menu

জনক

শামীম আহমেদ

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর ২০১৮
image

বাড়ির আঙিনায় ঢুকেই মনটা খারাপ হয়ে গেল সৈকতের। চারদিকে বিদঘুটে অন্ধকার। জেনারেটর বন্ধ মনে হলো। লিফটও চলছে না। অগত্যা সিঁড়িই ভরসা। মাথাটা ভাড়ি হয়ে আছে। দু’একটা সিঁড়ি পার হতেই রাজ্যের ক্লান্তি ভর করে বসে শরীরে।

একসময় মনে হলো বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে আছে সে। খট খট আওয়াজে দরজা খুলে দিল সুকন্যা। সৈকতের একমাত্র মেয়ে।

-সরি মা, ফিরতে দেরি হয়ে গেল। ক্ষীণ কণ্ঠ থেকে স্বর বেরুতে চায় না সৈকতের।

- তুমি তো প্রতিদিনই দেরি করো বাবা! তোমার কান্ড দেখে মনে হয় অফিসে তুমি একাই কাজ কর। মেয়ের খেদোক্তিতে লজ্জা পায় সৈকত।

- আচ্ছা মা, কাল থেকে সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরবো। তারপর আমরা বেড়াতে যাব। রবীন্দ্র সরবরে পানসী চেপে ঘুরবো। তুমি চটপটি খাবা, আমি ফুসকা। ঝাল কিন্ত বেশি খেতে পারবা না। ইদানীং তুমি অতিরিক্ত ঝাল খাও!

বাবার কথা শুনে মজা পায় সুকন্যা। ফিক করে হেসে দেয়। হাসলে ও’র গালে টোল পড়ে। টোল পড়া হাসি খুব পছন্দ সৈকতের। উচ্ছ্বসিত চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

- ওটা তো আমি তোমার থেকে শিখছি বাবা। ভাত দেয়ার আগে তোমাকে কাঁচা মরিচ আর পিঁয়াজ দিতে হয়। একবেলা না পেলে বাড়ি-ঘর মাথায় করে ফেল। আর শোন বাবা, তুমি কিন্তু আমার চটপটিতে ভাগ বসাতে পারবা না। অর্ধেকটা তুমিই খেয়ে ফেল!

- হা হা হা। ঠিক আছে। আর খাবো না। এই যে কান ধরছি। এখন যাওতো, এক গ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে আসো। বরফ গলা পানি। খাদ্যনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। বেশি দেরি করো না। শেষে পেট থেকে নানা জাতের ফার্নিচার বের হয়ে আসবে!

- পানি আমার হাতেই আছে। অন্ধকারে তুমি দেখতে পাচ্ছ না। এ সময়ে কলিংবেলের শব্দ হলে আমি পানি রেডি করি। আর তোমার বেল বাজানোর ঢং আমার চেনা। দুইবার পুশ করো।

- তাই নাকি? আমার কন্যা দেখি সত্যি সত্যি বড় হয়ে যাচ্ছে!

- পানি কিন্ত মোটেও ঠান্ডা না। নরমাল। তোমার জন্য ঠান্ডা পানি নিষিদ্ধ। বেড়াতে গেলে কোক-পেপসিও কিনবা না। ওগুলো টয়লেট পরিষ্কারের জন্য। দিনে দিনে তুমি বাবু হয়ে যাচ্ছ। তোমার জন্য স্টিলের একটা স্কেল কিনতে হবে। তারপর রুটিন মাফিক বেত্রাঘাত চলবে।

মেয়ের পাকামো কথায় চোখের কোনে পানি জমে সৈকতের। সেদিনের একরত্তি মেয়ে। বার্বিডলের মতো দেখতে ছিল। নরম তুলতুলে শরীর। সিজারের বেবি। মাঝে মাঝেই সর্দিজ্বরে ভুগত। রাতদিন মেয়েকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতো সে। তার শিয়রে বসে কত যে নির্ঘুম রাত কেটেছে!

ছোটবেলা থেকেই দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত মেয়েটা। আড়াই মাসের মাথায় কথা বলা শিখেছে। অন্যসব শিশুও হয়তো তাই শেখে। তবে সুকন্যা কিছুটা ব্যতিক্রম। সব শিশুরা সম্ভবত ‘মা’ শব্দটিই উচ্চারণ করে প্রথমে। সুকন্যার কথা বলা শুরু হয়েছিল ‘বাবা’ বলা দিয়ে। এ নিয়ে তার মায়ের বেশ আফসোস ছিল। মনের অজান্তে মাঝে মাঝে তা প্রকাশও করতো। দু’একটা শিশুসুলভ বদঅভ্যাসও ছিল সুকন্যার। তার অন্যতম হলো- বাবার কোলে আসা মাত্রই হিসি করে দেয়া। এ জন্য কতবার যে অফিসের গেটআপ বদলাতে হয়েছে!! অবশ্য সৈকতের জন্য এটা এখন বড় একটা হাতিয়ার। বাবা-মেয়ের ঝগড়া লাগলে ‘হিসি বাবু’ বলে ক্ষ্যাপাতে পারে তাকে।

বাবাকে না দেখলে কান্নাকাটি শুরু করে দিত সুকন্যা। চব্বিশ ঘণ্টা তার পাশে তার বাবাকে চাই। এতে প্রায়ই নানা বিপত্তি হতো। অফিসে যেতে হতো লুকিয়ে লুকিয়ে। চোরের মতো। অফিস থেকে ফেরার পর বাবা মেয়ের কত খুনসুটি, কাঁধে চড়িয়ে ঘুরে বেড়ানো, গুনগুন গান করা, দোলনায় দোল দেয়া, ইশারায় গল্প করা, আরো কত কী!

মেয়ের প্রসংগ আসলেই কেমন যেন আনমনা হয়ে যায় সৈকত। হাজার স্মৃতি ভিড় করে মাথায়। সুখের স্মৃতি, কষ্টের স্মৃতি!

আজ কেন যেন অনেক বেশি খারাপ লাগছে তার। শরীরের সব শক্তি হারিয়ে গেছে মনে হয়। চারদিকে ঘোর অন্ধকার। একসময় অনুভব করে- সুকন্যা তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। মেয়ের স্পর্শে রক্তকণিকায় স্পন্দন হচ্ছে। সীমাহীন মমতায়, নিদারুণ ভালবাসায়। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সৈকত। পরম যতেœ।

- বাবা, তুমি ঘুমায় পড়লা নাকি? দু’হাতে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করে সুকন্যা।

- উম! কই? না তো মা, ঘুমাইনি। তোমার কি শরীর খারাপ? এমন নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছ কেন? পাল্টা প্রশ্ন করে সৈকত।

- তুমি মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে আমার খুব ভাল লাগে। তাই নড়াচড়া করছিলাম না। পিছে তুমি আবার হাত বুলানো বন্ধ করে দাও।

- হা হা হা। বোকা মেয়ে। তুমি শুয়ে থাক। আমি তোমার মাথার উঁকুন বেছে দেই। হা হা হা।

- বাবা! পিটুনি খাবা কিন্তু। আমার মাথায় মোটেও উঁকুন নাই।

- আমারও তাই মনে হয়। পাগলদের মাথা গরম থাকে তো! উঁকুনরা আরাম পায় না। ওরা থাকে এসিওয়ালা মাথায়!

- ঠিক বলছো। তুমি সারাদিন এসির মধ্যে থাকো না? উঁকুনরা তোমার মাথায় ছয় তলা বিল্ডিং বানিয়েছে দেখ!!

- হা হা হা। সবাই বুদ্ধিজীবী হয়। আমার মেয়েটা হয়েছে বুদ্ধুজীবী।

- শোন বাবা, এখন একটা গল্প বলো। কতদিন তুমি গল্প শোনাও না! পরম যতেœ বাবার বাহু দু’টি কাছে টেনে আবদার করে সুকন্যা।

- তাই? কিন্তু গল্পের হাঁড়ি তো শেষ হয়ে গেছে, মা। গল্প নতুন করে রান্না করতে হবে। সুকন্যার সরু নাক টেনে উত্তর দেয় সৈকত।

- রান্না করার দরকার হলে কর। আজ গল্প না শোনালে আমি পড়তে বসবো না। হোম ওয়ার্কও করবো না। পানি ঢেলে তোমার সব জামাকাপড় ভিজায়ে দেব। কাল অফিসে যেতে পারবা না।

মেয়ের কথাগুলো রিনঝিন করে কানে বাজে সৈকতের। যেন কোন এক মায়াবতীর রহস্যময় সুরেলা কণ্ঠ। আনন্দে গায়ের লোম জেগে ওঠে। বার বার শুনতে মন চায়। এজন্যেই অকারণে কথা বাড়ায়। কথার পিঠে কথা বলে।

- কোন গল্পটা শুনবা বলো। কানা দৈত্য আর চরকি বুড়ি’র গল্প?

- না, ওটা অনেকবার বলছো। আজ নতুন একটা শোনাও।

- আজ শরীরটা ভাল লাগছে না রে মা, মাথাটা প্রচন্ড ব্যথা করছে। চোখ তুলে তাকাতে পারছি না। একটু পরে হাত-পায়ের জয়েন্টগুলো খুলে পড়বে মনে হয়। নতুন গল্প মনে পড়ছে না!

- আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমার মাথা ম্যাসেজ করে দেই, গায়ে হাত বুলিয়ে দেই। তুমি চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাক।

- না না। তুমি যেমন আছ, তেমনই থাক। তোমার গায়ের ঘ্রাণ আমার ভাল লাগছে।

মেয়ের হাত দিয়ে নিজের শুকনো ঠোঁট দু’টি ছুঁইয়ে নিয়ে উত্তর দেয় সৈকত। এরপর নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলতে শুরু করে-

“এক দেশে ছিল এক রাখাল রাজা। তার ঘর ছিল না, বাড়ি ছিল না। কোনো আপনজনও ছিল না। গরিব বলে কেউ তাকে পছন্দ করতো না। অনাদর অবহেলায় বড় হতে থাকলো সে। ভর্ৎসনা, ভ্রুকুটি আর অপ্রাপ্তি নিত্য সংগী ছিল তার। সীমাহীন পরিশ্রম করা ছিল নিত্য অভ্যাস। মানুষের উপকার করতো। বিপদে আপদে পাশে থাকতো। তবুও সবাই ঠকাতো তাকে। এত শ্রম, বড় ত্যাগেও ভাগ্যদেবীকে তুষ্ট করা গেল না। সুখপাখিটা দূর আকাশেই রইলো।

দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়। হঠাৎ একদিন সৃষ্টিকর্তার কৃপা হলো যেন। রাখাল রাজার ঘরে জন্ম হলো ফুটফুটে এক কন্যাশিশুর। ঠিক যেন রূপকথার রাজকন্যা। দিঘল কালো চুল, পটলচেরা চোখ, বাঁশির মতো নাক। শরীর জুড়ে সদ্য ফোটা গোলাপের সতেজ-স্নিগ্ধতা, গোলাপী রঙের নরম আভা!!

চারদিকে খুশির বন্যা। দূর দূরান্ত থেকে দলে দলে লোক আসা শুরু হলো। কেউ রাজকন্যার ছবি তোলে, কেউ আলতো করে মুখ টিপে দেয়। কেউ তার তুলতুলে হাত স্পর্শ করে দেখে, কপলে আদর করে। কোলে নিতে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।

রাখাল রাজার বুকভরা আনন্দ। সব কষ্ট যেন মুহূর্তেই উবে যায়! দূর হয় গ্লানি, দূর হয় জড়া। সরে যায় বেদনার কাল মেঘও। রাখাল রাজা বনে যায় মহারাজা। জরাজীর্ণ কুঁড়েঘরটিকে মনে হয় দিগন্ত জোড়া এক বিশাল রাজপ্রাসাদ। সে প্রাসাদে রাজা সাহেব তার প্রিয় রাজকন্যা নিয়ে সুখে শান্তিতে বাস করে...।” আমার গল্পটি ফুরল... নটে গাছটি মুড়ল...।

বাবার গলা জড়িয়ে ধরে নিবিষ্ট মনে গল্প শুনছিল সুকন্যা। চারদিকে ঘন অন্ধকার। পিনপতন নীরবতা। তার মনটা খারাপ হয়ে গেল! মাথা উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে- আচ্ছা বাবা, তোমার সব গল্পের মধ্যে আমি কেন থাকি বলত?

- আমি তো এক রাখালরাজা আর রাজকন্যার গল্প বললাম। মৃদু হেসে জবাব দেয় সৈকত।

- ঐ রাখালরাজা হলে তুমি। আর রাজকন্যা হলো তোমার মেয়ে। যে তোমার কোলে শুয়ে আছে। এর আগেও যত গল্প শুনাইছো সবই আমাকে ঘিরে।

- এটাই প্রকৃতির নিয়ম মা, পৃথিবীর সব বাবার গল্পের নায়িকা হলো তার আদরের মেয়ে। প্রিয় কন্যার আনন্দমাখা সুখী মুখ ছাড়া বাবাদের গল্প কখনো পূর্ণ হয় না। আড়ষ্ট কণ্ঠে উত্তর দেয় সৈকত।

- আচ্ছা বাবা, আমি যদি একটা রিকোয়েস্ট করি তুমি রাখবা?

মেয়ের কথা শুনে হাসি পায় সৈকতের। পরম আদরে কন্যাকে বুকে চেপে ধরে।

- আমার জীবনটা তোমার জন্মের কাছে ঋণী মামণি। তুমিই আমার পৃথিবী। আমার স্বপ্ন, আমার বেঁচে থাকা। তোমার সব রিকোয়েস্টই আমি রাখার চেষ্টা করি। বল, কী করতে হবে?

- এত সিরিয়াস হচ্ছ কেন? খুবই সাধারণ বায়না।

- আচ্ছা, বল।

- আজ যদি আমি পড়তে না বসি তুমি মাইন্ড করবা?

মেয়ের কাঁদ কাঁদ কণ্ঠ শুনে ভয় পেয়ে যায় সৈকত। ধড়ফড় করে উঠে বসে। ওর হাত দু’টো টেনে নিয়ে নরম গলায় বলে, তোমার কি মনটা খারাপ? কেউ ফোন করে বকা দিয়েছে? ক্লাসে পড়া পারনি?

- ওসব কিছুই না। আমি আজ পড়তে চাই না বাবা।

নিজেকে অপরাধী মনে হয় সৈকতের। অনেক দিন হলো মেয়ের পাশে বসা হয় না। বেড়াতেও যাওয়া হয় না কোথাও। সারাদিন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে। স্কুল থেকে ফিরে মেয়েটা প্রায়ই একা একা থাকে। সৈকতের ঘুম ভাঙার আগেই স্কুলে চলে যায় সুকন্যা। অফিস থেকে ফিরে দেখে মেয়ে তার গভীর ঘুমে!

- কে বলছে তোমাকে এত পড়তে হবে। হোম ওয়ার্কেরও দরকার নাই। রবীন্দ্রনাথ স্কুল পালিয়েছেন, নজরুল তো বেশি পড়তেই পারলেন না আর লালন তো বুঝলেনই না স্কুল কী। হা হা হা!!

মেয়েকে স্বাভাবিক করতে উচ্ছ্বসিত হবার ভান করে সে। সুকন্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সরু ঠোঁট দু’টি ধরে অকারণে টানাটানি করে।

- তাহলে এলান করে দেই। আমার মেয়ে আজ পড়তে বসবে না। সারা রাত সে তার বাবার পাশে বসে গল্প করবে। গদগদ হয়ে বলে সৈকত।

- এলান কী বাবা?

- এলান মানে ঘোষণা। প্রাচীন কালে তো এত খবরের কাগজ, টিভি, টুইটার, ফেসবুক, ম্যসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার বা ইমো ছিল না। রাজা বা জমিদারদের সকল সিদ্ধান্ত এলান করা হতো। কখনো হাতি, গাধা বা ঘোড়ায় চড়ে। কখনো ঢোল বাজিয়ে আবার কখনো বা ঘণ্টি বাজিয়ে। কথা বলা হতো টিনের তৈরি চোঙায়।

বাবার কথা শুনে আবার ফিক করে হেসে দেয় সুকন্যা।

- আচ্ছা, তুমি তাহলে এলান-ই করে দাও। তবে ঢোল কিন্তু বাজাতে পারবা না। এতো রাতে ঢোল বাজানো ঠিক না। হি হি হি।

টেবিলে রাখা খবরের কাগজ দিয়ে বড় করে একটা চোঙা বানায় সৈকত। তারপর লিভিং আর ডাইনিং রুমের দিকে তাক করে উচ্চকিত স্বরে বলা শুরু করে- “ভাইসব... ভাইসব..., এতদ্বারা ঘোষণা করা যাইতেছে যে, রাজা বাহাদুরের একমাত্র কন্যা, আমাদের সকলের নয়নের মণি, আদরের ধন সম্মানিতা ‘নাহিয়ান নাওয়ার আহমেদ’ ওরফে ‘সুকন্যা’ অদ্য ১২ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ, ২৮শে ভাদ্র, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, ১লা মহররম, ১৪৪০ হিজরী, রোজ বুধবার রাত্রিকালীন অধ্যায়ন হইতে বিরত থাকিবেন। তিনি তাঁহার পিতৃ মহোদয়ের সহিত গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা করিয়া রজনী অতিক্রান্ত করিবেন। এমতাবস্থায় তাঁহাদের অযথা বিরক্ত না করিবার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাইতেছে... ভাইসব... ভাইসব...।”

বাবার এমন কান্ড দেখে আবার খিল খিল করে হেসে ওঠে সুকন্যা। কাগজের চোঙা সরিয়ে মুখ চেপে ধরে।

- হি হি হি। এলান এখন বন্ধ কর বাবা। আমার হাসি পাচ্ছে। সবাই ঠিকই বলে, তুমি গাধা প্রকৃতির মানুষ। হাতি সদৃশ্য গাধা...!!

- সত্যি কতাই কচচো গো মা জননী। আল্লাহ গাধা বানায়ে ভালই করিচে। হাতি হতি গেলি মরন হতো। আমার মরন হলি এরমের বাপ তুমি কনে পাবানে?

- এটা আবার কেমন ভাষা? তোমাদের গ্রামের নাকি?

- নারে মা, এটা অন্য জেলার ভাষা। যশোরের। তুমি বড় হলে নিয়ে যাব সেখানে। যাও তো বাবা, একটা কম্বল নিয়ে আসো। আমার শীত লাগছে। অনেক শীত। ঠান্ডায় শরীর কাঁপছে!!

- কম্বল আনতে হবে না। আমি এসি বন্ধ করে দেই। তোমার কি শরীর খারাপ বাবা?

- উঁহু। আমি ভাল আছি।

- সত্যি বলছো তো? নিজের অসুখ লুকিয়ে রাখার বাজে অভ্যাস আছে তোমার।

- হুম। তিন সত্যি।

- বাবা দেখ দেখ, জোনাকি উড়ছে! কত সুন্দর আলো!! ঘন অন্ধকারে ওরা সবুজ আলো নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইস কী অপূর্ব!!

- কই জোনাকি, কোথায় আলো? আমি তো দেখছি না।

- এইতো। বারান্দায় ঝোলানো টবগুলোর দিকে তাকাও। দলে দলে কত জোনাকি! বাবা, আমাকে জোনাকি ধরে দাও। প্লিজ বাবা।

- ওদের উড়তে দাও। ওরা ওদের মতো থাকুক।

- বাবা প্লিজ। আমি ওদের কাঁচের বয়ামের মধ্যে রাখবো। জোনাকির আলোতে অন্ধকার ড্রইং রুমটা দারুণ উজ্জ্বল হবে। দারুণ লাগবে দেখতে! বাবা, ওঠো না, ওরা চলে যাবে তো!!

মেয়ের আবদারের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয় সৈকতের। মাথার ব্যাথাটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে শরীর। তবুও জোর করে উঠে দাঁড়ায় সে।

চোখ মেলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। সামনে নিকষ কালো আঁধার। হাজার হাজার জোনাকি উড়ছে। সবুজাভ আলো নেই। শুধু হলুদের ছড়াছড়ি!! দেয়ালে ভর করে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকে সৈকত। অতি চেনা এক কবিতা এসে ভর করে মাথায়...

“রাত্রি দ্বিপ্রহরে আজি কে তুমি জ্বালিছ বাতি,

বহু ক্রোশ পার হয়ে; এমন জীর্ণ ঘরে কে তুমি অচেনা অতিথি!

তুমি কি বিশাখার নক্ষত্র সম

নাকি এই বিভাবরীর বিপ্রতীপ ভ্রম?

অনিন্দ্য স্বপ্নের সপ্রভ আহ্বান রেখে, এমন নিষ্পলক চোখে-

অযুত আলোকবর্ষ হতে, কে তুমি এ অলীক অন্তরীক্ষে!

আঁধারে ছড়িয়ে কেশ, পুচ্ছে জ্বেলে সবুজাভ আলো,

তুমি কি খুঁজিছ তারে, যে তোমারে বাসিবে ভাল?

তুমি যারে ভেবেছিলে কাছে; থেমে গেছে মনন তার

বিভ্রান্ত বিভাজনে, ক্লান্ত অয়নে বিমূর্ত হাহাকার;

ফিরে যাও অরণ্যে, ফিরে যাও জোনাকি আমার

পাঁজরে দহন যার; ভালবাসিবার তার, নাহি অধিকার...!!

একসময় মনে হয় জোনাকিরা কষ্ট পেয়েছে হয়তো। তার রূঢ় কথায়, রুক্ষ আচরণে। ওরা কষ্ট নিয়ে উড়ে যাচ্ছে, সেই অচেনা অরণ্যে...! আচ্ছা, ওরা কেন উড়ে যাচ্ছে? তার যে জোনাকি প্রয়োজন। অনেক বেশি প্রয়োজন। তার প্রাণ প্রিয় কন্যা ওদের সবুজাভ আলোর জন্যে অপেক্ষা করছে। এই আলো দিয়ে সে তার অন্ধকার দূর করবে। আনন্দে গালে টোল ফেলে সে মধুর করে হাসবে! বাধ্য হয়েই একসময় শূন্যে লাফ দেয় সৈকত। শরীরের সব শক্তি উজাড় করে পিছু নেয় জোনাকি দলের...!

বিকট শব্দে সংবিৎ ফিরে আসে সৈকতের। নিজেকে আবিষ্কার করে নিজ ফ্লাটের সদর দরজার মেঝেয়। চরকির মতো মাথাটা ঘুরছে। উঠে দাঁড়াবার মতো সামর্থ্য নেই। চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলতে শরীরের সব শক্তি নিঃশ্বেষ হয়ে এলো। সেগুন কাঠের শক্ত দরজার আঘাতে কপাল ফেটে দরদর করে রক্ত ঝরছে!

লিভিংরুমের নিলাভ আলোটা মিটমিট করে জ্বলছে। কোথাও কেউ নেই। শুধুই নিঃসীম শূন্যতা! অনন্ত হাহাকার! নিথর নীরবতা!! চারদিকের দেয়ালে সুকন্যার ছবি টাঙানো। নিঃশব্দে তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে যেন। ঠোঁটে কষ্টের হাসি। ধূসর আর মলিন দু’চোখ!

ল্যাপটপের ব্যাগটা হাত থেকে ফসকে পড়ে গেল ফ্লোরে। গত পাঁচ দিন ধরে প্রচন্ড জ্বরে ভুগছে সে। মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। রক্তবমিও হয়েছে কয়েকবার। দুর্বল আর ক্লান্ত শরীর নিয়েও অফিস করতে হচ্ছে তাকে। সামনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠান। বিশাল কর্মযজ্ঞ। নিঃশ্বাস ফেলার ফুসরত নাই। আজও ফিরতে গভীর রাত হয়ে গেছে। প্রচন্ড জ্বরের ঘোরে বাসার সিঁড়িতে ওঠার পর থেকে আর কিছু মনে করতে পারছে না!

পিপাসায় গলা শুকিয়ে আসছে সৈকতের। তার ঠান্ডা পানি চাই। পুরো একজগ ঠান্ডা পানি। ফ্রিজ থেকে পানি বের করে গ্লাসে ঢালার আগেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় আবার। কিছুক্ষণ পর কিছুটা জ্ঞান ফিরে আসে। ততক্ষণে প্রতিবেশীদের ভিড় জমে গেছে। অস্ফুট শব্দ ভেসে আসে কানে...। আহারে! ১০৬ ডিগ্রি জ্বর। সারা শরীর ভিজে গেছে রক্তে। এম্বুলেন্স এতো দেরি করছে কেন! সবাই ধরে নিচে নামাও। মোটেও দেরি করা যাবে না। চোখ দু’টি আবার মুদে আসে সৈকতের। দূরে কোথাও এ্যাম্বুলেন্সের মৃদু সাইরেন শোনা যায়...!!

  • বিশেষ সাক্ষাৎকার

    কিছুটা এমার্জেন্সি কবির বাঁচার মধ্যে থাকে

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    newsimage

    প্রশ্ন : এই যে এত বছর বিদেশে থাকা, বছরে একবার করে আসা,

  • সমর সেন : কেন প্রাসঙ্গিক

    দারা মাহমুদ

    newsimage

    কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা হাতে পেয়ে রবীন্দ্রনাথ দু’জন অপরিচিত তরুণ

  • কবি জাহাঙ্গীরুল ইসলাম

    স্মৃতি ও কবিতা থেকে

    সৈকত রহমান

    newsimage

    জাহাঙ্গীরুল ইসলাম সম্পর্কে কিছু বলতে বা লিখতে যদি যাই, দেখি আমাদের ব্যক্তিগত

  • রমা চৌধুরী

    মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নভেলায়

    খালেদ হামিদী

    newsimage

    আমার মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একমাত্র উপন্যাসিকা ‘সব্যসাচী’তে রমা চৌধুরী আছেন, নভেলাটির শেষাংশে, এভাবে:

  • দিদি ও আমার দিন-যাপনের খসড়া

    আলাউদ্দিন খোকন

    newsimage

    ২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বিকেল ৫টা। দিদি চট্টগ্রাম মেডিকেলের আইসিইউ-তে। জন্মাষ্টমির বন্ধ চলছে।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    একটি মনোরম সন্ধ্যার আর্তি কাজী সুফিয়া আখতার বেঙ্গল বইয়ের লাইব্রেরিতে বুধবার বিকেলে হঠাৎ করেই

  • অপ্পো কথার গপ্পো

    লিটন চক্রবর্তী মিঠুন

    newsimage

    আর দশটা বিষয়ের মতো সাহিত্যও হরেক রকম। নানা তার চেহারা, বিচিত্র তার