menu

ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’

প্রান্তজনের দস্তাবেজ ও জাদু-বাস্তব কথকতা

আহাম্মেদ কবীর

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ জানুয়ারী ২০১৯
image

স্বপ্নতাড়িত জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক এবং প্রজন্মান্তর খোয়াব, সংগ্রাম, জীবনাচার, বাসনা, কামনা, বিলাস আর সীমিত প্রাপ্তিতে পরিতৃপ্ত মানুষেরই কি কাহিনি এ উপন্যাস? নাকি বলা যেতে পারেÑ বিভ্রাট, বিভ্রম আর জৈব জটিলতায় অথবা শতাব্দিব্যাপী শোষিত হয়েও নৈঃশব্দ্য ধারায় শুধু টিকে আছে বা টিকে থাকতে চায়Ñ তাদেরই কাহিনি এ উপন্যাস? কিংবা জমির অধিকার, আধিয়ার, তেভাগার প্রদীপ্ত-সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ মানুষের অধিকার আদায়ের অভিজ্ঞানই কি এ উপন্যাস? নতুবা ক্ষুধা ও খাদ্যপ্রাপ্তির ইচ্ছে এবং অধিকারে প্রাগ্রসর বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের জমে-ওঠা ক্ষোভ ও স্ফুলিঙ্গ কি এ উপন্যাসের মহাকাব্যিক ব্যাপকতা, বিস্তৃতি, বিন্যাস, বাস্তবতা নাকি আপাত বিরোধিতা এবং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ! ...কিন্তু মায়া ও প্যারাডক্সের বাস্তব অন্তর্মূলের প্রবেশক পাঠকশ্রেণি অবশ্য তমিজের বাপ, তমিজ ও তার কন্যাসন্তান সখিনা তথা তিন প্রজন্মের কাহিনিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইবেন। তবুও উপচেপড়া বিশ্বাস, ভাবনা ও আবেগের স্বকীয়তা তাকে তাড়িত করবেÑ উত্তরবঙ্গে মজনু শাহ-এর ফকির বিদ্রোহ কিংবা ভবানী পাঠকের সন্ন্যাস বিদ্রোহ তথা ১৯৪৭ সালের আগু-পিছু রাজনীতি, আন্দোলন, দাঙ্গা, সংগ্রাম আর কৃষক ও তৃণমূলের অধিকার ইত্যাদি অন্যান্য অনুষঙ্গে। তবে তারচেয়েও বিস্তৃত ও প্রাজ্ঞেয় সত্য হলোÑ এ উপন্যাসে বহু কিছু বলেও কোনকিছু না বলার পরিমিতি যেমন দৃশ্যমান ঠিক তেমনি চিরায়ত ধারাক্রমে বহুকিছু বারবার কিংবা বারংবার বলার বৈশিষ্ট্য-প্রোথিত অভিজ্ঞানও এখানে বক্ষ্যমাণ। তাই উপন্যাস নিয়ে বলার কিছু নেই বরং রয়েছে বারংবার পাঠের আবশ্যকতা।

ইলিয়াস তার উপন্যাস শুরু করেছেন- নাটকের সূত্রধর বা বিবেকের কথন-শৈলীতে নতুবা বলা যেতে পারে ‘বিযুক্তিকরণ তত্ত্বের’ দ্বান্দ্বিকতায় অর্থাৎ কয়েকটি বাক্যেই উপন্যাসের সারবস্তু উপস্থাপন? ...পুরোপুরি সে রকম না হলেও প্রশ্ন উঠতে পারেÑ উপন্যাসের শুরুতে অন্যতম প্রধান চরিত্র তমিজের বাপের দাঁড়ানো স্থানটির দিকে লেখক তার পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের কেন চেষ্টা করেছেন? তবে এই দৃষ্টি আকর্ষণও প্রথম পাঠে সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত না হলেও ক্রমে ক্রমে হয়তো বা বারংবার পাঠ ও মনোযোগের প্রেক্ষিতে পরিষ্কার হয়ে ওঠে স্থান, উপলক্ষ, ঘটনা, সময়, ইচ্ছে, স্বপ্ন, আকাক্সক্ষা আর প্রত্যাশার মতই। ... ইলিয়াসের বর্ণনা, যেমন “পায়ের পাতা কাদায় একটুখানি গেঁথে যেখানে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গলার রগ টানটান করে যতোটা পারে উঁচুতে তাকিয়ে গাঢ় ছাইরঙের মেঘ তাড়াতে তমিজের বাপ কালো কুচকুচে হাত দুটো নাড়ছিলো, ঐ জায়গাটা ভালো করে খেয়াল করা দরকার। অনেকদিন আগে, তখন তমিজের বাপ তো তমিজের বাপ, তার বাপেরও জন্ম হয়নি, তার দাদা বাঘাড় মাঝিরই তখনো দুনিয়ায় আসতে ঢের দেরি, বাঘাড় মাঝির দাদার বাপ না কি দাদারই জন্ম হয়েছে কি হয়নি, হলেও বন কেটে বসত করা বাড়ির নতুন মাটি ফেলা ভিটায় কেবল হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াচ্ছে, ঐসব দিনের এক বিকালবেলা মজনু শাহের বেশুমার ফকিরের সঙ্গে মহাস্থান কেল্লায় যাবার জন্যে করতোয়ার দিকে ছোটার সময় মুনসি বয়তুল্লা শাহ গোরা সেপাইদের সর্দার টেলরের বন্দুকের গুলিতে মরে পড়ে গিয়ে ছিল ঘোড়া থেকে। বন্দুকের গুলিতে ফুটো গলা তার আর পূরট হলো না। মরার পর সেই গলায় জড়ানো শেকল আর ছাইভস্মমাখা গতর নিয়ে মাছের নকশা আঁকা লোহার পান্টি হাতে সে উঠে বসলো কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে পাকুড়গাছের মাথায়। সেই তখন থেকে দিনের বেলা রোদের মধ্যে রোদ হয়ে সে ছড়িয়ে থাকে সারাটা বিলজুড়ে। আর রাতভর বিল শাসন করে ওই পাকুড় গাছের ওপর থেকেই। তাকে যদি এক নজর দেখা যায় এই আশায় তমিজের বাপ হাত নাড়াতে নাড়াতে আসমানের মেঘ খেদায়।...” অর্থাৎ সেই তাকে একনজর দেখার সদিচ্ছা। আর এই ইচ্ছের সূত্রেই যাপিত যে জীবন সে জীবনেরই কথকতা এ উপন্যাস। তবে তমিজের বাপের এ ভাবনা কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও বিকশিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ সমধর্মী আবেগ, বিশ্বাস, বাস্তবতা ও ভাবনা প্রকটিত হতে দেখা যায়- উপন্যাসের শেষদিকে, তমিজের কন্যাসন্তান সখিনার খোয়াব তথা ভাবনার প্রকাশে। সেও তার দাদার মতো চেয়ে আছে সেই দিকে, সেই আগ্রহে, হয়তোবা সেই বিশ্বাসে। লেখকের বর্ণনায়, “...মোষের দিঘির উঁচু পাড়ে লম্বা তালগাছের তলায় পুরনো উঁইঢিবির সামনে খটখটে শক্ত মাটিতে পাজোড়া জোরে চেপে রেখে ঘাড়ের রগ টানটান করে মাথা যতোটা পারে উঁচু করে চোখের নজর শানাতে শানাতে সখিনা তাকিয়ে থাকে কাৎলাহার বিলের উত্তর সিথানে জখম চাঁদের নিচে জ্বলতে-থাকা জোনাকির হেঁশেলের দিকে॥”

কী দেখছে সখিনা? ...

বইয়ের ব্লার্ব রচয়িতার মন্তব্য, ‘এখন সখিনার খোয়াব। খোয়াবনামা স্বপ্নের ব্যাখ্যাতা। কিন্তু স্বপ্নের ব্যাখ্যায় যা বিবেচ্য তা স্বপ্ন নয়, স্বপ্নদেখা মানুষ।’- অর্থাৎ স্বপ্ন নয় স্বপ্নদেখা মানুষের সার্বিক জীবনাচার অথবা বলা যায় তাদের আচরণ বিধি সম্পর্কে অবহিতকরণ ও তথ্য হিসেবে উপস্থাপনের নানাবিধ প্রয়াসই উপন্যাসের উপজীব্য। তবে এখানেই শেষ নয়। উপন্যাসের কাহিনি একমুখী নয়, কিংবা বহুমুখী বলাটা পুরো অর্থে সঠিক না হলেও মুখ ও মাত্রিকতা ভিন্নার্থে প্যারাডক্স। ইলিয়াসের উপন্যাসে প্রকরণ ও বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে ভারত-পাকিস্তান বিভাজন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, জমির অধিকার, তেভাগা আন্দোলন, বৃহত্তর বাংলার স্বপ্ন, হিন্দু-মুসলমানের স্বতন্ত্র আবাসভূমি, দ্বিজাতি তত্ত্ব, অর্থনৈতিক মুক্তি, কমিউনিস্ট আন্দোলন, ফকির বিদ্রোহ কিংবা তৃণমূলের জীবনাচার ইত্যাদি নানা অনুষঙ্গে বিস্তৃত এবং ব্যাখ্যেয় উপন্যাসের দশ দিগন্ত বা গূঢ় রহস্য। সেজন্যই সাবঅলটার্ন বাস্তবতা, জাদু বা মায়াবাদী শৈলী থেকে শুরু করে অধিবাস্তব আর খোয়াব স্বপ্ন বিভাজনের বিধৃত এ উপন্যাসের বহুপাক্ষিক বিশ্লেষণ আবশ্যক।

নিুবর্গীয় মানুষের ক্ষুধা ও স্বপ্নের কথা এ উপন্যাসের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলেও ফকির মজনু শাহের নেতৃত্বে যে ফকির বিদ্রোহ হয়েছিল কিংবা ভবানী পাঠকের নেতৃত্বে যে সন্ন্যাস বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিলোÑ সে প্রসঙ্গও এসেছে পরোক্ষভাবে আবার কখনো কখনো উদ্দীপ্ত উত্তরাধিকার হিসেবে। ঘটনার অবস্থান হিসেবে নির্বাচিত জনপদ ছিল উত্তরবঙ্গের মূলত বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চল। তবে ঘটনার বিকাশ ও বিন্যাসের সূত্রে সেটা উপলক্ষ হিসেবে এসেছে পাক-ভারত উপমহাদেশ। সময় হিসেবে ১৭৬০-১৮০০ সালের মধ্যকার ফকির সন্ন্যাস বিদ্রোহের সময়কাল এবং ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভাজনের বা সন্ধিক্ষণের প্রেক্ষিত ও বাস্তবতা। তবে এ বাস্তবতাকে দরদি, কুশলী ও দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিদীক্ষায় খুবই সচেতন এবং সারল্যের সাথে শেকড়বাদী শৈলীতে তিনি প্রকাশ করেছেন। দেশ স্বাধীন হলেও মানুষের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। অথবা বলা যায়Ñ ১৯৪৭-এর দেশ বিভাজন ছিল ক্ষমতার হাতবদল, প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের ভাগ্যের বিশেষ কোন পরিবর্তন যে হয়নি সেটাও এ উপন্যাসে মনস্তাত্ত্বিকভাবে অথবা জাগতিকভাবে কিছুটা বৈপ্লবিক ধারায় উঠে এসেছে। তার ব্যাখ্যায় পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে উত্তরবঙ্গের প্রকৃত জীবনাচার। তার মতে, মঙ্গাপীড়িতের প্রতি অত্যাচারের স্টীম রোলার চাপানো, জোতদার ও ভূমিদস্যুদের শোষণ এবং আগ্রাসনে জর্জরিত কাৎলাহার বিল ও আশপাশের মানুষজনের ভাতের প্রতি আগ্রহ, ফসলের ন্যায্য হিস্যা বা দাবির স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা হলো একটি মানবিক বাস্তবতা। তিনি তার কথাশিল্পের পারঙ্গম পরিমিতি আর প্রাজ্ঞতায়- এ বাস্তবতাকে দরদ দিয়ে, কুশলী শব্দ ব্রহ্মায়, লোকজ অনুষঙ্গ ও তদীয় আঞ্চলিক রীতিতে উপস্থাপন করেছেন, এবং এ কাজ যেমন পরিশ্রমলব্ধ, তেমনি লোকজ ধারায় শেকড়ের কাছে ফিরে আসার প্রান্তবাদী সাহিত্যকৃতি কিছুটা ভিন্ন এবং মৌলিকও বটে।

উপন্যাসের বিন্যাসে ও বিকাশে বারংবার এসেছে ভাতের প্রতি প্রেম, ভালবাসা ও আকাক্সক্ষা। বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রান্তিক পর্যায়ের এ মানুষগুলোর পেট ভরে ভাত খাবার সদিচ্ছা একই সাথে মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক। কেন এরা পেট ভরে ভাত খেতে চায়। কারণ এরা ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত। তার কারণ কী? কারণ ওদের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে আবার সেটা নিয়তি বা ভাগ্য বলে ওদেরকে বোঝানোও হচ্ছে। তাই ওরা ক্ষুধায় কাতর। ওদের শতাব্দিব্যাপী ভাবনা হলো ‘পেটে দিলে পিঠে সয়।’ তাই ভাতপাগল তমিজের বাপ, কিংবা কুলসুম, তমিজ, তমিজের মেয়ে সখিনাসহ আরো অনেকেই ঘোরের মধ্যে জীবন কাটাতে কাটাতেও ভাতের প্রতি আগ্রহ, প্রেম তথা ভাতের ক্ষুধা আর অভাবের তাড়না থেকে যেন ছুটতে পারে না বা পারছে না। তবে তাদের মুক্তির সদিচ্ছা রয়েছে সেটা অবশ্য প্রবণতা হিসেবে উপন্যাসে উঠে এসেছে। কিন্তু কখনোই সেটা উচ্চকিত হয়ে ওঠেনি।

উপন্যাস সম্পর্কে ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে, ‘মেলা দিন আগেরকার কথা।’ অর্থাৎ পাঠক পড়লেই বুঝবেন অষ্টাদশ শতকে যখন মজনু শাহ-এর নেতৃত্বে ফকির বিদ্রোহ হয়েছিল ঠিক সেই সময়টাকেই বোঝানো হয়েছে। তবে ভাবের ধরন অনেকটাই প্রান্তিকজনের বোধগম্য কথকতার মতো। পরের লাইনগুলোতে বর্ণিত, ‘...কাৎলাহার বিলের ধারে ঘন জঙ্গল সাফ করে সোভান ধুমা আবাদ শুরু করে বাঘের ঘাড়ে জোয়াল চাপিয়ে।’ অর্থাৎ অসম্ভব এক বাস্তবতা। বাঘ দিয়ে হালচাষ করা! কিন্তু তারপরে আবার ইতিহাসের বাস্তবতা, ‘...ওইসব দিনের এক বিকেলবেলা মজনু শাহের অগুনতি ফকিরের সঙ্গে মহাস্থানগড়ের দিকে যাবার সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেপাই সর্দার টেলারের গুলিতে মারা পড়ে মুনসি বয়তুল্লাহ শাহ।’ ... পাঠককে তারপরও অদ্ভুত বর্ণনা ও বাস্তবতায় টেনে নিয়ে বলা হয়, ‘...কাৎলাহার বিলের দুই ধারের মানুষ সবাই জানে, বিলের উত্তরে পাকুড়গাছে আসন নিয়ে, রাতভর বিল শাসন করে মুনসি।’ ... এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কে এই মুনসি? পাঠক সমস্ত উপন্যাস বারংবার পাঠ করেও এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবেন না। তবে বুঝতে পারবেন- তমিজের বাপ ও এ অঞ্চলের মানুষের শক্তির প্রতীক হলো এই মুনসি চরিত্রটি। তারপরের বর্ণনায় উঠে আসে, ‘...দূরে কোথাও ভূমিকম্প হলে যমুনা বদলে যায়। বন্যায় ভেঙ্গে পড়ে কাৎলাহারের তীর। মুনসির নিষ্কণ্টক অসিয়তে চাষীরা হয় কাৎলাহার বিলের মাঝি।’ ...আর এই মালি বংশের শেষ দিকেরই প্রজন্ম তমিজের বাপ ও তমিজ। উপন্যাসের কাহিনির সূত্রপাত এই প্রজন্মকে ঘিরে। যেমন, ‘...খোয়াবনামার শুরু। বিলের মালিকানা চলে যায় জমিদারের হাতে। মুনসির শোলোকে শোলোকে মানুষের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে বেড়ায় চেরাগ আলী ফকির। তমিজের বাপ শোলোক শোনে আর ঘুমের মধ্যে বিলে গিয়ে কাদায় পা ডুবিয়ে দেখতে চায় পাকুড়গাছের মুনসিকে। ভবানী পাঠকের সঙ্গে পূর্বপুরুষের জের টেনে বৈকুণ্ঠনাথ গিরি প্রতীক্ষা করে ভবানীর শুভ আবির্ভাবের। তমিজ দেখে জমির স্বপ্ন। আর চেরাগ আলীর নাতনি কুলসুম খোয়াবে কার কায়া দেখতে চায় তার দিশা পায় না। তেভাগার কবি কেরামত শেষ পর্যন্ত আটকে পড়ে শুধুই নিজের কোটরে; সে নাম চায় বৌ চায় ঘর চায়।’ ...কিন্তু চাইলেই কি পাওয়া যায়? তাই তাকেও অবস্থার চাপে পড়ে খুনি হতে হয়। ফলে তার স্বপ্নের ফলাফল শূন্য হয়ে ওঠে (?)। তারপর আবারো ইতিহাসের বর্ণনা ও বাস্তবতার প্রেক্ষিত সম্পর্কে ধারণা প্রদান। যেমন, ‘...কোম্পানির ওয়ারিশ ব্রিটিশের ডান্ডা উঠে আসে দেশী সাহেবদের হাতে। দেশ আর দেশ থাকে না, হয়ে যায় দুটো রাষ্ট্র। দেশী সাহেবরা নতুন রাষ্ট্রের আইন বানায়, কেউ হয় টাউনবাসী, কেউ হয় কন্ট্রাকটর। আবার নিজ দেশে পরবাসী হয় কোটি মানুষ। হিন্দু জমিদার নায়েব চলে যাওয়ার পরও আজাদ পাকিস্তানে জমি আর বিলের মানুষ নিজেদের মাটি আর পানির পত্তন ফিরে পায় না।’ ...অর্থাৎ ক্ষমতার হাত বদলই ঘটে সাধারণের ভ্যাগের কোন পরিবর্তন ঘটে না। নব্য দখলদারিদের হাতে বিল ও আশপাশ অঞ্চলের চেহারা বদলাতে থাকে। ইটখোলা তৈরির ফলে গাছ কেটে ফেলা হয়। ফলে শতাব্দি প্রাচীন পাকুড়গাছও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তবে থেমে যায় না গল্প বা কাহিনি। সৃষ্টি হয় নতুন ধারা বা বিশ্বাসের ভিত্তিভূমি। যেমন, ‘...পাকুড়গাছ নাই। মুনসির খোঁজ করতে করতে চোরাবালিতে ডুবে মরে তমিজের বাপ। ভবানী পাঠক আর আসে না। বৈকুণ্ঠ নিহত।’ ... এ ধরনের তথ্যে পরিষ্কার হয়ে ওঠে ঘোর কেটে যাচ্ছে। তবে সেটা আপাত ভাবনায়, বাস্তবে ততটা নয় কিন্তু। পরিবর্তনটা এভাবেই উদ্ধৃত হয়েছে, ‘...ক্ষমতাবান ভদ্রলোকের বাড়িতে চাকর হয়ে বিল ডাকাতির আসামি তমিজ পুলিশকে এড়ায়। কিন্তু তার কানে আসে কোথায় কোথায় চলছে তেভাগার লড়াই। নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে তমিজ বেরিয়ে পড়ে তেভাগার খোঁজে। ফুলজানের গর্ভে তমিজের ঔরসজাত মেয়ে সখিনাকে নিয়ে ফুলজান ঠাঁই নেয় কোথায়!’ এছাড়াও শেষ দিকে বলা হয়েছে যে কাৎলাহার বিলের উত্তরে সখিনা দেখতে পায় জ্বলন্ত হেঁসেলে বলকানো ভাত। আর এই ভাত আর স্বপ্নদেখা মানুষ এবং তাদের জীবনের কথকতাই এ উপন্যাসের ডিসকোর্স।

প্রশ্ন উঠতে পারে লেখক কি খোয়াবনামার পক্ষে না বিপক্ষে? লেখক কি সংস্কারবাদী? লেখক কি সমাজ বিকাশের নিয়ামক হিসেবে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথকে পরিহার করে বিবর্তনধারার নিয়তিবাদী? লেখক কতটা জোরালোভাবে তেভাগার আন্দোলনকে সমর্থন করেন? কিংবা ভারত-পাকিস্তান বিভাজনে লেখকের পক্ষপাত সুস্পষ্টভাবে ঠিক কোন দিকে? পাশাপাশি প্রান্তজনের স্বপ্ন দেখা, তার বিশ্বাস আর বিশ্লেষণের ধারাক্রমকে লেখক কি পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিশৈলীতে দেখেছেন? নাকি তার প্রজ্ঞা দিয়ে, মেধা দিয়ে, মননশীলতা দিয়ে খোয়াবের অসীমতায় ঘূর্ণনরত অণু বা পরমাণুর মতো লোকজ-বিশ্বাস-তাড়িত জনগোষ্ঠীর অবস্থাকে বুঝিয়েছেন? ...বলা যায় তুলে এনেছেন? অথবা তথ্য, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন?

প্রশ্নগুলোর উত্তর সরল বা একপেশে নয় বরং অনেকটাই ভাবনা ও বোধের গভীরে প্রথিত। তমিজের বাপকে দেয়া চেরাগ আলী ফকিরের খোয়াবনামা বইটির প্রসঙ্গে আসা যেতে পারে। এ বই কি আসলেই রহস্য? সত্য? অলৌকিক কিছু? কিংবা এ বইটি সৌভাগ্যের প্রতীক? ... প্রশ্নগুলোর উত্তর সবক্ষেত্রেই সঠিকভাবে সুস্পষ্ট নয়। এছাড়াও বইটির রহস্য, বইতে আঁকা বিভিন্ন প্রকারের চিহ্নের মানে, ব্যাখ্যা এবং ফলাফল ইত্যাদি নিয়ে উপন্যাসে বিশেষ কোন পক্ষপাত না থাকলেও অলৌকিক ঘটনাসমূহের দুই রকমের ব্যাখ্যা পাঠকের কাছে অনুমেয় হতে দেরি হয় না। শাপ, অভিশাপ, কুদৃষ্টি তথা তমিজের বাপের অধ্যত্ব ক্ষমতার সাধারণ ব্যাখ্যা থাকলেও নানা স্থানে তার রহস্যময়তার মীমাংসা গ্রামের ভাববাদী ও চিন্তায় পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সীমাবদ্ধতায় সেটা অব্যাখ্যেয়, বলা যায় অলৌকিকও বটে।

উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কবিগান তথা এর বিষয়বস্তু, প্রসঙ্গ, ইতিহাসবোধ, তথ্য ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। চেরাগ আলী ফকিরের গানে উঠে এসেছে, ফকির বিদ্রোহের গৌরবগাথা, অধ্যত্বচিন্তা ও গ্রামীণ লোকজ জীবন। পাশাপাশি বৈকুণ্ঠনাথ গিরি ভবানী পাঠককে বন্দনা করে গান করতে করতে অলৌকিকের প্রত্যাশা করে। তার গানে দেবদেবীর বন্দনার পাশাপাশি জাগরণের মহাবাণীও প্রতিভাত। কিন্তু তেভাগার কবি কেরামতের গানগুলো হিন্দু-মুসলমানের মিলনের বাণী প্রচারেই ব্যাপৃত। তবে শেষের দিকে নব্য পাকিস্তানের বাস্তবতায় কিছুটা পরিবর্তিত হতে শুরু করে। মোটকথা এ উপন্যাসে গানগুলো উপলক্ষেই নয় শেকড়জাত, উদ্দীপক ও লোকজ জীবনের প্রণিধানযোগ্য অনুষঙ্গ। জীবন ও সংগ্রামের প্রতীকী রূপ এতে পরিবৃত। বাংলা পয়ার রীতিতে লেখা গানগুলোতে ১৪ মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দের দ্বিপদী-ধারার আধিক্যই লক্ষণীয়। তবে মাঝে মাঝে ত্রিপদী ছন্দের ঝিলিকও লক্ষ্য করার মতো। প্রথম গানে (পৃ-১৩) আছে-

সিথানে পাকুড় গাছ মুনসির বসতি

তলায় গজার মাছ অতি হিংস্রমতি।

গভীর নিশিতকালে মুনসির আদেশে

বিলের গজার মাছ রূপ লয় মেষে।

অর্থাৎ ফকির বিদ্রোহে নিহত মুনসি যে বাস করে পাকুড় গাছে তারই আদেশে কাৎলাহার বিলের হিংস্র গজার মাছ রূপ নেয় মেষের। উভয়ক্ষণেই শক্তির প্রত্যাশা, সংকটের ভরসা এবং বিজিতের বিজয়ী হবার ভবিষ্যৎ ভাবনাই ছাই চাপা আগুনের মতই উসকে উঠতে চায়। অন্য একটি গানে (পৃ-৩০) নদীর গতিপথ পরিবর্তনের সঙ্গে ফকিরের প্রসঙ্গ উঠে আসে বেশ জোরালে ও যৌক্তিক মরমি তত্ত্বে। যেমন-

তানার লানতে মাটি ফাটিয়া চৌচির।

নবস্রোত তালাশিয়া দরিয়া অস্থির ॥

সেইমতো ব্রহ্মপুত্র বহে যমুনায়।

করতোয়া হইলো ক্ষীণতোয়া শীর্ণকায় ॥

আহারে কুলীন নদী আবিল পঙ্কিলে।

ফকিরে ঠিকানা পায় মহামীন বিলে ॥

তার লানতে অর্থাৎ স্রষ্টার অভিশাপে করতোয়া নদী শীর্ণকায় হয়ে যায় বলেই মাছের বিলে ফকিরের ঠিকানা হয়। পাশাপাশি ফকির বিদ্রোহের মহানায়ক মজনু শাহের ইজ্জত নাশের সূত্রে গানে (পৃ-২০০) ব্যক্ত হয়-

মহাস্থানে শায়িত শাহ সুলতান হুজুর।

মাহি সওয়ার নামে তিনি দুনিয়ায় মশহুর ॥

তানারে বেইজ্জত করে নাসারা কোম্পানি।

লাজে দুষ্কে শুকাইল করতোয়ার পানি ॥

অর্থাৎ স্থানীয়ভাবে নদী শুকিয়ে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে মজনু শাহের পরাজয়ের প্রতি তুলনা অনেকটাই ভাব, ক্ষোভ প্রকারান্তরে জারণেরই বাণী প্রচার করছে। আরেকটি গানে দেখা যায় মজনু শাহ তার অনুগত বিপ্লবী ভবানী পাঠককে হুকুম করছেন গোরা তথা ইংরেজ সৈনিকদেরকে ফাঁসি দিতে। এখানে ভবানীর শক্তিমত্তার প্রসঙ্গও এসেছে বেশ জোরালোভাবে। যেমন-

মজনু হাঁকিয়ে কয় ভবানী সন্ন্যাসী।

গোরাগণে ধরো আর দাও সবে ফাঁসি ॥

গিরিবৃন্দ অসি ধরে ভবানী হুংকারে।

গোরাগণে পাঠাইয়া দেয় যমদ্বারে ॥

নতুন সময়ের কবি কেরামত গান বান্ধে নতুন ভাব, প্রেম আর অতীত স্বকীয়তার ভিত্তিতে। তার গানে (পৃ-২০০) দেখা যায়Ñ

মাঝি বিনা বিল আর জল বিনা মাছ।

পুত্রহীন মাতৃকোল পুষ্প বিনা গাছ ॥

আওরতে না পায় যদি মরদের চুম।

যতো জেওর দাও তারে রাতে নাহি ঘুম ॥

অন্যদিকে চেরাগ আলীর কণ্ঠে মুনসির গানে (পৃ-৩০০) শোনা যায় জাগরণের মর্মবাণী। দুশমনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা শোনা যায়। যদি সবাই রুখে দাঁড়ায়, এক হয়ে শক্তিমত্তায় ঝাঁপিয়ে পড়ে তবে রোদের উত্তাপে শিশির যেমন শুকিয়ে যায় ঠিক তেমনি শৃঙ্খল বা শিকলও ছিঁড়ে যেতে পারে। যেমন-

জাগো কাতারে কাতারে গিরিরডাঙ্গা কাৎলাহারে

জোট বান্দো দেখো টেকে কয়টা দুশমন।

জোট বান্দো ভাঙো হাতের শিকল ঝনঝন।

শিকল মিলায় রৌদ্রে শিশির যেমন ॥

চেরাগ আলীল আরেকটি গানে (পৃ-৬১) আছে স্ত্রীর প্রেম আর ভালবাসার শয়ন ছেড়ে ফকিরের যুদ্ধে ছুটে যাবার প্রবল ইচ্ছে, শক্তি, সাহস আর বাস্তবতার কথা। যেমন-

চান্দ কোলে জাগে গগন পাশে বিবি নিন্দে, মগন

খোয়াবে কান্দিলো বেটা না রাখে হদিস।

(ফকির) না রাখে হদিস।

(হায়রে) সিথানে পড়িয়া থাকে কার্পাসের বালিশ।

দুয়ারে দাঁড়ায়ে ঘোড়া করিলো কুর্নিশ।

(ফকির) ঘোড়ায় চড়ি বহিরিলো নাইকো উদ্দিশ ॥

লেখকের বর্ণনায় ধানকাটা বিলের অন্তরের চিন্তা ও চিত্র যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তবে রহস্যময়তায় তমিজ (পৃ-৯৫) অথবা কিছুটা ঘোরের মধ্যে তমিজ তার বাপের মাছ ধরা ও ছুটে চলাকে উপলব্ধি করে গীতল শৈলীতে। যেমন-

সুরুজে বিদায় মাঙে শীতেতে কাতর।

শীষের ভিতরে ধান কাঁপে থরথর ॥

পশ্চিম হইল রাঙা কালা পানি অচিন ডাঙা

ফকিরে করিবে মেলা রাত্রি দুই প্রহর।

ধানের আঁটি তোলো চাষা মাঝি ফেরো ঘর।

অন্য একটি গানে (পৃ-১১১) হামিদার সন্তান মারা যাবার ঘটনার প্রতিচিত্র দেখতে পায় কুলসুম তার দাদা চেরাগ আলীর গানে। তাকে প্রবলভাবে আপ্লুত ও বিহ্বল করে সে গান-

খোয়াবে জননী চুম্বে পুত্রের ললাটে।

ঝাঁপ দিয়া পড়ে বাছা মওতের ঘাটে ॥

চুম্বিলে পুত্রেরে মা গো কী কহিবে আর।

আজরাইল লুকায়া ছিল ওষ্ঠেতে তোমার ॥

তবে কেরামতের গানের মধ্যে চাষীদের জীবন, অধিকার আদায়ের জাগতিক কথা উঠে এসেছে (পৃ-১৪৫)। যেমন-

বিসমিল্লা বলিয়া শুরু করে কেরামত।

ভারতবাসীর উপরে আল্লা কর রহমত- শুন সব্রজন

শুন সব্রজনে শুর্ধ মনে হিন্দু মোসলমান।

সোনার বাঙলার চাষীর দুষ্কে ফাড়িবে পরাণ- রক্ত করি জল

রক্ত করি জল সোনার ফসল চাষা ফলায় মাঠে।

অনাহারে উপর্বাসে জেবন তাহার কাটে।

অধিকার আদায়ের প্রশ্নে গানগুলো উদ্যম সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। চার মাস ধরে কায়িক শ্রম দিয়েও কৃষক পায় না সুফল। জোতদারের শোষণে তারা জর্জরিত হতে হতে এমনি পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। করুণ ও বাস্তব অবস্থার আরেকটি চিত্র ফুটে উঠে কেরামতের গানে (পৃ-১৬৬)। যেমনÑ

যাহার হাতে নাঙল। যাহার হাতে নাঙল, ফলায় ফসল অন্ন নাই তার পাতে। জমির পর্চা লইয়া জোতদার থাকে দুধেভাতে ॥ রক্ত করি পানি

র অ ক্ত করি পানি মাটি ছানি ভাদ্রে রোপাই ধান।

চার মাসের মেন্নতে দেহে নাহি থাকে পরাণ। পৌষে ধান কাটি

পৌষে ধান কাটি, বাঁটাবাঁটি করিল জোতদার।

ভাগে পাইলাম আধা ফসল চলে না সংসার। চাষার মেন্নতের দাম,

এভাবেই চাষীর পরিশ্রম বা মেহনতের দাম সে পায় না। জাগরণের এ মহাসত্যে উদ্বুদ্ধ কবি কেরামত শেষদিকে পাকিস্তানবাদী হতে শুরু করে। তবে সেখানেও চাষীদের অধিকার আদায় হবে সেই স্বপ্ন, প্রত্যাশা কিংবা শপথের কথা সে ভুলে যায় না। তবে মুসলিমপন্থীরা সচেষ্ট থকে তাকে মুসলীম জনগোষ্ঠীর স্বার্থের স্বপক্ষে সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান-প্রীতিতে আকৃষ্ট করতে। সে নতুন ভূখন্ড পাকিস্তানের প্রতি আগ্রহী হয়ে ঠিকই তবে তার চেতনায় যে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের চেতনা বিরাজ করছে সেটা ভুলতে পারে না। অন্যদিকে তার স্বপ্ন ও বিশ্বাস হলো স্বাধীন পাকিস্তানে চাষীকুল তাদের জমির অধিকার ফিরে পাবে। সেই বিশ্বাসেই সে শুরু করে-

বিসমিল্লা বলিয়া আজি বাঁধিনু শোলোক।

খোশখবর দিব আজি শুন সব্রলোক। আজি দীন গরিবের

আজি দীন গরিবের আঁধার দিনের হইল অবসান।

এই ভারতে কায়েম হবে আজাদ পাকিস্তান। সেথায় সবাই সমান

সেথায় সবাই সমান দীনী ফরমান হইবে সেথায় জারি।

প্রজার মঙ্গল তরে উচ্ছেদ হইবে জমিদারী ॥ জমিদার প্রজায়

জমিদারে প্রজায় জোতদার চাষায় একই আসন পান

চাষীমজুর দীন দরিদ্রের মুশকিল আসান ॥

কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো মুসলমান চাষী আর সর্বহারার স্বপ্নের আজাদ পাকিস্তানে জোতদার আর গরিব চাষী একই আসনে বসতে পারেনি। স্বাধীন দেশে জমির অধিকার চলে যায় হিন্দু জোতদারের হাত থেকে সদ্য গজিয়ে ওঠা মুসলিম জোতদারদের হাতে। একই সঙ্গে আরেকটি অপ্রিয় সত্য হলো এসব বাণী প্রচারকারী কবি কেরামতের জীবনটাও আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপিত হয়। তার বাণীই তার কাছে ফাঁকি হয়ে উঠে যখন সে খুনের ষড়যন্ত্রে পতিত হয়। তাই জীবন ফাঁকি স্থানও ফাঁকি, সর্বোপরি ফাঁকির স্বর্গরাজ্য ফাঁকিস্তান তার জীবনের স্বপ্ন। তার গানে আছে-

কাফের হস্তে মায়েবোনে হারালো ইজ্জত।

সর্বোশ্রান্ত হইয়া হেথায় করিলো হিজরত।

হেতা হইতে যায় চলিয়া হিন্দু ভাইগণে।

মাতৃভূমি ত্যাগে বড়ো দাগা পায় গো মনে ॥

স্বর্গদর্পে গড়িমসি এহি জন্মভূমি।

পিতামাত্রামহ রহে এহি মাটি চুমি।

তাহাদের মনোকষ্টে আল্লা হয় নারাজ।

অন্যদিকে উপন্যাসের অন্যতম হিন্দু চরিত্র বৈকুণ্ঠনাথ তার গানের ভাষায় নবজাগরণ ও সন্ন্যাস বিদ্রোহের প্রেক্ষিতকে স্মরণ করে বাণী প্রচার করছে। তার গানে সে শুধু ভবানী পাঠকের আগমনই প্রত্যাশা করছে নাÑ একই সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়া, শোষণের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠীর চেতনা উদ্রেকের প্রয়াসও চালাচ্ছে। তার মতে সুখনিদ্রা ত্যাগ করে মৃগরাজ তথা সিংহরাজের মতো জাগতে হবে। কারণ মাছ জাগে তরু জাগে, গিরিগণ তথা সন্ন্যাসীগণ জাগে তাই জাগতে হবে ভবানী পাঠকের ডাকে। যেমন-

সুখনিদ্রা পরিত্যাজে জাগো মৃগরাজতেজে

মীন জাগে তরু জাগে জাগো গিরিগণ।

তোমার সুপ্ত শয্যাপরি গৃহে প্রবেশিল অরি

বান্ধিল শৃঙ্খলে তোমার নিদ্রাতে মগন।

ভবানী হুঙ্কারে জাগো জাগো গিরিগণ।

কিন্তু ঝড়ের রাতে সেই জাগ্রত বা জাগরণের বাণী প্রচারকারী বৈকুণ্ঠকে সন্ত্রাসীরা জবাই করে ফেলে। ঘটনার নিষ্ঠুরতায় সবাই অবাক হয় ঠিকই কিন্তু কী করার আছে বা ছিল তার ভাবনার বিকাশে? (বাকি অংশ আগামী সংখ্যায় পড়ুন)

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

    নিভৃত ও বিচিত্র

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    সাহিত্যের নিত্য পরিবর্তনের উৎসমুখে সরব উপস্থিত হয়ে যিনি সর্বদা নিজেকে বদলে নিতে

  • ১৯৭১-এর অপ্রকাশিত ডায়েরি ৫

    জিয়াউল হাসান কিসলু

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশেল পর) ১৯ নভেম্বর, ১৯৭১, শুক্রবার খুব সকালে উঠে চা খেয়ে পিটি

  • পঙ্ক্তিভারে মুখরিত সন্ধ্যা

    newsimage

    রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। নির্দিষ্ট সময় থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পর পৌঁছালাম কবি

  • ধারাবাহিক উপন্যাস ৩

    ‘মৌর্য’

    আবুল কাসেম

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) দেবরাজ জিউসের কন্যা মিউসের নাম থেকে মিউজিক নামটা এসেছে। তিনি

  • সৈয়দ হকের জলেশ্বরী

    পিয়াস মজিদ

    newsimage

    মার্কেসের যেমন মাকান্দো, দেবেশ রায়ের যেমন তিস্তা, সৈয়দ শামসুল হকের তেমনি জলেশ্বরী।

  • মহাদেশের মতো এক দেশে ২

    কামরুল হাসান

    newsimage

    অস্ট্রেলিয়া পৃথিবীর সাতটি মহাদেশের মাঝে সবচেয়ে ছোট, সবচেয়ে নবীন। তবু মহাদেশ

  • মুহম্মদ সবুরের কবিতা

    newsimage

    শান্তির পতাকা তুষার কিংবা উষ্ণতা- এই প্রবাসে কী বিভ্রমে অনিচ্ছায়; ডুবে যেতে হয় উষ্ণ-শীতল