menu

পূরব দেশের পুরনারীদের কথা

ওবায়েদ আকাশ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৮
image

বাংলাদেশের পাঁচজন মহীয়সী নারীর কথা নিয়ে রচিত ‘পূরব দেশের পুরনারী’ গ্রন্থটি। এটির রচনাকার অধ্যাপক কাজী মদিনা। তিনি খুব যত্নের সঙ্গে এঁদের জীবন ও কর্মের আখ্যান লিপিবদ্ধ করেছেন। তাঁদের ত্যাগ-অধ্যবসায় এবং সমাজ-হিতৈষী কর্মকান্ডগুলো খুব সাবলীল ও যথার্থভাবে তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন। এই পাঁচজন নারী হচ্ছেনÑ নবাব ফয়জুন্নেসা, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হেসেন, শামসুন নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামাল ও নূরজাহান বেগম। সাহসী ও আত্মমর্যাদাশীল নারীগণ তাঁদের স্ব স্ব এলাকায় এখনো পথিকৃৎ হয়ে উত্তর প্রজন্মকে তার দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। লেখক কাজী মদিনা আজকের প্রেক্ষাপটে তাদের কর্মাবদান তুলে ধরে একটি মহৎ ও যুগোপযোগী কাজ করেছেন। নারীর অবরোধকাল, শৃঙ্খলমুক্তি এবং আত্মপ্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় এঁরা যে সূচনা করেছিলেন তার একটি প্রাসঙ্গিক বয়ানে গ্রন্থটি সমৃদ্ধ হয়েছে।

এই গ্রন্থে আলোচিত পাঁচ নারীর মধ্যে প্রথমেই আসে কবি, সমাজসেবী, শিক্ষাব্রতী নবাব ফয়জুন্নেসার নাম। তিনি কুমিল্লায় মেয়েদের জন্য একটি স্কুল নির্মাণ করে সর্বাধিক আলোচিত হন। তিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা কবি হিসেবেও স্বীকৃত। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নবাব উপাধীতে ভূষিত করে। তাঁর সময়ে তিনি যেভাবে নারীকে জাগিয়ে তুলতে একের পর এক ভূমিকা নিয়েছেন তা অবিস্মরণীয়। তিনি ছিলেন বহুভাষী ও বিদেশভ্রমণকারী এক আত্মসচেতন মানুষ। তিনি তাঁর ভ্রমণঅভিজ্ঞতা হয়তো নারী জাগরণে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ও সাধ্যমতো সাফল্যও পেয়েছিলেন।

রংপুরের পায়রাবন্ধে জন্ম নেয়া নারী বেগম রোকেয়ার সমাজ ও নারী সচেতনতামূলক কর্মকান্ডগুলো আমাদের সবার জানা। তাঁর স্বামী সাখাওয়াত হোসেন তাকে এ কাজে সহায়তা করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি কলকাতায় এসে তাঁর মূল কার্যক্রম শুরু করেন। শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারমূলক কর্মকান্ড তাঁকে সারাক্ষণ ব্যস্ত করে রাখত। বিশেষ করে তিনি নারীদের শিক্ষা ও সংস্কৃতিজ্ঞান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ, সাহসী ও সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজেও ছিলেন একজন স্বনামখ্যাত সাহিত্যিক। তাঁর রচনাগুলো সমাজের উন্নয়ন ও বিকাশ সাধনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। তিনি বাংলা উর্দু আরবি তিনটি ভাষাতে পারদর্শী ছিলেন। তিনিও একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে নারী শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। আজও অবিভক্ত বাংলার মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বাঙালি জাতির কাছে তিনি চিরদিনের নমস্য ও নারী জাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণে থাকবেন সন্দেহ নেই।

বেগম রোকেয়ার সুযোগ্য উত্তরসূরি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নারী আন্দোলনের পথিকৃৎ শামসুন নাহার মাহমুদ অনেক সংগ্রাম করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হন। তিনি বিশিষ্ট সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ক্রীড়াবিদ, নজরুল গবেষক ও রাজনীতিবিদ হবিবুল্লাহ বাহারের বোন। বিদ্রোহী কবি কাজী জনরুল ইসলামের অসংখ্য কবিতা ও পত্রে দুই ভাইবোনের গুণকীর্তন আছে। নোয়াখালীর সন্তান শামসুন্নাহার মাহমুদ প্রথম জীবনটা চট্টগ্রামে কাটান। ১৯৩৬ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে চল্লিশ দেশের প্রতিনিধির মধ্যে শামসুন নাহার মাহমুদ বাংলার প্রতিনিধিত্ব করেন। নারী শিক্ষা ও শিশু শিক্ষা ছিল তাঁর অন্যতম আগ্রহের বিষয়। আমৃত্যু তিনি এ কাজ থেকে কখনো মুক্তি নেননি।

সুফিয়া কামাল কবি ও সাহসিকা জননী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি বারবার সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। মানব দরদি ও বাঙালি জাতির বিবেক শতাব্দির অকুতোভয় নারী বাংলাদেশের বরিশাল জেলায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর ভাবনায় ছিল সমগ্র বাঙালি জাতি ও শান্তিময় এক বিশ্ব। তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯২৭ সালে ‘সওগাত’ পত্রিকায়। সেই থেকে শুরু করে শেষ জীবনে তিনি একজন স্বনামখ্যাত কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সাহিত্যিক জীবনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। লেখালেখি ছাড়াও তিনি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও নারী জাগরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বিশ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নারী। সরাসরি রাজনীতি না করলেও বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে তাঁকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। তিনিও নবাব ফয়জুন্নেসা ও বেগম রোকেয়ার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে খ্যাত।

নারী লেখকদের অগ্রণী মুখপত্র ‘বেগম’ পত্রিকা সম্পাদনার মাধ্যমে নূরজাহান বেগম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হন। সওগাত সম্পাদক নাসিরউদ্দীন তাঁর পিতা এবং পরিণয়সূত্রে তিনি শিশুসাহিত্যিক ছড়াকার সাংবাদিক রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের সহধর্মিণী। তিনি আমৃত্যু সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজকে বদলে দিতে চেয়েছেন। সংস্কার ভেঙে নারীদের আলোয় নিয়ে আসতে চেয়েছেন। নারীর চিন্তাচেতনামননের বিকাশে তাঁর ভাবনার অন্ত ছিল না। তাঁর লেখালেখির মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছেন। জীবনবোধে ঐশ্বর্যময়ী এই নারী ১৯৪৭ থেকে ২০১৬ এই সত্তর বছর ধরে বেগম পত্রিকাটি সম্পাদনা করেন। সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য কবি, লেখক, আলোকচিত্রী, কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে বেগম পত্রিকার সচিত্র ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে বিপ্লব ঘটিয়ে দেন।

এই পাঁচ সাহসী, মহীয়সী ও গরবিনী নারীর জীবনগাথা নিয়ে রচিত আলোচ্য গ্রন্থটি রচনা করে লেখক-অধ্যাপক কাজী মদিনা সিঃসন্দেহে একটি সামাজিক ও আদর্শিক দায়িত্ব পালন করেছেন। এঁদের চেতনা ও আদর্শ হাজার বছর ধরে বাঙালি নারীর পথে আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলবে। বইটিতে কিছু মুদ্রণ প্রমাদ চোখে পড়ল। আশা করি পরবর্তী মুদ্রণে সংশোধন করে দিবেন। লেখক ও প্রকাশককে ধন্যবাদ জানিয়ে, বইটির অধিক পাঠ প্রত্যাশা করছি।

পূরব দেশের পুরনারী ॥ কাজী মদিনা ॥ প্রকাশক : জনান্তিক, ঢাকা ॥ প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ॥ প্রচ্ছদ : সৈয়দ আবুল বারক আলভী ॥ মূল্য : ২২০ টাকা।