menu

পিতার মুখ

সৈয়দ নূরুল আলম

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২০
image

জাহানকে চারপায়ে ব্যাঙের মতো উবুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখে আগন্তুক বুঝে ফেলে, কে বা কারা জাহানকে মেরে এভাবে ফেলে রেখে গেছে। আগন্তুক দৌড়ে প্রথম আজিজুল হক স্যারকে খবর দেয়। পরে মিনার স্যারকে। আকাশকেও খবরটা দিতে ভুলে যায় না।

গ্রাম বরাবর জাহানের পছন্দ। স্কুল-কলেজ ছুটি হলেই জাহান বাবার কাছে বায়না ধরত, গ্রামে দাদার বাড়ি বেড়াতে নিয়ে যেতে? কিন্তু বাবার ছুটি, মায়ের ছুটি, নিজের ছুটি সব মিলে, কোথাও যাওয়ার সুযোগ খুব কম হতো।

স্বপ্ন দেখার পর জার্নি করে আসার ক্লান্তি, ভালো ঘুম না হওয়ায় অস্বস্তি, জাহানের মধ্যে আর থাকে না। তার পরিবর্তে একটা ভালো লাগার অনুভূতি তাকে ছেয়ে ফেলে। আনন্দে দুহাতের চেটোয় চুমু খেয়ে, হাত দুটো উপরের দিকে ছুড়ে মারে। সবাই বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধু বললেও জাহান বলে পিতা

বাবা মহিউদ্দিন স্কুল টিচার। মা রাবেয়া খাতুন একটা এনজিওতে চাকরি করতেন। বাবার ছুটি মিললেও মার ছুটি খুব একটা মিলত না। তাই জাহান মাঝেমধ্যে মাকে ছাড়াই, বাবার সাথে দাদুবাড়ি বেড়াতে যেত। গ্রামের গাছপালা, মেঠোপথ, নদী, খালবিল এতই ভালো লাগত যে, ওর আর আসতে মন চাইত না। বাবাকে বলত, আরেকদিন থেকে যাই। আরেকদিন থেকে যাই। এই করে, বাবার ছুটি বাড়াতে হতো। তাই জাহানের যখন পঁয়ত্রিশতম বিসিএস এ এডুকেশন ক্যাডারে চাকরি হলো, তখন ও ধরেই নিয়েছিল কোনো এক মফস্বল শহরে ওকে যেতে হবে। ঠিকই তাই হলো।

গোপালগঞ্জ, কাশিয়ানি, রাতইল জহুর আলী সরকারি কলেজে যখন ওর পোস্টিং হলো, তখন ও মন খারাপ করেনি। বরং, গ্রামপ্রীতিটা আবার জেগে উঠেছিল। তাই ঢাকা থেকে এই ছুটে আসা।

জাহান সারা রাতে দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। সকালে একটা লোক এই ঘরে মারা গেছে, সেই ঘরে একা রাতে থাকা, ভাবতেই জাহানের পিলে চমকে ওঠে। আর ঘুমাবে কী?

চেয়ারে বসে থেকেছে সারা রাত। ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে এসেছিল, তখন জাহান একটা স্বপ্ন দেখে, ও শুয়ে আছে সুন্দর একটা বিছানায়। ঘরের দরজা জালানা সব খোলা। খোলা জানালায় ওপাশে দাঁড়িয়ে লম্বা, স্বাস্থ্যবান, চশমা পরা একটা লোক জাহানকে বলছে, ইয়াং লেকচারার। লেখাপড়া শিখে বড় ডিগ্রি নিয়ে কেউ এখন আর গ্রামে আসতে চায় না। তুমি এসেছ, তোমাকে অভিনন্দন। স্বাগতম। তোমাদের মতো লেখাপড়া জানা ছেলেমেয়েরা গ্রামে এলে, গ্রামকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

এই দাবায় রাখতে পারবে না কথা শোনামাত্র জাহান লাভ দিয়ে ওঠে। ওর ঘুম ভেঙে যায়। এ তো পিতার কথা। পিতা ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, বাংলার মানুষকে আর দাবায়ে রাখতে পারবা না।

পিতার জন্মভূমে এসেই তাঁকে স্বপ্ন দেখল।

স্বপ্ন দেখার পর জার্নি করে আসার ক্লান্তি, ভালো ঘুম না হওয়ায় অস্বস্তি, জাহানের মধ্যে আর থাকে না। তার পরিবর্তে একটা ভালো লাগার অনুভূতি তাকে ছেয়ে ফেলে।

আনন্দে দুহাতের চেটোয় চুমু খেয়ে, হাত দুটো উপরের দিকে ছুড়ে মারে। সবাই বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধু বললেও জাহান বলে পিতা।

জাহান একজন বয়স্ক লোককে ওর রুমের দিকে আসতে দেখে। ও তাড়াতাড়ি যেয়ে দরজা খোলে। লোকটিকে ক্লান্ত মনে হয়। রুমের মধ্যে ডাকবে কি ডাকবে না ভাবতে থাকে। ততক্ষণ লোকটি বলে, তুমি নাবিলা জাহান। ঠিক তো। বয়স হয়েছে। তবু গেইস ভুল হয় না।

জাহান লোকটির কথা শুনে লোকটির দিকে হ্যাঁ করে চেয়ে থাকে।

‘অবাক হচ্ছ? অবাক হবারই কথা। নাম জানলাম কী করে? খুঁজে বের করলাম কী করে। আর প্রথমেই তুমি বলছি কী করে? অনেক প্রশ্ন তাই না?’

‘ভেতরে আসুন। নিশ্চয় আপনি এই কলেজের স্যার।’

জাহান ধরে নিয়েছে, প্রিন্সিপাল আজিজ স্যার হবেন। কিন্তু শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে, প্রিন্সিপাল স্যার বা আজিজ স্যার বলে না। মাঝামাঝি একটা অবস্থানে থাকে।

এবার লোকটি হাসি হাসি মুখ করে বলে, ‘ইয়াং লেকচারার ঠিক ধরেছ। আমি কলেজের প্রিন্সিপাল আজিজুল হক। তোমার সাথে আগে একদিন শুধু ফোনে কথা হয়েছে। আজ দ্বিতীয় দিন। একদিনের পুরোনো হয়ে গেছ। তাই তুমি বলছি। তুমি বলাটা মেনে নিয়েছ তো?’

জাহান কথার উত্তর না দিয়ে, ধপাস করে স্যারের পায়ের হাত দিয়ে সালাম করে।

প্রিন্সিপাল স্যার জাহানের মাথায় স্নেহের হাত রাখেন।

‘দুঃখিত। ভাইস প্রিন্সিপাল স্যার হঠাৎ মারা যাওয়াতে সব ওলটপালট হয়ে গেছে। তোমার সাথেও যোগাযোগ করতে পারিনি। কলেজ ক্যাম্পাসে পা দিয়েই জানতে পারলাম, গতরাতে তোমার অনেক কষ্ট হয়েছে। পা ভেঙে গেছে।

না স্যার, তেমন কিছু না। দুর্ঘটনা তো বলেকয়ে আসে না।

তা বাদরটাকে বলে গিয়েছিলাম। ও কি গিয়েছিল তোমাকে রিসিভ করতে?

বাদর মানে আকাশ! হ্যাঁ, ও গিয়ে পুরো সময় দাঁড়িয়েছিল আমার জন্যে। দেখে আমায় খুব মায়া লেগেছে।

অই বাদরটা তোমাকে এই রুমে থাকতে দিয়েছে!

স্যার, অসুবিধা হয়নি।

আমি ভেবেছিলাম প্রথম কয়েকটা দিন তুমি আমার বাসায়, গেস্ট রুমে থাকবে। কিন্তু সে কথাটা যে কাউকে বলে যাব সে অবস্থা ছিল না।

‘স্যার, এ জন্য কোনো চিন্তা করবেন না।’

‘তুমি ভয় পাওনি তো। মানুষটা এভাবে চলে যাবে কে জানত।’

জাহান ভয় ঠিকই পেয়েছে। কিন্তু এখন আর তা বলতে চায় না। ওটা চাপা দিয়ে জাহান বলে, ‘মুকিত স্যার কীভাবে মারা গেলেন?’

‘শুনেছি হার্ট এটাকে।’

‘শুনলাম মুকিত স্যারের বাড়ি, এখান থেকে সাত মাইল দূরে। এতটা পথ পাড়ি দিয়ে গেছেন, আসছেন। এখন একটু রেস্ট নেন স্যার।’

‘ঠিক আছে। আজ আর ভাঙ্গা পা নিয়ে তোমাকে কলেজে আসতে হবে না। আমি জয়েনিং লেটার লিখে, কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবো। তুমি শুধু সই করে দিও।’

‘না স্যার, যেতে পারব। এখন ব্যথা একটু কম।’

আজিজ স্যার দুপা এগিয়ে আবার ফিরে আসেন। এসে বলেন, ‘তোমাকে যদি এই রুমে পার্মানেন্ট করে দিই। তোমার অসুবিধা হবে? আমাদের এখানে তোমার আগে কোনো মহিলা শিক্ষক ছিল না। তাই মহিলা হোস্টেলের দেখভাল করার জন্য মুকিত সাহেবকে দেয়া হয়েছিল। তোমার যদি কোনো আপত্তি না থাকে।’

আজিজ স্যার একটু থেমে আবার বলেন, ‘দু-একদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। আর প্রথম কয়েকদিন একজন সিনিয়র স্টুডেন্টকে তোমার সাথে রাতে থাকতে বলে দেবো।’

‘স্যার, কোন অসুবিধা নেই।’ জাহান জোর করে মনে বল এনে বলে।

‘তুমি হোস্টেলে মেয়েদের সাথে খেতে পারো অথবা নিজেও রান্না করে খেতে পারো। সব ব্যবস্থা আছে। মুকিত সাহেব নিজেই রান্না করে খেতেন।’

দুটো অপশন জাহানের দিকে ছুড়ে দিয়ে আজিজ স্যার রুম থেকে বের হয়ে যান।

জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই জাহান শেখ মুজিবের নাম শুনে আসছে। ও যখন ক্লাস ফোরে পড়ে, তখন স্কুলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বলার প্রতিযোগিতা হয়েছিল। সেই প্রতিযোগিতায় জাহান ফার্স্ট হয়েছিল। ওর মনে আছে ও এত ছোট ছিল যে, স্টেজে উঠতে পারছিল না, তখন বাংলা ম্যাডাম কোলে করে ওকে স্টেজে তুলে দিয়েছিলেন। ওই একমাত্র প্রতিযোগী যে পুরো ভাষণটা মুখস্থ বলেছিল। বলা শেষ হতে-না-হতে হাতের তালিতে পুরো হলরুম গমগম করে উঠেছিল। ম্যাডাম কোলে করে স্টেজ থেকে নামানোর সময় চুমুতে চুমুতে ওর চোখমুখ ভরে দিয়েছিল।

দেখতে দেখতে এ কলেজে জাহানের ছ’মাস কেটে যায়। জাহানের সাথে ইতোমধ্যে অনেকের ভালো ভাব জমে উঠেছে। কিন্তু রসায়নের শিক্ষক আকিব সাহেবকে ও সহজভাবে নিতে পারেনি। আকিব সাহেবের অতীত না জানলেও, জাহান বুঝতে পারে, পিতাকে নিয়ে গবেষণার কাজটি আকিব সাহেব পছন্দ করছেন না। মুখে কিছু না বললেও, জাহান ঠিকই এটা ধরতে পেরেছে। তাই পারতপক্ষে জাহান আকিব সাহেবের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকে।

টিচার্স রুমের সামনে আজিজ স্যার জাহানকে দেখে বলেন, ‘কেমন আছেন?’

‘স্যার, আপনি তো আমাকে তুমি বলতেন। এখন আপনি বলছেন কেন?’

‘বুড়ো হয়েছি তো। কখন কাকে কী বলি ঠিক রাখতে পারি না।’

‘স্যার, আপনি আমাকে তুমি বলবেন। আপনি তো আমার বাবার মতো। আপনার কাছ থেকে বাবার ¯স্নেহটা পেতে চাই।’

‘ঠিক আছে। তা তোমার মা এখন কেমন আছেন?’

‘হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছে। তবে হাঁটতে পারছেন না। ডাক্তার বলেছেন হাঁটার জন্য আরও কিছুদিন সময় লাগবে।’

‘সময় লাগুক। হাঁটতে পারলে হয়। নিজের কাজটা নিজে করতে পারা অনেক কিছু।’

‘দোয়া করবেন, স্যার। তাছাড়া মায়ের তো আগেই বড় একটা অসুখ আছে।’

‘হ্যাঁ, বলেছিলে।’

‘চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। উপরে একজন আছেন। তার উপর সব সময় আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে। তা তোমার গবেষণার কাজ কত দূর এগোলো?’

‘স্যার, এটা গবেষণা হবে কিনা জানি না। তবে কলেজ জীবন থেকেই পিতার উপর একটা কাজ করার ইচ্ছে করে এসেছিলাম- তাই।’

‘কত দূর হলো?’

‘প্রায় সব গুছিয়ে এনেছি।’

‘আমি তোমাকে একটা লেখা দিতে পারি। ঢাকা থেকে পেপার কাটিং নিয়ে এসেছি। তোমার গবেষণার কাজে লাগতে পারে।’

‘খুব ভালো হয়েছে। দিন, স্যার। তাছাড়া আমি আপনার কাছ থেকে পিতার ৬ দফা সম্বন্ধে কিছু জানতে চাই। শুনেছি ৬ দফার মধ্যেই ছিল আমাদের স্বাধীনতার বীজ।’

‘৬ দফা তুমি পড়েছ?’

‘ছোট সময় পড়েছি ভালো করে মনে নেই।’

আজিজুল হক স্যার তাঁর ফাইল থেকে একটা পেপার কাটিং এবং আলমিরার থেকে একটা চটি বই বের করে জাহানকে দিয়ে বলে, ‘আগে তুমি আবার ৭ দফা পড়ো, ততক্ষণে আমি হাতের কাজটা সারি, তার পর তোমার সাথে আলাপ করব।’

জাহান পেপার কাটিংটা ব্যাগে রেখে, বইটা খুলে ৭ দফা পড়তে শুরু করে।

অল্প কিছু দিনের মধ্যেই জায়গাটা জাহানের কাছে মায়াময় হয়ে ওঠে। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। চোখ ফেরানো যায় না। গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে মধুমতি নদী বয়ে চলেছে, যদিও এখন সবাই এটাকে মরা নদী বলে। নদী ড্রেসিং করে সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর এই ড্রেসিং করা বালু ফেলে নদীর পাড়ে বালুর মাঠ করা হয়েছে। জাহানের সবচেয়ে ভালো লেগেছে এখানকার মানুষদের। এত সহজ-সরল। কাজে-কথায় কোনো অমিল নেই। যতই সাধারণ মানুষের সাথে মিশছে, ততই তাদের কথায়-ব্যবহারে মুগ্ধ হচ্ছে জাহান। এ গ্রামের মধ্য দিয়ে চওড়া বিশ^রোড চলে গেছে গোপালগঞ্জ হয়ে টুঙ্গিপাড়া। জাহানের আর তর সইছে না কতক্ষণে টুঙ্গীপাড়া যাবে।

‘তা তুমি ছুটি নিয়ে ঢাকায় যাবে, মার কাছে?’

‘না, স্যার। আমি টুঙ্গীপাড়া পিতার স্মৃতিসৌধে যাব। পিতার ওপর আমার লেখাগুলো গুছিয়ে এনেছি। দুদিন ওখানে থেকে শেষ করব।’

‘তুমি একা যাবে, সাথে কাউকে নেবে?’

‘স্যার, আমি ওখানে গেস্ট হাউজ বুকিং দিয়েছি। তাছাড়া কাল ঢাকা থেকে আমার এক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নাদিয়া আসবে। ওকে নিয়ে যাব।’

‘ঠিক আছে যাওয়ার সময় আমি তোমাকে একটা চিঠি দিয়ে দেবো। ওরা তোমাকে সব ধরনের সহায়তা করবে। ওখানে বড় একটা লাইব্রেরি আছে জানো?’

‘শুনেছি, স্যার।’

‘প্রয়োজন মনে করলে ওখান থেকে তুমি বিভিন্ন তথ্য নিতে পারবে। তবে একটা জিনিস সব সময় মাথায় রাখবে। সবাই তোমার বন্ধু না। কেউ কেউ শত্রুও। যাচাই ছাড়া কাউকে বিশ্বাস করবে না। আপন ভাববে না।’

‘জি, স্যার। পিতা সবাইকে আপন ভেবেছিলেন। তাই তাঁর এ পরিণতি। আমরা নতুন প্রজন্ম এ থেকে শিক্ষা নেব, স্যার।’

‘আমিও আমার সব ছাত্র-ছাত্রীদের এই কথাটা বলি, বন্ধু শত্রু হলে সে হয় ভয়ংকর।’

‘স্যার, আপনি দেখি আমার বাবার মতো বলেন- ভাবেন।’

‘মারে ভেবে আর কী করতে পারলাম। না পারলাম তাঁকে বাঁচাতে। না পারলাম তাঁর আদর্শ ধরে রাখতে। এখন তো তাঁর জন্য দুচোখের জল ফেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না।’

কথাগুলো বলতে বলতে আজিজুল হক স্যারের দুচোখ ঝাপসা হয়ে ওঠে। তা দেখে জাহানও ডুকরে ওঠে। দুপ্রজন্মের দুজন মানুষ, চোখের জলে ভাসতে থাকে।

আগামী কাল নাদিয়া আসছে। ওর জন্য কী প্রতীক্ষা জাহানের। জাহান কথা রেখেছে। নাদিয়াকে ছাড়া টুঙ্গিপাড়া যাবে না। দু’বান্ধবী একসাথে যাবে। এখানে আসার আগে নাদিয়ার সাথে সে রকম কথা হয়েছিল।

নাদিয়া আকাশ পথে আসবে। ঢাকা থেকে যশোর। তারপরে নড়াইল কালনা হয়ে বাই রোড।

আজিজ স্যার জাহানকে বলেছিলেন, বন্ধু যে কয়দিন এখানে থাকবে, তাকে নিয়ে উনার বাসায় থাকতে, দুটো রুম খালি পড়ে আছে।

‘স্যার, কোনো অসুবিধা নেই। একসাথে থাকতে পারব। দুজন একসাথে না থাকতে পারলে মজা কোথায়!’

জাহান একথা যখন স্যারকে বলে, তখন জাহানের মনটা খট করে উঠেছিল, সেই রাতে নাদিয়া যা করেছিল, সেধরনের কিছু হবে না তো?

ভাবলে এখনো জবাফুলের মতো লাল হয় জাহান।

নাদিয়ার এখনও চাকরি হয়নি। ও এখন রাজনীতি করতে চায়। সেদিকেই হয়তো ছুটছে। তা না হলে ওর হাতে এত টাকাপয়সা আসে কোথা থেকে?

ইতোমধ্যে দুবার বিদেশ যাওয়া হয়ে গেছে। একবার ভারতে, একটা সাংস্কৃতিক দলের সাথে, আরেকবার লন্ডন। সাংস্কৃতিক দলের সাথে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। কারণ ও জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটি নাট্যদলের সাথে যুক্ত ছিল, তাছাড়া ভালো আবৃত্তি করতে পারত। কিন্তু লন্ডন কী ভাবে, কার সওয়ার হয়ে গেল, সে রহস্য কেউ ভেদ করতে পারেনি। জাহানের কাছে উড়োখবর আছে, নাদিয়া কোনো এক টিভি চ্যানেলের মালিকের সাথে ডুবসাঁতার খেলছে।

এই তো ঢাকা থেকে যশোর হয়ে আসার কথা শুনে জাহান বলেছিল, কী দরকার! ঢাকা থেকে সোজা বাই রোডে চলে আয়।

‘সময় বাঁচাতে।’

‘কী এমন কাজ করিস যে সময় নিয়ে ভাবছিস?’

‘যার নির্দিষ্ট কিছু করার নেই, তাকে অনেক কিছু করতে হয়।’

‘অনেক বলতে হবে না। শুধু একটা আমাকে বল।’

‘গেইস কর।’

‘বুঝি না তোর হেঁয়ালি কথা।’

‘দুদিনের চাঁদ ঘরে বসে দেখা যায়। দুদিন পর ঠিকই জানতে পারবি।’

এভাবেই জাহানের সাথে নাদিয়ার সর্বশেষ কথা হয়। জাহান বুঝতে পারে নাদিয়া আর আগের নাদিয়া নেই। জাহান দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

সংবাদটা প্রথম একজন আগন্তুক সবাইকে দেয়। আগন্তুক প্রতিদিন সকালে হাঁটতে না বেরোলেও আজ হাঁটতে বেরোয়। চাপ্তা জামে মসজিদে ফজরের নামাজ জামাতের সাথে পড়ে, তারপর হাঁটতে হাঁটতে বালুর মাঠের দিকে যায়।

কিছু দূর এগিয়ে জাহানকে ওভাবে পড়ে থাকতে দেখে।

আজিজুল হক স্যার খবর পেয়ে প্রথমে কাশিয়ানী থানাকে ইনফর্ম করে। পরে বুকের বাঁ-পাশটা চেপে ধরে বালুর মাঠে ছুটে আসে। আশপাশের কয়েকজন লোকও এসে জড়ো হয়। ততক্ষণে স্যারের বুকের ব্যথা অনেকটা বেড়ে গেছে। সেটা কাউকে বুঝতে দেন না। তিনি একদৃষ্টে চেয়ে থাকেন জাহানের নিষ্পাপ কচি মুখের দিকে।