menu

নিমগ্ন ও নির্লিপ্ততার কবি হায়াৎ সাইফ

জুনান নাশিত

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯
image

হায়াৎ সাইফ / জন্ম : ১৬ ডিসেম্বর ১৯৪২; মৃত্যু : ১৩ মে ২০১৯

কবি হায়াৎ সাইফের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ত্রাসে সহবাস’। ‘ওয়্যার অন টেরর’, ‘টেরোরিস্ট’ এসব শব্দ কিংবা শব্দবন্ধ এখন আমাদের দিনানুদিনের অনিবার্য অনুষঙ্গ। বিশেষত গত এক যুগ ধরে ‘সন্ত্রাস’ শব্দটি আমাদের মগজ ও শ্রুতিকে এতো বেশিবার আঘাত করেছে, ফলে এর থেকে নিরপেক্ষ দূরত্বে থাকা কোনভাবেই সম্ভব নয়। প্রতিদিনই আমরা কোন না কোন ধরনের সন্ত্রাসের খবর শুনছি। কিন্তু হায়াৎ সাইফ! তিনি কেন ১৯৮৩ সাল থেকে এই শব্দটি এতো বেশিবার ব্যবহার করেছেন? কোন ভবিষ্য উপলদ্ধি থেকে কবি সাইফ তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের এই নামকরণ করেছেন? তিনি কি জানতেন আজকের দুনিয়ায় সন্ত্রাস এরকমভাবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাবে? একবিংশ শতাব্দির দুনিয়া নিরন্তর কাঁপবে আর বলি হবে নানাবিধ সন্ত্রাসের? তাহলে কি এ কথাই প্রমাণিত হয় না, কবিরা কেবল স্রষ্টাই নন ভবিষ্যত দ্রষ্টাও বটে! কিন্তু সে দ্রষ্টার ভূমিকায় নামার যোগ্যতা ও দূরদৃষ্টি সবার থাকে না।

অগ্নিপুরাণে বলা হয়েছে, অপার কাব্যের সংসারে কবিই একমাত্র ব্রহ্মা। বিশ্ব তার কাছে যেমন প্রীতিকর মনে হয় তেমনি তা পরিবর্তিতও হয়ে যায়।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছেন, ‘Everywhwre I go I find that a poet has been there before me’.

সত্যিকারের কবি সেই অগ্রবর্তী সৈনিক। আবাদী জমিতে ফসলী গাছের পাশাপাশি আগাছারও অভাব পড়ে না। আগাছা কবির দৌরাত্ম্যে অনেক পাঠক যখন বীতশ্রদ্ধ তখন হায়াৎ সাইফের মতন কবিরা পাঠকের বিবর্ণ বোধের সলতেতে আগুন উস্কে দেন। কাব্য রসের পেলবতায় মন সিক্ত করেন। আনন্দ দিয়ে আনন্দ নিংড়ে নেন। পৌঁছে যান সন্তুর ভূমিকায়। সেখানে দাঁড়িয়ে কবি হায়াৎ সাইফ বলেন, ‘মানুষের তপস্যা শেষ হয়ে গেলে/ আলোকের দুধরাজ যায় উড়ে দূরে/ সুনিদ্রা শেষ হলে স্বপ্নের সন্নিধ্যি বেড়ে চলে অলীক প্রহরে।’

হায়াৎ সাইফ ব্যক্তিজীবনে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। জন্মেছেন ১৯৪২ সালের ১৬ ডিসেম্বর। বর্তমান রাজধানী ঢাকায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মরণ কামড়ে পৃথিবী তখন বিষাক্ত নীল। বছর দশেকের বালক প্রত্যক্ষ করেছে জাতির মহান ভাষা আন্দোলন। যৌবন কেটেছে ষাটের সংগ্রাম মুখর উত্তাল আবহে। তারপর মুক্তিযুদ্ধ। নতুন দেশ, স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। কিশোর বয়সে কাব্যলক্ষ্মীর সাক্ষাৎ পেয়েছেন। কিন্তু সে সাক্ষাৎ পূর্ণ হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স ও এমএ ডিগ্রি নিয়েছেন। একাডেমিক কারণে ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে নিবিড় পরিচয়। তার ওপর কাব্যলক্ষ্মীর অলৌকিক হাতছানি। তাই সাহিত্যে মনোনিবেশ ছিল ধ্যানীর পর্যায়ে। সেই ধ্যানস্থ যুবক কিন্তু ভিন দেশের সাহিত্য পেয়ে আপন আলোয় বেড়ে ওঠা হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যকে লগ্ন করতে ভোলেননি। বিস্মৃত হননি ইংরেজ কবি টিএস এলিয়টের সেই বক্তব্য। এলিয়ট মনে করতেন, একজন কবি নিজ মহাদেশের সমগ্র অতীত, সমগ্র সৃষ্টি ও সমগ্র ঐতিহ্যকে অঙ্গীকরণ করবেন। আর তা নিজ কর্মে প্রতিফলিত করেই সেই কবি মৌলিকত্বে উদ্ভাসিত হতে পারেন, অন্যথায় তিনি হবেন নিতান্তই গতানুগতিক।

হায়াৎ সাইফের কবিতা পড়ার প্রাথমিক উপলব্ধি এরকম- বিশাল এক সুরম্য প্রাসাদ। দূর থেকে ভেতরটাকে ভীষণ রহস্যময় মনে হয়। একটু ইতস্তত করে ঢুকে পড়ার পর দেখা গেল ভেতরটা প্রশান্ত ও মোহময়, কিন্তু নির্লিপ্ত। প্রাসাদের সাজসজ্জায় রয়েছে ক্লাসিক বিষণ্নতা। আবহ পুরোপুরি রোমান্টিক। তবে তা নস্টালজিয়াতাড়িত। রয়েছে সংগীত প্রবাহ। দেয়ালে দেয়ালে অন্তর্দৃষ্টির প্রক্ষেপণ। আরো আছে দূরগামী এক মূর্ছনার ঢেউ। সে ঢেউয়ের আঘাতে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হন কবি। আসলে সরাসরি বললে এসবই কবি হায়াৎ সাইফের কাব্যবৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্য বোধগম্য করতে প্রয়োজন বোঝা ও শোনার পূর্ব প্রস্তুতি। অর্থাৎ পঠন পাঠনের ধারাক্রম বিচ্ছিন্ন কোন ব্যক্তির পক্ষে হায়াৎ সাইফের কবিতার রসোদ্ধার সম্ভব নাও হতে পারে। প্রশ্ন উঠতে পারে তিনি কি তবে দুর্বোধ্য কবিতা লেখেন? সেকথাও বলা যাবে না। আধুনিক কবিতার সঙ্গে যে দুর্বোধ্য অভিধাটি জুটেছে তা মাত্রাগত। গুণগত কিংবা বিষয়গত নয়। কবি হিসেবে হায়াৎ সাইফ খুব বেশি জনসম্পৃক্ত নন। তিনি তা হতেও চাননি। পরিশীলিত আর মার্জিত রুচির চর্চা যিনি করেন আর যাই হোক গড়পড়তা জনপ্রিয় হওয়া তার পক্ষে হয়তো সম্ভব হয়ে ওঠে না। এ নিয়ে হায়াৎ সাইফের নিজেরও কিছু খেদ নেই। তাই তিনি অনায়াসে বলতে পারেন, I don’t try to address large audience. I am happy with few discerning ones.

আসলে কবি হায়াৎ সাইফ কেন, আধুনিক কোন কবিই হয়তো পাঠক মুখাপেক্ষী নন। একসময়ে কবিতা যূথবদ্ধ শ্রোতার কাছে সরাসরি পৌঁছাতো। ১৭৭৮ সালে বাংলায় ছাপাখানা প্রতিষ্ঠার পর পরিস্থিতি পালটে গেলো। সুরের নির্ভরতা ছেড়ে কবিতা স্বাবলম্বী হওয়ায় তা শ্রুতির বদলে পাঠযোগ্য হয়ে উঠলো। বাইরের সঙ্গীতের বদলে কবিরা কবিতায় অন্তর্লীন সংগীত রচনা করলেন। তখন থেকে কবিতা সমষ্টির দুয়ার থেকে একাকী পাঠকের ঘরে চলে গেল। আর একাকী পাঠকের গ্রহণ বর্জনের রুচিকে তোয়াক্কা করে কবিরা হয়তো কবিতা লেখেন না। তারা লেখেন স্বপ্রণোদনায়, সোৎসাহে। পাঠক লুফে নেয় তো খুবই ভাল। না নিলেও ক্ষতি কতোটুক তা বিতর্কের বিষয়।

কবিরা সাধারণত সমাজের অগ্রবর্তী অংশ থেকে আসেন। সে অগ্রবর্তীদেরও অগ্রগামী হায়াৎ সাইফ। কী ভাবে, কী ভাষায়, কী আঙ্গিকে এক রুচিস্নিগ্ধ যুবা কবি তিনি। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত স্বভাবের ও ব্যক্তিত্ববান। তার ব্যক্তিত্বের ছাপ কবিতাতেও পুরোপুরি পরিস্ফুট। কেবল কবিতায় নয়, তার গদ্যেও সে ছাপ রয়েছে। তার গদ্যও ঋজু অথচ দৃঢ় প্রকৃতির।

‘সন্ত্রাসে সহবাস’ (১৯৮৩) বইটির পর গদ্য ও কবিতা মিলে তার ডজনখানেক বই বেরিয়েছে। এর মধ্যে কবিতার বই হলো, ‘সব ফেলে দিয়ে’ (১৯৮৪), ‘প্রধানত মাটি ও মানুষ’ (১৯৮৭), ‘এপিঠ ওপিঠ’ (১৯৯২), ‘নিমগ্নতা ও ভালোবাসার কবিতা’ (২০০৬), ‘প্রধানত স্মৃতি আর মানুষের পথচলা’ (২০০৮) এবং ‘রসুন বোনার ইতিকথা’ (২০১০)।

প্রথম থেকে শেষ অব্দি কবির কাব্যপরিক্রমায় যে বিষয়টি বিশেষত নজরে আসে তা হলো তার আত্মউন্মোচন। যেন খোলস ভেঙে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার এক শিল্পিত কার্যক্রম। ‘সন্ত্রাসে সহবাস’ গ্রন্থে কবির প্রকাশ তীব্র নয়, খানিক অবগুণ্ঠিত। নিজের প্রকাশ নিয়ে খানিকটা হলেও কুণ্ঠিত ছিলেন তিনি। যেন ফুটি ফুটি করেও ফোটা হলো না সম্পূর্ণ। যদিও ফোটার জোরালো আয়োজন দৃষ্টি এড়ানোর নয়। কেউ কেউ বলেছেন প্রথম কাব্যগ্রন্থে হায়াৎ সাইফ কবি সুধীন্দ্রনাথের প্রভাব এড়াতে পারেননি। অনেকেই জানেন সুধীন্দ্রনাথ হায়াৎ সাইফের প্রিয় কবি। যেমনি তার আরেক প্রিয় আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস। সুধীন্দ্রনাথ ও ইয়েটস দু’জনই রোমান্টিক। তবে দু’মেরুর। ইয়েটসের কবিতায় আবেগের যে উচ্ছ্বাস আর স্বপ্ন কল্পনা লতিয়ে উঠেছে তা সুধীন্দ্রনাথে নেই। ‘বিরূপ বিশ্বে মানুষ নিয়ত একাকী’- এ কথাই সুধীন্দ্রনাথের কবিতার মূল সুর।

শব্দগত এবং ভাব ব্যঞ্জনায় প্রথম কাব্যগ্রন্থে নিরাশাকরোজ্জ্বল কবি সুধীন্দ্রনাথের ছায়া পড়েছে এ কথা সত্য। কিন্তু গুটি গুটি করে হলেও কবি সাইফ প্রথম বইতেই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য দাঁড় করাতে সমর্থ হয়েছেন। যার দ্বারা শাসিত হয়েছে তার বাকি কাব্যজীবন। প্রকারান্তরে আগেও বলেছি, কবি হায়াৎ সাইফ ভাবগতভাবে রোমান্টিক। আঙ্গিকগতভাবে ক্লাসিক। কাব্যে তিনি বিলাসী নন, বস্তুনিষ্ঠ। তার কবিতায় নৈরাজ্য নেই। আছে সুষমা। তিনি আঁটোসাঁটো ভাষায় কথা বলেন। যেন নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন। কিন্তু যা বলেন তা গভীর আত্মবিশ্বাস থেকে উঠে আসা। তার প্রথম দিককার কবিতায় তৎসম অর্ধতৎসম শব্দের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। কিন্তু পরের দিকে কবিতার ভাষা অনেক সহজ হয়ে এসেছে। তবে গভীরতা হারায়নি। বরং তা আরো প্রাজ্ঞ হয়ে উঠেছে। তার ভাষায় পুনরুক্তি নেই। এলায়িত নয় মোটেও। দৃঢ় মেরুদন্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভাষা ক্লাসিকসুলভ ঘন ও গভীর। আবেগের আতিশয্য নেই। আবেগ বড়ো দৃঢ় ও দীপ্তিময়। তার কবিতায় অকারণ উচ্ছ্বাস কিংবা উচ্ছলতা নেই। আছে পরিমিত ও মার্জিত রুচির বহিঃপ্রকাশ। ভাষা প্রাঞ্জল ও গতিশীল এবং সংহত। তাতে দূরপ্রসারী এক ভাবনার ঢেউ রয়েছে- যা পাঠককে টানে। ছন্দে তিনি প্রথাগত। হায়াৎ সাইফ স্বপ্নকল্প কবি। তবে উচাটন নন। তিনি কবিতায় হৃদয়বৃত্তির (faculty of heart) প্রাবল্যের সঙ্গে মিশিয়েছেন বুদ্ধিবৃত্তির (faculty of intellect) প্রাবল্য। অর্থাৎ বুদ্ধি আর আবেগের নিপুণ সমন্বয় রয়েছে তার কবিতায়। শেষ পর্যন্ত কবিতার উৎস কিন্তু মূলত আবেগ আর বুদ্ধি-ই। আমেরিকান কবি paul Engle বলেছেন, poetry is boned with ideas, nerved and blooded with emotions, all held together by the delicate, tough skin of words. কথাটি হায়াৎ সাইফের কবিতার জন্যও পুরোপুরি প্রযোজ্য।

তার প্রথম দিককার কবিতার কমিউনিকেট করার কিঞ্চিৎ সীমাবদ্ধতা আমাকে পীড়া দিয়েছে। এ খেদ পুরোটাই ঘুচে গেছে তার রসুন বোনার ইতিকথা বইটি পড়ে। বলা যায় এখানে তিনি প্রাজ্ঞতার চূড়া বহুলাংশে স্পর্শ করেছেন। ভাষার মাধুর্যে আর ব্যক্তিত্বের প্রগাঢ়তায় বইটির প্রতিটি কবিতাই যেন স্বতোৎসারিত, অকপট। তার কবিতার বিষয়বস্তু বরাবরই দেশ, কাল, মাটি, মানুষ, প্রেম, ভালোবাসা, জীবন, মৃত্যু, ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বইটিতে এসব নিয়ে তার অভিজ্ঞ প্রকাশ যেন একজন সন্তুর উচ্চারণ। যা ভীষণ গাঢ়, গভীর ও দূরগামী। মানব অস্তিত্বের নানাবিধ দিক নিজস্ব দর্শনে ও স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বইটিতে তুলে ধরেছেন। এটি পড়তে পড়তে কাহলিল জিবরানের ‘দ্য প্রফেট’ বইটির কথা স্মরণে এলো। ‘কবির নিয়তি’ কবিতায় কবি বলেছেন, ‘এ জীবনে সবকিছু মিলে গেলে কিছুই মেলে না/ তাই তো হয় না মিল জীবনের হিসেব খাতায়/ যদিও শেষের প্রান্তে যেতে যেতে আশা করি হয়তোবা/ মেলাবেন তিনি যেমন জেনেছি পৃথিবীকে/ যেন মেলাবেন তিনি মানুষের যত চাওয়া আর পাওয়া, আর মিটে যাবে সব সন্তাপ/ কিন্তু তা হয়না কখনো/ জীবন কখনো সয় না সবকিছু পেয়ে যাওয়া।’

তিরিশের কবি অমিয় চক্রবর্তী মেলানোর কথা যতো সহজে বলতে পেরেছেন হায়াৎ সাইফ ততো সহজে সে কথা বলতে পারলেন না। আসলে অমিয় চক্রবর্তীর পৃথিবী থেকে হায়াৎ সাইফের পৃথিবী আরো বেশি রক্তপিপাসু ও জটিল। তার অভিজ্ঞতাই তাকে বলিয়ে নিয়েছে ‘জীবন কখনও সয় না সবকিছু পেয়ে যাওয়া’।

হায়াৎ সাইফের কবিতায় ঘুরেফিরে বিপন্নতা, বেদনা ও নিঃসঙ্গতার কথা এসেছে। প্রাথমিকভাবে এসবের প্রকাশ পুরোমাত্রায় ছিল ব্যক্তিক। ধীরে ধীরে তা সামষ্টিক হয়ে উঠেছে। তার আমি হয়েছে আমাদের। তিনি ব্যক্তিক থেকে হয়েছেন সামাজিক ও রাষ্ট্রিক। সন্ত্রাসে সহবাস কবিতায়, ‘শতাব্দিকাল কবরেই পড়ে আছি/ তবুওতো শেষ হয়নি এ গোরাজাব... আমার তো কোনো নিগূঢ় ইচ্ছে নেই/উচ্চাঙ্ক্ষাও ধরিনি বুকের তলে/আশা ছিলো শুধু ঈর্ষা ও ক্রোধহীন/একটু সময় যেন স্বাধিকারে চলে।’

কিন্তু ‘যেতে হলে যাও’ কবিতায়- ‘শানকিতে শাদা ভাত পচে গেছে কবে/সে পচনে হয়তোবা কলিত কোহল হবে ধীরে... আমাদের বিনষ্ট সংসারে শুনি তাও ধ্বংস হয়।’

অথবা ‘আর কতোদিন কবিতায়’- ‘জঠরে জটিল জ্বালা হাহাকার করে অবিরাম/মাতামাতি হাতাহাতি করে ঘরে ঘরে বাড়ি মুখ/গ্রামেগঞ্জে কেবা কাকে কতখানি খাদ্যদ্রব্য দেবে/হয়তোবা একদিন এরও শেষ হবে/এ সমাজ কতদিন আনুপূর্ব মিথ্যা কথা কবে?’

নগরে জন্ম নেয়া কবি সাইফ পুরো দস্তুর নাগরিক কবি নন। তার কবিতায় নাগরিক অনুষঙ্গের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবনধারাও এসেছে সমানভাবে। কখনও কখনও বেশি মাত্রায়। আবহমান বাংলা, মা, মাটি দেশ তার প্রিয় অনুষঙ্গ। প্রেম, হতাশা, ব্যর্থতাও এসেছে তবে তা পরিমিত মাত্রায়- ‘এমন ভীষণ ঘাতিনী তুই তবু বারবার কেন অরূপ ফাল্গুনে/পুষ্পের দিকে শস্যের দিকে ফেরাই অমিত চোখ/ আর আচম্বিতে বের করে আনি একটি পুরনো বিপর্যস্ত ব্যানার/বাংলা বাংলা বাংলা/জননী আমার।’ তেমনি ব্যক্তিক আকাঙ্ক্ষার কথা বর্ণিত হয়েছে এভাবে- ‘তবু ক্যানো এখনও ইচ্ছে হয়/খুঁজে পেতে একটি হৃদয়/এবং সেখানে আবার জ্বালি/শুদ্ধতার শুভ্রতার অমল ধবল এক আলো।’

যে মৌল বৈশিষ্ট্য কবিতাকে গদ্য থেকে পৃথক করেছে তা হলো কাব্যের সংগীতধর্মিতা। হায়াৎ সাইফের কবিতা সঙ্গীতময়। ফলে কবিতা মৃন্ময় ও ঘোর জাগানিয়া। পাঠকের হৃদয়তন্ত্রীকে করে আচ্ছন্ন। এরই সঙ্গে সবশেষ বইতে যুক্ত হয়েছে প্রার্থনার নিবিড় নিবেদন- ‘এই মৌনতার ওপারে থাকে কেউ/এই দৃশ্যমান পরিপার্শ্বের বাহিরে থাকে কেউ/হয়তো সে দৃষ্টির গোচরে নেই দূরত্বে নিহিত/কিংবা হয়তো সে সুদূরে নেই রয়ে গেছে অতীব নিকটে/গলার শিরার কাছে অবিরাম ওঠা নামা করে/এবং এইভাবে আপন চিত্তের ভেতরে থাকে কেউ/আত্মার গভীরে থাকে কেউ চুপিসারে নিজেরই স্বভাবে।’

কিংবা- ‘সেই অস্তিত্বহীন জীবনের কোনো অবয়ব যদি থাকে/তাই যেন বারবার কাপুরুষ বানায় আমাকে/মহাপুরুষেরা হয়তো বা জীবন পেরিয়ে গেলে/অনায়াসে শুষে নেয় সত্যের নির্যাস/এই পৃথিবীর বসবাস কেবল সত্য হতে পারে বাস্তবে যদি একবার কোনোমতে এমনটি ঘটে যায়/আমাদের জীবনাচরণে মানুষের ভালোবাসা পেয়ে যায় আরেক মানুষ।’

সত্যের প্রসঙ্গে আইনস্টাইনকে স্মরণ করছি। তিনি আপেক্ষিকতা নিয়ে বলেছেন, ধরো বহুদূরের বনে একটা গাছ পড়লো, তুমি টেরও পেলে না। অর্থাৎ তোমার কাছে গাছটা পড়েনি। সেটাই তখনকার মতো তোমার কাছে সত্য। অর্থাৎ সত্য এরকমভাবেই আপেক্ষিক।

আর কবিতার সত্য? ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি/ঘটে যা তা সত্য নয়’। হায়াৎ সাইফের কবিতা থেকে এতোক্ষণ ধরে যেসব সত্যের উন্মোচন ঘটানোর চেষ্টা করলাম তা আদতে কতোটুকু কী? কবিতা কি সবসময়ই বিশ্লেষণের যোগ্য? বলা হয় ভালো কবিতা বিশ্লেষণের অতীত। তবু কবিতা পাঠে ভালোলাগা মন্দলাগার একটা ব্যাপার দাঁড়িয়ে যায়। সমালোচকেরা কবিতার একপিঠ দেখানোর চেষ্টা করলেন তো পাঠক আরেক পিঠ খুঁজে নিতেই পারেন। তাতে দোষ দেয়া যায় না। কিংবা কবিতারও ক্ষতি বৃদ্ধি কিছুই ঘটে না।

বাংলাদেশের অগ্নিগর্ভ ইতিহাস আর উত্তাল সময়ের আরেক নাম ষাটের দশক। সে ষাটের দশকে যে’কজন প্রথম কাতারের কবি রয়েছেন হায়াৎ সাইফ তাদের অগ্রগণ্য। এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। কবি সারাজীবন যে শুভবোধ নিয়ে কাব্যচর্চা করেছেন অভিজ্ঞতার অনেক উত্থানপতনেও তাতে চিড় ধরেনি। আশাহত হননি কবি। শুভচেতনায় মঙ্গল এবং ভালবাসার আশায় এখনও বুক বাঁধেন তিনি। যদিও ধৈর্যচ্যুতি ঘটে মাঝে মাঝে। খেদ নিয়ে তাই বলেন, ‘জনপদ ছেড়ে দিয়ে তাই আপাততঃ অরণ্যেই চলে যাওয়া ভালো/যদি যাবার মতন অরণ্য কোনো এখনও থেকে থাকে কোনখানে।’

কিন্তু এ ধৈর্যচ্যুতি সাময়িক। নিরাশার প্রান্তরে কবি আবার আশার আলো জ্বালেন। সেই আশাই বুকের ভেতর জিইয়ে রাখে অপেক্ষা। অপেক্ষা ভালোবাসা পাওয়ার, অপেক্ষা প্রিয়জনের সান্নিধ্য আর স্পর্শের।

কবি বলেন, ‘দিন শেষে সহস্রাব্দ পার হয়ে গেলে তোমার স্পর্শের ভেতরে/হে অনামিকা, আবার কি দেখা দেবে কোনো এক দিব্য ভালোবাসা?’

দেখা হয়তো দেবে কিংবা দেবে না। তবু কবি অপেক্ষায় কাটাবেন দিন। এ জগতে নয়, আমাদের অদেখা অন্য কোন জগতে। পারলৌকিক প্রতীক্ষার কাতর আর্তিতে ভেঙে যেতে যেতেও ভাঙবেন না। কারণ রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘বিচ্ছেদেরি হোমবহ্নি হতে/পূজামূর্তি ধরে প্রেম/দেখা দেয় দুঃখের আলোতে।’

  • সাহিত্যের স্বতন্ত্র স্বর নির্মাণ-বিনির্মাণ

    মাহফুজ আল-হোসেন

    newsimage

    সারসংক্ষেপ সাহিত্য হচ্ছে মানুষের নান্দনিক ভাষিক অভিব্যক্তি এবং এর মাধ্যমে সাহিত্যস্রষ্টা তাঁর কালের

  • শওকত ওসমানের অগ্রন্থিত কবিতা

    মুখোমুখি

    newsimage

    সম্প্রতি বাংলা সাহিত্যের এক কর্মী জনাব ভূঁইয়া ইকবাল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জদুঘরের আবদুল

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    তিনটি কবিতা আনোয়ারা সৈয়দ হক তুমুল সিম্ফনি আজ তুমুল সিম্ফনি আজ আকাশে বাতাসে ঘোর অন্ধকারে

  • অসম্পূর্ণ গল্প (পর্ব ৩)

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) পঞ্চম অধ্যয় লোকটাকে বুকের উপর থেকে ঠেলে উঠায় নাইমুন। সুযোগ পেয়ে

  • ২০১৯ সালে প্রকাশিত দশটি গ্রন্থ

    newsimage

    শরীর সংক্রান্ত কূটালাপ মামুন হুসাইন মামুন হুসাইন তাঁর সমকালের কথাশিল্পীদের মধ্যে স্বতন্ত্র। স্বতন্ত্র বিষয়ে,

  • জিগমে সিংগায়া ওয়াংচুক!

    আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

    newsimage

    প্রথম যখন ভুটানে যাই তখন অপির (আমার বর) উপর একটু বিরক্ত হয়েছিলাম।

  • সাহিত্যে নতুন স্বর নির্মাণের প্রত্যয়ে

    শালুক-সাহিত্যসন্ধ্যা ‘প্রতিস্রোত’-২

    কামরুল হাসান

    newsimage

    শালুক-সাহিত্যসন্ধ্যা প্রতিস্রোত ২-এর নির্ধারিত তারিখ ছিল গত ১০ মে বেলা দুইটায়। আমি