menu

তাহাদের কথা

মাকিদ হায়দার

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯
image

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশ হাজার হাজার বছর আগে। এক সময় এই মানুষেরা বনজঙ্গলে বসবাসকালে তাদের দেহাবরণ ছিল বিভিন্ন ধরনের, কেউ কেউ উদোম থাকতেই পছন্দ করতেন, তারা থাকতেন প্রকৃতির সন্তানরূপে। অন্যরা দেহাবরণ হিসেবে ব্যবহার করতেন গাছের বাকল, ক্ষেত্র বিশেষে অন্য কোন আচ্ছাদন।

ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার তার বিখ্যাত গ্রন্থ, চার খন্ডে লিখিত বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম খন্ডে প্রাচীন যুগ নিয়ে যে সকল তথ্য দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি বলেছেন, ভারতের প্রাচীন যুগের ইতিহাস একরকম বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইউরোপের পন্ডিতেরা ভারতের প্রাচীন লিপি, মুদ্রা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার করে হিন্দু যুগের ইতিহাস উদ্ধারের সূচনা করেন। তাদের সমবেত চেষ্টায় আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাচীন যুগের ইতিহাস। অপরদিকে রমা প্রসাদ রচিত ‘গৌড়রাজ মালা’ এবং আরও পরে রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ এবং ১৯১২ সালে বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল চেষ্টা চালিয়ে ছিলেন বাংলার সঠিক ইতিহাস, ইতিহাসবিদদের লেখাতে। তিনি সফল হননি। ১৩৪১ সালে ড. দীনেশচন্দ্র সেন ‘বৃহৎ বঙ্গ’ যে গ্রন্থটি প্রণয়ন করেছিলেন, সেটি ঐতিহাসিক বিবরণ হিসেবে বিদ্বজনের নিকট সমাদৃত হয় নাই। রমেশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা অধ্যাপক, পরবর্তীতে তিনি ভিসি হয়েছিলেন। তার পরে আমরা দেখেছি ‘বাংলার ইতিহাস’ ড. নীহাররঞ্জন রায়ের। নীহাররঞ্জন রায়ের অনুমতি নিয়ে প্রখ্যাত কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, বাংলার ইতিহাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের বিশিষ্ট পন্ডিত-সুলেখক ড. মুনতাসীর মামুন, বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ওপর তার সুলিখিত গ্রন্থ, সর্বস্তরের পাঠকের নিকট সমাদৃত হয়েছে।

অতি সম্প্রতি বিজন গোলদার রচিত ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থটি পেয়েছে পাঠকের আনুকূল্য। ‘বাঙলা, বাঙালি ও বাত্যজনের কথা’। বাত্যজন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর পশ্চিম যাত্রীর ডায়রি ১৪/০২/১৯২৫ সালে লিখেছিলেনÑ বোধকরি বাত্যজনদের নিয়েই। “দুঃখের অত্যাচার যখন অতিমাত্রায় চড়ে ওঠে তখন তাকে পরাভূত করতে পারিনে, কিন্তু তাকে অবজ্ঞা করবার অধিকার তো কেউ কাড়তে পারে না”। তার আফ্রিকা কবিতাতেও লক্ষ্য করি নিষ্পেষিত মানুষের বাত্যজনের কথা।

সেই বাত্যজনের কথাই লিখেছেন/বলেছেন গ্রন্থকার বিজন গোলদার। লেখকের বর্ণনা মতে, জ্যামিতিক ব্যাকরণের সূত্রানুসারে ‘বাত্য’ শব্দ থেকে ‘ব্রাতীন’ শব্দটির উৎপত্তি। কায়িক শ্রমনির্ভর জনসমষ্টিই ব্রাতীন ব্রাত্যর অনুরূপ শব্দ। অর্থাৎ জাতিগত এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্ষুদ্র, পঞ্চমবর্ণ ও নিম্নবর্ণের মানুষদের লেখক ব্রাত্য হিসেবেই দেখেছেন। এবং ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি জানিয়েছেন প্রাগৈতিহাসিকের কথা, এমনকি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতরই পরিলক্ষিত হয়েছিল, কে ব্রাত্য আর কে ব্রাত্য নয় সেই স্বরূপ সন্ধান করেছেন লেখক। তার সুবৃহৎ বাঙ্গালা, বাঙ্গালি ও ব্রাত্যজনের কথা গ্রন্থে। ইতিপূর্বে তার কয়েকটি লেখা দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হয়েছিল, পরবর্তীতে সেটি বৃহদাকারে প্রকাশিত হয়েছে। ‘মুখবন্ধ’ লিখেছেন বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। স্বল্প কথায় তিনি জানিয়েছেন বাঙালির ইতিহাস ও স্বরূপ সন্ধানের কথা, আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, পাঠকেরা পাঠ করলে অবশ্যই জানবেন ব্রাত্যজনেদের জীবনযাপন, ধর্মাচার এবং সামাজিক অবস্থান।

যিশু খ্রিস্টের জন্মের পূর্বে অর্থাৎ ১৭৫০-এ ঋকবেদেরই বর্ণসৃষ্টিকে ভিত্তি করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে লেখক-পাঠককে একছত্রে আনার সফল প্রচেষ্টা গোলদারের পুস্তকটিতে। পূর্বেই বলেছি নীহাররঞ্জন রায়, সুকুমার সেন, রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বাংলাদেশের ইতিহাস লেখক রমেশচন্দ্র মজুমদার, মুনতাসীর মামুন সকলেই জানিয়েছেন বাঙালির অতীতকে। অন্ত্যজ ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করেছেন ইতিহাসের পন্ডিতেরা। পাল, সেন এবং পরবর্তীতে মুসলিম শাসনসহ ইংরেজ শাসন, সব কিছুকেই প্রাধান্য দিয়েছেন লেখক।

আমার অভিধায় মূল্যবান তথ্য-উপাত্তই গ্রন্থটির বৈশিষ্ট্য-বিশেষত্ব। তবু বলতে হয়, সমাজে দ্রোহ এবং তার ব্যাপ্তি বাড়াতে সাহায্য করে জমি, নারী। এ সকল নিয়েই আর্য-অনার্যদের ভেতরেই সৃষ্টি হয়েছিল দ্বন্দ্ব। সেই সব দ্বন্দ্বেরই ইতিহাস বাঙালির ইতিহাস। পুনরায় ফিরতে হলো রবীন্দ্রনাথের নিকট। তিনি জানালেন, ‘ইতিহাসে থাকে বাদশাহের সুরাপাত্রের রক্তিম ইতিহাস। ছককাটা শতরঞ্জির মতো ইংরেজ শাসন, এর ঘরগুলো সাদা কালোয় সমান বিভক্ত নয়। এর পনেরো আনাই সাদা।’ রবীন্দ্রনাথ এক্ষেত্রে রাজাদের যুদ্ধবিগ্রহ থেকে ইতিহাসকে বাঙ্গালা ও বাঙ্গালিকে তথা জনগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দিয়েছেন তাঁর লেখায়।

প্রাচীনকালে ভিন্ন ভিন্ন কৌমভিত্তিক আলাদা জনপদ গড়ে ওঠে ভাগীরথির পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর পশ্চিম ও দক্ষিণে। অন্তর্বর্তীকালে নদের নাম ছিল গৌড় বঙ্গ, সমতট, চন্দ্রদ্বীপ, বঙ্গাল, পুন্ড্র, বরেন্দ্র, রাঢ়, তাম্রলিপ্তি, বারক কঙ্কগ্রাম, বর্ধমান, কজঙ্গল, দন্ডভুক্তি, খাড়ি, নাব্য ইত্যাদি। এদের ভৌগোলিক সীমারেখা সময় ভেদে ভিন্ন হয়। এক সময় পুন্ড্রবর্ধন বরেন্দ্র ভূমি সমর্থক হিসেবে বিশাল জনপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। সুবিস্তৃত অঞ্চলব্যাপী পরিচিত ছিল গৌড়ের। এবং রাঢ়ও যুক্ত হয় গৌড়ের মধ্যে। আবার বঙ্গ, বঙ্গাল, বঙ্গালদেশ ভিন্ন ভিন্ন জনপদ সময়ভেদে আকারে আয়তনে সম্প্রসারণ ও সংকোচন ঘটে। এবং অষ্ট শতবর্ষে বঙ্গ নামের মাঝেই একত্রীকরণ ঘটে পুন্ড্রসহ ভিন্ন ভিন্ন জনপদের। আবার অধিকরণের সময় সুবা বাঙলার নামে বৃহৎ বাঙলার পরিচিতি মেলে।

প্রায় পঁচিশ লক্ষ বছর পূর্ব হতে এ ভূমির যাত্রা শুরু। জনতত্ত্বের দিক দিয়ে এ জনগোষ্ঠী অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও আলপীয় জনার সমন্বিত রূপ। তবে অস্ট্রিকজনাই এর প্রাধান্যে। একদিন এ বাঙলার জনেরা তাম্রসভ্যতা গড়ে তোলে। তাম্রলিপ্তি মেদিনীপুর অঞ্চলে হলেও সমুদ্রকূলব্যাপী গড়ে ওঠে বন্দর সভ্যতা। নৌবাণিজ্য হতো ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সাথে। কৃষির সৃষ্টি এ জনগোষ্ঠীর।

নর্ডিক আর্যরা ভারতবর্ষে আগমনের পর দেড় হাজার বছর অপেক্ষার পর খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে তারা বাঙলায় আগমনে সমর্থ হয় এবং গুপ্তবংশীর সম্রাটগণের সময় তাদের জয়যাত্রা নিশ্চিত হয়। এ জয়যাত্রায় আর্যরাও বহুলাংশে অংশী হয় অনার্য সংস্কৃতির সাথে।

বাঙলায় পলি সমৃদ্ধ এ ভূভাগ গড়ে উঠেছে গঙ্গা-ভাগীরথী, পদ্মা-মেঘনা, যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের বয়ে আসা স্রোতধারায়। আবার নৌবাণিজ্যকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন জনপদে গড়ে ওঠে সভ্যতা। গঙ্গারিডি রাষ্ট্র সভ্যতা তারই প্রমাণ। পান্ডু রাজার ঢিবি, চন্দ্র কেতুর গড়, তাম্রলিপ্তি, পুন্ড্রনগর, ময়নামতি, পাহাড়পুর ও সম্প্রতি আবিষ্কৃত ওয়ারী বটেশ্বর এর সভ্যতা প্রমাণ করে এ সকল জনপদের অগ্রসরতার। এ সকল জনপদের কোন কোনটার বয়স প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছরের। এ সকল জনপদের জনগোষ্ঠীর কাছে নিজস্ব সংস্কৃতি কৌমভিত্তিক অনুষ্ঠানাদির ব্রত পালন ও পূজা পার্বণ।

খিস্টীয় অষ্টম শতক হতে বাংলায় আর্য ব্রাহ্মদের অনুপ্রবেশ এবং চতুবর্ণ তাদের হাত ধরে বাংলায় প্রবেশ। শ্রেণির আধিপত্য নিয়ে তারা সমাজে প্রতিষ্ঠা নেয় ক্রমে ক্রমে এবং রোম সংস্কৃতিতে নিজেদের অংশী করে তার প্রাধান্যে থেকে প্রতিষ্ঠা নেয় সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতিতে। ক্রমে ক্রমে বৈদিকÑ অধীনস্ত করে প্রাচীন জনপদের মানুষকে। বৈদিক বিধানে আর্য ব্রাহ্মণ ব্যতীত সকলকে ক্ষুদ্র করে এবং আর্যদের সেবাই তাদের থাকে কর্তব্যকর্ম। শ্রমনির্ভর পেশাভিত্তিক জনগোষ্ঠী সকলই ক্ষুদ্র ও অরণ্যচারী, পেশানির্দিষ্ট কিছু মানুষের পঞ্চম শ্রেণীভুক্ত হয়। এরপরেও থাকে নিবর্ণ মানুষ। সবকিছু গড়ে ওঠে ব্রাহ্মণ্য বিধানের বৈদিক নিয়মে।

খ্রিস্টপূর্ব ২৬২ হতে আশোকের সময়কালে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটে। তবে তা বৈদিক ধর্মের সাথে সমন্বয় করে। রাজধর্মের আনুকূল্যে বৌদ্ধের সংখ্যা বাড়ে। বর্ণঘৃণা কিছুটা প্রশমিত হয় তার অনুশাসনে। এরপর বাঙলা দীর্ঘকাল শাসন করে পাল বংশ। তারাও বৌদ্ধ ছিলেন। তবে সে সময় ব্রাহ্মণ ধর্মের মাত্রা বাড়ে। সামান্য সময়ের জন্য ক্ষমতা গ্রহণ বাঙালি ও নিম্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি কৈবর্ত রুদ্রক ও ভীমের। সামন্ত রাজারা অর্থনৈতিক ও শ্রেণিগত কারণে কৈবর্ত রাজকে ধ্বংস করে।

পাল বংশের ধ্বংসে সেন রাজ শুরু। বর্ণ ও শ্রেণি শাসন ও শোষণের নির্মমতার শিকার বিশাল জনগোষ্ঠী। অপরদিকে নিম্নশ্রেণির বৌদ্ধদের হিন্দুধর্মে ফিরিয়ে এনে বর্ণাবনতি। গুহ্য দর্শন, কায়াসাধনা, বিভেদ ব্যভিচারে দীর্ণ সমাজে মুসলিম রাজশক্তির প্রবেশ অনেকটা অনিবার্য পরিণতি। এ মুসলিম রাজশক্তির রাজশাসন ৬৫০ বছরের অধিককাল। এ সময়ে ব্যাপক নিম্নশ্রেণী, বৃত্তিচারী শ্রমনির্ভর ও ব্রাত্য জনগোষ্ঠী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।

বাংলায় তখন ঐতিহাসিক ভূমিকা নেন শ্রী চৈতন্য। তিনি অবৈদিক। তার ভক্তিপ্রেম ধর্মীয় ভেদাভেদকে এক করে মানবপ্রেম সরলীকরণের মাধ্যমে ঈশ্বর দর্শন। তার মত সুফি মতবাদ ও সহজিয়া দর্শনের একটি সমন্বিত রূপ। তবে হিন্দুধর্মের মত যা ব্যতীত অন্য যাদের অবতার বলা হয় তারা মূলত বৈদিক বিধি বিধানের অন্তর্ভুক্ত।

এর মধ্য দিয়ে পূর্ব বাংলায় চর্যাপদ গড়ে তোলে বাঙলা ভাষার আদিরূপ। মুন্ডারা ভাষা সমৃদ্ধ করে বাঙলাকে। বাংলায় যুক্ত হয় ফরাসি, আরবি, পর্তুগীজ, ইংরেজি, ফরাসি ও অন্যান্য শব্দ ভান্ডার। মধ্যযুগ সমৃদ্ধ করলো বাঙলা ও বাঙলা ভাষাকে।

ইংরেজ এলো। আড়াইশ বছর অধিককাল চললো তাদের শাসন। আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোটির অধীনে এলো বাঙলা। খাজনা আদায়ের জন্য ভূমি ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনস্ত করা হলো। নিম্নবর্ণ, নিম্নশ্রেণীকে শাসন ও শোষণে নিঃস্ব করা হলো। সামন্ত জমিদার ও ব্রিটিশ এক হয়ে যে রেনেসাঁ গড়ে তাতে নিম্নশ্রেণি ও ব্রাত্যরা থাকে উপেক্ষিত। ব্যতিক্রম থাকেন বিদ্যাসাগর। বিবেকানন্দ বৈদিক থাকায় নিম্নশ্রেণির এ জনগোষ্ঠীর পক্ষে তিনি থাকেন আংশিকরূপে। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মণ্যবাদের দুর্লংঘ্য প্রাচীর ভাঙতে চেষ্টা করেন। তিনি পারেন না। কারণ প্রাচীর অনেক শক্ত। তবুও এর মধ্যে হিন্দু কলেজ হয়, কলকাতায় মাদরাসা হয়। বঙ্গভঙ্গ হয়, ধর্মের বিভেদ বাড়ে। অন্ত্যজরা নিঃস্ব হয়ে তলানিতে থাকে।

এর মধ্যে নিঃস্ব অন্ত্যজ ও ব্রাত্যজনেরা সামন্তবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী হয়ে বিদ্রোহ করে। এরা সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, চোয়াঙ বিদ্রোহ, কৃতদাস বিদ্রোহ, তন্তুরায় বিদ্রোহী, পাহাড়ি বিদ্রোহ, লবণচাষি বিদ্রোহ রংপুর কৃষক বিদ্রোহ, নীল বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, বাঁশের কেল্লা, সাঁওতাল বিদ্রোহ ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিরোধী বিদ্রোহে অংশ নেয়।

অতঃপর ধর্মভিত্তিক দেশভাগ। পূর্ব ও পশ্চিমের সকল অংশেই ধর্ম থাকে এবং ধর্মের আবরণে বিভেদ বাড়ে। পূর্ব বাংলা সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামো থাকার এর চেহারা থাকে অপেক্ষাকৃত ভয়াবহ। একদিনের ব্রাত্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর একাংশ শ্রেণি শীর্ষে উঠে আর্য ব্রাহ্মণ হয়। নিঃস্বরা ব্রাত্য থাকে। ’৫২, ’৬৯ এবং ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠী স্বাধীন ভূমি পেলো।

ধর্ম আজও সক্রিয় ও প্রবল প্রতাপে এগিয়ে যাচ্ছে। বিভেদ তীব্র। এর মধ্যেও লেখক জানিয়েছেন তার আশার বাণী। তিনি ব্রাত্যজনের মধ্যেই দেখেছেন সকল প্রত্যাশা। শুধু বাঙালি ও মানুষ হওয়ার আশ্রয় তাদের মধ্যেই বর্তমান।

লেখক বিজন গোলদার আজকের বাঙালির স্বরূপ সন্ধানে প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে টেনে নিয়ে ’৭১-এ দাঁড় করিয়েছেন। প্রতিটি পর্বে ও সময়ে লেখক নির্মোহ থেকে শ্রেণি মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি ও অর্থনীতি, বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাঙালির বিবর্তনকে দেখিয়েছেন। এ বইটি আশা করি বাঙালির মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে। তার এ নৃতত্ত্ব কথা, ইতিহাস, সমাজ দর্শন ও ব্রাত্যজনের গৌরবগাথা জানা খুব দরকার ও প্রয়োজনীয়। ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে যখন শ্রেণির মৃত্যু হয়, তখনই বাঙালি মানুষ হিসেবে পাবে তার আপনজন। ধন্যবাদ ও অভিনন্দন লেখকের এ নির্মোহ বিশ্লেষণের জন্য।