menu

পোস্টমডার্নিজম, উত্তরআধুনিকতা এবং উত্তরচেতনা

জিললুর রহমান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
image

আমেরিকার পোস্টমডার্ন চিত্রশিল্পী ডন এড হার্ডির আঁকা একটি চিত্রকর্ম

(পূর্ব প্রকাশের পর)

খ. পোস্টমডার্নিজম

পোস্টমডার্নিজমের ‘Post’-শব্দটি এসেছে লাতিন ভাষার ‘postis’ থেকে। ‘postis’-এর অর্থ ‘ভরী’ করা। পোস্টডেটেড চেক মানে একটা তারিখ ‘ভরী’ করে দেওয়া, যখন টাকা সংগ্রহ করা যাবে। লাইটপোস্টও নিশ্চয় আলোকের পরবর্তী নয়। পোস্টঅফিস উত্তর-কার্যালয় হিসেবে ধরা হলে পোস্টঅফিসের কর্মীরা বিচলিত হতে পারেন। পোস্টমডার্নিজম এবং উত্তরআধুনিকতা তাই এক ব্যাপার নয়। বরং বাংলা ভাষায় চলমান পোস্টমডার্নিজম এবং উত্তরআধুনিকতা দুটো ভিন্ন চিন্তাধারা হিসেবেই বিকশিত। তবে তাদের সাযুজ্য হচ্ছে আধুনিকতাকে অস্বীকারের মধ্যে। তারপরও পোস্ট-মডার্নিজম বলতে বাস্তবে আধুনিকবাদ-পরবর্তী দর্শন বোঝানো হয়েছে, যদিও এই দর্শন বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে জীবন-জগৎ-ইতিহাস-সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করতে চায়। এর পরিধিতে রয়েছে স্থাপত্য, সাহিত্য, ভাষা, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, ভিডিও, নৃত্য, সংগীত, ক্ষমতা, রাষ্ট্রশক্তি, মার্কসবাদ, যাবতীয় পূর্ববর্তী দর্শনচিন্তাও। তবে, প্রসঙ্গত একথা মনে রাখা চাই, পোস্টমডার্ন দর্শন আধুনিকবাদের নিছক সম্প্রসারণমাত্র নয় বরং আধুনিকবাদের সমালোচনা এবং তার বিরোধিতায় মুখর।

ঐতিহাসিকভাবে দেখলে, পোস্টমডার্নিজম বিশ-শতকে তিন বা চারের দশক থেকেই নানাক্ষেত্রে মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। প্রথম এই মতবাদকে চিহ্নিত করা যায় নগর-স্থাপত্যের ক্ষেত্রে। পরবর্তীকালে বেশ-কয়েকটি ঘটনাধারা পোস্টমডার্ন দর্শনের অভিমুখ নির্মাণ করে। ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সের বামপন্থি ডি-গ্যালে সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পোস্টমডার্নিটির চিন্তাচর্চা সূচিত হয় বলে অনেকের ধারণা। এর সঙ্গে-সঙ্গে ফুকোর দার্শনিক মতবাদ জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইউরোপের পোস্টমডার্নিজমের বিকাশে ছাত্র-আন্দোলন এবং পরিণতিতে ফুকো-দেরিদা-লিওতারের ধারণায় মানবতাবাদের বিরুদ্ধে এই ভাবুকদের বিতৃষ্ণা এবং যুক্তির বিপক্ষে অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। হাইডেগারের চিন্তায় হিউম্যানিজম প্রপঞ্চের অস্পষ্টতা থেকে মুক্ত মৌলিক-চিন্তায় ফেরার ব্যাপারও আলোচিত হয়। ১৯৬৮ সালে ইউরোপ-জুড়ে, বিভিন্ন-দেশে বুদ্ধিজীবী-ছাত্র-শ্রমিক-তরুণদের বিভিন্ন আন্দোলন-বিদ্রোহ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, আফ্রিকা-লাতিন-আমেরিকা-জুড়ে উপনিবেশবাদ-নয়াউপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াই, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীবাদের উত্থান, প্রযুক্তির বিস্তার ইত্যাদি সবকিছুই ভূমিকা রেখেছে পোস্টমডার্নিজমের সূত্রপাতে। দর্শনের ক্ষেত্রেও পোস্টমডার্নিজম নিজস্ব-বৈনাশিক বহুত্বময়তা নিয়ে উপস্থিত। দেকার্ত-কান্ট-ফ্রেগে-ভিটগেনস্টাইন-কোয়োইন প্রমুখ দার্শনিকদের বিশ্লেষণ-বিচার শেষে ডেভিডসন-রোটি-দেরিদা প্রমুখ দার্শনিকরা ‘অদ্বিতীয়-সমগ্ন-বদ্ধ-শব্দতালিকার বদলে বহু বিকল্প-সমৃদ্ধ তাৎক্ষণিক ব্যাখ্যা খুঁজছেন। দেরিকাকল্পিত বিনির্মাণ-পদ্ধতি এই চিন্তাধারার খুব বড়ো হাতিয়ার। সর্বকালজয়ী দার্শনিকতার ব্যাখ্যার বদলে পোস্টমডার্নিজমের ঝোঁক আপেক্ষিকতার দিকে। পোস্টমডার্নিজমের আরেকটি বড়-ক্ষেত্র ভাষাবিজ্ঞান আর চিহ্নতত্ত্ব। সুইজারল্যান্ডের ভাষাবিজ্ঞানী ফার্দিনান্দ-দ্যা-সোসুর (১৮৫৭-১৯১৩)-এর কয়েকটি মৌল-ধারণা নির্ভর করে যে গঠনবাদী ভাষাতত্ত্ব গড়ে উঠেছিল, তার গ্রহণ-বর্জন ঘটিয়ে বড়ে ওঠে পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট ভাষাদর্শন। যার সম্প্রসারণ দেরিদার বিনির্মাণ পদ্ধতি সৃষ্টিতে। পোস্টমডার্ন দর্শনের প্রধান তিন ব্যক্তিত্ব মিশেল ফুকো, জ্যাক দেরিদা এনং জাক লাকা। এদের লেখাপত্রগুলি পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। ফুকো যেমন সমাজ, ইতিহাস, প্রতিষ্ঠান, রাজনীতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভূমিকা এবং চাপের সর্বগ্রাসী অবয়ব বিশ্লেষণ করে দেখান। লাকা পোস্টস্ট্রাকচারালিস্ট প্রক্রিয়ায় মনঃসমীক্ষণের চেষ্টা করেন। জাক-লাকা মানবমনকে ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে ‘পাঠ’ করতে চান, অন্যদিকে দেরিদা ভাষাক্ষেত্রে-দর্শনক্ষেত্রে চূড়ান্ত বৈনাশিক, বহুত্বময়, অনির্দিষ্টতাকে প্রতিষ্ঠা করতে চান। এই তিনজন ছাড়া বিশেষ উল্লেখয্যোগ্য রঁলা বার্ত। কোন টেক্সটকে পাঠ-বুদ্ধিজীবীর নোটবই করার ক্ষেত্রে তার মৌলিকচিন্তা আর তত্ত্বগুলি গুরুত্বপূর্ণ। বার্ত-কথিত ‘পাঠকর্তার মৃত্যু আলোচ্য প্রেক্ষিতে স্মরণীয় ভাবনা। ‘মার্ক্সবাদ’ বিষয়েও পোস্টমডার্নিজমের বিশেষ একটি ধারার মতামত মূল্যবান। তার মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তোনিও গ্রামসির কারাগারের লেখালেখি এবং অন্যান্য ভাবনাগুলি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পুনঃপাঠের প্রবণতা। রাষ্ট্রের আধিপত্য এবং কর্তৃত্ব বিষয়ে গ্রামসির মৌলিকচিন্তা সবসময়ে মার্কসীয় চিন্তার প্রেক্ষিতে খুবই প্রয়োজনীয়। পোস্টমডার্নিজমকে যেসব সংশয়বাদীরা পুঁজির এক-বিশেষ অবস্থায় সৃষ্ট দর্শন হিসেবে দেখতে চান বা পোস্টমডার্নিজমকে মনে করেন পুঁজিবাদে সর্বসমর্পিত দর্শন হিসেবে, তাদের বিরুদ্ধে বলা যায় যে, পোস্টমডার্নিস্টদের কোন কোন-ধারা মার্কসবাদের সঙ্গে একটা সংলাপ চালাতে বদ্ধপরিকর। ফুকোর চিন্তাধারার শেষপর্যন্ত গ্রামসির Counter Hegemoy প্রসঙ্গে উৎসাহী। এই প্রেক্ষিতে লুই-আলথুসারের মার্কস-পাঠ-প্রকল্প আর ব্যাখ্যা এবং ইয়রগেন হ্যাবারমাস আলোচিত সমাজতত্ত্ব চিন্তা মনোযোগ দাবি করে। হ্যাবারমাস দাবি করেন, ‘আধুনিকতা- একটি অসম্পূর্ণ প্রকল্প’। তিনি মনে করেন, “মডার্নিটি এবং তার প্রকল্পকে ব্যর্থ হিসেবে পরিত্যাগ করার বদলে আমরা সেসব অসংযত কর্মসূচির ভুল থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি। যে কর্মসূচি আধুনিকতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা করেছে’।

মডার্নিটিতে আত্মপরিচয় অধিকতর সচল, ব্যক্তিগত, পরিবর্তনশীল, আত্মচিন্তা-পীড়িত হয়ে ওঠে এবং তৎসহ, নতুনত্ব ও রদবদল-সাপেক্ষ। তবে, মডার্নিটিতে ব্যক্তির আত্মপরিচয়টি সামাজিক এবং অপরকেন্দ্রিক। প্রাগাধুনিক সমাজে আত্মপরিচয় গড়ে তোলার জন্যে অপরের স্বীকৃতির প্রয়োজন ছিল না, কেননা তা কালপরম্পরা দ্বারা সুসংহত ছিল। মধ্যযুগে লেখা ‘গীতগোবিন্দ’ থেকে ‘কূন্যপূরাণ’, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, ‘পদাবলীসাহিত্য’, ‘শাক্তপদাবলী’, ‘মঙ্গলকাব্য’, মৈমনসিংহগীতিকা’, ভারতচন্দ্র হয়ে প্রাক-হেমচন্দ্র- এ-বিশাল কালখন্ডের কবিগণ ও তাদের কৃত-চরিত্রের আত্মপরিচয়ের সংকট দেখা দেয়নি দার্শনিক সমস্যারূপে। হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ে তা-এলো ঔপনিবেশিক সংস্পর্শে, ইউরোপীয় চিন্তাপ্রণালীর আগমনে এবং ইউরোপীয় বস্তুজগতের প্রসারে।

বৌদ্ধধর্মে আত্মপরিচয়কে বলা হয়েছিল অলীক; ব্যক্তির বাস্তব সত্তা হয় না। রাম-শ্যাম-যদু-মধুর গঠন হয় তাদের কর্মের কারণে। অদ্বৈত বেদান্ত এবং তাওবাদ পুরোপুরি ঐকিকে সীমাবদ্ধ ছিল এবং এসব জটিল চিন্তাপদ্ধতি চুয়ে-চুয়ে সাধারণ গণসমাজের স্তরে আত্মপরিচয়কে ব্যক্তির নিজের কাছে সমস্যা হয়ে উঠতে দেয়নি। পক্ষান্তরে হেগেল থেকে জি.এইচ. মিড পর্যন্ত ইউরোপীয় ভাবুকরা আত্মপরিচয়কে বলেছেন পারস্পরিক স্বীকৃতিনির্ভর। তাদের মতানুযায়ী, একজন লোক নিজের খাতিরে নিজে অপরের স্বীকৃতিকে ন্যায়ত সিদ্ধ-বৈধ-পর্যাপ্ত হিসেবে গ্রহণ করে। মডার্নিটির প্ররোচনায় এ-কারণে গড়ে ওঠে স্বীকৃতিনির্ভর সমালোচনার অনুশাসন। কবি কী বলছেন সেটা বর্তেছিল স্কুল-মাস্টার, অধ্যাপক, আলোচকদের ওপর। ব্যাপারটি অদ্ভুত। কেননা আধুনিকতার প্রধান উপাদান সংকটাপন্ন, ভাসমান, পরিবর্তনরত আত্মপরিচয়, যাকে লেখক নিজে ঠাহর করতে সমস্যা-জর্জরিত, তাকে স্থায়িত্বের তকমা দিচ্ছেন অন্য একদল লোক। আত্মপরিচয়গুলোর সম্ভাবনা বৃদ্ধির সঙ্গে-সঙ্গে, প্রয়োজন দেখা দেয় স্বীকৃতির, এবং এজন্য একটি অনুমিত স্থিরতা খুবই দরকার। আধুনিকতায়, পারস্পরিক স্বীকৃতির অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়াটিতে, আত্মপরিচয় অর্জনের খাতিরে, সামাজিক-স্তরে সংজ্ঞায়িত এবং ব্যবহারযোগ্য ভূমিকা, মানদ-, অনুশাসন, রীতিনীতি, আচার-আচরণ এবং প্রত্যাশা থেকে একজন লোক চাহিদামতো বেছে নিতে পারে, আত্তীকরণ করতে পারে, নতুনভাবে নিজেকে গড়তে পারে। এভাবে, আধুনিকতায়, ব্যক্তির সামনের লোকটা বা লোকগুলো, যাকে বলা হচ্ছে অপর, তা আধুনিকতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। আধুনিক সাহিত্যজুড়ে আমরা তাই দেখি অপরকেন্দ্রিকতার রমরমা। আত্মপরিচয়, ব্যক্তির স্তরে এবং তত্ত্বের স্তরে, আধুনিকতার দার্শনিক সমস্যা। প্রাগাধুনিক কালখন্ডের তুলনায় সেহেতু আধুনিকতায় অসৎ মানুষের সংখ্যাধিক্য। ফালতু আত্মপরিচয় নিয়ে তার আইডেনটিটি কেলাসিত এবং অনড় হয়ে ওঠে। অবসাদ ও একঘেয়েমির সূত্রপাত ঘটায়। সামাজিক সম্পর্ক, প্রত্যাশা ও ভূমিকা পালনের ঘূর্ণিতে সে পাক খায়। পরস্পরবিরোধী বহু-ভূমিকার ফাঁদে পড়ে, নিজের কাছে নিজেকে খুইয়ে ফেলে। শার্ল বোদলয়ার, টি,এস, এলিয়ট থেকে শুরু করে সমর সেন, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের পাঠকৃতিতে যার পরিচয় মেলে। কিয়ের্কেগার্দ, নিৎশে, হাইডেগার, সার্ত্রে বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন অমন আধুনিক মনস্থিতি নিয়ে, সংশয়ী-আত্মপরিচয় নিয়ে। সংশয়ী-আত্মপরিচয় প্রতিরোধ করার জন্যে নিজস্ব রীতি-শৈলী-কেতা-ঢঙ-প্রথা-ম্যানারিজম-স্টাইলকে গুরুত্ব দিয়েছে আধুনিক ব্যাক্তিমানুষ; যেমন জীবনানন্দ দাশ, কমলকুমার মজুমদার, বিনয় মজুমদার, জয় গোস্বামী প্রমুখ।

অতি-উন্নত দেশগুলোয় শিল্পোদ্যোগ-উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে, এবং প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে, ঐতিহ্য সম্পর্কিত স্মৃতিবিপর্যয়ের কারণে, ব্যক্তির আইডেনটিটি আদপে থাকে কিনা, সেটাই হয়ে উঠেছে দার্শনিক প্রশ্ন। অর্থাৎ পোস্টমডার্ন ভাবনায়, বৌদ্ধধর্মের মতন, আত্মপরিচয় একটি অলীক ব্যাপার, একটা মিথ। পোস্টমডার্নিজম কোন আন্দোলন নয়। আত্মপরিচয়ের যুক্তিবাদী ও সত্তাবাদী ধ্যানধারণাকে স্বীকার করে না পোস্টমডার্ন চিন্তাধারা। প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের প্রকোপে ব্যক্তি ও কৌমসমাজ এখন দ্রুতি আক্রান্ত। কবি-শিল্পীর পোস্টমডার্ন আইডেনটিটিহীনতা আমরা এখনকার বাংলা সংবাদপত্রের সিনেমার পাতাটি দেখলে টের পাই, যে পৃষ্ঠাটি মধ্যবিত্ত বাঙালি-সমাজে আধুনিকতার প্রথমার্ধে ছিল প্রায় নিষিদ্ধ, এবং যে পৃষ্ঠাটিতে বর্তমান কালখন্ডে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি, গ্রন্থপ্রকাশ, গুণীজন সংবর্ধনা বিজ্ঞাপিত হয় গাঁটের কড়ি খরচ করে।

কলিম খানের মতো ভাবুকদের মতে আধুনিকতার স্বনির্ভর, আত্মগঠনকারী অহং ভেঙে পড়েছে, এবং অন্তর্হিত হচ্ছে। অশোক বিশ্বনাথন তার বক্তৃতায় বাংলাসাহিত্যের ভঙ্গুর আত্মপরিচয়ের উদ্ভব চিহ্নিত করেছিলেন ফালগুনী রায়ের কবিতায়। ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের ভাবুকরা, এবং বদরিলে বলেছেন, এখনকার আমলাতান্ত্রিক, গণমাধ্যম-দূষিত, ভোগবাদী ভিড়ের চাপে ব্যক্তি নস্যাৎ হয়ে গেছে, উবে গেছে। এইরকম সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে অহং ভেঙেচুরে গুঁড়িয়ে রূপান্তরিত হয়েছে হইচইপূর্ণ অস্থিরতায়, অসংলগ্নতায়। আধুনিকতার উদ্বেগের জায়গায় এসেছে পোস্টমডার্ন হিস্টিরিয়া। এটা স্বাভাবিক যে, পোস্টমডার্ন কবিতা থেকে উদ্ভূত হবে ‘থ্রিল’। আধুনিক কবিতার মতন ‘বুঝতে পারার’ বা মানে বের করার সম্ভাবনা তাতে থাকবে না। পোস্টমডার্ন কবি তাই আহ্লাদ জোগান, মানে জোগান না। আত্মপরিচয়কে প্রতিষ্ঠানরূপে বিরোধিতাকারীরা কবিতায় পোস্টমডার্ন মনস্তাত্ত্বিক পীড়াগুলোকে একরৈখিক ও বহুরৈখিক পাঠকৃতির তুলনামূলক আলোচনাকালে, চিহ্নিত করেছিলেন সমীর রায় চৌধুরীর শব্দবন্ধে ‘লজিক্যাল ক্র্যাক’ বা যুক্তিফাঁল রূপে।

পোস্টস্ট্রাকচারালিস্টরা, জাক দেরিদা, জুলিয়া ক্রিস্তেভা, মিশেল ফুকো প্রমুখ, মনে করেন, ব্যক্তির আইডেনটিটি ব্যাপারটি পুরোপুরি ভাষার কারসাজি, সমাজের বানানো, একটি অতিমীমাংসিত মায়া। আইডেনটিটি ক্রাইসিস বা আত্মপরিচয়ের সংকট স্রেফ গাঁজার দম। এঁরা যে কথাগুলো বলেছেন তা বৌদ্ধ-দার্শনিক নাগার্জুন বহুকাল আগে বলে গেছেন। তিনি ‘আত্মন’-এর অস্তিত্বকে মানেননি। জায়মান উপলব্ধি ও ক্রিয়া, যা দিয়ে ব্যক্তিজীবন গঠিত, তার মালিকানা হয় না, বলেছিলেন নাগার্জুন। হিন্দুধর্মে আত্মনকে মনে করা হয়েছিল শাশ্বত-একক, এবং আমাদের প্রাগাধুনিক কাব্য-রচয়িতারা তার-দ্বারা প্রগাঢ়ভাবে প্রভাবিত ছিলেন। কিন্তু বাংলা কবিতায় নাগার্জুনের বা পোস্টমডার্ন ভাবনা-প্রসূত আইডেনটিটিহীনতা নিয়ে কাজ আমরা দেখেছি উৎপলকুমার বসুর শেষদিকের কবিতায়। তিনি কিছু কবিতায় একাধিক কণ্ঠস্বরের প্রয়োগ করেছেন। ওয়ার্ডসওয়র্থ ও প্রমথ চৌধুরীর চিন্তার জারকরসে চোবানো আলোচকরা যে অমন পাঠকৃতি মেনে নেয়ার কথা না।

আধুনিক কবি শামসুর রাহমান রুপোর চেনে তামার মাদুলি বেঁধে বাংলা একাডেমিতে কবিতা পড়ছেন এটা ভাবা যায় না, তার আইডেন্টিটির কারণে। কিন্তু বাংলা একাডেমিতে আশি-নব্বইয়ের দশকে বহু কবিকে ভিড় করতে দেখা যায় যারা তাবিজ, মাদুলি, গ্রহরতেœর আংটি ভূষিত, এমনকি মার্কসবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির কর্মীও। তা এই জন্যে যে, তাদের আইডেনটিটি গুলিয়ে গিয়ে এক পোস্টমডার্ন আইডেনটিটিহীনতা গড়ে উঠেছে। তারা নিজেদের আইডেনটিটি চয়ন নিয়েও নিশ্চিত নন। এঁদের কবিতার যে আগডুমবাগডুম আলোচনা বিভিন্ন ছোটকাগজে প্রকাশিত হয় তা ন্যায্য। মডার্ন কালখন্ডে ছিল ধর্ষক, যাকে নিয়ে ডিটেকটিভ গল্প লেখা হতো। পোস্টমডার্ন কালখন্ডে জুটেছে গণধর্ষক, যার চেহারার বর্ণনা বা আইডেনটিটি নেই। তার আছে কেবল লিঙ্গ। তেমনই, মল্লবীরের দ্বন্দ্বযুদ্ধের জায়গায় এসেছে পোস্টমডার্ন গণপ্রহার। যারা মারছে তারা আত্মপরিচয়হীন, তাদের নিজেদের কাছে নিজের কোন আইডেনটিটি থাকার সম্ভাবনা নেই। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির পার্ধক্য গুলিয়ে গেছে। আইডেনটিটি বলতে যে ব্যাপারটা টিকে আছে তা বাজার-আইডেনটিটি, রক্তমাংসের তৈরি ভোগ-বাক্স, মানুষের মতন দেখতে। আধুনিক শিল্প-সাহিত্য, এবং তা থেকে বা তাতে উদ্গত আত্মপরিচয়ের যুগের পর আমরা এসে পৌঁছাই এক ভিন্ন কালখন্ডে। এখানে কারোর আত্মপরিচয় নেই।

পোস্টমডার্নিজমের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে হনন করা। পোস্টমডার্নিজমের সাধনা তবে কি মৃত্যুর সাধনা? পূর্ণ মানুষকে ধ্বংস করে একটুকরো মানুষকে অর্থাৎ ক্রেতা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে চায় পোস্টমডার্নিজম। বঙ্গীয় পোস্টমডার্নিস্টরা নয়াউপনিবেশবাদের শৃঙ্খলে নিজেদের জড়িয়ে রেখে মনে করছেন, পুঁজিবাদ-ভোগবাদই মানবসভ্যতার চরম উৎকর্ষ। কিছুটা নির্জ্ঞানে কিছুটা সজ্ঞানে বঙ্গীয় পোস্টমডার্নিস্টরা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদে সহায়তা করে যাচ্ছে। সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্য কত ভয়াবহ ও কুৎসিত তা সাম্প্রতিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করলেই বোঝা যায়। মডার্নিস্টরা পুঁজিবাদের স্বার্থে তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে যথাসাধ্য ধ্বংস করেছে। পোস্টমডার্নিস্টরা অবক্ষয়ী বুর্জোয়াতন্ত্রের বিত্তবাদকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে পোস্টিং করে ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করতে উদ্যত। বিশ্বজগতের প্রতিটি বিষয়ে যেমন, তেমনই কবিতায় এই পোস্টমডার্নিজম সবচেয়ে ঘৃণ্য। বাংলা কবিতায় যারা পোস্টমডার্নিজমের বর্ণনা করেন। ক্রমশ...

  • জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ৮০

    নিজের মতো করেই ভাষা তৈরি করতে হবে

    newsimage

    জ্যোতিপ্রকাশ দত্তজ্যোতিপ্রকাশ দত্ত বাংলা কথাসাহিত্যের অপরিহার্য উচ্চারণ। তাঁর গল্পের স্বাতন্ত্র্য ও কাব্যনির্ভরতা

  • জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের রচনা-

    শূন্যে সেই উদ্যান

    newsimage

    এক পর্বতসানুদেশে এক পর্ণকুটিরের কথা শোনা ছিল। ক্ষীণস্রোতা তটিনীর তীরে। পাইনের বন সারি

  • গিরিশ কারনাড

    সমাজ সংস্কৃতির অম্লান আলো

    গৌতম গুহ রায়

    newsimage

    হতে পারতেন ইংরেজি ভাষায় কবিতা লেখা সফল ভারতীয় কবি, হতে পারতেন দর্শনের

  • তাহাদের কথা

    মাকিদ হায়দার

    newsimage

    মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ হাজার হাজার বছর আগে। এক সময় এই মানুষেরা বনজঙ্গলে

  • স্মৃতিতে অনন্য জীবনানন্দ

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    এখনো পর্যন্ত বাংলা কবিতার প্রধানতম কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি এই আসন অলঙ্কৃত

  • বসতভিটে গো ভালোবাসা নাও

    দিলারা মেসবাহ

    newsimage

    বসতভিটে গো ভালোবাসা নাও দিলারা মেসবাহ লোকমুখে শুনি আমাদের অবসন্ন ভিটে ক্ষয়রোগে শয্যাশায়ী প্রায়! আহা