menu

দিলারা হাফিজের কবিতা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৯ নভেম্বর ২০২০
image

সবুজ গলিয়ে

সবুজ গলিয়ে চোখের গোলক দুটো

ঢুকে গেলো বনের গভীরে...

পড়ন্ত সূর্যের গোধূলি আলো পিছু নিলো তার,

খোল-করতালসহ বেজে ওঠে

মাটির খঞ্জনা,

নবীন পাতাদের কোলাহলে বাজে আনন্দ-করতালি।

শেকড়ের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ, লম্ফ-ঝম্প শেষে

মেপল বীথির ঝরাপাতা মাড়িয়ে দিব্যি তারা

ঘুরে এলো পাইন বনের এ মাথা ও মাথা,

কিছু কিছু শস্যের সীমানা প্রাচীর নেই জেনে

আদিগন্ত সবুজেরা হেসে কুটিপাটি;

ধাবমান মায়াবী হরিণ দেখে

অবাক চোখে চেয়ে থাকে বুনো আপেলের দল।

সেদিনের সেসব শ্রুতি যেন লম্বা এক বনস্পতি

ভোঁ দৌড়ে মিলিয়ে গেলো

সেন্ট লরার আদুরে জলের সরোবরে...

অনঙ্গ সবুজ

করোনেশন পার্কটি আজ তাগড়া ঘোড়ার মতো

দৌড়াচ্ছিলো সপ্রাণ সবুজে

আমার ছিলো না সাধ্য দাঁড়াই সমুখে

অবরুদ্ধ করে দিই পথ,

তখন পশ্চিমে ছিলো দিগম্বর এক

গোধূলি মায়ের ছেলে

অতলান্তে যাবার আগেই

চিৎকাত করা তার উলঙ্গ আলো

ছুঁড়ে দিলো

প্রজনন প্রণামে

মনে নেই, কতক্ষণ সেই

ধাঁধার আবর্তে আমি একা

বাতাসে সবুজ সুতোর মতো নিরলম্ব

মহাভারতের কুন্তীর মতন ভীত

কতক্ষণ; আজো মনে নেই।

এই যে মাতাল করা অনঙ্গ সবুজ,

কীভাবে ধারণ করি আমারই বুকে

নিঃস্ব ও কাঙাল আমি,

আত্মঘাতী করোনা কবলে

গৃহের আশ্রয়ে নিরাশ্রিত উঁই

হৃদয় ছাড়া যে, আর

কোনোই ভাঁড়ার নেই

বেশিরভাগটা তার জুড়ে আছে

কালোত্তীর্ণ মুখচ্ছবি,

দ্রোহী এক বিখ্যাত কবির

কবিতার সবুজেই আজো ভেসে যায়

প্রতিটি অন্তিম,

কোনো কোনো রাতে, সদ্য প্রসূত কবিতা

সকালে উঠেই

অপরূপ এক চিতার সবুজে

পেতে দেয় মায়ারোদ,

রাতজাগা স্নিগ্ধ এক আঙুলের মতো

ছায়া হয়ে উড়ে যায় যেন সেই পাখির উড়াল

আয়নার মতো সবুজের কাছে কিছু ঋণ

তবু রয়ে গেছে বাকি,

সবুজের স্বপ্নময় কিছুটা সময়

এখনো সযত্নে তুলে রেখেছে প্রকৃতি,

আমিও সন্তান প্রকৃতির,

আমার জরায়ু যেন নিসর্গের ধুলো

পৃথিবীতে নিয়ে আসি আমিও এমন

ঘাসের সন্তান

আজন্ম মানব তারা

সবুজে সবুজ।

বর্ষার সনেট

তুমি কি বর্ষার কান্না মেখে শুয়ে আছো অন্ধকারে?

হয়তো হবে না দেখা, আর কোনো দিন- এই ভেবে

আলস্যের বেলা কাটে দীর্ঘ ঘুমে, নিদয়া স্বভাবে

আলোতেও আজ একা আমি এই সঘন আষাড়ে।

বিরহী যক্ষের মতো কাঁদো যদি বৃষ্টির প্রণামে

বর্ণ পতনের মতো ঘুম নামে শ্রাবণের ঘাসে

বৃষ্টি আসে, বৃষ্টি যায় নিরুত্তর কবরের পাশে

পূর্বমেঘ ছুঁয়ে তবু ডাকো যদি ঐ বৃষ্টির নামে;

নীপবন ভেসে যায় রিমঝিমে, নব ধারাজলে,

বিরহ শয়ানে রাধা খোঁজে মিলনের রতিকণা

প্রণয়ের পিছুটান আজো তবু কিছুতে ছাড়ে না,

নিসর্গের স্মৃতিজলে মায়াটুকু থেকে যায় ভুলে।

বৃষ্টির জানালা খুলে শুনি তার মগ্নবীণা, সুর

তুমুল বৃষ্টিতে বাজে দূরে বুর্কিনা ফাসোর ক্ষুর।

বি: দ্র: (ইতিহাসের পাতায় এই বুর্কিয়া ফাসো সবচেয়ে দ্রুততম ঘোড়া হিসেবে সমধিক পরিচিত।)

দিলারা হাফিজ : আগামীকাল ২০ নভেম্বর কবি দিলারা হাফিজের ৬৬তম জন্মদিন। ১৯৫৫ সালের এই দিনে তিনি মানিকগঞ্জ জেলার গড়পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর। ১৯৯৮ সালে ঢাবি থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রি লাভ করেন।

৩৭ বছর শিক্ষকতা জীবনে সরকারি কুমুদিনী কলেজ, ইডেন কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যায় ছাড়াও মিরপুরের সরকারি বাংলা কলেজ ও তিতুমীর কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড, ঢাকার চেয়ারম্যান হিসেবে চাকরি থেকে অবসর নেন। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ- ভালোবাসার কবিতা, পিতা কিংবা পুত্র অথবা প্রেমিক, প্রেমের কবিতা, কে নেবে দায়, খুঁজে ফিরি ভিক্ষালব্ধ জ্ঞান, অবিনশ্বর আয়না, নির্বাচিত কবিতা, নারী সংহিতা। ১৯৮৩ সালে কবিতার জন্যে লা ফর্তিনা সম্মাননা ও ২০১২ সালে বাংলাদেশ ও নেপাল ফ্রেন্ডশিপ সম্মাননা লাভ করেন। বৈবাহিক জীবনে তিনি অন্যতম প্রধান কবি রফিক আজাদের (প্রয়াত) স্ত্রী।