menu

দিদি ও আমার দিন-যাপনের খসড়া

আলাউদ্দিন খোকন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর ২০১৮
image

২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বিকেল ৫টা। দিদি চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউ-তে। জন্মাষ্টমির বন্ধ চলছে। বড় ডাক্তাররা প্রায় সবাই ছুটিতে। এর মধ্যেই চমেক-এর সহকারি পরিচালক ডাক্তার আক্তারুল ইসলামের সহযোগিতায় মেডিসিন, সার্জারি, ডায়াবেটিকসহ অন্যান্য প্রায় সব বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপকদের নিয়ে বোর্ড বসল দিদির চিকিৎসার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে। তখনই প্রায় নিশ্চিত যে, দিদি আর বেশিক্ষণ নেই আমাদেও মাঝে। এর আগেও তিনবার তাঁকে আইসিইউ-তে আনা হয়েছিল। অবস্থার উন্নতি হলে কেবিনে নেওয়া হলেও এবার আর সম্ভব নয়Ñ আমরা তা বুঝতে পারছিলাম। ডাক্তাররাও আশা ছেড়ে দিয়েছেন প্রায়। ২০১৭ সালের জুন মাস থেকে বারবার অসুস্থ হয়ে পড়ায় দিদিকে বেশি সময় মেডিকেলেই কাটাতে হয়েছে। গত ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে ফেলায় সে-ই থেকে মৃত্যু পর্যন্ত টানা নয় মাস মেডিকেলেই ছিলেন দিদি। শেষ পর্যন্ত ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে। তিনি স্বর্গে যেতে চাননি। তাঁর ‘স্বর্গে আমি যাব না’ কাব্যগ্রন্থে ই লিখেছেনÑ

“যাব না ভাই যাব না স্বর্গে আমি যাব না

দুধের নদী ক্ষিরের সাগর যতই সেথা থাকুক না...”

... ... ...

“এই মর্ত্যভূমে একা একা কাটাব দিন তবু ভালো

জুড়াব প্রাণ চাঁদের সুধায় মাখব গায়ে তারার আলো...’’

রমা চৌধুরী। সাহিত্যিক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক। সন্তান, সম্ভ্রমহারা নিঃস্ব-রিক্ত “একাত্ততরের জননী”। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যখন মুক্তিযোদ্ধার নাম ভাঙিয়ে বহু বহু জন নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন, তখন একজন রমা চৌধুরী সন্তান, সম্ভ্রম, সম্পদ হারিয়ে শোকে-দুঃখে নিজেকে নিজের ভেতর গুটিয়ে নিচ্ছেন। যুদ্ধের কারণে লক্ষ লক্ষ শহিদ ও নিজের সন্তান হারানোর শোক বুকে নিয়ে তিনি খালি পায়ে পথে পথে কাঁধে ঝোলা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন বছরের পর বছর। কারো সাহায্য ছাড়া একজন নারী কী কঠিন লড়াই করেছেন দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর এর কিছু কিছু কথা লিখেছেন তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ “একাত্তরের জননী”তে (১ম খন্ড)। যদিও তিনি বইটির দশ খন্ড লিখতে চেয়েছিলেন, তা আর সম্ভব হলো না।

রমা চৌধুরী। আমি তাঁকে দিদি বলে ডাকতাম। আমার সাথে দিদির পরিচয় ১৯৯৫ সালে। তাঁর প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ “রবীন্দ্র সাহিত্যে ভৃত্য” প্রকাশ করার সময়ে তাঁর সাথে পরিচয়। আমি তখন চট্টগ্রামের চেরাগী পাহাড়ের লুসাই ভবনে ‘প্রাইম’ নামে একটা এ্যাডফার্মে শেয়ারে যুক্ত ছিলাম। আমি জন্মেছি স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে। মনে প্রবল আকাক্সক্ষা যদি যুদ্ধের আগে জন্মাতাম তবে নিশ্চিত স্বাধীনতাযুদ্ধে নিজেকে সঁপে দিতাম। এটাই প্রথম প্রেরণা দিদির সাথে সংযুক্তির। আমার মা মারা যান ৫ বছর বয়সে। দিদির সাথে পরিচয়ের পর তাঁর কাছ থেকে জানলাম যুদ্ধের সময়ে তাঁর ওপর পাকিস্তানিদের নির্যাতন, তাঁর ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া, তাঁর সকল সাহিত্যকর্ম পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার কথা। জানলাম, ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ায় ঠান্ডায়, অনাহারে-অর্ধাহারে অসুস্থ হয়ে তাঁর বড় ছেলে সাগর আর মেজ ছেলে টগর এর মারা যাওয়ার কথা।

দিদির স্নেহ বাৎসল্যে আমার মা হারানোর বেদনা একাকার হয়ে মিশে যায়। দিদি আমাকে বললেন- তাঁর সহযোগী হওয়ার কথা। সন্তানের স্মৃতি নিয়ে তিনি গড়ে তুলতে চান “দয়ার কুটির” নামে একটি অনাথালয়। আমাকে বললেন আমি যেন তাঁর সাথে সেই কাজে সহকারী হয়ে পাশে থাকি। আর তাঁর বই প্রকাশে সহযোগিতা করি। সেই থেকে আমার আর দিদির একসাথে পথচলা শুরু। আরপর দীর্ঘ দুই যুগ কেটে গেল।

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট পরিবার পরিজন ছেড়ে দিদির সাথে সন্ন্যাসজীবনে যুক্ত হওয়ার দুঃখ সহ্য করতে না পেরে আমার বাবা মারা যান হার্ট এ্যাটাক করে।

১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর মাত্র ২১ বছর বয়সে মারা যায় দিদির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান দীপঙ্কর চৌধুরী টুনু। ২০০২ সালে পা ভেঙে ছয় মাস বিছানায় পড়ে থাকলেন দিদি। তাঁর মধ্যেই প্রকাশ পেল তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘নজরুল প্রতিভার সন্ধানে’, ‘সপ্তরশ্মি’, চট্টগ্রামের লোকসাহিত্যে জীবনদর্শন’, কাব্যগ্রন্থ- স্বর্গে আমি যাব না’, ‘শহীদের জিজ্ঞাসা’ এবং দীপঙ্কর টুনুর কাব্যগ্রন্থ ‘হৃদয়ের ভাষা’, দীপঙ্কর টুনুর স্মারক সংকলন ‘স্মৃতির বেদন অশ্রু ঝরায়’ এবং রমা চৌধুরী ও দীপঙ্কর টুনুর পত্র সংকলন ‘নীল বেদনার খাম’।

দিদি ১৯৭৮ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে দেন। তার আগে বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রামে নারীদের মধ্যে প্রথম ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে চাকরির সুযোগ পেয়েও মা ও বাড়ির প্রতি অন্ধ ভালোবাসার কারণে কক্সবাজার বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেছিলেন দিদি। সর্বশেষ ফটিকছড়ি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নিযুক্ত থাকাকালীন স্কুল কমিটির সাথে আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে স্বেচ্ছায় অবসর নেন। এরপর থেকে আলসারে আক্রান্ত হয়ে নিজ গ্রাম বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়ায় গৃহ-শিক্ষক হিসেবে জীবন-যাপন করেন প্রায় বারো বছর।

১৯৯০ সালের পর থেকে পুরোদমে লেখালেখি শুরু করেন। লেখ্যবৃত্তিকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। যা আমৃত্যু করে গেছেন। নিজের বই নিজে প্রকাশ করে পাঠকের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয়া-ই ছিল তাঁর কাজ। সাথে একটি আবেদন ছিল- বই বিক্রির টাকায় গড়ে তুলতে চেয়েছেন অনাথ আশ্রম। দীপঙ্কর টুনু মারা যাওয়ার পর অনাথ আশ্রমের নাম পরিবর্তন করে রাখেন- ‘দীপঙ্কর স্মৃতি অনাথালয়’।

দিদি নামকাওয়াস্তে দুইবার সংসার শুরু করেছিলেন। বলা যায় চার সন্তানের পিতৃ-পরিচয়ের সূত্র ধরে দুইজন স্বামীকে স্বীকৃতি দেন। যদিও তারা দু’জনের কেউই দিদির প্রতি কোন কর্তব্য পালন করেননি। দু’জনই তাঁদের আলাদা সংসার নিয়ে বহাল তবিয়তে বেঁচেবর্তে আছেন। একজন ডাঃ নৃপেন্দ্রলাল চক্রবর্তী- যিনি প্রথম তিন সন্তানের জনক। আছেন সীতাকুন্ডে। অন্যজন এড. দীলিপ দত্ত রায়। একসময় দৈনিক সংবাদের সার্কুলার সহযোগী থাকলেও এখন কিশোরগঞ্জ জর্জ কোর্টের উকিল। তিনি দীপঙ্কর টুনুর পিতা।

দিদির বাবা মারা যান মাত্র তিন বছর বয়সে। কোন ভাই-বোন ছিল না দিদির। মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে বোয়ালখালীর এক অজপাড়াগাঁয়ে থেকেও নিজপ্রতিভায় মাত্র বিশ বছর বয়সে স্নাতকোত্তর করেন।

সারা জীবনই তিনি লড়াই করে গেছেন।

২০০৫ সালের ১৭ই মার্চ গ্রামের বাড়িতে থাকাকালীন দিদির মাথা ফেটে যায় একটা ঘটনার প্রেক্ষিতে (যা প্রকাশ্যে আনা আপাতত সম্ভব নয়)। দিদিকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভর্তি করি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং মস্তিষ্কের অপারেশনে কোমায় চলে যান। সাতদিন কোমায় থেকে একটু একটু করে জ্ঞান আসলেও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন দিদি। সে সময় দিদিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে আমার পাশে ছিল আমার কিছু বন্ধু। আমাকেও চিনতে পারতেন না দিদি। চার মাস পর স্মৃতি ফিরে এলেও দিদির একটা চোখ নষ্ট হয়ে, একহাত, এক-পা অচল হয়ে দেড় বছর বিছানায় পড়ে থাকতে হয়। আমিই তাঁর একা সঙ্গী। আর ছিল কয়েকটা বিড়াল। দিদি বিড়াল এতই ভালোবাসতেন যে, আঠারোটি বইয়ের মধ্যে নয়টি বই তিনি বিড়ালকে উৎসর্গ করে গেছেন। দেড় বছরের চেষ্টায় দিদিকে আগের মতো সুস্থ করা গেলে আমরা দুজন আবার বই বিক্রি ও ছাপার কাজে বেরিয়ে পড়ি। চেরাগী পাহাড়ের লুসাই ভবনের বারো বাই ষোল ফিটের একটি রুমে দিদি কাটিয়ে দেন ১৭-১৮ বছর। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে গণভবনে দেখা করতে যান প্রধানমন্ত্রীর সাথে। এত নির্লোভ একজন মানুষ তিনি! সবাইকে যেমন ফিরিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রীকেও তেমন ফিরিয়ে দিয়েছেন। নিলেন না কিছুই তাঁর কাছ থেকে। উল্টে নিজের লেখা কিছু বই প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিয়ে এসেছেন। সারাজীবন যত কষ্টই হোক দিদি কারো কাছে মাথা নোয়াননি। আমি তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে এ শিক্ষাই পেয়েছি জীবনে- নিজের প্রয়োজনে নিজেকে ছোট না করে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়।

  • বিশেষ সাক্ষাৎকার

    কিছুটা এমার্জেন্সি কবির বাঁচার মধ্যে থাকে

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    newsimage

    প্রশ্ন : এই যে এত বছর বিদেশে থাকা, বছরে একবার করে আসা,

  • সমর সেন : কেন প্রাসঙ্গিক

    দারা মাহমুদ

    newsimage

    কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ দু’জন অপরিচিত তরুণ

  • কবি জাহাঙ্গীরুল ইসলাম

    স্মৃতি ও কবিতা থেকে

    সৈকত রহমান

    newsimage

    জাহাঙ্গীরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে বা লিখতে যদি যাই, দেখি আমাদের ব্যক্তিগত

  • রমা চৌধুরী

    মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নভেলায়

    খালেদ হামিদী

    newsimage

    আমার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একমাত্র উপন্যাসিকা ‘সব্যসাচী’তে রমা চৌধুরী আছেন, নভেলাটির শেষাংশে, এভাবে:

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    একটি মনোরম সন্ধ্যার আর্তি কাজী সুফিয়া আখতার বেঙ্গল বইয়ের লাইব্রেরিতে বুধবার বিকেলে হঠাৎ করেই

  • অপ্পো কথার গপ্পো

    লিটন চক্রবর্তী মিঠুন

    newsimage

    আর দশটা বিষয়ের মতো সাহিত্যও হরেক রকম। নানা তার চেহারা, বিচিত্র তার

  • জনক

    শামীম আহমেদ

    newsimage

    বাড়ির আঙিনায় ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল সৈকতের। চারদিকে বিদঘুটে অন্ধকার। জেনারেটর