menu

গল্প সংখ্যা

তালুকদারের হৃদয়-বাসনা

দিলার মেসবাহ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৯ মে ২০১৯
image

গল্পগুলোর অলঙ্করণ : সঞ্জয় দে রিপন

তোতা মিয়া তালুকদারের ছায়ার চেয়েও নিকটে। মিয়া সারক্ষণ হাসতে থাকে। মুদ্রাদোষ। তোতার হাসনের কোন কারণ লাগে না। মুরিদের হাস্যরসে ভেজা কথাগুলো ফুল ফোটালো।

‘মালিক, আমগো মেহগনি বাগান কেমুন সোন্দর হইছে একবার দেহন লাগব। একশ’ চারাই ডাঙ্গর হইল কেমতে, আল্লামাবুদ জানে।’

শাপলার জলার কিনারে তালুকদার পরখ করে এক হলুদ রোদমাখা মেহগনি বীথি। ঠান্ডা বাতাস।...

‘এইগুলান কার তরে? খাইবো কেডা? বৃক্ষ বাঁইচা থাকতে থাকতে যদি কব্বরের বিছানায় শুইতে হয়।’ সজীব বৃক্ষশোভার ছায়ায় দাঁড়িয়ে তালুকদার মন স্থির করে ফেলে, যে বিষয়টি এতোদিন তেমন আমলে আনে নাই। দ্বিতীয় বিবাহ তার জন্যে ফরজের উপর ফরজ। বিধবা বোন শরিফুল দিন রাইত কানের বারাত ভনভন করে ভোমা মাছিডার লাহান। সেই শলাগুলান মনে পড়তাছে।

‘বাইজান আপনের সয় সম্পত্তি ক্যাডায় খাইব? একডা পোলা নাই আপনের। একডা মাইয়া হেও স্বামী সোন্তান লইয়া সৌদি পইড়া রইল’। আর মোকামে বসলে জনা দুই সাগরেদ সেই রহম কানের রাত ভন ভন করে। পায়ে দরাডাই বাকি রইছে। যেন বা তফা তালুকদার শাদী না করলে দুনিয়া রসাতলে যাইবÑ গজব পড়ব।

মেহগনির ছায়ার যে মনকথা পড়াইছিল নিজের মনরে, সেই বিষয়ডা চটজলদি ঘইট্যা গেল। ষাট বছরের আলহাজ্জ তফাজ্জল তালুকদার নিকাহ করলেন সতের বছরের জুলেখা বিবিরে। টানাটানির সংসারে টাটকা যুবতী কন্যা।

হাজী সাহেবের দ্বিতীয় বিবাহের ওজনদার একটা হেতু ছিল। বড় বিবি বড় ঘরের ঝি, চেহারা সুরতও সোন্দর। অতি চিকন আওয়াজে কতা কয়। কিন্তু পেচকি লাগল একখানে, একটা কন্যা পয়দা কর‌্যাই কুঁচা মুরগির মতো ঝিমাইতে লাগল বড় বিবি সাহেবা মেহেরুন্নেসা।

ইতিমধ্যে যেন এক ফুঁয়ে উইড়্যা গেলগা পনের বছর। অহনও সগ্গলে কয়, ‘নয়াবিবি’। এই শব্দডার মইধ্যে খানিক শ্লেষ আছে। সেইরকম মনে হয়। বিবি অজ গাঁওগেরামের মানুষ হলেও ঠাঁট বাটে দঢ়! সে কেমন নিজেরে ছড়াইয়া রাহে। দপদপাইয়া হাঁডে। গপগপাইয়া খায়। হায়া পর্দা নাই। পশ্চিম দিকে মাতা নোয়ায়না বান্দা। তয় কলকলাইয়্যা হাসতে জানে।

দিনে দিনে নয়াবিবির পাড়া বেড়ানি বাইড়া গেছে। পাড়া পড়শির হাঁড়ির খবরাখবরও তার নোখের ডগায়। যার তার অন্দরে বিনা ওজরে ঢুইক্যা যায়। মনভুলানি ফাও বাতচিত কইতে থাহে। যেন কত জনমের খ্যাশ!

কেউবা আনন্দ পায়, ‘বাপুরে শানদার বাড়ির বিবিজান, তাও কোনু দেমাগ নাই।’

কেউবা কপাল কুঁচকায়, ‘এতো লটকালটকি ভালো নাগো।’

তালুকদার নামাজী, কামপাগল মানুষ। খানিক আলাভোলা কিসিমেরও। মাঝে মধ্যে কানপচানি আধা আধা কতা কানে আইয়ে। মাছি খ্যাদায় সে। এই কানে শোনে, ঐ কানে খেদায়।

মোকামে বসলে, তালুকদার পাক্কা ব্যবসায়ী। এই ধ্যান জ্ঞান না থাকলে ব্যবসাপাতি লাটে উঠত।

মনোহরদি বাজারে তার সর্ববৃহৎ বস্ত্রবিতান ‘মায়া শাড়ি ঘর’। সামনে বৈশাখ। অহন তো নিয়াশ ফেলানের সময় নাই। এই সময় ঝড় তুফানের আগ দিয়া পলাশ, রায়পুর, চুলা, বাসুভান্ডা মুল্লুক মুল্লুক থিকা পরিবার নিয়া সদাই করবার আহে। ইয়ার দোস্ত, আত্মীয় কুটুম বাদ থাহে না। শাড়িলতা, ঘের দেওয়া জামা, থিরি পিস, পাঞ্জাবি, লুুঙ্গি এ বস্ত্রবিতানে কী নাই। চালান আসতেই থাকে। শুমার নাই। থরেথরে রং বেরংয়ের থান কাপড়। দোকানীগুলা নিয়াশ ফেলানের টাইম পায় না।

ক্যাশবাক্স আগলাইয়্যা ঘন্টার পর ঘন্টা মালিক ঠায় বইয়া থাহে। মাশাআল্লাহ। বাক্সের ডালা মিনিটে মিনিটে খোলরে বন্ করোরে। তালুকদার হাকিমপুরী এক নম্বর জর্দা, কাঁচা সুপারির নেশায় খদ্দেরের গরম-ঠান্ডা বাতচিতে কেমুন নেশাতুর হয়ে ওঠে। জমিদার ভাগ্য।

পিচ্চি নান্টু বেশুমার হাই তুলতে থাহে। চিকনা হাফিজ্জ্যা ঝাড়ি মারে।

‘ঐ ব্যাডা রাইতে গুমাস নাই? এমুন হাই তোলস ক্যা?’ পিচ্চি ‘মায়া শাড়ি ঘরে’র তামাম ফাই ফরমাস খাটে। পিচ্চির চক্ষু দুইডা বুইজ্যা আহে।

আসরের নামাজ জামাতে পইড়্যা কেবলই মোকামে ঢুকছে তফাজ্জল তালুকদার। দাঁিড়গুলায় অহনও ওজুর পানি লাইগ্যা আছে। পুরানা দোস্ত মুরতুজা গদির কাছে আসতেই তালুকদার খোশমেজাজে তারে পাশে বসায়। খানিক দম ধরে থাহে দোস্ত। তারপর কানের লতির কাছে ফিসফিস করে, ‘নয়াবিবি কই কই যায়Ñ কার গরে বইয়্যা ততা বাত, বোয়াল মাচের লহুর লাহান ঝোল মাখাইয়্যা বাত খায়। খায় আর রঙ্গ তামাশা করে। খবর রাহো মিয়া? কাগর বাড়ি যায়? তালুকদারের বিবি যেহানে মনে লয়, সেইহানে যাইবো ক্যারে? তোমার মান হম্মান নাই? তোমারে কেউ মন্দ কইলে আমার বুকত বিন্দে।’

আন্ধার তবলা তবলা মুখখান ডানে বামে কাত কর‌্যা তালুকদার কয়, ‘দুরো, ছোট বিবির বয়স কম। এডডু আদডু ঘুরাফিরা করে। আইচ্ছা। বাড়িত যায়া লই। হুনুমনি কী বিষয়’।

মানু হিংসা করে নাহি। কেডা কয় মনের খবর! বড় বিবি মেহেরুন্নেসা যেহানে মরা নদীর মতো বিজন, উদাস। শুকনা ঠনঠনা। সেহানে নয়াবিবি পাওয়ার টিলারের দুর্মর জলস্রোত। সশব্দ, সহাস্য প্রাণরসে থৈ থৈ বান সর্বশরীরে। চলতে ফিরতে ঢলে পড়ে যেমুন। হাসতে হাসতে কাশ উইড্যা যায়। তখন জগভরা পানি গলাত ঢালে। হাঁচি দেয় পুরা ঘর কাঁপায়া। ভাত খাইতে বসলে গপগপাইয়্যা খায়। চাপুর চুপুর শব্দ করে নয়াবিবি।

মেহেরুন্নেসা মাঝে মধ্যে না কয়েও পারে না। ‘ ধীরে ধীরে খাওন লাগে, গলায় বিষম লাগব’।

জুলেখা কান দেয় না বড় বিবির কথায়।

ভেটকি মার্কা হাসি দিয় কাতলা মাচের চানের বাটি উপুড় কইর‌্যা ঢালে পাতে।

তালুকদার যখন বাড়ি ফেরে, তখন শরীলতা হাপসায়। বড় বিবি পরম যতেœ ব্যালের শরবত বানায়, নয়াবিবি চিলের লাহান ছোঁ মাইর‌্যা নিয়া স্বামীর সামনে দাঁড়ায়া থাকে। দিনভরা মাচ গোস রান্ধে মেহেরুন্নসা। হাজী খাইতে বইলে জুলেখা বিবি পাতে তুল্যা দেয় নানা পদের ছান। মাঝে মধ্যে তালুকদারের আতপাও কী যতনেই টিইপ্যা দেয় নয়াবিবি। আর সেই সুময় ফয়সালা হয়্যা যায় মেহগনি বাগানডা তার নামে সাফকবলা দলিল বানায়া দেবার। তালুকদার জবান দিছে বসতভিটা দরদালানডাও জুলেখা বিবির নামে রেজিস্ট্রারি কর‌্যা দিবে। দুই ফসলী জমি জিরাত বাদ বাকি সম্পত্তির ওয়ারিশ তো একটামাত্র বংশের বাতি, তার পুত্র ধন! বাসনা জোছনা আর হাসনাও পাইব ভাগে যেমুন হয়। বড়বিবি আর বড় মাইয়্যা মরিয়মের কথা পড়ে না।...

তালুকদারের কানে আজও ভাসে মাস্টার সায়েবের কতাগুলো, ‘বংশ রক্ষায় পুত্র দরকার? পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা! ঠিক আছে দিন তারিখ সাব্যস্ত হোক। উপস্থিত থাকার চেষ্টা করবো।’ মাস্টার সায়েবে কী খুশি হতে পারলেন না। মেহেরুন্নেসাকে তিনি খুব স্নেহ করেন যে।

নয়াবিবি পর পর তিনডা মাইয়্যা পয়দা করছে। অবশেষে আশ্বিন মাসের খাঁড়া দুপুর বেলা একটা পোলা পয়দা করছে। তালুকদারের বংশ নির্বংশ হইয়্যা যাইত এই পোলাডার জন্ম না হইলে।

আশাখান আল্লাপাক পূর্ণ করছে। হাজার কোটি শুকরিয়া আল্লাপাকের দরবারে। মাটিতে পাও পড়ে না পোলার। কোলে কোলে ডাঙ্গর হইল ছোট তালুকদার। গায়ে গতরে বেশুমার বাড়বাড়ন্ত।

নয়াবিবি দেমাগে গর গর করে। তার চোখ ঘুরানি, কোমর দুলানি, পাড়া বেড়ানি খাসলত আরো বাইড়া গেল। বড়বিবি তো এক মাইয়্যা জন্ম দিয়াই কাত। নয়াবিবি বংশের বাত্তিখান জ্বালাইছে।...

তালুকদারের বাপজান ছিল বড় মসজিদের ইমাম হুজুর। সফেদ সাদা দাঁড়ি তার নুরানী চেহারায় পাহরা বসাই ছিল। নব্বই বছর বয়সে চশমা ছাড়া কোরান তেলাওয়াত করত।

কিন্তু পুত্রধন আল্লার বান্দা ব্যবসাবাণিজ্যে ডুবে গেলÑ আল্লাহর ইচ্ছায় কামিয়াবও হইল। ওয়াক্তের নামাজ কাজা হয় না। ইবাদাত বন্দেগীতে ভয়ভক্তি মাশাআল্লাহ। তবে মনডা ভাদ্র আশ্বিনের সরষা ক্ষ্যাতের মতো ঝলমলা উদার! কোনু প্যাঁেচর মইধ্যে তফা তালুকদার নাই। মানুষজন বলাবলি করে, ‘মানুষডা বড়ই বালা গো।’

বেলা আটটা। নয়াবিবি চোখ ধাঁধাঁনো কমলা কালার শাড়ি পিন্দনে। খোঁপার মইধ্যে একখান পুষ্প। ঠোঁট পালিশ আগুন রঙা। সকাল হইতে না হইতেই পাড়া বেড়ানি। বড় বেগম মেহেরুন্নেসা মোছা মোছা সুরে বলে,

‘জুলেখা বইন। আইজ কোনুখান যাওন নাই। আমার শরীলডা ম্যাজ ম্যাজ করতাছে। ভাবে বুজি জ্বর আইবো। চিতলমাচ আনছে হেত্তি। রান্ধন গরে যাওন লাগবো।’ রসবতী নয়াবিবির মুখখানা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের আঁকিবুকি। বংশের বাতিডা হেই জ্বলাইছে! কুঁইচ্যা মুরগি কয় কী! হের অহন ব্যাপারি বাড়ি যাওন লাগবÑ লাগবই লাগব। বজলা দর্জির বারাত কয়ডা বেলাউজ বানাইতে দিতে হইবো। ফুটকি ফুটকি ফুলতোলা সাতরঙা সাতটা গজকাপড়ও খরিদ করছে নয়াবিবি সদ্য। দিঘল ভেংচি ভরাট মুখ জুড়ে। চেহারা সুরত তেমন কিছু না বটে। তবে শ্যামলা চামড়া টান টান। পুুরুষ্ট স্বাস্থ্যের বাহার। অমনি চলন বলন। হালকা মেচতা পড়ছে একটুখানিক। চোখজোড়া জোনাক পোকা। জ্বলে, নেভে। কামাই নাই।

‘না গো বু, আমার যাওনই লাগবো। ধলার মায়ে মরছে নাহি? হেরে ডাহা যায়নি? আমার জরুরি কাম আছে বু।’

‘কই যাইবা? কও না হুনি?’

আমতা আমতা করে জুলেখা রসবতী। সব সওয়ালের জবাব হয়! বুড়িডা কোনহানকার!....

বিবি মেহের না কয়্যা পারে না। ঠান্ডা গলায়ই বলে, ‘বু গো হাড়িডা পরছ গতর ঢাহার লাইগ্যা। এমুন চাইপা চুইপা পরছো বু। আচলাখান আলগা কইর‌্যা গা গতর ঢাহো। তালুকদার বাড়ির বৌ ঝিগো সোম্মান আছে। নাকি কও?’

রসবতী চক্ষু নাচায়,

‘হাঁচা নি? কিন্তুক বয়সডা আমার এহনও কাচাই। বুইড়্যা সোয়ামির ঘর করতাছি, হেইড্যা তো নিজ চোক্ষে দেখতাছ? সাদ আল্লাদ ব্যাবাক গাঙের তোড়ে ভাইস্যা গেছে নি? বু, বড় বু?’ খিলখিলাইয়্যা হাসে নয়া। তুফানের লাহান উধাও হয়ে যায় ছোটবিবি।

বড় বিবির ফর্সা মুখখান অপমানে লাল হয়্যা গেছে। যেন সে কাঁটার অধিক কিছু। পোলাপানগুলা একটু বাদে খাওন চাইব। সকল-গরজ মাথায় নিয়া বড়বিবি রান্ধন গরে ঢোকে।

ব্যাপারি বাড়িডা যেন সুখেরে ভিটা। বজলুর গায়ের বর্ণ কালাকুলা। কিন্তুক মুখখানে জানি কিতা ঝিলমিল করে। নয়াবিবি বোঝে!...

বজলার টিনের চৌচালার দুয়ারে পা দিয়াই হাঁক পড়ে রসবতী। ‘বাইজান বেলাউজের মাপ লন জলদী।’ গরিবের বাড়ি হাত্তির পাড়া। বজলার মা বানেছা বেদিশা। আগেও বার কয়েক আসছে নয়াবিবি। তয় এমুন সাত সহালে না। ‘বজলু বাই কই গো?’ যেমুন রসবতীর গলা শুকায়।

বজলু হুড়া হুড়ি কইর‌্যা গর থন বাইর হয়। খালি গা। গেঞ্জি পরনের ফুরসুত পায় না। বাম হাতে লুঙ্গির গিটঁ সামলায়। বানেছা লেবুতলায় দৌড়ায়, লেবুর তালাশে। বড় বাড়ির বিবি, শরবত বানায়া দিতে হইব।

ঝিলমিল হাসির রেখা চক্ষুর কিনারে বিবির, ‘বেলাউজ বানান লাগব। নায়িকা কাটিং দিবা বজলু মিয়া। সইয়ের ব্যাডার বিয়া লাগবে। গতবার বেলাউজ বানাইছ না সাট বানাইছ। ঢল ঢল করে। গতরে হাওয়া খেলে। বুজলা? বুজলা কাটিং মাস্টোর।’

বজলুরও গলা শুকায়। ‘তাইলে মাপমুপ ঠিকঠাক দেওন লাগব ভাবীছাব।’

‘হ বডি থেইক্যা মাপ নেওন লাগব। ফিটিং লাগব। বুজবা তো কাটিং মাস্টোর।’

বজলুর চৌচালায় নয়াবিবি মাপমুপ দিতে ঢুকে তরতরাইয়া। গজফিতা হাতে নিয়া বজলু থম মেরে থাকে খানিক। গলা শুকায় কিয়েরে? খুবই হুঁশ কইর‌্যা নেওন লাগব। নয়াবিবি বলে কথা।

‘আরে ব্যাডা বহুত শরমিন্দা। আহো আহো। মাপ নেও তো।’...

বানেছা শরবত বানাইতাছে। একদলা গুঁড় চটকাইতাছে। কেডা যেন হাসতাছে। চিকন রিনরিনা হাসি। নয়াবিবির লাহান?... বজলুর বারাত প্রায়ই যাওন পরে বিবির। অহন শরীলে মাপমুপ বুইঝ্যা গেছে বজলু। ফিটিং হয় বালা।

তিন বেটি জোছনা, হাসনা, বাসনা বয়ঃসন্ধির দিকে আগাইতাছে। বংশের বাত্তি বাদশা মিয়া দুধ, ঘি , মিষ্টি মন্ডা খাইতাছে আর ফুলতাছে।

তালুকদার যে ব্যবসায় হাত দেয় যেন সোনা হইয়্যা ওঠে। দিনখান নানান ধান্দা, নিয়াশ ফেলানোর জো নাই। ‘তালুকদারর রাইস মিল’। টাটু ঘোড়ার মতো চাল্লু থাহে দিনভর। চাল, হলুদ, মরিচ, ধন্যা ভাঙ্গে মানু রাইস মিলে। ভাঙ্গানি হয় মিহি। আরো আছে মৎস্য খামার, কোয়েল পক্ষীর খামার আছে নয়াবিবির বাপের তল্লাটে, পাঁচদোনায়। হর্তাকর্তা ম্যানেজার নয়াবিবির মাস্তান ভাই জগলু।

এইখান থেকে লাভের গুঁড় পিঁপড়ায় খায়। শ্যালক বড় খ্যাশ।

বংশের বাতি চৌদ্দ বছরে পা দিবো। মহা ধুমধাম। হৈ হৈ তালুকদার বাড়িত। মনোহরদীর গণ্যমান্য মানুষের দাওয়াত। বাদশামিয়ার মাথায় স্বর্ণের মুকুট। বড়বিবিও ব্যস্ত। ছোটবিবি পরছে কটকটা লহুর বর্ণে হাড়িখান। ফাইট্টা পড়তাছে যেমুন।

এলাকার চোখা বুদ্ধির ধনী আড়তদার রজব মৃধা। বিরিয়ানি খাইয়া তৈলাক্ত হাত ধুতে ধুতে নয়াবিবিরে বলে, ‘পোলাডা কার নাক নকলা নকশা পাইছে। আপনাগো কারো লগে মিল পাইলাম না।’

জুলেখা জর্দাভরা ডবল পানের খিলিডা জলদি আগাইয়া দিতে দিতে বলে, ‘ব্যাডা আমার বাপজানের নাক নকশা পাইছে বাইজান। বাপজান বেস্ত হইতে দেখতাছেন তার নাতিডারে।’

মৃধা মুচুর মুচুর করে পান চিবায়। লাল রস খানিক খানিক গড়ায়। মাথা দোলাইয়া বলে, ‘হুঁ দাদা নানা হগলই বংশের ধারা। তাইলে নানাজানের মতো আমাগো ছোট তালুকদার। তেনারে চউখে দেখবার সুভাগ্য তো হয় নাইক্যা।’

ছোট তালুকদার চিহারা মুবারক কেমনে এত মিল খায় বজলু দর্জি লগে!... রহস্যের কুলকিনারে নাই। খালি গুজুর গুজুর ফুসুর ফাসুর।

আলহাজ্জ তফা তালুকদার নামাজ শেষে দুইহাত তুইল্যা প্রতি ওক্তে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে। বংশের বাতিটা বাইচ্যা থাকুক।

বড়বিবির হাতে লাগান নারকেল গাছের চিরল চিরল পাতা তখন নড়ে কী নড়ে না!....