menu

গৃহ বদলের মানুষ জীবন

মামুন হুসাইন

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২১
image

শিল্পী : সমর মজুমদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ধরা যাক, যুবকেরা অথবা তাদের বাড়িঘরে বাবা-মায়ের নির্মিত এই প্রকারের মুখস্থ ঘুম ঘুম দিনলিপির ভেতর- হেড মওলানার মেয়ে, পায়ে জোঁক সেঁটে থাকা, শিক্ষা ভ্রমণ উপলক্ষে দৃশ্যমান, হাওরের নিখোঁজ রাজকন্যা এবং তোমাদের নিচতলার উঁকি-ঝুঁকি জন্ম-জন্মান্তরের মরীচিকা সখী একত্রে দ্রবীভূত হয়ে পৃথিবীর শেষ সন্ধ্যা নির্মাণ করে প্রতিনিয়ত। তোমাদের বাড়িওয়ালা-আংকেল চাইছেন নিচতলার ভাড়াটেরা নিপাত যাক; কারণ তার দেয়াল-উঠোন-গিজার এবং পানির পাইপে অসুখের দাগ জমে থাকছে। বলা যায়- রাজকন্যাকে ভেবে তোমার এবং তোমাদের নির্মিত দহন প্রক্রিয়ার স্বরূপ নিয়ে ল্যান্ড-লর্ড আংকেল খুব সামান্যই ভাবিত হয়। মানব জীবন যদিওবা ক্ষণিকের মেলা, কিন্তু তখন তোমাদের দীর্ঘশ^াসের সঞ্চয় মেঘহীন, ক্ষমতাবান, সংকেতবহনকারী, সাবলীল, মহিমান্বিত অথবা সরাসরি শোকার্ত ও মৃত্যুমুখী। পরীক্ষা শেষের সুখ খোঁজার জন্য তোমরা সমুদ্র দেখার স্মৃতিতে জাহাজের পরিত্যক্ত প্রপেলার প্রতিষ্ঠা করলে- তোমাদের স্মরণে এলো, একটি প্রপেলার তখন পরিত্যক্ত। সেখানে খণ্ডকালীন বাসা বেঁধেছে এক পরিযায়ী পক্ষী-দম্পতি, আর অনেক আগে সমুদ্রের গভীর জলে এই প্রপেলারের ঘূর্ণনেই নিরন্তর মৃত্যু ঘটত নুন-মগ্ন মাছ প্রজাতির। তোমাদের ভাবনায় এলো: আমাদের কোনো বাগান নেই এবং আমরা বাগান পরিচর্যা করি। আমরা মৌচাষ করি কিন্তু বাগান নেই। আমরা মধু বিক্রি করি তাদের কাছে, যারা বহুদিন মৃত। চুনের মতো নিষ্কলঙ্ক হওয়ার আগে, তোমরা জানবে এখানে একদিন একটি বাড়ি ছিল; তোমাদের বাড়ি ছিল খানিকটা হাঁটা পথে ঐদিকটায়, আমাদের বাড়ি ছিল কাছে পিঠেই, এটা ছিল তোমাদের শহর, আমাদের শহর, আমাদের দেশ, যেখানে আমরা নিবেদন করেছিলাম আমাদের অচঞ্চল-সহজ-নালিশসমূহের তালিকা। ...তুমি চলে গেলে, আমরা কীভাবে ছিলাম এখানে? পুকুর থেকে ধোপার চকিত প্রহার কখনও উজ্জ্বল শব্দ আনতো। আর কখনও দীর্ঘ নৈঃশব্দ্য। ... তারপর শীতার্ত নক্ষত্ররাজি দেখতে দেখতে যদিবা আমরা দূরে চলে যাই, কিছু থেকেই যায়। যুবকেরা, বলা যায়, এইভাবে একদিন শব্দের ব্যরিকেড রচনা করে সুস্থ হয়, মূক হয়, মুখ ঘোরায় অতীতের দিকে এবং মিথ্যার বাহুল্যে ফের অসুস্থ হয়।

খানিকটা অসুস্থতা- হেড মওলানার কন্যা, জোঁক সেঁটে থাকা হাওরের গরিব রাজকন্যা ও তোমাদের নিচতলার উঁকি-ঝুঁকি জন্ম-জন্মান্তরের মরীচিকা-সখী একত্রে দ্রবীভূত হয়ে উৎপাদিত অপর এক অগ্রন্থিত কন্যার অবয়বেও ছড়িয়ে যায়। হয়ত তার গায়ের রং পুড়ে যায়। তোমরা জানো এখানে কোনো মান্যজন শাসিত-ফর্সা-প্রেমময় হাসপাতাল-ডাক্তার নেই। কী হয়, ক্লাসে-রাস্তায় বাসে মরীচিকা-সখীর দৃশ্যমান অগ্নুৎপাতে সদ্য রাজনৈতিক-বাইসেপ্স-সমৃদ্ধ অপর যুবকেরা, তোমাদের মতো সম্মিলিত-অন্তর্গত-সহজ নালিশের পরিবর্তে শরীরের পুরুষার্থে একদিন ভয়ঙ্কর খিঁচুনি অনুভব করে। তারা পার্টি অফিসের কংগ্রেস সু-সমাধা করে কোনো প্রকার অনুমতি ব্যতিরেকেই তোমার মরীচিকা-সখীর হাত, ঘামে ভেজা চুল এবং খাড়া নাকে ক্রোধ ঘষে দেয় রক্ত জমাট হওয়া ফেটে পড়া চোখ দিয়ে। পরিত্যক্ত একটি শিশুর মতো তোমাদের সখী অচীন-আবদ্ধ ঘরে কান্না ছড়ায়, শ^াস নেয়ার জন্য আকুল হয়, আতঙ্কে চোখ বিস্ফারিত। তুর্যধ্বনির মতো শব্দ আসে সমবেত যুবকদের মুখ থেকে এবং তারা ‘সমুখে শান্তি পারাবার...’ গান চাপিয়ে বিশালকায় শরীর দিয়ে রাজকন্যার পালকের মতো মাংসপেশিতে মস্করা ছড়ায়। তোমাদের অথবা তোমাদের সামান্য চেনা পুঙ্গববর্গ পরিত্যক্ত ঘরে সঙ্গীত ছড়াতে ছড়াতে বারংবার মেয়েটিকে সোজা করে, বুকে হাত ঘষে, ঝুঁকে পড়ে সামনে, পেছনে জোরে হেলান দেয় এবং তার শরীর উঁচু করে। তাদের কেউ সিলিং-এর সাজসজ্জা দেখে। তাদের এবং সবার পায়ে ধুলো, পোশাক এলোমেলো, আর বুক পিঠ জুড়ে ট্যাটু। (... মা আমার অসুখ হয়েছে। এদিকে আসো, আর আমাকে দয়া করে একটু,... মা ভয় লাগছে, খুব ভয় পেয়ে গেছি ... মা আমি সত্যিই ভীত, কিন্তু মরতে চাই না...)। বালিশহীন মেঝেতে মেয়েটি কান্নার গোঙানি ছড়ায় অথবা তার যন্ত্রণাদায়ক আওয়াজ এত ক্ষীণ হয়ে আসে যে, যেন সে তাকিয়েছে দূরের অথবা ঘরের অপর অসুস্থ মহিলার দিকে! মহল্লার এবং শহরের রাজনৈতিক হাত-পা খরস্রোতা হয়, ক্ষুরধার হয় আর আবারও গোঙানির মতো ভয়, নিঃসঙ্গতা এবং অনর্গল ছবি আদান-প্রদান: ... দেখুন আমাদের ঘরে আবার পোর্টেবল এক্সরে, ইলেকট্রোলাইটস, আর মায়ের পেছনটা জুড়ে গোপন বেডসোর।... রক্তের গর্ত জুড়ে মিছেমিছি নেবানল পাউডার,... আর চকিতে সে অনুভব করে, আবার কেউ তাকে টানছে,... বারে বারে। শরীর বেয়ে একটি কাঁপুনি বয়ে যাচ্ছে আর বাতাসে চুল উড়ছে আর রক্ত-নুন-বীর্য এবং ঘামের নিশ্চল আতঙ্ক ও জান্তব প্ররোচণা। তূর্যধ্বনির মতো গান ভাসছে। (আমাকে আমার জিনিসগুলো দিন...) লোকসকল নম্র স্বরে, ফেটে পড়া চোখে রক্ত জমা করে এবং সতর্ক থাকতে হবে, স্মৃতি ও নরকের মধ্যে যাওয়ার সময়- এই মর্মে কথা বলে। কিছু কিছু শব্দ দীর্ঘ নিস্তব্ধতার পর তোমাদের একদা উঁকি-ঝুঁকি মরীচিকা কন্যার কানে আসে। (...আমাকে আমার জিনিসগুলো দিন) যুবকেরা হাতের ভারি ঘড়ি পরীক্ষা করে এবং দম দেয়। নিচের রাস্তায় বুদ্ধিক্ষীণ শিশুর চিৎকার-কান্নার ধ্বনি ওঠে। মেয়েটির মুখ নিষ্প্রভ, ফোলা-ফোলা এবং চোখের পাতার নিচে জমাট রক্ত-চিহ্ন। তার তিক্ত কণ্ঠস্বর অবশ ও ধারালো। (বীর্যের গন্ধে আমার বমি পায়) আমার নাক ভারি খুঁতখুঁতে। পেরিওড শুরু হলেও আমার ঘেন্না হয় এবং শরীর জুড়ে পচা মাছের গন্ধ আসে!) এখন তীব্র গরম। চিবুক আর ঠোঁটে ঘামের জলবিন্দু... (আপনার পারফিউমের নাম?)। পায়ের মোজা না খুলে কেউ ঘুমঘুম সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল। বেসিনের কল খুলে মেয়েটি জল খায়। আঁটো করে চুল বাঁধে। পাখির কিচিরমিচির শোনে। টলমল হয় এবং ভেতরে-ভেতরে কুচকাওয়াজ করে। হয়ত তার মুখ অসম্ভব শান্ত। সে মাথা তোলে এবং দূর গৃহে অদেখা অপরাপর আপাত নিরাপদ বোনদের দিকে তাকিয়ে গোপন অন্ধকারে ভাবতে চায়, হয়ত দীর্ঘ নিস্তব্ধতা... (এখন আর আমি বাঁচতে চাই না); তুমি এবং তোমরা ভালোবাসার গল্প শোনাও (...মেরে প্যায়ারে বহিনো...)। তোমাদের দুর্বোধ্য ফিসফিসানিকে আমি ঘেন্না করি। ভুল বললাম, ‘ঘেন্না হচ্ছে’- কথাটা বলার সাহস হচ্ছে না আমার। তোমাদের বোকাবোকা আবিষ্কারসমূহ দেখছি,... আর আবারও কয়েক মুহূর্তের নীরবতা- কেউ কি তোমরা আমার সাম্প্রতিক ঘটনা সম্পর্কে ভীত? মেরে প্যায়ারে ভাইয়ো, তোমরা কী সবাই আমাকে আগের মতো ভালবাস! তোমরা কি চাইছো আমি আরো ঢের বেঁচে থাকি! তোমরা প্রশংসা করছো আমার! এই মুহূর্তে একটি দমবন্ধ ঘরে তোমরা সবাই। ভারি দ্বিধাগ্রস্ত আমি। তোমাদের শরীর এই ক’মাসে কী ওজনটাই না নিয়েছে! আমারও খেতে খুব পছন্দ। তোমরা সবাই পোশাক পরছো? হাতে জামা নিয়ে কী ভাবছো; জামা দিয়ে কি পুরুষার্থ আড়াল করছো! আগেই চুল আঁচড়াতে বসলে সমবেত সঙ্গীতের মতো। তোমরা মদ খেয়েছ একটু বেশি। তোমাদের প্রতিবিম্ব দেখ, আয়নায় আগডুম বাগডুম খেলছে। তোমাদের বাবা বেঁচে থাকলেও কী তোমাদের সিদ্ধান্ত তোমরা নিজে নাও? তোমাদের শুভরাত্রি জানাতে পারি। ঠিকঠাক মুখ ধুয়েছো তো! না, আবার ধোও! পৃথিবীর একটি সুন্দর জায়গায় কী হয়ে গেল! কিছু মনে করবে কি যদি দরজা ভেজিয়ে দিই? তোমরা আইজাক নিউটনের জ্ঞান-বৃদ্ধ আপেলে দাঁত বসালে। আর আপেল জুড়ে মৃদু নষ্ট দাঁতের রক্তপাত। নৈশাকাশ থেকে ম্লান আলো পড়ছে দেখো। দেখো আমার শরীরে কয়েক জায়গায় গভীর ক্ষত- মায়ের নেবানল পাউডার খুঁজছি। আমার হয়ত শরীরের অনেক ভেতরেও ক্ষত থেকে গেল- তোমরা এতো আদর করলে যে, আমার ভাষা বুঝবার জন্য পায়ের মধ্যস্থান স্পর্শ করে তবে ক্ষান্ত হলে। তোমরা আকাশ থেকে ঝুলে পড়া আলোর রকমারি ¯্রােতে ইতস্তত ঘোরাঘুরির ফাঁকে একবার বড্ড মারামারি করলে নিজেদের মধ্যে। (তুমি কি অবসরে অনুবাদ করো?) এ সবের অর্থ কি?- আত্মা/ভয়/পলায়ন/

চুক্তি/উদ্বেগ/আনন্দ! চেয়ারে তোমাদের পানপাত্র কাঁপছে, কারণ রাস্তা বেয়ে একটি ভারি ট্যাংক বেরিয়ে গেল। তোমাদের কি মৃত্যুভয় চলে গেল? তোমাদের দেখতে কী মজার লাগছে?... হিসি করবে? করো... হিস- হিস-! তোমাদের প্রায় নিখোঁজ-শিশ্নে, হিসি গড়িয়ে তোমাদের নিজেদের পা-ই ভিজিয়ে দিয়েছে। তোমাদের জামা কাপড় আন্ডার গার্মেন্টস কাঁপছে- কারণ একটি সাঁজোয়া গাড়ি অথবা ট্যাংক তোমাদের স্যালুট দিয়ে আবার এই রাস্তা হয়ে পাশের রাস্তায় ঢুকছে। মেয়েটি এবং যুবকেরা অথবা শুধুই মেয়েটি তলার ঠোঁট কামড়ে দুঃখ ও আক্রোশ হজম করতে চাইছিল। যুবকেরা পোশাক পরে অথবা পোশাক খোলে। (আমরা পরস্পরকে যন্ত্রণা দিই কেন বলো তো!)। জ¦লে খাক হয়ে যাওয়া ফোলা মুখ দেখা যাচ্ছে আয়নায়। (আমি এখন যাবো।)

সব সত্যি বলছো তো? সারা বিকেল-সন্ধ্যা-রাত কোথায় ছিলে?- বড় ভাই-ব্রাদারেরা জিজ্ঞাস্য হয়। হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। কোথায়? আশেপাশে। দ্রুত ঘরে ফেরোনি কেন? ইচ্ছা হয়নি। তুমি মিথ্যে বলছো? ... (আমার হাত মুঁচড়ে, ওরা আমাকে ভয় দেখায়...)। আমি বাড়ি যাবো। ঘরে একটি হিং¯্র নীরবতা। তূর্যনিনাদ হচ্ছে গান থেকে। যুবকেরা চিবুক এবং গলায় আঙুল স্পর্শ করে। যোগী-যুবকেরা প্রশ্ন ভরা রাজনৈতিক চোখে ইতি-উতি তাকায়...। মেয়েটি দরজার নবে হাত রাখে। ল্যাম্পের আলোয় কেউ কেউ সিল্যুয়েট। রিস্টওয়াচের ফিতার ওপর এক দু’জনের ভাসমান শিরা- ... তোমাদের এবং আমাদের সবার বাড়ি যাওয়া দরকার। আমরা কখন বাড়ি যাবো? এই শহরটার নাম কী? মেয়েটি পরিচ্ছন্ন হয়, সামান্য নড়বড় করতে-করতে জোরে শ^াস নেয়...। শরীরের উর্ধাংশ কম্পমান এবং স্বর সম্পূর্ণ শান্ত। আমার এত আতঙ্ক কেন? এত জোরে চুল আঁচড়াই যে চিরুনির আওয়াজ হয়। চুলের ক্লিপ হারিয়ে ফেলেছি। বারান্দায় ঠাণ্ডা বাতাস। সে একটু দোনমনা হয়, তোমাদের খিদে পেয়েছে নিশ্চয়? যুবকদের কেউ আবার এক লহমায় তোমাদের চেনা কন্যাটির উরুতে চিবুক ঘষে দেয়। মেয়েটি এবার সত্যি সত্যি বাড়ি ফিরতে চায়- আমি দরজা খুলছি। কেউ হাত বাড়ায়। শোনো..., এ রকম পরিস্থিতিতে সবাই উদ্বিগ্ন হয়, আর কেউ ভয় দেখানোর জন্য খেলনা পিস্তল তাক করে এবং দুর্বোধ্য ভাষায় প্যান প্যান করে। অথবা সবাই দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলে, শান্ত হয় এবং তুমুল মস্করায় মেঝেতে আন্ডার গার্মেন্টস ছাড়া-ই গড়াগড়ি খায়। যেন আঘাত প্রাপ্ত হয়ে এক্ষুণি মারা যাচ্ছে। আর দরজার হাতলে তোমাদের পরিত্যক্ত আন্ডার গার্মেন্টস জুড়ে কী আশ্চর্য, আবার সেই কাঁপুনি, কারণ একটি ট্যাংক গলি থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় উঠছে। তারা তড়িঘড়ি রাতের রেলগাড়ি খোঁজে এবং শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক করতে যেয়েও অবাক হয়- দেখো, কেবলই একটি ভয় তাক করে আছে আর নতুন খিঁচুনি শরীর জুড়ে!

তোমাদের উঁকি-ঝুঁকি জন্ম-জন্মান্তরের মরীচিকা-সখী অথবা তার মতো অন্য কেউ কান্নার গোঙানি ছড়াতে ছড়াতে একদিন এইভাবে রাষ্ট্রীয় যৌবরাজ্যের অধিপতিবৃন্দদের বাধ্যতামূলক যোনী প্রদর্শন শেষে ঘরে ফেরে, জেরায় পড়ে, এবং স্তব্ধ হয়- হয়ত আন্দাজ হয়, নিশ্চুপ বসে থাকাটাই তোমার শ্রেষ্ঠ সময়। হয়ত ফিসফিস কথার-নদী জোরালো হয়। হয়ত সবার প্ররোচনায় ল্যান্ড লর্ড আঙ্কেল এবং ল্যান্ড লেডি-আন্টি নিচতলার ভাড়াটেদের উৎখাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়- তাহলে যা আমরা শুনেছি, ভেবেছি,... সব সত্য? ঘুমের মধ্যেও আমরা মুখস্থ বলতে সক্ষম: মেয়েটির দু’হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, দু’পা বাঁধা, ঘাড়ের চুল কাটা, তক্তায় হাঁটু গাড়া,... আর চোখ বেয়ে রক্ত...। সবাই পাহারা বসিয়েছে। মেয়েটি মুখ ঢেকে বসে আছে। মেয়েটি ভাবলো এবং মনে করলো- রাতে ঘুমিয়ে এই যে জেগেছি, এর অর্থ ‘জন্মগ্রহণ’। আমাদের প্রতিদিনের সকাল একটি ছোট যৌবনকাল, আর বিশ্রাম এবং ঘুম আমাদের ছোট মৃত্যু। মেয়েটি ফোঁপায়, সামান্য স্থির হয়- জগতে সব ঘরে-রাস্তায় এত এত আয়না সত্ত্বেও, একটি লোকও জানে না তার সঠিক অবয়ব; আমরা কেউ দেখতে পাই না কেন? মহল্লার পরম হিতৈষী পড়শীবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেয়, তোমাদের এই কন্যার শক্ত অসুখ, কারণ তার চোখ ঘোলাটে; লোকেরা ভাবলো মেয়েটির বিবেচনা বোধ কম, কারণ শরীরের যত্ন নেয়ার পরিবর্তে সে খাতায় প্রবচন লিখছে:... ‘পাখি যারা খাঁচায় আটকায়, পাখিকে রুটিন মতো খাওয়াবার শয়তানিটুকুও তাদের জানা আছে।’ লোকেরা ভাবলো এই সব শব্দরাশি পলিটিক্যাল। লোকেরা দেখলো, অন্তর্নিঃসহায়তার কথা বলতে যেয়ে মেয়েটি আরো ক্ষ্যাপাটে কথা বলছে- ‘তিন লাথি কেন, তিন শো লাথি মারবেন আমাকে, তাই তো? এই বাটক/ ভালভা তো আপনাদের জন্যই- সেই ছোট বেলা থেকেই শরীরটাকে আপনাদের ঢালা বিছানা করে দিয়েছি-’; লোকসকল উপদেশ-বর্ম হস্তান্তরের পর ঘরে ফিরে গেলে, মেয়েটি সমস্যার তালিকা এবার বিস্তৃত করার অবসর পায়- মায়ের সঙ্গে কথা হয়: মা, শরীরের ওজন এত ক্ষীণ হওয়ার পরেও- প্রতিদিন ইদানীং অহেতুক স্থূলতার ভয় হচ্ছে আমার। স্বাভাবিক পরিমাণের খাবারেও বমি আসে। শেয়ার্ড-বাথরুমে বমির চিহ্ন লেগে থাকায়, অপর মানুষ অস্বস্তি প্রকাশ করছে। একবার এক কাজিনকে নিয়ে উঁচু টিলাতে সূর্যাস্ত দেখার জন্য উঠি, কিন্তু দুর্বলতায় মাথা ঘুরে বমি করি; কাজিন চাইছে আমার ক্ষীণ শরীর আরো পৃথুলা হোক। খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে সম্পর্ক উৎপাদনের করণ কৌশলও আমাকে ধরা দেয় না আর। ঘরের ফার্নিচার-জিনিসপত্র এক্ষণি বদলাতে চাইছি না। ... আমার বিশ্বাস, উদ্বেগ আমার আর পিছু ছাড়বে না। আপনাদের সবিনয়ে জানাই, সেই সন্ধ্যাকাল থেকে কেবলই আমার ভয় হচ্ছে। উদ্বেগকে বশ করতে পারছি না। উদ্বেগের সঙ্গে থাকতে থাকতে মনে হয় আমি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবো। যদি ভাবি, সেদিন কি ঘটেছিল, তাহলে আমি নির্ঘাৎ আটকে যাব। যদি ভাবি সেদিন কী ঘটেছিল, মাথার ভেতর আমি ঘটনা প্রবাহ আর বন্ধ রাখতে পারি না। আমি এখন সব এড়িয়ে চলি- অচেনা ঘর, ঐ সব রাজনৈতিক-যুবকদের বিবিধ ঘাম, ঘামের নুন, রক্তপাত ও বীর্য-এর আঁশটে ভুতুড়ে নিবর্তন! একা বেরুনো একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা বটে। কোন জনসমাগমে আমি নিরাপদ নই। সব মানুষ ভয়ঙ্কর। আমি আমার উদ্বেগের চাপ ধারণ করতে পারছি না। তীব্র লজ্জার মতো হয়, যখনই এইসব ভাবি। খুব অস্বস্তি হয়, যখনই এই সব প্রসঙ্গ সামনে কেউ আনে। কখনও এত রাগ হয় যে, এক্ষণি বিস্ফোরিত হবে। আমার এই সব উপসর্গ আমাকে দুবর্ল মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে। ভাল হওয়ার কোন পথ আমি জনি না। এ সব কি আমার দোষ, আমি চাইলে সেদিন সব ঘটনারাশি বন্ধ করতে সক্ষম ছিলাম? একসময় ভাবতাম আমি সব দুর্যোগে খাপ খাওয়াতে সক্ষম, ...এখন বুঝি এসব মিথ্যে। জগতে কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। মানুষকে বিশ^াস করা যায় না। নিজেকে আমি রক্ষা করতে শিখিনি। মানুষের ভিড়ে আমি নিরাপদ নই। নিজেকে বিশ^াস করতে ভুলে গেছি,...আর এই সব অনিয়ন্ত্রিত চিন্তা-অনুভব আমাকে প্রতিনিয়ত দিকচিহ্নহীন করছে!

দিকচিহ্নহীন মরীচিকা সখির স্পষ্ট আর্তভাব ও সারিবদ্ধ অন্তপুর দেখতে দেখতে যখন আমরা অবাক হচ্ছি, তখন নিচতলার ভাড়াবাড়িতে শেষবারের মতো পোর্টেবল এক্সরে এলো, ইলেকট্রোলাইটস হলো এবং মায়ের শরীরে চিকিৎসার-অতীত দীর্ঘ-বিস্তৃত মানচিত্রের মতো বেডসোরের পাতাল গর্ত চাক্ষুষ হলো আবার। ল্যান্ড লর্ড আঙ্কেল মহল্লার সেই আশ্চর্য রাজকন্যাদের গৃহত্যাগের নোটিশ চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন এবং আমরা যাচ্ছি পিতামাতাদের স্ব-উদ্ভাবিত পরিবর্তিত নতুন বাড়ির দিকে। গৃহ বদলের কালে আমরা ভাবছি- নদী খেলাধুলা করছে, সঙ্গীত বাজছে আর মানুষ থেমে থেমে অক্ষর আদান প্রদান করছে। জন্ম-জন্মান্তরের সেই দলছুট রাগী-নিষিদ্ধ-ক্লান্ত যৌবতী সখী জিজ্ঞাস্য হয়: কী দেখছেন আপনারা? কেন? কিছু খুঁজছেন? কী নেই আমার? এই তো শরীর, ... আমার শরীর, অধুনা স্পষ্ট-স্ফীত, এই শরীর আপনাদের সেবায়, ... কিন্তু শরীরের ভেতর আমার বাল্যকাল কোথায়? ল্যান্ড-লর্ড আঙ্কেল, ল্যান্ড-লেডী আন্টি নতুন ‘টু লেট’ লিখেছেন হাতে। বাল্যকালের-যুবাকালের মুগ্ধ সখা বৃন্দ ইতোমধ্যে মহল্লা পরিবর্তন করে, শহর পরিবর্তন করে, গৃহ পরিবর্তন করে এবং বেদনায়-ভয়ে-মায়ায় প্রায়শ: যৌবতী-সখীর নাম লেখে খাতা-বইয়ের এমাথা-ওমাথা। অবশেষে, আলোচনা সাপেক্ষে, একদিন অনেক দূর দেশ ঘুরে হারানো দিনের মুগ্ধস্বভাব যুবকেরা সারিবদ্ধ-বলবান হয়ে মরীচিকা-সখীর পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি দেখার নিষিদ্ধ প্রতিজ্ঞা নেয়- ... যেনবা আমরা মুণ্ডিত ও শাপগ্রস্ত, আমরা অনেককাল আগে একদা সবাই ভালবেসেছিলাম সবাইকে, ভালবাসার আয়োজন করেছিলাম; তারপর সবাই সবাইকে পরিত্যাগ করি,... এরপর আর দেখা হয় না কোনদিন। আমাদের মস্তিষ্কে এখন বহু শতাব্দির ব্রত কথা ভাসে- তোমার এবং আমাদের সবার মৌল অভিজ্ঞান গৃহহীনতা; আর মানুষের সারা জীবনের তৃষ্ণা সকল প্রতিবেশে সেই হারানো গৃহ নির্মাণ ও বিনির্মাণের অগ্নিদগ্ধ নির্জন দৃশ্যাবলীর প্রতিস্থাপন। যুবকেরা গৃহের অঙ্ক করে- প্রত্যেকের গৃহ পৃথিবীর কেন্দ্র বটে; যেখানে দু’টি রেখা এসে সন্নিহিত হয়- অনুভূমিক ও উলম্ব...। অনুভূমিক রেখা জগতের সকল স্থানকে চিহ্নিত করে, সংযুক্ত করে, আর উলম্ব রেখা চিহ্নিত করে নভোলোক এবং ভূগর্ভস্থ জগৎ। গৃহ প্রত্যাবর্তন তাই আকাশের ঈশ^র এবং মৃত মানুষের যুগপৎ স্পর্শ করার সংক্ষিপ্ত গলিপথ।

বাস্তুচ্যুত মানুষ, আপাত নিরীহ-বিষণ্ণ যুবকেরা বুঝতে শেখে- কোনোদিন এই দুই রেখার সমন্বয় সাধন সে করতে পারে না; অনুভূমিক ও উলম্ব রেখাসমূহ স্তম্ভিত-মস্তিষ্কের নানান গলিঘোঁজে ভস্মসাৎ হয় এবং মন্থর আশ্বস্ত পায়ে অগোচরে সকল লক্ষবস্তু হারিয়ে ফেলে একদিন। তখন আমরা বলি- মানুষের সুখের কাল বড় ক্ষীণ,... শেষ পর্যন্ত মানুষের হয় দু’এক মুহূর্তের সুখানুভূতি মাত্র! ক্ষীণ রাজনৈতিক-ব্যথিত যুবকেরা অথবা দলছুট অপর যুবকদের অন্য কেউ সাদা ঘোড়ার স্বপ্ন দেখে প্রায় রাতে। নতুন বাড়িঘর বদল হতে হতে, তারা ভাবে পৃথিবীর অনেক ওপরে এবং পৃথিবীর অনেক বাইরে তাদের বন্ধু বলয়। তারা পবিত্রতা, স্থাপত্য-সজ্জা ও অভিজ্ঞতার পরমবিন্যাস নিয়ে ভাবতে ভাবতে একবার টানা কয়েক সপ্তাহ ভারশূন্য ও ফ্যাকাশে হয়। হয়ত তখন তাদের নতুন ক্লাস ফাইনাল পরীক্ষা; জন্ম-জন্মান্তরের মরীচিকা-সখী এবং তাদের পরিবার সম্ভবত সেই অস্থায়ী-অস্থির কালে গৃহত্যাগ করে সকলের অজান্তে। যুবকেরা ল্যান্ড লর্ড আঙ্কেল ও ল্যান্ড লেডি আন্টির ‘টু-লেট’ পাঠ করতে করতে এই পরিত্যক্ত গৃহের স্তর, সৌন্দর্য ও আলোক বিন্যাস নিয়ে উদ্ভাসিত হয়। রাত অথবা পড়ন্ত বিকেল-সন্ধ্যায়, তখন ‘টু-লেট’-সৌন্দর্যের কার্ডবোর্ড বাতাসে সু-প্রচুর মার্গ সঙ্গীত ছড়িয়ে চলেছে; তারা গৃহকর্তা-গৃহকর্তীর অবর্তমানে, যেহেতু তখনও নতুন কোনও ভাড়াটে পৌছায়নি, বাড়ি ভাড়া খুঁজছে এই ভঙ্গীতে- কেয়ারটেকারকে বশীভূত করে ঘরের ছাদ, রান্নাঘর ও সিঁড়ি দেখতে বসে। (ধরা যাক ঘরের বাইরেরটা মানুষের শরীর, ছাদ-সিলিং এসব তোমার মস্তিষ্ক ও হৃদয়, বেজমেন্ট তোমার আকাক্সক্ষা ও অবচেতন, রান্নাঘর তোমার মনোবিশে^র সুতীব্র রসায়নাগার, রুমগুলো তোমার সঙ্গে কথা বলার নানান গলিপথ আর এই সিঁড়িঘর তোমার মন-ভূমিতে পৌঁছানোর অনিঃশেষ উপায়); অন্য অর্থে, গৃহ একটি আশ্রয়ও বটে। যেখানে ‘অভ্যাস’সমূহ পুনর্বাসিত হয়- এবং উৎপাদিত হয় আমাদের দৈনন্দিনের অনর্গল ব্যবহৃত শব্দরাশি, মতামত, চাউনি, কর্মযজ্ঞ, বক্তিমা আর গল্পগাছা! আর ঘরের গলি-ঘোঁজ, ফার্নিচার, বিছানা, রাস্তার মোড়,... এসব বিবিধ দৃশ্যের অবতারনা করা হয় যেন অভ্যাসের সেই চেনা জগৎ- ছবি, ট্রফি ও স্যুভেনির হয়ে খানিকটা কাল বেঁচে যায়।

দেখা গেল, গৃহবিন্যাসের এই স্বল্পায়ু চিহ্নসমূহ পাঠ করার আগেই যৌবতী-সখীর-একদা দুঃখী যুবকবৃন্দের পুরনো দীর্ঘশ্বাসসমূহ সপ্রতিভ হয়, বিচিত্র হয় এবং ঠিকরে পড়া রোদ্দুরের মতো দোল খায়। তারা সম্মেলক গানের পূর্বাভাস আনে, স্বস্তিবাচন রচনা করে এবং উৎকণ্ঠা থেকে উৎকণ্ঠার অধিকতর অন্তরালে যাত্রা করে : ঘরের শরীর জুড়ে দেখলো, সদ্য ভাড়াটে-উচ্ছেদের সফলতায় পুরনো সিলিং-এ জন্মদিন-বিবাহবার্ষিকির লাল নীল কাগজের অদ্ভুত ভোঁতা আলো। নিখোঁজ রাজকন্যার পরিত্যক্ত রান্নাঘরের মেঝেতে সামান্য বাসি জল, পুরনো ব্লাউজের একটি হাত এবং জলে ভাসমান পলিপ্যাক একগুচ্ছ। দেয়ালে যত্রতত্র পেরেক, নেবানলের খালি প্যাক, এক্সরে ফিল্ম, রক্তের বাসি রিপোর্ট, ছিন্ন পেটিকোর্ট, গরম মসলার শিশি, হার্পিক, বলপয়েন্ট, তুলো, ওদের ফ্যামিলি রিইউনিয়নের ধূসর বাদামী ফোটোগ্রাফ, পুরনো বই, খবরের কাগজ, তুলো বেরুনো বালিশ, ভাঙ্গা অক্সিজেন সিলিন্ডার, ইনহেলার আর ছেঁড়া ফাঁটা স্যান্ডেল-এর স্ট্র্যাপ। যুবকেরা স্মৃতি নির্মাণের শিল্পকলা আয়ত্তের ছাত্র হয়- আপনি কি জানেন, কি বিষয়ে পড়লে আমার ক্যারিয়ারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে? আপনাদের জানা আছে, আমাদের সেই মরীচিকা-সখী ঘুমাতো কোন ঘরে? এইটি কি ছিল বেডরুম? ও কি একা থাকতে চাইতো ... হয়ত ওদের একটি সেলাই মেশিন ছিল- ‘ববিন কাকে বলে’ এই কথাটি বুঝবার জন্য সে এমন একটি দৃশ্যপট তৈরি করলো: জিপার কী করে লাগানো যায়? ওর কি মন খারাপ হয়েছিল? বোনদের মধ্যে একমাত্র ওর মুখেই কেন ব্রন জেগে উঠতো! ... দেয়াল, সিলিং এবং ঘরের ভেতর স্বেচ্ছায়-বন্দি যুবকেরা প্রশ্ন কাতর হয়- জায়গাটি আমরা ত্যাগ করি, না জায়গা নিজেই আমাদের পরিত্যাগ করে?

যুবকেরা শরীর-মস্তিষ্ক জুড়ে থেকে বাল্যসখীর একদা বন্ধ ঘরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে শৈশব খোঁজে- ... হয়ত তীব্র বিষ্টি এবং আমাদের ছুটি। বই-পুস্তক জামায় মুড়িয়ে বিষ্টিতে হাঁটছি। লুকোচুরি খেলছি। ছবি দেখছি। স্কুলের স্পোটর্স। চিপ্স খাওয়া শিখছি। ভ্যান থেকে আইসক্রিম কিনছি। সমুদ্র অথবা নদীতে গলা ডুবিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেলাধুলা। জানালার কাঁচে ধুলোর ভেতর অক্ষর লেখা : জ+ঘ ৃ; হোম ওয়ার্কের ফাঁকেই দাঁত পড়ে গেল, আর বালিশের নিচে লুকিয়ে রাখলাম। ভাইবোনে মারামারি করলাম। কোথাও চুম্বন বিনিময় শিখলাম। ব্যাঙাচি ধরছি। রেকর্ড চিনছি। কাজিনদের বাড়িতে গেছি। ফুল দিয়ে মালা গেঁথে মাথায় বাঁধলাম, লুকিয়ে ম্যাগাজিন পড়ছি। খালি পায়ে কোথাও গেছি। বন্ধুর সঙ্গে ঘুমালাম। স্কুলের জন্য লাঞ্চ-প্যাক নিয়েছি। ঘরের পেছনে ব্যাডমিন্টন। প্রথম বকুনি হলো শিক্ষকের। স্কুল ইউনিফর্মে সারাদিন বনেবাদাড়ে শুয়ে বসে থাকা। গান গাইলাম। খুব চিৎকার করে মাঠের ভেতর গান গাইলাম একা ...! যেন গানের সুর ঘুড়ির মত আটকে গেছে আকাশে, আর হঠাৎই যুবকেরা তাদের কণ্ঠস্বর চিনতে পারে না!

স্মৃতি নির্মাণের এই খেলা যখন শেষ হয়, তখন সন্ধ্যা আসন্ন। যুবকেরা ভাবলো, তারা পৃথিবীর শেষ সন্ধ্যা উদযাপন করছে। বেরুনোর পথে দেখলো- যুবাকালের নিখোঁজ-রাজকন্যার পরিত্যক্ত ঘরের পেছনে একটি রং চটা প্যাকিং বক্স, আর ভিজে থাকা মেঝেতে পাখি চেনার ফিল্ড গাইড। পানির ভেতর ভেজা প্রাচীন দৈনিক- ভেজা পৃষ্ঠাজুড়ে ডুবে যাওয়া খবর; ‘বহুকাল আগে কে একজন এ্যাসাইলাম থেকে ছুটি নিয়ে ফেরার কালে মারা যায় অথবা গুলিবিদ্ধ হয়...!’ এই গুলিবিদ্ধতা তাদের স্মৃতিতে কোনো চিহ্ন আনে না। ছাদ নিচু হলে, লোকে ইংরেজি করে- মাইন্ড ইওর হেড...; এ রকম নিচু হয়ে যুবকেরা ভিজে থাকা পাখির ফিল্ড গাইড সরিয়ে পরিত্যক্ত বাক্সের ভেতর উঁকি দেয়- তারা অবাক হয়, ভীত হয় এবং থমকে দাঁড়ায়, দেখে একটি মৃত শিশুর আভাস অথবা ভ্রুণ, ... সারা শরীর পাউডারে ডুবানো যেন শীতল মাংসের গন্ধ আবিষ্কৃত হয় অনেক দেরিতে। যুবকেরা যেন স্থির চিত্র দেখছে। এই ভঙ্গিতে সটান দাঁড়ায়, নাকি একটি উদ্দেশ্যহীন ভাঙ্গাচোরা যন্ত্রণা অনন্তকাল ঝুঁকে আছে। আমরা মৃত্যু-অতিথিকে নেমন্তন্ন দিয়ে অনন্তকাল ঝুঁকে আছি পাতালমুখো। মৃত্যু-অতিথির ঠিকানা লিখে রাখার মানুষ খুঁজবে কে? শীতের গভীর দেশ থেকে আমরা জীবন নামক মহাশয়কে মসৃণ করার বুদ্ধি বার করি। আমরা আমাদের মুখ চিনতে পারছি না। মাথা পরিষ্কার হয় এবং মাথায় কুয়াশা জমে দ্রুত; ভূত এবং ঈশ^র বিষয়ে কেউ ফেভারিট কোট খুঁজে গুগুল-এ। বাল্যসখীর জল জমে থাকা পরিত্যক্ত ঘরে যুবকেরা ছিন্নভিন্ন হয়, যুবকেরা মূর্খ হয়, অসুখী হয় এবং স্মৃতিহীন হতে হতে বেদনার্ত হয়,- ... আমাদের ব্যথাগুলো কোথা থেকে আসে? যুবকেরা কাউকে প্রধান বক্তা সম্বোধন করে কথাবার্তা বলে এবং চিঠির পরিবর্তে, কবিতার পরিবর্তে জীবন-সংক্রান্ত কয়েক পৃষ্ঠা নোটস নেয়- হয়ত এই ব্যাখ্যা আইসবার্গ মাত্র। ভয় তাড়িত হয়ে শিশু নষ্ট হওয়ার নাট্যাংশ, বিষাদ, সংশয়, রাষ্ট্রনীতি ও উপন্যাসিকা কেউ অদ্যাবধি রচনা করেনি। লোকে বলে- একটি নষ্ট সময় বটে, পিছলে পড়েছি আমরা। আর চারিদিকে অনুপস্থিতির ভিড়। লোকে বলে এটি একটি শান্ত সমাধির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। লোকে ভাবে এই পরিত্যক্ত ঘর থেকে বেরিয়ে পথ পারাপার এখন নিষিদ্ধ। লোকে ভাবে, দশ দিগন্তে এখন শক্তিশালী রাজ্যবচন, অভ্যুদয় এবং শৌর্যবীর্যের পরীক্ষা। মৃত শিশুর পাউডার বেয়ে পিঁপড়ে আসে গন্ধ নেওয়ার জন্য। আমরা ‘ভবিষৎ তোমার হাস্যকর’- এই বলে নিঃশব্দ চিৎকার করি। হয়ত নিকটে কোথাও হারমোনিয়াম বাজে, মোটরগাড়ি হাঁটে এবং মানুষেরা গলি থেকে গলি বদল করতে করতে বহুদূর রহস্যময় ল্যাম্পপোষ্টের নিচে স্থির হয়। হয়ত দুপুর হয়, নগরে মোষ নামে, নগরে অসুখ নামে, ছোট বোনের পাহারাকারী ভ্রাতঃ দ্রুত খুন হয়, আর লোকে আপসোস করে,- হায় জীবন! লোকেরা প্রতিশোধ লিপি রচনা করে। লোকেরা স্তব্ধ হয়। লোকেরা পদ্য লেখে দু’চার লাইন আর প্লাস্টিক মানুষের অবয়বে আত্মকাহিনী নির্মাণ করে। আমরা লিখি হারিয়ে যাওয়ার গল্প। শান্ত হাসিমুখ ও শান্ত বাথরুমের দেয়াল সম্পর্কে।... যুবকদের এবং আমাদের তখন বিদায় নেয়ার খেলাও বটে! এই গলির ভেতর কে গাড়ি ঢোকায়? যুবকেরা এবং আমরা কোন এক সুলভ-নির্মম-নিরীহ শোকে একটি সিগারেট ভাগ করে খাই। আমাদের সামান্য কথাবার্তা হয়। ‘কাঠবেড়ালী বাদাম নিয়ে ছুটে আসছে’- এই দৃশ্য তো দেখিনি কখনও। ভূমিকাহীন জলছবি ভেসে যাচ্ছে ঢেউয়ে। আমাদের প্রতিকৃতির সামনে সময়ের চেয়ার, কর্পোরেশনের ফোয়ারা, ধূলিঝড়, গান ও হাতবোমা। তাহলে আমাদের ব্যাখ্যাগুলো কোথা থেকে আসে? ব্যথাসমূহ হয়ত আমাদের চিরকালের বেঙ্গমা-বেঙ্গমী, চিরকালের জমজ ভাইবোন। যুবকেরা ভাবে- ‘ভালবাসা’ শব্দের বিপরীত অর্থ ঘৃণা নয়,... ‘পৃথক’ হয়ে যাওয়া। বহুদিন আগে আমাদের পাড়ায় একজন অদেখা-কমদেখা রাজকন্যার অধরা-অস্পষ্ট-গভীর স্পর্শে আমরা ঢের প্রতিযোগিতা করেছিলাম, আর আনুকূল্যের লোভে ভুল-ভাল হোম ওয়ার্ক করতাম দ্রুত। বহুদিন আগে আমরা টানা কয়েক মাস কোথাও দিক-চিহ্নহীন এক ভালবাসায় আবদ্ধ হই, একত্রে থাকি। তারপর পৃথক হই এবং সেই মরীচিকা-সখীর সঙ্গে আর দেখা হয় না কোনদিন: ভয়-ভয়-সাহস উৎপাদনের লোভে, আমরা এবার বলি মৃত্যুর আগে কদাচিৎ মরণ হয় মানুষের আর সত্যিকার কথাবার্তা তো শুরু হয় মৃত্যুর পরেই!