menu

পরাবাস্তবের আড়ালে

ঝরে পড়া মায়ামুগ্ধতা

মুহিম মনির

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

জানালার ওপাশে ফুটে আছে বাতাবি ফুল। এপাশে বসে আছি একফোঁটা জলের আশায়। তবু বৃষ্টি আসে না। নিজেকে লুকোতে পারি না অবিরল বৃষ্টিধারায়। কেবলই দেখে যাই, জলজ উদ্ভিদের সঙ্গে জ্যোৎস্নার জলকেলি, রাতপাখিদের উড়ে উড়ে স্বপ্ন খোঁজা, ঝরঝর নৈঃশব্দ্যে ঝরে পড়া মায়ামুগ্ধতা। আর ‘পরাবাস্তবের আড়ালে’ বইটির পাতাও ওলটাই থেকে থেকে। তার ‘তীক্ষ্ণ তরবারি’র ফলা চিরে ফেলে আমাকে।

‘আমার মতোই সেও... জানি, কেউ একজন

যখন কবিতা পড়ে, ভাঙা পাঁজরের ফাঁকে ফাঁকে

পঙ্ক্তিরা নিঃশব্দে কেঁদে কেঁদে ওঠে

সে কেবলই অপ্রতিরোধ্য ভাঙার শব্দ...

দিকচিহ্নহীন এই ভাঙনের কোনো শেষ নেই

...

আমার মতোই সেও... ঘাসেদের সবুজ ডগায়

জমে থাকা দুঃখ ছুঁয়ে, কষ্টে, নীরবে কাঁদে...

আমি অবাক হই এই ভেবে, কবি কীভাবেই-বা ধরে ফেললেন সেই অনুভবকে, যা আজও অধরা আমার কাছে! এজন্যেই কি ‘জন্মান্ধ জন্মান্তরে কবিরা মৃত্যুঞ্জয়ী। সব কবিই জাতিস্মর, এই কাব্যের রীতি’? কিংবা কবি মানেই যেন ‘অনন্ত আঁধারের যাত্রী’? এসব জানতেই পড়ে যাই কবির একেকটা কবিতা। পড়ি আর ভাবি, কবিতা কী? নরের কাছে নারী, নারীর কাছে নর? রাতের কাছে দিন, দিনের কাছে রাত? আলোর সীমান্তে আস্তানা-গাড়া আঁধার? নাকি আঁধারের উপত্যকায় আলোর উদ্ভাস? নাকি যে-আঁধার আলোর অধিক, তা-ই কবিতা? এতোকিছু নয় বোধহয়। কবিতা আসলে কবিতা ছাড়া কিছুই নয়। নাকি সবকিছুই কবিতা? এও হবে হয়তো। কবিতা তো কেবল ছন্দ-ছন্দাতীত শব্দপিন্ডের পদচারণা নয়, এ যে বেদনাবিধুর নীলকণ্ঠও। নাহলে অশোক কর কেনই-বা লিখলেন, ‘আমার সমস্ত কবিতাই নীল?’ লিখলেন-

‘অন্ধকার ঘন হবার সাথে নিজস্ব ক্ষতগুলো

রাতের কালোতে মিশে যায়, কষ্টরা নিরঙ্কুশ জেগে থাকে

অন্ধকারে জ্বলজ্বলে শিকারী চোখের অদ্ভুত আত্মীয়তা

স্থবির অসহায় মুহূর্ত

সমীকরণহীন পরম্পরা...

তবু এই ফিরে আসা অপ্রতিহত জাগরণ

পাথরে প্রাণ জাগানো আকাঙ্ক্ষার এক ক্ষয়হীন উন্মাদনা।

(আত্মপ্রতিকৃতি; পরাবাস্তবের আড়ালে)

না, এখনও ঠিক বুঝে উঠিনি, কবিতা কী কিংবা কী নয় কবিতা? ঝর্নার জলে ধোওয়া ক্ষীণস্রোতস্বিনী কি কবিতা নয়? কবিতা কি নয় এইসব অবারিত ধুলোপথ হাতছানি পদচিহ্ন? ও হ্যাঁ, মনে পড়ছে-

‘কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস

ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর

গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর

কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।’

(কবিতা এমন; সোনালি কবিন; আল মাহমুদ)

আর তাই এই কবি অশোক করও তাঁর ‘পরাবাস্তবের আড়ালে’ এঁকেছেন অসংখ্য চিত্রল হরিণী। তিনি কেবল বেদনার কবিতাই লেখেননি, লিখেছেন ভালোবাসার কবিতাও। বিষাদের ফেরিওয়ালার কাঁধেও ঝুলিয়ে দিয়েছেন অনাস্বাদিত রোমান্টিসিজম। এনেছেন স্যুররিয়ালিজম, ম্যাজিক রিয়ালিজম; পরাবাস্তবতা, বাস্তবতা, জাদু-বাস্তবতা। ষড়রিপুর মোহ মাৎসর্য কাম ক্রোধ লোভ নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনই লিখেছেন মহিমান্বিতাকে নিয়েও। শব্দের সুষম বিন্যাসে বিন্যস্ত করেছেন প্রকৃতিকে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে। তাই মুগ্ধ হয়ে পড়ি তাঁর কবিতা-

‘মরাল গ্রীবার ডাহুক

জলমগ্ন উষ্ণতায় নিস্পৃহ কাটায় যৌবন

পদ্মপাতার জলে খোঁজে আকাশের ছায়া।

কাশফুল আর শরতের মেঘ দৃশ্যত সমান্তরাল

সোনালি জলে মিশে যায় সূর্যাস্তের প্রাণ

জলকাদার সংসারী ডাহুক মায়ার ছোঁয়ায়

মরাল গ্রীবায় জ্যোৎস্নার অলঙ্কার জড়ায়

নরম চাঁদের আলোয় মন উচাটন

হারিয়ে যাওয়া নাকছাবির গল্প বলি যাকে

বুক ভরা তার নবান্নের সুঘ্রাণ, মায়াবী চোখে

আমার চিত্রল হরিণী, তার আছে ‘তৃতীয়’ নয়ন

অন্ধকার চেরা দৃষ্টিরেখা ঝরা বকুল সৌরভে

শারদীয়া সন্ধিক্ষণে অবলীলায় অবগাহনে মেশে

(মরাল গ্রীবার ডাহুক; ঐ)

আমি ও আমার দীর্ঘশ্বাস এতক্ষণ অশোক করের কবিতাভুবনে বিচরণ করছিলাম বলে ভুলতে বসেছিলাম, বর্তমানের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে আলো আর আঁধারে ছড়ানো স্মৃতিগুলো। নিশ্চুপ কথকতার এই হেঁয়ালিপনা দেখে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু হায়! ‘প্রার্থনার মতো কান্নারাও নিরুত্তর, স্বপ্নেরাও অন্ধের মতো দৃষ্টিহীন।’ তবুও, তারপরও আমি অপেক্ষা করি নীরবতা ভাঙচুর করে দেয়া সেই শব্দের। কোনো এক কোলাহল মুখরিত সন্ধ্যায় যে সাড়া দিয়েছিল। বলেছিল, ‘আমি মিশে রইলাম মধ্যাহ্নে।’ কিন্তু তখন পাইনি তাকে। এখনও পেলাম না এই নির্জন রাতে। তবুও ‘সেইসব দুরন্ত সম্ভাবনার চোরাডাক কেন যে ফিরে আসে!’ জানি না।

তাই আবার ফিরে আসি অশোক করের কবিতায়। ক্রমশ নিমগ্ন হয়ে যেতে থাকি কিংবা আমাকে টানতে থাকে কবির কবিতা। কে জানে, এ মুগ্ধতাই-বা কতক্ষণের জন্য, কতোদিনের জন্য? তবে ভেতরে অনুভূত হয় এক অন্যরকম মোহনীয়তা। আর তাই তাকেও বলতে থাকি-

‘আমাকে কাছে ডেকে নাও, এ কোন মুগ্ধতা-,

তর্জনী ছুঁয়ে আছে উষ্ণতা, স্বপ্নেরা সিঁড়ি ভাঙছে চিলেকোঠার

করতালি ঠোঁটে নিয়ে কবুতর নিপুণ উড়ছে বৃত্তাকার শূন্যতায়

অভিমানী আজ মেঘ হয়ে জ্যোৎস্না ছোঁবে, তাঁর আছে অদ্ভুত

কোমল পরশ, বাতাসে উড়ে উড়ে ফিরে আসে পালঙ্কের পাশে

আমায় ডেকেছো সে তুমি, নিবিড় মুগ্ধতা, নিঃশব্দ অভিমানে

....

নীল আলো বুকে জ্বেলে জোনাকিরা কি সুখে নিজেরে পোড়ায়

বেদনারাও খুব ম্রিয়মাণ লাগে আজ, বলো, এ কোন মুগ্ধতা

(এ কোন মুগ্ধতা; ঐ)

পরাবাস্তবের আড়ালে ॥ অশোক কর ॥ প্রকাশক : পাঠক, কলকাতা ॥ প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০১৯ ॥ প্রচ্ছদ ॥ রাগীব আহসান ॥ মূল্য : ১৫০ টাকা।