menu

প্রত্যয়ী ভবিষ্যতের বাতিঘর

মুনীরুজ্জামান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ আগস্ট ২০১৯
image

‘প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য’ কবি প্রবন্ধকার শিল্পসমালোচক আবুল হাসনাতের নতুন গ্রন্থ। প্রকাশ করেছে জার্নিম্যান।

গ্রন্থটির নামের মধ্যেই একটি সাহস জাগানিয়া বোধ রয়েছে। আজকের এই ডিজিটাল প্রায়ান্ধকার যুগে আবুল হাসনাত যে প্রবন্ধগুলো সন্নিবেশিত করেছেন সেগুলো পাঠকের মনে অতীত বর্তমান ভবিষ্যতের জন্য একটা দৃঢ় প্রত্যয় জন্ম দেয়। সৃষ্টি করে বিশ্বাস নিজের মধ্যে, সমাজের জন্য মানুষের জন্য সেটা অথবা বলা যায় ফিরে পায় মানবিক বিশ্বাস। এই বিবেচনায় প্রবন্ধ নির্বাচনে তো বটেই বিষয়বস্তু চয়নেও আবুল হাসনাত সফল বলতে হবে।

উইকিতে মোট কুড়িটি প্রবন্ধ রয়েছে; শিরোনাম : শম্ভু মিত্র। অশোক মিত্র। রেহমান সোবহান। খালেদ চৌধুরী ও রক্তকরবী। হাসান আজিজুল হক। শ্রদ্ধাঞ্জলি : ভাষাসৈনিক আহমদ রফিকের চেতনা-ছায়ায়। সন্জীদা খাতুন। সমর সেন। হামদি বে। দ্বিজেন শর্মাকে নিয়ে বিচ্ছিন্ন কিছু কথা। ভূমেন্দ্র গুহ, জীবনানন্দ দাশের মূলানুগ পাঠ প্রসঙ্গে। কথাশিল্পী মাহমুদুল হক। সৈয়দ হাসান ইমাম। মতিউর রহমান। মন্দিরা নন্দী। আমাদের নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী। সুভাষ মুখোপাধ্যায় : কবি। শামসুর রাহমান ও তাঁর কবিতা। শিল্প-আন্দোলনের সুবীর চৌধুরী। বুলবুল চৌধুরীর নৃত্যসাধনা।

লক্ষণীয় প্রতিটি প্রবন্ধই কোন না কোন ব্যক্তিকে নিয়ে লেখা। কিন্তু না নিছক কোন ব্যক্তির জীবনী বা জীবন কাহিনি লেখেননি আবুল হাসনাত। ব্যক্তির কাজ এবং চিন্তায় তিনি সমাজ ও ব্যক্তি মানসকে দেখেছেন। এবং অবশ্যই ভবিষ্যৎকে খুঁজেছেন, ভবিষ্যতের ব্যক্তি ও সমষ্টির চিন্তাকে খোঁজার চেষ্টা করেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই সফলও হয়েছেন।

যাদের নিয়ে লিখেছেন আবুল হাসনাত তাদের কেউ কেউ সংস্কৃতির জগতের মানুষ। রয়েছেন সাহিত্যজনেরা। কবি। অর্থনীতিবিদ। সাংবাদিক। শিল্পী। শিল্পবোধসম্পন্ন ভিন্ন পেশার মানুষ। এঁরা সবাই শুধু স্ব স্ব ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করেননি, লেখক আবুল হাসনাত বলছেন এরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পথের দিশাও প্রতিষ্ঠা করেছেন বা এখনও করছেন। সেই কারণেই প্রবন্ধগুলো নিছক জীবন কাহিনী নয়, আবুল হাসনাতের অন্তর্দৃষ্টির কারণে এগুলো শিল্প-সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র ভাবনার আধার হয়ে উঠেছে। যাদেও নিয়ে লেখা হয়েছে শুধু তাদের কাজ এবং ভাবনার বিশ্লেষণ নয়, লেখক আবুল হাসনাতেরও শিল্প-সংস্কৃতি সমাজ-রাজনীতি ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। এই ভাবনাগুলোই তিনি আজকের তরুণ প্রজন্ম, ভবিষ্যৎ প্রজন্মেও কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। সেই জন্যই এই লেখা-প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য।

স্বল্প পরিসরে সবগুলো প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ নেই। শম্ভু মিত্র এবং খালেদ চৌধুরীকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ দুটি বাংলা সংস্কৃতির একটি যুগকে প্রতিনিধিত্ব করে যে যুগটি বিনির্মাণের যুগ। বিশেষ করে শম্ভু মিত্রকে নিয়ে লেখাটি নিছক একটি প্রবন্ধ না হয়ে হতে পারে একটি উপন্যাসের ভিত্তি। তেমনি রেহমান সোবহানকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটিতে স্বাদ পাওয়া যায় ছোটগল্পের। সাহিত্যে ভূমেন্দ্র গুহকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। ভূমেন্দ্র গুহ চিকিৎসক হয়েও জীবনানন্দ দাশ ছিল তার একমাত্র আরাধ্য। আবুল হাসনাত তার প্রবন্ধে ভূমেন্দ্র গুহকে নিয়ে লিখতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশকে যেমন নতুন মূল্যায়নে দেখবার দৃষ্টি তৈরি করে দিয়েছেন তেমনি বাংলা সাহিত্যে তাঁর অবস্থান আরও একবার পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছেন। বন্ধু মতিউর রহমানকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধে শুরুটা ব্যক্তিগত আবেগ দিয়ে করলেও লেখক প্রধানত মতিউর রহমানের লেখা ‘আকাশভরা সূর্যতারা : কবিতা-গান-শিল্পের ঝর্নাধারায়’ বইটি নিয়েই লিখেছেন। এবং বাংলাদেশের রাজনীতি-সংস্কৃত-অর্থনীতি-সামাজিক আন্দেলনের যে চিত্র মতিউর রহমান তার গ্রন্থে এঁকেছেন সেটা নিয়ে লিখেছেন। আবুল হাসনাত চমৎকার একটি প্রবন্ধ লিখেছেন বাংলাদেশের চিত্রকলা আন্দোলনের অসামান্য সংগঠক সুবীর চৌধুরীকে নিয়ে। এর মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর এক তরুণ সহকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধাই নিবেদন করেননি, তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন সেই সময়টিকে যে সময়ে বাংলাদেশের তরুণেরা দেশ সমাজ মানুষের জন্য লড়েছে, মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। লিখেছেন অদেখা অবাঙালি সাংবাদিক হামদি বে সম্পর্কে। এখানেও আবুল হাসনাতের লেখার গভীরতার পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদের অচেনা জগৎ থেকে তুলে এনেছেন এমন একজন মানুষকে এমনভাবে যেন মনে হয় তিনি তো আমাদেরই লোক। বাংলাদেশের কোন মননশীল সাহিত্যিক বা সংস্কৃতিকর্মী সাহিত্য রচনা করবেন বা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সৃজন করবেন অথচ লড়াই করবেন না এটা হতে পারে না। বস্তুত আবুল হাসনাত লিখেছেন রড়াইয়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথকে পাওয়া আর সেই পাওয়ার অন্যতম প্রধান সূত্রধর সন্জীদা খাতুন। যেন রবীন্দ্রনাথের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশকে পাওয়ার লক্ষ্যে ছায়ানট প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ষাটের দশকের শুরুতে। সন্জীদা খাতুন ছিলেন অন্যতম রূপকার। এই লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের সংস্কৃতি কর্মীদেরে যে ভূমিকা তার ভিত রচিত হয়েছিল সন্জীদা খাতুনদের নিরলস কর্মকান্ডে।

প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য গ্রন্থে আবুল হাসনাত বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে লিখতে গিয়ে পাঠককে এদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাস লড়াই-সংগ্রামের কথা এমনভাবে তুলে এনেছেন যেটা আসলে অতীতের লড়াইয়ের সঙ্গে আজকের, আগামী প্রজন্মের মননশীলতার, অসাম্প্রদায়িকতার, মানবিকতার লড়াইয়ের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। আজকের সংস্কৃতির জগতে যে বন্ধ্যত্ব, সাহিত্য যুগকে অতিক্রম করতে পারছে না, ভাবনা যে চরমভাবে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে, ব্যক্তি যে সমাজকে ছাপিয়ে গেছে, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে এই আঁধার সময়টাকে পেরোতে অতীতের এক একটি মানুষের লড়াই সংগ্রামকে সমাজ ও সমষ্টির ক্যানভাসে ফেলেই দেখতে হবে। অনুপ্রাণিত চেতনায় তার আঘাতই পারে কালের উত্তরণ ঘটাতে।

আবুল হাসনাতের প্রত্যয়ী স্মৃতি আসলে প্রত্যয়ী ভবিষ্যতের বাতিঘর।

  • গল্পে দেশভাগ

    উদ্বাস্তু

    পলাশ মজুমদার

    newsimage

    আমার সঙ্গে বিক্রমপুর যেতে পারবেন? কেন নয়! অবশ্যই পারব। কখন যেতে চান? আগামীকাল

  • গল্পে মুক্তিযুদ্ধ

    গোমতী নদীর তীরে

    ফারহানা রহমান

    newsimage

    গোমতী নদীর আইল বরাবর খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে প্রায় সীমান্তের কাছে

  • গল্পে মাতৃপ্রেম

    মা

    সাঈদ আজাদ

    newsimage

    ওই দেখো, বাবা কখন এসে উঠানে ঘোড়ানীমগাছের তলে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে।

  • ধারাবাহিক

    অভিযাত্রিক

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) নবম অধ্যয় মডেল স্বপ্নার সঙ্গে মুখোমুখি বসে আছে একে চৌধুরী। কিন্তু

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    হাহা হাহা হাহা হাহা আনোয়ারা সৈয়দ হক হাহাকারে জর্জরিত সময়ের নদী উত্তাল তরঙ্গ আর বাতাসের