menu

পতনের পর

আসমা চৌধুরী

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৩ অক্টোবর ২০১৯
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

ঘরে ঢুকে মিষ্টি একটা গন্ধ পায় শরীফ। রান্নাঘরে ভালোকিছু রান্না করছে সায়মা। মন ঢেলে গন্ধটা আবার নাকে ঢুকানোর চেষ্টা করে বাথরুমের দিকে যায় শরীফ। বাইরে থেকে ফিরে হাত-মুখ না ধুলে সায়মা খুব রাগ করে। একটু পরিচ্ছন্নতার বাতিক আছে। রান্নাটাও ভালো করে তবে ভালো রান্নার উপকরণ যোগান দিতে পারে না শরীফ। সামান্য জিনিস দিয়ে মজার রান্না করে সারাদিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় সায়মা। হাত-মুখ ধুয়ে, বাইরের কাপড় ছেড়ে আরাম করে বিছানায় বসে রিমোট টিপে টিভি অন করে শরীফ। বিছানার এক পাশে ঘুমিয়ে আছে প্রান্ত। শরীরটা ভালো নেই ওর। গায়ে জ্বর। শরীফ ছেলের কপালে হাত দিয়ে তাপ বোঝার চেষ্টা করে।

রান্নাঘর থেকে সায়মা বলে, খাবার দিচ্ছি উঠে বস। শরীফ জিজ্ঞেস করে, প্রান্ত খেয়েছে?

Ñ দুধ খেয়েছে। ঘুম থেকে উঠলে ভাত খাওয়াবার চেষ্টা করব। কিছু খেতে চায় না।

শরীপ ভাতে হাত দিয়ে চুপ করে বসে থাকে। দেখে সামনে হাঁসের মাংসের বাটি, টকটক করছে ঝোল, মিষ্টি গন্ধ। অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, হাঁসের মাংস কোথায় পেলে?

Ñ মা পাঠায়ে দিছে প্রান্তর জন্য। রাতে কয়েকটা চালের রুটি বানাবো, জানিনা খেতে পারবে কি-না। তুমি বসে আছ কেন? খাও।

শরীফ বলে, তুমিও আসো দুজনেই খেতে বসি।

Ñ না, ছেলে উঠুক ওকে আগে সামলাই।

শরীফের মনটা কেমন করে ওঠে। করুণ চোখে বলে, সায়মা একা একা খেতে ইচ্ছে করে না। আসো পাশে বসো।

প্রান্ত জেগে গিয়ে মাকে ডেকে বলে, বমি পাচ্ছে মা।

ভাতের থালা সরিয়ে দু’জনেই ছুটে আসে। প্রান্ত ওর মায়ের বুকের সাথে সেঁটে থাকে। শরীফ গামছা ভিজিয়ে আস্তে আস্তে মুছে দেয় প্রান্তর মাথা, পিঠ, বুক। ঠা-া হয়ে যায় ভাত-মাংস।

ছেলেকে মাঝখানে রেখে ক্লান্ত বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়ে। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রয়েছে গোল করা সাদা-ভাত, রঙিন হাঁসের মাংস।

সন্ধ্যায় প্রান্ত বলে, বাবা আমার জ্বর ভালো হলে বেড়াতে যাবো।

শরীফ বলে, যদি পেট ভরে ভাত খাও তাহলে যাব।

Ñ ঠিক যাবে তো? সবাই কুয়াকাটা যায় সমুদ্র দেখতে। আমরাও যাবো।

সায়মা বলে, ঠিক আছে বাবা, আগে খেয়ে নাও, তারপর আমরা বেড়াবার গল্প করব।

প্রান্ত বলে, আগে বলো বেড়াতে নিয়ে যাবে তো? সবাই কত জায়গায় যায়, আমরা যাই না।

Ñ তোমার বাবা তো ছুটি পায় না।

Ñ আমাকে বেড়াতে না নিয়ে গেলে আমি খাব না।

Ñ আচ্ছা, আচ্ছা এবার আমরা বেড়াতে যাব। তুমি খেয়ে নাও সোনা বাবা।

সায়মা ছোট ছোট লোকমায় প্রান্তর মুখে তুলে দেয় ঝোলমাখা ভাত। এক পাশে বসে শরীফও খেয়ে নেয় চটপট। মনে মনে একটা হিসেব কষে ফেলে। কুয়াকাটা যাওয়া, হোটেলে থাকা, খাওয়া, টুকটাকি কেনাকাটা কত খরচ হতে পারে। কিছু টাকা ধার করে হলেও এবার ছেলেটাকে নিয়ে ঘুরে আসবে। কোনদিন কোথাও যেতে পারেনি ওরা।

সায়মা বলে, পৃথিবীর সবাই ছুটি পায়, শুধু তুমি ছুটি পাওনা। ছেলেকে নিয়ে কোনদিন কোথাও গেলে না। আমি না হয় কিছু টাকা দিব। সংসার খরচ বাঁচিয়ে কিছু জমিয়েছি, সেগুলো দিয়ে দিব। তবু ছেলেটাকে খুশি করো।

শরীফ বলে, ক’দিন পরে প্রিন্সিপাল স্যার রিটায়ার্ড করবে। কিছু হিসাব বাকি আছে। স্যার চার্জ বুঝিয়ে দিলে আমি নতুন স্যারকে বলে ক’দিন ছুটি নিব। তুমি কিছু টাকা দিলে আর ধার করা লাগবে না। দুজনের টাকা মিলিয়ে এবার আমরা কুয়াকাটা বেড়াতে যাব।

ঘুমিয়ে পড়েছিলো শরীফ। মাঝরাতে কিছু একটা শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। সায়মার শাড়ি সরে গেছে পায়ের ওপরে অনেকটা। অভাবের সংসার সায়মার লাবণ্য কেড়ে নিতে পারেনি। নিভাঁজ শরীর। গমের মতো ফর্সা। ডিম লাইটের মৃদু আলোয় নিঃশ্বাসের তালে তালে কেঁপে উঠছে উন্নত বুক। অজান্তেই হাত চলে যায় সায়মার খোলা কাঁধে, বুকে। শরীফ জানে কোথায় স্পর্শ করলে জেগে উঠবে সায়মার শরীর। হাত দিয়ে বার কয়েক ছাড়াতে যায় সায়মা। হাল্কা প্রতিরোধ করে। এক সময় সারাদিনের ক্লান্ত, শ্রান্ত সায়মা প্রবল আবেগে জড়িয়ে যায় স্বামীর বাহুতে।

পরদিন জ্বর নেমে যাওয়ায় প্রান্ত তার খেলনাগুলো নিয়ে মেতে উঠেছে। শরীফের মনে পড়ে ছেলেবেলায় তার কোন খেলনা ছিল না, ওরা মাঠে-ময়দানে, নদীতে খেলেছে দল বেধে। বিরাট একটা দল ছিলো ওদের। সারাদিন শুধু খেলা। তারপর হঠাৎ মারা গেল বাবা। নদীতে ভেঙে নিলো জমি, বাড়ি। একসময় মাও চলে গেল পরপারে। একা নিঃস্ব শরীফ না খেয়ে, না ঘুমিয়ে এর ওর বাড়ি থেকে কোন রকমে বি.এ. পাস করে। অভাব ওকে আজও ছাড়েনি। বেসরকারী কলেজে একাউন্ট্যান্টের চাকরি। সারাদিন খাটতে হয়। বেতনের সরকারি অংশ পেলেও কলেজ থেকে বলতে গেলে কিছুই পায় না। ভাড়া বাড়িতে থাকে, সায়মার মতো শান্ত, ধৈর্য্যশীল স্ত্রী আছে বলে সংসারটা টেনে-টুনে চলে যায়। শাশুড়িও এটা সেটা পাঠায় নাতীর নাম করে। শরীফের তো কেউ নেই। দূর সম্পর্কের যারা আছে তারা অভাবী শরীফের খোঁজ করবে কেন? পথেঘাটে দেখা হলে কে কেমন আছে জানা যায়।

শরীফ তৈরি হয়ে কলেজে যাত্রা করে। আগে আগে পৌঁছাতে হবে। আজ স্যারের দেনা-পাওনার লিস্টটা দিতে হবে। প্রিন্সিপাল স্যার অবসরে গেলে শরীফ বড় একা হয়ে যাবে। স্যার ওদের চাচা হয়। বলা যায় পথ থেকে কুড়িয়ে এনে শরীফকে চাকরি দিয়েছে। যখন শরীফের পেটে ভাত ছিল না, ভিক্ষা করার উপক্রম তখন প্রিন্সিপাল জায়েদউদ্দীন ওকে দয়া করে এখানে চাকরি দেন। তিনি এই কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রিন্সিপাল আর শরীফ একাউন্ট্যান্ট। সেই থেকে প্রিন্সপাল স্যারের ছায়ায় আছে শরীফ। যতবার বিপদে পড়েছে, টাকার দরকার হয়েছে স্যার সাহায্য করেছে। শরীফের বিয়ের সময়ও বড় ভূমিকা রেখেছে সে। সায়মার বাবা আত্মীয় পরিজনহীন, নিঃস্ব শরীফের কাছে মেয়েকে বিয়ে দিতে চায়নি। প্রিন্সিপাল স্যার যখন আত্মীয় পরিচয় দিয়েছে এবং বলেছে, সে দায়িত্ব নিবে, তখন বিয়েটা হয়েছে।

২.

প্রিন্সিপাল স্যারের শেষ কর্মদিবস পার হয়। ভাইস প্রিন্সিপাল স্যার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও আনুষ্ঠানিক চার্জ বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। সভাপতির নির্দেশে অডিট শুরু হয়। দীর্ঘদিন ধরে অডিট না হওয়ায় কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভাউচার সংরক্ষণ, বেতন-ভাতা ওঠানো, প্রদানে সঠিক নিয়ম মানা হয়নি। অডিট কিছুটা এগিয়ে গেলে গভর্নিং বডির মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়। ভরা মিটিংয়ে ডাক পড়ে শরীফের। সভাপতি ভরাট গলায় প্রশ্ন করে, বলুন শরীফ সাহেব কলেজের আয়-ব্যয়ের হিসাবে গরমিল কেন? শরীফ কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে বলে, প্রিন্সিপাল স্যার যা টাকা-পয়সা নিয়েছে এবং ফেরত দিয়েছে সব একটা কাগজে লেখা রয়েছে। টিয়ারবৃন্দ ও অন্যান্য সদস্যবৃন্দ একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে। শরীফের মাথা ঝিমঝিম করছে, পা কাঁপছে। সে কী উত্তর দেবে? কলেজের যা আয়-ব্যয় সবই প্রিন্সিপাল স্যারের নিয়ন্ত্রণে থাকতো। যখন যা টাকা সে নিত শরীফ সাথে সাথে তা লিখে রাখত। হয়তো এক লাখ টাকা নিয়েছে আবার পঞ্চাশ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছে। এভাবেই চলতো। শরীফ একদিন বলেছিলো স্যার যে তারিখে টাকা নিচ্ছেন সাইন করে দেন। স্যার বলেছিলো ওসব লাগবে না, তুমি লিখে রাখলেই হবে। আবার কখনো কখনো নিজের থেকেই সাইন করে দিত।

সভাপতি আবার প্রশ্ন করে, আপনি সিগনেচার ছাড়া টাকা দিলেন কেন? এখন এই বিপুল অঙ্কের টাকার দায়িত্ব কে নেবে? আপনাকে তো এর জবাব দিতে হবে? থানা-পুলিশ হবে।

শরীফ কি বলবে? রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, খাবার জুটতো না। প্রিন্সিপাল জায়েদ উদ্দীন তাকে চাকরি দিয়ে রক্ষা করে। তার ওপরে শরীফের অগাধ আস্থা। কলেজের খুটি-নাটি কাজও শিখেছে তার কাছ থেকে। সে কেন এমন করলো? যাবার আগের দিন শরীফ তার কাছ থেকে পাওনা টাকার লিস্টটি তাকে দেখায়। প্রিন্সিপাল স্যার লিস্টটি দেখে গম্ভীর হয়ে যায়। পরের দিন যাবার সময় লিস্টটি ফেরৎ দিয়ে বলে, শরীফ এ কলেজের কেউ চোর নয়। লিস্টটি রেখে দাও। সেই থেকে শরীফ নিজেকে প্রশ্ন করে যাচ্ছে চোর তাহলে কে? কে চোর? মিটিংয়ে সবাই একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে, কেন টাকার হিসাব সিগনেচার ছাড়া রেখেছেন? কেন তাকে এতগুলো করে টাকা দিয়েছেন? এই টাকার সাথে আর কে কে জড়িত আছে? ঊনত্রিশ লাখ টাকার হিসাব দিবে কে? আপনি এখন কী করবেন? কোথায় পাবেন এত টাকা?

শরীফ কোন কথা খুঁজে পায় না। কেন এমন করলেন প্রিন্সিপাল স্যার। যখনই বকেয়া টাকার প্রসঙ্গ তুলেছেন তখনই বলেছেন, শরীফ এসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। সময়মতো ব্যালেন্স মিটিয়ে দেব। তাহলে এখন চুপচাপ চলে গেলেন কেন? কী করবে শরীফ এখন? কোথায় যাবে?

বাড়িতে ফিরে শরীরে কোন সাড়া পায় না শরীফ। সায়মাকেও বলতে পারছে না। টেবিলে চা ঠা-া হয়ে যায়, জামা-কাপড়ও খোলে না। রাত বাড়ে। অসহ্য যন্ত্রণায় মাথা ঘোরে। বুকের ভেতরে যন্ত্রণা হয়। প্রিন্সিপাল স্যার এমনটা করতে পারলেন? কী করবে এখন সে?

রান্নাঘর থেকে খুঁজে একটা দড়ি নিয়ে আসে। ক্লান্ত সায়মা অঘোরে ঘুমাচ্ছে। চেয়ারের ওপরে উঠে ফ্যানের সাথে দড়ি বাঁধে। গলায় জড়ায়, এখন পা দিয়ে চেয়ারটা ফেলে দিলেই হয়। অন্ধকারের ভিতরেও পরিচিত ঘরের সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের ঘুমাবার খাট, ছোট খাবার টেবিল, রান্নাঘর, তাকের ওপরে গুছিয়ে রাখা বাক্স, জানালার পর্দা, কোরআনশরীফ, জায়নামাজ।

শরীফ কোন উপায় খুঁজে পায় না আর। পা ওঠায় চেয়ারটা ফেলে দিতে হবে। পা ওঠায়, হঠাৎ প্রান্তর কান্না শোনা যায়...