menu

গোপেন্দ্রনাথ সরকার রচনা সংগ্রহ

বিলু কবীর

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯
image

এই আলোচনাটা বই নিয়ে। কিন্তু সঙ্গত বাস্তবতায় তা লেখক মূল্যায়নের সাথে একাকার। যুগপৎভাবে রচনা সংগ্রহর সাথে সাথে প্রামাণ্যকরণ ও স্মারকের মানে উদ্ভাসিত হয়েছে মাসুদ রহমানের সম্পাদিত এই কাজটি। ‘ড্রপ-আউট’ বলতে যা বোঝায়, তা আমাদের বহু লেখকের জীবনসত্য। তাদের মধ্যে অনেকেই থাকেন গ্রন্থহীন লেখক। গোপেন্দ্রনাথ সরকার (১৮৮৮-১৯৭৯) ঠিক তেমনই একজন লেখক। কিন্তু তার লেখালেখির পর্যায়, মান এবং পরিমাণ এতটাই উত্তীর্ণ যে, বই থাকাতো অবশ্যই উচিত ছিল, এমনকি আমাদের সাহিত্যেই তার একটা অবস্থান দাঁড়িয়ে গেলেও মানিয়ে যেত। এই বই এবং তার সম্পাদক কেন ধন্যবাদার্হ, সেটা এমনিতেই অনুমান করা যাবে।

বইটিতে বিস্মৃত গোপেন্দ্রনাথ সরকারের ৫২টি কবিতা/গান, ২টি গল্প এবং ৫টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। তা বাদে সম্পাদকীয় নিবেদন, ভূমিকা, ৩টি আলোকচিত্র, কয়েকটি পুরনো পত্রিকার ছবি এবং গোপেন্দ্রনাথ সরকার, সত্যজিৎ রায় ও আবুল আহসান চৌধুরীর একটা করে চিঠির অনুলিপি মুদ্রিত হয়েছে। সব মিলিয়ে বিস্ময় জাগানিয়া রচনা সংগ্রহের আবডালের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যায়নের সুবাদে তা বেশ একটা খননযোগ্য আকরগ্রন্থের চরিত্র অর্জন করেছে। গ্রন্থিত প্রত্যেকটি লেখা কোনো না কোনো বিখ্যাত কাগজে প্রকাশিত। কাগজগুলো হলোÑ প্রবাসী, ভারতবর্ষ, ভারতী, মানসী সাধক, সুলভ সমাচার, সন্দেশ, বসুমতী, মৌচাক, মাসিক সাম্যবাদী, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, মাসিক অমৃত, মাসিক পাপিয়া, মাসিক পূর্বাশা, মাসিক যমুনা এবং মাসিক দিনাজপুর পত্রিকা। এমনকি কোনো কোনো লেখা একাধিক কাগজে পুনর্মুদ্রিতও। এসব কাগজে মুদ্রণের জন্য মনোনীত হওয়ার ব্যাপারটি লেখার উচ্চমান সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়ার সূচক। আর একাধিক পত্রিকায় পুনর্মুদ্রিত হওয়ার ঘটনাগুলো ওইসব লেখার চমৎকারিত্বের পরিচায়ক।

গোপেন্দ্রনাথ সরকার দ্বিতীয় বিভাগে এন্ট্রান্স পাস করেছিলেন ১৯০৯ সালে। তার পরীক্ষা পাসের সনদ এ গ্রন্থে পত্রস্থ হয়েছে। ওরিয়েন্টাল সেমিনারি’রও একটা ছবি আছে। পারিবারিক আলোকচিত্রও একটা। সেই সাথে একপ্রস্থ বংশলতিকা বইটিকে সমৃদ্ধ করছে। লক্ষ্য করা যায়, গ্রন্থভুক্ত সবচেয়ে পুরাতন লেখাটি প্রকাশ পেয়েছিল বাংলা ১৩১৮ সালে, অর্থাৎ আজ থেকে ছাক্কা ১০৮ বছর আগে। আর সবচেয়ে কম পুরাতন লেখাটি বেরিয়েছিল ১৩৮২ সালে, মানে ৪৪ বছর আগে। দুটির একটি কালদৈর্ঘ্যও সামান্য নয়। কালিক তথ্যে প্রকাশিত লেখার খতিয়ানটি এই রকম- ১৩১৮ সালে ০১টি, ১৩২০ সালে ০৩টি, ১৩২১ সালে ০২টি, ১৩২৭ সালে ০১টি, ১৩২৮ সালে ০৬টি, ’২৯এ ০৯টি, ’৩০এ ০৩টি, ’৩২এ ০৩টি, ’৩৫এ ০৩, ’৩৬এ ০৪, ’৩৭এ ০৮, ’৩৮এ ০১টি, ’৪০এ ০১, ’৭৭এ ০২ এবং সবশেষ ১৩৮২ সালে ০৪টি লেখা। এই পঞ্জিকার জের টানার একটা বুঝ আছে। সেটা হলো এগুলোই তো তার প্রকাশিত লেখার পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়। আবার অপ্রকাশিত কোনো লেখাও সম্পাদকের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। অতএব, সমগ্রের তুলনায় কাজটি বড়ো অপ্রতুল। এ দিয়ে অনুমান করা যায়Ñ গোপেন্দ্রনাথ সরকারকে নিয়ে কাজের প্রসারিত ক্যানভাস অনাবিষ্কৃতই রয়ে গেছে। এ কাজটি করাতে উদ্দীপনার তাড়না সৃষ্টিই এই পরিসংখ্যান বয়ানের উদ্দেশ্য। যে কাজটি করার একটা আরম্ভপথ বা দিশা মাসুদ রহমান দেখাতে প্রয়াস পেয়েছেন। যা বাংলাসাহিত্যের জন্য বড়ো কথাতো বটেই।

নিজের লেখা সংবলিত ‘সন্দেশ’-এর কপি চেয়ে চিঠি লিখলে সম্পাদক সত্যজিৎ রায় তাকে যে উত্তর লিখেছিলেন, সেই চিঠিটিও এর আগে কোত্থাও প্রকাশ পায়নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম পড়াশোনা করেছিলেন যে ‘ওরিয়েন্টাল সেমিনারি’তে আলোচ্য গোপেন্দ্রনাথ এক সময় সেখানে শিক্ষকতা করেছিলেন। এই শিক্ষক একদা অসুস্থ হয়ে কলকাতার ক্যাম্বেল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ডা. ইউএন ব্রহ্মচারীর চিকিৎসাধীন ছিলেন। যেভাবেই হোক রবীন্দ্রনাথ সংবাদটি অবগত হয়ে তাকে দশটি টাকা, একঝুড়ি ফল এবং আরোগ্য কামনা করে একটি আশীর্বাণী চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সে চিঠি নিশ্চয়ই হারিয়ে গেছে বা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ঘটনাগুলো গোপেন্দ্রনাথ সরকারের লেখকপর্যায়, মান-অবস্থান এবং গ্রহণযোগ্যতার সূচকতো অবশ্যই।

অতএব, গবেষকদের কল্যাণে, এই রকমের একজন লেখকের একটি অবস্থান বাংলাসাহিত্যে উজ্জ্বল হয়ে থাকা উচিত ছিল অনেক আগেই। কিন্তু সেটা হয়ে না ওঠাটা, তার জন্য যাই হোক, বাংলাসাহিত্যের জন্যে ঢের। তবে আরও যে বিলম্ব ঘটেনি, সেই মুখরক্ষাটা করলেন মাসুদ রহমান। সেই বিবেচনা থেকেই এ, কথা মনে করার গ্রহণযোগ্য যুক্তি রয়েছে যে, বই আকারে এটি পাওয়ার কারণে সম্পাদক এবং তার নেপথ্য সহযোগিতাকারীরা অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।

গোপেন্দ্রনাথ সরকার রচনা সংগ্রহ। সম্পাদনা : মাসুদ রহমান। ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। প্রচ্ছদ : দেওয়ান আতিকুর রহমান। পৃষ্ঠা : ১৩৬। মূল্য ২৫০ টাকা।