menu

ঊষা ও গামিনি

বিক্ষত সময়ের ভাষ্য

পীযূষ কান্তি বড়ুয়া

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

‘ঊষা ও গামিনি’ কাব্যগ্রন্থটি তরুণ কবি সৌম্য সালেক-এর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যা তার ‘আত্মখুনের স্কেচ’ কাব্যগ্রন্থের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বলা চলে। ‘ঊষা ও গামিনি’ গ্রন্থের ভাষাভঙ্গি পরিচিত হলেও তা কবির নিজস্ব। অপরিচিত শব্দগুচ্ছকে কবি আপন প্রকৌশলে পরিচিত করে তুলেছেন যথা প্রয়োগে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কতিপয় শব্দগুচ্ছের প্রতি অমিতব্যয়ী প্রীতি কবির স্নেহাতুর মননের স্মারক। অধিকাংশ কবিতার অন্তর্নিহিত ভাব হচ্ছে পরিতাপ। কবি ছত্রে ছত্রে পরিতাপের অনুশোচনায় পরিশুদ্ধ হতে চেয়েছেন। অনুশোচনার অনলে দগ্ধ হয়ে কবি একারণেই বলেছেন দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে: ‘এবার তিক্ততা চাই, চাই পরাজয়।’

কবি পরিতাপদগ্ধ হয়ে প্রীতির ব্যুহ ছিঁড়ে ইচ্ছামৃত্যুর ঘোরে আচ্ছন্ন থেকে বলেন- ‘প্রীতি ও পরিণয় শেষে কালঘুমে পেয়ে যায় ইচ্ছামৃত্যুর অভিলাষ।’

কবির ভাবনামালা যেন খেয়ালি নদীর স্রোত। খেয়ালি কবি নিঃসঙ্গ হলেও যেতে চান দূরে: ‘খেয়ালের নদী যাবে দূর একা/ একা মাঝি, একা জলযান...।’

সৌম্য সালেকের কবিতায় কখনো কখনো বিরামের ঘাটতি দেখা যায়। বেশকিছু কবিতায় যতি চিহ্নের দেখা মেলেনি। এটা তার অন্তর্গত অস্থিরতার বহির্প্রকাশও হতে পারে। কেননা একটানা সুখের সাগরে অবগাহন মানুষের অস্থিরতার নিমিত্ত হয়ে দাঁড়ায়। কবির কাছে এই সত্যই মূর্ত হয়ে ওঠে। তাই তিনি বিমুক্তি দেন আপন অন্তরের গহীন বাসনাকে- ‘বিধি ও সংঘারাম ছেড়ে কেউ চলে/ রোদনের পথে/ কেউ চায় নগ্ন-বিষাদ / কেউ চায় হারের পৃথিবী...।’ (হিম ও পালকের গান)

কবি কখনো কখনো তৈরি করেন মিথ। মিথ দিয়েই তিনি স্বপ্ন আঁকেন কবিতার ভুবনে।

‘সোনার মহিষ’, কবিতায় দেখা যায় সেই প্রয়াস: ‘রোজ স্বপ্নে এসে হানা দেয় সোনার মহিষ/ চারপায়ে ধেয়ে আসা পালের যোজন খেলা করে...’

তরুণ কবি বয়সের প্রগলভতায় আক্রান্ত হয়ে মোহমুগ্ধতায় ভোগেন। তা তিনি অকপট স্বীকার করে নেন কবিতার ছত্রে ছত্রে- ‘কান্নায় অচেতন চোখ কাল স্পর্শ করেছে এক মোহ’ (গত রাত্তির ভার)।

কবি যত ভাব মনে বহন করেন তত ভাবের ভার তিনি মুক্ত হতে পারেন না। এইসব ভাবের বাস তার চিন্তার অতল গহীনে। এদের ভাষা দেয়া তার পক্ষে কঠিন বৈকি। অতৃপ্তির এক বোধ হতে তাই সৌম্য সালেক এক সময় বলে ফেলেন: ‘আমি যা বলতে অক্ষম তার নাম কবিতা।’

মানুষ মাত্রেই মিলন-বিচ্ছেদের ভবচক্রের নির্মাণ। কবিও তার ব্যতিক্রম নন। তার জীবনে মিলনের চেয়ে বিচ্ছেদের প্রতাপ বেশি। কখনো কখনো অসিদ্ধ মিলন তাকে পরিতাপের আগুনে পোড়ালেও কিছু কাক্সিক্ষত বিচ্ছেদ তাকে দেয় পূর্ণতা। যদিও তার, ‘হৃদয় কাঁপছে বিচ্ছেদ ব্যতিহারে’, কিন্তু তাতেও কবি অতৃপ্ত নন।

কবিতায় কবি অনেকাংশে দেহবাদী। তিনি দেহজ অনুভূতির স্রোতে কবিতার সুর খোঁজেন। তাই অবলীলায় বলতে পারেন: ‘ধরো/ বলতেই স্পর্শে নিলাম আবৃত কুসুম, লকলকে জিভ/ তার অনাবাদি গোপনসমূহ।’ (আদিষ্ট অধ্যায়)

কবির কবিতা কখনো ধারণ করে প্রকৃতির মুখ, তৈরি করে অনন্ত মায়া। ‘ভাটির ভাসান’ কবিতায় খুঁজে পাই তারই প্রশান্তি- ‘মুখোমুখি খেলে যায় সন্ধ্যার আবাহনী আর শ্রান্ত পালের ছায়া’

কবিকে ছুঁয়ে যায় সমকালীনতা, পরিতাপী আবহের মাঝেও দুহাজার সতের সালে রোহিঙ্গাদের নির্যাতিত হওয়ার বেদনায় কবি লিখেছেন- ‘আমাকে হত্যা করে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে নাফ নদীতে/ অতিক্রান্ত রক্তস্রোতে ভেসে যাচ্ছে আমার স্বজন।’

যদিও কবি স্বাজাত্যবোধের অনুভূতির প্রখরতায় ভুগেছেন, কিন্তু তার এই আক্ষেপের মাঝে মূর্ত হয়ে ওঠে মানবিকতা। ইয়েমেনের বোমাবিধ্বস্ত সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনের অধিকার চেয়ে কবি উচ্চকিত হয়ে বলেন- ‘ঈর্ষার নগ্ন-পীড়নে জ্বলে-পুড়ে যারা রণক্ষেত্রে আসে/ তাদের কোনও পরিচয় নেই, তাদের কোনও সিদ্ধি নেই।’ (ইয়েমেনের চাষীরা কেবল শস্য ফলাতে চায়।)

অশান্ত মধ্যপ্রাচ্যের কান্না আর বোমার ধোঁয়ায় পীড়িত কবি ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ জানিয়ে, ধ্বংসাত্মক-যুদ্ধের অবসান চেয়ে বলেন: ‘নীলিমা ক্ষয়ে গেছে- ধোঁয়ার প্রতাপ/ মধ্যম পরিধিজুড়ে রক্ত আর হাড়ের সমাধি।’

সকল যুগে, সকল দেশে মহান শহীদেরা মানুষের মনে তৈরি করে চেতনার বাতিঘর, আনে মনোবলের অন্তহীন ফল্গুধারা।‘শহীদেরা’ কবিতায় কবি সেই সত্যের পুনরুচ্চারণ করে বলেন:

‘শহীদেরা চিরদিন সাহসের পাঠশালা।’

প্রতীক্ষা মাত্রেই প্রেমিকের পীড়নরাগের উৎস। প্রিয়ার চিঠির প্রতীক্ষায় থেকে থেকে কবি নিজেকেই সান্ত¡না দেন ‘কোনও এক মধুময় মাসে তোমার পত্র এসে পৌঁছে যাবে’ পংক্তির মাধ্যমে।

শীতের সন্ন্যাস, তার কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় বসন্তের প্রতীক্ষায়। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন- ‘শিমুলের ডালে ডালে সুবর্ণকীর্তন হবে ভ্রমরের।’

চিত্রকল্প নির্মাণে কবি বেশ সিদ্ধির পরিচয় দিয়েছেন। জলপট, ঘর্মাক্ত ফুলের আঁচল, ডানাপন্থী মেঘের বিলাপ, অগণ্য বায়ুর ঘূর্ণিপাক, ইথারের মগ্ন কলহ ইত্যাদির মাধ্যমে কবি তার কবিতাকে চিত্ররূপময়তার দিকে টেনে নিতে পেরেছেন। লোকায়ত ঘুম কিংবা বাংলার সদয় জীবন- এ জাতীয় পদবাচ্যে কবি খুব চমৎকারভাবে তার ঐতিহ্যপন্থী চিন্তামালাকে তুলে ধরেছেন। মাঝে মাঝে মনে হয় সৌম্য মনন নির্মাণের রসায়নে বিস্রস্ত, ‘উচ্ছন্নে যাওয়ার আগেভাগে’ কবিতাটি এরকম এক অনুভূতি এনে দেয় পাঠকের মনে। কবিতার ভূমিতে কবি এক শব্দচাষী।

সৌম্য যদিও তার কবিতায় আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির বিড়ম্বনা তুলে ধরেছেন ‘হ্যাকার’ কবিতার মাধ্যমে; তবে ‘ট্রায়াল’, ‘হ্যাকার’ শিরোনামীয় শব্দাবলির সংযুক্তি বাংলা শব্দভান্ডারকে অপূর্ণ বলে প্রকাশ করে না।

যতি ও মুদ্রণ প্রমাদজনিত বিভ্রাট ‘ঊষা ও গামিনি’-কে যেমন নিখুঁত রাখতে পারেনি, তেমনি দুয়েকটি কবিতা ‘সাতমাসী’ বলেও প্রতীয়মান হয়েছে। ‘ঊষা ও গামিনি’ কাব্যগ্রন্থের কিছুটা পটভূমি শুরুতে মলাটের ফ্ল্যাপের মর্মপাঠে উৎকীর্ণ থাকলেও সাধারণ পাঠকের কাছে নামের সহজবোধ্যতা বজায় থাকেনি। এবিষয়ে কবির সরল ভাষ্য থাকলে সাধারণ পাঠকের কবিতার সুরে ঐকতানিক হওয়া সহজ হতো।

সৌম্য সালেকের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, সূচনার পরিতাপ ও মধ্যভাগের মানবিক আর্তি ছাপিয়ে শেষ অংশে এসে খুঁজে পেয়েছে তার মৌলিক ভাষ্য। পৃথিবী আজ উজাড় হয়ে যাচ্ছে হৃদয়বৃত্তির দিক হতে। যান্ত্রিকতার যন্ত্রণায় কাতর পৃথিবীর আজ হৃদয় বলে কিছু নেই। কবি এই প্রমিত সত্যকে ধারণ করেই ‘ঊষা ও গামিনি’র মূল বক্তব্য তুলে ধরেছেন: ‘আজ বৃক্ষ বনবাসী নয়, আমাদের হৃদয় বনবাসে।’ (হৃদয় বনবাসে)

ঊষা ও গামিনি ॥ সৌম্য সালেক ॥ প্রচ্ছদ : মোমিনউদ্দিন খালেদ ॥ প্রকাশকাল : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৮॥ প্রকাশনক : দেশজ প্রকাশন।