menu

নিরাপত্তা রক্ষী

এম নাঈম

সংবাদ :
  • মূল উর্দু থেকে অনুবাদ হাইকেল হাশমী
  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

লাশটি মাটির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আর গ্রামের মানুষরা চারিদিকে জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। রামু চিন্তা করলো যে, থানা থেকে পুলিশ ডেকে লাশটা তাদের কাছে হস্তান্তর করা উচিৎ, আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয়া মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। সবাই তার সাথে একমত হলো।

গত কয়ক মাস ধরে গ্রামে ডাকাতির ঘটনা অতি মাত্রায় বেড়ে গিয়েছে, তা নিয়ে সবাইকে আতঙ্কে থাকতে হয়। সবার একই চিন্তা যে, কী করে ডাকাতদের ঠেকানো যায়, ডাকাতির যেন ঘটনা আর না ঘটে তার জন্য কী ব্যবস্থা নেয়া যায়।

রামু বলল যে ডাকাতি থামানোর জন্য ডাকাত গ্রেপ্তার করা খুবই প্রয়োজন আর ডাকাতদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশের সাহায্য অতি প্রয়োজন। রামু’র এই কথায় অনেকেই সহমত পোষণ করলো। কিন্তু অনেকেই দ্বিমত করলো, তাদের যুক্তি হলো ইদানীং পুলিশ আগের মতো আর কর্তব্যপরায়ণ নয় যে, তিন মাইল দূর থেকে এসে আমাদের গ্রামে ডাকাত ধরতে সাহায্য করবে।

তারপরও যারা রামুর পরামর্শে খুব বেশি খুশি হয় নাই অন্য কোন উপায় না দেখে তারাও ওর কথা মেনে নিল। পর দিন রামু তার সঙ্গে রঙ্গো চৌধুরীকে নিয়ে থানায় গেলো। তার ইচ্ছা ছিল যে দারোগা বাবুর সাথে দেখা করে সরাসরি তাকে সব ঘটনা জানাবে কিন্তু হাবিলদার তাদের জানালো যে দারোগা বাবু অসুস্থ আর সুস্থ হলেই কাজে যোগদান করবেন। তারপর তারা হাবিলদারকে ডাকাতির সব ঘটনা জানালো এবং খুব মিনতি করল যেন ডাকাতি থামানোর জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ তারা নেন।

হাবিলদার কিছুক্ষণের জন্য চিন্তার মহাসাগরে ডুবে গেল তারপর হঠাৎ স্বপ্নভঙ্গ করে জেগে উঠে বলল, “দেশটা এই জন্য স্বাধীন করি নাই যে, আমরা নিত্যদিন নতুন নতুন অসুবিধার সম্মুখীন হবো। কখনো ডাকাতি, কখনো ছিনতাই, কখনো খুন আর কখনো ধর্ষণ”, তিনি লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বললেন, “আমরা অর্থাৎ পুলিশ চেষ্টা করে যাচ্ছি যেন এই দুর্ঘটনাগুলো বন্ধ হয়, আমরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন জনতা, স্বাধীন পরিবেশে, শান্তিপূর্ণভাবে যেন বেঁচে থাকতে পারি। এর জন্য আপনাদের সবার সহযোগিতা আমাদের প্রয়োজন।”

তারপর তারা ডাকাতির রিপোর্ট করে গ্রামে ফিরে এলো।

কয়েক দিন পর গ্রামের লোকেরা দেখলো সন্ধ্যাবেলা কয়েকজন পুলিশ গ্রামে প্রবেশ করে এবং ভোরবেলা থানার দিকে ফিরে যায়। এই অবস্থা সপ্তাহব্যাপী চলল আর এই পুলিশ পাহারার সময় ডাকাতি বা চুরির কোন ঘটনা গ্রামে ঘটে নাই, কোন ডাকাতের ছায়া পর্যন্ত দেখা যায় নাই। তখন গ্রামবাসীদের বিশ্বাস ফিরে এলো যে, আর এই গ্রামে ডাকাতি তো দূরের কথা চুরিও হবে না। গ্রামবাসীদের এই আস্থার পর পুলিশের পাহারা তুলে নেয়া হলো। গ্রামবাসীরা এখন শান্তিতে ঘুমাতে শুরু করলো, তাদের ডাকাতির আতঙ্ক কেটে গেলো।

কিন্তু পুলিশের পাহারা প্রত্যাহার করার কয়েক দিন পরে রঙ্গো চৌধুরীর বাসায় ডাকাত পড়লো। তারপর পুরা গ্রামে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লো। গ্রামবাসীরা আবার ডাকাতদের হাত থেকে বাঁচার সমাধান খুঁজতে শুরু করলো। সবার মুখে চিন্তার ছায়া, সবাই ভয়ে ভয়ে থাকছে। একে অন্যের সাথে দেখা হলেই একই প্রশ্নÑ এখন কী হবে?

যেহেতু রঙ্গো চৌধুরী গ্রামের একজন প্রভাবশালী, সম্পদশালী, ধনী ব্যক্তি, তিনি বেশ দয়ালু লোক, গরিবদের জন্য ওনার দ্বার সবসময় খোলা আর তাদের সাহায্য করতে তিনি মোটেও কার্পণ্য করেন না, তাই ওনার বাসায় ডাকাতি হওয়াতে গ্রামবাসীদের মধ্যে রাগ আর ক্ষোভের এক ঝড় বয়ে গেলো।

রামু গ্রামের লোকদের জড়ো করে বলল যে, এই ঘটনা আমাদের পুলিশকে জানানো দরকার। কিন্তু অনেকে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলো যে আগে জানিয়ে কী লাভ হয়েছে? পুলিশ আর কয়দিন পাহারা বসাবে? এইসব ফালতু কথা, আমরা কতো দিন তাদের পাহারার ওপর নির্ভরশীল থাকবো?

“পুলিশ যদি গ্রামে পাহারা দেয় তাহলে আমরা শান্তিতে ঘুমাতে পারি” রামু তার কথায় গুরুত্ব প্রয়োগ করে বলল, “তাই থানায় জানানোটা আমাদের জন্য খুবই জরুরি।”

“আমরা আমাদের রক্ষা নিজেরাই করি” বিজয় কুমার কথা বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, “এটা মোটেও জরুরি না যে পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা দিবে, নিজের নিরাপত্তার রাস্তা নিজে বের করাই শ্রেয়”।

ওর কথা শুনে সবাই এক সুরে বলে উঠল, “তাই হোক, আজ থেকে আমরা আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেই করবো।”

তারপর একটা তালিকা করা হলো যেখানে গ্রামের সব যুবকের নাম লেখা হলো। আরো সিদ্ধান্ত হলো যে, প্রত্যেকটা যুবক একদিন অন্তর পাহারা দিবে। এই তালিকা অনুযায়ী গ্রামের সব যুবক পাহারা দেয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।

কিন্তু রামু জেদ ধরল যে সে প্রত্যেক দিন পাহারা দিবে। তার একটা বড় কারণ যে গ্রামে সব চেয়ে প্রথম তার বাসায় ডাকাতি হয়েছিল। ডাকাতেরা সারা বছরের শস্য ছাড়া, সোনা আর রুপার গয়না সব নিয়ে গেলো। ওর মা তার হবু বউয়ের জন্য গয়না বানিয়ে রেখে ছিল। তাই ওর মাথায় সারাক্ষণ ডাকাতদের কথা ঘুর-পাঁক খেতো এবং সে মনে মনে ভাবতো যদি সে ডাকাতদেরকে নাগালে পায় তাহলে ক্ষিপ্ত বাঘের মতো তাদেরকে চিবিয়ে খাবে। তাই সে প্রত্যেক দিন পাহারা দিতে প্রস্তুত আছে।

কয়েকদিন পর আমাবস্যার রাত। পুরা গ্রাম অন্ধকারে ডুবে আছে এবং গ্রামে পাহারা দেয়া হচ্ছে। আধা রাতে তারে দেখলো কিছু মানুষের ছায়া গ্রামে প্রবেশ করছে, পাহারাদাররা নিজেদের মধ্যে ইশারায় কথা বলল আর সাবধান হয়ে গেলো। ছায়াগুলো কাছাকাছি এলে তারা তাদের হাতে চকচকে ছোরা আর চাপাতি দেখতে পেলো, তাতেই বোঝা গেলো যে তারাই ডাকাত। রামু হুইসেল বাজানোর সাথে সাথে সবাই ডাকাতদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে রামু একটা ডাকাতকে, যে অন্য ডাকাতদের তুলনায় বেশি সাস্থ্যবান দেখাচ্ছিল, রাম দা দিয়ে আঘাত করলো এবং সে সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ডাকাতের অন্য সঙ্গীরা নিজেদের জান বাঁচানোর জন্য পালিয়ে গেলো।

গ্রামের প্রত্যেকটি লোক, যাদের মুখে সব সময় চিন্তার ছায়া নাচতো, এখন সবার মুখে আনন্দ আর খুশির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। মনে হয় যেন তারা নতুন জীবন খুঁজে পেয়েছে, কোন বিরাট বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা পেয়েছে। তাই এই মৃত ডাকাতকে দেখার জন্য ওই গভীর রাতে গ্রামের লোকেরা ছুটে এলো।

ভোরের আলোর সাথে সাথে রামু দৌড়িয়ে থানায় গেলো।

“হাবিলদার সাব, কাল রাতে আমাদের গ্রামে ডাকাত এসেছিল, আমরা ডাকাতদের প্রতিহত করতে পেরেছি, এবং মনে হয় তাদের সরদার মারা গেছে।”

“শাবাশ, শাবাশ,” হাবিলদার মুগ্ধ হয়ে বলল।

“হাবিলদার সাব, এখন লাশ কী করবো, দাফন করে দিবো না কি টুকরো টুকরো করে চিল-কাককে খাইয়ে...”

“না না”, রামুর কথা শেষ হবার আগেই হাবিলদার চিৎকার দিয়ে উঠলো, “লাশের ময়না-তদন্ত হবে।”

রামু যখন হাবিলদারকে সঙ্গে করে গ্রামে ফিরলো তখন অনেক লোক লাশকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। রামু মানুষের ভিড় ঠেলে হাবিলদার এবং তার পিছনে কয়কজন পুলিশের জন্য রাস্তা করে দিয়ে লাশের নিকট যাবার চেষ্টা করলো।

লাশের কাছে পৌঁছে হাবিলদার তার বুট দিয়ে লাশকে একটি লাথি মারলো তারপর ঝুঁকে লাশের চেহারা দেখে অকস্মাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। তার চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

তখনই সে তার মাথা থেকে টুপি নামিয়ে শ্রদ্ধার সাথে লাশকে এক জোরালো স্যালুট দিল!

***

লেখক সম্পর্কে : এম নাঈম ঢাকায় থাকেন এবং একটি শিপিং কোম্পানিতে চাকরি করেন। তার গল্প ভারত, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের বহু সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

  • সিকদার আমিনুল হক সম্পর্কে

    বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা

    সাক্ষাৎকার

    newsimage

    [কবি সিকদার আমিনুল হকের ডাকনাম দীপক। দীপকের বাল্যবন্ধু পীযূষকান্তি সাহা। বর্তমানে তিনি

  • আজ সিকদার আমিনুল হকের ৭৭তম জন্মদিন : শ্রদ্ধাঞ্জলি

    সিকদার আমিনুল হকের গদ্য রচনা

    ফারুক মাহমুদ

    newsimage

    সিকদার আমিনুল হক মূলত কবি। ‘বিপুলপ্রজ’ কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতিও রয়েছে। বেঁচে

  • আমার বাবা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবেন

    সালমান তারিক মিশা

    newsimage

    ছোটবেলা থেকে আমি খুব একা থাকতাম। স্কুলে ভর্তি হই ১৯৭৫ সালে গভর্নমেন্ট

  • মহাদেব সাহার কবিতা

    newsimage

    [মহাদেব সাহা ষাটের দশকের অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় একটি

  • অজানার ডাকে

    কণিকা রশীদ

    newsimage

    গত সতের দিন ধরে অন্ধ রজব আলী বসে আছে বকুল গাছের তলায়।

  • মহাস্থানের হাজার বছর

    সৌম্য সালেক

    newsimage

    নাটককে প্রাচীন কলাশাস্ত্রবিদগণ ‘দৃশ্যকাব্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। নাটকের মধ্যে বিশেষ কালপ্রবাহ আসতে

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    চতুর্দশপদী চিঠি মার্গারিটার কাছে ফাউস্ট মাহফুজ আল-হোসেন আমায় তুমি ক্ষমা কোরো না গ্রেচেন, আর করবেই