menu

নৈঃশব্দ্যের ঢেউ : যাপিত জীবনের ভাবানুবাদ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০১৯
image

তাহমিনা খানের কবিতার বই ‘নৈঃশব্দ্যের ঢেউ’ বেশ কিছু কবিতার বহুবিস্তৃত ভাবনায় সংকলিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাগুলো আকৃতিতে মধ্যমমানের এবং উচ্চারণগুলো নিপাট ও অনায়াসসাধ্য ছন্দোময়। আলোচ্য গ্রন্থে যে বিষয়টি লক্ষ্যযোগ্য তা হলো, কবির ভেতরের প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস যেন বিস্তৃত আকাশ পেয়েছে উড়ে যাবার। কিংবা বলা যায়, কবির দীর্ঘদিনের ভাবনামালা পুঞ্জিভূত হতে হতে কখন যেন অনায়াসে বেরিয়ে এসেছে খুব গভীর থেকে। কংক্রীটের জীবনে বসবাস এই আধুনিক মানুষের। ক্রমবিচ্ছিন্নতা আর মেনে নেয়ার এ খেলা যেন চলছে এবং চলতে থাকবে অমোচনীয় উপায়ে। তারপর একদিন এসবেরও অবসান হবে আরো নির্জনতায়।

কবির ভাষায় এ যেন একটি বুনোলতাকে টবে স্থানন্তরের মতো। সেখানেও আছে জীবন। আছে ফুল ফোটা। কিন্তু আকাক্সক্ষা? সে তার আকাশ খুঁজে পায় না।

হলদে পাতার বুকে আকাঙ্ক্ষারা মৃতপ্রায়

ব্যালকনির রূঢ় আঙুলে ঝুলে আছে অসহায়,

গোধূলি আকাশ যখন ছড়ায় আবির

তেষ্টায় ছটফট ভেতর বাহির।

[বুনোলতা, পৃষ্ঠা. ১১]

চার দেয়ালের সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যালকনির নির্বাচিত আলোয় কি বুনোলতার তৃষ্ণা মেটে? কবি বুনোলতাকে প্রতীকায়িত করে এঁকেছেন একটি সময়ের ইশতেহার। যে সময় আমাদেরকে অফুরন্ত সবুজ ও সীমাহীন আকাশ থেকে দূরে সরিয়ে কংক্রীটের আবাসে সীমাবদ্ধ করেছে। এর ভেতর দিয়ে তাহমিনা যে তার দীর্ঘশ্বাসের অনুবাদ করেছেন তা মহার্ঘ, যথার্থ।

তাহমিনা খানের কবিতা যেন প্রকৃতি ও সময়ের বিবর্তনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকা এক মুখর মানুষের গান; যার মুখরতা শুধু ব্যয়িত জীবনকে সুতোয় গেঁথে গেঁথে তার পরিণত দৃশ্যায়নের দিকে তাকিয়ে থাকা। সে দৃশ্য একবার যেমন স্থির আর একবার তা গতিময়। তার আর একটি কবিতা ‘নিস্তরঙ্গ জল’। এই নামকরণের ভিতর দিয়ে ব্যাপক ইঙ্গিতময়তা অনুরণিত করেন। বৃক্ষের প্রাণ যেমন বায়ুনির্ভরতায় উচ্ছল, তেমনি জলের প্রাণ তরঙ্গ ও স্রোত নির্ভরতায় আবেদনময়।

এই নিস্তরঙ্গ জলে তাহমিনা নিজেকে প্রতিস্থাপন করে কী দেখতে পান?

জেগে আছি যেন নিস্তরঙ্গ জল;

অতর্কিতে ডানার ফাঁপরে

অবাক পাখি টুপটুপ ডুবে

অসময়ে ফোটায় আকুলি বিকুলি ঢেউ!

কবেকার চৈত্রে খরায় পুড়েছে পালক

এখনো সে দাহবোধ, হাপিত্যেশ!

অতন্দ্র সে খোঁজে বুঝি তাই

এই শীতজলে উপশম!

[পৃষ্ঠা. ১৭]

কবির ভাবনাটা যেন এখানে গতির বিপরীতে আর এক গতি। ষড়ঋতুর সম্মোহনে জল বহুরূপায়িত হয়ে একবার উত্তুরে হাওয়ায় নির্মম কৌতুক হয়ে যায় আর একবার চৈত্রে তার পালক পুড়ে যায়। কবির এই সিম্বলিক বর্ণনা পৃথিবীর পরিবর্তিত বাস্তবতা দিয়ে বুঝে নেয়া যায়। মানুষের স্বপ্নহীনতা কিংবা নিদারুণ কষ্টের সময়গুলো যেন ফুরোতে চায় না। জমাট বরফের মতো পড়ে থাকে। তাহমিনার রাত্রিগুলো তেমন অগণ্য হতাশা দিয়ে ভরা, কষ্ট দিয়ে মোড়া। এবার সব কিছু ছেড়ে শুধু স্বপ্নহীনতায় বিভোরে ঘুমাতে চান তিনি।

আবার এ থেকে উত্তরণের পথেরও সন্ধান তিনি করেছেন। এবং সেখানে আবার স্বপ্নের ছোটবৃক্ষ রুয়ে দিতে ভুল করেননি। ‘কখনো আসে যদি ভোর’ কবিতায় বলেন- ‘কখনো আসে যদি এমন ভোর/ সবাই জেগে উঠব একসাথে/ পাখিদের মতন।’

এ কবিতায় কবির উচ্চারণ ঘোরশূন্য, ঋজু ও সরাসরি।

তাহমিনার অধিকাংশ কবিতায় এই গভীর জীবনবোধ লক্ষ্যযোগ্য। তিনি একজন ঘোরগ্রস্ত কবি ও জীবনকে নিংড়ে দেখা মানুষ। তার কবিতার ভাষা সুনির্বাচিত ও সাবলীল। চিত্রকল্পের নতুনত্ব লক্ষ্যযোগ্য। উপমা ও প্রতীক ব্যবহারে তিনি সহজ সাফল্য অর্জন করেছেন। তার সংযমী কথা বলা ও তাকে বোধের মীমাংসায় পৌঁছে দেয়ার পারঙ্গমতায় প্রাজ্ঞতা দেখিয়েছেন।

প্রকৃতি থেকে উপমা এবং পঠিত জীবন থেকে স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের গভীর বোধ তাড়িত তাহমিনার আলোচ্য গ্রন্থটি আমাদের সাহিত্যে এক দরকারী সংযোজন।

নৈঃশব্দ্যের ঢেউ ॥ তাহমিনা খান ॥ প্রকাশক : আগামী প্রকাশনী ॥ প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ॥ প্রচ্ছদ : আনওয়ার ফারুক ॥ মূল্য ১৫০ টাকা।

-ওবায়েদ আকাশ

  • গল্প সংখ্যা

    তালুকদারের হৃদয়-বাসনা

    দিলার মেসবাহ

    newsimage

    তোতা মিয়া তালুকদারের ছায়ার চেয়েও নিকটে। মিয়া সারক্ষণ হাসতে থাকে। মুদ্রাদোষ। তোতার

  • ভালো মানুষ

    হাইকেল হাশমী

    newsimage

    আমরা যখন তাকে পতিতাপল্লী থেকে উদ্ধার করলাম তখন সে অজ্ঞান ছিল। তার

  • রোদনপাখি

    শিপা সুলতানা

    newsimage

    ঘোর অন্ধকার রাত, তবু গ্রামে ঢুকতে কোনো অসুবিধা হলো না আমার। গ্রামে

  • সফুরার কুড়িয়ে পাওয়া মোবাইল এবং

    ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন

    newsimage

    চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়। হঠাৎ করেই ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে আকাশ।

  • অসম্পূর্ণ গল্প (পর্ব ২)

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) তৃতীয় অধ্যয় - আমি কিন্তু আসলেই ডাক্তার, ভাই! ইন্টার্নি করা হয়ে

  • ‘রক্তকরবী’ ও রবীন্দ্র-নাট্যদর্শন

    এমিলি জামান

    newsimage

    “উপনিষদ বলেন, প্রাণই সত্য, তার মৃত্যু নেই... ‘রক্তকরবী’তে আমি সে কথা বলেছি।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    অশ্বচালক ইদ্রিস সরকার কাঁটা তারে ছিন্ন হয় হৃদয়ের অনন্ত সাহস সারিবদ্ধ পাখি বৃক্ষে বৃক্ষে খোঁজে