menu

গোল্ডফিসপুলে দাঁড়িয়ে কবি ক্লাইভ জেইমস

উদয় শংকর দুর্জয়

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ নভেম্বর ২০১৮
image

‘সেনটেনস্ড টু লাইফ’ কাব্যগ্রন্থের ‘আর্লি টু বেড’ কবিতায় লিখেছেন- আমার বৃদ্ধ বয়স কোনো সমস্যা না। আমার ভগ্ন শরীরটাই আমাকে পোড়ায় নিয়ম করে। আমি যদি আবার ভালো হয়ে উঠি, তবে হাঁটবো মাইলের পর মাইল। আমার নাম ক্লান্তিহীন পথিকের সমার্থক

‘আনরিলায়বল মেমোরিস’-এর লেখক যিনি কবি এবং উপস্থাপক হিসেবে ব্যাপক পরিচিত, তিনি হলেন ক্লাইভ জেইমস; আত্মজীবনীমূলক স্মৃতিকথা লিখে যিনি রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন। ক্লাইভ জেইমস বলেছেন- ‘যদি তুমি স্বপ্নাদর্শী হও তবে আমি তোমার স্বপ্ন, কিন্তু যখন জেগে ওঠার অভিলাষী হও তখন আমিই তোমার সেই অভিলাষ, এবং তুমি ক্ষমতাবান হও প্রভুত্বের মতো, তখন সেই একাকী নীরব তারা, ঠিক এই শহরের মাথার উপর জলজল করবে, আমরা জানি সেটা সময়ের মতো খুব অচেনা এবং তা দীর্ঘকালব্যাপী।’ অনেক আকাংক্ষা এসে ধরা দেয় কবি ক্লাইভ জেইমসের জীবন সায়াহ্নে, আত্মোপলব্ধি থেকে বিষাদের দলগুলো লুকিয়ে রেখে তিনি পাঠকের জন্য লিখে রাখেন গোল্ডফিস-পুলের কথা যেখানে তাঁর মেয়ে খেলা করতো, কবি উপলব্ধি করেছেন কীভাবে মাছেরা নিয়ম মেনে চলাচল করে; কেউ কাউকে ছোঁয় না। কবি ‘ব্যালকনি সিন’ কবিতায় নিজের অসাড় সময়ের কথা ব্যক্ত করেছেন, মন চায় ছুটে যেতে কিন্তু তিনি যেন পাহাড়ের মতো স্থবির। আল্ট্রাসাউন্ড বলেছে তাঁর হৃদয়ের ভেতর-বাহির ভালো আছে, কিন্তু ভীষণ একাকিত্বের আলোছায়ায় শরীর আর কিছুতেই সজীব পত্রপল্লবের মতো তরতর করে এগোতে পারে না। তবুও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দেখছেন, শরতে ম্যাপল বৃক্ষ যেন ডালপালা ছড়িয়ে আরও যুবতী হয়ে উঠেছে। অলক্ষ্যে, বিষণ্নতার ফাঁকে, কবি নির্জন মনে কাউকে আহ্বান জানিয়েছেন তাঁর এই কবিতায়, লিখেছেন- ‘Sit with me on my stone balcoû’.

জেইমস হচ্ছেন এই সময়কার একজন সুদক্ষ সমালোচক এবং কৃষ্টিগত কন্ঠস্বর। তিনি কবিতা বলতে বুঝিয়েছেন জীবদ্দশায় মানুষের যা কিছু ঘটে যায় কবিতা তার বহির্ভূত কিছু নয়। কবিতার উপর তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের বই ‘পোয়ট্রি নোটবুক ২০০৬-২০১৪’ এই বইয়ে তিনি তাঁর কবিতাক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন; শিল্প সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রবাহিত করে তিনি যা যা উপার্জন করেছেন তার সবটুকু উপস্থাপন করেছেন। কবিতার আঙ্গিক, বিষয়, সিমিলিস, মেটাফোর, ইমেজ, অলংকারসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে শেক্সপিয়ার থেকে লারকিন আবার কখনও কিটস থেকে পাউন্ডের কবিতার খুঁটিনাটি টেনে এনেছেন। তিনি পাঠকের উদ্দ্যেশে বলেছেন তাঁদের কবিতা দ্বিতীয়বার পড়ার জন্য, কারণ প্রথম পাঠে কবিতার সবকিছু উদ্ধার করা যায় না। বইটিতে ২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত কবিতা বিষয়ক যেসব প্রবন্ধ লিখেছেন সেগুলোই মূলত স্থান পেয়েছে; বলা যায়, যারা কবিতা লেখেন বা লেখার চেষ্টা করেন তাদের জন্য এটি একান্ত প্রয়োজনীয় একটি দলিল। ফাইনান্সিয়াল টাইম বলেছে- ‘বইয়ের উপাদানগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ... মনোরমভাবে লিখিত... তাঁর লেখার হাত এখনও চতুরতা হারায়নি’। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে বেস্ট সেলার হয়েছে ‘ব্রিলিয়ান্ট ক্রিয়েচারস’ (১৯৮৩) এবং ‘দ্যা সিলভার ক্যাসল’ (১৯৯৬)। তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অ্যাস অফ দিস রাইটিং’ (২০০৩), ‘দ্য মিনিং অফ রেকগনিশন’ (২০০৫) এবং ‘কালচারাল এমনেসিয়া’ (২০০৭)। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পোয়েম অফ দ্য ইয়ার’ (১৯৮৩), ‘এ ভার্জ-ডায়রি, আদার পাসপোর্ট: পোয়েম ১৯৫৮-১৯৮৫’, ‘সেন্টেন্সড টু দ্য লাইফ’ (২০১৫), ‘ইনজুরি টাইম’ (২০১৭) এবং ‘দ্য রিভার ইন দ্য স্কাই’ (২০১৮)। উল্লেখ্য যে, গায়ক এবং মিউজিসিয়ান পিটি অ্যাটিকিনের জন্য প্রচুর গানও লিখেছেন।

২০১০ সালে জেইমসের লিউকোমিয়া ছাড়াও ফুসফুস এবং কিডনিতে মারাত্মক ব্যাধি ধরা পড়লে মৃত্যুর অশনি সংকেত শুনতে পান। কবিতা তাঁকে এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে দেয়নি তখন; আর সেবছরই বিবিসির এক সাক্ষাৎকারকে বলেন- `I'm getting near the end. I don't want to cast a gloom, an air of doom, over the programme but I'm a man who is approaching his terminus’. অর্থাৎ আমি জীবনের প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। কার্যক্রমের মাধ্যমে আমি আমার বিষাদ, নিয়তিকে পরিমাপ করতে চাই না, কিন্তু আমি সেই ব্যক্তি যে তাঁর সীমান্তের শেষ অবধিতে পৌঁছে যাচ্ছে। কঠিন ব্যাধির সাথে নিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছেন জেইমস, তবু তিনি থেমে নেই। ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘Sentenced to life’ যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে আছে অসুস্থ সময়ের উপলব্ধিগত বিবরণ আর স্মৃতিচারণের অনবদ্য শব্দসম্ভার। নিজেকে কিছুতেই থামিয়ে দেন নি এই কবি, ২০১৩ সালে শয্যায় শুয়েই তিনি, তাঁর অনুবাদ করা দান্তের ‘দ্য ডিভাইন কমেডি’র প্রুফ দেখেছেন। এখানেই একজন শিল্পীর দায় যেন আরও মহিমান্বিত হয়ে ওঠে; তিনি মনে করেন এই পৃথিবীর মানুষকে কিছু দেয়ার আছে এবং সেজন্যেই শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিজেকে নিবেদন করে চলেছেন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পেছনে। তিনি অমোঘ নিয়মের কাছে হেরে গিয়েও হেরে যাননি। হারিয়ে গেলেও তিনি পাঠকের স্মৃতির আকাশে ধ্রুব তারার মতো জ্বলে থাকবেন। ‘সেনটেনস্ড টু লাইফ’ কাব্যগ্রন্থের ‘আর্লি টু বেড’ কবিতায় লিখেছেন- আমার বৃদ্ধ বয়স কোনো সমস্যা না। আমার ভগ্ন শরীরটাই আমাকে পোড়ায় নিয়ম করে। আমি যদি আবার ভালো হয়ে উঠি, তবে হাঁটবো মাইলের পর মাইল। আমার নাম ক্লান্তিহীন পথিকের সমার্থক। সপ্তাহান্তিক রাতে আমি হাঁটবো আরও অনেকটা পথ। এটা তাঁর অব্যক্ত কথা নয় যেন বাস্তবেই তিনি হেঁটে যেতে চান আরও কিছু বছর। তিনি আরও লিখেছেন ‘I’d go to tango joints and stand up straight while women leaned against me trustingly’ অর্থাৎ দক্ষিণ অ্যামেরিকার নৃত্যের সাথে নিজেকে যুক্ত করতে চান দৃঢ়ভাবে যখন প্রণয়িনীরা তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। যুবক বয়সে জেইমস একবার আর্জেন্টিনা গিয়েছিলেন নৃত্য শেখার জন্য, হয়তো সেই সময়কে ফিরে পেতে চেয়েছেন কবিতায়। কবিতা তো যাপিত জীবনেরই বহিঃপ্রকাশ; শুধু প্রকাশ ভঙ্গিটাই আলাদা। ভিনগ্রহের কল্পনা এসে হানা দিতে পারে যেকোনো সময় কিন্তু তার পেছনেও এই স্বাভাবিক যাপন চিত্রের কোনো না কোনো সংযোগ রয়েছে।

এরপর ২০১৭ সালে প্রকাশ পায় তাঁর ‘Injury Time’ কাব্যগ্রন্থ। কাব্যগ্রন্থের নাম শুনলেই বোঝা যায় এটি তাঁর ‘Sentenced to life’-এর দ্বিতীয় অধ্যায়; জেইমস তাঁর অসুস্থ সময়ের যে কথাগুলো লিখে শেষ করতে পারেন নি ‘Sentenced to life’-এ, সেগুলো জড়ো করেছেন ‘Injury Time’-এ। তিনি পাঠকের চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছেন; পারিবারিক আনন্দের মাঝে খুঁজে পাওয়া শৈল্পিক যাপনকে বর্ণনা করেছেন এবং পৃথিবীর সাম্প্রতিক সময়ের যাবতীয় যে সৌন্দর্যকে তিনি উপলব্ধি করছেন তারই প্রকাশ ঘটেছে এখানে। জীবনের নিরন্তর উপলব্ধি যেন জেইমসকে তাড়া করে ফিরেছে বারবার। এবছরের (২০১৮) সেপ্টেম্বরে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘The River in the Sky’। এ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো হলো একান্ত মুহূর্তে উপলব্ধি করা সময় ও প্রকৃতির বিভিন্ন অনুষঙ্গ; আর এখানে মুঠোবন্দি হয়ে উঠে এসেছে তাঁর অগ্রন্থিত সেইসব দিনগুলোর কথা। তিনি তাঁর জীবনের ক্ষণস্থায়ী প্রাচুর্যের এক অন্তহীন পথে পাঠককে ভ্রমণ করিয়েছেন। শক্তিশালী অনুচিন্তনের যে প্রতিফলন ঘটিয়েছেন এই কাব্যগ্রন্থে তারই একটি প্রবহমান ধারা পাঠকের মনে নাড়া দিয়েছে। চিত্রকল্পের পাশাপাশি তিনি ব্যক্তিগত অনু-রণিত আবেগের স্রোতধারা থেকে পাড়ি দিয়েছেন অবিস্মরণীয় যত শৈল্পিকতার নিগূঢ়তায়। জীবন সায়াহ্নে এসেও যেন শুনতে পেয়েছেন প্রিয়তমার ব্যাকুল আহ্বান। বিটোফোনের নবম সুরের মায়ায় তিনি যেন শুনেছেন বিশ্বনাগরিকের বুকের গহনে জেগে থাকা সুরগুঞ্জন। জেইমস তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ-বেদনাকে ভাগ করেছেন পাঠকের সাথে; মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরে এসেছেন বারবার আর সেইসব উপলব্ধির বেদনাহত অনুক্ষণের চিত্র এঁকেছেন তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থে।

‘সেন্টেন্সড টু লাইফ’ লেখার পর ভেবেছিলেন এটাই হয়তো তাঁর জীবনের শেষ লেখা। ২০১৭ সালের দিকে এসে সেই এলোমেলো ভাবনাকে আবার যেন নেড়েচেড়ে নিলেন; না ওখানেই শেষ ছিল না। জেইমসের সর্বশেষ বই ‘ইনজুরি টাইম’ প্রকাশিত হওয়ার পর, ওয়েলসে বসবাসরত অস্ট্রেলিয়ান কবি ও ঔপন্যাসিক জিওফ পেইজ ‘দ্য সানডে মর্নিং হেরাল্ড’ পত্রিকায় লিখেছেন- ‘ক্লাইভ জেইমসের ইনজুরি টাইম; হলো একটি সম্পূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। তিনি বারবার মনে করিয়েছেন যে জেইমস আমাদের সাথেই আছেন তাঁর স্বচ্ছতা ও কাব্যীয় প্রতিপত্তি নিয়ে। জেইমস হলো সম্ভবত সোজা সাপ্টা স্টিফেন এডগারের চেয়ে, অ্যালান গোল্ডের চেয়ে কম দুঃসাহসী, অ্যালান ওয়ার্নের চেয়ে কম লৌকিক এবং জর্দি অ্যালবিস্টনের চেয়ে কম প্রতিভাধর।’ সমসাময়িক অস্ট্রেলিয়ান কবিদের কাছে জেইমস দারুণ ঈর্ষান্বিত একজন।

ক্লাইভ জেইমসের পুরো নাম ছিল ভিভিয়ান লিওপল্ড জেইমস। জন্মগ্রহণ করেন ৭ অক্টোবর ১৯৩৯, সিডনির দক্ষিণস্থ শহরতলি কগরাহতে। চিত্র অভিনেত্রী ভিভিয়ান লেই, স্কারলেট ওহারা চরিত্রে অভিনয় করার পর জেইমসের কাছে উন্মোচিত হলো, ভিভিয়ান হচ্ছে মেয়েলি নাম। এরপর ভিভিয়ান ছেঁটে দিয়ে রাখলেন লিওপল্ড জেইমস। তাতেও মনে হয় তিনি খুশি হলেন না। ‘দিস অ্যাভোব অল’ (১৯৪২) মুভিতে টায়রোন পাওয়ার অভিনয় করেন ক্লাইভ চরিত্রে। জেইমস, পাওয়ারের অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে নিজের নাম রাখলেন ক্লাইভ জেইমস। কবি, ঔপন্যাসিক, সমালোচক, উপস্থাপক, অনুবাদক এবং স্মৃতিকথক ক্লাইভ জেইমস ১৯৬২ সাল থেকে ইংল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন।

‘সেন্টেন্সড টু লাইফ’ কাব্যগ্রন্থ থেকে তিনটি কবিতার অনুবাদ এবং ভাবানুবাদ করার যথাসাধ্য প্রয়াস মাত্র।

Spring Snwo Dancer

বসন্তের তুষার নর্তকী

এপ্রিলে তুষার শ্রাবণ। হিমনিশি একের পর এক ভীষণ অবিরাম

এখানে ওয়েলস খামারের ভেড়াগুলো পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা যায়

হিমবায়ু আমার বুকের ভেতর ফোটায় হুল, কিন্তু আলো দেখে বুঝি

হয়তো বসন্ত দাঁড়িয়েছে পিছে, ঝিরি হাওয়ায় একাকী সন্তর্পণে।

জীবনের তিক্ততা যেন, দীপ্তমান শীতের শেষে অযথার্থ হয়ে নামে।

আমি নিশ্বাসে জেগেছি, উঠেছি বেড়ে নিঃসঙ্গ নিয়মে, এবং আমি শিখেছি

সুখি হতে, শিখেছি দীর্ঘ জীবনের জন্য যা একসময় নিষ্প্রভ হয়ে যায়।

সেই এখনও তুমি আমোদী আর পরিপাটি ভোজের আয়োজন কর,

দ্যাখো কীভাবে আমরা একটি প্রবহমান ধারার মধ্যে যাপন করছি

এবং এর মধ্যেই মৃত্যু এসে দাঁড়াবে। ভাবতে পার আজ আমি কি দেখেছি:

আমার দিভাই, যতদূর দৃষ্টি যায় এক পলক দেখেছি তাকে

রান্নাঘরের মেঝে জুড়ে ব্যালে নৃত্যের পদাঙ্ক এঁকে যাচ্ছে সে,

এবং সেই সময় আমি নিঃশ্বাসহীন, স্থবির এক বয়সী বৃক্ষ।

এসবের মাধ্যমে আমি জীবিত হয়ে উঠি, আমাদের প্রিয় ভেড়ার নৃত্য দৃশ্য দেখি

হয়তো তাকে আর কখনই দেখব না, এমন কি এক মুহূর্তের জন্যও না।

Winter Plums

শীতের প্লামস

আমার দরজার ওপাশে দুটো প্লামগাছ বেড়ে উঠছে নির্ভাবনার দেয়াল তুলে

ঠান্ডার দিনগুলোতে তারা একটু একটু করে গোলাপী হয়ে উঠেছে। হয়তো

আনমনে তাঁদের চারিদিকে ফুল-পত্রালির দল যেন পরিধান করে আছে

রাত্রি পোশাক, এবং তাদের হিল্লোলিত শাখা প্রশাখা রঞ্জিত হয়েছে কৃষ্ণরঙে।

ঠিক অপরূপ সূর্যাস্তের সময়, যেন কোনো জাপানী চিত্রকর বেনামী তুলির

অবিমিশ্র স্পর্শে এঁকেছেন সেইসব প্লাম বৃক্ষের নিরুপম সৌন্দর্য।

শীতের প্লামগাছ দুটো পাতার সংসার ছড়িয়ে দাঁড়ায়। তারপর গ্রীষ্মের অনুপ্রবেশ,

প্লামদের পত্রাঞ্জলিকে শোনায় উত্তাপের বার্তা আর পুষ্পকুড়িরা অন্তরীণ হয়।

আরেকটা সোনালি বছর হয়তো আমি পার করতে পারবো না, তবুও

অনাবৃত শাখা-প্রশাখা শোনায় আশার বাণী, সূর্যোদয়ের দিকে এগিয়ে চলার।

আবার পরবর্তী শীতের প্লামস বৃক্ষদের সাহসী ফুলগুলো

অকস্মাৎ জ্বলে উঠবে এবং আমি সেই সব প্রত্যাশা গোপনে কুড়িয়ে নেব।

শীতের সেই দুটো প্লামগাছ আমাকে দীর্ঘজীবী করে।

এমন কি তুষার প্রবাহের মধ্যেও রঙ নিয়ে ফলবতী হয়

প্রতিকূলতা থেকে ছিনিয়ে নেয় সব বিজয়-উল্লাস।

তাদের জন্য সব ঠিক আছে, কিন্তু তারাও কি এমন করে ভাবে।

যদি কেউ দ্যাখে কুঁড়িগুলো নতুন করে, কোনো কিছু থেকে জন্ম নিচ্ছে না

সেটা তার কাছে বেদনার চেয়ে কি আনন্দেরই হবে?

অন্তহীন ভাবনা এসে দাঁড়ায় জানলার ওপারে।

Sentenced to Life

জীবনের জন্য কিছু ব্যাখা

আমি দন্ডিত জীবনের মুখোমুখি যেন ঘুমিয়ে আছি; স্থবির, দুচোখ খোলা

চারিদিকে তুষার, রাত্রি এসে ভিড় করলে অজান্তে অনুভব করি দুঃসময়

এবং আমি হাঁটি মাইলের পর মাইল এই অচেনা শহরে। বোহেমিয়ান আমি

গভীর কাদাজলে থেকে দেখাই সুপন্থা, জলপাখিদের। জীবনের পেছনে ভিন্ন গল্প

একজন দুঃখী মানুষ তারচেয়েও দুঃখী যতটুকু সে বলতে পারে।

যদি ভাবি নিখুঁত অঙ্কে, সে এতোটা দোষী নয় যে মরবে

প্রতিটি দিন জেনে চলেছে, তাঁর দৌড় হলো ধাবমান:

আমার পাপ হারিয়েছিল বিশ্বাস। আমি মিথ্যা বলব

যেন আমি সবার কাছে সত্য হয়ে উঠতে পারি

বর্তমানে তার সবকিছু ক্ষয়ে গেছে, অন্ধকারে নিমজ্জিত।

সে তো ভালোবাসার নামে ছিল অথবা আমি চিন্তা করেছিলাম

এটা বিশ্বাস করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে হবে,

কিন্তু না, সেটা চিন্তা করার জন্য একটি অনুশীলনী ছিল।

এখন, শুধু পুরনো নয়, অসুস্থও বটে, অনেকটা পথভ্রষ্ট পথিক যেমন উদ্ভ্রান্ত।

তবু আমি দেখি নতুন কোনো সম্পূর্ণ উচ্ছ্বাস, নতুন আলোক রাশি।

আমার কন্যার বাগানে একটি গোল্ডফিসের ছোট্ট জলাশয় আছে

যেখানে ছয়টি মাছ ডুব সাঁতার খেলে, তাদের প্রিতিটি কনিষ্ঠ আঙুলের মতো।

আমি হঠাৎ চমকিত এবং দেখি তারা কীভাবে নিয়মগুলো অনুসরণ করে

ভুল নেই কোনো কিছুতে, একে অপরকে স্পর্শ করার ক্ষেত্রে,

নির্দিষ্ট আবক্র পথ যেন সুনিপুণ, ঠিক একটি সোজা-সরল সুরধ্বনির মতো।

একদা আমার সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়নি; না আমি সেগুলো জানতাম

ফুলগুলো জাপানি বনফুল, পান্ডুর রঙ মেখে মলিন, ক্ষণস্থায়ী পলকা রঙ

কিন্তু শুনতে পারি, পত্র-পাখালির অনুরণনে বেজে ওঠা দূরালাপন।

দৃষ্টির অন্তরালে একটি পাখিও প্রবেশ করতে পারে না বৃক্ষরাজিতে

আমি যে মধুকরীদেরও সংখ্যাগণনা করতে পারি।

এখনও আমার স্মরণবেলার দৃশ্য ভেসে ওঠে চোখের আয়নায়

সূর্যের রঙ মুছে গেলে প্রশ্নরা উড়ে আসে মেঘ হয়ে।

ভূমির স্মৃতিতে লেখা থাকে আজন্ম মায়ার কথা

তাই কি মস্তিষ্কের ভেতর টের পাই নিস্তেজ সময়ের সংকেত?

শ্বাসযন্ত্রের শরীর ঢেকেছে ধূলিকণায়। সেতো আমারই জানার কথা

অন্য কোথাও যাওয়ার নেই, নেই অবকাশ নেই স্থানান্তরের ঠিকানা।

তবু আমি পারি অপরাধ অবজ্ঞা করতে, বিষাদকে পারি ছুড়ে ফেলে দিতে

মন আমার দ্যাখো শান্তিপ্রয়াসী সূর্যাস্ত, ঐ দূরস্বর্গ পাঠিয়েছে,

বিষণ্ন রঙ মুছে প্রদীপ্ত রঙের মাঝে শাণিত পরিত্রাণ,

সাদা আকাশ মেখেছে রঙিন পালক যখন দিন ফুরিয়ে এসেছে,

যেন এটাই ছিল আমার অভিলাষ এবং ইচ্ছাপত্র-

যেন আমার গভীর সব অনুভূতির দুয়োরে শেষ কড়া নড়ে ওঠে

এবং সময় তাদেরকে সৃষ্টি করে ভিন্ন বিন্যাসে এক আলাদা অর্থে।

এখন আমি অধীর, ক্লান্তির বেহালায় বাঁধি নিঃসঙ্গ। আকাশ হয়ে ওঠে বিষাদভরাতুর

এখানে এখন ইংলিশ শরৎ, স্নিগ্ধ হাওয়া উড়ছে অনিঃশেষ, কিন্তু আমার মন

আলো পোহায় অজান্তে, আমি পশ্চাতে ফিরিনি কখনও।

  • জালনা সিরিজের লেখক মাজো ডি লা রচ

    সুব্রত কুমার দাস

    newsimage

    বিংশ শতাব্দির প্রথমার্ধের জনপ্রিয় লেখকদের মধ্যে কানাডীয় কথাসাহিত্যিক মাজো ডি লা রচ

  • আমার আছে বই-৪

    মালেকা পারভীন

    newsimage

    লেখক হতে গেলে নিয়ম করে প্রায় প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখতেই হবে।

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    চুম্বনের মায়াবী নেশায় অসীম সাহা মহুয়া, মল্লিকা এবং মাধবীর লতা থেকে কোমল বর্ণগুলো মার্চ

  • ভ্রমণ

    ভগবান টিলার পাদদেশে

    রুহুল আমিন বাচ্চু

    newsimage

    খাগড়াছড়ির জেলা সদরের সোজা উত্তরে পানছড়ি উপজেলা। সদর থেকে দূরত্ব ২৫ কি.মি।

  • অন্য ভুবনের বাসিন্দা

    রেজাউল করিম খোকন

    newsimage

    তেইশ চব্বিশ বছর ধরে সযত্নে রেখে দেয়া রুমানার লেখা সবগুলো চিঠি পড়া

  • পূরব দেশের পুরনারীদের কথা

    ওবায়েদ আকাশ

    newsimage

    বাংলাদেশের পাঁচজন মহীয়সী নারীর কথা নিয়ে রচিত ‘পূরব দেশের পুরনারী’ গ্রন্থটি। এটির