menu

বাংলা অনুবাদে নওশাদ নূরীর কবিতা

ওবায়েদ আকাশ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ এপ্রিল ২০১৯
image

কবিতা কোথায়? কবিতা কাকে গ্রাস করে? কবি কেন কবিতার দাসত্ব করে? কিংবা, কবিতা কেন কবিতেই হয় নিবেদিত? এত সব প্রশ্ন করা যায় কবিতাকে ঘিরে। কবিতা যেমন চারপাশে, তেমনি কবিতা কবির অন্তরে বিরাজে। স্বভূমির প্রকৃতিকন্যা যাকে গ্রাস করেছে, আচার অনাচার রাজনীতি ঐতিহ্য যাকে গ্রাস করেছে, কবিতা তাকে গ্রাস করে। কবিতা তার কাছে কবিতার রূপে নিষ্কৃতি পায়। কবি তাকে লালন করেন, উন্মোচন করেন এবং তার কাছে ঋণগ্রস্ত হন নির্দ্বিধায়। আর কবি কবিতাকে এভাবে পেয়েই আপ্লুত। তাই কবিতা কবিতে নিবেদিত। অত্যন্ত প্রভাবশালী উর্দুভাষী কবি নওশাদ নূরীকে গ্রাস করেছিল তার দেশপ্রেম, স্বভূমি ভারতের সকল রীতিপ্রকৃতি। দেশের উত্থান-পতন ভাঙচুর কিংবা জয় পরাজয় তাকে তাড়িত করেছে, ভাবিত করেছে দেশের মান অপমান।

সদ্যপ্রাপ্ত স্বাধীনতাকে ঐশ্বর্যমন্ডিত করতে তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহের লাল নেহরু যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দান ভান্ডারের দিকে দৃষ্টি ফেলেছিলেন, এবং এ লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরে গিয়েছিলেন, তখন কবি নওশাদ নিজের দেশের এই নতজানু বৃত্তিকে সহ্য করতে পারেননি। তিনি মনে করতেন, তাঁর দেশ ভারত পৃথিবীর সবার উপরে, সেই দেশ যখন আমেরিকার করুণার প্রত্যাশায়, তখন কবি ব্যথিত হন। এবং তাঁর ভেতরে প্রতিবাদের ভাষা তুলে দেয় কবিতা। নিজের দেশের অপমানের যন্ত্রণা ঘোচাতে তিনি উচ্চারণ করেন-

ভারত পৃথিবীতে সবার ওপরে এর সম্মান সব কালে মহান

হাত পেতে বহুক্ষণ হলো দাঁড়িয়ে আছে ক্ষুধার্ত হিন্দুস্তান

ওয়াশিংটনের গলিগুলোতে আজ ভারত হচ্ছে নিলাম

করুণা করো ভিক্ষে দাও দানবীর সীতা রাম

[ভিক্ষুক, অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান, পৃ: ১৯]

এমন উচ্চারণ যে কবির, সে কবি সম্পর্কে, তার কাব্যজিজ্ঞাসা সম্পর্কে আর কিছু বলবার থাকে না। একজন কবির কাছে কোনো জাতির এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা থাকে না। কিন্তু কবিরা যতই জনমানুষের কথা বলেন, ততই শাসকশ্রেণির বিরাগভাজন হন। নওশাদ নূরীর জন্য জারি করা হলো গ্রেফতারি পরোয়ানা। গ্রেফতার এড়াতে তিনি বাংলাদেশে চলে এলেন। ভালবাসলেন বাংলাকে, ভালবাসলেন বাংলার মানুষকে। বাংলার কবিতা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে। মুক্তমনা, উদারমনা রাজনীতি-সহযোদ্ধাদের হলেন পরম বন্ধু। সময়ের প্রয়োজনে লিখলেন প্রচুর কবিতা। বোদ্ধা বাঙালি পাঠক যারা উর্দু বোঝেন, কিংবা প্রকৃতই যারা উর্দু পাঠক সবার কাছে আবির্ভূত হলেন একজন উচ্চমার্গীয় কবি হিসেবে। তার কবিতা প্রকৃত শিল্পের দাবি পূরণে সক্ষম। তাঁর কবিতা সমালোচক থেকে কাব্য বিশেষজ্ঞ সবার কাছে মূল্যায়িত হলো সসম্মানে।

২০০০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হলো নওশাদ নূরীর কবিতা সংকলন। এখানে খুব বেশি কবিতা ঠাঁই পায়নি। বাই ল্যাঙ্গুয়াল এই বইটি প্রকাশিত হয়েছে উর্দু ও বাংলা ভাষায়। অনুবাদ করেছেন দেশের স্বনামখ্যাত কবি-লেখকগণ। অনুবাদ করেছেন - মোহাম্মদ হাসান, বশীর আল হেলাল, আসাদ চৌধুরী, জাফর আলম, আল মুজাহিদী, মিজারুল কায়েস, হাইকেল হাশমী, মোহাম্মদ হাসান ও ইনায়াতুল্লাহ সিদ্দিকী। এরা প্রত্যেকেই উর্দু ভাষায় বিশেষভাবে দক্ষ ও সাহিত্যাঙ্গনের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। কবিতার পাশাপাশি মোহাম্মদ হাসান কয়েকটি গজলেরও অনুবাদ করেছেন।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নির্মম হত্যার পর অনেকেই সেদিন কলম হাতে নিতে সাহস করেন নি। হাতেগোনা কয়েকটি কবিতা তখন রচিত হয়েছিল। এদের মধ্যে নওশাদ নূরীও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ‘উত্থান উৎস’ নামে রচনা করেন কবিতা।

অবশ্য পরবর্তীতে অনেকেই লিখেছেন এবং লিখছেন। এ দায় থেকে প্রকৃত কবি লেখকগণ মুক্ত হতে পারেননি। মুক্ত হতে পারেননি নওশাদ নূরীও।

সে তো নিজেই উত্থান, উত্থানের অভ্রান্ত দৃষ্টান্ত-

সে আছে, সে আছে-

সর্বদা হাজির সে যে, অফুরান শক্তি হয়ে

সে আছে, সে আছে-

সে অমর, মৃত্যুঞ্জয়ী, মৃত্যু নেই তার।

[অনুবাদ : আসাদ চৌধুরী, পৃষ্ঠা: ৩৩]

১৭ মার্চ টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুকে দাফনের পরে তিনি আরো একটি কবিতা লেখেন। এবং সেটির নাম দেন ‘টুঙ্গিপাড়া’। এটিরও অনুবাদ করেন আসাদ চৌধুরী। প্রকৃত কবির কলম যে সময়ের প্রয়োজনে থেমে থাকতে পারে না, কবি নওশাদ নূরী বারবার সে প্রমাণ দিয়েছেন। তিনি কবিতা লিখেছেন, মে দিবস নিয়ে, ছাব্বিশে মার্চ নিয়ে, এমনকি ১৯৭২ সালে কাজী নজরুল ইসলামকে প্রথম ঢাকায় দেখার পরও তিনি সেই অনুভূতি কবিতায় প্রকাশ করেন।

যুগ চেতনা কিংবা সময় চেতনার প্রকৃষ্ট উদারহরণ তার কবিতা। তার সঙ্গে সংযোগ ঘটেছে প্রেমের। এ প্রেম অন্য রকম। এ যেন ঠিক প্রেম নয়, নিজের সাথে, কবিতার সাথে, খ্যাতির সাথে এক ধরনের সম্পৃক্তির ভেতর দিয়ে জাগিয়ে তোলা আগামীকে।

সময়কে শব্দের আকারে পেশ করেছি

তোমার ঠোঁট ও মুখের প্রশংসার বর্ণনায়

তোমার নরম পায়ে চলার গতির প্রশংসা

সময়ের হিরকে আমি টাঙিয়ে রেখেছি।

... ... ...

সময়ের আদলকে সাক্ষী রেখে

যুগের সাথে সময়ের সংযোগ রেখেছি।

মিষ্টি চুম্বনের মতো নিশ্বাসের উষ্ণতা

কল্পনার সৃষ্টিকে খ্যাতির সাথে সম্পৃক্ত রেখেছি।

[ভূমিকা, অনুবাদ জাফর আলম, পৃ: ৫৭]

তৃতীয় বিশ্বের মানুষের আশা ও তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের তুলনা করা হয়েছে আগ্নেয়গিরির নিচে ঘুমন্ত আগুনের সঙ্গে। এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পথ রুদ্ধ করে রেখেছে সমুদ্র। এখানকার মানুষ দিনে কল্পনা করে আর রাতে স্বপ্ন দেখে। চলমান দিন শেষে তাদের দুঃখ ভেসে ওঠে সমরূপে। এই সব স্বপ্নকামী বিপ্লবী সংগ্রামী মানুষের চিন্তায় কৃষ্ণকায় ঝিনুক আর ভেতরে আশার বালুকণা। কী অদ্ভুত আর অসামান্য দৃষ্টি ও দর্শন দিয়ে কবি এই অঞ্চলের মানুষের মানচিত্র এঁকেছেন! যেখানে বাস করে স্বপ্নবাজ কল্পনাবিলাসী মানুষ। কিন্তু তাদের ভেতরে যে অগ্নিকুন্ড সুপ্তায়িত, তা কিন্তু নেহাত অগ্রাহ্য করবার নয়। সময়ের প্রয়োজনে তারা আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলে ওঠে। এরা প্রয়োজনে স্বপ্নের বাস্তবায়নে একদিন অশান্ত ও শৃঙ্খলহীন প্রমত্ত হতে পারে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে জ্বলে উঠতে পারে বারুদসম।

এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্তে এক বিশাল

সমুদ্র রেখেছে পথরুদ্ধ।

ভেজা ভেজা সমুদ্র সৈকতে

চিন্তার কৃষ্ণকায় ঝিনুক ছড়িয়ে

উজ্জ্বল আশার বালুকণা ছিটিয়ে।

... ... ...

ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির নিচে

সক্রিয় লাভার উত্তাপ,

তৃতীয় বিশ্বের আশা

তৃতীয় বিশ্বের লোক।

[তৃতীয় বিশ্ব, অনুবাদ : হাইকেল হাশমী, পৃ: ৬৯]

কবি নওশাদ নূরী জানেন কবিকে কোথায় সোচ্চার হতে হয়, রাষ্ট্র ও সমাজ পরিস্থিতির কোন কোন ক্ষতগুলো শনাক্ত করতে হয়। কোন কোন চিহ্নকে নির্দিষ্ট করে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়।

মোহাম্মদ হাসান অনূদিত গজলগুলোতে প্রেমের যে শশ্বাত সত্য উচ্চারিত হয়েছে, তা অনাদিকালের সত্যকে প্রতিভাত করে। ‘তুমি চলে গেলে, শহরের সব প্রদীপ নিভে গেল/ প্রতিটি প্রাসাদ, প্রতিটি ঘরে আহাজারি ছড়িয়ে পড়ল।’ [পৃ: ৭১]

নিঃসঙ্গতা, বিরহ-বিষাদ থেকে মানুষের চিরায়ত সম্পর্ক যেন অবিবার্য উচ্চারণ হয়ে ছড়িয়ে আছে প্রতিটি গজলের পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে।

অনূদিত কবিতার নির্মাণশৈলী থেকে শব্দ, নিরিখ, চিত্রকল্প, উপস্থাপনা, সমসাময়িক কাব্যভাষার গতি প্রকৃতি নিয়ে কথা বলা দুরূহ। কারণ কবিতা এমনই এক শিল্প, প্রকৃতার্থে যার অনুবাদ হয় না। তবে অনুবাদে যতটুকু প্রাপ্তি তা হচ্ছে বিষয় ও ভাবনার কাছাকাছি দূরত্ব দিয়ে হেঁটে যাবার কালে যৎসামান্য ঘ্রাণে আন্দোলিত হওয়া। এবং কবির কাব্যমানস উপলব্ধি করতে কোনো বেগ পেতে হয় না।

এদিক থেকে নওশাদ নূরীর কবিতার ভাবনা ও চিন্তারাজ্য যথার্থ উপলব্ধ হয়েছে। তার এই কবিতাগুলো আমাদের চিন্তায় সমৃদ্ধির ব্যঞ্জনা ছড়িয়েছে। ব্যক্তিগত শ্রমঘামে যারা এই কবিতাগুলি অনুবাদ করেছেন, তারা মূলত নওশাদ নূরীকে বৃহত্তর বাংলার পাঠকের কাছে যথার্থ মর্যাদা দিয়ে উপস্থাপন করেছেন। আর যারা উর্দু থেকে রসাস্বদন করতে পারবেন, তাদের জন্য এই গ্রন্থ প্রকাশ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।

নওশাদ নূরীর কবিতা ॥ সম্পাদনা : আইয়ুব হোসেন ও শামীম জামানভি ॥ প্রকাশক : হাক্কানী পাবলিশার্স ॥ প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০১০ ॥ মূল্য : ১২৫ টাকা।