menu

ধূসর শিউলি

মেহেরুন্নেছা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

সজনিদের বাড়ি থেকে কিছুদূর এগুলেই রাস্তার ওপাশে সবুজ গালিচা। শিশিরসিক্ত গালিচায় সোনালি রশ্মির ঝিলিক! লোকমুখে এই গালিচা এখন শিউলিতলা। সাদা শিউলির অপূর্ব মায়াজাল ওখানে! প্রকৃতি নিজ হস্তে এই শুভ্র আলিম্পন রচনা করে।

শরতের বিহানে উন্মুখ সজনি সবুজ মাড়িয়ে ছুটে যায় শিউলিতলায়। বেশ কিছুদিন আগেও শিউলির মালা গুঁজে স্কুলে যেতো সে। কিন্তু এ আনন্দে অচিরেই ছন্দপতন ঘটে। মায়ের কড়া গলা, “এতো হাইজ্জা-গুইজ্জা স্কুলে যাওনের দরকার নাই। স্কুলে যাবি মাথাত কাপড় দিয়া।” তারপর থেকে কুড়িয়ে আনা শিউলি তার পড়ার টেবিলে শোভা পায়। মুগ্ধ চিত্তে ছোট্ট বেতের ঝুড়িতে আলতো করে শিউলি তুলে রাখে। বেতের ঝুড়িটি সজনির দারুণ প্রিয়! পাশের বাড়ির সুলেখা ভাবির দেয়া উপহার।

গত ইদে সুলেখা সজনিকে দাওয়াত করেছিলো। সুলেখার হাতের পোলাও-কোর্মা-সেমাইয়ের স্বাদ এখনো তার জিভে লেগে আছে। সুলেখা শহরের বাসিন্দা। কেবল ইদেই সুলেখার পরিবার গ্রামের কোলাহলে নিজেদের উজার করে দেয়। সামনে কোরবানির ইদ। ইদ উপলক্ষে এবারও তারা গ্রামে পদচিহ্ন রেখেছে।

আধখানা ছায়া আর আধখানা রৌদ্রালোকের গোধূলিবেলায় সজনি অলস-মন্থর ছন্দে সুলেখাদের বাড়ি অভিমুখে রওনা হলো। হাতে শিউলির মালা।

ভাবি...!

আরে বাহ! সজনি...! এতো সুন্দর শিউলির মালা নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?

কোথাও না...! আপনার জন্যই এনেছি!

পরম মমতায় সজনি সুলেখার হাতে অর্পণ করলো মালাটি। চুলে জড়াতে জড়াতে সুলেখা বলে, “কেমন লাগছে বলতো, সজনি?”

সজনি মুগ্ধচিত্তে সুলেখার দিকে তাকিয়ে থাকে। সুলেখা তখন অফুরান লাবণ্যের জোয়ারে ভাসছে। এই সৌন্দর্যের অমরাবতীকে কী বলবে ভেবে পায় না সে। তবুও বলে, “ভাবি...! আপনের মতো এতো রূপ আমি আর কারো দেহি নাই!”

সজনির প্রশংসায় স্বভাবসুলভ মিষ্টি ভঙ্গিতে সুলেখা হেসে দেয়। সজনির বেণীখানা ছুঁয়ে বলে, “তা সজনি তোমার শিউলি কোথায়? বেণীখানি যে শিউলির পরশ না পেয়ে একেবারে নুয়ে পড়েছে!”

সজনি চোখ নামিয়ে নেয়। মুখে মেঘের ছায়া। তিরতিরিয়ে বলে, “আমরা গেরামের মেয়ে। সাইজ্জা থাহোন আমাগো মানায় না। পান থাইকা চুন খসলেই আকতা-কুকতা অয়।”

সজনির পাণ্ডুর মুখখানি আহত করে সুলেখাকে। প্রসঙ্গ পাল্টায় সে।

“সজনি...! কালকে আমরা মেঘনার শহরে যাবো! তুমিও কিন্তু যাবা আমাদের সঙ্গে!”

সজনি চুপ করে আছে। মুখখানা বিষণ্ণ-বিধুর। অপ্রসন্ন কণ্ঠে বলে, “ভাবি...! আমার তো যাইতে মন চায়! তয় আম্মায় যাইতো দিতো না!”

“ঠিক আছে...! চাচিকে আমি বলবো! দেখবা, চাচি ঠিক রাজি হয়ে যাবে!”

যেই কথা সেই কাজ। সুলেখা লেখাপড়া জানা বনেদি বাড়ির বউ। চাকরিতে

উচ্চপদে আসীন। এই গ্রামে সুলেখার প্রাণোচ্ছল অভিব্যক্তি সবাইকে কাছে টানে। অগত্যা সুলেখার অনুরোধ সজনির মা ফেলতে পারেনি।

পরদিন তারা চাঁদপুর শহরে মেঘনার পাড়ে দারুণ হৈ-হুল্লোড়ে মেতে ওঠে। ছবি ওঠায়। নৌকা ভ্রমণ করে।

দুপুরে ইলিশ ভাজা দিয়ে পেটপুরে ভাত খায়।

সুলেখা বলে, “ইলিশের বাড়িতে এলাম, আর ইলিশ দিয়ে ভাত খাবো না, তা কি হয়!”

সজনির প্লেটে ইলিশ উঠিয়ে দিতে দিতে সুলেখার উচ্ছ্বাস, “খাও...! খাও ...! আরেক টুকরা ইলিশ খাও!”

ঢেউ-গর্জনের ন্যায় অভাবিত এক মায়ার প্রতিচ্ছবি যেন সুলেখা। শেষবেলার মহিমান্বিত সমীরণ ছুঁয়ে দেয় সুলেখার গ-দেশ। আর সজনির ভেতর লুটোপুটি খাচ্ছে মৌন আনন্দের নহর! জীবনে নদী দেখেনি সে। কেবল বইয়ের পাতায় মেঘনা-পদ্মা-ডাকাতিয়ার গল্প শুনেছে। এক্ষণে সে তিন নদীর মিলনমেলায় দাঁড়িয়ে ভাবছে, নদীগুলো যে তার কল্পনার চেয়েও বিশাল! দূরে ওপারের লোকালয় কুয়াশার আড়ালে ক্রমশ ঝাপসা হতে হতে ম্রয়িমাণ।

নদী সাঁতরে পার হওয়ার কথা ভেবে সজনির গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মারাত্মক স্রোতের ঘূর্ণি দেখে সে নির্বাক! হতচকিত হয়ে ভাবে, কী করে নদীর বিশালতাকে তুচ্ছ করে ধেয়ে চলেছে অসংখ্য মাল বোঝাই নৌকা! প্রমত্ত মেঘনার জলরাশি তার কাছে রীতিমতো ভয়াবহ!

ভাবি...! ও... ভাবি! ওগুলান কি?

ওগুলো ইস্টিমার!”

সজনির বিস্ময়ের মাত্রা কয় ধাপ বেড়ে যায়। তার সম্মুখে জীবন্ত এক ছায়াছবি যেন।

ভাবি...! ইয়ানো এতো বালুর বস্তা কিল্লাই?

নদীর ভাঙ্গন...! ভাঙ্গন থেকে রক্ষার জন্যই এসব ব্লক আর বালুর বস্তা ফেলে রাখা হয়েছে।

দিগ¦লয়ে আলোর স্ফুরণ তখন অনেকটাই ফিকে। রবির তেজ রাত্রির কোটরে আশ্রয় নিতে তৎপর। সুলেখাও চঞ্চল হয়ে ওঠে বাড়ি ফেরার জন্য।

মাসতিনেক পর। শীতের বৈরাগ্যের হাতছানিকে এড়াতে পারলো না সুলেখা। শহরের একঘেয়েমি কাঁহাতক ভালো লাগে মানুষের! ব্যালকনিতে রোদ পোহানো, এক হাতে চায়ের কাপে চুমুক, আরেক হাতে খবরের কাগজে চোখ বুলানো- প্রতিটা সকাল একই ধাঁচের।

এক রৌদ্রমাখা সকালে সুলেখা রওনা দেয় বাড়ি অভিমুখে। ঢাকার রাস্তায় কি অসহ্য জ্যাম! জ্যাম ডিঙিয়ে যখন বাড়ির কাছাকাছি তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়েছে বহু আগেই। পুকুরের উপরে ছোপ ছোপ আঁধার। জোনাকির প্রদীপে মোস্তাগের অরণ্য আরো ভুতুড়ে ঠেকছে। তবুও পিঞ্জরাবদ্ধ সুলেখার মুক্ত বিহঙ্গের নেশা। অন্ধকারে পথের দাগগুলো একেবারেই আবছায়া। পৌষের মেঘহীন আকাশ। চাঁদকে ঘিরে আছে রহস্যময় আঁধার।

কুয়াশার হিম কেটে সুলেখা উঠানে আসতেই চোখে পড়লো, বাড়ির মানুষগুলো আগুন পোহাতে ব্যস্ত। রাতে পুঁটি মাছের চচ্চড়ি, কাতলের মাথা দিয়ে কলাইয়ের ডাল- নিস্তরঙ্গ জীবনে সত্যিই এক অন্যরকম আবেশ! রসুইঘরের বেড়ার ফাঁকে তখনও ফুঁ দিয়ে চলেছে উত্তরের হিমেল বাতাস।

সুলেখা চাদর মুড়িয়ে শোবার ঘরে চলে এলো। টিনের চালে অবিরাম বৃষ্টির মতো কুয়াশা পড়ছে। কম্বলের নিচে পুঞ্জীভূত ওম। সুলেখা চলে গেলো ঘুমের রাজ্যে। কিন্তু মাঝরাতে ধড়াস করে টিনের চালে শব্দ! তার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। নির্ঘাত নারিকেল! কখনো কখনো টরা নারিকেলের সাথে দু’একটা ঝুনা নারিকেলও পড়ে। ওদিকে দূরের মাঠ হতে ভেসে আসছে কুকুরের নৈঃশব্দ্যভেদি রোদন।

এতো কিছুর পরেও আবার কখন যে চোখ লেগে এলো সুলেখা টের পেলো না। হঠাৎ মানুষের হট্টগোলে আর দৌড়াদৌড়িতে ঘুম ভেঙে গেলো। চারদিকে ভোরের ঘ্রাণ। ঝটপট নিজেকে গুছিয়ে উঠানে নেমে এলো সে। ততক্ষণে অন্য গৃহস্থরাও সব উৎসুক চোখে উঠানে।

এ বাড়ির পশ্চিমে পেঁয়াজ-রসুন-পালং-মুলার পশরা। তারপরেই সজনিদের বাড়ি। দুধসাদা কুয়াশার বহর পেরিয়ে সজনিদের বাড়ি এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মানুষগুলো তো সেদিকেই ছুটছে। সজনিদের বাড়ি থেকেই যে আর্তনাদ ভেসে আসছে। সুলেখা স্পষ্টত সজনির মায়ের বুকফাটা চিৎকার শুনতে পাচ্ছে।

আর এক দণ্ড দ্বিধা নয়। অন্যদের সাথে সুলেখাও দৌড়াচ্ছে আছড়ে পড়া ক্রন্দনের দিকে।

মৃত সজনিকে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কীটনাশকের বোতলটাও পড়ে আছে পাশে। সজনির বাবা-মা অচেতন। ছোট ভাইবোনেরা বিলাপ করছে।

বেলা গড়িয়ে সূর্য মাথার উপর। পুলিশ এসেছে। সজনিদের বাড়ি লোকে-লোকারণ্য। পুলিশ বিভিন্নভাবে জনে জনে জেরা করছে। কিন্তু কেউ সজনির আত্মহননের কারণ বলতে পারছে না। সজনির মুঠোফোনটাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

সুলেখার মাথা ঘুরছে। সে বাড়ি চলে এলো। তার চলার পথে বাজছে মৃত্যুর নিনাদ!

প্রায় চার দিন অতীত হয়েছে। এখনো পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ। নীলাকাশের আবরণে নিবিড় এই পল্লীতে এমন ভয়াবহ মৃত্যু মেনে নেয়া সত্যিই কষ্টদায়ক! সুলেখা ঘরের দাওয়ায় বসে আছে। হাতে মুঠোফোন। ঘরের কোণ ঘেঁষে খপ খপ করে ব্যাঙটা চলে গেলো। অন্যমনস্কভাবে সেদিকে তাকাতে তাকাতে সুলেখা ফেসবুকে ঢোকে। এ ক’দিন সজনির মৃত্যু আর আহাজারি, ভার্চুয়াল জগত থেকে সুলেখাকে বহুদূরে ছিটকে ফেলেছিলো।

এক মুহূর্তের জন্যও সজনিকে বিষাদের গাঙ থেকে সরানো যাচ্ছে না। চোখ বেয়ে জলের ফোঁটা নামে। সজনি মরে নাই! সজনি মরতে পারে না! আবার নিজেই নিজেকে সান্ত¡না দিয়ে সম্বরণ করে। অনুভব করে, প্রিয়জন হারানোর বেদনা বেঁচে থাকার লড়াইটাকে কতটা নির্মম করে তোলে।

ফেসবুকে ঢুকতেই টুন টুন শব্দের মেলা! কয়েক দিনের জমানো ক্ষুদে বার্তার স্তূপ। সুলেখা একে একে সব পড়তে লাগলো। চট করে তার চোখ আটকে গেলো সজনির বার্তায়। আরে! এটাতো আসলেই সজনির আইডি থেকে পাঠানো হয়েছে! মাত্র সপ্তাহখানেক আগে সজনি ফেসবুক আইডি খুলেছিলো। তাকে বন্ধু করে নেয়ার জন্য ছিলো অকুণ্ঠ আবদার।

সুলেখার সামনে সজনি আবারো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জীবন্ত সজনি! পরক্ষণেই মনে হলো, আহা, সজনি নেই! সজনি আর কোনোদিন ‘ভাবি’ বলে ডাকবে না! হেলে-দুলে আমগাছের পাশ দিয়ে উঠানে এসে দাঁড়াবে না!

তমসাচ্ছন্ন হৃদয়ে সুলেখা দীর্ঘ বার্তাটি পড়া শুরু করলো, “ভাবি আমার কথাগুলো যখন আপনি পড়বেন তখন হয়তো আমি আর এ জগতে নাই। আপনাকে বড় ভালোবাসি। তাই অন্তত আপনাকে জানিয়ে গেলাম আমার পাপের হিসাব। মাসখানেক আগে উত্তর পাড়ার চেয়ারম্যানের ছেলে রাশেদ আমারে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। আমিও লগে লগে রাজি হই। একদিন তার অনুরোধে চানপুর যাই। এরপর রাশেদ আমারে একটা হোটেলে নিয়ে যায়। হিয়ানো আমরা শারীরিকভাবে মিলিত হই। আমি জানতাম না রাশেদ সবকিছু মোবাইলে ভিডিও করছে। এরপর থাইকা হে আমারে প্রায় চানপুর যাইতে কয়। না গেলে নাকি আমার ভিডিও নেটে ছাইড়া দিবো। ডরে আমি আরো দুইবার হের লগে চানপুর যাই। তহনো আমরা একই কাজ করি। শেষমেশ ওইদিন রাশেদরে বিয়ার জন্য চাপ দিলে হে কয়, এমন খারাপ মাইয়ারে বিয়া করন যাইতো না। ভাবি, আমার সব শেষ! আমি পাপী! তাই মৃত্যুই আমার প্রাপ্য! আমার বড় ইচ্ছা ছিলো, লেখাপড়া কইরা আপনের মতো হমু। কিন্তু নিজের আবেগের উস্কানিতে নিজেই বলি হইলাম। একটু পরে আমার মোবাইলটা পুকুরে ফালাইয়া দিমু। এবার বিদায় ভাবি! আমার মতো পাপীরে কেউ ক্ষমা করতো না জানি। তবুও সব জানার পরে আপনি অন্তত আমারে ঘৃণা কইরেন না।”

সুলেখা আর্তনাদ করে উঠলো। অন্ধকার দিয়ে অন্ধকারের যবনিকাপাত, কী নিষ্ঠুর সমাধান! ষোড়শীর রঙিন অরণ্য থেকে সজনি চলে গেলো সকল ক্লেদাক্ততার ঊর্ধ্বে।

সুলেখা তাড়াতাড়ি উঠলো। এক্ষুনি তাকে সজনির বার্তাটি নিয়ে থানায় যেতে হবে। পথেই শিউলিতলা, যেন শিউলি ফুলের মালা নিয়ে হাস্যোজ্জ্বল সজনি দাঁড়িয়ে আছে। সুলেখার চোখে সজনির হাতের শিউলির মালাখানি কেবল ধূসর হয়ে আসে।