menu

গল্পে মুক্তিযুদ্ধ

গোমতী নদীর তীরে

ফারহানা রহমান

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ আগস্ট ২০১৯
image

গোমতী নদীর আইল বরাবর খুব সাবধানে পা ফেলে ফেলে প্রায় সীমান্তের কাছে পৌঁছে গেছেন ড. এনায়েত বরকতউল্লাহ। এখানেই তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। শৈশব-কৈশোর তিনি ব্রাহ্মণপাড়া নামক এই প্রাচীন জনপদে কাটিয়েছেন। ময়নামতি থেকে দড়িয়ার পাড় হয়ে ষাইটশালা পযর্ন্ত বিশাল এলাকা জুড়ে যতদূর তার চোখ যায় ততদূর তিনি যে নিচু ভূমি দেখতে পান তা দেখে বহুদিন পর ড. এনায়েতের চোখ ও মনের উপর এক ধরনের প্রশান্তি নেম আসে। এই বিস্তীর্ণ এলাকাটি মোগল আমলে কালিদাহ সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এর অববাহিকায় নিম্নাঞ্চলে ঘুংঘুর নদীর পূর্ব তীরে ইংরেজ কোম্পানির নীল বেনিয়ারা সতের শতকের গোড়ার দিকে বলদা মৌজার এক উঁচু স্থানে ব্যবসায়িক কুঠি স্থাপন করেছিল। আর সেই কোম্পানির হিসাব রক্ষণের জন্য বারানসী কাশি মুন্সি নামক একজন কান্যকুট ব্রাহ্মণকে হিসাব রক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এই ব্রাহ্মণ মহাশয়ের বসতি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই কোম্পানির খাতায় এ স্থানের নাম ব্রাহ্মণপাড়া হয়ে যায়। তো সেই জন্মভূমি ব্রাক্ষণপাড়ার দিকে হেঁটে যেতে যেতে মনের মধ্যে নানা ধরনের চিন্তাভাবনা উঁকিঝুঁকি দিতে থাকে এনায়েত বরকতউল্লাহ। চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে ছেলেবেলার কত সব বিচিত্র চিত্রকল্প।

২.

এদিকে ২৫ মার্চের রাতে যখন ঢাকা একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরে পরিণত হয়, চারিদিকে দাউদাউ করছে আগুনের লেলিহান। আর ভয়ার্ত মানুষের চিৎকারে আকাশ বাতাস প্রজ্বলিত হয়ে উঠতে থাকে ঠিক তখনই এনায়েত সাহেব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে তিনি ঢাকা ত্যাগ করে গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন। বিপতœীক ড. এনায়েত বরকতউল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক। বহুবছর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে দুই মেয়ে মল্লিকা ও কবিতাকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। মল্লিকার বয়স এখন ২০ বছর। শান্ত স্থিতধী অপরূপা মল্লিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স পাস করে উচ্চশিক্ষার কথা ভাবছে। এদিকে কবিতাও ১৪ বছরে পড়েছে। কিন্তু সেই যে তিন বছর বয়সে মা হারিয়ে কয়েকদিন ধরে একনাগাড়ে মা মা করে কেঁদে কেঁদে ঘরের প্রতিটি ইঞ্চি জায়গা খুঁজে বেড়িয়ে মেয়েটা একেবারে চুপ করে গেলো আর কখনো সে চোখের জল ফেলেনি। সারাক্ষণ উদাস হয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকার এক বিচিত্র অভ্যেস গড়ে তুলেছে সে। না আছে তার কোন চাওয়া পাওয়া, না আছে কোন ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ বা অভিযোগ। এমন এক আলাভোলা মেয়েকে নিয়ে এনায়েত বরকতউল্লাহ চিন্তার কোন শেষ নেই। এরি মধ্যে দেখা গেলো পুরো দেশ কেমন ভীষণ উত্তাল হয়ে উঠলো।

৩.

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে সমগ্র ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। এসময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কয়েকটি সুসজ্জিত দল ঢাকার রাস্তায় নেমে পড়ে এবং সারারাত ধরে গণহত্যা চালায়। একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপরেও হামলা চালানো হয়। হামলার প্রথম পর্যায়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষককে হত্যা করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে এনায়েত বরকতউল্লাহ সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও মা মরা দুই কন্যাকে নিয়ে ঢাকায় থাকাকে আর নিরাপদ হিসেবে ভাবতে পারছিলেন না তিনি। তবে গ্রামের বাড়ি ব্রাক্ষণপাড়াতেই যে বিশেষ কাছের কেউ আছে তাও নয়। নানার বাড়িতে একমাত্র চিরযুবক ছোটমামা অর্থাৎ নান্টু মামাই ছিলেন। তিনিও বছর খানেক আগে মারা গেছেন। ছোটমামার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মোতালেব মিয়াঁ এলাকার চেয়ারম্যান। সে সবার শ্রদ্ধেয়। অত্যন্ত ভালো মানুষ। একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও পরোপকারী মানুষ হিসেবে নিজ ও আশেপাশের সকল গ্রামে তার সুনাম আছে। প্রায় সবার কাছেই তিনি বিশ্বস্ত ও গ্রহণযোগ্য একজন মানুষ। তার উপর নিশ্চিন্তে ভরসা করা যায়। এনায়েত বরকতউল্লাহ জানেন মোতালেব মামা তাকে এবং তার দুই কন্যাকে জান দিয়ে হলেও রক্ষা করার চেষ্টা করবেন। সেই ভরসাতেই শেষ পর্যন্ত তিনি ব্রাক্ষ্মণপাড়ায় এসেছেন।

৪.

এনায়েত বরকতউল্লাহ ও তার দুই কন্যাকে পেয়ে মোতালেব মিয়া যার পর নাই খুশিতে আহ্লাদিত হয়ে উঠলেন। তাদেরকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন, “বাবা! এতদিন পর বুঝি এই ছোট মামারে মনে পইড়ল্লো? নান্টু মইরা গেলো তাও একটু আইলা না? ভাবছি আর এই জনমে আইতা না। সেই যে লেখাপড়া করনের লাই ঢাকায় চইল্লা গেলা আর এই আইল্লা।” এনায়েত সাহেব ছোট মামার কথা শুনে লজ্জা পান। নান্টুমামা প্রকৃতপক্ষে তার ছোট মামা কিন্তু তাকে নান্টুমামা বলেই ডাকতেন তিনি আর তার প্রিয়বন্ধু মোতালেব মিয়াকে ডাকতেন ছোটমামা। মোতালেব মিয়া আর নান্টুমামার দোস্তির কথা এলাকার সবাই জানেন। তাদেরকে লোকে মাণিকজোড় বলে ডাকতো। ছোটমামার কথা শুনে এনায়েত সাহেব মনে মনে ভাবেন, “ঠিকই তো! দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো এ জীবনে আর এমুখি হওয়া হতো কিনা কে জানে? যাইহোক না কেন শেষ পর্যন্ত নিজের জন্মস্থানে আসা তো হলো। আর মা মরা মেয়েগুলোকেও একটু গ্রামের পরিবেশ দেখানোর সুযোগ হলো।” যদিও ঢাকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মল্লিকা কিছুতেই তার বন্ধুবান্ধব ছেড়ে আসতে চাইছিল না। চারিদিকে যা পরিস্থিতি তাতে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। তার বন্ধুমহলের প্রায় প্রত্যেকে মনে মনে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন নিজেদের মধ্যে গোপন বৈঠক করে কে কীভাবে আগাবে, কোথায় গিয়ে যুদ্ধের ট্রেনিং নেবে সে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। মল্লিকারও ইচ্ছে নিজেকে যুদ্ধের সাথে জড়িত করার। ফলে সব ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়িতে পালিয়ে যাওয়ার মতো কাপুরুষতা সে আসলে মেনে নিতে পারছিল না। বাবাকে নিয়ে তার কোন চিন্তা নেই। সে জানে বাবা এমনই একজন ধ্যানী ও জ্ঞানি মানুষ যে তিনি সব ধরনের পরিস্থিতেই মানিয়ে নিতে পারবেন। সমস্যা দেখা দিলো আলাভোলা ছোট বোন কবিতাকে নিয়ে। দুনিয়ার কোন ব্যাপারেই তো তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। এখন পর্যন্ত সে নিজেকে একটু সামলে সুমলে রাখা শিখলো না। সময় মতো খাওয়া বা স্নানটাও সে করে না। প্রতিটি কাজ তাকে বলে বলে করাতে হয়। এদিকে দিন দিন কি ভীষণ শারীরিক সৌন্দর্য যে তার মধ্যে ভর করছে সেটা ভাবাই যায় না। দিনে দিনে সে যেন এক অপ্সরীতে পরিণত হতে চলেছে। কবিতার এই রূপ দেখে বাবা-মেয়ে মাঝেমাঝে ভয় পেয়ে যায়। পাঁচ ফিট ছয় ইঞ্চির মাখনের মতো উজ্জ্বল ত্বকের অধিকারিণী সে। প্রতিমার মতো তার মুখের গড়ন। আর দেহসৌষ্ঠব তো বোধহয় বিধাতা নিজ হাতে বানিয়েছেন। সে যে একজন নিতান্তই কিশোরী মেয়ে সেটা তাকে দেখলে আর মনে হয় না। এই ১৪ বছর বয়সেই রীতিমত সে যুবতী হয়ে উঠেছে। কিন্তু বহু চেষ্টা করেও তাকে কিছুতেই শাড়ি বা সেলোয়ার কামিজ পরানো শেখানো গেলো না। এমনকি সে ওড়নাটা পর্যন্ত সামলাতে পারে না। এখনো সে সামনে কুঁচি দেওয়া লং ফ্রক পরেই ঘুরে বেড়ায়। এনায়েত বরকতউল্লাহ মল্লিকাকে বলে দিয়েছেন কবিতাকে কিছু যেন বলা না হয়। মা মরা মেয়েটা এমনিতেই ভীষণ উদাসীন হয়েছে। কিন্তু মল্লিকার ভাবনা যায় না।

৫.

মল্লিকা ভীষণ বুদ্ধিমতী মেয়ে। গ্রামে রওনা দেওয়ার আগেই সে বুঝে নিয়েছে ঢাকার মতো করে সেখানে চলা যাবে না। নিজেকে আড়ালে রাখতে পারলেই সবদিক থেকেই নিরাপদে থাকা যাবে। তাই রওনা হওয়ার আগে তার ধবধবে ফর্সা হাতে মুখে সে কিছুটা কালি মেখে নেয়। কবিতাকেও মাখানোর জন্য অনেক পিড়াপীড়ি করতে থাকে। কিন্তু সে তো আর কারো কথা শোনার মতো মেয়ে নয়। গ্রামে এসেও মল্লিকা একইভাবে মুখে কালি মেখে ঘর থেকে বের হয়। কিন্তু কবিতা যেন স্বর্গ হাতে পেয়েছে এমনভাবে দিন কাটাতে থাকে। চারিদিকে খোলামেলা। যেদিকে চোখ পড়ে সারি সারি গাছের মেলা। বাড়ির সামনেই যতদূর চোখ যায় সবুজ ধানক্ষেত। এসব দেখে সে আরও যেন উদাস হয়ে পড়ে। ঘোর লাগা চোখে সে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দেখে। মোতালেব মিয়ার এই বাড়িটি সম্ভবত গ্রামের সবচেয়ে বড় বাড়ি। এখানে বাড়ির ভেতরে মহিলাদের স্নানের জন্য আলাদা পুকুর আছে। আর বাইরের দিকে পুরুষের ব্যবহারের জন্য বিশাল আরেকটি পুকুর। নানা ধরনের গাছ পালায় ঘেরা নারী মহলের পুকুরটিকে কবিতার দারুণ পছন্দ হয়ে যায়। পুকুরটির কাছে যাওয়ার জন্য সে সারাক্ষণ ছটফট করতে থাকে। সকালের নাস্তার পরপরই সে গিয়ে পুকুরে নেমে পড়ে আর বেলা গড়িয়ে গেলে তাকে সেখান থেকে এক প্রকার জোরজবরদস্তি করে ওঠাতে হয়। খুব অল্পদিনেই সে সাঁতার শিখে ফেলেছে। সারা শরীর চিৎ করে পানিতে ভাসিয়ে সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। সেখানে সে দেখতে পায় চারিদিকের বিশাল বিশাল সব গাছ ঝুঁকে এসে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কী এক ঘোরের মধ্যে তার দিনগুলো কাটতে থাকে। মে মাসের শেষের দিকে পাকিস্থানি আর্মি এসে ব্রাক্ষণপাড়ায় ক্যাম্প গড়ে তোলে। ছোটমামা গ্রামের চেয়ারম্যান। ব্রাক্ষণপাড়ার পুলিশ ফাঁড়ি, স্কুল, কলেজ দখল নিয়েই প্রথম দফায় পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন সরফরাজ বুখারি তলব করেন গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেবকে। মোতালেব মিয়া অতি পরহেজগার ও বুদ্ধিমান মানুষ। তিনি ঘন ঘন পাকি ক্যাম্পে নানাধরনের উপহার ও খাবারদাবার নিয়ে যাতায়াত করতে লাগলেন। সকালে-দুপুরে যখনই তিনি ক্যাম্পের দিকে রওয়ানা দেন অন্দরমহলের পুকুরপাড় দিয়ে তাকে যেতে হয়। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় প্রতিদিন তিনি এক ডানাকাটা পরীকে পুকুরে ভাসতে দেখেন। প্রথমদিকে তার কাছে দৃশ্যটি ভীষণ স্বর্গীয় মনে হতে থাকে। কিন্তু যতদিন যায় একই দৃশ্য প্রতিদিন দেখে দেখে অত্যন্ত পরহেজগার ও সৎ চরিত্রের মোতালেব মিয়ার শরীর ও মনের ভেতর কী এক অজানা আকাক্সক্ষার বিচিত্র ঢেউ উথালপাতাল করতে থাকে। তিনি নিজের অজান্তেই কোন কোন দিন কিছু সময় কোন একটি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে অপলক দৃষ্টিতে পুকুরের মাঝখানে তাকিয়ে থাকেন। সেখানে কবিতা নামক এক অপ্সরা কিশোরী পদ্মফুলের মতো ভেসে আছে। মোতালেব চেয়ারম্যানের বর্তমান বয়স ৬৫ বছর। বহুবছর হয়ে গেছে ষাটোর্ধ স্ত্রীর সাথে তার কোন শারীরিক সম্পর্ক নেই। বহুদিন হলো এসব তিনি ভুলেই গেছেন। কিন্তু ইদানীং পাকি সেনাদের সাথে সন্ধ্যার পর বসে গরুর মাংস ভুনা আর পরাটার সাথে কিঞ্চিৎ পানীয়ও গ্রহণ করেন তিনি। পাকি সেনারা নারী সঙ্গ লাভের জন্য তাকে নানাভাবে উস্কানি দিতে থাকে। মূলত তাদের নিজেদের স্বার্থের জন্যই চেয়ারম্যানকে বলতে থাকে কিছু নারীর ব্যবস্থা করে দিতে। মোতালেব মিয়া অপারগতা প্রকাশ করলে সেনারা তাকে খিস্তিখেউড় করতে থাকে। এদিকে দেশের পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হয়ে উঠছে। একদিনে পাকিস্তানি সেনাদের লুটতরাজ, গ্রামে গ্রামে গণহত্যা, ধর্ষণ, আগুনে পুড়িয়ে গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার খবর কানে আসতে থাকে। আরেকদিকে শোনা যায় দিকে দিকে যুদ্ধের দামামা। ঘরে ঘরে যুবক যুবতী যুদ্ধের ট্রেনিং নিতে শুরু করেছে। যখন তখন না বলে ছেলেমেয়ে বাড়ি ছাড়ছে। মল্লিকা এসব শুনে আরও অস্থির হয়ে পড়ে। সে বাবাকে তার মনের ইচ্ছের কথা জানায়। এবং যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মনে মনে প্রস্তুতি নিতে থাকে।

৬.

এই বাড়িটিকে গ্রামের সবাই বড়বাড়ি নামে ডাকে। বড়বাড়ির প্রথম তিন ছেলে অর্থাৎ মোতালেব চেয়ারম্যানের চার ছেলের তিন ছেলেই বিবাহিত। তারা স্ত্রী-পুত্র নিয়ে দেশের ভিন্ন ভিন্ন শহরে বসবাস করে। প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। শুধুমাত্র ২২ বছরের ছোট ছেলে ফরহাদ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারি পড়ছে। দেশের পরিস্থিতি খারাপ হয়ে উঠলে ক্লাস সাসপেন্ড হয়ে যায়। সে বাড়িতে চলে আসে। কিন্তু এভাবে দীর্ঘদিন ধরে তার পক্ষে চুপচাপ বাড়িতে বসে থাকা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। এদিকে মল্লিকাও অস্থির হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে গোপনে নানা শলাপরামর্শ চালাতে থাকে। ফলে কোন এক রাতের আঁধারে মল্লিকা ও ফরহাদ একসাথে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নেওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়া হয়। মল্লিকা চলে যাওয়ার পর কবিতা যেন আরও স্বাধীন হয়ে যায়। সে পুকুরঘাট ছেড়ে যখন তখন বাড়ির বাইরেও চলে যেতে থাকে। এনায়েত বরকতউল্লাহর পক্ষে মেয়েকে দিনরাত চোখে চোখে রাখাও সম্ভব হয়ে ওঠে না। তিনি বুঝতে পারেন যে গ্রামে আর বেশিদিন থাকা নিরাপদ নাও হতে পারে। এরি মধ্যে পাকি সেনাদের নানা কুকর্মের কথা তার কানে আসতে থাকে। তিনি কবিতাকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা ছোটমামাকে জানান। মামা তাকে অনেকভাবে ভরসা দেন কিন্তু তিনি উতলা হয়ে ওঠেন। ফলে মামার উপদেশেই তিনি কবিতাকে মামা-মামির জিম্মায় রেখে একবার সরেজমিনে ঢাকার পরিস্থিতি দেখার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন।

৭.

ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার দিন সকালবেলায় কবিতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে এনায়েত বরকতউল্লাহ নানাভাবে বোঝাতে থাকেন যেন কবিতা কিছুতেই এই দুই/একদিন ঘর থেকে বের না হয়। তিনি কথা দেন মাত্র দুদিনের মধ্যেই তিনি ফিরে এসে কবিতাকে ঢাকায় নিয়ে যাবেন। কবিতার মধ্যে কোন ভাবান্তর দেখা যায় না। সে যথারীতি সেদিনও পুকুর থেকে দুপুরে উঠে এসে খাওয়াদাওয়া করে বাড়ির সামনের ধানক্ষেতের কাছে গিয়ে অবারিত বিস্ময় নিয়ে ধানক্ষেতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের দোলা দেখতে থাকে। এবিকেলের এসময়টিতে প্রতিদিন মোতালেব চেয়ারম্যান আছরের নামাজ আদায় করে সেনা ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন বুখারির ফাইফরমাশ খাটতে যান। আজকেও তিনি একই উদ্দেশেই বের হয়েছিলেন। কিন্তু পথের মধ্যে একটি স্বর্গীয় পরীকে আইলের উপর বসে থাকতে দেখে কোনভাবেই আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। আসলে বেশ কিছুদিন হলো তিনি সারারাত ছটফট করে কাটাচ্ছিলেন। রাতের পর রাত তিনি নির্ঘুম কাটাচ্ছিলেন। ইদানীং তিনি তার নিজের শরীরটাকেও আর চিনতে পারছিলেন না যেন। রাত যত গভীর হতো তার মনে হতো থাকে কেউ যেন টকটকে লাল ঝাল মরিচ দিয়ে তার সারাদেহে ডলে দিচ্ছে। চোখ বুঝলেই তিনি শুধু একটি অপরূপা কিশোরীকে পুকুরের মাঝখানে ভাসতে দেখেন। তারপর তিনি ভোর হওয়া পর্যন্ত তওবা তওবা আর ওস্তাগফিরুল্লাহ পড়তে থাকেন। সারারাত ছটফট করে ভোরের আজান দেওয়ার সাথে সাথে বিছানা থেকে উঠে পড়েন তিনি। এরপর পুকুরের জলে অনেকক্ষণ ধরে ডুবে থাকেন। শেষে নামাজ পড়ে নাস্তা খেয়ে বাইরে যান। গতরাতেও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। বিকেলে যখন কবিতাকে ধানক্ষেতের পাশে বসে থাকতে দেখেন তখন তিনি তার শেষ সংযমটুকুও হারিয়েছেন। প্রথমে তিনি কবিতার পাশে গিয়ে বসেন। অনেকক্ষণ গল্প করার পর তিনি জানতে চান কবিতার নদী দেখতে ভালো লাগে কিনা। কবিতা তার ভালো লাগার কথা জানায়। এরপর তিনি কবিতার দিকে তার হাত বাড়িয়ে দেন। বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের আইলের উপর দিয়ে সাবধানে পা ফেলে ফেলে গোমতী নদীর মনোরম দৃশ্য দেখার লোভে কবিতাও সেদিন তার ছোট দাদুর হাত ধরে রওনা হয়েছিলো। তবে সেদিনের পর আর কখনই কেউ জানতে পারেনি পরীর মতো সুন্দর কিশোরী মেয়েটির সাথে আসলে সেদিন বা তার পরদিন বা পরবর্তীতে কী হয়েছিলো আর সে কোথায় বা হারিয়ে গেলো?

  • গল্পে দেশভাগ

    উদ্বাস্তু

    পলাশ মজুমদার

    newsimage

    আমার সঙ্গে বিক্রমপুর যেতে পারবেন? কেন নয়! অবশ্যই পারব। কখন যেতে চান? আগামীকাল

  • গল্পে মাতৃপ্রেম

    মা

    সাঈদ আজাদ

    newsimage

    ওই দেখো, বাবা কখন এসে উঠানে ঘোড়ানীমগাছের তলে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছে।

  • ধারাবাহিক

    অভিযাত্রিক

    মুজতাবা শফিক

    newsimage

    (পূর্ব প্রকাশের পর) নবম অধ্যয় মডেল স্বপ্নার সঙ্গে মুখোমুখি বসে আছে একে চৌধুরী। কিন্তু

  • এ সংখ্যার কবিতা

    newsimage

    হাহা হাহা হাহা হাহা আনোয়ারা সৈয়দ হক হাহাকারে জর্জরিত সময়ের নদী উত্তাল তরঙ্গ আর বাতাসের

  • প্রত্যয়ী ভবিষ্যতের বাতিঘর

    মুনীরুজ্জামান

    newsimage

    ‘প্রত্যয়ী স্মৃতি ও অন্যান্য’ কবি প্রবন্ধকার শিল্পসমালোচক আবুল হাসনাতের নতুন গ্রন্থ। প্রকাশ