menu

নিরাপত্তা

জান্নাতুল ফেরদৌস

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ জুলাই ২০১৯
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

বেলা এগারোটার দিকে আমি পৌঁছালাম সেই গ্রামটাতে। এখন আমি ভিকটিমের বাড়ির ছোট উঠানটিতে একহাতল ভাঙা একটা কাঠের চেয়ারে বসে আছি। কটকটে রোদে একটা আম গাছের ছায়ায় আমাকে বসতে দেওয়া হয়েছে। ছোট উঠানটা ঘেঁষে একটা দোচালা মাটির ঘর। ঘরটির চালার টিন এতোই পুরনো যে, ওটাকে টিনের দেহবাশেষ বলা চলে। গতকাল রাতে ঢাকা থেকে আমি রওনা দিয়েছি। এখানকার একজন স্থানীয় সাংবাদিককে আগেই জানানো ছিল। তার সাহায্যেই আমি এখানে এসেছি। আমাকে ঘিরে এই বাড়ির কয়েকজন প্রতিবেশি দাঁড়িয়ে আছে। ভিকটিমের বাবা ও মা ঘরটির সাথে লাগোয়া বারান্দায় বসে আছে। তারা তেমন কোন কথা বলছে না। প্রতিবেশিরাই বেশ উৎসাহের সাথে কথা বলছে। খুব তৃষ্ণার্ত লাগলো। আমি বললাম, “এক গ্লাস পানি হবে?”

প্রতিবেশিদের একজন দৌড়ে গিয়ে তার বাড়ি থেকে পানি ও একটি বাটিতে কয়েকটা নাড়ু নিয়ে হাজির হলো। আমি পানিটা এক নিঃশ্বাসে পান করলাম। ডিপ টিউবওয়েল থেকে আনা পানি। কেমন যেন মাটির সোঁদাগন্ধ। এখনও তৃষ্ণায় গলাটা শুকিয়ে আছে, তবু এই গন্ধযুক্ত পানি আর চাই না।

আমার সাথে আসা সাংবাদিককে কাছে ডেকে ফিসফিস করে বললাম, “বাইরের লোক সরান, না হলে এরা কিছু বলবে না।”

সাংবাদিক একবার গলা খাকারি দিয়ে বললো, “কী রে ভাই তোগো কাজকাম নাই। যাও যে যার বাড়ি যাও। আমাদের কাজ করতে দেও।”

কথাটা শুনেও কেউ জায়গা থেকে নড়লো না। যেন তাদেরকে কিছু বলাই হয়নি।

সাংবাদিক: তাইলে ভাই তোরাই থাক, আমরাই জায়গা। কী রে তোরা কেউ নড়স না ক্যান?

এবার লোকগুলো একটু নড়েচড়ে উঠলো। চাপা গলায় এলোমেলো কথা বলতে বলতে চলে গেল সবাই। নাড়ুর বাটি আর গ্লাসটা মালিকের হাতে দিয়ে দিলাম।

আমি এবার কথা বলা শুরু করলাম, “শোনেন আমি ঢাকা থেকে এসেছি শুধু আপনাদের কাছ থেকে কথা শোনার জন্য। আপনাদেরকে সাহায্য করাই আমার উদ্দেশ্য। কী ঘটেছিল আমাকে বলেন।”

ভিকটিমের বাবা এবার উত্তর দিল, “সবাই এতোক্ষণ যা বলছে, তাই ঘটছে।”

লোকটির গলাটা কেমন যেন ক্লান্ত শোনালো।

সাংবাদিক বললো, “শোন ভাই ভয় পায়ো না। তোমাদের অসুবিধার কথাগুলো বল। ভাই ঢাকায় গিয়ে যে রিপোর্ট করবেন, তাতেই তোমাদের অনেক উপকার হবে।”

ভিকটিমের মা এবার বারান্দা থেকে উঠে ঘরের ভিতরে চলে গেলেন।

লোকটা এবার আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললো, “শোনেন আমি বর্গাচাষি। কোনমতে খেয়েপরে পরিবার নিয়ে বেচেঁ আছি। এর মধ্যে মেয়েটার এই দশা হলো। দারোগা সাব প্রথমে কেইস নিল না। চেয়ারম্যান বাড়ি এসে বলে গেল, দুই হাজার টাকা দিব, আর কথা বাড়াস না। আমি টাকা নেই নাই। এর মাঝে চেয়ারম্যানের সেই বজ্জাত ভাগনে রাকিব এসে বললো, “খুব মজা লাগছে। মেয়ে সুস্থ হলে আবার তুলে নিয়ে যাব।” লোকটা একটু দম নিয়ে আবার বলা শুরু করলো, “আমি তখন কি করবো বুঝলাম না। মেয়ের শরীর এর মাঝে অনেক খারাপ হয়ে গেল। হাসপাতালে না নিলে বাঁচানো যাবে না। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর লোক জানাজানি হলো। সাংবাদিকরা আমাকে নিয়ে থানায় গেল। এবার কেস নিল তারা। কিন্তু সেদিন রাতে রাকিব আবার আসলো। আমারে মারধোর করলো। এবার মেয়ের মারে তুলে নিয়ে যাবে বলে গেছে। এই এক সপ্তাহ হল, মেয়েটারে হাসপাতাল থেকে আনছি। একটা গাই ছিল। রাকিব সেইটা নিয়ে গেছে। থানায় গেছি, সারাদিন বসিয়ে রাখলো। কেউ আমার সাথে কথাও বলার সময় পেলো না। আপনারদের কাছে আর কি লুকাবো। ভিটেটা গোপনে বিক্রির চেষ্টা করতেছি। হাতে কিছু নগদ টাকা পাইলেই আমি এ গেরাম থেকে চলে যাব।”

আমি একটা বড় নিঃশ্বাস টেনে বললাম, “শোনেন আমরাই আপনার আইনি সহায়তার ব্যাবস্থা করবো। প্রয়োজনে মেয়েটির ভালো চিকিৎসার ব্যাবস্থা করবো। আপনি ভয় পায়েন না।”

লোকটি হেসে উঠলো, “আপনেরা ঢাকায় থাইকা সাহায্য করবেন। কিন্তু এখানে থাকতে হবে আমাকে। আমার আর কোন সাহায্য লাগবে না।”

আমি এবার বললাম, “মেয়েটির সাথে একটু দেখা করতে চাই।”

ভিকটিমের মা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে এই প্রথম কিছু বললো, “মেয়েটার ভয় এখনও কাটেনি। ওর বাবারে দেখলেও চমকে চমকে ওঠে।”

আহারে মনটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো আমার। আমি বললাম, “ঢাকা থেকে আসলাম, ওর সাথে একটু যদি দেখা না করি... আমি অল্প সময় থাকবো ওর সামনে। একটু দেখা করার সুযোগ দেন বোন।”

মহিলাটি এবার তার স্বামীর দিকে একবার তাকালেন। এরপর বললেন, “আসেন।”

আমি তার পিছনে পিছনে ঘরটাতে ঢুকলাম।

মাঝারি সাইজের একটি ঘর। একপাশে একটি বড় চৌকি। ঘরে দড়ি বাঁধা কয়েকটা। যেখানে কাপড় চোপড় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। একটা টিনের ট্রাঙ্ক, কিছু হাঁড়িপাতিল একপাশে রয়েছে। চৌকিটার পাশেই একটা জানালা। মেয়েটি সেদিকে মুখ করে শুয়ে আছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। মেয়েটির মা চৌকিটার এক কোনায় বসে মেয়েটির একটা পা ছুয়ে ডাকলো, “পারুল, ঘুমাস নাকি!”

মেয়েটি এবার মুখ ফিরে তাকালো। মায়ের দিকে তাকিয়েই ওর চোখ পড়লো আমার উপর। অমনি সে তাড়াহুড়ো করে পাশে থাকা একটা কাঁথা দিয়ে নিজেকে পেঁচিয়ে ফেললো। এক মুহূর্তের জন্য আমি ওর মুখটা দেখতে পেয়েছি। কী গভীর দৃষ্টি ওর!

কাঁথা জড়িয়ে একটা কাপড়ের দলার মতো মেয়েটা পড়ে রইলো। একটুও নড়ছে না। আমি এবার চৌকিটার এক কোনায় বসে বললাম, “পারুল তোমার নামটাতো খুব সুন্দর। আমার একটা মেয়ে আছে। তোমার থেকে একটু বড়। ওর নাম জুই। তোমাদের দুজনের নামই ফুলের নামে।”

মনে হলো মেয়েটি একটু যেন নড়েচড়ে উঠলো।

আমি আবার কথা বলা শুরু করলাম, “শোন মা পৃথিবীর সব মানুষ খারাপ না। তুমি যেন আবার স্কুলে যেতে পার আমরা সেই চেষ্টা করব। আমি তোমার জন্য চকোলেট নিয়ে আসছি। তুমি খাবে। কোন চকোলেট তোমার ভালো লাগলো আমাকে জানাবে। আমি সেটা পরেরবার বেশি করে আনবো।”

আমি এবার উঠে দাঁড়ালাম। পারুল ও ওর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি ঘরটি থেকে বের হয়ে এলাম। উহ কী গরম! বাইরে তাও একটু বাতাস আছে।

মেয়েটির বাবা এখনও আগের মতই বসে আছে। আমি আগের চেয়ারটিতে গিয়ে আবার বসলাম।

আমি বললাম, “আপনি এতো ভেঙে পড়বেন না। আমি আজই থানায় যাব। আপনার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবো।”

লোকটি এবার বললো, “আমাদের আর নিরাপত্তা!”

আমি বললাম, “ হতাশ হবেন না। আমরা আপনার পাশে আছি।”

লোকটা বললো, “কে কার নিরাপত্তা দেয়। আপনি যে এখানে বসে আছেন, আপনার পোলামাইয়ারে কে নিরাপত্তা দিচ্ছে বলেন তো?”

লোকটার কথাটা আমার মগজের কোথায় গিয়ে যেন ধাক্কা দিল।

আমি আরো কিছু বিষয়ে আলাপ করে রওনা দিলাম জেলা শহরের পথে। স্থানীয় সাংবাদিকটির বাইকে আমরা যাচ্ছি। পুরোটা পথ আমি জুঁই-এর কথা ভাবলাম। আমি একটা এনজিওতে কাজ করি। সারাদেশে ছুটে বেড়াই কাজে। ওর মা ব্যাংকে চাকরি করে। মেয়েটিকে আমরা সময় দিতে পারি খুব কম। ড্রাইভার ওকে আনানেওয়া করে। বাড়ির কেয়ারটেকার একজন পুরুষ, বাসায় তার আনাগোনা হরহামেশাই চলে। বাসায় এসে একজন পুরুষ শিক্ষক মেয়েটাকে পড়াতে আসেন। একটা গানের স্কুলে সপ্তাহে দুইদিন যায় সে। সাঁতার কাটা শিখতে যায় দুইদিন। এ সব কিছুই ও একা একা করে। কতোইবা বয়স জুঁইয়ের। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে সে। এ সব জায়গায় ওকে কোন বাজে পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে কিনা আমি কোনদিন খোঁজও নেইনি। এইতো কদিন আগেই ও আমকে বললো, “বাবা আমি আর সাঁতার শিখতে যাব না।”

কথাটা শুনেই আমি ধমকে বললাম, “কেন যাবে না। কতগুলো টাকা দিয়ে তোমাকে ভর্তি করেছি। ঐ টাকাতো ওরা ফেরত দেবে না। সাঁতার শিখে তারপর যাওয়া বাদ দাও।”

জুঁই তখন কি যেন একটা বলতে গেল, আমি ওকে থামিয়ে দিয়েছিলাম।

আহারে কী বলতে চেয়েছিল আমার মেয়েটা। ওর কী কোন অসুবিধা হচ্ছে সেখানে। মনটা কেঁদে উঠলো আমার। সত্যিই তো আমার মেয়ের নিরাপত্তা কি আমি দিতে পারছি?

মনে হলো এখনই যদি ছুটে মেয়েটার কাছে যেতে পারতাম!

এই প্রচন্ড গরমে আমার ভয়ে কুঁকড়ে কাঁথা জড়িয়ে থাকা পারুলের কথা মনে পড়লো। আহারে জীবন, আহারে নিরাপত্তা। পারুলদের নিরাপত্তা দেওয়ার সামর্থ্য আসলেই কি আমার আছে?

পারুলের চোখের চাহনিটা মনে পড়লো আমার। আমি সেখানে ভয় না ঘৃণা দেখতে পেয়েছি।

  • বিশ্বসাহিত্য সংখ্যা চার

    ক্যারল অ্যান ডাফি এই সময়ের কবি

    উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    আবেগপ্রবণতা অথবা কাঠিন্য, কৌতুকরসবোধ অথবা গীতিবিন্যাস, রীতিবিরুদ্ধ মনোভাব অথবা প্রচলিত ধারা, যাদুবাস্তবতা

  • ক্যারল অ্যান ডাফির কবিতা

    ভাষান্তর : উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    তাঁর মুক্তাগুলোকে উদ্দীপ্ত করা আমার নিজের ত্বকের পাশে, তাঁর মুক্তা খচিত গহনা। আমার

  • ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে

    হাসান অরিন্দম

    newsimage

    একটি চিহ্নিত ভূখন্ডে মানবসন্তানের জন্ম হয়, আর আমরা পাই এক-একটি মাতৃভাষাও। সেই

  • ডব্লিউ এস গ্রাহাম-এর অপ্রকাশিত কবিতা

    ভূমিকা ও অনুবাদ : মিলটন রহমান

    newsimage

    সম্প্রতি স্কটিশ কবি ডব্লিউ এস গ্রাহাম-এর কিছু অপ্রকাশিত কবিতা প্রাপ্তির কথা জানিয়েছে

  • একজন মানুষ

    মূল : ভায়াকম মোহাম্মদ বশীর
    ভাষান্তর : নীতিন রায়

    newsimage

    আপনার নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা নেই। আপনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে বহুদূরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

  • আষাঢ়ে, বরিষণে

    newsimage

    তোমার কথা ভাবছিলাম বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর তোমার কথা ভাবছিলাম তুমি এলে না, বৃষ্টি এলো সেই

  • কানিজ পারিজাতের শিহরন জাগানো গল্পগ্রন্থ ‘জলশিহরন’

    অঞ্জনা সাহা

    newsimage

    কানিজ পারিজাত একজন গল্পকার। কিন্তু তাকে আমি কবি বলেই জানতাম! প্রথম যেদিন

  • ভারতের বুকে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ

    মাটি চাপা হুঙ্কারের ইতিহাস ও নকশালবাড়ি

    গৌতম গুহ রায়

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) তেভাগা’র আন্দোলনে জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সের ইতিহাস এক ব্যতক্রমী ঘটনা। এখানে কৃষকের