menu

ঘুম

শাশ্বত নিপ্পন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২১
image

শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

বুকের বাঁ পাশটায় একটা অস্বস্তিকর ব্যথা নিয়ে আনিস ওজুতে বসে। দু’ঠোঁটের মাঝে চাপ দিয়ে ফেনাওঠা পানিকে কিছুটা দূরে পিচিক করে ফেলে। মাছবাঁধা ছিপের মতো বাঁকা হয়ে পানির ধারাটা মাটিতে পড়েই শুকিয়ে যায়। এই ভরা এপ্রিলে চারপাশ থেকে যেন গরম ভাপ উঠছে। অথচ ভোরের দিকে বেশ ঠাণ্ডা। সেদিন পেপারে দিয়েছিল কোথায় জানি ভীষণ কুয়াশায় মাঠঘাট অন্ধকার ছিল সকাল এগারোটা পর্যন্ত। আজব আবহাওয়া। “সবই আল্লাহর ইশারা”, -বিড়বিড় করে আনিস। মানুষের ইমান বড়ই দুর্বল- বলে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই তার মাথাটা ঘুরে উঠল।

নামাজে দাঁড়িয়ে আনিসের মনে হলো, মসজিদের ফ্যানগুলো কী আজ খুব স্লো ঘুরছে! সে কি ঘামছে গলগল করে? পাঞ্জাবিটা ভিজে জবজব। ভুলও হতে পারে। হয়তো ওজুর পানি। আনিস আড়চোখে চারপাশটা দেখে। আজ সময়মতো আসার কারণে সামনের কাতারে সে দাঁড়াতে পেরেছে- বড় স্যার আর অ্যাকাউন্ট সাহেবের মাঝে! কী মহান এই ইসলাম ধর্ম! এখানে আমির, ফকির, বড় স্যার, অ্যাকাউন্ট সাহেব আর ননপার্মানেন্ট স্টাফ আনিসুর রহমান আনিসের মধ্যে কোনো ফারাক নেই। তবে, আজ আনিসের সবকিছু যেন গণ্ডগোল হয়ে যায়। সে মনসংযোগ করতে ব্যর্থ হয় বারবার। এমনটি হয় না কখনো। ওর বুকটা ক্রমেই চেপে আসে দু’পাশ থেকে, শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এখন মনে হচ্ছে মসজিদের সব ফ্যান বন্ধ। মনে হয় তপ্ত মরুভূমির উপর জ্বলন্ত অগ্নিপিণ্ড মাথায় নিয়ে সালাত আদায়ে দাঁড়িয়েছে। আনিসের দোয়ার ছন্দ কেটে যায়। গলাটা শুষ্ক লাগে। তার মনে পড়ে, তাদের ফাইল গেছে জোনাল অফিসে, সেখানে ফাইল ছাড় হলেই বিভাগীয় অফিস- আর বিভাগীয় অফিস এক ঠেলা দিলেই মন্ত্রণালয়ের টেবিল আটকাবে না- তখনই মাইনেটা আসবে। আনিসের মাথার মধ্যে একঝাঁক ঝিঁঝি পোকা একসাথে ডাকতে শুরু করে। ইমাম সাহেবের সাথে তাল রাখতে ব্যর্থ হয় সে।

আনিস সেজদায় যায়; পাশে বড় স্যার। ইসলামে সব সমান- আসলেই কি আল্লাহ সমানভাবে সবাইকে হেদায়েত দেয়? বারো বছর হলো সে এই টিএন্ডটি অফিসের অনিয়মিত কর্মচারি। হঠাৎ একটা ঝিঁঝি পোকা আনিসের মগজের দিকে হাঁটতে শুরু করে। সেজদা থেকে উঠে, অনেকটা কাটা কলাগাছের মতো টিএন্ডটি অফিসের বড় স্যারের গায়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ে। তার মগজের মধ্যে পোকাটা পিঁপিঁ শব্দ করতেই থাকে।

দুই

জেনারেল হাসপাতালের বেডে শুয়ে অপরাধীর চোখে আনিসুর রহমান উপস্থিত সকলের কথা শুনতে থাকে। প্রথম পর্যায়ে আনিসের সকলকে সফেদ মতো মনে হয়, যেন সকলেই কাফন মুড়িয়ে দিয়ে এসেছে। এরা সকলেই এক সাথে কথা বলছে; পানির গহীন থেকে বুদ্বুদের মতো উঠে আসছে ওদের গলার আওয়াজ। পিটপিট দৃষ্টিতে আনিস সকলকে চেনার চেষ্টা করে। সকলেই তার অফিসের। পা পর্যন্ত পাঞ্জাবি পরা লোকটি ইমাম সাহেব। ইমাম সাহেব হেঁটে গেলে তার গায়ের তীব্র আতরের গন্ধে রাস্তাটা পবিত্র থাকে দীর্ঘক্ষণ। ইমাম সাহেব আনিসের মাথার কাছে রাখা সরকারি নোংরা টেবিলে একটা আনারস রেখে তার দিকে আরো কিছুটা ঝুঁকে আসে। আনিস সেই পবিত্র গন্ধটা পায়।

এখন ক্যামন বোধ করছেন?

ভাল- মিনমিন করে উত্তর করে আনিস।

আলহামদুল্লিাহ, বলে সকলের দিকে তাকান ইমাম সাহেব। এই পরমার্থিক শব্দের মাখরাজি উচ্চারণে যেন সবার মধ্যে জমে থাকা চাপা উত্তেজনার অবসান ঘটল। আনিস দেখে, মানুষগুলো অনেক কষ্ট করে তাকে দেখতে এসেছে। কারো কারো মুখে রুমাল তোলা। এর মধ্যে একজন বলে, স্যার আসতেন, কিন্তু। বাঁকিটুকু আনিস আর শোনে না। আনন্দে তার চোখ চিকচিক করে ওঠে। গর্বে তার গলায় দু’পাশের শিরা দুটো ফুলে ওঠে। বড় স্যার তাকে দেখতে আসতেন! ভাবা যায়! অপরাধী তো সে! সেই তো নিজে বড় স্যারের নামাজটা নষ্ট করে দিয়েছে উজবুকের মতো।

ইমাম সাহেব বলেন, আরে ভাই রাখেন তো ওসব! ওসব হলো ইহুদি নাস্তিকদের সাজানো অসুখ। নাকের রুমাল সরিয়ে পিচ করে থুতু ফেলে ইমাম আবার বলেন, যদ্দিন এই পৃথিবী বেদ্বীনদের হাতে থাকবি তদ্দিন...! কথা শেষ না হতেই আগ্রহী একজন জিজ্ঞেস করে, এ নাকি খুব ছোঁয়াচে? অন্যজন উত্তর দেয়, ভাই আল্লা-ভরসা। উপস্থিত একজন পিছন থেকে বলে, সারাদেশ না কি বন্ধ হয়ে যাবে, মসজিদেও নাকি আসা যাবে না? এবার ইমাম সাহেব নাকের রুমাল সম্পূর্ণ সরিয়ে হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন, এখন বুঝতেছেন তো ষড়যন্ত্রটা কুতায়? লক্ষ্য হলো মসজিদ ঘর! আল্লাহুর ঠিকানা বন্ধ করা- আরে ভারতের অনেক দিনের চাওয়া তো এই একটাই, বুঝেন না?

সকলেই প্রায় একমত হন এবং সমগ্র ষড়যন্ত্রের গভীরতা অনুমান করতে চেষ্টা করেন। ইমাম আবার হুঙ্কার দেয়, আসুক না, কে আসবে আসুক একবার, আসুক মসজিদ ঘরে তালা দিতে। এর মাঝে একজন বলে, আচ্ছা, মক্কার মসজিদও না কি বন্ধ?

থামেন মিঞা! তাড়া লাগায় ইমাম। এবার থুতু ফেলে সে আনিসের বেডের পাশে; তারপর বলে, আরে মিঞা এটা বাংলাদেশ, ইমান-আকিদা, নামাজ-রোজার দেশ- এখানে নব্বই ভাগ লোক মুসলমান।

আনিসের চোখের পর্দাটা আবার ভারি লাগে। আনিস ক্ষীণ গলায় প্রশ্ন করে, “অসুখটা কী?”

কান থেকে কল সরিয়ে ডাক্তার বলে, “না না ভয়ের কিছু নেই।”

না না ঐ মসজিদ ঘরে তালা দেওয়া অসুখটা কি জানি স্যার?

আরে না, ঐ তো মসজিদে সামান্য মাথা ঘুরে গিয়েছিল আপনার; দুর্বলতা এসিডিটি আর হার্টের সামান্য এদিক সেদিক। ঘুমের ঔষধ দিয়েছি, ঘুমান।

বাধা দিয়ে আনিস বলে, এই যে মক্কার মসজিদের কথা কি জানি?

ডাক্তার তখন গভীর মনযোগ দিয়ে আনিসের ফাইলটা দেখতে থাকেন।

আজ ওয়ার্ডে অনেক রোগী। আনিস আবার বলে, স্যার আমার কি ঐ অসুখ?

ডাক্তার এবার ব্যস্ত গলায় উত্তর করে, আরে না, করোনা না; যদিও আমাদের কাছে পরীক্ষা করার যন্ত্রপাতি নেই; তবুও দেখি, আল্লাহ ভরসা।

জ্বী, আল্লা ভরসা। আনিসের চোখের দু’পাতা আরো ভারি হয়ে আসে।

তিন

আনিসের অসুখের খবর পেয়ে বউ জরিনা মায়ের বাড়ি থেকে চলে এসেছে। ডাক্তার আনিসকে ঔষধসহ রিলিজ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে করোনা ভাইরাস বিশ্ব অচল করে দিয়েছে। এই ভাইরাস সম্পর্কে আনিস যে একবারেই অজ্ঞ ছিল তা কিন্তু নয়। তবে হাসপাতালের বেডে শুয়ে তার মাথাটা কেমন জানি আউলে গিয়েছিল। তাছাড়া ওর মতো কর্মচারির অতশত ভাবতে গেলে চলে না। কিন্তু এখন ওকে সবদিক ভাবতে হচ্ছে। অফিসে গেলে দু’পয়সা হয় প্রতিদিন কিন্তু অফিস বন্ধ দীর্ঘ সময়, পকেট শূন্য। সারাদেশ লকডাউনে চলে গেছে। অফিস, দোকান, স্কুল-কলেজ সব বন্ধ। রাস্তায় পুলিশের সাথে সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। শুধু কাঁচাবাজারটা দুপুরের খটখটে রোদ গায়ে মেখে পড়ে আছে। মসজিদও বন্ধ হয়েছে। টিএন্ডটি মসজিদ যখন বন্ধ করে দিয়ে গেল সেনা সদস্যরা তখন ইমাম আশেপাশে কোথাও ছিল না। শহর ফাঁকা। প্রাণহীন সভ্যতা। শব্দ বলতে শুধু সাইরেন, পুলিশের হুটার। শহরে কেউ আসতে পারছে না, বেরুতেও পারছে না। মৃত্যুর খবরেও স্বজনরা আসতে পারছে না। দাফন হচ্ছে জানাজা ছাড়া।

সাইরেন বাজছে আনিসের মাথার মধ্যে। অনটনের দামামা তার সংসারের আনাচে কানাচে। আনিসের শাশুড়ি সেই যে মেয়ের সঙ্গে এসেছেন আর যেতে পারেননি। বাচ্চার দুধের জোগান দিতে পারছে না জরিনার বুক। কৌটার দুধের অনেক দাম। তবে, সরকার বাইরে সস্তাতে চাল দিচ্ছে; বিভিন্ন স্থানে ত্রাণও দিচ্ছে। সে চাল নিতে মুখোশ পরা অসহায় বুভুক্ষু মানুষের দীর্ঘ লাইন। আনিস দু’দিন যেতে চেয়েছিল কিন্তু জরিনা যেতে দেয়নি।

কিন্তু, আজ যে না গেলেই না। আর তখনই আনিসের এনালগ নকিয়া ফোনটা অশুভ সংকেতের মতো বেজে ওঠে।

হ্যালো হ্যালো, কে? হ্যালো, কখন? কতটা... ইস!

সারা গায়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে জরিনা জিজ্ঞেস করে, কে? কী হলো?

তোমার ভাইয়ের পা কেটে গিয়েছে। উত্তর করে আনিস।

অ আল্লা! কখুন? কটা সিলাই হয়েছে গো? ঘর থেকে শাশুড়ি মা হাউমাউ করে এসে পড়েন। বাজান তুমি যেভাবেই পার আমাকে আইজই রেখে আসু-বলতে বলতে তিনি কান্নায় ঢলে পড়েন।

শাশুড়িমার বাড়ি ফতাইপুর। মরা ভৈরবনদের ব্রিজের নিচেই। আনিসের বাড়ি থেকে মাইল তিনেকের পথ। রাস্তা ভাল। লোকজন নেই, ফাঁকা। তারপরও আনিস ভাবনায় পড়ল। হাতে টাকা নেই। এখন অটো, ভটভটিয়া যাই হোক না কেন, ভাড়া বেশি চাইবে। দুঃসময়ে এদেশের সব মানুষ ফায়দা লোটে। এদিকে বাড়িতে চাল নেই। আশফির দুধ নেই। আনিসের বুকের ব্যথাটা খচখচ করে ওঠে। গলা শুকিয়ে আসে। আনিস বুঝতে পারে শরীরে মধ্যে কোনো জটিল সমস্যা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বাড়ি মাথায় তুলতে থাকে শাশুড়ি। এই সংকটের মাঝেই জরিনা আলতো করে ডাকে আনিসকে, গলাটা খাদে নামিয়ে বলে, মাকে তুমি রেখেই আসু।

বিস্মিত হয়ে আনিস জিজ্ঞেস করে, আর চাল নেওয়া?

আজকের মতো চালিয়ে নেব।

অগত্যা আনিসকে লুঙ্গি ছেড়ে প্যান্ট পড়তেই হয়। বাড়ি থেকে বেরুনোর আগ মুহূর্তে জরিনা আনিসের হাতে পঞ্চাশ টাকা গুঁজে দেয়। সে আর বুকের ব্যথাটার কথা বউকে বলে না।

ফতাইপুরে রাতে থাকেনি আনিস। চলে এসেছে সন্ধ্যার আগেই। যাতায়াতে আশি টাকা খরচ। বাকিটা শাশুড়ি নিজে থেকে বের করে দিয়েছে বলে রক্ষা। বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার বুকটা ভীষণ ধরে আসে। আনিসের মনে হলো, জ্বর আসছে নাকি! এ সময় জ্বর তো সাংঘাতিক অসুখ! টাকা পয়সা নেই, ডাক্তার নেই, চারদিকে শুধু নেই আর নেই- এই কথা মনে হতেই শরীরের সাথে সাথে আনিসের আত্মাটাও ছ্যাৎ করে ওঠে।

রাতে ঘুম হলো না আনিসের। শেষ রাতে সে একটা লম্বা স্বপ্ন দেখল। আনিসের অন্ধ দাদাজান ঝলমলে এক টুকরো রোদ সুতোর মাথায় বেঁধে তার হাতে দিয়ে বলে, নে রে শালা, এখন রোদের ঘুড়ি ওড়া। দাদার গায়ের পচা মাংসের গন্ধে দিনের বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। দাদাজানের গায়ের ছেড়া কাফন উড়তে থাকে। আনিস ভয়ে চিৎকার করে ওঠে। আনিসের আব্বা সলেমান মিঞা তখন ঘরের দাওয়ার বসে কাশতে কাশতে বলে, আব্বা তুমি আবার গোর থেকে উঠে আসলি ক্যানে? কাশতে কাশতে তার চোখ ঘোলা হয়ে গেছে। দাদাজান উত্তর করে, অ সলু তর শরীলতা তো আরো খারাপ হয়িছে রে বাপ; আমি এলাম তোকে দেখতি আর নাতিডারে নিতি- অ সলু, তর যক্ষা কি বাড়তির দিকে বাপ... পথ্য খাসনি? কিভাবে খাবি? তুইও তো মরা। আব্বা আমার আনিসের চাকরির খাতা বড় অফিসে গিয়িচে, ইবার মাইনি হবে; ট্যাকা পাবে-তখনি জরিনা চিৎকার করে ওঠে, আপনি কুত্তায়? ওদের কাউকে আপনি ছোঁবেন না- খবরদার বুলচি। আনিসের ঘুম ভেঙে যায়। সারা শরীর তার ঘামে ভেজা। আনিস শুনতে পায়, আশিফা কাঁদছে দুধের জন্য। জরিনা তার শীর্ণ বুক আশিফার মুখে চেপে ধরার চেষ্টা করছে। আনিসের শরীরটা বেশ হালকা লাগছে এখন। বুকের ব্যথাটা কম শুধু গলাটা ধরে আছে মাত্র। ঢোক গিললে ব্যথা অনুভূত হয়। আনিস বিছানা থেকে উঠে বসতে গিয়ে মাথাটা টলে ওঠে। পচা মাংসের গন্ধ তার নাকে এসে ধাক্কা দেয়।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে আনিসের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গেল। এক চিলতে বাতাসের জন্য তার ফুসফুস মুহূর্তে হাঁপিয়ে উঠল। সে ঘোলাটে চোখে দেখতে পায়, উঠানের মাঝে তার অন্ধ দাদাজান তার দিকে তাকিয়ে আছেন। আনিসের দম বন্ধ হয়ে আসে। ক্রমাগত তীব্র ব্যাথায় তার মুখ নীল হয়ে আসে। অস্ফুট স্বরে সে তার মেয়েকে ডাকতে চেষ্টা করে। আনিসের ঝাপসা দৃষ্টি আবার দুলে ওঠে, দাওয়ায় বসে সলেমান মিঞা কাশছে খক্খক্। আনিস গড়িয়ে পড়ে বৈঠকখানার চৌকি থেকে।

মৃত্যুসংবাদ বাতাসের আগে ছোটে। কিছু সময়ের মধ্যে পাড়ায় ছড়িয়ে গেল। টিএন্ডটি অফিসের আনিসুর রহমান আনিস, পিতা, সলেমান মিঞা মারা গিয়েছে। উঠানে নোংরা পড়লে যেমন কাক আসে না ডাকতেই, ঠিক তেমনি, কিছু মানুষ আসতে আরম্ভ করল আনিসের নিষ্প্রাণ দেহটাকে দেখে বিলাপ করতে। সবাই মুখে কাপড় বেঁধে দূরে দাঁড়িয়ে, মানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই সামাজিক কর্তব্য পালন করল। এই খবর মহল্লা ছাড়িয়ে সারা শহর হতে সময় লাগলো মিনিট কয়েক। কিছুক্ষণের মধ্যে সাইরেন বাজিয়ে সরকারি গাড়ি থামল জরিনার বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নামল ইউএনও, পুলিশ, সেনা সদস্য, সাংবাদিক আর অদ্ভুত পোশাক পরা একদল স্বাস্থ্যকর্মী। লোকে লোকে একাকার। ওরা আনিসের দেহটাকে ভয় ও বিস্ময়ের চোখে দেখল শুধু দূর থেকে। অদ্ভুত পোশাকের লোকগুলো আনিসকে পরীক্ষা করল ভয়ে ভয়ে। অন্যদিকে পুলিশ ও অন্যান্য লোক বাড়িতে লাল পতাকা তুলে দিল। পুলিশ দেখে সামাজিক দায় সম্পন্ন করতে আসা মানুষগুলো চোখের পলকেই অদৃশ্য হলো। এদেশের সাধারণ মানুষ পুলিশ এড়িয়ে চলে। ইউএনও সাহেব হাত মাইকে ঘোষণা দিলেন, “এই বাড়ি লকডাউন করা হল।” শুনে আফরোজা ভয়ে ভয়ে মায়ের কানেকানে জিজ্ঞাসা করে, “মা এর মানে কী?” সেনা সদস্যগণ জরিনার হাতে খাবার তুলে দিলেন। সব ছিল সেই ব্যাগে। খাদ্যসামগ্রী তুলে দিল ইউএনও নিজেও। অনেক খাবার, আশিফার জন্য দুধের প্যাকেটও ছিল। ওরা বলল, আপনাকে ভাবতে হবে না, আমরা সবাই আপনাদের খাদ্য সরবরাহ করব, ইনশাল্লাহ। এই প্রথম জরিনা দেখল, পরিবারের সদস্য মারা গেলে, খাদ্যসামগ্রী সাহায্য পাওয়া যায়! খাদ্যের কথা ভাবতে গিয়ে আনিসের কথা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়েছিল জরিনা। ওরা আনিসের শরীরটাকে নেওয়ার তোরজোড় শুরু করেছে। জরিনার মনে হলো, ওরা খাদ্যের বিনিময়ে নিষ্প্রাণ শরীরটাকে ওদের কাছে বিক্রি করছে না তো? বাড়ির ফেলনা জিনিস ভাংড়ির দোকানে বিক্রি দেওয়ার মতন! আফরোজা অপলক তাকিয়ে আছে সাদা সিমেন্টের ব্যাগের মধ্য থেকে উঁকি দেওয়া চালগুলোর দিকে। মৃতবাবার পাল্টে যাওয়া চেহারাটা শেষবার দেখে। ময়লা জামায় চোখ মুছে আফরোজা খাদ্যসামগ্রী ঠাসা ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল উঠানের রান্নাঘরের কাছে।

জরিনার সংসারে এখন আর খাবারের সমস্যা নেই। সরকারি, বেসরকারি, পুলিশ, সেনা, নেতা সবাই খাবার দিচ্ছে তাদের। জরিনা অবসন্নœ দেহে প্রায়ই বিড়বিড় করে, আমি ওদের হাতে লাশ দিলাম, ওরা আমাকে ভাত দিল; ওকে তারা কোথায় নিয়ে গেল? কেন নিয়ে গেল? ওর কী হয়েছিল? জরিনা গাল বেয়ে লবণাক্ত ধারা নামতে থাকে। দুধ বলকের মতো হৃদয়ভাঙা কষ্ট জরিনা ভিতর থেকে উথলে আসতে চায়, আর ঠিক তখনই আরো একদল মানুষ জরিনার দরজায় এসে দাঁড়ায়। ওদের মধ্যে যিনি নেতা, তিনি অন্য একজনকে ছবি তুলতে বলে এগিয়ে আসেন। জরিনার হাতে খাবারের ব্যাগ তুলে দিয়ে বলেন, আনিস ভাই বড় ভাল মানুষ ছিলেন, ভাবী- আল্লাহ তাকে বেহেশ নসিব করুক। সকলে বলে ওঠে “আমিন”। এই এক সমস্যা, আজ সপ্তাহ ঘুরতে চলে, জরিনা প্রাণ খুলে কাঁদতে পারেনি। যখনই তার প্রাণফাটা শোক উথাল দিয়ে হৃদয়ের পাড় ভাঙতে চায় তখনই কেউ না কেউ আসে তার দরজায়। হাতে থাকে খাবারের ব্যাগ। সবই থাকে সেই ব্যাগে- চাল, আলু, তেল, চিনি, আশিফার দুধ আর নগদ দুইশত টাকা।

আফরোজার মাঝে মাঝে বাবাকে মনে পড়ে। তবে তার ভরা পেটের তৃপ্তির ঢেঁকুর আনিসের শূন্যতাকে বুঝতে দেয় না। গভীর রাতে সুনসান নীরবতার মাঝে যখন আফরোজার গভীর নিঃশ্বাস ঘরে একট চাপা ভৌতিক আবাহ সৃষ্টি করে, তখন জরিনার ভয় হয়। সে শুনতে পায় ইঁদুর সাহায্যের ব্যাগ থেকে চাল খাচ্ছে, কুটকুট শব্দ হচ্ছে। ঘরের মেঝেতে সার দিয়ে রাখা সাদা সিমেন্টের ব্যাগ চাঁদের পাতলা আলোয় কাফনঢাকা কফিনের মতো দেখায়। জরিনার মনে হয়, ইঁদুরের এই শব্দ কোন স্বাভাবিক শব্দ নয়! এই শব্দের উৎস অন্য কোন জগতে- যেখানে বাতাসে মিশে আছে পচা মাংসের উটকো গন্ধ। হঠাৎ আশিফা কেঁদে ওঠে। জরিনা ঘুমন্ত কন্যার মুখে গুঁজে দেয় তার দুধপুষ্ট স্তন। তার স্তন দুটো আগের মতো আর শীর্ণ নয়। সে হাত বুলায়। দুধপুষ্ট স্তনের বোঁটাটা মুখে পেয়ে গরুর অভুক্ত বাছুরের মত চোঁ চোঁ করে টানতে থাকে আশিফা। আফরোজা গভীর ঘুমের মধ্যে আবান্তর কিছু বলে ওঠে। ভরা পেটের গভীর ঘুম আফরোজাকে নিয়ে যায় অন্য কোনোখানে। নির্ঘুম থাকে জরিনা। এক অজানা অপরাধবোধ ভীড় করে ওর দু’চোখে-বাইরে তখন চাঁদের অকৃপণ আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর; উঠানের আতাগাছে ডানা সাপটায় রাতজাগা পাখি। আবার উল্লাস করে ওঠে ইঁদুর। হঠাৎ জরিনার বুকটা আকুল হয়ে ওঠে। বাষ্পরুদ্ধ গলায় সে ফুঁপিয়ে ওঠে অসহায়ের মতো। তখনই ওর মনে হয়, পাশের বৈঠকখানায় কেউ একজন ভরা পেটে ঘুমাচ্ছে। বৈঠকখানা থেকে ভেসে আসা মৃদু নাকডাকার শব্দ ক্রমেই তার কানে স্পষ্ট হতে থাকে।

  • অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    স্বতন্ত্র, বিচিত্র ও অভিনব

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    তীব্রভাবে সমালোচিত ও তীব্রভাবে গ্রহণযোগ্য চিলের কবি নিকানোর পাররার কেন বলেছিলেন যে,

  • ধ্রুপদী স্রষ্টা

    অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    হিন্দোল ভট্টাচার্য

    newsimage

    অচেনা নম্বর থেকে ফোন এল যখন তখন সকাল বেলা সাড়ে ১১টা। ফোন

  • অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

    অধিবিদ্যার কবি

    উদয় শংকর দুর্জয়

    newsimage

    এক বেশ্যা অনায়াসে ভিতরমদিরে ঢুকে যায় বুদ্ধ মন্দিরেরে দরজা বন্ধ হয়ে গেল এক

  • মহাতর্জনী আর যুদ্ধ ঘোরের মেটাফোর

    নাসরীন জাহান

    newsimage

    পুরো যুদ্ধের সময়টাই বলা যায় আমার স্বপ্নে বাস্তব ঘোর লড়াইয়ে কেটেছে। যেখানে বেশিরভাগ সময় বাস্তব জয়ী হয়েছে। মনে পড়ে, যুদ্ধ শুরুর দুমাস পর এক মিশনে

  • সাময়িকী কবিতা

    এখন আমায় তরুণতর সতীর্থেরা বলে অলোকদা, আপনি আমাদের মাথার ওপর আছেন। ভাবি আমি কি তবে তাদের জরাজীর্ণ আচ্ছাদন ছলে ও কৌশলে?

  • এখানে এখন : সামাজিক সংকটের নির্মাণ

    সানজিদা হক মিশু

    newsimage

    সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬) বাংলা নাট্যসাহিত্যের কিংবদন্তি। তাঁর ৮৫ তম জন্মক্ষণে সংক্ষিপ্ত

  • গ্রাম-গ্রামান্তরে

    প্রথম পূর্ণ ডিজিটালাইজড শিক্ষা বোর্ড যশোর

    রুকুনউদ্দৌলাহ

    newsimage

    দেশের অনেক কিছুতে যশোর প্রথম হওয়ার গৌরবের অধিকারী। যুক্ত বাংলার প্রথম জেলা