menu

খুনি

সানজিদা সিদ্দিকা

  • ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ এপ্রিল ২০১৯
image

এক সপ্তাহ ধরে কোনো প্রকারের ত্রুটি ছাড়াই রোবটটি প্রতিদিন জাফরের সকল কাজ করে যাচ্ছে। এমনকি রাতে যৌনসুখ দিতেও অবহেলা করছে না। দুই বছর আগে এই রোবটটির নাম ছিলো শিউলি। জাফর শিউলির সৌন্দর্যে ও কণ্ঠের জাদুতে মোহাবিষ্ট হয়ে বিয়ে করেছিলো। এতোদিন সব ঠিকঠাক চলছিলো। হঠাৎ কী হলো শিউলির? মুখে হাসি নেই, কোনো চাওয়া নেই, পাওয়া নেই স্রেফ একটি রোবট। এসব ভাবনায় এমনভাবে জাফর ডুবেছিলো কখন যে খাওয়া শেষ হয়ে গেছে তা খেয়াল করেনি। দুপুরের লাঞ্চবক্সটি শিউলি টেবিলে রাখতেই জাফর ওটা ব্যাগে ভরে নিয়ে বের হয়ে যায়। সিড়িঁ দিয়ে প্রতিটি ধাপ নিচে নামছে সেই সাথে চিন্তাগুলোও নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

শিউলি কি অন্য কারো প্রেমে পড়েছে? ও কি পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছে? আজকাল রোবটের মতো সব কাজ শেষ করে। বাকিটা সময় মোবাইল নিয়ে পড়ে থাকে। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে মাঝে মাঝে ওকে বিছানায় পায় না; তখন পাশের রুমে ফিসফিস শব্দ শুনতে পায়; কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় জাফরের সকল কৌতূহল।

আজ ইচ্ছে করে অসময়ে ঘরে ফিরে আসে জাফর। কলিংবেল চাপতেই কপালে লালটিপ, পরনে লাল শাড়ি, খোপায় বেলীফুল পরিহিত শিউলি ঠোঁটে হাসি নিয়ে দরজা খুলে। জাফরকে দেখতেই সে হাসি শোকে পরিণত হলো। জাফরের বুঝতে অসুবিধা হলো না ওর উপস্থিতি শিউলিকে স্বস্তি দেয়নি। মনে মনে ভাবে ও কি কোথাও বের হচ্ছিলো? নাকি বিশেষ কারো আসার কথা ছিলো? তবুও জাফর কোনো কিছু জানতে চায় না। কিছুক্ষণ পরে সকল সাজ মুছে শিউলি সাধারণ পোশাকে জাফরের জন্য এককাপ চা নিয়ে এলো। চা দিয়েই চলে যায় রান্নাঘরে। এরপর যথারীতি খাবার টেবিলে খেতে বসেছে। যদিও আজ একসাথে খাচ্ছে। অধিকাংশ সময় জাফর রাত বারোটা কিংবা একটা করে বাসায় ফিরে তাই একসাথে খাওয়া হয় না। একটা সময় ছিলো যখন মাঝখানে হাল্কা কিছু খেয়ে শিউলি জাফরের জন্য অপেক্ষা করতো। সে সময় একদিন রাগ করে জাফর বলেছিলো, ‘খাওয়া নিয়ে অতো প্রেম দেখাতে হবে না। যার খাবার সে খেয়ে নিবে। আমি বাহির হতে খেয়ে এসেছি। কী মনে করো! একসাথে খেলেই প্রেম বেড়ে যায়? যতো সব অদিখ্যেতা।’ আবেগের প্রচন্ড অপমানের কারণে এরপর থেকে শিউলি আগেই খেয়ে নেয়। তাই আজ একসাথে খেতে বসে জাফরের নিজেকে চোর চোর লাগছে। মনে হচ্ছে চুরি করা চোরকে বেদম মারের পর দয়া করে কেউ খেতে দিয়েছে। খাবার শেষে দুজনে দুপাশে আলাদা সোফায় বসে টিভি দেখছে। শিউলি টিভি দেখার বদলে মোবাইল চালাচ্ছে। ওদের নিস্তব্ধ পৃথিবীতে একমাত্র বক্তা টেলিভিশন। জাফরের অসহ্য লাগছে । মনে মনে ভাবছে, ‘এতোদূর! আমি পাশে বসে আছি তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই! মোবাইলই সব! আজ জানতেই হবে কে সে?’

জাফর ঘুমের ভান করে বিছানায় চুপটি করে শুয়ে রইলো। হঠাৎ মাঝরাতে ডিমলাইটের আলোতে শিউলি সেজেগুঁজে মোবাইল নিয়ে পাশের রুমে গিয়ে আস্তে করে দরজা চাপিয়ে দিলো। জাফরের কাছে ওর বেডরুমটিকে মনে হয় পৃথিবী আর পাশের রুমটি অজানা কোনো গ্রহ। যেখানে যেতে ওকে পাড়ি দিতে হবে লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ। তবুও সন্দিহান, পারবে কি সেখানে পৌঁছাতে? জাফরের অভ্যন্তরে চলছে দ্বিধা-দ্বন্দ্বময় প্রশ্নোত্তর পর্ব। আমাকে কি শিউলি তবে নির্বাসনে পাঠাচ্ছে? কেনো আমি নির্বাসনে যাবো? বাহ! ও মাঝরাতে ফুর্তি করে বেড়াবে আর আমি কিনা মৃত সাপের মতো কৃষকের জামার আস্তিনে উষ্ণতা খুঁজবো। ভীষণ ক্রোধের সাথে দরজায় কান পাতে। আহ! অসহ্য। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে সব কথা বলছে যা একসময় জাফর ভালোবেসে শিউলিকে বলেছিলো, টেক্সট করেছিলো। দুশ্চরিত্রা নারী আজ সে সব কথা অন্য পুরুষকে বলছে। এরপর জাফর ডাইনিং টেবিল হতে একটি ছুরি এনে নীরবে ধীরে ধীরে দরজার নব ঘুরাতেই খুলে গেলো দরজা। পেছন থেকে যা দেখলো তা নিজের চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছে না। এলোচুল ছড়িয়ে বিছানায় কাত হয়ে কাকে যেনো ভালোবাসার কথা বলছে, আদর করছে। জাফর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। হাতের ছুরিটি নিয়ে ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে গিয়ে শিউলিকে এক ঝটকায় পাশ ফিরিয়ে ছুরিটি তুলে ধরলো পাশে যে আছে তাকে আঘাতের জন্য। একি! পাশে কেউ নেই। জাফর হতবাক। শিউলি উত্থিত ছুরিটি ছিনিয়ে নিয়ে নিজের বুকে ধরে। চিৎকার করে বলে, খুন করো আমাকে। তুমি খুনি। তোমরা পুরুষেরা খুনি। খুন করো একটি নারীমনকে অনন্ত ভালোবাসার মিথ্যা প্রতিশ্রুতিমূলক বাক্য দিয়ে। যখন জেনে যাও ওই মনটি তোমাদের মিথ্যা বাক্যে খুন হয়েছে তখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি আর কাজের চাপের দোহাই দিয়ে ভালোবাসার আত্মহত্যা করো। অথচ এই তুমি বেকার অবস্থায় আমাকে ভালোবেসেছিলে সে সময় প্রেম ছিলো, স্বপ্ন ছিলো, বিয়ের পর মাঝে মাঝে সন্ধ্যাবেলায় বেলীফুলের গাজরা এনে খোঁপায় পরাবে এ প্রতিশ্রুতিও ছিলো। ছুটির দিনে শাড়ি পরে দুজন অজানায় হারানোর কথা ছিলো। কাজ শেষে যখন এসে কলিং বেল দিবে আমি পরিপাটি হয়ে সেজেগুঁজে তোমার জন্য দরজা খুলবো। ঘরে ঢুকেই ভালোবাসি বলে আমাকে আলিঙ্গন করবে। মুছে যাবে সকল ক্লান্তি। মনে পড়ে কি জাফর সে সব কথা? এই নাও দেখো; সে সব কথা আজো মোবাইলের টেক্সটে জ্বলজ্বল করছে যেগুলো দেখে আমার দিন কাটে। হাহ! আজ বেঁচে থাকার সকল উপাদানই আছে অথচ সে প্রতিশ্রুতিরা এখন লম্বা ছুটিতে। এরপরই শুরু হলো শিউলির অসংলগ্ন কথা... খুনি সবাই খুনি, তুমি খুনি, রাষ্ট্র খুনি। খুন করেছে আমাকে, জনগণকে, প্রেমকে, বিশ্বাসকে। সবার বুকের ভেতর খুলে দেখো। রক্ত আর রক্ত। দগদগে ঘা। ওই দেখো ঘায়ের মাঝে পোকাগুলো কেমন কিলবিলিয়ে সাঁতার কাটছ্ ে। হা হা হা... তোমাদের না রাখা কথা আর স্বপ্নরাও সেখানে সাঁতার কাটছে। সুনীল জানতো তেত্রিশ বছর কেটে যাবে তবু কেউ কথা রাখবে না। তোমার বুকে, রাষ্ট্রের বুকে এখন ক্ষমতার লোভ। লোভ... জন্ম দেয় বিকলাঙ্গ শিশু। ওই দেখো ওরা কারা? তোমার সন্তানকে তাড়া করছে। থামাও থামাও... প্রতিবেশি রাষ্ট্রে প্রবেশ করলে আর ফিরবে না। এবার কাঁটাতারে ঝুলবে। বেচে দিবে ওকে স্বপ্নের বিনিময়ে। চুক্তি সই হবে, নোবেল পাবে... এরপরই শুরু হবে ছুরিদের কুঁচকাওয়াজ। ওরা খুন করেছে প্রেম, বিশ্বাস। সবাই প্রতারক, খুনি...

সারারাত ধরে শিউলি এমন আরো অসংলগ্ন কথা বলেই চলছে। ভোর হলো মানসিক হাসপাতালের পাঠানো এম্ব্যুলেন্সের শব্দে। শব্দ শুনেই শিউলি হাত থেকে ছুরি ফেলে জাফরের হাত ধরে বলে, চলো পালাই। ওই শুনছো! খুনি এখন আর একা নয় ওরা অনেকজন আসছে সাইরেন বাজাতে বাজাতে। চলো পালাই...

নিশ্চল-নিশ্চুপ জাফর একটি প্রেমের খুনের দায় নিয়ে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।