমেন চন্দ, শহীদুল্লা কায়সার, শহীদ সাবের, এদের মতো লেখকের মধ্যে তাদের মতো বিচ্ছিন্নতাবোধে আক্রান্ত লেখক কেন?’ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই অবশ্য; উত্তরটা ঠোঁটেও এসেছিল, কিন্তু বলা হয়নি, ‘বিচ্ছিন্নতাবোধও কি কখনো শক্তি হয়ে ওঠে না?’ স্যার অবশ্য উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করেই বলেছিলেন, ‘যাই হোক, আমার তো অনুষ্ঠানে থাকাই হচ্ছে না।’ আলোচনার মঞ্চে আবুল হাসানের ছবি এঁকেছিল আমাদের আরেক বন্ধু লিখন রহমান; আসলে প্রত্যেকের ছবিই সে এঁকেছিল। আর্ট বোর্ডে আঁকা ছবিগুলো যতœ করে রাখতে পারব না ভেবে যে বন্ধুকে দেয়া হয়েছিল, তার এখন এসব মনে আছে কি না, বলা কঠিন।

তার পর আমরা ঢাকায় এসে মফস্বলের ঘ্রাণ ছড়াতে থাকি। ধ্রুব এষ আর শওকত আলী তারার সঙ্গে আমি তখন এলিফ্যান্ট রোডের এক বাসায় থাকি। ওই সময়েই বের হলো আবুল হাসানের রচনাসমগ্র। বইয়ের প্রচ্ছদের জন্য একেকজন একেক রঙে নিজেদের হাত রাঙিয়ে পাশাপাশি রাখলাম আমরা তিনজন ছাড়াও বাড়িওয়ালার পুত্র তানজিম ও কনক। বেশ কয়েক সংস্করণ বেরুনোর পরও সেই প্রচ্ছদই এখনো ব্যবহার করা হয় বইটিতে, এখনো সে বই প্রকাশ পায় প্রথম সংস্করণের ভুলগুলোসমেত।

এভাবেই কেটেছে আমাদের দিন- কাটছে আমাদের দিন, আবুল হাসানকে সঙ্গী করে। বার্লিন থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে আসার পর বন্ধু কবি নির্মলেন্দু গুণের কাছে আবুল হাসান চিঠি লিখেছিলেন, ‘বার্লিন থেকে ফেরার পর আমি এই একাকিত্বই বিভিন্নজনের সান্নিধ্যে খুঁজতে চেষ্টা করেছি। যার জন্য আমি এক রমণীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম, কিন্তু এখন সেই শ্রীমতীও আমাকে আর একাকিত্ব দিতে পারেন না।’ ঠিক ওভাবে না বলা গেলেও এটা তো ঠিক, আবুল হাসান আছেন বলেই একাকিত্ব আমাদের গ্রাস করে না, যদিও আমরা পরিভ্রমণ করি একাকিত্বের ভেতর দিয়ে। এখনো তো নিজেকে প্রশ্ন করি, করতে পারি, ‘মাটির ভিতরে তুমি সুগভীর একটি স্বদেশ রেখে কেন কাঁদো?/বৃক্ষ রেখে কেন কাঁদো? বীজ রেখে কেন কাঁদো? কেন কাঁদো তুমি?’। বার বার কাঁদি, আর প্রশ্ন করি, কত যে শক্তি হারাই, কিন্তু এই শক্তি হারাই না।

  • একাকিত্বে ও আমার একান্ত স্বজন

    মাসুদার রহমান

    newsimage

    প্রিয় কবি! এই অভিধাটি নিয়ে এ পর্যন্ত আমার কোন ভাবনা নেই। এই মুহূর্তে লিখতে বসে তা নিয়ে ভাবনা ও ধন্ধে পড়া গেল। প্রিয় কবি; এই

  • আবুল হাসানের কবিতায় দুঃখবোধের বৈচিত্র্য

    অনন্ত মাহফুজ

    newsimage

    জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা। দৃশ্যের বিপরীত

  • উড়াল

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    অফিস শেষ করে জ্যাম ঠেলে মতিঝিল থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সাতটা বেজে যায়। জামাকাপড় খুলে মুখ হাত ধুতে

  • সুহিতা সুলতানার কবিতা

    newsimage

    এমন বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় স্তব্ধতা নেমে আসে দক্ষিণ দিগন্ত বেয়ে; বিশ্বাস অবিশ্বাসের জলে ভেসে বেড়ায় শাদা হাঁস যদিও ভয়ঙ্কর শীত নামেনি এখনও

  • ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনি : চার

    সিমলা-মানালির পথে

    কামরুল হাসান

    newsimage

    সেন্ট্রাল বাসস্টপে যাত্রা বিরতি ১৫ মিনিট। আমি এ সুযোগে নিচে নেমে ডাবল

  • সাময়িকী কবিতা

    কখনও-সখনও, অবেলায় নদীপাড়ে, নীল প্রজাপতি