menu

জিগমে সিংগায়া ওয়াংচুক!

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৬ মে ২০১৯
image

প্রথম যখন ভুটানে যাই তখন অপির (আমার বর) উপর একটু বিরক্ত হয়েছিলাম। ভুটান দেখার কী হলো। ছোটবেলায় কত কষ্ট করে মুখস্থ করতে হয়েছে জিগমে সিংগায়া ওয়াংচুকের নাম। সেই দেশ! অনাগ্রহ নিয়ে পা রাখি। এয়ারপোর্টে নেমেই ছোট চোখ ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। ওদের জিডিপির মূলমন্ত্র হ্যাপিনেস! বলে কী! এদিক ওদিক তাকাই। ছোট্ট এয়ারপোর্ট। একটা প্লেন নামার পর গেট দিলো বন্ধ করে। কাজ শেষ। আজ আর কোনো প্লেন আসবে না। এয়ারপোর্টেই ভিসার সব কাজ শেষ করে আমরা যখন মূল শহরে যাই। আমার চোখ ততক্ষণে ছানাবড়া। এত সুন্দর দেশ! যেন ছবি। স্বর্গ দেখিনি। গল্প শুনেছি। তবে তার আগেই এ যেন স্বর্গ দেখে ফেলা। পাহাড়, আকাশ, মেঘবাড়ি, স¦চ্ছ নদী আর হাসিমুখের মানুষ। আর কী চাই! ছিলাম আমরা একটা পাহাড়ের উপর। নিচে আপেল গাছ। গাছ ভর্তি আপেল। নিচে পড়ে আছে তারচেয়েও বেশি। আমার কী ভাব, নিচে পড়ে থাকা আপেল খাই না। গাছ থেকে পেড়ে খাই। আমাদের দেশের আপেল খেতে ঘাস ঘাস লাগে। ও দেশের আপেল যেন অমৃত। নরম মোলায়েম এবং মিষ্টি। ঘুরতে ঘুরতে ভাবি ইস এরা কী বোকা, একটা যদি ব্লেন্ডার থাকতো তাহলে রাস্তার পাশে টংয়ে বসে যেতাম। আপেল জুস বানিয়ে কোটিপতি হয়ে যেতাম ৫ দিনে। এরা জানেই না জুস বানিয়ে বিক্রি করা যায়। জিনস কিনতে গেলাম, বলে কি তোমাদের বঙ্গবাজার থেকে কিনে এনেছি। কথার সরলতায় ভেসে যাই। বাঙালি বুদ্ধি ২/৩টা দিয়ে আসার ইচ্ছে হলো। কেউ নিলো না। দেশে আসার সময় কিনে আনি ৩০ কেজি আপেল। মুগ্ধ হই শহরের মাঝখানে বয়ে চলা নদী দেখে। এত স্বচ্ছ! যেন কাঁচ। ছুঁয়ে দিলেই ভেঙে যাবে। বাচ্চারা খেলছে নদীর পাড়ে। ময়লা, কাগজ, পাতা কিছুই পড়ে নেই তাতে। এই একটা নদী দেখেই কাটিয়ে দেয়া যায় সাড়ে ২৩ বছর। হাঁটতে গেলে গাড়ি থেমে যায়। ইশারা করে যাও। কোনো বাঁকেই শোনা যায় না হর্ন। মনে পড়ে আমাদের দেশে ড্রাইভারদের পাগলের মতো গাড়ি চালানোর দৃশ্য। সে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে আবরার। ঘুরতে ঘুরতে দেখি পিঠ ভর্তি পণ্য নিয়ে হেঁটে চলছে ঘোড়া। কোনো মানুষ নেই। ঘোড়াদের ভাবগতিক দেখে প্রশ্ন করি এক ভুটানীকে। ওনারা কই যায়? ভুটানী জানান, ঘোড়া বাবাজিরা পণ্য নিয়ে নেপালে যাচ্ছেন। ওখানে এ পণ্য নামিয়ে নেপালের পণ্য নিয়ে ওনারা আবার ভুটানে ফিরে আসবেন। প্রাণীদের কোনো পাসপোর্ট লাগে না। ওদের কেউ ধরবেও না। তাই পণ্য বিনিময়ের এ ব্যবস্থা। আহা যদি এখানকার ঘোড়ার মতো স্বাধীন জীবন থাকতো। তাহলে সারা বিশ্ব জাবর কেটে কেটে ঘুরে বেড়ানো যেত! যত দিন যায় ভুটানের প্রতি মুগ্ধতা বাড়ে। জানতে পারি ওদের ৭২ ভাগ বনভূমি। তারপরেও ওরা উৎসব করে গাছ লাগায়। কোনো বণ্যপ্রাণী মেরে ফেললে শাস্তি পেতে হয়। বলে কী! দেখি পাহাড়ের গায়ে বাড়ি। মেঘ বসে আছে তাতে। মাথা খারাপ হয়ে যায় এত সুন্দর দৃশ্য দেখে। হাঁটতে হাঁটতে দেখি ছোট ছোট শিশুরা ৫ গুটি খেলছে। আরে আমাদের খেলা না! আমিও খেলতে বসে যাই। বাংলাদেশ ভুটান তখন যেন এক উঠোন হয়ে যায়। মনে মনে ভাবি ইস অনেক যদি টাকা থাকতো তাহলে এদেশে একটা বাড়ি বানাতাম। মনের ইচ্ছে মনেই রয়। মেঘ বাড়ি আর হয় না। আমাদের কাছেই আসেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং। ৮ বছর তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেলে পরেছেন। ওনার বন্ধুরা জানান, মেধাবী মানুষটি প্রত্যেক পরীক্ষায় প্রথম হতেন। সুন্দর করে বাংলা বলেন তিনি। ডাক্তার হওয়ার আগে মানুষ হওয়ার আহ্বান জানান। হতে বলেন মানবিক মানুষ। তার কথার সুর ছড়িয়ে পড়ে সবুজ প্রান্তরে। মনে মনে ভাবি একটুতেই মাথা গরম আর বিস্মৃতিপরায়ণ জাতি আমরা। তার মাঝেও আমাদের আতিথেয়তার খ্যাতি বিশ্বজোড়া। মানবিকও আমরা। তবুও আরও মানবিক হতে আজ থেকে না হয় কেউ কটু কথা বললেও দাঁত বের করে হাসবো আবার। একটাই তো জীবন! কী লাভ রাগ বিদ্বেষ পুষে!